সাগরিকা রায়
বাড়ি থেকে বেরনোর সময় অদ্ভুত চেখে তাকাল মা, ‘আমি কি তোর সঙ্গে যাব নীলু?’
ব্যাগের চেন আটকাতে আটকাতে অসহায় বোধ করছিল শুভনীল। মা যদি জেদ ধরে বসে, তাহলে কারও সাধ্য নেই মাকে সামলায়। অফিসের কাজে একে মাঝে মাঝে টুরে যেতে হয়। সেবার তো রানিপিসির দেওয়া ঘন সবুজ রঙের ব্যাগে জামা কাপড় গুছিয়ে মা রেডি। শুভনীল আশ্চর্য হয়েছিল মায়ের ব্যস্ততা দেখে, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ মা?’
‘তোর সঙ্গে। অত দূরে একা একা যাবি?’ মা কৌটো ভরে পান গুছিয়ে নিচ্ছিল। সবুজ ব্যাগের সাইড পকেটে ঠেসেঠুসে পানের সরঞ্জাম ঢোকাচ্ছিল।
উপায় না দেখে তেতলার রুমাকাকিমাকে ডেকে এনেছিল শুভনীল। পানের রসে ঠাসা মুখ ওপরের দিকে তুলে মায়ের পাশে এসে বসেছিল কাকিমা। সেবার কাকিমাই সামলেছিল মাকে। এখন কাকিমাও নেই। বিরাটিতে ছেলের কাছে গেছে। ভরসা বলতে রিমঝিম। মায়ের জেদের বানের মুখে খড়কুটো। আজ শুভনীলের জলপাইগুড়ি যাওয়ার কথাটা মাকে কে বলেছে কে জানে! রিমঝিম বলবে না। নিশ্চয়ই ফোনে প্রকাশকাকার সঙ্গে কথাবার্তা শুনে ফেলেছে ঠিক কোনও এক সময়। না হলে সব কথাবার্তা, আলোচনা মায়ের অগোচরেই তো হয়েছে। মোহন্তপাড়ার জমিটা বেচে দিতে মনস্থির করেই ফেলেছ শুভনীল। কী হবে আর ওসব জমিয়ে রেখে। কলকাতা থেকে জলপাইগুড়িতে নিয়ম করে যাতায়াত, জমি-বাড়ির দেখভাল করা এক একটা মানুষের পক্ষে কি সম্ভব? নেহাত প্রকাশকাকা ছিলেন। খবরাখবর ফোন মারফতই যা নেওয়া হত। ইদানীং কাকার শরীর ভাল যাচ্ছে না। বয়সও হয়েছে। দিন কুড়ি আগেই ফোন করছিলেন, ‘কাস্টমার আছে। বাড়ি-জমি ফেলে না রেখে যদি বিক্রি করতে চাও তো... আমারও বয়স হচ্ছে। ক’দিন আর পাহারা দেব!’
চাপা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে এসেছিল শুভনীলের কানে। রাতে শুয়ে রিমঝিমের সঙ্গে আলোচনা করেছে। রিমঝিম উৎসাহ দিয়েছে। ঠিকই তো! অযথা অতটা জমি ফেলে রেখে লাভ কী?
শুভনীল মাকে জানতে পারছিল না এসব কথা। রিমঝিস আশ্বাস দিয়েছে, পরে বুঝিয়ে বললেই হবে। কাজটা আগে হয়ে যাক!’
মায়ের সেন্টিমেন্টটা রিমঝিমকে বোঝাতে পারছিল না শুভনীল। সেই সময়, সেই পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত না হলে এই আবেগকে ছুঁতে পারা খুব কঠিন। এখনকার প্রায় নির্বাক, প্ৰাণহীন মা এত হাসতে জানত যে, তার ছোঁয়ায় পুরো সংসারটা হাসত। কত... কত স্মৃতিভরা সেইসব দিন। মাঝে মাঝে কলকাতার জনবহুল রাস্তায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ একঝলক বাতাসের সঙ্গে সেই গন্ধ নাক ছুঁয়ে ফের ফিরে যায় মোহন্তপাড়ার বাড়িতে। কখনও মাধবীলতা ফুলের গন্ধ মিশে থাকে তাতে। সন্ধ্যেবেলায় মা হাত ধরে টেনে নিয়ে যেত, ‘ফুল ফুটতে দেখবি? একটুক্ষণ মাধবীলতার কলিটার দিকে তাকিয়ে থাক।’
তখন সন্ধে হব হব ভাব। মাধবীলতার কলির দিকে তাকিয়ে ওরা তিনজন। আস্তে, খুৱ আস্তে মাধবীলতার কলি পরির পায়ের হালকা শব্দের মতো অস্পষ্ট নরম শব্দে পাপড়িগুলো মেলে ধরল। এরপর থেকে নেশা হয়ে গিয়েছিল ফুল ফোটা দেখার। মা খুব যত্ন করত গাছটার। প্রকাশকাকা বলছিলেন, এখন নাকি সারা বাড়ি ছেয়ে গেছে মাধবীলতায়। শুনে শুভনীলের মনে হয় মাধবীলতা গাছটা সারাটা বাড়ি জুড়ে ওদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। হঠাৎ করেই তো বাড়িঘর ছেড়ে চলে এসেছিল ওরা। ওরা বলতে মা আর শুভনীল। রিমঝিম পরে এসেছে শুভনীলের জীবনে। আসার সময় গাছটাকে, বাড়িটাকে বল আসতে ভুলে গিয়েছিল শুভনীল। মনে ছিল না।
মায়ের দিকে তাকাল শুভনীল, ‘আমি চলে আসব মা! কাজ হয়ে গেলেই...’
‘কাজ? কার কাজ?’ আর্তনাদ করে উঠল মা। স্বরের তীব্রতায় ভয় পেল শুভনীল। ‘কাজ’ বলতে শ্রাদ্ধের গন্ধ পেয়েছে মা। মৃত্যুর গন্ধ!
আরে, অফিসে কাজ! মাত্র দিন তিনেকের মামলা! রিমঝিম তো থাকছে তোমার কাছে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব। চিন্তা কোরো না। তাছাড়া, ফোন তো করবই।’
মা ফ্যালফ্যাল করে দেখছিল ওকে। মাত্র চার বছরেই মা কেমন বৃদ্ধা হয়ে গেছে। শিয়ালদা থেকে জলপাইগুড়ি পৌঁছনো পর্যন্ত মায়ের ফ্যালফ্যালে চোখ টানা অনুসরণ করে গেছে ওকে। মাকে কি সব কিছু জানানো উচিত ছিল? কিন্তু যদি বেসামাল হয়ে পড়ত? সঙ্গে আসার জন্য অবুঝ বায়না ধরে থাকত? তাহলে শুভনীলের পক্ষে সামলানো মুশকিল হত!
ও নিজে কি কখনও জলপাইগুড়িতে ফিরে যাওয়ার কখা ভবে? নিশ্চয়ই না। না হলে, সুভাষ দালালের সঙ্গে সন্তোষপুরে গিয়ে জমির খোঁজখবরই বা করবে কেন? জমির দাম চড়চড় করে বাড়ছে। পার্থদা সোনারপুরে জমি কিনবে শুনে শুভনীলও ভেবেছিল কাছাকাছি চেনাশোনা লোক থাকাটা ভালই। কিন্তু দালাল লোকটা শেয়াল চোখে তাকিয়ে ভুজুংভাজুং দিয়ে সোনারপুর গ্রামীণ এলাকার বনহুগলি দু’নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে হাজির করল ওকে। ওখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে হতভম্ব শুভনীল। জল নাকি এখানে বারো মাস দাঁড়িয়ে থাকে। কেওড়াপুকুর খাল, ছুমড়োর ঘাট, কুলবিল... কোন খালেই সংস্কার হয় না। ফলে অবধারিত মশা-মাছি, অসুখ-বিসুখ...। সব শুনে রিমঝিম রেগে টং, ‘দরকার নেই তোমার বাড়ি করার। সস্তার তিন অবস্থা। এসব জায়গায় বাড়ি করতে চাও কী ভেবে? বরং ফ্ল্যাট কেনো।’
চমৎকার কথা বলে রিমঝিম! যেন ফ্ল্যাট কিনতে তৈরি শুভনীল! যেন পকেট গজগজ করছে টাকায়! বোঝে না টাকাটাই প্রধান বাধা স্বপ্ন দেখার। প্রকাশকাকা জমি-বাড়ি বিক্রির কথা তোলায় একটু লোভ তো হয়েছিলই শুভনীলের। এই টাকা পাওয়া গেলে বিজয়গড়ের দিকে ফ্ল্যাট কিনেও হাতে কিছু থাকবে। নয়তো বারাসাত কি নরেন্দ্রপুরে জমি কিনে রাতুলের মতো ট্রেন্ডি আর ছিমছাম বাড়ি বানাবে।
বাসের ঝাঁকুনিত পেট-পিঠ ব্যাথা হয়ে যাচ্ছে। দু’ধারে নয়ানজুলি। জলে ডুবু-ডুবু পাটগাছ। দূরে খেতের মাঝে টংঘর। উত্তরবঙ্গের বাতাসে যেমন ঝিমঝিমে মাদকতা আছে, ওখানে সেটা নেই।
ওই যে প্রকাশকাকা! বাস থেকেই কাকাকে দেখতে পেল শুভনীল। ব্যাগ গুছিয়ে নিতে নিতে চারপাশে তাকাল ও। এই বাসষ্ট্যান্ড থেকেই সেদিন বাসে উঠেছিল ওরা কলকাতার উদ্দেশ্যে। এল চার-চারটি বছর পর। একটা চেনা মুখও নজরে পড়ছে না। পিন্টুর পানের দোকানটা এখানেই ছিল না?
‘এসে গেছ ভালয়-ভালয়! পার্টিও চলে আসবে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে। একটা রিকশা নিই, বুঝলা? তোমার রেস্ট চাই।’
প্রকাশকাকার সঙ্গে রিকশায় উঠে বসল শুভনীল। কাকাকে দেখে খারাপ লাগছিল তার। কাকার চেহারা বেশ খারাপ হয়ে গেছে। ফতুয়াটা খলখল করছে শীর্ণ শরীরে। সেই কবে কাকিমা মারা গেছেন! একা মানুষ এখন, শেষ জীবনটা কেমন যাবে কে জানে!
‘চা খাবা? সামনের দোকানটায় নামি, চলো।’
রিকশা থামিয়ে নেমে গেলেন কাকা। শুভনীল নামল না। কাচের গেলাসে চা দিয়ে গেল একটা ছেলে। দোকানের সামনে বেঞ্চে বসে দ্রুত চা শেষ করছেন কাকা। কড়া চা। ভাল লাগল ক্লান্ত শরীরে। শুভনীল চা খেল আরাম করে।
‘নীলু, আর কিছু খাবা? টেস্ট?’ ঘাড় ফিরিয়ে গলা তুললেন কাকা।
‘না, চলুন।’
গলির মুখে এসে রিকশা ছেড়ে দিলেন কাকা। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে অনবরত কথা বলছেন তিনি, ‘দাম কোন জিনিসটার বাড়ে নাই বলো? জমিই বা বাদ যাবে কেন?... বউদি কেমন আছে? তোমার বউ বউদির দেখাশোনা করে তো?’
জবাব দিতে দিতেই তমালকে দেখল শুভনীল। বাবুপাড়ার তমাল। সুস্মিদের পাশের বাড়িতে থাকে। তমালকে দেখে সুস্মিকে মনে পড়ল। ভুলেই গিয়েছিল সুস্মির কথা। বিয়ে হয়ে গেছে হয়তো। চলে গেছে জলপাইগুড়ি থেকে। তমাল অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘শুভনীল।’
‘হ্যাঁ, ভাল আছিস?’
‘আছি। তুই কবে এলি? সরকারি চাকরি করছিস শুনেছি। বিয়ে?’
ঘাড় নাড়ল শুভনীল, ‘হ্যাঁ, তুই?’
‘এসএসসি দিয়ে যাচ্ছি। সবটাই লাক বুঝলি!’
একরকম আছে তমাল। স্কুল লাইফের মতৈ ছটফটে, তড়বড়ে। পোস্ট অফিসের ডানপাশের যে-রাস্তাটা স্টেশন পাড়ার দিকে বেঁকে গেছে, সেখানে পল্টুদের বাড়িতে খেলতে যেত ওরা সবাই। পাশে একটা মাঠ ছিল। সেটা কি আছে? নাকি শপিংমল হয়ে গেছে? সুস্মির কথা জিজ্ঞেস করবে করবে করে করা হল না। রাখিপূর্ণিমার দিন ইভটিজারদের রাখি পরাবে বলে বেরিয়েছিল প্রসন্নদেব মহিলা কলেজের মেয়েরা। সুস্মি ছিল সেই দলে। মায়ের জন্য জরদা কিনতে গিয়ে রাখি পরে বাড়ি ফিরল শুভনীল। ফিচেল হেসে সুস্মি বলেছিল, ‘বরাবর রাখির দিন এখানে এসে দাঁড়াবে, আমি এসে রাখি পড়িয়ে দেব। পরে সুস্মির সঙ্গে ওর ভাল বন্ধুত্ব তৈরি হয়েছিল। বাবুপাড়া পাঠাগার থেকে বই আনতে গিয়ে কতদিন সুস্মিদের বাড়ি গেছে ও! অথচ সুস্মিকে এতদিন মনেই পড়েনি। আজ তমালকে দেখে হুড়হুড় করে পুরনো জলপাইগুড়ি এক ছুটে চলে এল সামনে।
কুশল প্রশ্নের ধামাকার পরে এক জায়গায় এসে কণ্ঠস্বর থেমে আসে। তমাল কী বলি বলি করেও বলল না।
‘থাকছিস এখন?’
‘এই দিন-দুয়েক!’
বিদায় নিয়ে তমাল চলে গেল। শুভনীল তমালের চলে যাওয়া দেখছিল পেছন ফিরে।
ভাগ্য মানুষকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে যায়! হয়তো আজও তমালের মতো শুভনীলও জলপাইগুড়িতে থাকত। সব কিছু অন্যরকম হতে পারত! যদি সেদিন কোনও কারণে কোচবিহারে না যেত দাদা! যদি ঝন্টু ঘোষাল দাদাকে কোচবিহারে সস্তার জমির কথা না বলত! সকাল ন’টর মধ্যে সে ভাত খেয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল দাদা, ‘ফিরে এসে জমিয়ে খাব মা! ছোলা-নারকেল দিয়ে কচুশাক, পাঁচমিশালি ডাল রেখে দিও কিন্তু। ফিরে এসে খাব।’ ফিরেই আসছিল দাদা। বাসটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খালে পড়ে গিয়েছিল। এমনভাবে উলটে পড়েছিল যে, বাসের দরজা খালের জলে ডুবে যায়। কীভাবে যেন বাসের নিচে পড়ে জলে-কাদায় আটকে গিয়েছিল দাদা। দুটো বাসের রেষারেষির জন্য দাদা আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। তখন অন্ধকার নেমে এসেছে প্রায়। স্থানীয় লোকজন তৎপর হয়ে কয়েক জনকে বাঁচাতে পেরেছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনজন মারা যায়।
সারারাত ছেলেটা বাড়ি ফেরেনি। সবাই তো ওর জন্য অপেক্ষা করছিল। মোবাইল ফোনও সাড়া দিচ্ছিল না। ভোরের দিকে সাইকেল চেপে কে একজন এসে খবর দিয়েছিল, ‘মাস্টারবাবু, একটা ব্যাপার হয়ে গেছে।’ বাবা আশ্চর্য চোখে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়েছিল। জলের ভেতর খোঁজাখুঁজি চলছে তখন। ওরা গিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে দাদাকে টেনে তুলেছিল দুটো লোক। পানাভরা খালে শ্যাওলা মেখে শুয়ে ছিল দাদা। সারা শরীর লতাপাতায় জড়ানো। পুকুরের তলার পাঁক লেপ্টে আছে চোখে, নাকের ফুটোয়, কানের ভেতরে! তিনদিন আগেই কী সুন্দর করে হেসে হেসে দাদা বলেছিল, ‘এবার শীতে তোকে বড় বড় কইমাছ খাওয়াব। মাছগুলো দেখিস। এক্কেবারে হলু-উ-উ-দ!’ বলতে বলতে দাদার চোখ বুজে এসেছিল স্বাদ বোঝাতে। সেই চোখ এখন কাদায় জড়ানো।
মাকে ধরে রেখেছিল শুভনীল। একটা চটের ওপর দাদাকে শুইয়ে রাখছিল কারা। অনেকক্ষণ জলের গভীরে থাকার জন্যে দাদার শরীর থেকে বুনো সোঁদা গন্ধ বের হচ্ছিল। মা অবাক হয়ে দাদাকে দেখছিল। যেন দাদাকে নয়, অন্য কাউকে দেখছে। সেই যে স্তব্ধ হল মা, দীর্ঘদিন কথা বলেনি। শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দটুকুও পাওয়া যেত না যেন। ষোলো দিনের মাথায় চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছিল শুভনীল। দেরি করেনি। মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল কলকাতার উদ্দেশ্যে। ঠিক এক বছর পরে ছাব্বিশে আগস্ট তারিখটা এল। মাকে কিছু বলতে পারছিল না। অথচ ভেতরে ভেতরে পুড়ে যাচ্ছিল। ঠিক ন’টার সময়ই তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল দাদা! খেতে বসে ভাত নাড়াচাড়া করছিল শুভনীল। মনখারাপের চাদর সারা শরীর-মনকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল। তখনই মা এসে কাছে দাঁড়িয়েছিল, ‘ও ফিরে এসে খাবে বলে গেছে, তুই খা। ও এল বলে!’ এতদিন পরে মায়ের মুখে শব্দের ঘোরাফেরা শুনে আনন্দ ও বেদনায় জড়াজড়ি শুরু হয়ে গিয়েছিল ভেতরে ভেতরে। বহুদিনের জমিয়ে রাখা কান্নার বাঁধ ভেঙে গিয়েছিল, ‘দাদা চলে গেল মা...’
‘ও ফিরে আসবে। বাড়ি ছেড়ে থাকতে পারে না ছেলেটা। আসবে, দেখিস,’ ছেলেভুলনো সুরে কথা বলতে বলতে শুভনীলের পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল মা। শুভনীল অবাক হয় মাঝে মাঝে। মা দাদার জন্য অপেক্ষা করে আছে, অথচ বাবার মৃত্যুটা মেনে নিয়েছে। সন্তান হারানোর শোকে মা জীবিত থেকেও মৃত্যুকে উপলব্ধি করেছে। হয়তো বাবার মানসিক অবস্থাটা মা ভাল বুঝেছে। দাদাকে দেখতে গিয়ে বাবার স্ট্রোক হয়েছিল। বাপ-ছেলে হাত ধরাধরি করে বাড়ি ছেড়ে চলে গেল। মাত্র কয়েকটা ঘণ্টার মধ্যে সব কিছু পরিবর্তিত হয়ে গেল।
বাঁ-হাতে কলেজ রেখে ডানহাতি রাস্তায় নেমে পড়ল শুভনীল। সরু কাঁচা রাস্তা চলে গেছে ঝোপঝাড় পেরিয়ে। কত চেনা রাস্তা! স্মৃতির ভার সামনে এগোতে দেয় না। পেছিয়ে রাখে। শুভনীল দাঁড়িয়ে পড়ল। ওখানে মার্বেল-গুলি খেলত ওরা।
প্রকাশকাকা ওকে দাঁড়াতে দেখে হাসলেন, ‘মনটা উইড়াং বাইড়াং করে? জন্মভূমি! এরে কি ভোলা যায় নীলু?’
শুভনীল কাকার দিকে তাকিয়ে কী বলতে গিয়ে থেমে গেল। কাকাকে বড্ড কাহিল দেখাচ্ছে। বার্ধক্য ভালরকম থাবা বসিয়েছে।
‘ওই জন্যই তো জমি-বাড়ির ব্যবস্থা করতে বলতেছি। এখন আর আমার শরীরে শক্তি নাই, বুঝলা? মাথাও কাজ করে না। বলে, বাঁশ পাকলে সরু, মানুষ পাকলে গোরু!’
শুভনীল ভাবল, শেষ জীবনটা কাকাকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে রাখলে ভাল হত। রিমঝিমকে জিজ্ঞেস করতে হবে। ঝট করে একজনের দায়িত্ব নেওয়াটা...
‘যারা জমি-বাড়ি কিনবে তারা লোক কেমন কাকা? মানে, বাবা-দাদার এত ভালবাসার জমি!’
অদ্ভুত হাসলেন প্রকাশকাকা, ‘সেইসব দেখে কী হবে? কথাবার্তা মোটামুটি কমপ্লিট হয়েই আছে। তুমি মালিকপক্ষ। ফাইনাল কথা তোমার। বউদির সইসাবুদ লাগবে। সেই সব ব্যবস্থা হবে পরে। তুমি কথা বলো। আর-একবার তোমায় আসতে হবে। টাকাপয়সা... সব বুইঝা কথা আগায় নিবা!’
প্রকাশকাকার কথা শুনতে শুনতে জলপাইগুড়িকে দেখছিল শুভনীল। বর্ষা চলছে। এখানে রাতের দিকে বৃষ্টিটা বেশি হয়। জমিতে জল দাঁড়াতে দিত না দাদা। ফসল নাকি নষ্ট হবে। জলপাইগুড়ির শ্বাস-প্রশ্বাসে দাদার গায়ের গন্ধ পাচ্ছে শুভনীল। এখনই যেন একটা বাঁধাকপি নিয়ে এসে দাঁড়াবে দাদা, ‘দেখ নীলু, আমাদের জমির!’ বৃষ্টির দিনে ছাতা নিয়ে স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত দাদা। ভাইকে ছাতার তলায় নিয়ে বাড়ি ফিরত। ফিরেই চেঁচাত, ‘মা, নীলুর পায়ে বৃষ্টির জল লেগেছে। বেশ করে সরষের তেল মালিশ করে দাও, নয়তো ঠান্ডা লাগবে। পরশু থেকে কিন্তু ইউনিট টেস্ট।’
‘তুমি তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে নাও। পার্টি চলে আসবে। আইসা গেছে কি না...’ প্রকাশকাকা হাঁটার গতি বাড়ান। সব কাজেই প্রকাশকাকার নির্ভরতার ছায়া সঙ্গ দিয়ে আসছে। বাবা-দাদার চাকরিস্থল থেকে পাওনা টাকাপয়সাও কাকার উদ্যোগেই তাড়াতাড়ি পাওয়া গিয়েছিল। এখন জমি-বাড়ি বিক্রির ব্যবস্থাও কাকাই করছেন। শুভনীল আর ওর মা শুধু সইসাবুদ সেরে নিশ্চিন্ত। শুভনীল ভাবল, ব্যবহারিক সম্পর্ক কখনও কখনও এত আত্মিক হয়ে ওঠে যে, তথাকথিত আত্মীয়তা সেখানে লজ্জাকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। প্রকাশকাকা তো আপন কাকা নন। বাবার বন্ধু মাত্র! আজ সব কথাবার্তা কাকার বাড়িতেই হবে। শুভনীলদের বাড়িতে কেউ থাকে না। বসবে কোথায় সবাই? চারধারে ঝোপঝাড়, আগাছা নিশ্চয়ই! বাড়ির কথা মনে হলে বুকটা শ্বাস নিতে ভুলে যায় যেন। ধড়াস ধড়াস করে। কত স্মৃতি! কত কথা! বুকের ভেতর থেকে দমচাপা কান্না উথলে ওঠে।
বারান্দার একধারে ব্যাগটা রেখে কুয়োপাড়ে গেল শুভনীল। কাকার বাড়িটা একই রকম আছে। টিনের চাল, ইটের দেওয়াল। ভগ্নদশা প্রায়। বাঁধানো কুয়োপাড়ে খাবলা দিয়ে সিমেন্ট উঠে গেছে। বালতিতে জল তোলা ছিল। ঠান্ডা জলে হাতমুখ ধুয়ে স্বস্তি এল। এই জলে যেন আপনজনের স্পর্শ আছে। পায়ের পাতায় জল ঢালতে ঢালতে ওদের আসতে দেখল শুভনীল। তিনজনের মধ্যে একজন নিশ্চয়ই দালাল। দ্রুত চোখ বুলিয়ে প্রকাশকাকার ঘরবাড়ি দেখে নিচ্ছে লোকটা – বিক্রির মাল হিসেবেই সব যাচাই করে হয়তো।
‘এসো নীলু! ওঁরা এসে গিয়েছেন,’ কেটলিভরে চা নিয়ে বাড়ি ঢুকছেন কাকা। মোড়ের মাথার রবিদার দোকানের চা নিশ্চয়ই।
দালাল বাদে বাকি দু’জন কাস্টমার। পৌনে দু’বিঘে ফসলি জমি। আর সাড়ে তিন কাঠার মধ্যে বাড়ি। কাঠা এখানে কত যাচ্ছে? কলকাতায় তো হাত দেওয়া যায় না! অজিতবাবু বারুইপুরে দু’কাঠা জমি কিনলেন। সাড়ে চার লাখ করে পড়ল। তা সেও ভেতরের দিকে। স্টেশনে ট্রেন ধরতে পনেরো টাকা রিকশাভাড়া লাগে। অটো রিকশায় আট টাকা।
‘সবই তো জানো নীলু! আর-একবার সামনাসামনি আলোচনা করে নাও। দো-ফসলি জমির দাম আলাদা করে ধরতে হবে। কোনটা ডাঙা জমি, কোনটা খাল জমি সব মার্ক করা আছে জমির কাগজপত্রে। মোটামুটি সবই ল্যাখা আছে। দেখে নাও,’ প্রকাশকাকা বাড়ির দলিল, জমির কাগজপত্র শুভনীলের দিকে এগিয়ে দিলেন। শুভনীলের মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। ব্রেনে জট বেঁধে গেছে যেন। স্মৃতিগুলো বটের ঝুরির মতো নেমে আসছে মাথা থেকে। বাস্তব জগৎ সেখানে ঢোকার পথ পাচ্ছে না।
‘আপনি তো সব করছেন কাকা। আমি আর কী দেখব!’ শুভনীলের অস্থিরতা বাড়ছিল। কখন বাড়িতে যাবে? ভয় ভয় করছে কেন! বাড়িটা দেখার মতো সাহস সঞ্চয় করতে পারবে না যেন! কলকাতায় থাকাকালীন এভাবে ভাবেইনি কখনও। এখন মনে হচ্ছে এতদিন খোঁজখবর করেনি, আজ বাড়ি বিক্রি করতে এসেছে! কী ভাববে বাড়িটা! কী ভাববে বাবা... দাদা!
‘কথাবার্তা ফাইনাল হলে এ মাসের মধ্যেই তাহলে রেজিস্ট্রি করে ফেলব। কী বলেন?’ বয়স্ক লোকটি পর্যায়ক্রমে প্রকাশকাকা ও শুভনীলের দিকে তাকান।
‘নিশ্চয়! নীলু, তোমাকে আর-একবার আসতে হবে। বাপ-দাদার অবর্তমানে জমি-বাড়ি তোমার আর বউদির নামে মিউটেশন করা হয়েছিল আড়াই বছর আগে। বউদির সই লাগবে। পারলে বউদিকে নিয়ে আসতে হবে রেজিস্ট্রির আগে!’ প্রকাশ কাকা এঁটো কাপগুলো গুছিয়ে রাখলেন, ‘চলো, তোমাদের বাড়ি যাই! মাস্টারদাদা কত কষ্টে বাড়িটা করেছিলেন। সোনার সংসার গেল। এখন সোনার মাটি কার হাতে যাচ্ছে!
প্রকাশকাকার আক্ষেপ শুনতে শুনতে নিজেকে অপরাধী মনে হল শুভনীলের। বাপ-ভাইয়ের জমিজমা রক্ষা করার দায়িত্ব তো ওরই। অথচ ও-ই বা কী করে...।
‘বুঝলা নীলু, জীবন থেমে থাকে না। সব পালটায় গেছে। আমি ওই পুরনো দিনগুলোর মধ্যে আটকায় আছি,’ প্রকাশকাকা দূরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
শুভনীল কাকার বাড়ির মাকাল গাছটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকল। এই গাছটার দিকে তাকিয়ে চুপ করে থাকল। এই গাছটার অনেক বয়স। মনে আছে, একবার লজ্জাবতী লতার গাছ শেকড়সুদ্ধ তুলে মাটির টবে বসিয়ে দিয়েছিলেন কাকা। স্কুলে দেখানোর জন্য। ‘ওইখানে বঁইচির ঝোপ ছিল না?’
‘নাই। বহু গাছ ঝড়ে নষ্ট হয়্যা গেছে। বইচি, ম্যাদাগাছ, ওলটকম্বল, বান্দরলাঠি, ঘি-কাঞ্চন, আম... গাছ নাই আর!’ প্রকাশকাকা উঠে দাঁড়ান এমনভাবে, যেন সব আফসোস ঝেড়ে ফেলে দিলেন, ‘চলো, তোমাদের বাড়িতে একবার...!’
প্রকাশকাকার কথা শুনে ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকটা। এতদিন পরে কী করে ঢুকবে ও বাবা আর দাদাকে বাদ দিয়ে? লোক লাগিয়ে বাড়িটা নাকি মোটামুটি সাফসুতরো করে রেখেছেন কাকা। যেতে যেতে সে কথাই বলছিলেন সঙ্গের লোক তিনটিকে। শুভনীল বাঁক ঘুরে বাড়ির সামনে পৌঁছেই শ্বাস টানল। বাড়ি! বাড়ি! কতদিন পর দেখল বাড়িটাকে! একটা লম্বা বাঁশ এখনও ঠায় দাঁড়িয়ে। একা। পয়লা কার্তিক থেকে টানা এক মাস সন্ধেবেলা বাঁশের আগায় ‘পিদিম’ জ্বেলে সুতো ধরে ওপরে তুলে দিত মা পিদিমটাকে। পূর্বপুরুষদের কথা মনে রেখে এই পিদিম জ্বালাত মা। কুপিতে কেরোসিন ভরে সুতোতে টান দিয়ে পিদিম ওপরে তোলার সময় বিড়বিড় করত মা, ওঁ দামোদরায় নভসি তুলায়াং...!
জুতোয় হোঁচট খেয়ে থমকাল শুভনীল। খুব নুড়ি এই রাস্তাটায়। এই রাস্তা ধরেই একদিন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল দাদা কোচবিহার যাবে বলে। বাবা বেরিয়েছিল স্কুলে। এই রাস্তা দিয়েই মাকে নিয়ে কলকাতার উদ্দেশে রওনা হয়েছিল শুভনীল। রাস্তাটার কথাই ভুলে গিয়েছিল ও। হোঁচট খাইয়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিল কি রাস্তাটা?
বুকটা ফাঁকা ঠেকছিল। ওই যে সামনেই দাদার ঘর! ওখানেই বিছানায় বসে পড়াশোনা করত নীলু। বারান্দার শেষ সীমায় রান্নাঘর। রান্নার গন্ধ, ঝাঁজ সোজা ঢুকে পড়ত দাদার ঘরে। দাদা চেঁচাত, ‘মা! পেঁয়াজি হচ্ছে নাকি?’
‘না রে, আলুচচ্চড়ি করছি,’ হাসত মা।
‘এঃ! বাড়ির অবস্থা দেখি খুব খারাপ,’ দালাল মন্তব্য করে, ‘পোড়োবাড়ি!’
‘চার বছর বসবাস নেই, হবে না?’ অবস্থাটা বোঝাতে চান প্রকাশকাকা, ‘জানই তো সব।’
শুভনীলের বুক জ্বালা করছিল। অ্যাসিডিটি। লিকার চা খাওয়ার অভ্যেস। কাকার ওখানে দুধ-চা খাওয়ার পরপরই অস্বস্তি হচ্ছিল। সঙ্গে অ্যান্টাসিডও নেই।
মুখ তুলে বাড়ি দেখতে দেখতে দালাল লোকটার মন্তব্যটা কানে এসেছিল ওর। এই ‘পোড়োবাড়ি’ একদিন কত স্বপ্ন নিয়ে গড়ে উঠেছিল, কী বুঝবে এই লোকটা! বাড়ির ওরিয়েন্টেশন নিয়ে বাবা খুব চিন্তিত ছিল। মা খনার বচন আউড়েছিল, ‘দক্ষিণ ছেড়ে উত্তর বেড়ে/পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ!’ অর্থাৎ জমির উত্তর সীমানা ঘেঁষে বাড়ি করা ভাল। তাহলে দক্ষিণে নিজের এক্তিয়ারে কিছুটা খোলা জমি থাকবে। পুবে পুকুর ভাল। পশ্চিমের পড়ন্ত রোদ থেকে বাড়ি রক্ষা করতে ঘন বাঁশঝাড় রাখতে হবে। দেখা যায়, কালবৈশাখী ঝড় সাধারণত পশ্চিম দিক থেকেই আসে। অন্য কোনও ঝড়ে ভেঙে পড়লে সেটা পুব দিকের বাড়ির ওপরে পড়ত। বাঁশগাছ ঝড়ে নুয়ে পড়ে। ভাঙে না। মায়ের ব্যাখ্যা শুনে খুশি হয়েছিল বাবা। তখন ফেংশুই ছিল না হাতের কাছে। কিন্তু মা, বাবা, নীলু, দাদা তো সুখী ছিল। সুখের, নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থাকা বাড়ি কেন পোড়োবাড়ি হয়ে গেল! জানে না শুভনীল। শুধু অনুভূত হল সেই বাড়ি আর আজকের পোড়োবাড়ির গন্ধটা একই রকম আছে। সময় যেন থমকে গেছে এখানে। কে বলবে এখন ফোর-জি সেলফোনের ফান্ডা চলছে।
ফোনের কথায় মনে হল পৌঁছানোর সংবাদটা দেওয়া হয়নি মাকে। ট্রেনে ফোনের সুইচ অফ করে রেখেছিল। রিমঝিম নিশ্চয়ই ফোন করেছে ওকে। ইস্! এখন থাক! পরেই কথা বলে নেবে।
মাধবীলতার গন্ধে ভরে আছে বাড়িটা। টানা বারান্দার একধারে শুকনো নারকেল ডাঁই করে রাখা। প্রকাশকাকা লোক দিয়ে নারকেল পাড়িয়ে রেখেছেন। আগে মোহন নামে একটা লম্বা লোক গাছ সাফসুতরো করে ফল পেড়ে দিত। এগুলো কি মোহনই পেড়েছে?
বারান্দায় উঠতে গিয়ে দড়িটায় মাথা ছুঁয়ে গেল। বর্ষাকালে কাপড় শুকানোর জন্য বাবা টাঙিয়েছিল এই দড়িটা। নাইলনের দড়ি। লোকনাথ ভাণ্ডার থেকে কিনেছিল বাবা। দড়িটার একধারে একটা গামছা ঝুলছে। ধুলোপড়া, মাকড়সার জালে জড়াজড়ি হয়ে বিবর্ণ একটা গামছা। কার? আবছা দেখা যাচ্ছে লাল-সবুজ ছাপ! এটা কি লাল-সবুজ সেই গামছাটা, পুরী থেকে এনে দিয়েছিলেন প্রকাশকাকা? ভাত খেয়ে এই গাছটায় মুখ মুছেই দাদা সেদিন বেরিয়ে গিয়েছিল বরাবরের অভ্যেসমতো? চার বছর ধরেই গামছাটা ঝুলছে, শুভনীল এসে দেখবে বলে? জমি-বাড়ির মিউটেশনের সময় ও এদিকে আসেনি। কাগজপত্র কাকা নিয়ে গিয়েছিলেন কলকাতায় সইসাবুদের জন্য! এমন নয় তো, যে-লোকটা বাড়িটা ঝাঁট দিয়েছে, এটা তার গামছা! কিন্তু এভাবে মাকড়সার জাল জড়াবে তাতে? একদিনের মধ্যে!
‘সব তো আপনাদের আগেই দেখা আছে। কাগজপত্র নীলু দেখে নিক আজ, ‘প্রকাশকাকা পার্টির সঙ্গে কথা বলতে বলতে কুয়োপাড়ের দিকে আঙুল তুলে কী দেখাচ্ছেন।
শুভনীল বারান্দা থেকে নামল না। কাকা ডাকলেন, ‘চলো নীলু!’
শুভনীল কাতর গলায় বলল, ‘আমি একটু থাকি কাকা?’
‘থাকো! সাপখোপ থাকতে পারে। সাবধান।’
ওঁরা চলে গেলেও একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকে শুভনীল। তারপর ভূতের মতো ঘুরে বেড়াতে থাকে বাড়ির ভেতরে। পেছনের বাগানে। কাঁঠাল গাছের নিচে সেই একইরকম ভাবে ইট সাজিয়ে রাখা। বাবা-ই রেখেছিল। শীতকালে রোদ পড়ে এখানে। বাবা সরষের তেল মাখত। শুভনীল ইটগুলো ছুঁয়ে থাকল কিছুক্ষণ। ওইখানটায় মা উনুনের ছাই ফেলত। তারপর গ্যাস এল। বাবা মানকচুর গাছ পুঁতেছিল ছাইগাদার ওপর। এসব জায়গায় ঘুরে বেড়ায় দাদা। সারাক্ষণ পাহারা দেয় বাড়ি-জমি।
দুটো দিন কেটে গেল। এ মাসের পঁচিশ তারিখ নাগাদ ফের আসতে হবে। তারপর মোহন্তপাড়ার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ। আর কখনও হয়তো আসা হবে না এখানে। যতদিন কাকা আছেন, ততদিন সেলফোনে জলপাইগুড়ির সঙ্গে সম্পর্ক ঝুলে থাকবে। একদিন কাকার সঙ্গে সেটুকুও চলে যাবে।
কেরোসিনের স্টোভের অভ্যেস এখনও রয়ে গেছে কাকার। স্টোভ জ্বেলে ডালসেদ্ধ আলুসেদ্ধ, ডিমের ঝোল রাঁধছেন তিনি। স্টোভের শোঁ-শোঁ শব্দের সঙ্গে কেরোসিন তেলের গন্ধ, রান্নার ঝাঁজ মিলে ঘরে মিশ্র গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে। আজ কলকাতায় ফিরে যাবে শুভনীল। শেষবারের মতো সে বাড়িটাকে দেখে এল। হাত বুলিয়ে দিল বাড়ির গায়ে। মাধবীলতার ঝাড়ে। মাথায় লেগে আজও দড়িটা দুলে উঠল। গামছাটার গায়ে হাত বুলিয়ে দিল শুভনীল, ‘আসি!’ গামছাটা দুলতে থাকল। একা একা!
মা’র সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল। রিমঝিম জানাল, মা অভ্যেসমতো বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। দাদার জন্য অপেক্ষা চলবে মায়ের। আমৃত্যু।
কুয়োপাড়ে স্নান সেরে নিচ্ছেন প্রকাশকাকা। শুভনীল গিয়ে দাঁড়াল, ‘ভাবছি, আবার কবে আসব, সময়ও পাব কি না, দাদা যেখানে ডুবে গিয়েছিল, জায়গাটা একবার দেখে আসব। এখান থেকে ঘণ্টাখানেক...’
গা বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে, কাকা সেইভাবে তাকিয়ে থাকলেন। বললেন, ‘দাঁড়াও। আমিও যাব।’
সওয়া ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেল ওরা। বাস থেকে নেমে খালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল শুভনীল। চারপাশ নীরব। নির্জন। শুনশান। খালের জল স্থির হয়ে আছে। মাঝে মাঝে জলের ভেতর থেকে বুদবুদ উঠছে। বুড়বুড়ি কাটছে কোনও মাছ। পানার সুপুরির শুকনো খোল জলে পড়ে থেকে ফুলে ঢোল হয়ে আছে। এই খাল থেকেই লোকজন দাদাকে তুলেছিল। জলের গভীরে গিয়ে শুয়ে ছিল দাদা। সারারাত! উঠতে পারেনি। ‘আসব’ বলেও ফিরে আসতে পারেনি বাড়িতে। যেখানে মা, বাবা, নীলু আছে। এই জল ওকে ফিরতে দেয়নি। এখানে, এই নির্জনে একা একা ছিল দাদা!
গাঢ় সবুজ জলের দিকে তাকিয়ে শুভনীলের মনে হল সারারাত এই জলের মধ্যে শুয়ে থেকে দাদা যেন এই জলের সঙ্গে একটা সম্পর্ক পাতিয়েছিল। বেশ কয়েক ঘণ্টা এই জলের আশ্রয়েই তো ছিল মানুষটা। জলটা কি দাদাকে মনে রেখেছে? দাদার গায়ের গন্ধ, শেষ নিশ্বাসটুকু, প্রাণবায়ু এই জলে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। একথা তো সত্যি!
শ্বাস টানল শুভনীল। বুকের ভেতরে রক্তকণা উচ্ছ্বল হয়ে উঠল যেন। ব্যাগ খুলে বোতলে রাখা খাওয়ার জলটুকু ফেলে দিল ও। ডুবডুব শব্দে সবটুকু জল পড়ে থাকল ঘাসের ওপর। খালি বোতলটা খালের জলে ভরে নিল শুভনীল। বোতলভর্তি সবুজ সবুজ শ্যাওলা মেশা ঘোলা জল। বোতলের ঢাকনা কষে আটকাতে আটকাতে কলকাতার ভাড়াবাড়ির বারান্দায় মায়ের অপেক্ষমাণ ছবিটা স্পষ্ট দেখতে পেল শুভনীল। দাদার জন্য আজও বসে আছে মা।
‘কী করো নীলু?’ প্রকাশকাকা অবাক হয়ে শুভনীলের কার্যকলাপ দেখছিলেন।
‘দাদাকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি কাকা। অনেকদিন একা একা ছিল। এবার ও মা’র কাছে যাবে।’
প্রকাশকাকার অবাক চোখের সামনে সাবধানে দাদাকে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল শুভনীল। মা অপেক্ষা করছে। ফিরে যাচ্ছে দাদা। বাড়িতে।
একটা বাস আসছে। হাত তুলল শুভনীল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন