দুষ্মন্তের পত্নীগৃহে যাত্রা

সাগরিকা রায়

চুল উঠে যাচ্ছে বলে কিছুদিন এটা সেটা ব্যবহার করে এখন ক্ষান্ত দিয়েছে দুষ্মন্ত। মাঝে থেকে যেটুকু ছিল তাও যেতে বসেছে। ওর যা পেশা, তাতে চেহারায় চেকনাই থাকা জরুরী। মেস বাড়ির আর পাঁচজনের মতো ওর দশটা পাঁচটার অফিস নয়। সবাই ন’টা সাড়ে ন’টার মধ্যে বেরিয়ে যায়। তারপর ঘাঁটাঘাটি করা খবরের কাগজটা গুছিয়ে নিয়ে বসে দুষ্মন্ত। কাগজের আদ্যোপান্ত পড়ার দিকে নজর নেই ওর। ও কেবলমাত্র মৃত্যুর খবর দেখে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। বিশেষ বিশেষ খবর ডায়েরিতে টুকে রাখে। ইদানিং কি মহিলাদের মৃত্যুর হার বেড়ে গেছে? দুঃখের নিশান উড়িয়ে নীচে লেখা থাকে তোমার হতভাগ্য স্বামী। এই খবরে আগ্রহ নেই দুষ্মন্তর।

আজকের কাগজ খুলে খুঁজে খুঁজে পেয়ে গেল বহু আকাঙ্ক্ষিত সেই মৃত্যু। কান্না থরো থরো শ্রদ্ধাঞ্জলি- নয়ন সমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়াছ যে ঠাঁই। স্বামী হারা রমণীর অসহায় স্বর কাগজের কালো অক্ষরে ফুটে উঠেছে।নীচে কী লেখা আছে সেটাও ভাল করে দেখতে হবে। বাচ্চা-কাচ্চা আছে কি? ছোট ছেলে পুলেতে আপত্তি নেই দুষ্মন্তর। বড় হলেই ঝামেলা। ঝামেলা মানে সেখানে দাঁত ফুটোনো যাবে না। তবে পটানোর ক্ষমতা থাকলে ভয় নেই। যেটা দেদার আছে বলে ওর বিশ্বাস।

আজ সকালেই হকারের থেকে কাগজটা নিয়ে কেবলমাত্র সেকেন্ড পেজ খুলেছে, অমনি সুব্রতদা এসে ‘তোমার অনেক সময় আছে ভাই, পরে দেখে নিও’ বলে কাগজটা নিয়ে সটান নিজের চৌকিতে। সুব্রতর পরে দেবুদা। তনুময় বাবু, শিবশঙ্কর…! সাতজনের মধ্যে ছয়জনের সঙ্গেই বাকতাল্লায় এঁটে উঠতে পারে না দুষ্মন্ত। আর সাত নম্বর তো ও নিজেই। নিজের সঙ্গে যুদ্ধ চলে। ভাল কাজ চাই। নাহলে সত্যি সত্যি এঁটে ওঠা মুশকিল এই দুনিয়ায়। দুপুর বেগুনি বোগেনভেলিয়া ফুল রোদের তাপে ঝলসাতে থাকে। খাঁখাঁ বারান্দায় একা বসে প্ল্যান ভাঁজতে থাকে দুষ্মন্ত।। মাথায় প্ল্যানের পর প্ল্যান আসে। প্ল্যানের চাপে ঝলসাতে থাকে ও। তিনমাস ধরে বেকার পরে আছে। জমানো টাকা ভাঙ্গিয়ে আর কতদিন চলবে? কথায় বলে কুবেরের ধনও বসে খেলে শেষ হয়। ব্যাঙ্কের টাকা দিয়ে আর কত দিন চালাবে? ইমিডিয়েট ব্যবস্থা নিতে না পারলে মেস ছাড়তে হবে। ছেড়ে? ফের সেই মোবাইল রিপেয়ারিং সেন্টারে তিন হাজার টাকার কাজ? ওতে কি পোষায় ঘরভাড়া দিয়ে? অবশ্য ওই কাজটা করতে গিয়েই ঘুঁটিয়ারি শরীফের খবরটা পেয়েছিল। একটা মহিলা এসেছিল। বেশ কালো গোলগাল চেহারায় কেমন এক ধরণের উদাসী ভাব। একটা মোবাইল নিয়ে এসেছিল সঙ্গে করে। চার্জার কাজ করছে না। সেদিন সেন্টারে লোকজন না থাকায় মহিলার সঙ্গে কথা বলেছিল কাজ করতে করতে। তখনই জানতে পারে সদ্য স্বামীহারা হয়েছে মহিলা। ফোনটা তার স্বামীরই। থাকে ঘুঁটিয়ারি শরীফে। গাজিবাবার মাজার থেকে ক কদম হাঁটলেই মহিলার বাড়ি। সংসারে আছে বুড়ি শাশুড়ি। মুশকিল হয়েছে কিছু জমিজমা আছে। ফসলি জমি। তা এখন সেসব দেখে কে? শাশুড়ি বলেছে বিক্রি করে দিতে। সে ভাবনা আছে... ইত্যাদি। তখনই ব্রেনে ইলেকট্রিক বাল্ব জ্বলে উঠল। কেউ নেই যার, তার সহায় হও দুষ্মন্ত। সেই গানটার মত ‘তুম বেবফা হো তো, কিসি কো সাহারা বনো।’ সেন্টারের কাউকে কিছু না জানিয়ে একদিন চলে গেল দুষ্মন্ত ঘুঁটিয়ারি শরীফে মাধবীর বাড়িতে। মাটির দোচালা ঘর। পরিষ্কার, নিকোনো বারান্দায় খেজুর পাতার চাটাই বিছিয়ে বসেছিল এক পঞ্চাশোর্ধ মহিলা। দুষ্মন্ত আন্দাজে বুঝে নিল মহিলা মাধবীর শাশুড়ি। মাধবীর কথা জিজ্ঞেস করাতে মাধবী নিজেই বেরিয়ে এল। ওকে দেখে খুশি হল। অবাকও। সেই শুরু। যাতায়াতের ফাঁকে ফোঁকরে মাধবীর সংসারের খুচুর মুচুর নানান কথা জেনেও নিচ্ছিল ও। জমি আছে বিঘে তিনেক। পাড়া পড়শীদের কৌতূহলী চোখ দুষ্মন্তর দিকে আঙ্গুল তুলেছিল। মাধবীর শাশুড়ি সামাল দিল- ‘আমার কাকাশ্বশুরের ছেলে।’ আমাদের দুর্দশার কথা শুনে এসেছে। ব্যস, পারমিশন পেয়ে গেল দুষ্মন্ত। একদিন বিয়ে করে নিল মাধবীকে। তারপর মাধবীর যা কিছু, সব কিছুই দুষ্মন্তর। এটাই তো নিয়ম। মাস তিনের চেষ্টায় জমি জমা বেচেবুচে দিল এক ব্যাপারির কাছে। ঠকাল না মাধবীকে। রাস্তার ধারে একটা টেবিল পেতে দিল। মাধবী ভারি সুন্দর চপ বানাতে জানে। শাশুড়ি আর মাধবী মিলে চা, চায়ের দোকান দিয়েছে। বেশ আছে ওরা। আর খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি দুষ্মন্ত। কারণ মাধবীর থেকে আর কিছু পাওয়ার ছিল না। তাছাড়া আগের ঠিকানাতে ওকে খুঁজেও পাবেনা মাধবী।

রোদ চড়েছে খুব। বারান্দায় বসে থাকতে পারছিল না দুষ্মন্ত। খবরের কাগজটা নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে ও। মাথায় পোকা ঘুরঘুর করছে। আজকের কাগজে দুটো খবর আছে। দুটো খবরই মারাত্মক ভাল খবর। একটা খবর স্মৃতির উদ্দেশে। অন্যটি হল পেজ ফিফথের। প্রথমটি শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে স্বজনবন্ধুদের আমন্ত্রন জানানো হয়েছে। দ্বিতীয়টি হল দুর্ঘটনার খবর। লঞ্চ থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয়েছে একজনের। বডি এখনও পাওয়া যায়নি। একটু ভেবে নিল দুষ্মন্ত। কাগজের পাতায় চোখ রেখে যেতে হবে। বডি পাওয়া গেল কিনা জানা দরকার। ততদিন বসে না থেকে ঢু মেরে আসা যাক এক নম্বরে। ঠিকানাটা কী...? কাগজ খুলে ভাল করে ঠিকানা দেখে নিল দুষ্মন্ত। অবনখালি, বোঁদের হাটি মেন রোড। গড়িয়া। কথা হল কোন গড়িয়া? বাস গড়িয়া, নিউ গড়িয়া, গড়িয়া স্টেশন, শুধু গড়িয়া...! ভরসা বলতে বোঁদের হাটি নামটা। অটো বা বাস ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে। এমন কিছু ব্যাপার না। আর অবনখালি নামটা তো আছেই।

স্নান সেরে ফিটফাট হয়ে নিল দুষ্মন্ত পাওয়ার বিহীন কালো ফ্রেমের চশমা পরে নিল বের হওয়ার আগে। হাতে কালো চামড়ার ব্যাগে কিছু ইংলিশ সায়েন্স ম্যাগ গুছিয়ে নিল। গ্রাম বাংলার ফেব্রিক করা একটা পাঞ্জাবি নিল। কাগজে শ্রাদ্ধের আমন্ত্রণ জানিয়েছে মানে বাড়িতে শিক্ষিত লোকজন আছে। বেশি কথাবার্তা এক্ষেত্রে বলেনা দুষ্মন্ত। বুদ্ধি ফাঁস হয়ে যাবে। বরং কথা কম বললে লোকে গুরুত্ব বেশি দেয়।

বাস থেকে নেমে যখন মাটিতে দাঁড়াল, তখন বিকেল শেষ হয়ে সন্ধে নেমে গেছে। বাসের ড্রাইভার গড়িয়ায় পৌঁছে দিয়ে হাত ধুয়ে বসে গেছে। জিগেস করলে বলে ‘ওইসব ছোট পব্লেম আমার জন্য নয়।’ ড্রাইভারের গম্ভীর মুখ দেখেও সাহস করে বলেছিল-‘বাস ফিরে যাবে কখন?’

-‘আজকেরে যাবে না, কালকেরে যাবে।’ ড্রাইভারের অটুট গাম্ভীর্যে ভাঁটা পড়েনি। দুষ্মন্ত ব্যাগ গুছিয়ে এগিয়ে গিয়েছে অটোস্ট্যান্ডের দিকে। সেখান থেকে অবনখালি বোঁদের হাটের নাগাল পেয়েছিল ও। জায়গামত পৌঁছে ঠিকানাটা খুঁজে নিয়েছে। একটা মুদিখানা রয়েছে। বাড়ির সামনে সাদা কাপড়ের ছোট প্যান্ডেল। সাইনবোর্ডে মুদিখানার নামটা ঝাপসা হয়ে এসেছে। দুষ্মন্ত ভাল করে নামটা দেখার চেষ্টা করে। জয় মা কালীঘাটের ভান্ডার। এটা দোকানের নাম! নীচে লেখা ‘এইখানে মুদিখানার নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য ন্যায্য মূল্যে পাওয়া যায়।’ মুদিখানার একপাশে এক চিলতে জায়গায় একটি ছেলে বসে কী করছে। সেখানে মোটা করে শক্ত কাগজের উপর আলতা দিয়ে লেখা জয়বাবা পঞ্চানন, টেলিকমউনিকেশন; যেকোনো কোম্পানির মোবাইলের রিচার্জ করা হয়। একেবারে পাশেই মন্দির রয়েছে। বেড়ার ঘর। ঘরের গায়ে লাল রঙ দিয়ে বড় করে লেখা রয়েছে; ওঁ মা রক্ষাকালী। দেখেশুনে দুষ্মন্ত প্রমাদ গুনল। তিন তিনটে ব্যবসা! এদের চরিয়ে খেতে পারবে ও?

-‘আহা হা হা!’

চমকে উঠেছে দুষ্মন্ত। সাদা প্যান্ডেলের পেছন দিকে সরু মত রাস্তা। ঘুটঘুটে অন্ধকার সেই রাস্তা দিয়ে কারা আসছে। তাদেরই কেউ শোকাবহ শব্দ করে উঠেছে। দুষ্মন্ত তাকিয়ে দেখল দুজন মাঝবয়সী লোক আসছে কথা বলতে বলতে। একজন মাথা নাড়ে আফশোষের ভঙ্গিতে- ‘কিই বা বয়স! চলে গেল! এখন ছেলে, বউকে…!’ বোধহয় শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রন রাখতে এসেছিল। দুষ্মন্তর পাশ কাটিয়ে চলে গেল, কিন্তু রেখে গেল মস্ত খবর। এখানে দাও মারার সুযোগ আছে। কিন্তু মুদিখানা বা রিচার্জ সেন্টার কার? ওই ছেলেটা কে?

দুষ্মন্ত এগিয়ে গেল। রিচার্জ সেন্টারের ছেলেটি ওকে দেখে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। দুষ্মন্ত গলা খাঁকারি দিল-‘আমি ঈশ্বর তারকনাথবাবুর বন্ধু। কাঁথিতে থাকি। ছেলেবেলায় একসঙ্গে খেলাধুলো করেছি। খবরটা পেয়ে …। খুবই খারাপ হল। কী হয়েছিল?’

ছেলেটি ধীরে সুস্থে উঠে দাঁড়াল- ‘ঝট করেই…, অ্যকসিডেন্ট। তারপরই…, আপনি আসুন আমার সঙ্গে। কাকিমা ভেতরে আছে।’

অন্ধকার রাস্তাটা দিয়ে যেতে যেতে দুষ্মন্ত হিসেব কষে। কাকিমা মানে এই ছেলের কাকিমা। অর্থাৎ মৃত ব্যক্তি এর কাকা। অর্থাৎ এই ছেলের বাবা, মা আছে। তারা নিশ্চয় এখানেই থাকে। দুষ্মন্তকে কিভাবে গ্রহণ করবে কে জানে। খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে।

সরু অন্ধকার গলি পেরিয়ে ওরা ছোট একটা উঠোনে এসে পড়ল। এখানে আলো জ্বলছে। সাদা কাপড় দিয়ে কোনরকমে জায়গাটা ঘিরে কাজ হয়েছে। মাঝবয়সী মহিলা জিজ্ঞাসু চোখে এগিয়ে এল। এখানে কেউ দুষ্মন্তকে চেনেনা। সুবিধে আপাতত এটাই। ব্যথাতুর গলায় দুষ্মন্ত রিপিট করে- ‘আমি তারক…!’ বলতে বলতে চশমা খুলে চোখ মোছে। এই চোখ মোছার পরই পরিবেশ পালটে গেল। মহিলা এগিয়ে এসে- ‘আপনি বসুন। আর বলবেন না। এই তো বয়স! ছেলে, বউকে কে দেখে।’ দুষ্মন্ত রুমাল পকেটে ঢুকিয়ে তাকাল- ‘আপনি কে হন তারকের?’

-‘কাকিমা। তা, কথা হল, আমরা এখানে থাকি না। থাকি ঝাপটের ঢালে। চেনেন তো? বনপাসের পরে?’

-‘আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ! নাম শুনেছি। যাওয়া হয়নি। আপনারা আছেন কিছুদিন?’

-‘আছি, মানে, কাজ হল আজ। এবারে মৎস্যমুখ সেরে চলে যাব। ওদিকে আমার ধানগুলো…’

কাকিমার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে এই তারকনাথ বড্ড বিপদে ফেলে দিয়েছে এদের । দুষ্মন্ত ছেলেবেলায় শোনা সেই স্কন্ধকাটা ভূতটাকে দেখে। যে খেজুর রস খেতে চলে আসতো গেরস্তের বাড়িতে। নয়তো মাঠে ঘাটে যেখানে পেত খেজুর গাছ। আজ গেরস্তের বাড়িতে রসে ভরা খেজুরের হাঁড়ি ঝুলছে! ভূতটা চেয়ারে বসে তারকের বউকে দেখার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। রসে ভরা হাঁড়ি শুধু নয়। গাছটা না দেখলে চলে? যেন মনের কথা বুঝে কাকিমা কাকে ডাকে- ‘নবু, মাকে আসতে বল, তারকের বন্দু এসেছে।’ দুষ্মন্ত উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ভাবটা, আমি কার? কে আমার? জীবন কী? কিস্যু না! নবুর বয়স দশ। তার মায়ের শুকনো মুখে এখনও শ্যামলিমা। দুষ্মন্ত উঠে দাঁড়িয়ে নবু ও তার মাকে বসতে দিল। বউটি এই অ্যাপ্যায়নের আশা করেনি। জড়োসড়ো হয়ে বসল নবুকে সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে। দুষ্মন্ত ভুল চাল ফেলেনা এসময়। ও নবুর পড়াশোনা নিয়ে তারকের কত চিন্তা ছিল, সেকথা তুলল। তারকের আসলে কি হয়েছিল, সেটা বলার সুযোগ দিল বউকে। এতে নবুর মা সহজ হবে। কায়দা কানুনের পরে অনেকটাই সফল দুষ্মন্ত। কিন্তু এবারে উঠতে হয়। এখন কি ভাঙ্গর যাওয়ার বাস বা… পাওয়া যাবে?

রে রে করে উঠেছে সবাই। পাগল নাকি? তারকের বন্দু, না খেয়ে যাবে? তাছাড়া একদিন বাদ মৎস্যমুখ! তাতে তো থাকতেই হবে। অগত্যা দুষ্মন্ত রয়ে গেল। খুব খাটা খাটনি করল দুটোদিন। দোকান, মন্দির ঝাঁড়পোঁছ করাল লোক দিয়ে। নিজে মাছের কেনাকাটা করতে চেয়েছিল। কিন্তু পাড়ার লোক বলল, এখানে পুকুরের মাছ পাওয়া যাবে। বলা আছে।

কাজকর্ম মিটে গেলে যাওয়ার কথা বলতেই হয়। এবারে বাধা দিল কাকিমা- ‘তুমি থাক দু’দিন। আমরা চলে যাচ্ছি। একে একে সবাই যাবে। নবু একা হয়ে পড়বে! আমি একটু সামলে ফের আসবো।’ দুষ্মন্ত নিমরাজি হয়। এভাবে একমাস কেটে যায়। দু মাস কাটে। দুষ্মন্ত নবুর মাকে ‘নবুর মা’ বলে ডাকে। প্রথম দিন শুনেছিল কার মুখে তারক নামের লোকটা বউকে নবুর মা বলে ডাকতো! দুষ্মন্ত যখন ডাকে, তারকের বউ কেমন চমকে লাল হয়ে যায়! খেয়াল করে দেখেছে দুষ্মন্ত। যেদিন খুব বৃষ্টি হল, ওরা তিনজনে একসাথে খেতে বসেছে। নবুর মা মাছ নেয়নি নিজের পাতে। দুষ্মন্ত নিজের বাটি থেকে মাছ তুলে দিয়েছিল। নবুর মা থতমত খেয়ে- ‘এ কী করলেন?’ বলে ওঠায় দুষ্মন্ত গাঢ় চোখে তাকিয়ে- ‘তারক খুশি হবে, বলেছিল’। নবুর মা সেদিন রাতে কেমন অঝোর বর্ষা হয়ে ভাসিয়ে দিল দুষ্মন্তকে! এটাই চাইছিল দুষ্মন্ত। মেয়েমানুষ এখানেই জব্দ। আসন পাকা করতে এটুকু দরকার ছিলই। দুষ্মন্ত কিছুই করেনি। কেবল আশ্রয় দিয়েছিল নবুর মাকে। আর নবুর মা তারকের সংসার তুলে দিল দুষ্মন্তর হাতে। দুষ্মন্ত থেকে গেল।

এখন সকালে উঠে ব্যবসাপত্তর দেখাশোনা করে দুষ্মন্ত। নবুর মা চা দিয়ে যায় দোকানে। পাড়ার লোকের চোখ পড়েছে। কেউ কেউ এসে-‘তা, আপনার ঘর সংসার নেই? এখানে কতদিন আর…!’ দুষ্মন্ত বোঝে। অনেকেই হাত কামড়াচ্ছে দুষ্মন্তর ভাগ্যোদয়ে। কিন্তু দুষ্মন্ত হল ঘাঘু মাল। ও হাসে-‘সংসার করা হয়নি। কে জানে, ঈশ্বরের এটাই ইচ্ছে ছিল! নবুর পাশে এসে দাঁড়াতে আমাকেই বেছে নিলেন তিনি! তবে, জমিজমা আছে। সেসব ভাবছি নবুর নামে লিখে দেব। আটকে পড়লাম এখানে! ছেলেটাকে একটু খাড়া করে চলে যাব। গানটা শুনেছেন? জীবনপুরের পথিক রে ভাই, কোন দেশে সাকিন নাই? হা হা হা!’ মুখে পেস্টের ফেনা ভরে গেছে। হাসতে গিয়ে মুখ উঁচু করতে হল।

বিকেলের দিকে নবুর মা চুল বেঁধে মুখে ক্রিম মেখেছে। দুষ্মন্ত খেয়াল করে মনে মনে হাসে। কাছে গিয়ে দাঁড়াতে নবুর মায়ের মুখ ফ্যাকাশে দেখাল। দুষ্মন্তর ভ্রূ বেঁকে গেল- ‘কী হয়েছে?’

নবুর মা ফিসফিস করে – ‘সে যদি ফিরে আসে?’

-‘কে?’ দুষ্মন্ত যথার্থ অবাক হয়ে পড়ছিল। কার কথা বলছে নবুর মা?

-‘নবুর বাবা! সেতু ভেঙ্গে পড়ল। দেহ পাওয়া গেছে। ওদিকেই গিয়েছিল সেদিন। জামা প্যান্ট দেখে চেনা গেছে। মুখ থেঁতলে গিয়েছিল। যদি ফিরে আসে? বাবুরাম সেদিন ওরম দেখতে কাকে দেখেছে ইশটিশনে। এসে হাজির হয়ে যায় যদি?’

জবাব দিতে পারেনা দুষ্মন্ত। নবুর মায়ের মনে লোকটা আছে! ভালবাসা নেই। ত্রাস আছে! লোকটার ফিরে আসার পসিবিলিটি কতটা?

-‘বডি পাওয়া গিয়েছিল না?’

-‘হ্যাঁ, মুখ চেনা যাচ্ছিল না!জামা প্যান্ট দেখে…! একই রকম জামা অন্য কেউ পরতে পারে তো!’ নবুর মা নিজেকেই প্রশ্ন করে যেন!

সেদিন থেকে প্রশ্নটা ঘুরে বেড়ায় দুষ্মন্তর মাথায়। যদি… কোনদিন…! ওদের ঘটকপুকুরের চান্দুর বাবা দশ বছর পরে ফিরে এসেছিল। নাকি স্মৃতি হারিয়ে ফেলেছিল। বাজার করতে গিয়ে কোন বাসে উঠে কোথায় চলে গিয়েছিল। এটা ঘটনা! এমন ঘটতে পারেই। কে বলতে পারে যে ঘটবে না? আচ্ছা! সেই খবরটা কোথায় দেখেছিল যেন? কাটিংটা ব্যাগেই থাকার… ইয়েস! এই যে! লোকটা সাপের কামড়ে মরেছে। ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওখানে একটা বাচ্চা মেয়ে আছে বউটির। ব্যাস! ওখানে থানা গেড়ে রাখা যাক। কখন কে কাজে লাগতে পারে, কেউ কি বলতে পারে? নবু অ্যাডাল্ট হওয়া পর্যন্ত কি সময় পাবে দুষ্মন্ত? বি অ্যালার্ট দুষ্মন্ত! সাপের ল্যাজ দেখা গেছে। ফণা আসতেই পারে। যখন তখন!

খবরের কাটিংটা বের করে পড়ে দুষ্মন্ত। হুম! একটি মাত্র বাচ্চা আছে বউটির। বরের সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে মেলা দেখতে যাচ্ছিল। বউ বাচ্চাকে কোলে নিয়ে উঠে গেছে। বরের পা কী করে ফসকে গেল! বউ তাকিয়ে দেখল বরটা তলিয়ে গেল। বডি তখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। এতদিনে কি…? দেখাই যাক। ইঁট পেতে আসতে প্রবলেম কী?

সেদিনই রাতে খেতে বসে কথাটা পাড়ল দুষ্মন্ত। কাঁথিতে আর ভাঙ্গড়ে কিছু জমি আছে। সেসবের অ্যারেঞ্জ করতে হবে। কাল সকালে গিয়ে পারলে কাল, নয়তো পরশু ভোরে চলে আসবে। বলতে গিয়ে নবুর মায়ের দিকে চোখ গেল। সন্দিহান চোখে তাকিয়ে নবুর মা- ‘ফিরে আসবে তো?’

-‘মানে?’ হা হা হাসিতে সব সন্দেহ ডানা মেলে। ভোরের গাড়ি ধরে রওনা দিল দুষ্মন্ত। যেতে হবে হাওড়া। দূর হলেই ভাল। ট্রেনে উঠে বসে নেক্সট কারিক্রম সম্পর্কে প্ল্যান করে দুষ্মন্ত। কাগজের কাটিংটা বের করে ফের দেখে নিল। লোকটা সম্পর্কে কাগজে লিখতে গিয়ে সাংবাদিক ঠিকানা দিয়েছে যেটা, তাতে গ্রামের নামটুকুই আছে। দুষ্মন্ত খুঁজে বের করবে। ধর্মতলার নাম মনে আছে। ওখান থেকে খানিকটা গিয়ে সুজনখালি।

টিনের চালওলা বাড়ি। বাসকপাতার বেড়া দিয়ে ঘেরা। ভারি নির্জন। গুছোনো সংসার বলেই মনে হচ্ছে! দুষ্মন্ত ভয় পায়। লোকটা ফিরে এসেছে কি? সাবধানে পা ফেলতে হবে। লোকটার নাম নদীরাম হালদার। এক সময়ে ঘটকপুকুরে ছিল। এই খবর জানে দুষ্মন্ত কাগজ মারফত। বউটার ছবি দেখে মনে হয় জীবন সম্পর্কে এখনও কোনও এক্সপিরিয়েন্স নেই। চপএর দোকানে আলিবালি কথার ফাঁকে জেনে নিল লঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়া নদীরামের কথা কেউ জানেনা। মানে, লোকটা এখনও ফেরেনি। মৃতের মর্ত্যে প্রত্যাবর্তন হয়নি! আর একটি পত্নী গৃহের ব্যবস্থা হল! আপাতত দুটোই চলুক। এদের জমিজমা কি আছে?

বাড়ির ভেতরে ঢোকেনি দুষ্মন্ত। বাইরে থেকে ডাক দিয়েছিল- ‘কেউ আছেন?’ একজন বেরিয়ে এসেছে। সাদাসিদে লোক। চোখে অবাক চাউনি।

দুষ্মন্ত শোকাবহ মুখে জানিয়েছে ও স্বর্গত নদীরাম হালদারের ছেলেবেলার বন্ধু। এই সেদিনও কথা হয়েছে। খবর পেয়েছে দেরিতে। খুবই দুঃখের কথা…ইত্যাদি। একে একে লোক জড়ো হচ্ছে লোকটার ডাকাডাকিতে। লোকটা জনে জনে বলে বেড়াচ্ছে –‘একটা ঠগ এসেচে গো। এই লোকটা কোনওকালে বন্ধু ছেলনি আমার!’ পাড়ার লোকের প্রশ্নের ঠেলায় দুষ্মন্ত প্রমাদ গোনে। জানা যাচ্ছে লোকটাকে জলপুলিশ বাঁচিয়েছিল। কী কান্ড! এভাবেই কি ফিরে আসতে হয়? ওরা ঘিরে ধরেছে দুষ্মন্তকে।

দুপুরের চড়া রোদে রাস্তার কলে শরীর থেকে মারের দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করে দুষ্মন্ত। মাথা ফেটে রক্ত শুকিয়ে গেছে। কলের নীচে মাথা পেতে দিয়ে রক্ত ধুতে থাকে ও। পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মাথা মুছে ফেলতে ফেলতে প্ল্যান কষে। কয়েকটা খবরের কাগজ কিনতে হবে। কখন দরকার পড়ে আবার! হাতে সম্বল রাখা চাই। বোঁদের হাটিরও কি ভরসা আছে? নবুর মা নিজেই যে সেতু খুঁজে পাচ্ছেনা সম্পর্কের! দুষ্মন্ত সেখানে কী করে আর…!

ফের বিজ্ঞাপনগুলো দেখতে হবে !

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%