সাগরিকা রায়
দাদু মরে যাওয়ার পরে আমরা ত্রিবেণীমাসির বাড়িতে এসে উঠলাম। মাসি বলেছিল, -আমি যতক্ষণ আছি, ভাবিস না তোদের কেউ নেই। বাবা নেই, তাতে কী আছে? আমার হাসিমারার বাড়িতে কত জায়গা এমনিই পড়ে আছে। লোক নেই। সাতটা ঘর। আমার হাজব্যান্ডের যেমন কান্ড! অতগুলো ঘরের কী দরকার ছিল বল? আমি সেকথা বললে বলতো- ছেলে-মেয়ে হবে। তারা যার যার ঘরে থাকবে। পড়বে, গান শুনবে, ইচ্ছেমতো রেস্ট নেবে। লোকটার কপাল দেখ, একটিও ছেলেপিলে হলনা। শরীরে দোষ আছে যে!
মা মুখ নীচু করে আস্তে আস্তে কথা বলে- কিন্তু, তোর ঘাড়ে কেনই বা আমরা..! অবশ্য ভাড়া যদি নিস, তাহলে আর অসুবিধে হবে না। তোর জামাইবাবুর একটা সম্মান আছে। শ্বশুরবাড়িতে থাকতেই লজ্জিত ছিল। এখন শালীর বাড়িতে বৌ মেয়ে আশ্রয় নিলে লজ্জা পাবে, এ আর বেশি কী? মরে গেছে অকালে, নাহলে এতদিনে মাথার ওপরে ছাদ বানিয়ে দিয়ে যেত ঠিক। মেয়েকে কম ভালবাসতো? জলপরী বলে ডাকতো।
-ভাড়া দিবি? টাকা পাবি কোথায়? ইনকাম বলতে প্রাইমারি স্কুলে মিডডে মিলের খিচুড়ি রান্নার কাজ! এই জন্যই বাবা বারণ করেছিল যাকে তাকে বিয়ে করতে! শুনলি না! প্রেম এমন চাগিয়ে উঠল যে, বিয়ের আগেই পেট বাঁধিয়ে বসলি..! এই মেয়ের কারণেই বাবা তোদের ফেলতে পারেনি। মেয়ের বাপ মারাও গেল অকালে। বাবা তোর নামে কিছু টাকা রেখে গেছে। তা, সে টাকা তুই খরচ করিস না। ওর ভবিষ্যতের জন্য ফিক্সড করে দে। এখন আর কোথায় বা যাবি? ভাইরা চায় না যে তোরা ওখানে আড্ডা গাড়িস। ছোটখোকা বলেছে-যা দেওয়ার, বাবা তোদের দিয়ে গেছে। বাড়ির ভাগ চাইলে দেবেনা ওরা। লড়বি কাকে নিয়ে? তার’চে,যা বলছি, শোন। আমার কাছে কটাদিন থাক। তোর মধুদা-ও বলছিল। বেচারিরা যাবে কোথায়?
আমার মা কাঁদল। আসলে আমাদের তো নিজেদের বাড়ি নেই। দাদুর কাছে থাকতাম। এখন দাদু স্বর্গে গেলে মামারা আমাদের বাড়িতে থাকতে দিতে রাজি নয়। এরকম হয়। আমার স্কুলের বন্ধু পিয়াল মামাবাড়িতে থাকে। সেখানে ওকে খুব কষ্ট করে থাকতে হয়। মামা-মাসি ওকে ভালবাসে। কিন্তু তাদের বাড়িতে প্রচুর কাজ। সংসারের কাজে হাত লাগাতে হয় বলে পিয়ালের পড়াশোনা হয়না। তিথিদিদিমণির ইতিহাস ক্লাসে পিয়াল রোজ কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকে। পলক দিদিমণির ক্লাসেও। শুধু শুভ্রা দিদিমণির বাংলা ক্লাসে পড়া পারে। আমি জানি, বাবা না থাকলে খুব কষ্ট। বাবা থাকলেও ভাল ইনকাম না করলে খুব কষ্ট।
মা রাজি হচ্ছিল না। দূরে গেলে স্কুলের মিডডে মিলের কাজটা যাবে। তাহলে আমাদের চলবে কী করে?
মধুমেসো মাকে রাজি করালো- চল, কোথায় যাবে আর এই মেয়ে নিয়ে? আমার কাছে সন্তানতুল্য থাকবে। ওদিকে ভাল স্কুল আছে। ভর্তি করে দেব। পরে যদি মনে কর, তাহলে নিজের মনমতো ভাড়া চলে যেও। আর, ওখানে একটা কাজ জুটে যাবে ঠিক।
আমরা ট্রেনে চেপে মেসোর বাড়িতে যখন এলাম, সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। ভারি ঝিমঝিমে ঘুটঘুটে চারধার। বাস রাস্তা থেকে প্রথমে রিকশায়, পরে মাঠের ধার থেকে হেঁটে হেঁটে মাসির বাড়ি। মাসি মেসো দুজনেই ছিল সঙ্গে। সারা রাস্তা খুব কথা বলছিল মেসো। মাসি অল্প অল্প। মা চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল। আর আমার পায়ে বড্ড ব্যথা করছিল। ভাবলাম, আজ মাসির বাড়িতে গিয়েই ঘুমিয়ে পড়তে হবে। কাল থেকেই কি স্কুল? আচ্ছা, স্কুলটা কোথায়? আমি কি একা যেতে পারব স্কুলে? নতুন জায়গায় একা একা বড্ড ভয় করে আমার। এই জায়গাটা বড্ড চুপচাপ। আমার দাদুর বাড়ির সামনেই বাজার ছিল বলে সারাদিন হইচই লেগেই থাকতো। বাসরাস্তা কাছেই ছিল। সারাক্ষণ মাইকে অ্যনাউন্স করতো একটা লোক- এত নম্বর গাড়ি সকাল ছটা পাঁচে বাগবাজার যাচ্ছে। মা, তখন উঠে চা বানিয়ে দাদুকে দিচ্ছে। আমি স্কুলে যাব বলে রেডি হয়েছি। রুটি আর বেশি দুধ দেওয়া চা খেয়ে প্ল্যাস্টিকের ক্যারিব্যাগে বইখাতা ঢুকিয়ে কৌটোয় আতা নিয়েছি। টিফিন খেতে ভারি ভাল লাগে। সব বন্ধুরা টিফিন নিয়ে আসে। এখানে স্কুলটা কেমন হবে কে জানে! দিদিমণিরা রাগী হলে আমার খুব ভয় করবে ভাই। আমি ভ্রু তুলে তাকানো ভালবাসি না। কেমন যেন ভয়ঙ্কর মনে হয় মানুষটাকে। যেমন মনে হয় ছোটমামাকে! আমাকে দেখলেই ভ্রু তুলে তাকিয়ে কী যে ভাবে! বিরক্তি নিয়ে তাকানোটা আমার কাছে খুব পরিষ্কার হয়ে গেছে। এর মানে হল,আমাকে সে পছন্দ করছে না!
-আর কতদূর রে দিদি? মা অনেকক্ষণ পরে কথা বলল।
-ধর চলেই এসেছি। সামনে ধূধূ মাঠ পড়বে। তারপরেই...! মধুমেসোকে অন্ধকারে ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। হাতের ব্যাগটা অল্প অল্প দেখতে পাচ্ছিলাম। দাদু মারা যাওয়ার পরে মাসিকে নিয়ে মেসো গিয়েছিল। শ্রাদ্ধের কাজ হয়ে যেতে আমাদের নিয়ে চলে এসেছে। আমি ভেবেছিলাম আমাকে ছেড়ে থাকতে অণুমামার কষ্ট হবে। সন্ধেবেলায় অফিস থেকে ফেরে অণুমামা। তখন মামার পা টিপে দিতে হয়। আমি তো চলে এলাম। এখন কে দেবে? কিন্তু যখন মামাকে বলতে গিয়েছি, মামা হাসি চেপে চেপে ল্যাপটপে কার সঙ্গে চ্যাট করছিল। আমাকে দেখতেই পায়নি যেন। যখন বললাম- মামা, যাচ্ছি।
অণুমামা ডান হাতের আঙুল দিয়ে স্ক্রল করছিল। সেভাবেই না তাকিয়ে বলল- আচ্ছা।
আমি বেরিয়ে আসতে আসতে দেখলাম কাঁঠাল গাছের তলায় ঘন ছায়া জমেছে, সেখানে কয়েকটা কাক কিছু খাচ্ছিল ঠুকরে ঠুকরে। বিল্লু বেড়ালটা বারান্দার চেয়ারে ঘুমুচ্ছে। আমার মনে হল, কবে আর আসব জানিনা। কবে আবার এই কাঁঠাল গাছ, বিল্লুকে দেখব! কেউ বলল না- টুকি, আবার আসিস।
অণুমামা কাউকে বলছিল- ডিস্টার্ব করতে এসেছিল! নোটিফিকেশন চেক করার সময় অন্যদিকে মন থাকে না আমার।
কাকে বলছিল জানিনা। কার কথা বলছিল, সেটা একটু বুঝতে পারছিলাম। মেসো বলল- তোমরা রেডি হয়ে নাও। জেনারেলে যাব। জায়গা পাব না লাইনের পেছনে দাঁড়ালে। রাতে বসেই একটু ঘুম চাই।
আমরা জেনারেল কম্পার্টমেন্টে এসেছি! দুপুর দুপুর শ্যালদায় পৌঁছে ঠিক সময়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম বলে আমরা চারজন বসতে পেরেছি। কিন্তু এখন বড্ড ঘুম পাচ্ছে।
-এই আমরা মাঠে ঢুকে পড়লাম। এখানে দাঁড়াবে না। জায়গাটার বদনাম আছে। পা চালাও। মধু মেসোর গলায় ভয় ভয় ছাপ- নানান জন নানা কথা বলে! অপঘাতে মরে সব এই মাঠে ডাংগুলি খেলতে আসে! ভাল লাগে না এত ভয় নিয়ে বাস করতে!
বাবা রে! আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে গেল। কী ভয়ঙ্কর কথাই না বলল মেসো। মা খুব ভয় পেয়েছে। আমার মায়ের বড্ড ভূতের ভয়। এখন মেসো অব্দি পা চালাচ্ছে দেখে আমরা বাকি তিনজন ছুটতে শুরু করেছি। একেই আমার পায়ে ব্যথা, তার ওপরে ছুটতে গিয়ে ব্যথা বেড়ে গেল। কিন্তু উপায় নেই। এই জায়গাটার বদনাম আছে। সাবধান থাকতেই হবে।
একটা রাস্তার ওপর এসে উঠে হাঁফ ছাড়ল মেসো-ব্যাস, এখন রয়ে সয়ে চল। রাত হয়েছে বলে এমন কষ্ট হল। নইলে রিকশ পাওয়া যেত।
এরপরে আরও খানিক হেঁটে মেসোর বাড়িতে এসে উঠলাম। একতলা বাড়িটা বেশ বড়। বাড়ির চারপাশে গাছপালা। অন্ধকার বাড়ি। মেসো পকেট থেকে চাবি খুঁজে নিয়ে তালায় ঢোকাতে যাচ্ছিল, ত্রিবেণী মাসি মোবাইল ফোনের টর্চ অন করতে টুক করে তালা খুলে গেল। একটা নয়, গোটা চারেক তালা! খুলতে তো সময় লাগবেই!
মাসির বাড়ির অন্ধকার ঘরগুলো থেকে কারা যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছিল আমাকে। মাসি অল্প ধমক দিল- এত ভিতু হলে হবে? তোকে এখানেই থাকতে হবে জেনে রাখ। কাল সকালে ঘুরে ফিরে দেখিস। পেছনে পুকুর আছে। বাঁশবন আছে। রাজ্যের নারকেল, সুপুড়ি…! তবে বলে রাখি, উঠোনের উত্তরদিকে কিন্তু বেলগাছ! এঁটোকাঁটা ফেলনা। ওখানে বেম্মদত্ত্যি আছে। মাসি ঠোঁট টিপে হাসতেই মাসির গজ দন্তের মধ্যে ছিটকে গিয়ে পড়ল হ্যারিকেনের আলো। দাঁতটা চোখ টিপল আমাকে!
রাতের বেলায় বাইরে জঙ্গুলে হাওয়া হচ্ছিল। কতবড়ো বাড়ি এটা আমি বুঝতে পারছিনে। আমি মায়ের সঙ্গে একটি ছোট ঘরে ঘুমিয়েছি। এই ঘরে দুটো জানালা। দুটোই বন্ধ। এখানে তো ইলেকট্রিসিটি নেই। তাই হ্যারিকেন দিয়েছে ত্রিবেণী মাসি। সেটার আলোও নিভু নিভু। মা মনে হয় ঘুমোয়নি। চিন্তা করছে। “কী হবে আর চিন্তা করে! যা হওয়ার তাই হবে।” বলেছে মাসি। কোথায় খুসখাস শব্দ হল। আমার ভয় করছিল। আমি সেই ভয়ঙ্কর মাঠের কথা ভাবছিলাম। আর বেলগাছের কথা। বেলগাছে নাকি বেম্মদত্যি আছে। বেম্মদত্ত্যি কেমন দেখতে জানি। কিন্তু, আমার বড্ড ভয় করছে।
কখন ঘুমিয়ে পড়ে ফের ভোর হতে জেগে গেছি। কোথায় একটা অচেনা পাখি ডাকছিল। আমি দেখলাম মা ঘুমিয়ে কাদা। আস্তে নেমে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। মধু মেসো বাড়ির পেছনের দিকের দরজাটা খুলে দু ধাপ সিঁড়ি ভেঙে কোথায় যাচ্ছে। আমি কথা না বলে সেদিকেই গেলাম। পেছনে খুব জঙ্গল! বাঁশবন! একটা পুকুরও দেখতে পাচ্ছি। আমাদের মলিনা জেঠির বাড়িতে পুকুর দেখেছি চম্পাহাঁটিতে। সেই রকম নয়, এই পুকুরের বড্ড ঠান্ডা ঠান্ডা স্বভাব। একটু লুকনো স্বভাব। আমার মত। আমার নাকি ঘরকুনো লুকনো স্বভাব।
মধু মেসো একা একা পুকুর পেরিয়ে ঝোপের ভেতরে ঢুকে গেল। ওই ঝোপে কি সাপ আছে? কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশনের অপোজিটের বাড়ির সাইড দিয়ে গেলে শর্টকাট হয়। কিন্তু সেখানে বড্ড জঙ্গল। সেই জঙ্গলে দুটো দাঁড়াশ সাপ আছে। মাঝে মাঝে ওদের দেখা যায়। ওই জন্যই সেই রাস্তার নাম দাঁড়াশ লেন। ওখানে পুকুরও আছে। এই পুকুরে কি সাপ নেই? মেসো ঝোপের ভেতরে কী করতে গেল?
আমি পুকুরের কাছে এসেছি। পুকুরে ঘন দাম। কোথাও বা দামের ওপরে শোলাগাছ জন্মেছে। পুকুরের উল্টোদিকে একটা বুড়ো বটগাছ। বটের ডাল এসে পড়েছে পুকুরের ওপরে। মাঝে মাঝে শিনশিনে বাতাস বইছিল। ঘন বাঁশবনে ছাতারে পাখিরা হল্লাচিল্লা করছে। জল মাকড়সা জলের ওপর দিয়ে ম্যাজিক দেখাতে দেখাতে হেঁটে যাচ্ছে। তখনই একটা জলপিপি পাখি ডেকে উঠল। আর মধুমেসো ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। আমাকে দেখে হাসল মধুমেসো- উঠে পড়েছ? বেশ। দেখ, এদিকে বেশি দূরে যেওনা। ঝোপেঝাড়ে সাপ খোপ থাকতে পারে। আজ কলা পেকেছে কিনা দেখতে গিয়েছিলাম। পাকেনি। দুদিন সময় চাই। চলে এস। চা বানাই।
আমরা চা বানালাম। মা আর মাসিকে ডেকে চা খাওয়ালাম। আজ আমার ভারি আনন্দ। মেসো আমাকে একটা বেলার মধ্যেই নতুন করে দিল। জায়গাটা বেশ।
সারাদিন গেল। ত্রিবেণীমাসি ঝোপঝাড় ঘেঁটে কুমড়ো, পুঁইডাটা, সেঁচি শাক তুলে আনল। নাকি জাবড়া তরকারি হবে সর্ষেবাটা দিয়ে। আর মেসো নিয়ে এল পুকুরের ছোট ছোট পুঁটি, চুনোমাছ। বাটি চচ্চড়ি হবে।
দুপুরে মা তেল মেখে পুকুরে চান করছিল। আর আমি তখনই দেখে ফেললাম বেম্মদত্ত্যিটাকে। ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে মায়ের চান করা দেখছিল! চোখদুটো কেমন ভ্যালভেলে!
ভাত খেতে গিয়ে ভাল লাগছিল না। সব বিস্বাদ হয়ে যাচ্ছে। মা তেল মাখা ভিজে চুল পিঠে ছড়িয়ে দিয়ে কমলা পাড়ের হলুদ শাড়ি পরে গরম ভাতে হাত ডুবিয়ে ভাপ নিচ্ছিল। আরামে মায়ের মুখে আলো ছড়াচ্ছিল। অনেকদিন পরে মায়ের ঠান্ডা ঠান্ডা হাত গরম ভাপ পাচ্ছিল। আমার মনে হল, সেই কথাটা মাকে বলে দিই। মা জেনে রাখুক। নয়তো আমি যখন ইস্কুলে যাব, তখন মাকে বেম্মদত্ত্যিটা দেখবে, মা জানতেও পারবে না। যদি তখন দত্ত্যিটা মাকে ধরে? ধরে বেলগাছে নিয়ে ওঠে যদি? খুব ভাল হত, আমরা যদি এই জায়গা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে পারতাম! অণুমামার কাছেই নাহয়…! বকুক, কিন্তু সেখানে বেম্মদত্ত্যি নেই। কেউ লুকিয়ে মায়ের চান করা দেখেনা।
-এখানে এসে বড় ভাল লাগছে রে দিদি। অনেকদিন পরে মনে হচ্ছে একটু শান্তি পাচ্ছি। মাথার ওপরে খবরদারী করার কেউ নেই। সেই ছোটবেলার মত লাগছে। ধুলোর খিচুড়ি, কাঁঠাল পাতার লুচি…মনে আছে দিদি?
দুবোনের মনের কথা শেষ আর হয়না! এখানে দুপুরটা ভারি মিঠে। কেমন সুনসান! রূপকথার মানুষেরা দুপুরে এখানে পুকুরের ধারে ঘুরতে আসে। এখান থেকে চলে যেতে হবে। মায়া বাড়িয়ে কাজ কী?
ত্রিবেণীমাসি ভাত মেখে মুখে দিতে দিতে সুন্দর হাসতেই আমার এখান থেকে চলে যাওয়ার ইচ্ছেটা চলে গেল। মামাবাড়িতে এভাবে কেউ হাসেনা আমার দিকে তাকিয়ে। মায়ের দিকে তাকিয়েও। আমাদের বোধহয় এখান থেকে যাওয়া হবেনা। বরং বেলগাছে এঁটোকাটা না ফেললেই হল। বেম্মদত্ত্যিটা আমাদের ওপর রাগ না করলেই হল! তাহলেই মা নিরাপদ।
-আমি আস্তে আস্তে একটুকরো জমি কিনে ঘর তুলব। মেয়েটার জন্য মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে হবে।
- সে করিস। তোর জামাইবাবুকে বলে রাখ। সস্তায় জমি পেলে ব্যবস্থা করবে। এই বাড়িটা আমরা খুব সস্তায় পেয়েছিলাম। অনেকদিন আগের কথা। আমাদের ঘরবাড়ি ছিলই না। জানিস তো সব। এই বাড়িটাকে লোকে হানাবাড়ি বলতো। ও কাগজপত্র বানিয়ে বাড়ির মালিকানা নিয়ে নিল।
-তাহলে? হানাবাড়ির ব্যাপারটা?
-ধুস! তবে বেলগাছে নাকি কিছু আছে। ও বলছিল। সত্যি মিথ্যে জানিনা। আমি কিছু দেখিনি। ত্রিবেণীমাসির মুখে ভাতের দলা ঢুকতে কথা বন্ধ হয়ে গেল। সরস সর্ষের ঝাঁঝে চোখ মুখ চনমনে মাসির। মা লঙ্কা ডলে ভাতে মিশিয়ে নিচ্ছিল। মধু মেসো এসে দাঁড়িয়ে খাওয়া দেখছিল। আর মেসো আসতেই আমার পেটের মধ্যে গুর গুর শব্দ হতে থাকল! হুট করে পেট ভরে গেল আমার! উঠে পড়লাম। মেসো আমার দিকে তাকিয়ে দুঃখিত স্বরে বলল-ঝাল দিয়ে ওর খাওয়াটা নষ্ট করলে? কাল থেকে ওর জন্য পাতলা ঝোল কর।
আমি পুকুরের ধারে গিয়ে হাত ধুয়ে ঘাটের ধাপে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এই বাড়িটা আসলেই মেসোর নয়! এটা নাকি হানাবাড়ি ছিল! কিন্তু মেসো এটা নিয়ে নিয়েছে! এখন আর হানাবাড়ি নয়? কিন্তু বেম্মদত্ত্যি আছে! হ্যাঁ,আমি জানি! আমি দেখেছি। কিন্তু কেউ বিশ্বাস করবে না বলে বলতে পারছি না! মা বিশ্বাস করবে? করাতে হবে। মাকে দেখাতে হবে এই বাড়িতে সত্ত্যি বেম্মদত্ত্যি আছে! মা জানলে সাবধানে থাকবে।
পরেরদিন ঘুম ভেঙে দেখলুম মা জানালায় দাঁড়িয়ে কী দেখছে। আমি মায়ের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে মা ভীষণ রকম চমকে উঠেছে- চুপ চুপ! ওই দেখ, দেওয়ালের ওপরে...!
আমি গোড়ালি উঁচু করে দেখতে চেষ্টা করলুম। দেখি, সামনের বাগানের ওয়ালের ওপর দিয়ে একটি বিশাল লকলকে সাপ ইলিবিলি কেটে চলে যাচ্ছে। যেতে যেতে মাথা উঁচু করে জানালার দিকে তাকিয়ে মাকে দেখল। মা ওকে দেখছিল। স্থির চোখ মায়ের। চোখের পাতা পড়ছিল না। দুজনেই দুজনকে দেখছিল। সাপটা মাকে দেখল কয়েক মুহূর্ত, তারপর ইলিবিলি কেটে টগর ফুল গাছের ওপরে উঠে পড়ল। প্রতিটি ডালে শরীর পেঁচিয়ে জড়িয়ে সিল্কের কাপড়ের মত সুলুক করে গলে গেল কোথায়। সাপটা সরে যেতেই মা জোরে শ্বাস টানল। আমি ভয় পেয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। বাগানের দিক থেকে বুনো গন্ধ আসছিল। কোন বুনো ফুল ফুটেছে ঝোপেঝাড়ে। মা গিয়ে বিছানার ওপরে বসে পড়ল। মার চুল খুলে পড়েছে পিঠের ওপর। শুকনো মুখে চোখের নীচের কালি নিয়ে মা গভীর চিন্তায় পড়ে আছে। আমি কী করব বুঝতে পারছিনে। মাকে কেমন অন্যরকম লাগছে দেখতে। এই মা যেন সেই কালকের চেনা মা নয়। অন্য কেউ। যাকে আমি চিনিনা। আমার দিকে তাকিয়েও মা আমাকে দেখছিল না। অন্য কিছু দেখছিল! আমার খুব ভয় করছিল। মাকে কি ব্রহ্মদত্ত্যি ধরেছে? কেমন হাঁসফাঁস করছে মা! আঁচল দিয়ে গায়ে ঘাম মুছল বার বার। একটু জল এনে দিলে হয়তো ভাল লাগবে ভেবে আমি উঠোন পেরিয়ে মাসির সাজানো কিচেনে গেলাম। আভেনে কিছু ফুটছে। গব গব শব্দ হচ্ছে। ত্রিবেণীমাসি মুখ নীচু করে ময়দা মাখছিল। আজ বুঝি লুচি হবে! মধুমেসো লুচি খেতে ভালবাসে। আমি জল নিচ্ছি, মাসি তাকাল। মাসিকে দেখে মনে হল মাসি কী একটা ভাবছে। চোখদুটো ভুলভুল করছে! এই বাড়িতে কি সবারই মন খারাপ হচ্ছে? সবাই কেমন কেমন করছে! মধু মেসো কোথায়? নিশ্চয় পুকুরপাড়ে গিয়ে ছাঁকনি জাল দিয়ে চুনো মাছ ধরছে। মেসো চুনো মাছ তেল সর্ষে গরগরে লঙ্কা ঠেসে খেতে ভালবাসে। আমি কি যাব সেখানে? না, থাক বাবা! আমার ভয় ভয় করে আজকাল সবেতেই।
জল নিয়ে মায়ের কাছে আসছি, মা উঠে চুল আঁচড়াচ্ছে দেখলাম। জল দেখে মা একটু অবাক হল। আমি জলটা মায়ের হাতে দিয়ে একটু শ্বাস ফেললাম- খাও মা। তোমার ভারি গরম হচ্ছিল কিনা!
মা গেলাস হাতে নিয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। জানালার বাইরে কেন তাকিয়ে আছে মা? সাপটা কি আবার এসেছে? সাপের কথা মনে হলেই আমি তাড়াতাড়ি করে হাওয়াই চটিটা পরে নিই। ভয় করে সাপকে।
মধুমেসো বাইরে থেকে এল। হাতে ব্যাগ। গোঁফওলা হাসিমুখ-আজ আড়ট্যাংরা পেলুম, বুঝলে। কাটিয়ে এনেছি। বেশ করে রাঁধ পেঁয়াজ আদা দিয়ে।
ত্রিবেণী মাসি মেসোর হাত থেকে ব্যাগ নিয়ে ফের কিচেনে ঢুকে গেল। আমি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখলুম, কত কত প্রজাপতি উড়ছে! জলের ওপর দিয়ে জল মাকড়সা হেঁটে যাচ্ছে সেদিনের মত। একটা বাঁশগাছ একেবারে জলের ওপরে ঝুঁকে পড়েছে। জল ছুঁই ছুঁই…জল ছুঁই ছুঁই…খেলা ! আকাশে অল্প অল্প মেঘ। আজ কি বৃষ্টি হবে?
দুপুরে খেতে বসে মায়ের গলায় কী আটকে গেল! মা কাশতে কাশতে অজ্ঞান প্রায়! মেসো কী কায়দায় মায়ের গলায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে বমি করালো মাকে। অমনি কী একটা বেরিয়ে এল। মাসি আঁতকে উঠল- একি গো? এ যে বড়শি! মাগো! ছুটকি বেঁচেছে এই না কত! মাছের গলায় আটকেছিল! দেখ কান্ড, মাছ ধুয়ে আনলি যখন, একবার ভাল করে দেখলি না?
মায়ের আর খাওয়া হলনা সেদিন দুপুরে। মেসো ধরে নিয়ে শুইয়ে দিল মাকে। বড় খাটে শুয়ে মা চোখ বুজে থাকে। আমি ঘুরঘুর করি। খানিক পরে মা একটু গরম চা খেল।
যাক, আমার মায়ের সুস্থ মুখ দেখে এত্ত ভাল লাগল যে বলার না। মামাবাড়িতে মাকে এত সুস্থ দেখিনি। সেখানে বড্ড মনমরা থাকতো মা। খুশিতে আমি আগানে বাগানে ঘুরে ঘুরে বন ফুল তুললাম। হলদে, গোলাপি, লাল, কমলা…কত ফুল। নামই জানিনা। কচুপাতার ঠোঙ্গা বানিয়ে ফুলগুলো রাখলাম। তখনই দেখলাম, লকলকে সাপটা হিলিবিলি কেটে চলে যাচ্ছে বেলগাছের দিকে! আমার শরীর থমথম করছিল। সাপই কি ব্রহ্মদত্ত্যি নাকি রে ভাই! ভয়ে আমার পা সরছিল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলুম, সাপটা চলে যাচ্ছে! বেলগাছটাকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে উঠে পড়ছে সিলিক সিলিক করে!
ঘরে এসে নিজের চৌকির বিছানায় শুয়ে পড়লুম। আমার ভারি ভয় করছিল। সাপ দেখে এত ভয় কেন করে আমার!
অনেক রাতে ঘুমটা ভেঙে গেল। আমি দেখলুম, আমাদের ঘরের বন্ধ দরজাটা খুলে গেল। মা কোথায় যাচ্ছে অন্ধকারে? যদি পা ফসকে পড়ে যায় মা! আমি উঠে উঁচু চৌকি থেকে নামতে নামতে মা বেরিয়ে গেছে! বারান্দায় বেরিয়ে মাকে দেখতে পেলুম না। তাহলে এই অন্ধকারে মা কোথায় গেল? আমি বারান্দা দিয়ে ছুটছি। কোথায় গেল মা?
এত ঘর এখানে! একটা ঘরের ভেতরে কারা ফিসফিস…! আমি মাকে খুঁজতে গিয়ে দরজার ফাঁকে দেখলুম ঘোর অন্ধকারে কারা দুজন…! একজন মা, অন্যজন সেই ব্রহ্মদত্ত্যিটা! ওদের জড়িয়ে রেখেছে পুকুরপাড়ের সেই লকলকে সাপটা! আর আমার মা হাসছিল! ব্রহ্মদত্ত্যিটা হাসছিল আদুরে গলায়।
আমি ভেতরে ঢুকতে যেতেই সাপটা ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি অন্ধকার বারান্দা দিয়ে ছুটে নিজের বালিশের কাছে আসছিলাম। ও ছাড়া আর কোথায় যাব আমি! আমার কেউ নেই, শুধু মা ছিল। তাকেও নিয়ে গেল ব্রহ্মদত্ত্যিটা!
আমার যে আর কেউ নেই! পুকুরপাড়ের লাল নীল প্রজাপতি, ফুলের দল সব কালো হয়ে গেল কী করে …!
ব্যাঙের আর্তনাদ কানে আসতেই আমি কেঁপে উঠলাম। সাপে ব্যাঙ ধরেছে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন