আদিনাথের নীলপাখি

সাগরিকা রায়

আজ সকালে পাখিটাকে দেখতে পেলেন না আদিনাথ। প্রত্যেকদিন পাখিটাকে না দেখতে পেলে তীব্র মন খারাপ হয় আদিনাথের। আর মন খারাপ থেকে দুঃসহ যন্ত্রনায় ডুবতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা প্রায় উন্মাদনায় পর্যবসিত হয়! পাগলের মতই ছুটোছুটি করে পাখি খুঁজতে থাকেন। কোথায় গেলে পাখিটাকে দেখতে পাবেন ভেবে পান না। ঘরের আনাচ কানাচ খুঁজে খুঁজে অবশেষে উঁ-উঁ করে কাঁদতে থাকেন। দু হাঁটুর মধ্যে মাথা ডুবিয়ে দিয়ে অনেকক্ষণ কাঁদবেন। পরে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়বেন। ডাকাডাকি করলে এমনভাবে উঠে দাঁড়ান, যেন সদ্য সদ্য প্রবল জ্বর থেকে উঠেছেন! রুমঝুম চুপচাপ দূরে দাঁড়িয়ে শ্বশুরকে দেখে। কাছে আসে না। হয়তো ভয় পায় এই উন্মাদনাকে। আবার রুমঝমকে সামনে দেখলে আদিনাথ ভয়ে থরথর কাঁপতে থাকেন। হাতজোড় করে কাকুতি মিনতি করেন যেন ওকে মেরে ফেলা না হয়! অসংলগ্ন শব্দ ছিটকে ছিটকে আসতে থাকে তাঁর মুখ থেকে। পালাতে চেষ্টা করেন। কোথায় যে লুকিয়ে পড়বেন, ভেবে পান না!

এই হয়েছে এক অবস্থা! দুরবস্থা বলাই ভাল। অন্তত সুজিত সেটাই ভাবে। দিনের পর দিন একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখে দেখে ক্লান্তি অনুভব করে সুজিত। বাবার এই রোগ আজকের নয়। প্রায় ছমাস হতে চলল আদিনাথ অদ্ভুত রোগের শিকার হয়ে পড়েছেন। তিনি মনে করেন একটা নীলপাখি আসে নাকি রোজ তাঁর কাছে। এসে টুকুস-টুকুস করে ছোট্ট ছোট্ট লাফ দিয়ে আদিনাথের সামনে দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। এক্কাদোক্কা খেলে। দাঁডিয়াবান্ধা খেলে। টুকি-টুকি খেলে। বলেছেন আদিনাথ। অনচ্ছ চোখের তারা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলেছেন সেসব সুখের ম্যহূর্তের কথা। কথাটা প্রথম প্রথম বিশ্বাস করেনি সুজিত। ভেবেছিল বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে মতিভ্রম হচ্ছে। অথবা শোক বাবাকে পালটে দিয়েছে। বংশের রক্ত বলে কথা। সহ্য করা যায়? তবু নজরে রেখেছিল বাবাকে। একদিন সকালে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে চুপচাপ বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে পড়তেই দেখতে পেল আদিনাথকে। সেদিন খুব খুশি ছিলেন আদিনাথ। হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছিলেন কাউকে! হাসিতে ভরে গিয়েছিল আদিনাথের চোখমুখ। নড়বড়ে গলায় কথা বলছিলেন-সুহাগ ছান্দ বদনি ধুনি নাসতো দেহি...! ছেলে সুজিতকে দেখতে পেয়ে খুশি লুকোতে পারেননি-‘দেখলি আমার নীল পাখিকে?’ সুজিত অবাক হয়েছিল। খাঁ খাঁ শূণ্য একফালি বারান্দায় পাখি খুঁজে পায়নি ও। কিন্তু আদিনাথ তো পেয়েছেন! তিনি আনন্দে হাততালি দিয়ে চলেছেন- বালা, নাসতো দেহি...! এরপর থেকে সুজিত খেয়াল করে দেখেছে আদিনাথ পাখি দেখেছেন। পাখিটা এসেছে তাঁর কাছে। আবার কখনও এমন হয়েছে, সারাদিন মুখ ভার করে থেকেছেন। জিজ্ঞাসা করলে মন খারাপ করা গলায় বলেছেন- পাখি আজ আসে নাই রে সুজু। উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী ভাবেন...কে জানে! যেদিন পাখি আসে, মন ফুরফুরে বুড়োর। মাঝে মাঝে ছড়া বলেন পাখিকে উদ্দেশ্য করে। একটাই ছড়া জানেন আদিনাথ। সেটাই হাততালি দিয়ে দিয়ে সুর করে বলেন – পদ্মদিঘির কালা জলে হরেক রকম ফুল/ হাঁটুর নীচে দুলতেসে খুকুর গোসা ভরা চুল…! খুশিতে মুখভরা হাসি আদিনাথের। অথচ পাখিটা মাঝে মাঝে আসেনা! কত কষ্ট পান আদিনাথ সে কথা পাখিটা বুঝতেই পারে না! দুঃখে কাঁদতে বসেন আদিনাথ। সারাটাদিন অবসাদে ডুবে থাকেন। মুখে কথা নেই! এক সময় থুম মেরে বসে থাকেন ঘরের এক কোণে। কথা বলেন না। খান না। অনেক রাতে ঘরের ভেতরে ঘুরেঘুরে বেড়াতে থাকেন। আঁতিপাঁতি করে কিছু বা কাউকে খোঁজেন। খুঁজে খুঁজে না পেয়ে হয়রান হয়ে বসে পড়েন। ছেলে সুজিত বিছানায় জেগে বাপের কান্না শোনে। কঁকিয়ে-কঁকিয়ে কাঁদেন। নীচু স্বরে। যেন তাঁর কান্না কেউ শুনতে না পায়! জেগে থাকা সু্জিত বাপের দীর্ঘশ্বাসও শুনতে পায়। কখনও আদিনাথ রাতের নিঝুম দশাকে ছিঁড়ে ফেলেন বুক চিরে ফেলা শব্দ দিয়ে–হায়রে মানুষ! সুজিত শূণ্য চোখে অন্ধকার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকে। পাশ থেকে রুমঝুমের শ্বাসের আওয়াজ শোনার চেষ্টা করে। না পেলে ভয় হয় বউটা জেগে আছে বুঝে। সবাই যদি জেগে থাকে তাহলে শোয়ার দরকারটা কী? জেগে থাকা যে কী ভয়ঙ্কর মনে হয় আজকাল!

সকালে রুটি ছিঁড়ে আলুচচ্চড়িতে জড়িয়ে নিতে নিতে পাশের বাঁ দিকের ভাড়াটের ঘরের ছেলের নামতা মুখস্থ করা শুনতে পায় সুজিত। দুই অক্কে দুই/ দুই দুগুণে চার…! ডান দিকের ঘর থেকে কচি গলায় রাইম শোনা যায়- জনি জনি…! মিক্সড ভেজিটেবল এর মধ্যে পড়েছে সুজিত। একটা সময় রুমঝুম সু্জিতকে ঢ্যাঁড়স বলে খেপাতো। এখন সত্যি নিজেকে ঢ্যাঁড়স মনে হয়। কেমন ল্যাতপেতে হয়ে গেছে সুজিত। সেই দাপট আর নেই। সব চলে গেছে জলে।

আদিনাথ বারোয়ারি বাথরুম থেকে দরজা অল্প ফাঁক করে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করছিলেন। চোরের মত মুখ করে বাইরে এলেন পা টিপে টিপে। অন্য ভাড়াটেরা ওঁকে খেয়াল করছে কি না সেদিকে নজর নেই। সবটুকু নজর ঘরের চালের ওপর গজিয়ে ওঠা চালকুমড়োর লতার ওপর। একটামাত্র কুমড়ো ধরেছে। এইটুকুনি। বাড়িওলা থেকে তিনঘর ভাড়াটের প্রত্যেকের নজর সেদিকে। আদিনাথ চুপিচুপি কুমড়োটা দেখার জন্য পায়ের পাতা উঁচু করলেন। পাতার ফাঁকফোকরে কুমড়োটা নিরাপদে আছে দেখে খুশিতে হাতে তালি দিয়ে উঠলেন – “আসে আসে, মনু আসে!”

-কী আছে? সুজিত বের হচ্ছিল। একবার থানা ঘুরে দোকানে যেতে হবে। বাবাকে চোখে চোখে রাখতে হয়। পাঁচজনের সঙ্গে বসবাস। কে কী মনে করে সে নিয়ে চিন্তা থাকে। ঘরের খবর কাউকে বলা যায়না। বাবার অসুস্থতা নিয়ে অনেকটা অস্বস্তিতে আছে সুজিত। ওর বিভ্রান্ত মনে আদিনাথ আর একটি বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছাপা শাড়ি পরা রুমঝুম ফ্যাকাশে কপাল নিয়ে এসে দাঁড়াল। সুজিত বের হওয়ার সময় এসে বাইরে দাঁড়ানো রুমঝুমের অভ্যেস। এখন কেমন চুপচাপ হয়ে গেছে ও। হাসে না। কথাও কম বলে। কেবল আদিনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে। আদিনাথ এখন যেমন রুমঝুমকে দেখে পুর পুর করে ফের বাথরুমে গিয়ে লুকোলেন। লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছেন। মন দিয়ে খেয়াল করছেন রুমঝুম কী করছে! পাশের ঘরের ভাড়াটে বউটি জল তুলতে এসে আদিনাথের লুকিয়ে পড়া আর রুমঝুমের দাঁড়িয়ে থাকা দেখতে দেখতে মুচকি হাসে। অথচ যাদের নিয়ে হাসি, তারা খেয়ালই করেনা!

সুজিত সাইকেল বের করে রুমঝুমের দিকে তাকাল। কেউ কথা বলল না। সু্জিত বেরিয়ে যেতে যেতে পেছন ফিরে বাথরুমের দিকে তাকিয়ে আদিনাথকে দেখার চেষ্টা করল। আদিনাথকে দেখা যাচ্ছে না। সুজিত জানে এখন ওর ভাড়াবাসাটা অদ্ভুত শৈত্যে খাঁ খাঁ করবে। এই শূণ্যতা কখনই ভরবে না। এই ঘরে উষ্ণতা খেলবে না কখনই। রুমঝুম আর কখনও হাসবে না। সুজিত আর কখনও ররিবার করে পাঠার মাংস আনবে না। সুজিতের বাবা আদিনাথ একমাত্র পাখিকে নিয়ে মশগুল হয়ে আছেন। তবু রুমঝুমকে ভয় পাওয়ার যে ব্যাপারটা আদিনাথের ভেতরে গেড়ে বসে আছে, সেটাও আর শেকড় উপড়ে চলে যাবেনা। কিন্তু বাবা কেন রুমঝুমকে ভয় পান? সাইকেলে প্যাডেল করতে করতে প্রশ্নটা ল্যাম্প পোস্টের মত স্থির হয়ে থাকে মাথায়। যে ল্যাম্প পোস্টে কখনও আলো জ্বলে না।

গরম বাতাসের হলকা শরীরের ওপর দিয়ে চলে গেলে রুমঝুম নড়ে উঠল। কী যেন করার ছিল, মাথায় আসে না। ঘরে ঢুকে এটা সেটা নাড়াচাড়া করতে করতে কান পেতে শোনে। অনেক অনেক দূর থেকে কেউ কি ‘মা’ বলে ডাকল? তাড়াহুড়ো করে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ফের স্থির হয়ে থাকে ও। আদিনাথ বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে রুমঝুমকে দেখে ফের বাথরুমের ভেতরে ঢুকে যান। ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দেন। ভাবটা এমন, যেন দরজা বন্ধ থাকলে রুমঝুম তাঁকে ধরতে পারবে না! কিন্তু এতে আর পাঁচটি ভাড়াটে ঝামেলায় পড়ে। পাঁচঘর ভাড়াটের জন্য দুটো বাথরুম। একটা অন্য কেউ আটকে রাখলে বাকিটা আদিনাথ দিনের বেশির ভাগ সময় আটকে রাখেন। এ নিয়ে ঝগড়া ঝাঁটি কম হয়নি! কিন্তু আদিনাথ বুঝলে তো! তিনি দরজা খুলবেন না কিছুতে। অন্য ভাড়াটেরা সুজিতের কাছে দরবার করেছে, নালিশ করেছে। বাড়িওলা নির্মল সাঁপুই বেশ করে কড়কে দিয়েছে সুজিতকে। সুজিত সেটা নিয়েও ভাবছিল। কী হয়েছে আদিনাথের, বুঝতে পারে না ও। বহুবছর আগে বাংলাদেশের বরিশাল জেলা থেকে এসেছেন আদিনাথ। একাত্তরের পরেই এসেছিলেন। সুজিতের জন্ম কলকাতায়। আদিনাথ একটা ছোট দোকান দিয়েছিলেন বেহালার বটতলা মোড়ে। একটা টেবিল পেতে চায়ের দোকান। সঙ্গে লেড়ো বিস্কুট। দীর্ঘদিন সেই দোকান চালিয়েছেন। ছেলেও বড় হয়েছে। বাবার কাজে হাত লাগিয়েছে। এই সেদিনও দোকানদারি করেছেন আদিনাথ। কিন্তু মাত্র কয়েক মাস হল আর পারছেন না। সব ভুল হয়ে যায়। অথচ এই কিছুদিন আগেই নিজের বৌ মরে যাওয়ার পরে ছেলের বিয়ে দিয়ে সংসারী করেছেন। নাতনি এল বছর না ঘুরতে। সেই নাতনির ষোল বছর বয়স হল। আদিনাথের অসুস্থ হওয়াটা নাতনির বয়সের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। খুব ভালবাসতেন নাতনিকে। টিয়েরানি। নাম রেখেছিলেন। সুজিত জানতো টিয়েরানির কথা। অনেকদিন আগে, বরিশালের গ্রামের বাড়ির পাশে ছিল ষোল বছরের টিয়েরানি। হলুদবাটা গায়ের রঙ ছিল নাকি তাঁর। গাছকোমর বেঁধে সবুজ ডুরে শাড়ি পরে হুটহাট চলে আসতো আদিনাথদের বাড়িতে। শেষ পর্যন্ত আদিনাথের মা টিয়েরানির মাকে কথাই দিয়ে ফেলেছিলেন-এইবারে আমরা বেয়াইন হই? দুইজনে দুইজনরে যেইরকম চুখে হারাইতেছে, বিয়া না দিলে দুঃখ পাইবে।

দুঃখ কোথায় লুকিয়েছিল সেই সময়! আড়াল থেকে চুপিচুপি শুনেছিল মায়ের কথা। দুঃখ মন্থরার রোল নিয়েছিল। তারপরেই লাগল একাত্তরের ঝড়। যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে। মরছে কত কত মানুষ! কত চেনা মেয়েরা হারিয়ে গেল কোথায় কে জানে! টিয়েরানিও একদিন হারিয়ে গেল। আদিনাথ খুব খুঁজেছেন। না পেয়ে পাগলের দশা। সকালের রোদ পেঁপে গাছের ওপর ছলক কাটছিল। আদিনাথের ভ্রম হয়েছিল। -ওই যে, টিয়ে এসেছে, বলে ছুটে যান। কিন্তু দেশের অবস্থা ক্রমে খারাপ হচ্ছিল। আদিনাথেরও। একরাতে পালাতে হল তাঁকেও। মাটির টান উপেক্ষা করতে তবু পেরেছিলেন। কিন্তু টিয়েরানিকে নয়। ডুরে শাড়ি পরা মেয়েটিকে বুকের ভেতরে লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলেন এপাড়ে। কেউ জানতে পারেনি আদিনাথের বুকে কী আছে! নাতনি হওয়ার পরে আদিনাথ নাম রাখলেন টিয়েরানি। রুমঝুমের ইচ্ছে ছিল শহুরে নাম রাখার। কিন্তু আদিনাথের ইচ্ছের অমর্যাদা করেনি। স্কুলের খাতায় টিয়েরানি হল ঈশিকা। আদিনাথ টিয়েরানিকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। নিয়ে আসতেন। একদিন রাস্তায় রোমিওদের কড়কে দিলেন কষে। খাটি বাঙ্গাল ভাষায় বাঘ গর্জে উঠল-আসো, আমার সামনে আসো। আমার নাতনির দিকে নজর দাও কুন সাহসে? ঠ্যাং ভাঙিয়া ফেলাইবো।

বাইরের শত্রুকে হঠিয়ে দিতে পারলেও ভেতরের শত্রু শক্তি বাড়িয়ে ফেলেছিল। রোজ সন্ধের দিকে আসতো বাপন মন্ডল সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে। তোলা তুলতে। তোলা নিয়ে ঝামেলায় যাননি আদিনাথ। ছিন্নমূলকে অনেকটা ঝুঁকে থাকতে হয়, সেটা জানতেন বলেই বাপন মন্ডলদের তুষ্ট রেখেছিলেন সাধ্যমত। সেদিনও এসেছিল ওরা। রাস্তায় আদিনাথের হিরোগিরি দেখেছিল বাপনের সাগরেদ। খবরটা সে পৌঁছে দিয়েছিল বাপনের কানে। সেই সন্ধ্যেতে বাপন এসে অল্প অল্প হেসেছিল-দাদু, এবারে সম্পর্কটা পাকাপাকি করে ফেলি?

বুঝতে পারেননি আদিনাথ- মানে? কী বলতেছ?

-বলছি, নাতনির বিয়ে দিন।

-নাতনি? ও পড়তেছে। দিব। দুইটা দিন যাউক।

-দুটোদিন কেন? পড়া তো বন্ধ হবেনা। ভাল পাত্র দাদু, ভেবে দেখুন। আপনার তোলা মকুব হয়ে যাবে।

-কার কথা কও তুমি?

-বাপন কি ভাল পাত্র নয় দাদু? ভালয় ভালয় যদি না দেন, তাহলে কিন্তু তুলে নিয়ে যাব। তখন একটা পাত্র নয়, অনেক পাত্র পাবেন। ওদের হাসির শব্দ কানে সেঁটে থাকে আদিনাথের। বাপনের সাগরেদ যখন আদিনাথকে মূল ঘটনায় পৌঁছে দেয়, আদিনাথের মুখে কথা সরেনি। আদিনাথ বাড়ি ফিরে মুখ গোঁজ করে থাকেন। সুজিত প্রশ্ন করে জবাব পায়নি। টিয়েরানি একা একা রাতের খাবার খেল। দাদু এলনা কাছে। একা ঘরে অন্ধকারে শুয়ে থাকে টিয়েরানির দাদু।

পরেরদিন দোকান খোলেননি আদিনাথ। সুজিতকে বলেছিলেন- চল, এই জায়গা থিকা চইলা যাই গিয়া। এহানে থাকা যাইবো না। খারাপ মানষের ভিড় হইছে খুব।

সুজিত বোঝার চেষ্টা করে গেছে বাবাকে। কিন্তু আদিনাথকে ধরতে পারেনি। কারা খারাপ মানুষ, তার আন্দাজও দেননি আদিনাথ। হয়তো ভয় পেয়েছিলেন সুজিত রেগে যাবে সবটা শুনলে! বাপনদের শাসাতে যাবে। কে না জানে বাপনকে শাসালে সে আর ঘরে ফেরে না! আদিনাথের কত জ্বালা, কে বুঝবে! পিতা হওয়ার জ্বালা। পিতামহ হওয়ারও জ্বালায় দগ্ধ আদিনাথ। কী করবেন! বুঝতে না পেরে মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল দশা!

তখন মা দুর্গা ঘরে আসছেন। সাজ সাজ রবের মধ্যে টিয়েরানির জন্য, বাবার জন্য, নিজেদের জন্য জামাকাপড় কিনতে বেরিয়েছিল সুজিত আর রুমঝুম। জুলাই মাস শেষ হয়ে সবে আগস্ট পড়েছে। গড়িয়াহাটে বাজার করছিল দুজনে। ঘরে রয়ে গেছে দাদু আর তাঁর নাতনি। টিয়েরানির জন্য চকোলেট কালারের লেহেঙ্গা নিয়েছে রুমঝুম। টিয়েরানির মায়ের বুকে বড় আশা। ড্রেস দেখে মায়ের পছন্দের প্রশংসা করবে মেয়েটা। মা জানে না মেয়ে তখন খাটের নীচে লুকোতে যাচ্ছে। ভয়ে ত্রাসে কী করবে জানে না মেয়ে। নিঝুম দুপুরে বাপন মন্ডল এসেছে টিয়েরানিকে নিয়ে যেতে। আদিনাথ দুপুরের ঘুম চোখে মেখে বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়েছিলেন। মাতাল বাপন এসে লাথি মেরে আদিনাথকে উলটে ফেলেছিল বারান্দা থেকে। আদিনাথ সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন। কিন্তু দুপুরে পড়শিরা কেউ ছিল না! যে যার মত কাজে বেরিয়েছে। বস্তির মানুষজন বসে সময় কাটায় না। একটা দুটো বাচ্চা সাক্ষী থেকে গেল সেদিনের।

আদিনাথ নাতনিকে বাঁচাতে যাননি, একথা কেউ বিশ্বাস করবে না। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু পারলেন না! খাটের নীচে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটিকে খুঁজে পাচ্ছিল না ওরা। তখন বাপন চকচকে ছোরা বের করেছিল। আদিনাথের গলার নলিটা কেটে দিতে মাথাটা টেনে পেছনে নিয়ে ছোরা গলায় ছুঁইয়ে দিতে ভয়ে ঠান্ডা হয়ে গেছিলেন আদিনাথ! গলা কাটা পাঁঠার শরীর কেমন ধড়ফড় করে দেখেছেন। রক্তের গন্ধ পাচ্ছিলেন। কসাইখানার গন্ধ পাচ্ছিলেন। এই দুনিয়ায় সব ভাললাগা, ভালবাসা উড়ে গেল ট্যাঁ ট্যাঁ করে ওদের বাড়ির ঝিমঝিমে নারকেল গাছের ওপর দিয়ে। খাটের তলা থেকে মেয়েটাকে টেনে বের করেছিল বাপনের সঙ্গীরা। ত্রাস বিস্ফারিত মৃত্যুভয়ে নীল হয়ে যাওয়া টিয়েরানির চোখের দৃষ্টিটা বাপনের ছোরাটার মত অবিরাম গলার নলি কাটতে থাকে! অবিরাম।

ওরা ওকে নিয়ে চলে গেল মুখচাপা দিয়ে। ছমাস হয়ে গেল,আজও কোনও খবর আনতে পারেনি পুলিশ। নিয়ম করে থানায় যাতায়াত সার হয়ে দাঁড়িয়েছে সুজিতের। আদিনাথ নিজেকে ক্ষমা করতে পারেননি। তাঁর উপস্থিতিতে টিয়েরানি মরে গেল এটাই হয়তো আদিনাথের অনুতাপ! মরে যাওয়াই তো! একে কি বেঁচে থাকা বলা যায় যদি টিয়েরানি শারীরিক ভাবেও বেঁচে থাকে!

দুপুরের গরম বাতাসে অনেক দূর থেকে দুটো নীল টিয়ে উড়ে আসে। আদিনাথ থম মেরে ওদের কথার অর্থ বোঝার চেষ্টা করেন। রুমঝুম যন্ত্রের মত সংসারের কাজ করে। অদ্ভুত ভাবে নিশ্চুপ হয়ে গেছে বৌটি। কথা বলে না। চকোলেট কালারের লেহেঙ্গা বের করে দেখে মাঝে মাঝে। ফের গুছিয়ে রেখে দেয়।

বাড়ি ফেরার রাস্তায় দুটো ফল কিনে আনে সুজিত। মাঝে মাঝে। বাবার জন্য। কয়েকদিন ধরে আদিনাথের শরীর ভাল নেই। সুজিত ফল নিয়ে ঢুকতে ঢুকতে রুমঝুমের গলা শুনতে পাচ্ছিল। একটু অবাক হয়েছিল। রুমঝুমের কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া দুষ্কর। কী বলছে ও?

একটি বাচ্চা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদিনাথের বিছানার পাশে। সেদিনের কথা বলছিল মেয়েটি। ও ছিল সেই ভয়ঙ্কর দিনে।

-আমি লুকিয়ে পড়েছিলাম। ভয় করছিল কাকিমা। খুব ভয়। যদি ওরা আমাকেও…!

-ওরা নিয়ে গেল টিয়েকে! তোরা আটকালি না? একবার চেঁচিয়ে ডাকলিনা কাউকে?

-কী করব? দাদুর গলায় ছোরা ধরেছিল। দাদু খুব ভয় পেয়ে খাটের তলাটা আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল যে! টিয়ে ওখানেই লুকিয়েছিল। নাহলে দাদুকে মেরে ফেলতো ওরা। আর আমার বুঝি ভয় করেনি? এইমাত্র দাদু মরে গেছে কাকিমা, তাই আজ বললাম এসব।

সুজিত নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে বাইরে। হাতের ফলগুলো প্ল্যাস্টিকের ক্যারিব্যাগে শ্বাস ফেলতে ভুলে যায়। সুজিত আজ থানায় যাবে ভেবেছিল। আর থানায় যাবে না। আদিনাথ নিজেই এতক্ষণে পাখিটাকে খুঁজতে বেরিয়ে গেছেন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%