সাগরিকা রায়
লোকটা সঙ্গী হল লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল থেকে। ভীড় ঘিজঘিজ গাড়িতে দাঁড়াবার জায়গা পাওয়াই দুষ্কর, বসার ভাবনা মাথাতেও নেই। তো সেই মহাক্ষণে পেছনের দিক থেকে ধ্বনিল আহ্বান – এহেনে বস এসে। আমার পাশে টু জাইগা হই যাবেনে।
আমি তো বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। লোকটা এত লোক থাকতে আমাকেই কেন? সত্যি কি আমাকেই ডাকছে?
আমার মন বুঝেই হাসল বোধহয় লোকটা – চলি আসেন দিকি। আম্মো মথুরাপুরে যাতিচি। লতুন জাইগায় আপনার কষ্ট হবি। আসে বসি পড়।
বসলাম গিয়ে ঠেসেঠুসে। ব্যাগটা পিঠ থেকে খুলে কোলের উপর রেখেছি। এখন শরীরটা স্বস্তি পেয়েছে খানিকটা। যাব মথুরাপুর হয়ে রায়দিঘি। সেখান থেকে পঁচিশার লাট। এই লোকটা কী করে জানল আমি মথুরাপুরে যাচ্ছি? মানে টিকিট কাউন্টারে আমার আগে পিছে ছিল। আমি পাশে বসাতে সে খুশি বোঝা যাচ্ছে। লোকটাকে কী সম্মোধন করবো বুঝতে পারছিনা। আপনি বলতে বাধে, আবার তুমি বলতেও পারছিনা। কিছু বলারই বা দরকার কী? বসতে দিয়েছে তো কী এমন করেছে? জানালার দিকে তাকিয়ে দেখতে থাকি একটা করে স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছে। দূরে দূরে গ্রামের আভাস। ধানখেত…। লোকটা উসখুস করে যাচ্ছে। কিছু বলতে চায় মনে হচ্ছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই লোকটা হাসল। এতক্ষণে খেয়াল করলাম লোকটার বড্ড ছিরকুটে চেহারা। নেশা টেশা করে খুব। লক্ষ্য করে দেখেছি যারা বেশ নেশাগ্রস্ত, তারা খুব দিলখোলা হয়। অফিসের নিরঞ্জনদা যেমন। সবসময়েই ‘লে লে কি চাস লিয়ে লে’ টাইপ। মে মাসের গরমে নিরঞ্জনদার কাছে গিয়ে রিমা যেই না বলেছে – ‘ইস, কি ইচ্ছে করছে আইসক্রিম খেতে!’ বলার অপেক্ষাতেই ছিল যেন নিরঞ্জনদা। টাকা বের দিল। অফিস শুদ্ধ সবাই সেদিন আইসক্রিম খেল। পরে যারা খেয়েছে, তারাই বলেছে –শালা বোতল খেয়ে খেয়ে বোধবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি স্বাতীও হাসছিল নিরঞ্জনদাকে ‘মুর্গি’ বানাতে পেরে।
-আমার নাম গনা সর্দার। বলে লাজুক হাসে লোকটা –নকুল সর্দাররে চিনো? সে আমার...
-বাবা বাবা! যাত্রীদের একাংশ চেঁচিয়ে উঠল। আমি চমকে উঠলাম। গনা সর্দার অপ্রস্তুত চোখে সেই যাত্রীদের দিকে তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে নিল – বাবা তো কী? সবার ব্যাপারে কথা বলতি নেই সেটা মাতায় নেই! যত্তসব! যাক বাদ দেন, আমার বাবা নকুল সর্দাররে চিনোনা? ভোঁদা সর্দাররে চিনো? সে হল গে আমার ...
-ঠাকুদ্দা ঠাকুদ্দা! সেই ভীড় ফের সরব।
-দেখিছেন কান্ডখানা? একজনায় কথা কতিছে, তোরা কেন এর মধ্যি আসতিছিস?
আমার খুব হাসি পাচ্ছিল। এই লোকটা নিয়মিত যাতায়াত করে ট্রেনে। কাউকে না কাউকে ধরে একই গল্প শোনায়। যাত্রীদের একাংশের মুখস্থ হয়ে গেছে লোকটার গপ্পোসপ্পো। আমার বেশ লাগছিল লোকটাকে। এমন টাইপের লোক সহজে মেলেনা!
-আর আপনার নাম?
-আমার নাম পরথমেই বলিচি। মনে লাই? গনা সর্দার। ইদিকেরে যারে জিজ্ঞাস করপা, সেই চিনপে আমারে। ইদিকের লোক কিনা! রোজি আসাযাত করি এই লাইনে তুমি ইদিকেরে কারুরি চিনোনা দেকতিচি। ঝিকরহাটির মোল্লারে চিনো? তাইতো। তুমি কারে চিনো বলেন দিখি।
আমি ফাঁপরে পড়া কাকে বলে বুঝতে পারলাম এতদিনে। সত্যি কথাটা আমার বুকে তীরের ফলার মতো বিঁধল। আমি কাকে চিনি? সত্যিই কি আমি কাউকে চিনেছি আজ অব্দি? চেনা যে এত সহজ নয় সেটা এই লোকাল ট্রেনে গনা সর্দারের পাশে বসে বুঝতে পারলাম। গনা আমাকে বুঝিয়ে দিল! একসময় ট্রেন থামল এসে মথুরাপুরে। ঠেলাঠেলি করে নেমে পড়লাম। এখান থেকে অটো বা ভ্যান ভাড়া করে যাব সেই রায়দিঘি। বাসও আছে। এগোচ্ছি, পেছন থেকে ফের সেই আহবান– যাতিচেন কোতা? ভ্যানে উটে পড়ুন দিকি। খোলা বাতাসের মধ্যি দে যাওয়ার মজাই আলেদা। বর্ষা নেই। আকাশ পোষ্কার পয়িচ্ছন্ন। জাইগা করি একবার যদি শুয়ি পড়তি পারেন, উনি যে উপরে আছে ভারি আরাম পাবিন। ওনার বসি বসি আমাগের কম্মো দেখতি দেখতি পিটে ব্যতা হয় কিনা? আমাগের সুখে তার সুখ।
তাকিয়ে দেখি কোত্থেকে এক ভ্যান ধরে এনেছে। তাতে ছ’সাত জন লোক ভারি নিশ্চিন্ত মনে পা দোলাচ্ছে ভ্যানে বসে। লম্বা লম্বা ঠ্যাঙ ভূতের মতো! এই সঙ্গীদের মোটে পছন্দ হল না। আমি কেন যে লোকটার কথা ফেলতে পারলাম না কে জানে! ব্যাগ সামলে ভ্যানে উঠে বসলাম। আমার পা দুটো ঝুলতে থাকল অন্যদের মতোই। লোকটা ঝেড়েঝুড়ে ভ্যানের মাঝখানে একটু জায়গা করে ডাকল – আসেন দিকি, শুয়ে পড়ুন। দেখপেন, কেমন মজায় মজায় যাতিছেন।
এবারে আর না থামালেই নয়। আমি হাসলাম- না না, শোব কেন? বসে বসে দেখতে দেখতে যাই। এদিকটা আসিনি আগে কখনো। গ্রামের শোভা শহরে দেখিনা বলেই এদিকে আসা। আপনি বসুন ভাল করে।
লোকটা অবাক হয়ে রাস্তার দু’পাশ দেখল – এহেনে এমন কী আছে? যা আছে সব আমাগের চিনা জিনিস। কী দেখপেন বসি বসি?
-আপনার চেনা, আমার চেনা নয়।
-নয়? আপনে কিছুই চিনেন না! নতুন জম্মো হইছে বটে। বলে হাসতে শুরু করেছে গনা সর্দার। হাসি সামলে বলল – আপনে নকুল সর্দাররে চিনোনা, ভোঁদা সর্দাররেও চিনোনা! ওরা কে ছিল জানো? ওরা আমার বাপ আর ঠাকুদ্দা। বুঝ?
লোকটা হয় পাগল, নয় পাতাখোর। সারাক্ষণ উল্টোপাল্টা বকে যাচ্ছে। ট্রেনে বসার জায়গা করে দিয়ে যেন মাথায় চড়ে বসেছে। আমার নিজের উপর রাগ হচ্ছিল। বেশি পাত্তা দিয়ে ফেলে নিজেই জালে আটকে গিয়েছি। মুখ গম্ভীর করে রইলাম। আমার বন্ধু বিশ্বজিতের পৈত্রিক বাড়ি পঁচিশার লাট পেরিয়ে সেই শীতল মাইতিতে। ওখানে নাকি সুন্দরবনের জঙ্গল থেকে মাঝে মাঝে বাঘ বেরিয়ে আসে। আর পঁচিশার লাটের সবজির ক্ষেত নাকি দেখার মতো। লাট অঞ্চল দেখারও ইচ্ছে। সব মিলিয়ে ছুটিটা এদিকেই কাটাবো। বিশ্বজিত কল্যাণী থেকে এসেছে। এসেই ফোন করে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। এসেই পড়েছি গনা সর্দারের হাতে। এর হাত এড়িয়ে পালানো ছাড়া উপায় নেই।
ভ্যান একটা নদীর পাশ দিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে নদীকে দেখা যাচ্ছিল। বাতাস ভেসে এল নদীর ওপাড় থেকে। এই সময় ভ্যান থামল। জনা দুই লোক নেমে গেল। এবারে খানিকটা হাত পা ছড়িয়ে বসলাম। আড়ে তাকিয়ে দেখি গনা নিজের হাতের পাতা মেলে কী দেখছে। পাগল একটা! কথা বলছেনা মানে ও হয়তো ভয় পেয়েছে আমার গাম্ভীর্য দেখে। লোকটা থাকে কোথায়? এই অঞ্চলেরই লোক মানে …ও বলেছিল মথুরাপুরে থাকে। কিন্তু মথুরাপুরে তো নামল না! জিজ্ঞাসা করবো? না, থাক। পাগলকে সাঁকো নাড়াতে বলা উচিত হবেনা। ফের শুরু করবে বাকতাল্লা!
ভ্যান খানিক রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে আর যাবেনা। এদিকে বাস আসে। আমি ব্যাগ পিঠে নিয়ে নেমে পড়লাম। চারপাশে ঘন সবুজ ঝোপঝাড়। এই ঘাস আর কুচো পাথরে ভরা রাস্তাটা কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে কে জানে! এই সব রাস্তা কখনও শেষ হয়না। কোথায় যে চলে চলে যায়! কোথায় যে যায়! মনে হয় সোজা নদীতে নেমে নদীর ভেতরে পথ করে করে চলে যায়। সে যাওয়া আর থামেনা। চলতেই থাকে!
সন্ধ্যে নেমে গেল নদী পেরিয়ে পঁচিশার লাটে পৌঁছতে পৌঁছতে। সেখান থেকে শীতল মাইতি যেতে যেতে রাত। ভারি সুনসান সুনসান চারপাশ। বিশ্বজিত ছিল রাস্তায় দাঁড়িয়ে। আমাকে পেয়ে বেজায় খুশি। পিঠে বেড় দিয়ে চলতে থাকে। মাঝে মাঝে বলে দেয় কোথায় গর্ত, কোথায় ডেবে আছে রাস্তা ... এইসব। ওর কথামতো আমিও কখনও লাফিয়ে, কখনও পা লম্বা বাড়িয়ে সেসব জায়গা পার হয়ে যাই। ওদের বাড়ি অনেকটা জায়গা নিয়ে। ফসলি জমি আছে। ওর বাবা, কাকা সেসব যাকে দেখাশোনা করে। বিশ্বজিত আমাকে ক্লান্ত দেখে বলল- খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়। কাল কথা সব।
উঠোনের একপাশের স্নানঘরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে স্বস্তি এল। বিশ্বজিৎ আমার জন্য নতুন সাবান তোয়ালে রেখেছে বাথরুমে। একটু পরেই খেতে ডাকল বিশ্বজিতের মা। রান্নাঘরে খাবার ব্যবস্থা। খেতের চালের ভাত, সবজির ঘ্যাঁট, পুকুরের মাছ। খেয়েই ঘুম পাচ্ছিল। বাইরে কারা এসেছে। কথা হচ্ছে। একটু পরে আমি যে ঘরে শুয়ে আছি, সে ঘরে বিশ্বজিতের কাকার ছেলে এসে খাটের নীচে থেকে ভারী মতো কী টেনে বের করছিল।
বিশ্বজিত জিজ্ঞাসা করল – কি রে? ভাড়া চায়?
ভাই–হ্যাঁ, বলে ভারী কী একটা নিয়ে যেতে যেতে কোলকুঁজো হয়ে গেল। আমি জানতে চাইনি, কিন্তু বিশ্বজিত জানে আমার কৌতূহল হচ্ছে। ও হাত দুই দূরের খাট থেকে কথা ছুঁড়ে দিল – জেগে?
-হ্যাঁ
-ওটা কী বলতো? পাম্পসেট আছে আমাদের। ভাড়া নেয় অনেকে। ঘণ্টায় পঞ্চাশ টাকা। ভাল ব্যবসা না? বলে হাসল ও। অন্ধকারে ওর হাসির শব্দ টুকরো টুকরো হয়ে জলের শব্দের মতো হয়ে গেল। এই জল নদী থেকে পাম্পের মধ্য দিয়ে এসে সবজির খেতে খলখল করে হাসে। সেই শব্দ বিশ্বজিতের হাসি হয়ে এল এই ঘরে। সবজির খেতও এল পাশাপাশি যেন। কার খেত, কার সবজি, কার জল…!
ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অনেক রাতে, হয়তো শেষ রাতে কেউ ঢুকেছিল আমাদের শোবার ঘরে। আবছা আবছা মনে পড়ে যেন। হয়তো আরও পাম্পসেট আছে বিশ্বজিতদের। আরও কাস্টমার এসেছে। এত রাতেও কাস্টমার আসে!
বিশ্বজিত দাঁত ব্রাশ করছিল। ইশারায় ডাকল – আয়। আমিও ব্রাশে পেস্ট লাগিয়ে ওর পেছন পেছন রওনা হলাম। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে দুটো। পুকুরের চারধারে লম্বা লম্বা ঘাস চিকন সবুজ, ফড়িং, প্রজাপতি, ব্যাঙ! সকালের রোদ পড়ে পুকুরের জল হিরহির কাঁপে। বিশ্বজিত আরও এগিয়ে যেতে যেতে ওদের খেতের সীমানার শুরু দেখাতে থাকে। আমার একটা বিদেশী গল্পের কথা মনে হয়। কোন দেশের গল্প? রাশিয়ান কি…? সেই চাষী শর্তানুযায়ী জমি কিনতে এসেছিল। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত যদ্দূর হাঁটতে পারো, সব তোমার জমি। কিন্তু সূর্যাস্তের আগেই যেখান থেকে রওনা হয়েছিলে, সেখানে ফিরে আসতে হবে। বিশ্বজিতদের জমির শুরুটা দেখতে গিয়ে গল্পটা মনে পড়ল। ফিরে আসতে গিয়ে পুকুরের জলে মুখ হাত ধুয়ে নিলাম। ওর আরেক ভাই কল্যাণীতে এগ্রিকালচার নিয়ে পড়ছে। মূল ধনাগার এখানে। ওদের জমির ফসল কোথায় কোথায় চলে যাচ্ছে। গ্রামে অনেকেরই জমিজিরেত আছে। গ্রামে বিশ্বজিতদের বেশ সম্ভ্রম করে লোকে। একটা লোক নারকেল পাড়া হবে কিনা জানতে এসেছে। সম্মতি পেলে সে লোক নিয়ে আসবে। প্রচুর গাছ বিশ্বজিতদের। নারকেল চলে যাবে কলকাতার বাজারে।
পরের দিন পঁচিশার লাটে গেলাম। ওখানে বিশ্বজিতের এক ছেলেবেলার বন্ধু থাকে। সাইটসিয়িং বলতে শিবমন্দির। ভোলানাথের জাগ্রত মন্দির দেখাতে নিয়ে গেল। সেখানে দেখি মন্দিরের পেছন দিকে লোকজনের জটলা। একটা গাছ কাটা হবে। তো কে একজন সেই গাছ কাটতে দিচ্ছেনা। বাদা অঞ্চলের লোকেরা অভাবী। বেশিরভাগ অন্যের জমিতে কামলা খাটে। তাদের মেয়ে বউরাও খাটে। আজ দেখেছি বিশ্বজিতের মা আর কাকি একটি রোগাপানা বউকে খুব ধমকাচ্ছে। পাটকাঠি খরচ হচ্ছে বেশি ধান সেদ্ধ করতে গিয়ে। বাদায় গিয়ে কাঠকুটো নিয়ে আসতে বলা হচ্ছিল তাকে। বউটি দাঁত বের করে সায় দিচ্ছে। একটা গাছ নিয়ে কিসের গন্ডগোল দেখতে গেল বিশ্বজিত। ওকে দেখে সব সরে দাঁড়াল কিন্তু কাঁউমাউ চলতে থাকে। বক্তব্য হল এই লোকটা গাছ কাটতে দিচ্ছেনা। একে টেনে সরিয়ে নেওয়াও যাচ্ছেনা।
লোক নামক অপরাধীকে দেখা যাচ্ছেনা। হাত ও পায়ের খানিকটামাত্র দেখা যাচ্ছে। বিশ্বজিত হেঁকে ডাক দিতে লোকটা মুখ বাড়াল। আমার এবারে অবাক হওয়ার পালা। লোকটা হল সেই গনা সর্দার। সে গাছ কাটতে বাধা দিচ্ছে? কেন? এই গাছটা কি গনার? বিশ্বজিত সেই প্রশ্নটাই করল– কেন বাধা দিচ্ছ? তোমার বাড়ি হল মথুরাপুরে। এখানে কী করছো? এই গাছ তোমার হল কী করে?
-আমার গাছ। কাটপা না। গলার স্বরে তীব্রতা। ট্রেনের সেই নরম সরম ভগবত লীলাদর্শনে উন্মুখ গনা এ নয়! বিশ্বজিতকে জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে থেমে গেলাম। জনতা ক্ষিপ্ত – দেখিছেন, কত বড় কতা কতিছে!
গনাও কম যায়না– কী দ্যাখপেন? আমার গাছ, আমি কাটপো না। হই গেল কিনা? বাড়ি যাও দিনি সব।
আশ্চর্য ঘটনা হল, গনা দিনরাত পাহারা দিয়ে যাচ্ছে গাছটাকে। কেউ ধারে কাছে এলেই হল। এমন চেঁচিয়ে ওঠে যে বলার না। একটি কঙ্কালের মতো অস্থিসার মহিলা আঁচলে বেঁধে কী নিয়ে এসেছিল। গনাকে জোর করে খাইয়ে জল খাওয়াল। আঁচল দিয়ে গনার মুখ মুছিয়ে খর চোখে গাছের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে…কী যে দেখছিল! কপালের ধেবড়ে যাওয়া সিঁদুর বেঁচে থাকার চিহ্ন হয়ে টিকে আছে! এক সময় সেও চলে গেল ওই দিকে। নদী পেরিয়ে গেল বুঝি! নাকি নদীতে নেমে গেল অতলের রাস্তা খুঁজতে গনার বউ!
-এদের নানা ঝামেলা। বিশ্বজিত কুপিত –গনা পাগলা জ্বালিয়ে খেল দেখছি। কী যে পাগলামি চেপেছে ওর কাঁধে! এমনিতে খারাপ না। কিন্তু এই গাছের উপর খুব মায়া। ঝামেলা আজকের নয়। একদিন রাতারাতি গাছ কাটা হয়ে যাবে। সেদিন যে কী হবে!
-কেন গাছ কাটতে দিচ্ছেনা? আর গাছ কাটছেই বা কেন?
-এই গাছ পড়েছে বিদে মন্ডলের জমিতে। গ্রামের লোক এই গাছে মানতের গিঁট বাঁধে। এখন বিদে গাছ কাটলে বলার কিছু নেই! এদিকে গনা নাকি দু’বছর আগে এই গাছে মানতগিঁট বেঁধেছিল। ওর ছেলের নামে। সে গিঁট এখনও বাঁধা আছে গাছের মগডালে। তাই গনা গাছ কাটতে দেবেনা। সোজা কথা। ওর বউও চায়না গাছ কাটা হোক। সে এসে স্বামীকে খাইয়ে শরীর-মনে জোর দিয়ে গেছে, বুঝলি? মথুরাপুরে থাকে। মাঝে মাঝে এসে দেখে যায় গাছটাকে।
গাছটাকে দেখলাম। বড়সড় গাছ। এরকম গাছ আগে দেখিনি। আমি চিনিনা। পাতায় ভরা গাছের কোথায় সে গিঁট, গনা ছাড়া আর কেউ খুঁজেও পাবেনা। গাছে মানতের গিঁট দিতে দেখেছি। বহু জায়গায় দেখেছি মানতের রঙীন গিঁট। অনেক পুজোর থানে গিঁট ঝোলানো সুতো দেখে অভ্যস্ত আছি। গনা সর্দার দু’বছর আগে গিঁট দিয়েছিল, ওর মানত এখনও পূরণ করেনি ঈশ্বর? ছেলে কি অসুস্থ? কী হয়েছে? গনা ট্রেনে বাপ ঠাকুদ্দার নাম বলেছে, কিন্তু ছেলের নাম তো বলেনি! কী হয়েছে গনার ছেলের? কেন গনা ছেলের জন্য প্রার্থনা করে গাছে মানতের গিঁট ঝোলায়? বাড়িতে ফিরতে ফিরতে প্রশ্নটা করেছিলাম বিশ্বজিতকে। ও একটু চুপ করে থাকে।
-আসলে ছেলেটার যাতে ফাঁসি না হয়, তাই গিঁট বেঁধেছে গনা।
-মানে?
-ত্রিকোণ প্রেমের গল্প। একটা মেয়েকে নিয়ে দুই বন্ধুর রেষারেষি। দুজনের একজন হল গনার ছেলে। মেয়েটা অন্য প্রেমিককে লাই দিয়ে যাচ্ছে। সে আবার প্রেমিকার আস্কারা পেয়ে প্রেমিকার সামনেই গনার ছেলেকে গালিগালাজ করে। ব্যস, গনার ছেলেটা ছুরি দিয়ে গলার নলি কেটে দিয়েছে নব্য প্রেমিকের। পালিয়েছিল। পুলিশ এসে খুঁজে পায়নি। গনা খুঁজে বের করে ধরে থানায় দিয়ে আসে। এসে কদিন গুম হয়ে পড়েছিল। অর্থবল, লোকবল কিছু নেই। এখন ভগবান ভরসা। তাই গিঁট বেঁধে রেখেছে যেন ছেলেটার ফাঁসি না হয়।
আমরা কেউ অনেকক্ষণ কথা বলিনা। সব কেমন বিস্বাদ ঠেকছিল। নোনা বাতাস আছে চারপাশে, ঠাহর হয়নি প্রথমে! এখন একটু একটু করে অনুভব করছি নোনা বাতাসকে!
ভেসেলে চেপে নদী পার হয়ে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ালাম দিনচারেক। ফিরে আসার আগের রাতে বিশ্বজিতের সঙ্গে সেই ঘরে শুয়ে আছি। রাতের আকাশ কেমন বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে আছে মাটির পৃথিবীর দিকে। গনা সর্দারের কথা ভুলিনি। কদিন ছিলাম না। কী হল কে জানে। গাছটা কাটা পড়েছে কিনা, বা পড়লেও গনার অবস্থা কী জানিনা। বিশ্বজিতের মুখে সব শুনে কেমন একধরনের বিমর্ষতা ছেয়ে আছে মনে। গাছটা কি কেটেছে ওরা? বারান্দায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে ফেললাম বিশ্বজিতকে।
-নারে, গনা সেই গাছে চড়ে বসে আছে। কেউ নামাতে পারছে না। যারা চেষ্টা করেছিল নামাতে, গনা ভয় দেখিয়েছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়বে। বোঝ কান্ড!
সকালের আলো ফুটি ফুটি করতেই বেরিয়ে পড়েছি। ফিরে যাওয়ার আগে গনা সর্দারের সঙ্গে দেখা করতে হবে। সেই গাছের সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, নিঝুম হয়ে আছে গাছ। কোথাও কারও নড়াচড়ার চিহ্ন নেই। গনা কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম কোথাও কেউ নেই। দু চারটে গরু চরছে। দূ রে দূরে। আমি সন্তর্পনে ডাক দিলাম –গনা সর্দার! আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন? সেই যে ট্রেনে… ?
দেখা যাচ্ছেনা ওকে, গলা পাওয়া যাচ্ছে গাছের আড়াল থেকে – চিনিছি। আপনে আমারে চিনেন নাই। নকুল সর্দাররে চিনো? সে আমার…বাপ।
ভোঁদা সর্দাররে চিনো? সে আমার ঠাকুদ্দা। আমার নাম গনা সর্দার।
এসব কথা আমার জানা। ভয় হল, আমি কি সত্যি কি চিনতে পেরেছি গনাকে? নকুল সর্দারকে? ভোঁদা সর্দারকে? এই বাপ ঠাকুর্দার রক্ত গনার শরীরে বয়ে যাচ্ছে নদীর মতো। এই রক্ত ধারা চেনার সাহস আমার নেই! আমি ঝিমঝিমে গাছটাকে ফেলে চলে যাচ্ছি। পেছনে পড়ে থাকল গিঁটবাঁধা একটি মানত- মানুষ। ডালপালা পাতা-টাতার আড়ালে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন