সাগরিকা রায়
তিক্ত হেসে আদিত্য বলল, ‘সংসারটা একটা সিঁড়ি। কেউ ওঠে, কেউ নামে।’
ঝমঝমে বৃষ্টির দিনে হঠাৎ করে সংসারের উপর বীতশ্রদ্ধ আদিত্যকে ঠিকঠাক বুঝতে পারছিল না শুভাশিস। একঘেয়ে বর্ষা অনেক সময় ডিপ্রেশন সৃষ্টি করে। একটু আগে বেশ চনমনেই দেখাচ্ছিল আদিত্যকে। হঠাৎ মেজাজ বিগড়ে গেল কেন?
শুভাশিসের মুখের ভাব দেখে একই সুরে ফোড়ন কাটে আদিত্য – ‘বোঝেননি তো? কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? নাকি কোনো অলৌকিক দৃশ্য-ট্রিশ্য দেখেছেন এইমাত্র?’
এই এক অসুবিধে! মাঝে একদিন বর্ষার দিনের নিষ্কর্মা আড্ডায় ছেলেবেলার কিছু গুপ্ত কথা ফাঁস করেছিল শুভাশিস। মৃত্যুর পরে ওর ঠাকুমা ওকে দর্শন দিয়েছিলেন ... পাশের বাড়ির খুকু কাকিমা স্টোভ ফেটে পুড়ে মারা যাওয়ার পর রোজ রাতে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ‘ও মাগো! জ্বলে যায়...’ বলে কাঁদতেন। সেই কান্না স্পষ্ট শুনেছে শুভাশিস। আড্ডা শেষেও হাসি থামেনি আদিত্যর। সুযোগ পেলেই টিটকিরি দেয়!
শুভাশিস অবশ্য রাগল না – ‘তোমার কথা বুঝলাম না। সংসার বস্তুটা এই অফিসে এল কোত্থেকে?’
আশ্চর্য চোখে তাকাল আদিত্য – ‘সে কী? অফিসটা যে আমাদের সংসার! আপনি জানেন না?’
এবারে হেসে ফেলে শুভাশিস — ‘উঠছে কে এখানে? নামছেই বা কে?’
‘ডি এম উঠবেন। নামব আমরা, আমি।’ আদিত্যর নিমীলিত চোখ।
‘মানে?’ এবার ফের ধোঁকা খেল শুভাশিস।
‘ডি এম সার্কুলার জারি করেছেন বন্যার মোকাবিলা করতে যাবেন। স্বচক্ষে বন্যা দেখার সাধ হয়েছে। এখন মরো তুমি। ভাবতে পারছেন কী সমস্যায় পড়েছি?’
শুভাশিস তবুও আদিত্যর কথার খেই ধরে ঝুলে আছে– ‘কিন্তু বললে যে, ডি এম উঠবেন, আমি বা আমরা নামব – মানেটা পরিষ্কার করো। ওঠা নামা কোথায় হবে?’
আদিত্য ঝাঁকড়া চুলে ভরা মাথাটা দু’হাতের তালু দিয়ে চেপে রাখল – ‘ডি এম নৌকোয় উঠবেন, ঠিক আছে? আমরা জলে নামব। নৌকো ঠেলে নিয়ে যেতে হলে জলে নামতে হবে। এই আর কী!’
শুভাশিস এখনও ঝুলছে – ‘কিন্তু আমরা নৌকো ঠেলব মানে? মাঝি কী করবে তাহলে?’
‘মাঝি? মাঝি কোথায়? নৌকোটা তো পাই আগে, তারপর তো মাঝি!’ আদিত্য যেন আর্তনাদ করে ওঠে। শুভাশিস বুঝল। অভিজ্ঞতা ওরও আছে। কখনো খরা, কখনো বন্যা, কখনো গ্রামে শৌচালয় তৈরির মোকাবিলা ...। আর এখন তো আকাশ জুড়ে ঘন মেঘ গুন্ডাবাহিনীর মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। অফুরান জলভাণ্ডার তাদের দখলে। ইচ্ছেমতো ভাসিয়ে দিচ্ছে, ডুবিয়ে দিচ্ছে চরাচর। নদীগুলোতে তুফান জেগেছে। জলে উপুড় ঝুপুড় নদী আইঢাই করছে ভরপেটে খেয়ে। ঘরছাড়া মানুষ, পশুর দুর্দশা, খবরের কাগজের পাতা দখল করেছে। পাড় ভেঙে গ্রাম ডুব দিচ্ছে জলের তলে। এই সঙ্গে নাগাড়ে বৃষ্টি পড়ছে। ডি এম বন্যা-পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখবেন। আদিত্য দায়িত্ব পেয়েছে। মূল বন্যা-বিধ্বস্ত জায়গাগুলোয় গাড়ি যাচ্ছে না। তার জন্য নৌকো চাই। এই জায়গাতে এসেই খেপেছে আদিত্য– ‘এখন নৌকো পাওয়া সহজ কথা বলুন? লোক। লাগিয়েছিলাম। সব ফিরে এসেছে। বলছে, একটা নৌকোরও নাকি টিকি দেখা যায়নি। কী মুশকিল!’
এই সংকটময় মুহূর্তেও আদিত্যের কথাটা শুধরে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারল না শুভাশিস। গম্ভীর, চিন্তান্বিত মুখে ও বলল – ‘নৌকোর কি টিকি হয়? ছই, গলুই, হাল, দাঁড় ... এসব হয় বোধ হয়!’
আদিত্য হেসে ফেলল, ‘বলবেন না শুভাশিসদা। মাথার ঘায়ে কুকুরের পাগল দশা কথাটার অর্থ বেশ বুঝতে পারছি।’ শুভাশিস এবারে সিরিয়াস। নৌকোগুলো গেল কোথায়? এ অঞ্চলে জেলে আছে বিস্তর। নৌকোও আছে সুতরাং। সব লোপাট হয়ে গেল? নিত্যানন্দও কিছু জানে না? ওকে ডেকে মুখোমুখি দাঁড় করালে ঠিক জানা যাবে। ও এদিকের লোক। জানে না বললে হবে?
নিত্যানন্দ বারান্দায় ছিল। আদিত্য ডাকতেই চলে এল। বোধ হয় ভেতরের কথাবার্তা সবটা না হলেও নিজের নামটা কানে এসেছে ওর। চটপট চলে এল দরজার মুখে।
শুভাশিস মজা করল – ‘বাঃ! এ যে দেখি মেঘ না চাইতেই জল!’ আদিত্যর ভুরু কুঁচকে উঠল ‘মেঘ বা জল শব্দটা আর উচ্চারণ করবেন না দাদা। জলাতঙ্ক হয়ে গেছে আমার।’ কথাটা ঠাট্টার ছলে বললেও ক্ষোভ ছিল। কথা বলতে বলতে নিত্যানন্দর দিকে ফিরল আদিত্য – ‘খবর কী?’
নিত্যানন্দ ঘরে ঢুকে পড়ল- ‘স্যার, কালীপদ মোহন্তর নৌকো পেলেই ভালো হত। এক্ষেত্রে। ওর নৌকোটা বড়ো। মজবুত। সাফসুতরো শক্তপোক্ত। তাছাড়া মাঝিও পোক্ত। নৌকো স্যার ওর কথায় ওঠবোস করে। বানভরা নদীকে তোয়াক্কাই করে না কালীপদ। এছাড়া সুরেশ আছে, জগদীশ, প্রকাশ, হরি, ভব ... বিস্তারিত খবর জানিয়ে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল নিত্যানন্দ। ভাবটা এবার – কী করণীয়?
‘বাঃ!’ আদিত্য খুশি – ‘এরা সব কোথায় গেল? নগেন, বীরু আর রজতকে পাঠিয়েছিলাম নৌকোর খোঁজে। ওরা খবর আনল কোনো নৌকোর নাকি ট্রেস নেই। যত্তসব। ভুলভাল খবর।’
‘ওরা স্যার ... ভুল বলেনি। সব মাঝি নৌকো নিয়ে নদীতে নেমে গেছে। ভরা নদী। এন্তার মাছ স্যার। মাছ ধরতে গেছে। সব নৌকো নিয়ে। এখন কোনো মাঝি নৌকো ছাড়বে না। কেউ আসবে না স্যার। কাউকে পাবেন না। নিত্যানন্দ খবরের অন্তিমলগ্নে পৌছে শ্বাস ফেলল।
আদিত্য অবাক হয়ে ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন অফিসার সুব্রত দেবের দিকে তাকাল। সুব্রত তাড়াতাড়ি চোখ ঘুরিয়ে নিল। এই শহরে জয়েন্ট বিডিও হয়ে এসেছে আদিত্য। প্রথম প্রথম নাস্তানাবুদ অবস্থা হয়। সুব্রত মনে মনে হাসছিল। দায়িত্বটা আসলে আদিত্যর ঘাড়ে এসে পড়েছে। সুমনের বিয়ে বলে ছুটি নিয়েছে ও। আদিত্য এখন ব্লকের অ্যাডিশনাল চার্জে রয়েছে। ব্লক অফিসারের দায়িত্ব অনেক। ব্লকে ব্লকে দৌড়তে হয়। বেচারা আদিত্য এখন কূল পাচ্ছে না।
‘এ তো মহা ঝামেলার কথা! এই বলছ ভালো ভালো নৌকো আছে, মাঝি আছে! আবার বলছ ... নেই! কী করা যায় শুভাশিসদা? আপনাদের এক্সপেরিয়ন্স আছে! বলুন। শলা দিন।’ উম্মা লুকোতে পারছিল না আদিত্য।
নিত্যানন্দ ভয়ে ভয়ে বলে – ‘স্যার, মাছ বেচে অনেক পয়সা পাওয়া যাবে। শুদুমুদু কেনই বা নৌকো দেবে বলুন?
নিত্যানন্দের মধ্যে মাঝিদের পক্ষ টেনে কথা বলার ঝোঁকটা খেয়াল করেছিল আদিত্য। ও চেপে ধরল ‘কালীপদ, সুরেশ ... আর কী কী নাম বললে ... ওরা কে হয় তোমার? শালা? ভগনিপতি?’
‘সম্বন্ধী স্যার! ওই সুরেশ!’ থতমত খায় নিত্যানন্দ।
‘আরে, আমরা কি পয়সা দেব না বলেছি? পয়সা দেব। খবরটা ওদের কানে পৌছে দাও। সেলফোন আছে তো? দাও, দাও। এখনই খবর দাও। পয়সার গন্ধ বড্ড মিষ্টি। মাঝি মানে মাছি, ঠিক চলে আসবে।’ আদিত্য সামান্য ব্যঙ্গ মিশিয়ে বুঝিয়ে বলে। এবারে নিত্যানন্দ কফিনে শেষ পেরেকটা পোতে — ‘স্যার জলে গেলে কেউ ফোন নিয়ে যায় না স্যার। সেবার ফোনে জল ঢুকে যা তা দশা। পরে আবার ফোন কিনতে হল। সেকেন্ড হ্যান্ড। সিম –’
‘ছাড়ো।’ প্রায় চেঁচিয়ে ওকে থামাল আদিত্য–‘খবর ঠিক পৌছে যাবে। তোমাদের চিনি। খবর পৌছে দেওয়ার লোক আছে ঠিক।’
বেজার মুখে চলে গেল নিত্যানন্দ। হালভাঙা নৌকোর মতো মুখ করে জানলা দিয়ে আকাশ দেখল আদিত্য। নিশির ডাকের মতো কানে আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির শব্দ। আঁশটে গন্ধে ভরে আছে বাতাস। বন্যার জল শহরে ঢুকে পড়েছে। নদীপথ একাকার। গাড়ি নিয়ে বেশি দূর যাওয়াও যাবে না। এদিকে আসল কথা হল মাঝিরা যে যার নৌকো নিয়ে লুকিয়ে পড়েছে। থানার ওসি শুভেন্দু বিকাশ সকালে ফোন করেছিল। ওর সেপাইরা নাকি চিরুনি তল্লাশি চালিয়েও মাঝি বা নৌকোর খোঁজ পায়নি। সব হাওয়ায় মানে জলে মিশে গেছে। অগত্যা ভরসা আদিত্য।
‘ধ্যার।’ বিরক্তি লুকোতে পারে না আদিত্য। লোকাল থানার ওসি যেটা পারছে না, আদিত্য সেখানে কী করে...? ব্লক অফিসের বারান্দায় নগেন বসেছিল। আদিত্যকে দেখে কাঁচুমাচু মুখে উঠে দাঁড়াল। ওর মুখের রেখা দেখেই শুভেন্দুবিকাশ অবস্থাটা ভালো বুঝতে পারছিল। বলল – ‘আমার তালপাতার সেপাইরা একটা নিউজ এনেছে। কালীপদ মোহন্ত নাকি এখনও নৌকো নিয়ে বের হয়নি। নৌকোসমেত লুকিয়ে আছে। ওটাকে ধরার জন্য জাল ফেলতে হবে।’ শুভেন্দুর হাসিতে খিকখিক শব্দ হয় না। বেশ একটা গাম্ভীর্য মিশিয়ে হাসে। লোকটার স্বভাবটা হল ধর তক্তা মার পেরেক টাইপের।
ফোন অফ করেও নৌকো এবং কালীপদ ব্রেনের পুরোটা জুড়ে চমৎকার বসে পড়ল। ‘ধরে আন চোর।’ বললে হয়? ধরবেটা কী করে? এলাকার ঘাঁতঘোতগুলো কালীপদরা। যতটা চেনে, আদিত্য কি চেনে? কোথায় কোন গর্তে গিয়ে। লুকিয়ে আছে কালীপদ, খুঁচিয়ে বের করতে হেতালের লাঠি চাই। আদিত্য বুঝতে পারছিল যে কেবল কালীপদই নয়। আরও দু-চারজনও আছে লুকিয়ে। সবাই বেরিয়ে পড়েনি। গর্তে ঢুকে আছে। কিংবা কে জানে আদিত্যদের হাত এড়াতে সত্যি চলে গেছে জলে। এখন জলই ভরসা ওদের। জলেই বাণিজ্য। জলেই প্রাণরক্ষা। ঘরসংসারও জলেই।
লম্বা বারান্দায় বৃষ্টির ছাঁট আসছিল। নিত্যানন্দ ভিজে চুপ্পস হয়ে হাজির। চোখে মুখে উত্তেজনা।
‘স্যার, কালীপদ নৌকো নিয়ে খাড়ির ভেতরে লুকিয়ে আছে। এইমাত্তর খবর পেলাম। বউ বাচ্চা সব নাকি রেললাইনে উঠে গেছে।’
আদিত্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ‘আচ্ছা। মজা দেখাচ্ছি ব্যাটাকে। যখন গারদে ঢুকবে, বুঝবে।’
মিনিট দশেকের মধ্যে হই হই করে বেরিয়ে পড়ল ওরা। ওসি শুভেন্দুর শালা এসেছে কোয়ার্টারে। ব্যস্ত ছিল শুভেন্দু। ফোনে ওর সঙ্গে কথা বলতে বলতে ঘরোয়া কথা কানে এল। আদিত্যর। ‘দেরি হতে পারে বুঝলে?... বিশেষ কাজ... দাদাকে বলো প্লিইজ ...।’ মাখম মাখম গলা শুনে বোঝা গেল বউ-এর দিকে ওসির জোড়া ভ্রূ সাংঘাতিক ওঠানামা করছে। এই সংকট মুহূর্তেও হাসি পেল আদিত্যর। দারোগার উপরেও যে দারোগা আছে, কথাটা মিথ্যে নয়।
একইসঙ্গে রওনা হল ওরা। ঝুলকালিমাখা আকাশ ঝুলে আছে মাথার উপরে। বাতাসে জলের সোঁদা গন্ধ। নদীর সঙ্গে মিশে মিলে এক হয়ে গিয়ে আদিম উচ্ছাসে ছলছল করছে রাস্তা। গাড়ির চাকা একসময় ডুবে যাচ্ছিল। ড্রাইভার সুভাষ জানিয়ে দিল গাড়ি আর যাবে না। আর এগোনো বিপজ্জনক। জল যেভাবে বাড়ছে, গাড়ি ডুবে যেতে পারে। আদিত্য বাইরে ঝুঁকে গাড়ির চাকা ডুবিয়ে দেওয়া জলকে দেখার চেষ্টা করল। দেখতে দেখতে ভুরু কুঁচকে উঠল ওর। সুভাষ ভুল বলেনি।
‘বোঝা যাচ্ছে না স্যার। রাস্তা আর নদীর মধ্যে কোনো ফারাক নেই স্যার।’ সুভাষ বিপন্ন চোখে সামনের দিকে তাকাল। সব এক। একাকার।
‘আমরা এখানেই নেমে যাই চলুন।’ শুভেন্দু ইশারায় গাড়ি পিছিয়ে নিতে বলে সুভাষকে।
‘আমরা নেমে যাব কোথায়? কালীপদ লুকিয়ে আছে বংশীহারির খালের মধ্যে কোথায় কে জানে! ওকে খুঁজতে কি জলে নেমে যাব? আদিত্য শুভেন্দুকে লক্ষ্য করে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয়। নিত্যানন্দ পেছনে বসে ঝিমোচ্ছে। কথাবার্তায় সজাগ হল – ‘স্যার, বংশীহারির খালের ভিতরে যাওয়া খুব মুশকিল। প্যাঁচালো জায়গা। যে কখনো যায়নি, সে চিনবেই না।’
ঠিক কথা। সরু সরু গলির মতো খাল। নালা বলাই ভালো। ঝোপে ঝাড়ে জলে সে এক রহস্যময় অন্ধকার জগত। যেন পাতালের রাস্তা।
নিত্যানন্দও নগেনের মতো ভগ্নদূতের কাজ করছিল। উৎসাহ দেওয়া দূর, কেবল হতোদ্যম করতে থাকে – ‘তাছাড়া স্যার কালীপদ খুব ধূর্ত। ওর শালা হল কেপমার! এখনও জেলে। সেবার –’
হাত তুলে নিত্যানন্দকে থামিয়ে দিল আদিত্য। মুখে কিছু বলল না। এসব স্থানীয় লোককে এই সময়ে চটানো ঠিক হবে না। নিত্যানন্দ ফের মুখ খোলে– ‘নৌকো ঢুকবে পটু হাতে স্যার। ঘুরবেও পটু হাতের প্যাঁচে। তাছাড়া ওখানে যেতে হলে ডিঙি বা ছোটো নৌকো চাই। বাইবে কে? লগি ঠেলা সহজ নাকি? পোক্ত লোক কোথায়?’
অনেক ইনফো দিল নিত্যানন্দ। এগুলোই বা পাচ্ছিল কোথায় আদিত্য? বন্যা পরিস্থিতি দেখে ত্রাণ দেবে সরকার, তার জন্য আজ এই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় পড়তে হল ওদের। কী আর করা যাবে।
এই সময়েই ছেলেটাকে দেখে ফেলল শুভেন্দু। প্রায় চেঁচিয়ে উঠল ও – ‘ওই ছেলেটাকে দেখুন! একটা ডিঙি নিয়ে কী করছে। ওটাকে ধরছি দাঁড়ান।’ আদিত্য অবাক হল। বছর বারো-তেরোর ছেলেটাকে ধরে কী করবে শুভেন্দু?
গাড়ি পিছিয়ে নিতে বলছে শুভেন্দু সুভাষকে। নিত্যানন্দকে নিয়ে সুভাষ চলে যাক বা পিছিয়ে থাকুক কোথাও। এত লোক সঙ্গে থাকলে বাতাস শুকে ধূর্ত কালীপদ ওদের উপস্থিতি সম্পর্কে সজাগ হয়ে যাবে। বরং সুভাষরা ফিরে গিয়ে তৈরি থাকুক। কালীপদকে ধরতে পারলে ফোনে জানিয়ে দেবে। ওরা তখন নৌকো নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে যেন। ব্যবস্থামতো ওরা চলে গেল। শুভেন্দু আদিত্যকে নিয়ে নেমে পড়ল জলে। মুহূর্তে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গেল। জল ঠেলে ওদের এগোতে দেখে লগি হাতে ছেলেটা স্থির হয়ে গেল। বোধ হয় পালানোর উদ্যোগ নেবে কিনা ভাবছে। লগিটা ঝপ্পাস করে জলে ফেলতেই বাজখাই গলায় চেঁচাল শুভেন্দু – ‘অ্যাই - হে-ই...। দাঁড়া দাঁড়া ওখানে ...।’ বলতে বলতে জল ঠেলে লাফিয়ে লাফিয়ে এগোতে থাকল। সঙ্গে সঙ্গে আদিত্যও। জল হাঁটু ছাড়িয়ে উপরে উঠছে।
‘দাঁড়া। এই ধর ... ধর ...।’ বলতে বলতে দু’জনে। ছেলেটাকে ধরে ফেলার ভঙ্গিতে ছুটছিল বলা যায়। ছেলেটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। সেই ফাঁকে ডিঙিটা টেনে ধরল আদিত্য। লাফিয়ে উঠে পড়ল ডিঙিতে। ত্রাস বিস্ফারিত চোখে দু’জন নতুন মানুষকে দেখছিল ছেলেটা। কালো রোগাটে শরীরে একটা ময়লা গেঞ্জি, সস্তার সিন্থেটিক প্যান্ট। ছোটো ছোটো সরু চোখ। একবার আদিত্যকে, একবার শুভেন্দুকে দেখছিল ছেলেটা। দু’জনের উঠে দাঁড়ানোতে ডিঙি প্রবল দুলে উঠল। আরেকটু হলেই জলের ভেতরে উলটে পড়ত ওরা। শুভেন্দু ক্ষিপ্ত হয়ে রিভলবার তাগ করল – ‘কালীপদ মোহন্ত বংশীহারির খালের ভেতরে লুকিয়ে আছে। নিয়ে চল। বারফট্টাই করলে ফটাস দুম করে দেব।’ ঠিক এই সময়ে আকাশ নেমে এল ওদের মাথার উপরে। মেঘের মিছিল তোলপাড় শব্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে নেমে এল। রিভলবার খাপে ঢোকাতে ঢোকাতে জলধারায় সিক্ত শুভেন্দু ঘাই তুলল। ‘কালীপদ যেখানে লুকিয়ে আছে, সেখানে নিয়ে চল। বংশীহারির খাল আমরা চিনি। চালাকি করলে মরবি।’ আদিত্য জানে বংশীহারির খাল ওরা কেউ চেনে না। শুভেন্দু রিভলবার হাতে ফঁকা আওয়াজ করছে।
অবাক ছেলেটার মাথা বুক বেয়ে জল নেমে যাচ্ছে কোন মহাসাগরের দিকে। উথাল পাথাল নদীতে যেন জোয়ার এসেছে। প্রবল দুলছে ডিঙিটা। দুলতে দুলতে ঘুরে গেল ডিঙি। জল তখন হুংকার দিচ্ছে। বৃষ্টির প্রাবল্যে ডিঙিটা। একধারে কাত হতেই শুভেন্দু চেঁচাল – ‘অ্যাই ... অ্যাই দেখে চালা।’ বৃষ্টির তোড় একটু কমতেই শুরু হল তীব্র হাওয়া। হাওয়ার দমকে ডিঙি একবার এদিকে, একবার ওদিকে কাত হয়ে যাচ্ছে। ফের তুমুল বৃষ্টি দৌড়ে আসছে দশদিক ঝাপসা করে দিয়ে। দিনে দুপুরে সব আঁধার করে এল।
অসীম জলরাশি চামুণ্ডা নৃত্য করছিল। টালমাটাল ডিঙিটাকে বাঁচাতে চেষ্টা করছিল ছেলেটা। প্রাণপণে দাঁড় টানছে। সরু বুক ওঠানামা করছে। মত্ত জলরাশির মতো। প্রতিপক্ষর সঙ্গে এটুকু ছেলে লড়বে কী করে? দেখে শুনে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিল আদিত্য। কোনো দিন সাঁতার শেখার কথা ভাবেইনি ও। জীবন মরণ নির্ভর করছে একফোটা একটা জীবের ওপর। ডিঙির মধ্যে প্রায় গড়াগড়ি খাচ্ছে শুভেন্দু আর আদিত্য। মাতাল ডিঙিটা ঠিকঠাক বসতে দিচ্ছে না। ডিঙি কখনো ঢেউয়ের উপর, কখনো নীচে আছড়ে পড়ছে। দাঁড় মাঝে মাঝে জলের নাগালই পাচ্ছে না। জলের ভয়াল গর্জন, মেঘের হুংকার, আদিত্য ও শুভেন্দুর তারস্বরে চেঁচামেচি ‘সামলে চালা ... এই তোর ডিঙি বাওয়া গাধা দাঁড় ফেলে দে ...’ মাঝে মাঝে হুড়মুড় বৃষ্টি ... সবটা মিলে সে এক অস্থির সময় বয়ে যাচ্ছিল ধূর্ত উদ্দেশ্যর উদ্দেশ্যে। যখনই সঠিক পজিশনে বসতে পাচ্ছে শুভেন্দু, তখনই রিভলবার তাক করে আছে ছেলেটার দিকে। ভিজে জুব্বুস সবাই। একা হাতে লড়ছে ছেলেটা। শুভেন্দু আদিত্যর দিকে তাকাল। ইশারায় রিভলভার দেখাল। অর্থাৎ এটার ভয়েই কাজ হচ্ছে। এই সময়ে ডিঙি এমনভাবে কাত হল যেন অতলে তলিয়ে যাবে। আদিত্য ছেলেটাকে সাহায্য করতে চেয়ে উঠে দাঁড়াতে গেল। টাল সামলাতে না পেরে উলটে পড়ল। ছেলেটা কচি গলায় চেঁচিয়ে ধমক দিল – ‘নইড়েন না।’ একটা থালা ওদের ডিঙির পাশ কাটিয়ে স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছিল। হয়তো খাদ্যের অভাবে থালার আর প্রয়োজন নেই বলে কেউ ভাসিয়ে দিয়েছে থালাটিকে। ফের ডিঙিটা টাল খেতে ধমক দেবে বলে হাঁ করতেই থেমে গেল আদিত্য। ভারি অন্যমনে ভেসে যাওয়া থালাটা দেখছে ছেলেটা। থালাটা কি ওদের? ওকি সেটাই ভাবছে? আদিত্যর ভুরু সোজা হতে হতে থালাটা খুঁজল। ওটা ততক্ষণে অনেক দুরে ভেসে যাচ্ছে ...।
কতক্ষণ এই তাণ্ডব চলল কে জানে! একসময়ে রণেভঙ্গ দিল প্রকৃতি। পাক খাইয়ে খাইয়ে ডিঙিটাকে সরু একটা খালের মুখে নিয়ে এল ছেলেটা? একটা খাড়ি দেখা যাচ্ছে। ছেলেটা জলে নেমে গেল। ডিঙিটাকে খালের মধ্যে ঢোকাতে চেষ্টা করছিল ঠেলে ঠেলে। কোনোক্রমে কায়দামতো এনে উঠে পড়ল ছেলেটা ডিঙিতে। তারপর দাঁড় টেনে টেনে খালের ভেতরের ঝোপঝাড় সমন্বিত অন্ধকার আদিম অঞ্চলে নিয়ে এল। দাঁড় সাবধানে জলে নামাচ্ছিল ও। আদিত্য দেখল সেই অন্ধকার জায়গায় একটা নৌকোর খানিকটা দেখা যাচ্ছে। আদিত্য-শুভেন্দু একসঙ্গে গর্জন করে উঠল। ‘কালীপদ! বেরিয়ে এসো! নয়তো গুলি করব।’
ঝোপঝাড় নড়ে উঠল। জলকাদার ভেতর থেকে জলে ভেজা শুকনো চেহারার চৌকো চোয়াল লোকটা বের হয়ে এল। হাতজোড় করা – ‘ছাইড়া দেন সাহেব!’
ভারি ধূর্ত চেহারার কোনো লোক হবে কালীপদ, ভেবেছিল আদিত্য। ভাবনার সঙ্গে মিলল না। খুব নিরীহ চেহারার লোকটার পরনে ভাঁজ করে পরা লুঙি। সরু সরু ঠ্যাং। পায়ের মোটা শিরাগুলো ফুলে আছে। পেটটা ঢুকে আছে ভেতরে যেন প্রাণায়াম করছে।
‘কালীপদ মোহন্ত, তোমাকে অ্যারেস্ট করা হল এবং তোমার নৌকো সরকারি কাজের জন্য রিকুইজিশন করে দেওয়া হল।’ শুভেন্দু ফের ডাঙা খুঁজে পেয়েছে।
একসময় ওরা কালীপদর নৌকোয় উঠে বসল। ফোনে সুভাষকে জানিয়ে দেওয়া হল নৌকো পাওয়া গেছে। ব্লক অপিসে খবর দিয়ে একটা ট্রাকের ব্যবস্থা করতে বলা হল। কালীপদ শুদ্ধ নৌকো নিয়ে যেতে হবে। ডি এম এবার বন্যা পরিস্থিতি দেখতে পাবেন। আর অসুবিধে নেই।
সব মিটল একে একে। ট্রাক এল। চলেও গেল কালীপদ আর নৌকোটাকে নিয়ে জল ঠেলে ঠেলে। শুভেন্দু আর আদিত্য সুভাষের গাড়িতে উঠবে বলে এগোচ্ছে। দু’জনে দু’জনের চেহারা দেখে নিজের অবস্থা বুঝতে পারছিল। আদিত্য বলল, ‘ভীষণ ভয় করছিল। সাঁতার জানি না। তবে আপনি ছিলেন ... এই ভরসা।’
শুভেন্দু গলা নামাল – ‘আমিও সাঁতার জানি না। আমি আপনাকেই ভরসা করেছিলাম। কী হত বলুন তো! বাপরে। যা গেল।’ দু’জনে একইসঙ্গে ঘাড় ঘুরিয়ে খাঁড়ির দিকে তাকাল। ডিঙির উপর দাঁড়িয়ে রোগা ছেলেটা ওদের দেখছে। হঠাৎই আদিত্যর মনে হল ছেলেটা কি কালীপদকে আগে থেকেই চেনে? এমন যদি হত ছেলেটা কালীপদর ছেলে, তাহলে কি ও ধরিয়ে দিতে চাইত কালীপদকে?
খাপে ঢাকা রিভলবারটা অস্বস্তিতে ফেলছিল শুভেন্দুকে। আদিত্যর দিকে তাকিয়ে দেখল আদিত্য পেছন ফিরে ছেলেটাকে দেখছে। - ‘কী হল?’ শুভেন্দু চাপা গলায় জানতে চায়।
‘কিছু না।’ বলে আদিত্য চুপচাপ হাঁটতে থাকে। ছেলেটাকে কি কিছু টাকা দেওয়া উচিত ছিল?
শুভেন্দু কিন্তু কিন্তু করছিল – ‘জানেন, মনে হচ্ছে ছেলেটার মাথার চারপাশে জ্যোর্তিবলয় দেখতে পাচ্ছি। হাসছেন? বিশ্বাস করুন, এমন কখনো হয়নি। ও না থাকলে ..., কী অদ্ভুত ক্ষমতা ভাবুন? যেন সত্যি জলের ঈশ্বর। জলদেব। জল নিয়ে জাস্ট খেলা করে গেল মাত্র।’
আদিত্য হাসেনি শুভেন্দুর কথায়। ও-ও দেখতে পেয়েছে সেই জ্যোর্তিবলয়। জলের মধ্যে, উত্তাল জলরাশির মধ্যে ছেলেটা যখন ডিঙি সামলাচ্ছিল তখন ও ছেলেটার চারপাশেই জ্যোতি দেখতে পেয়েছিল যেন। বললে শুভেন্দুই হয়তো হাসবে।
পকেটে হাত ঢোকাল আদিত্য। মানিব্যাগ টেনে বের করতে গিয়েও থেমে গেল। সারাক্ষণ বড় ছোটো হয়েই ছিল আজ। আর ছোটো হতে পারবে না। এইটুকু ছেলে এত বড়ো লোকগুলোকে কেমন পুতুল বানিয়ে ছেড়ে দিল! রিভলবারকে ভয় পেয়ে নয়, নিজের সঙ্গেই লড়াই ছিল ওর। বোধ হয়। ভয় পেলে ধমক দিতে পারত? – ‘নইড়েন না’! শব্দটা এখনও কানে বাজছে।
শ্বাস ফেলে আদিত্য - চলুন।
একটা সিলুট মূর্তি জলের উপর ডিঙিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়েও দেখতে পেল আদিত্য সেই মূর্তির মাথার চারপাশে সূর্যকিরণের মতো ছটা। হাতে দাঁড়। চোখে বরাভয়। এই সময়ে শুভাশিসদাকে মনে পড়ল ওর। অলৌকিক দৃশ্য টৃশ্য সাধারণত শুভাশিসদারই দেখার কথা। অথচ আজ ...!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন