ঊরুভঙ্গ

সাগরিকা রায়

রাত আটটা নাগাদ খবরটা পেলেন। প্রদীপ্ত তখন মহাভারত খুলে ধৃতরাষ্ট্রের বিলাপ অংশ পড়ছেন। কুরুক্ষেত্র-যুদ্ধে একে একে পুত্রদের মৃত্যু সংবাদ আসছে। কেবল দুর্যোধন বাকি। তিনি ভীমের ভয়ে দ্বৈপায়ন হ্রদে গিয়ে লুকিয়েছেন। সেখানে গিয়ে চাতুরি করে পান্ডবরা দুর্যোধনকে যুদ্ধ করতে বাধ্য করেন। ভীম গদা দিয়ে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করেন। দ্রোণপুত্র অশ্বত্থামার সেই দৃশ্য অসহ্য হওয়ায় গভীর রাতে ঘুমন্ত পান্ডব–ভ্রমে তাঁদের পাঁচ পুত্রের মুন্ড কেটে নিয়ে এসে দুর্যোধনকে দেয়। এই ভ্রম দুর্যোধন বুঝতে পারেন। বিষাদে তাঁর মৃত্যু হয়। এই পর্যন্ত পড়েছেন, ঠিক এই সময় সেলফোন বেজে ওঠে। মেয়ে ভুমি ফোন করেছে। সে এখন মুম্বইতে। বলছে, অহমের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়, ও ডিসিশন নিয়ে নিয়েছে।

কিছুই জানতে চাওয়া হল না, ভূতাবিষ্টের মত বসেছিলেন প্রদীপ্ত। ডোরবেল বেজে উঠতেই সমে ফিরলেন। রোদের তাপ আজ চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাস্তায় লোক চলাচল কম। এসময় কে এল? সমর কি? রিটায়ার করার পর আসে মাঝে মাঝে। গল্প স্বল্প করে। ফের চলে যায়। আবার একা হয়ে পড়েন প্রদীপ্ত। মিতা বহুদিন হল গত হয়েছে। থাকার মধ্যে এই বাড়ি, ব্যাঙ্কে কিছু টাকা, মোটামুটি ভাল একটা পেনশন। একটি মাত্র সন্তান ভূমিকে বিয়ে দিয়েছেন এন আই এফ টির স্নাতক অহমের সঙ্গে। বিয়ের আগেই ওরা এক সঙ্গে কাজ করেছে। সম্পর্ক গভীর হতেই প্রদীপ্ত দেরি করেননি। গাঁটছড়া বেঁধে দিয়েছেন দুজনের। ভূমি ফ্যাশন দুনিয়ার পরিচিত মুখ। কাজ করছে সেরা ডিজাইনারদের সঙ্গেও। কর্মদক্ষতা ও এক্সপিরিয়েন্সের সুবাদে মডেলিং জগতের শিরোনামে উঠে আসছে ও। মাঝে কিছুদিনি প্যারিস ঘুরে এসেছে। ফিরে এসে সে কি হাসি – ‘বাবা জান, ওখানকার ফ্যাশন ডিজাইনাররা আমার এজ ত্রিশ শুনে অবাক!’

‘ভেবেছিল ঊনিশ। তবে ইন্ডিয়ান ডিজাইনাররা কিন্তু শারীরিক ফিটনেস আর সুন্দর মুখ হলে সার্কিটে রেখে দেয়। দেখছ না রানি মেনন, মালবী সেন ... এখনও কাজ করছেন!’ প্রদীপ্ত এসব বোঝেন না। তিনি শুধু জানেন যে অহম আর ভূমি হল স্বপ্নের জুটি। যখন ওরা একসঙ্গে কাজ করে, দেখে মনে হয় দুটো গভীর বাঁধনে বাঁধা মানুষ। মনে আছে, প্রথম শো-এর দিন ভূমির কী উৎসাহ। শো শুরু হল অহমের বাছাই করা ছয়টি পোশাক নিয়ে। তাতে ছিল থ্রিডি ফোল্ড টাই আপ ড্রেস, ক্রপড পাতিওয়ালা সেলফি আর বিকারস অফ ব্লাড প্রিন্ট ... অহমের নানা সিগনেচার সমেত আইটেম। ব্যস্ত উত্তর কলকাতার রাস্তায় পুরনো ভিড়ে ঠাসা মেছুয়া ফলপট্টি ছিল ওদের প্রথম গন্তব্য। আজ এই জুটির একজন, তাঁরই কন্যা ভূমি জানিয়েছে, জুটিটা ভেঙ্গে গেছে। পরিনত কাপুরের সঙ্গে নেক্সট উইকে বিদেশ যাচ্ছে ও। এখন থেকে পরিনতর সঙ্গেই কাজ করবে। ফোনের ভেতরে ভূমির স্বরটা কঠিন মনে হয়েছিল। যেন নিজেকে ধরা দিতে চাচ্ছে না সরাসরি, একটু লুকিয়ে ফেলতে চাইছে! কেন? অহমকে কি একটা ফোন করবেন?

ফের ডোর বেল বাজছে। সমর এলে ভাল হয়। দরজা খুলে সমরকে দেখে খুশি হলেন। হাসলেন। তারপরেই মনে হল কয়েকঘন্টা পর যেন হাসলেন। তবে, মুখের রেখায় দুশ্চিন্তার ছাপ দেখে ফেলেছেন সমর। উদ্বিগ্ন হলেন – ‘শরীর ভাল তো?’ ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাতে দ্বিধা হল। শরীর কি সত্যি ভাল?

-‘ভাল নয়, মন ভাল নেই ভাই। ভূমি-অহমের বিচ্ছেদ হয়ে গেল হয়তো!’ ভেঙ্গে যাওয়ার শব্দটা কী যে অসহ! চোখ বুজে ফেললেন প্রদীপ্ত। কী অবলীলায় ভূমি বলল –‘আমি অহমের থেকে দূরে চলে যাচ্ছি বাবা। সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার একার নয়। আমি কেরিয়ার ছাড়তে পারব না। অহম আমাকে দাবিয়ে রাখতে চায়। এত স্পর্ধা ওর হয় কী করে? ... খবরটা তোমাকে জানিয়ে রাখলাম।’ এখন ভূমি যে জায়গায় চলে গেছে, অহম ওকে দাবিয়ে রাখে কী বলে? প্রদীপ্ত অবাক হন। কিন্তু, টোটাল বিষয়টা কি ভাল হল? ভূমি কি অহমকে ছেড়ে ভাল থাকবে? সমর সবটা শুনলেন। প্রদীপ্তর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে হয়তো একজন বাবার অন্তরের ডাক শুনতে চাইলেন।

একটা কথা, অহম দাবিয়ে রাখতে চেয়েছে ভূমিকে, এর মানেটা কী? ভূমি কি অন্য কোন মডেল এজেন্সিতে যোগ দিয়েছে? সেটাই কি অহমের বিরক্তির কারণ? ভূমি বিদেশ যাচ্ছে, অহম যাচ্ছে না কেন?

ভাবনায় পড়ে গেলেন প্রদীপ্ত। দাবিয়ে রাখা শব্দটা ক্রোধের জন্ম দিচ্ছে ভেতরে ভেতরে। তাঁর সফল কন্যাকে দাবিয়ে রেখে অহম নিজের পৌরুষ ফলাতে শুরু করেছে? অথচ অহমকে মেল শভিনিস্ট বলে কখনও ভাবেননি প্রদীপ্ত। কার ভেতরে কী থাকে বাইরে থেকে কি বোঝা যায়? ভূমি কেন এসব মেনে নেবে?

আলোচনা হল দুই বন্ধুতে। সমর বুঝিয়ে বললেন – ‘তুমি মেয়ের কথা শুনেছ। এবার অহমের কথা শোন। ওর কিছু বলার থাকতে পারে। বিচার নিরপেক্ষ হোক, সেটা তুমি চাও কিনা বল?’

-‘বলছ?’ প্রদীপ্ত দাঁড়ে ডাঙ্গার ঠিকানা পাওয়ার চেষ্টা করেন।

-‘বলছি। একতরফা শুনে কারও বিচার করো না। হতে পারে অহম সম্পর্কে ইতি টেনেছে ইগো থেকে। আবার ভূমি হয়তো কেরিয়ারকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে! বা, এক্সট্রা ম্যারিটাল রিলেশনে জড়িয়ে পড়েছে কেউ। দেখছি তো! ইদানিং নানারকম রিলেশন তৈরি হচ্ছে, যার কোন নাম নেই।’

ভয় হয় প্রদীপ্তর। সম্পর্কের এত উপপথ ধরে কোথায় পৌছতে চাচ্ছে মানুষ? সমর ঠিকই বলছে। মোহাচ্ছন্ন হওয়া তাঁর সাজে না। কন্যাপ্রীতি যেন অন্ধ করতে না পারে।

রাতে শুতে গিয়ে সব ছাপিয়ে দুটো শব্দ কানের ভেতরে খলবল করে। প্রথমে ভেবেছিলেন স্নানের সময় জল ঢুকে গেছে কানে। কিন্তু জল কথা বলে কেন? ‘দাবিয়ে রাখে’, ‘দাবিয়ে রাখে’ ... !

ঘুম হল না। সকাল সকাল স্নান সেরে দুটো মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়লেন প্রদীপ্ত। নিজের চোখে সবটা দেখেশুনে নেওয়া যাক। ভূমিকে অনেক যত্নে মানুষ করেছেন। এমন শিক্ষা দেননি যে সে স্বার্থপর হয়ে সংসার ত্যাগ করবে। তাছাড়া অহমকেই বা কতখানি চিনেছেন? সে ভূমিকে দাবিয়ে রাখতে চায় কেন? ইগোর কথা বলছিল সমর। সোজা কথা হল অহমের পৌরুষে ঘা লেগেছে। হিংসে! এই লড়াই কত সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছে। কুরু পান্ডবদের মধ্যেও এই সমস্যা ছিল। সব শেষ হল যাদব বংশ ধ্বংস দিয়ে। বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী - দিয়ে শুরু হয়েছিল যে পর্ব, তার সমাপ্তি হল হাহাকারে! আত্মকলহ হল মুল কথা হে কৃষ্ণ! দুটো জীবন এইভাবেই শেষ হয়ে গেল! এর দায়িত্ব একজনকে নিতে হবে। কে সেই বিচ্ছিনতাবাদী! একজন অভিজ্ঞ মানুষ ছাড়া তার সন্ধানে কে আর যেতে পারে?

বেরিয়ে পড়েছেন গান্ধারী। যুদ্ধে হত শত শত দেহ দেখে সনাক্ত করছেন পুত্রদের, অভিশাপ দিচ্ছেন কৃষ্ণকে। কিন্তু কৃষ্ণ কি দায়ী? দায়ী ছিল আত্মকলহ, যার বীজ অনেক আগে প্রোথিত হয়েছিল। গান্ধারী অন্ধ না হয়েও অন্ধ ছিলেন। স্নেহই কি এর কারন?

বালিগঞ্জ প্লেসে অহমের ফ্ল্যাট পনেরশো স্কোয়ার ফিটের। দুজনে মিলে একদিন সাজিয়েছিল। ঘরগুলোতে রঙের অসাধারন কম্বিনেশন। ফলস সিলিঙ্গের নিচে ওদের একান্ত আড্ডাঘর দেখার মত। দেখে প্রদীপ্তর মনে হয়েছিল, কি করলেন এতদিন! নিজের জন্য এভাবে কেন ভাবেননি! ... ফোনটা আসার এক সেকেন্ড আগেও এই সিচুয়েশনে পড়তে হবে, সেটাও কি ভাবতে পেরেছিলেন প্রদীপ্ত? সমর যখন বলছে, একবার সামনাসামনি হতে হবে অহমের। মেয়েটা বিনা বিচারে যেন শাস্তি না পায়...!

অহম ফোন রিসিভ করল। খুব শান্ত ভাবে জানাল, ‘ ভূমি যা বলেছে, সব সত্যি। ভূমি মুম্বই চলে গেছে। ওখানে অহমের বন্ধু ফ্যাশন ডিজাইনার দেবদাসের সঙ্গে কাজ করবে। এটা ভূমির চয়েস। ও কার সঙ্গে কাজ করবে সেটা ও ঠিক করবে, ডিসিশনটা ওর। এর মধ্যে আর কোন কথা নেই।’

প্রদীপ্ত অবাক হলেন – ‘তাহলে পরিণত কাপুরের কথা ভূমি বলল কেন?’

- ‘কাপুরের সঙ্গে ডিলটা ক্যানসেল হয়ে গেছে।’ আগের মত শান্ত স্বর অহমের।

প্রদীপ্ত চমকে গেলেন। হচ্ছেটা কী এযুগে! বউ অন্যের সঙ্গে চলে গেছে, ধরে এনে চাবকা, তা নয়, শান্ত ভদ্র ভাবে সেকথা জানাচ্ছে শ্বশুরকে। এই শীতল সম্পর্কের কোন শিকড় নেই? নাকি ছিলই না কোনদিন?

‘মুখোমুখি হও জামাইএর। এমন কি হল যে ভূমি এমন ডিসিশন নিতে বাধ্য হল! আমি কিন্তু ব্যাপার ভাল বুঝছি না। অহম একটু বেশি শান্তভাবে বিষয়টা নিয়েছে, এটা নিয়ে ভেবেছ? সন্দেহ হচ্ছে, ও নিজে কোন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েনি তো! হয়তো ভূমির চলে যাওয়া ওর কাছে শাপে বর হয়েছে!...ইদানিং বোল্ড রিলেশন তৈরি হয়েছে জানো? কোন এক কাপুরকে ধরে ফের কোন এক দেবদাসে মজে গেল মন। ভাব।’ সমর সম্পর্কের কাঁটাছেঁড়া করেন। সমরকে আজ মনে হচ্ছে মোহভঙ্গকারী এক পুরুষ। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে বিবদমান স্বজনদের বধ করতে হবে জেনে অর্জুন মোহজালে আবদ্ধ হয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ পাশে থেকে সেই জাল ছিন্ন করেছিলেন। কথাটা ভাল বলেছেন সমর। ভূমির উচ্চাকাঙ্খা আছে বলে তাকেই দোষী ঠাওরানো উচিত হচ্ছেনা। অহম কি কেরিয়ারিস্ট নয়? না, না, তিনি বাবা হয়ে পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারেন না! ভূমি বা অহম, দুজনেই তাঁর সন্তানসম। বিচার যথার্থ হতে হবে।

শিলিগুড়ি থেকে বালিগঞ্জ প্লেসে পৌছতে বেশি সময় লাগল না। সারারাত ঘুম হয়নি। নানাবিধ চিন্তায় পাগল পাগল দশা। একটা একটা করে পয়েন্ট সাজিয়েছেন প্রদীপ্ত। এত ভালবাসাবাসি ঘৃণায় পরিণত হল কেন? কেনই বা অহমকে ছেড়ে কাপুরের পেছনে ছুটল ভূমি? ফের দেবদাস এসে গেল কোন পথে? কলকাতা ছেড়ে মুম্বই চলে গেল ভূমি? মাঝখানে একটা বিরাট প্রশ্নচিহ্ন উঁকি দিচ্ছে। ভূমি তাঁকে সবটা বলেছে বলেই মনে হচ্ছে। বাকি প্রশ্নের জবাব দিতে হবে অহমকে। তেমন হলে কেস ঠুকতে দেরি করবেন না প্রদীপ্ত। ঘানি ঘুরিয়ে ছাড়বেন। কিসের জামাই? মেয়েকে যে সুখ দিতে পারলনা, তার সঙ্গে রিলেশনই বা কি? প্রদীপ্ত টের পেলেন এক অদ্ভূত জ্বালায় জ্বলে যাচ্ছেন। সমাজ বলবে ভূমি এক কথায় কুলত্যাগ করেছে। সোজা ভাষায় সেটাই বোঝায়। তিনি কি শিক্ষা দিতে পারেননি মেয়েকে? অথবা, তিনি কি কোথাও ভুল করছেন? ভূমি কি সেই ধাঁচের মেয়ে? এমন হতে পারে, মেয়ে হয়ে বাবার কাছে বিশদে বলতে পারছে না! সহ্য করতে করতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল! ওর মা বেঁচে থাকলে যে স্টেপ নিতে পারত, বাবা বলে কি তিনি পিছিয়ে যাবেন!

পারিজাত এপার্টমেন্টের চারশ তিন নাম্বার ফ্ল্যাট অহমের। লিফটে উঠে বোতামে হাত রাখতেই ভূমির মুখ মনে হল। আজ ওই ফ্ল্যাটে তাঁর মেয়ে নেই! অহম প্রদীপ্তর কেউ নয়। যে পুরুষ তার নারীকে আলো বাতাস থেকে দূরে রাখে, দাবিয়ে রাখে স্বাধীনতা থেকে তাকে কী বলবেন প্রদীপ্ত? এখানে আসার আগে একবার ভূমির সাথে কথা বলে নেওয়া উচিত ছিল। অথচ ... কি বা বলতেন! ভুমি নিজের কাজের পরিধি বাড়াতে চেয়েছিল হয়তো, অহমের পুরুষকারে সেটাই বিষ হয়ে দাঁড়াল! ফ্ল্যাটের দরজায় এখনও ওদের নেমপ্লেট রয়েছে। এই সেদিনও কত উচ্ছ্বাস দেখেছেন! একে অন্যের পরিপূরক ছিল ওরা। মাত্র সাতমাস আগে অহমের বাছাই করা দশটি পোশাক নিয়ে শুটিং হল। প্রদীপ্ত গিয়েছিলেন উত্তর কলকাতা বনগাঁ, ডায়মন্ড হারবারের নিরালা আর ঘিঞ্জি মেশানো জায়গায় শুটিং দেখতে। ব্যস্ততম ফ্লাইওভারেও শুটিং করেছে ওরা। আবিষ্কারের উল্লাসে ভরপুর ছিল দুজনে। প্রদীপ্ত কপালের ঘাম মোছেন।

দরজার মুখে একটা পেতলের ঘণ্টা ঝুলছে। ভূমির শখ। দরজার ডিজাইন করেছিল অহম। কিন্তু এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন প্রদীপ্ত! ডোরবেলে আঙ্গুল রাখতে ভয় করছিল। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত প্রদীপ্ত। আজ জবাবদিহি করতে হবে অহমকে। মেয়েটার চোখ থেকে ভালবাসা কেড়ে নিয়ে থেঁতলে মেরেছে ও। অতই সহজ বেঁচে যাওয়া? দ্বৈপায়ন হ্রদ থেকে দুর্যোধনকে বের করবেন।

বেল বাজালেন। কে খুলবে দরজা? ভেতরে সুরেলা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। শুনতে পাচ্ছেন প্রদীপ্ত। ... কেউ এলনা। অহম কি নেই এখানে? তবে বলল কেন যে ও এখানেই আছে! হয়তো তখন ছিল! প্রদীপ্ত একবারও বলেননি যে আজ তিনি এখানে আসবেন!

দরজাটা খুলছে যেন! তীব্র বিরাগ নিয়ে তাকিয়ে আছেন প্রদীপ্ত। সুখে ঘর করুক মেয়ে, এটাই চেয়েছিলেন। মেয়ে বেছে নিল অন্যধারার জীবন। কী করা যাবে! যে যার লিপি সঙ্গে করে নিয়ে আসে!

“কাকে চান?” মাঝবয়সি রোগাটে চেহারার মহিলাটিকে দেখে কাজের মাসি বলেই মনে হল। আগে অন্য কেউ ছিল। এই মহিলা প্রদীপ্তকে চেনে না।

“অহম আছে?”

“আছে, ঘুমুচ্ছে। ডাকব?”

প্রদীপ্ত ঘড়ি দেখলেন। বেলা ন’টা বাজে। এখন ঘুম? ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হয়। একটু কড়া হয়ে গেল গলার স্বর – ‘ডাকো। বল, ভূমির বাবা এসেছে।’

মহিলা ভূমিকে চেনে। সন্ত্রস্ত ভঙ্গিতে সরে দাঁড়াল – ‘আসুন বাবু।’

ফ্ল্যাটে ঢুকেই ড্রয়িংরুম। মনের মত করে সাজিয়েছিল ভূমি। এখন ভারি সুনসান। কেউ নেই কোথাও। এলোমেলো, বিশৃঙ্খল সংসার। ভেঙ্গে যাওয়ার পর কাচের বাসন যেমন হয়। সব টুকরোই আছে, কিন্তু পূর্ণ অবয়বে নেই। বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন প্রদীপ্ত। কেমন একটা অশুভ ভাব চারপাশে ছড়িয়ে আছে। অহমের কি এখনো ঘুম ভাঙ্গেনি? নাকি, খোঁয়াড়ি ভাঙ্গতে দেরি হচ্ছে?

গলা শুকিয়ে গিয়েছে। মহিলা এলে একটু জল চাইতেন। ভাবতেই অহম এল। যেন একটি ছায়া মাত্র। যেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হেরে ফেরা সৈনিক! হতবাক হয়ে পড়লেন প্রদীপ্ত। এ কি চেহারা বানিয়েছে অহম! অশান্তির ভূত সব কেড়ে নিয়েছে। একজন সংসার ত্যাগ করেছে, অন্যজন ... কে জানে কী হয়েছে ...।

“বসুন, ভাল তো?” সোফায় বসল অহম। প্রদীপ্ত দেখলেন একজন অবিন্যস্ত মানুষ তাঁর সামনে বসে।

“ভেবেছিলাম তুমি হয়তো ফ্ল্যাটে নেই ...”, কী বলে শুরু করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না প্রদীপ্ত।

“আছি। কোথাও যাচ্ছি না।”

“তোমার শুটিং ...?”

“সব ক্যানসেল করে দিয়েছি। মুড নেই।”

“কেন মুড নেই? তোমরা তো যা করেছ, নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেই করেছ!” একটু ব্যঙ্গ করার লোভ সামলাতে পারলেন না প্রদীপ্ত – “ভূমি একটি কথা বলেছে অবশ্য। তুমি নাকি ওকে দাবিয়ে রাখতে চেয়েছিলে! ‘দাবিয়ে’ শব্দটার মানেটা যদি বুঝিয়ে দাও।”

ভারি ক্লান্ত শ্বাস ফেলল অহম। যেন কথা বলতে ভাল লাগছেনা ওর। মোটেই তেড়ে ফুঁড়ে উঠলনা। শূন্য দৃষ্টিতে দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে ছিল। অরেঞ্জ কালারের দেওয়াল। এই কালার মনকে একনিষ্ঠ করে, বাড়তি এনার্জি দেয়! এই তার নমুনা? অহম অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে, যেন ও হারিয়ে গেছে কোথাও। যেন শরীর- টাকে রেখে পালিয়ে গেছে দূরে...। এই অদ্ভুত দৃষ্টিটা একটা অন্য ছবিকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল। প্রদীপ্তর পিসিমার জামাই অতীন! বউ চলে গিয়েছিল প্রেমিকের সঙ্গে। বিস্তীর্ণ রিক্ত ফসল তুলে ফেলা ক্ষেতের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল অতীন। চুপিসারে পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই তাঁর উপস্থিতি অনুভব করল অতীন। পেছন ফিরে তাকাল। এক অদ্ভুত শূন্যতা ছিল অতীনের চোখে। সে শূন্যতা বুকে এসে আঘাত করে। বলেছিল, “নীপার দোষ নেই। আমি ওর ইচ্ছে পূরণ করতে পারিনি।”

এই সেই দৃষ্টি! অতীনের হাহাকার কেন অহমের চোখে? অহম ভূমির কোন ইচ্ছে পূরণ করতে পারেনি?

“ভূমিকে দোষ দেবেন না। আমি ওর ইচ্ছে পূরণ করতে পারিনি।” অহম চোখ ঘুরিয়ে জানালার বাইরে রেখেছে – “ভূমি সংসার চায়নি। আমি চেয়েছিলাম। বলেছি, এবার আমাদের সন্তান আসুক। কিন্তু, ভূমি বলল কেরিয়ারই ওর সন্তান। আমি একথা মানতে পারিনি। ওর কাছে দুটো বছর চেয়েছিলাম। আবার ফিরে যেত ওর প্রফেশনে। ও মানতে পারেনি। বিশ্বাস করতো একবার ছেড়ে দিলে সে জায়গা অন্যে দখল করে নেয়! শূন্যস্থান পূরণ হয়ে যায়।” সঞ্জয়ের দিব্যদৃষ্টির সুবাদে সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ পাচ্ছিলেন ধৃতরাষ্ট্র। প্রদীপ্ত জানেন যুদ্ধের পর আত্মকলহ শুরু হবে যাদব বংশে। তাতে কেউ বাঁচবে না সমর! অথচ একজনকে যে বাঁচাতেই হবে! কেন যুগের পর যুগ ধ্বংস দেখে যাবেন? ঊরুভঙ্গের কি শেষ নেই? একবার উঠে দাঁড়াও। অন্ধত্ব এবং ঊরুভঙ্গ দশা নিয়েই থাকবেন প্রদীপ্ত? নতুন করে সৃষ্টি করবেন না? আত্মকলহের বাইরে বের হতে হবে দুর্যোধন! নতুন মহাভারত লেখা হোক আজ!

সেই রাগ ক্ষোভকে আর মনের ভেতরে খুঁজে পাচ্ছেন না প্রদীপ্ত। কাজের বউটি কে ডেকে রাঁধতে বললেন। অহমকে খাওয়াতে হবে। কতদিন যেন খায়নি ছেলেটা! উত্তেজনা অনুভব করছিলেন প্রদীপ্ত। এখন অনেক কাজ। শমীবৃক্ষ থেকে লুকোনো অস্ত্র বের করতে হবে। নিজেকে প্রকাশ করুন অর্জুন। আর বৃহন্নলা নয়।

রাতেই ডিসিশন নিলেন। সব শুনে সমর একমত। ওঁরই পরিচিত একজন আছে। ঠিকঠাক হবে বলেই মনে হয়। যেমনটি দরকার এখন। কিন্তু সমর বিস্মিত – ‘তুমি অহমকে টাইট দিতে গিয়েছিলে না?’

কী করে বোঝাবেন প্রদীপ্ত? ভূমিই শিখিয়ে দিয়ে গেছে অহমকে। একজনের শূন্যতা অন্যে পূরণ করে। তাহলে কেন এমন শূন্যতায় বাস করবে অহম?

অহমকে ডাকলেন প্রদীপ্ত – “পুরুষ মানুষ, বউ অন্যের সঙ্গে চলে গেছে বলে ডাক ছেড়ে কাঁদতে হবে নাকি? পাত্রী দেখতে যাচ্ছি। পছন্দ হলে তোমাকে দেখাব।”

অহম প্রায় হতবাক – “পাগল হয়েছেন? ভূমি নেই বলে...”

“ইয়েস মাই বয়, শূন্যস্থান পূরণের কথা ভূমি শিখিয়ে যায়নি? ঘর সংসার কর। আগে পুরুষ হও, পরে প্রেমিক। নামেই নয়, অহম মনে সৃষ্টি কর। মনে রেখ, তুমি ভুল করছ না।”

অহমকে হতবাক দশায় রেখে ফুরফুরে মন নিয়ে বের হলেন প্রদীপ্ত। কিছু আইনি ব্যবস্থা সামলাতে হবে। তারপর একটা সংসার বসাতে হবে ছেলেটার। ও ছেলেপুলে চায়, সংসার চায়। দেখা যাক। ট্রাই করকে দেখে! ছেলেটা রাজি হবেনা। রাজি করাতে হবে।

সমরের কাছে পাত্রীর খোঁজ পেয়েছেন। কাল যেতে হবে সেখানে।

জামাইটার একটা বিয়ে দিতে হবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%