সাগরিকা রায়
ঘোয়াওওওস!! ট্রাকটা পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল!
৩১ নং ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে খানিকটা গেলে বাঁ দিকের ঢালু রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কলসবাড়ি গ্রামের দিকে। এখানে বেশির ভাগই ক্ষেতমজুর শ্রেণির মানুষ। দু চার ঘর ভদ্রলোক আছেন। জমিজমা নিয়ে ভারি ব্যস্ত তাঁরা। ঘটনাচক্রে একটি স্কুল আছে। খুব বেশিদিন হয়নি বয়স। এরই মধ্যে ভিজে ন্যাতা! এস এস সি দিয়ে সদ্য চাকরি নিয়ে এখানে এসেছি। ভারি বুনো জায়গা বলে মনে হয়। অন্তত সোনারপুরে থেকে কলকাতাকে রোজ দেখে কলসবাড়ি বুনো হবে এ আর এমন কথা কী? বেস্পতিবার হাট বসে। সেদিন স্কুল ছুটি থাকে। হাটের মাঝখানে স্কুল। ছুটিটা সেই কারণে নয়। কারণটা হল ছাত্রদের অনেকেই স্বয়ং হাটে দোকান দেয়। পাট, ধান, চাল নিয়ে বসে। বাকিদের কেউ কেউ বাবা-কাকার সঙ্গে ব্যবসাদারি শিখতে যায়। হাতে খড়ি। আমার ভালই হল। সারাদিন হাটে ঘোরাঘুরি করি। কোনো দোকানে খানিক বসে, দাঁড়িয়ে ব্যবসার হালহদিশ বোঝার চেষ্টা করি। এরই মধ্যে কোনও ছাত্র হাটে অন্য ছাত্রের দোকান থেকে ট্যালটেলে চা এনে দেয় স্যারের জন্য। বিশ্রি স্বাদ। আমার মুখভাব দেখে ছাত্রের বাবা টিটকারি দেয় –এগুলান তোদের ছার খায়? ঘুরার পিছছাপ! শুনে আমি সুন্দর মুখ করে খেয়ে নিই। কী দরকার ঝামেলায় যাওয়ার!
চড়া রোদে হেঁটে সেদিন চলে গেলাম রাঙালিবাজনা। নামটা এতটাই মোহময় যে আকুল হয়ে পড়েছিলাম। শনিবার স্কুল থেকে বের হয়ে মোড়ের দোকানে সিঙ্গারা –চা খেয়ে সবে উঠে দাঁড়িয়েছি, খোকন পাল এসে দাঁড়াল। এই ছেলেটি স্কুলের ফুটবল টিমের ক্যাপ্টেন। ঢ্যাং ঢেঙ্গে লম্বা, ছোট্ট মুখের খোকন আমার দিকে অবহেলার দৃষ্টি হেনে বলল– এ বছর ফুটবলটা লম্বা হল, না চ্যাপ্টা হল, বুঝলাম না।
আমি বুঝলাম। খেলাধূলোর ডিপার্টমেন্ট আমার হাতে দেওয়া হয়েছে। আমি এখনও এই বিষয়ে কোনও আলোচনায় যাইনি। খোকন আমাকে শোনাল কথাটা। জবাব না দিয়ে আমি উঠলাম। আজ রাঙ্গালিবাজনায় যাব ভাবছি। তাড়াতাড়ি বের হতে পারলে ফিরবো ঠিক সময়ে।
কলসবাড়ি থেকে খুব বেশি দূরের নয়। ছায়ায় ছায়ায় হেঁটে যেতে ভারি ভাল লাগছে। এই রাস্তায় ট্রাফিক খুব। এমন ধুম ধাম মালবাহী ট্রাকগুলো আসে, ঘাড়ে পড়বে যেন। এখানেই কোথাও ধাবাটা আছে। শুনেছি তরকা রুটি খেতে আসে বহু ভোজনরসিক। ট্রাক ড্রাইভারদের রেস্ট নেওয়ার জন্যই এই ধাবা। ট্রাকগুলো সোজা চলে যাবে অসম, ধুবড়ি আর কোথায় কোথায়...! আমার ভূগোল জ্ঞান সীমিত। অঙ্ক নিয়ে ভেবেছি সারাজীবন। কিন্তু নিজের জীবনের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে সাধারণ সরল অঙ্কে গোল্লা পেয়ে এখন শুধু ফাইভ টু টেন হাতে রইল ব্ল্যাক বোর্ড - চক। খড়ি।
বাপস! আট্টু হলেই পিন্ডি দেওয়ার লোক দরকার হতো। ট্রাকটা পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে ঘাঁক ঘাঁক করে রাগ দেখাল পিষতে পারেনি বলে! মনে মনে কথা বলতে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে গিয়ে পড়েছিলাম। দোষ আমারই। সাইডওয়াকে চলে যেতে যেতে পিছন ফিরে দেখে নিলাম আরও ট্রাক আসছে কিনা। চারপাশে গুচ্ছের গাছ নেই এখন আর। খানিক চিহ্ন শুধু। গাছের নীচে ছোটখাটো চায়ের দোকান। পাশে গোটা তিনেক রিকশা। মনে হল ধাবার কাছাকাছি এসে গেছি। এতক্ষনের নির্জনতা একটু করে ভাঙছে যেন। বাতাসে মানুষের গন্ধ পাঁউ! কিছুটা এগোতেই দেখি যা ভেবেছি, তাই। সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ট্রাক। লম্বা মোটা পাইথন। বন–রাজ্যে পাইথন ছাড়া অন্য কিছু মাথায় এলনা। এত ট্রাক! এখানে কি এত ড্রাইভার, খালাসি সবার থাকা – খাওয়ার ব্যবস্থা আছে? আছে নিশ্চয়। নাহলে এরা থাকছেই বা কোথায়! রাস্তা বর্ষায় বেহাল হয়ে পড়ে। হবেই। দিনরাত মালবাহী ভারী ট্রাক চলাচল করছে! রাস্তা মেরামতির জন্য টোল আদায়ের ব্যবস্থা হয় শুনেছি। এখানেও কি হয়েছে? এসব রাস্তার মাল বহনের ক্ষমতা কত? যা ক্ষমতা, তার বহুগুণ বেশি ওজন সামলাতে গিয়ে এমন হয় দশা! গ্রাম সড়ক যোজনায় কত বছরের গ্যারান্টি থাকে? পাঁচ বছর?
-‘দেখেন বাবু, এই লম্বরটা। এইখানে এই লম্বরের টেরাক গাড়ি আছে বাবু?’ এক গ্রামীণ মহিলা একটুকরো বিবর্ণ কাগজ বাড়িয়ে দিয়েছে আমার দিকে।
চমকে উঠিনি। মহিলাটিকে দূর থেকেই ঘোরাঘুরি করতে দেখেছি। ট্রাকগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল। এতক্ষণ আমি একে নিয়ে কিছুই ভাবিনি। এখন অবশ্য মাথায় চিড়িক করে ঢুকে গেল মহিলাটি। বড় বিষণ্ণ মুখ। অরেঞ্জ কালারের ফুল ফুল শাড়ি বহু ব্যবহারে বিবর্ণ। তেলহীন চুল সাপটে বাঁধা। শুকনো চেহারা। বয়স পঞ্চাশও হতে পারে চল্লিশও হতে পারে। শরীর ও মনের ওপর দিয়ে যত ঝড় জল বয়ে গেছে, তার সবটুকু চিহ্ন মুখে লেপে রেখেছে সময়। স্থানীয় মানুষ মনে হয়! একটা ট্রাকের নাম্বার নিয়ে ঘুরছে! কেন? গন্ধ পাঁউ! কেমন যেন মন কেমন করা গন্ধ! সাহিত্যের চোখে নয়, এখানে আমার চোখে অঙ্ক আছে। একসারি ট্রাক, একটি মহিলা, আর একখণ্ড বিবর্ণ কাগজে লেখা একটা নাম্বার। অঙ্কটা কী?
-‘দেখি কাগজটা।’ হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে দেখি পুরনো হয়ে যাওয়া কাগজ ভাঁজে ভাঁজে নোংরা হয়ে গেছে। মহিলার মুখে উদ্বেগ। ভারি ব্যাকুল দৃষ্টি আমার মুখে নিবদ্ধ। আমি কাগজের ভাঁজ সাবধানে খুলি। পেন্সিল দিয়ে একটা নাম্বার লেখা হয়েছিল। পাঞ্জাব বোঝা যাচ্ছে। নাইন নাইন তারপরের সংখ্যা ঝাপসা, কিছুই বোঝা যাচ্ছেনা, একটা জিরো একেবারে শেষে এইট... কি? নাকি সিক্স!
-‘চিনেন বাবু? এই লম্বর আলা টেরাকটা আসছে কিনা জানো? দেখবা একটু? আমি শালা খঁজিবার না পারি! আমারে দেখিলে উয়ারা হাসে। কী করিম কছেন!’ সরু সরু চোখের ভাষায় অনুযোগ কাঁপে থরথর করে। ভারি আশ্চর্য হলাম বলাই বাহুল্য। এই গ্রামদেশে কত দূর দুর থেকে ট্রাক আসে নানা পণ্য নিয়ে। খানিক বিশ্রাম নিয়ে চলে যায় কোন অজানা অচেনা জায়গায়। এই রমণীর সঙ্গে কীসের যোগাযোগ ট্রাকের নাম্বারের? নাম্বারটা এই মহিলা পেল কার থেকে! কোন আত্মীয় কি? এত ব্যাকুলতা কার জন্য?
প্রশ্নটা করেই ফেললাম। শুনেই ক্ষুব্ধ হল যেন। হাত বাড়িয়ে কাগজের টুকরোটা নিয়ে নিল আমার হাত থেকে। শীর্ণ হাতে লাল প্ল্যাস্টিকের চুড়ি হলহল করছে! কাগজটা নিয়ে পেছন ফিরে চলে যেতে যেতে আমার দিকে তাকাল। সেই চোখেও অনুযোগ, আর বাড়তি হিসেবে ছিল এক বিশাল মরুভূমির জলশূন্য হাহাকার! দৃষ্টি দেখে ধাক্কা খেলাম। না জেনে কি দুঃখ দিলাম? কিন্তু কিচ্ছু বলিনি তো! শুধু নম্বরটা কোথা থেকে পেল সেটাই...। হয়তো সেটাই ওর বহু কষ্টে লুকিয়ে রাখা হাহাকার! অজান্তে সেই ব্যাথায় ছুরি চালিয়ে দিয়েছি। যাদের কাছে আজ অব্দি এই কাগজটা নিয়ে গেছে, সবাই একই প্রশ্ন করে! বলল তো! উয়ারা হাসে! হয়তো আমাকে ওদের মত ভাবেনি বলে আমার কাছে এসেছিল!
কেমন গল্প-গল্প গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার সামনে। সাঙ্ঘাতিক একটা রোমান্টিক গল্প আমার সামনে নৃত্য করছে, কিন্তু আমি তাকে ধরতে পারছিনা! অঙ্ক সলভ না করে আমি উঠিনা। এখানে অঙ্ক সলভ করতে হলে ওই মহিলাকে দরকার। কিন্তু মহিলা দ্রুত হেঁটে চলে গেল সামনের হাতির পাল ট্রাকগুলোর আওতায়। যখন আর দেখা গেলনা, তখন আর এসব নিয়ে ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলাই শ্রেয় ছিল। ঝেড়েই ফেললাম। ধাবার মশলা চায়ের লোভ আছে। সেটুকু মিটিয়ে নেব আজ। আমি এগিয়ে গেলাম। দড়ির খাটিয়া ছড়িয়ে রাখা এদিক ওদিকে। তারই একটাতে বসে পড়েই উঠতে হল। খুব হল্লাচিল্লা এখানে! জোর গলায় ফরমাশ করতে হবে। কিভাবে করবো সেটাও শিখে ফেললাম মুহূর্তে। একজন গাট্টাগোট্টা লম্বা চওড়া পাঞ্জাবি ড্রাইভার পুরুষালি হাঁক পাড়ল– ‘আবে, থোড়া ইধার দেখ, কুছ চায় সায় তো লে আ।’ এভাবে কথা বলার ঢঙটা বেশ লাগল। কিন্তু এসব রপ্ত করতে সময় চাই এই মিনমিনের। এমন হাঁক পাড়ার ক্ষমতা থাকলে অদিতি আমার কাছে থাকতো। ওর একটা ফোন পাওয়ার জন্য লেলিয়ে মরতাম না! …নিজেকে কুকুর মনে হয়! যে কুকুর একটুকরো রুটির জন্য হেদিয়ে মরে! অদিতি আমাকে খুব তাড়াহুড়ো করে ভুলে গেল। নিজেকে দুবেলা চড়-থাপ্পড় মেরেও অদিতিকে ভুলতে পারছিনা! একদিন দেখেছিলাম রুবির সামনে। চাকরি করছে শুনেছি। খুব ঝকঝকে দেখাচ্ছিল ওকে। সেদিন আমার মনে হয়েছিল কলকাতা থেকে পালাতে হবে। বারবার অদিতি সামনে আসবে, আর আমি বারবার মৃত্যুকামনা করবো নিজের! এভাবে চলেনা। বলতে গেলে সেই কারণেই অনেক দূরে চাকরি পেয়ে পিছপা হইনি। কণাদ বলেছিল– ‘ওদিকে নাকি খুব ম্যালেরিয়া হয়, পারবি থাকতে?’
পারছি তো! বুকের ভেতরে রাগ গুমগুম করে। জোরসে হাঁক দিই– ‘আবে, মশলা চায় দে ভাই ইধর!’
সেই যে শুরু হল। এখন রোজ একবার ধাবায় চা না খেলে আমার ভাল লাগেনা। কখনও তরকা রুটি খাই। কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খেতে জানতাম না। ট্রাক ড্রাইভারদের একজন এই আনপড় গাওয়াড়কে পাঞ্জাবি খানা খাওয়াতে শেখাল। কাঁচা পেঁয়াজ কামড়ে খেতে শিখলাম। লস্যি এল আমার কাছে নিবিড় ভালবাসায়। কিছুকিছু পাঞ্জাবি শব্দ শিখেছি। আগে হিন্দিতে সড়গড় ছিলাম না। এখন বেশ বলতে পারি। সেদিন মাকে ফোন করে ‘আব্বে ইয়ার’ বলে ফেলেছি। মা রেগে গেল– আমি তোর ইয়ার?
এখন খুব মেঘ করে আছে আকাশে। বর্ষা গেল বলে। গাছের গায়ে লকলকে সবুজ আলো জ্বলজ্বল। বর্ষার জল খেয়ে গাছের পাতা এই মোটা মোটা হয়ে আছে। ধাবা থেকে ফেরার ফের সেই রাস্তা। বিশাল ট্রাক ধাবার উদ্দেশ্যে ঘাই মেরে ছুটছে। আমার গায়ে ঝলকে উঠছে হেড লাইটের জোরালো আলো। আমাকে দেখেই ফের অন্ধকারে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রাকগুলো। ধাবায় যাবে। চায় সায় খাবে। ফের চলে যাবে কোথায় ...কে জানে! রাতে এদের কেউ কেউ নারী-সঙ্গ করে শুনেছি। আজই দেখলাম দুটো লেগিন্স আর কুর্তি পরা লিপস্টিক মাখা মেয়ে। ছম্মকছল্লো হাবভাব! যেমন ভাবে ভেতরে ঢুকে গেল, বোঝাই যায় এখানে নতুন না। অন্ধকারে আসে, অন্ধকারে চলে যাবে। ভোরে ট্রাক চলে যাবে যে যার গন্তব্যে! কেউ আর কারও খোঁজ রাখেনা! এভাবে কত কত নারী আসে যায়! কখনও দেখা হয় ফের? তখন কি একে অন্যকে চিনতে পারে? হয়তো চেনে। হয়তো চেনেনা। বা চিনলেও চেনেনা। যে ব্যবসার যা! এখানে প্রেম, ভালবাসা, ভাললাগার জায়গা নেই! আদিম ব্যবসা! চলছে, চলবে!
আমি আবার সেই অন্ধকারে ডুবেডুবে হাঁটছি। এভাবে কতকাল হাঁটছি মনে নেই। আদিমকাল থেকে এই ভাবে হেঁটে আসছি। সেমেটিক যুগ থেকে মরুভূমির ওপর যাযাবরের জীবন যাপন করে আসছি। আমার কোনও ঘর নেই। স্থায়ী আস্তানা নেই। কোথায় যাব জানিনা। কেউ আমার জন্য অপেক্ষা করে নেই। জন্ম জন্ম এভাবেই চলছে। আর, আমি কৃষিকাজও জানিনা! এই ঘন অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে পড়লাম। অদিতিকে ফোন করবো? হাতে ফোন নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি। অদিতি আমার ফোন রিসিভ করবে না! করে না! প্রথম প্রেমে ডুবে থাকার মেয়ে না ও। কবে কোন এক গ্রামে বেড়াতে গিয়ে কিশোরী জীবনের প্রথম প্রেমের স্বাদটাকে ভুলে গেছে অদিতি। আমি নির্বোধ বলেই উড়ে যাওয়া বেলুনকে ধরতে চাই। কোথায় আছে অদিতি এখন? আমার কথা কি একেবারেই মনে হয়না ওর? সব ভুলে গেল!
বৃষ্টি শুরু হল। ভিজতে ভিজতে আমার ভাড়া - বাসায় ফিরতে থাকি। আজ বেশি দেরি করেছি, এমন নয়। এখানে বিকেল ডুবলেই রাত নেমে আসে। গাঁ গঞ্জের মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি করে। কেউ কেউ লম্ফ জ্বেলে তিনপাত্তি খেলে হাটের দোচালায় রাত নটা সাড়ে নটা পর্যন্ত। এখন কেউ নেই। রাস্তা সুনসান। ঝিপ ঝিপ বৃষ্টি গা ছেড়ে নেমেছে। সারারাত ধরে বৃষ্টি ঝরবে। একটু বৃষ্টিতেই ঠান্ডা পড়ে। শেষ রাতে হালকা চাদর দরকার হয়। কলকাতায় এমনটা ভাবাই যায়না! ধাবায় রুটি তরকা খেয়ে এসেছি। ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়ব। বিছানায় শুয়ে চোখ বন্ধ করতেই অন্ধকারে বৃষ্টি মেখে ঘরে এল অদিতি। ভেজা শরীরে ঝড় উঠেছে। আজ তুফান উঠবে এইখানে। অদিতি বৃষ্টির শব্দের মত ঝম ঝম করে হাসল। অন্ধকারেই হাত বাড়ালাম–‘এস। আজ আমার কাছে থাক। তোমার শরীর ছুঁয়ে থাকি।’ অদিতি চলে যাচ্ছিল পেছন ফিরে। ডাকলাম না। আমি নারীসঙ্গ করতে চাইনি কেবল। যেখানে মনই নেই, সেখানে…। পাশ ফিরে শুলাম। গুড নাইট অদিতি! অদিতির দোপাট্টা মিলিয়ে গেল অন্ধকার মেখে।
দড়ির খাটিয়ায় বসতেই খাটিয়া ক্যাক করে উঠল। পাশের খাটিয়া পুরো দখল করে একজন চুড়ো করে ভাত ডাল নিয়ে বসেছে। সঙ্গে গোছা রুটিও আছে। আমার দিকে তাকিয়ে ঠা ঠা হেসে উঠল – ‘মশলা চায় কে লিয়ে? আ যা, বইঠ যা ইয়ার।’
আমার মশলা চায়ের নেশাটা সবাই জেনে গেছে দেখছি। আমি হেসে ফেললাম। থাবা থাবা ভাত মুখে তুলছিল লোকটা। খানিক বিশ্রাম নিয়েই ফের রওনা হবে সামনের লম্বা রাস্তা ধরে। কোথায় চলে যাবে কে জানে!
-‘এই লম্বরটা কুন টেরাকের? বলেন মোকে।’
চমকে তাকিয়ে দেখি সেই মহিলা! হাতে টুকরো কাগজ। নিশ্চয় ওতে নাম্বারটা আছে। আশ্চর্য তো! আগেও দেখেছি একে। আমার সঙ্গে কথাও হয়েছিল। কে এ? কোথায় থাকে? পাগল বলে মনে হয়নি আমার! কিন্তু কাকে খুঁজে ফিরছে? এই মহিলা কি রোজ এখানে কাউকে খুঁজতে আসে? আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে ভাত খানেওলা লোকটি মজা করে হাসল – ‘মুঝে পতা হ্যায় তুসি কেয়া শোচতি। উসানে ইকা কাহানি হ্যায়।’
-‘কাহানি? মতলব? কেয়া কাহানি?’
-‘হামারে য্যায়সা এক্কে ডাইভার ইঁহা আয়ে থে। ইনকো সাথ লাভ হুয়া। উনহে বাক গয়ে ইসিকো ছোড়কে। উসি দিনসে ইয়ে আওরতনে টেরাক কি নাম্বার লেকে ঢুঁড়টা। ম্যানু জানতা মনজিতকে। ও ফির লোটেঙ্গে নেহি।’
-‘মনজিত কৌন?’ আমি সবকিছু একটু দেরিতে বুঝি। এই মহিলা এখানে যারা আসে, তেমনই এক ট্রাক ড্রাইভারের প্রেমে পড়ে। কিন্তু সেই প্রেমিক একে আশা দিয়েও পালিয়ে গেছে। এখন প্রেমের একমাত্র নিশানা বলতে একটুকরো কাগজে সেই ট্রাক ড্রাইভারের ট্রাকের নাম্বার। হয়তো সেই প্রেমিক ভুল করেই নাম্বারটা দিয়ে ফেলেছিল পথে পাওয়া প্রেমিকাকে! মনজিত কি সেই ড্রাইভারের নাম?
-‘আব্বে ইয়ার। দুনিয়া ইতনা আজিব হ্যায়। উসি নেহি সমঝি।’
আমার হাতের চায়ের গেলাস দিয়ে গেল কেউ। গরম চা। দুধ আর এলাচ-এর গন্ধে ভরপুর। অন্যদিন আমেজ আসে এই গন্ধে। আজ ওই মহিলা আর মনজিতের কাহিনী শুনে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হল মনজিতকে। আর মহিলাকেও বলিহারি। প্রেমের স্বাদ মেটেনি এখনও! চা খেতে ইচ্ছে ছিলনা কেন কে জানে। কে বা এই মহিলা, কে বা মনজিত! এরা সম্পর্কে আমার কিচ্ছু হয়না। আসলে এই যে ঝিমিয়ে আসা বয়সের একটি মানুষ এভাবে বছরের পর বছর ঘুরে মরছে কোন এক মনজিতের খোঁজে, এটাই আমাকে বিরক্তি জোগাচ্ছিল। কোন মানে হয়! বোকামিরও একটা লিমিট থাকে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি মহিলাকে। কেমন একরকম এলোমেলো চেহারা। সারাদিন খায়নি হয়তো। কোথায় থাকে? কে আছে এর? এমন বর্ষাভেজা সন্ধ্যেতে একা একা পাগলের মত একজনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে! কতদিন আগে মনজিত এসেছিল এখানে? এখন মহিলার যা বয়স বলে মনে হচ্ছে, মাঝবয়সে পৌঁছে গেছে। বয়সের প্রতি পরতে যৌবনের ঘটনা বয়ে বেড়াচ্ছে! সত্যি কি আসবে মনজিত কখনও! চরম সত্যটা এই মহিলা বুঝতে পারছে না। সেদিন থেকে লক্ষ্য করছি মহিলাটিকে। দীন দরিদ্রই বলা যায়। ওর সম্পর্কে আরও শুনলাম। ভাইয়ের আশ্রয়ে থাকে। জোরজার করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তা, নতুন বরের কাছে প্রথমেই এই কাগজ দেখিয়ে টেরাকের খোঁজ জানে কিনা জিজ্ঞাসা করেছে। বলা বাহুল্য বিয়ে টেকেনি। এখন সারাক্ষণ রাস্তায় রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে। ভাই কখনও ডেকে নিয়ে খাওয়ায়। ওর খিদে অন্যখানে। সে খিদে মিটবে না কখনও। আগ্রাসী খিদে নিয়ে অপেক্ষা করে মনজিতের জন্য। চোখে অসীম অপেক্ষার ছাপ পড়ে গেছে। জীবনে খিদে তো একটিই মাত্র। কোথায় আছে সেই মনজিত! কোথায় রেখে রেখে চলে গেছে এমন কত কত নারীকে! অন্ধকারেও যে নারী আলো পেয়েছিল! ভুলতে পারেনি এক-দু রাতের প্রেমিককে!
বাড়িওলার সাতখানা নারকেল গাছ। আজ ডাব পেড়েছে। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরতেই দুটো ডাব দিয়ে গেল বাড়িওলা জীবনবাবুর ছেলে নরু। তেষ্টা ছিল। একটা ডাব কেটে খেলাম। জল মিষ্টি। ডাবের খোল ফেলতে গেছি পুকুর ধারে, অদ্রিজা, বাড়িওলার ভাগ্নি ওখানে দাঁড়িয়ে চুল খুলছিল। কালো লেগিন্স , লম্বা ঝুলের কামিজ পরা মেয়েটি জলপাইগুড়িতে থাকে। কলেজে পড়ে। আমাকে দেখে মিচকি হাসল। হাসিতে কী ছিল। আমি ভড়কে গেলাম। অদ্রিজা চোখে বাণ হেনে লজ্জা লজ্জা মুখে ছুটে পালিয়ে গেল। আমার মনে হল, এখানে আর থাকা যাবেনা। অদ্রিজা আমাকে নিয়ে অন্য কিছু ভাবলে ভুল করবে। মাঝে থেকে আবার ঝুট ঝামেলায় পড়া!... কিন্তু মেয়েটা বেশ! এই একা জীবনে ওর সংগে একটু কথা বলা, গল্প করায় ক্ষতি কী? সব সময় প্রেম নিয়ে ভেবে সময় কাটে? ধুস! ডাবের খোলা ছুড়ে ফেলে দিলাম আবর্জনার স্তুপে।
স্কুল ছুটি হয়ে গেল। আজ রেনি ডে। সকাল থেকে তুমুল বর্ষণে পৃথিবী যেন ডুবে যাবে আজ। নিজে রান্না করে খাই। বারান্দায় একফালি জায়গা চাটাইএর বেড়া দিয়ে ঘিরে ছোট রান্নার ব্যবস্থা করা আছে। স্টোভ জ্বেলে খিচুড়ি চাপিয়ে দিলাম। সঙ্গে আলুর চিপস আছে। দু চারটে চিপসের প্যাকেট এনে রাখি। রান্নাবান্না ভাল লাগেনা। এই ঝিমঝিমে দুপুরে শুয়ে শুয়ে বই পড়তে ইচ্ছে করে। যাঃ, বৃষ্টির জলের ঝাপটা আসছে। খিচুড়ির কড়া নিয়ে ঘরে ঢুকে গেলাম। এখানে বসে খাওয়া যাবেনা। বারান্দা জলে ভিজে গেছে। দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসলাম। জানালা দরজা বন্ধ বলে গুমোট লাগছে। দরজায় টোকা শুনে খুলে দেখি ভিজে চুব্বুস হয়ে এসেছে অদ্রিজা। কপালের ওপর নেমে এসেছে ভিজে চুলের গুছি। হাতে বাটি। কী আছে ওতে?
অদ্রিজা সুন্দর করে হাসে–‘ডিম কষা। আমি করেছি। আপনি রান্না করলেন কেন? ভাত দিয়েই যেতাম। দেখলাম রাঁধছেন …।’
-‘না না, আমি খিচুড়ি করেছি।’
-‘ঘরে জলের ছাঁট আসছে। ইসস!’ বলে দরজায় খিল তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাসল অদ্রিজা। হাসি দেখে আমার মহুয়া ফুলের গন্ধের কথা মাথায় এল। এই গন্ধ পেয়েছিলাম অদিতির শরীরে। আজ ফের ঘরে বুঝি মহুয়া ফুটেছে! ঘন বর্ষা মহুয়ার গন্ধ ডেকে এনেছে ঘরে, আমার শরীরে!
-‘বেশ করেছেন রেঁধেছেন।’ বলে আমার বিছানার ধারে বসে পড়ল অদ্রিজা। কী মেখেছে, মন কেমন করা গন্ধে ঘর ভরে গেল। এই বৃষ্টিতে এঘরে এল ও? বাড়ির লোক কিছু বলবে না? এভাবে এত কাছে এসে বসল… ঘোর বৃষ্টিতে আমি যে ভিজে যেতে পারি…অদ্রিজা বোঝেনা! কতদিন ভিজিনি। অদ্রিজা জানেনা? ওড়না আমার মুখের ওপর বুলিয়ে দিয়ে ও আমার কাছে এগিয়ে এল–‘কেউ কি জানে আমি এসেছি? আপনি এমন কেন? দেখেও দেখেন না!’ হিসহিস করে অদ্রিজা। ওর চুলের ঝাপটা আমার চোখ ঢেকে দেয়। ঘন শ্বাসে আমার শরীর তোলপাড় করে ওঠে। … ঘরের ভেতরে বৃষ্টি নামল। আমি ভিজে যেতে যেতে…।
অদ্রিজা কখন চলে গেছে জানিনা। বৃষ্টি ধরেছে যখন, তখন গেছে হয়তো! জানালা খুলতেই সোঁদা গন্ধে ঘর ভরে গেল। বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে থাকি। কিচ্ছু ভাল লাগেনা। খাওয়া হলনা। খিচুড়ি ঠান্ডা জল। অদিতি কি আজ এসেছিল? ফিরে গেল! দুটোদিন কেটে গেল। অদ্রিজা আজ হোস্টেলে ফিরে যাচ্ছে। আসবে সামনের উইকে। আমি জানাতে পারলাম না আমি পছন্দমতো জায়গায় চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছি। গতকালই আপয়েন্টমেন্ট লেটার পেয়েছি। এই স্কুলে আজ শেষ দিন। অদ্রিজা কষ্ট পাবে। কিন্তু আমি ওকে ডাকিনি। ও-ই কাছে এসেছিল। আমার মনে কোন খেদ বা অপরাধবোধ নেই। শরীর ডেকেছে। এই সম্পর্কে আমার মন ছিলনা। হয়তো অদ্রিজা আমাকে খারাপ ভেবে কষ্ট পাবে। কিন্তু অদ্রিজা আমার মন টানেনি। শরীরকে ও মন ভাবে! হয়তো!
বিকেলে ধাবার দিকে যাচ্ছিলাম। রাস্তায় জায়গায় জায়গায় জল জমে আছে। একটু ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে। জলো হাওয়ায় কেমন মন খারাপ করা গন্ধ। হেঁটে হেঁটে যাচ্ছি, পাশ দিয়ে ট্রাক যাচ্ছে সারি সারি। ধাবার দিকে যাচ্ছে ওরাও আমার মত। কেন যেন ধাবার দিকে যেতে যেতে সেই মহিলাকে মনে পড়ল। এই ওয়েদারে কি আসবে সে?
বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে ধাবায়। টুনিও জ্বলছে। বড় বড় উনুনের ধোঁয়ায় অল্প আলো ছায়া ধোঁয়া মিলে মিশে এক রহস্যময় দুনিয়া যেন। কিছু ছায়া ছায়া মানুষ নড়াচড়া করছে। আদিম পৃথিবী! আমি এগিয়ে গেলাম। জটলা করে কিছু আলোচনা হচ্ছে। আমি খাটিয়া দখল করে চায়ের জন্য অপেক্ষা করি। পরিচিত একজন ড্রাইভার রুটি মাংস নিয়ে এদিকে আসছে। আমার পাশ দিয়ে যেতে যেতে হাসল– ‘আরে ইয়ার, কেয়া হোনা থা, হুয়া কেয়া!’ -মানে? কী বলতে চায় লোকটা?
-‘আরে, উসি মনজিতনে আজ আ গয়ে ইহাঁপ্পে। দুসেরা ট্রাকমে। দেখ কে আ। লেকিন উসিনে আজ নেহি আয়া।’
মানে? সেই মনজিত নামের লোকটা আজ এখানে আছে, অথচ সেই রমণী সে কথা জানেনা! এত বছরের প্রতীক্ষা ব্যর্থ! মনজিতকে চলে যেতে দেওয়া যাবেনা। কেউ কিছু না বললেও আমি আটকাবো। কোথায় সেই লোকটা। দ্রুত হেঁটে লোকটার দেখানো দিকে যাই। সারিবদ্ধ ট্রাকের ভেতর থেকে একজন বয়স্ক ট্রাক ড্রাইভার উৎসুক মুখে দাঁড়িয়ে কী যেন বলছে। এই কি মনজিত? ওকে ধরেছে এখানকার লোকেরা। কথাবার্তা হচ্ছে। মনজিত ভেবড়ে গেছে। লোকটা এত এত জায়গায় যায়, এই জায়গার কথা ভুলে গেছিল। কতজনকেই তো নম্বর দিয়েছে বা দেয়, কে আর মনে রাখে! ওর জন্য কেউ যে কোথাও অপেক্ষা করে আছে, সেটা লোকটা ভাবেইনি! কেউ গিয়ে এরই মধ্যে সেই মহিলাকে প্রায় টেনে এনেছে। অবিন্যস্ত চেহারা, বিহ্বল চাউনি মহিলাটি ট্রাকের সারির ভেতরে ঢুকে পড়ল। কে একজন পরিস্থিতি বুঝিয়ে দিল – ‘তোমার মনজিত এসেছে। এই যে দেখ।’
মনজিত মাথা নেড়ে সম্পর্ক অস্বীকার করে যাচ্ছে। মহিলাটি গিয়ে মনজিতের সামনে ধূসর হয়ে যাওয়া কাগজটা এগিয়ে দিল–‘এই লম্বরটা কুন টেরাকের বাবু? দেখেন না একবার।’
চরাচর নিষ্প্রভ হয়ে গেল। সব আলো নিভে গেল। মনজিতকে চিনতে পারেনি মহিলা। প্রেমিকের মুখ মনে নেই। মনে আছে কেবল একটি নম্বর। একটি ট্রাকের নম্বর। আর কিছু নয়! সব সম্পর্ক একটি নম্বরের সঙ্গে!
মনজিত অপেক্ষা করেনি। গাড়ি নিয়ে তখনই পালাল। ট্রাকটা চোখের আড়াল হয়ে গেল। তখনও মহিলাটি কাগজ দেখিয়ে ওদিকে কাকে ধরে কী বলছে।
বাসায় ফিরে আসতে আসতে আজকের ঘটনা চোখের সামনে ভাসছিল। সারাজীবন একটি নম্বর নিয়ে বেঁচে থাকবে মহিলাটি। ও কি পাগল? ঝেপে বৃষ্টি নামল। ভিজতে ভিজতে মনে ছিলনা আমার সঙ্গে ছাতা আছে। মন বলছে মোবাইল ফোনটা পকেটে আছে। একটি নম্বর আছে ওখানে। সেই নম্বরে ফোন করলে কেউ রিসিভ করেনা! আর কিছু নেই আমার কাছে। সব বিবর্ণ! ধূসর! আচ্ছা, অদ্রিজার কাছে কি আমার দেওয়া ফোন নম্বর আছে?
হোয়াও! পাশ দিয়ে আরও একটি ট্রাক বেরিয়ে গেল অজানার উদ্দেশ্যে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন