আন্তর্জালিক

সাগরিকা রায়

প্রবল বৃষ্টির মধ্যে পড়ে গেল সোহা। একটা প্রাচীন মহীরুহ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে মন্দিরের পাশে। গাছের পাশেই অনুষ্ঠান ভবন। ওদের জেনারেটর বহনকারী গাড়িটাও ভিজে যাচ্ছিল। সোহা একবার আকাশে তাকিয়ে দেখল। ঘন মেঘগুলো পৃথুলা রমণীর মতো ধীর গতিতে ভেসে যাচ্ছিল পশ্চিমদিকে। এখানে দাঁড়ালেও খুব কিছু লাভ হচ্ছে না। বাড়ি ফিরে গেলেই ভাল। নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে। জলের ছাঁটে চুল ভিজে যাচ্ছিল। লং কামিজের খানিকটাও ভিজে গিয়েছে। গাছ ওকে রক্ষা করছে না মোটেই। মাটিতে ওর পায়ের কাছে বৃষ্টির জল পাওয়া ঘাস তরতর করছে। কাঁচা সবুজের একজোট হওয়া দেখতে গিয়ে কচু গাছের তেলতেলে পাতায় হিরের টলমল দেখল ও। আকাশের ছায়া পড়েছে হীরের গায়ে। মৃদু বলেছিল পদ্মপাতার জলের কথাটা। সায়েন্সের ছেলে হয়েও বেশ কবি-কবি ভাব ওর মধ্যে। জীবন নাকি পদ্মপাতার জল। যতক্ষণ আছে চমৎকার ঝলমল করছে হিরের মতো। ঝট করে গড়িয়ে পড়ে আলগা বাতাসের আচমকা ধাক্কায়। ব্যস। পাতাটা শুকনো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কালসীমার প্রহরী হয়ে। আর জীবন? মাটিতে মিশে গিয়েছে কোথায় কে জানে!

এখন কেন মৃদুর নাম মনে এল? হুম, ওর মেসেজের জবাব দেওয়া হয়নি। পড়ে রয়েছে মৃদুর কথাগুলো ইনবক্সে আটকে। জোর ঝটকা বাতাসটা একটা ধাক্কা দিল যেন। বৃষ্টি আরও জোর ফলাচ্ছে। সামনের মাঠ ক্রমে ধূসর।

ঠান্ডা হাওয়ায় কাঁপুনি ধরে ভিজে গায়ে। মৃদুর মেসেজের জবাব দেওয়া হয়নি। ব্যাঙ্কে গিয়েছিল ও। জেঠুর পেনশন তুলতে। ইদানীং এসব ওকেই করতে হচ্ছে। নেট দেওয়ার পাশাপাশি কলসেন্টারেও চেষ্টা চালাচ্ছে। কন্ট্র্যাকচুয়াল চাকরি পেলে তবেই করবে। অর্থাভাব সেই অর্থে নেই, কিন্তু চাকরি করতে চায় সোহা। দিনের পর দিন বসে থাকতে পারবে না ও। আসলে ও যে খুব সাধারণ। এখন মাঝে-মাঝে লজ্জা করে মৃদুর পাশে নিজেকে দাঁড় করাতে। কী ভীষণ ভাল রেজাল্ট করেছে মৃদু। বারবার ভালো রেজাল্ট! যতবার যত পরীক্ষা দিচ্ছে, কেবল ভাল রেজাল্ট। ভিজে পৃথিবীকে দেখে-দেখে সোহা লুকিয়ে-লুকিয়ে খুব খারাপ কথা ভাবে এই গাছের নীচে দাঁড়িয়ে। মৃদু একবার অন্তত বাজে রেজাল্ট করতে পারে! না হলে সোহা যে ক্রমশই পিছিয়ে যাচ্ছে ওর থেকে! কোলিগ মেয়েটার সঙ্গে হাওয়াই দ্বীপে বেড়াতে গিয়েছিল মৃদু লাস্ট উইকএন্ডে। ছবি পোস্ট করেছে ফেসবুকে। গোলগাল শ্যামলা মেয়েটির বডি ল্যাঙ্গোয়েজে কনফিডেন্স ঝকঝক করছে। ফুলের গয়নায় কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। মৃদু ইচ্ছে করেই কি প্রিন্টেড হাফ হাতা শার্ট পরেছে? মাথায় বেতের টুপি। টুপিগুলোকে কী বলে? খুব মজা করছে ওরা!

ইসস, কী বিশ্রীভাবে ভিজে গেল সোহা। বেলা এগারোটায় ঠান্ডা লাগছে। তাও আবার জুলাই মাসে। হাসি পেলেও হাসি গিলে ফেলল সোহা। মৃদু ওদেশের ঠান্ডা সহ্য করে কী করে? বেচারি। একদিন নাকি শুধু আলুসেদ্ধ খেয়ে ছিল। ডেকার্স লেনের খাবার খেয়ে খেয়ে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছিল মৃদু। মধুদার দোকানের স্যুপ কী দারুণ ভালবাসত! এবারে কলকাতায় এলে মৃদুকে যেসব জায়গায় নিয়ে যাবে সোহা। খুব করে খাওয়াবে। ওর পছন্দমতো বিরিয়ানি খাওয়াতে হবে। সোহা তাকিয়ে দেখল বৃষ্টিটা কমে এসেছে। বাড়ির দিকে রওনা হবে বলে সালোয়ার একটু তুলে ধরল সোহা।

দুপুরে হোয়াটসঅ্যাপে কথা হচ্ছিল। মৃদু হাওয়াই দ্বীপের গল্প করছিল। মন দিয়ে মৃদুর গলার স্বর শুনছিল সোহা। আজ খুব উচ্ছ্বাসে ছিল মৃদু। কথা শেষ হলেও রেশ গেল না সোহার মন থেকে। মৃদু বলে গেল। সোহা কেবল শুনে গেল। মৃদু আজ একবারও সোহার কথা জানতে চাইল না। এমনটা আগে কখনও হয়েছে কি? ল্যাপি অন করে বসে সোহা। ওর কিছু বন্ধু আছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে, গল্প করে মনটা হাল্কা করে নেবে। কেন যে মন গুম মেরে আছে কে জানে। আজ মনোজিৎ হাজরার সঙ্গে ইনবক্সে প্রচুর আড্ডা দিল। হাজরা উচ্ছ্বসিত। পিঙ্ক হার্ট পাঠাতে শুরু করল ঘন-ঘন। কিন্তু সোহা জানে হাজরা ঠকে যাচ্ছে। এভাবেই কত মানুষ কত মানুষকে ঠকাচ্ছে প্রতিদিন! একই সঙ্গে, একাধিকের সঙ্গে, মিষ্টি কথার রস আর পিঙ্ক হার্ট পাঠাচ্ছে! সোহা কেন এমন করছে আজ? মৃদুর উপর রাগ? তার শোধ তুলছে হাজরার উপর?

“টাকা এনেছ দিদিভাই?” জেঠু একটা হলুদ বাটিক ছাপা পাঞ্জাবি পরে দরজার মুখে দাঁড়িয়ে। ওঃ! টাকাটা জেঠুর হাতে দিতে ভুলে গিয়েছিল সোহা। মন উচাটন হয়ে আছে মৃদুর হাওয়াই দ্বীপের ছবি দেখার পর থেকেই। জেঠু হয়তো অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করে আছে এই টাকাটার জন্য। কাল বাড়িতে খাসি আনবে জেঠু, নিভাদিকে দিয়ে। সকালে বাজারে গিয়ে মাংস নিয়ে আসবে নিভাদি। শিবানীকাকি সাবধান করেছিল মাকে। এই বয়সে রেড মিট খাওয়া ঠিক নয়। জেঠু শুনলে তো! উঠে ব্যাগ খুলে টাকা জেঠুর হাতে দিতেই একটা স্বস্তি ফুটে উঠল জেঠুর চোখে। অল্প হেসে পিছন ফিরল জেঠু। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে-থাকতে সোহা ভাবল জীবনে ভালভাবে বেঁচে থাকতে খুব বেশি টাকার দরকার নেই। যা দরকার তা হল, আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকা। আবার এই আত্মবিশ্বাস জোগায় টাকা। সুতরাং টাকাটা খুব দরকার। একেবারে নিজের উপার্জিত টাকা। তা হলেই জেঠুর মতো স্বস্তি ফুটে উঠবে চোখে। বৃষ্টি আরও বেড়েছে। বাড়ির উল্টোদিকের বিভুবাবুর বাড়িটা বৃষ্টির তোড়ে ঝাপসা দেখাচ্ছে। জানালা খোলা পড়ে আছে কখন থেকে কে জানে। সোফাটা ভিজে গিয়েছে একেবারে। উঠে গিয়ে জানালা বন্ধ করে দিতে গিয়ে সোহা ভাবল এইবার একটা ছাতা কিনতে হবে। সুপার মার্কেটে ভাল ছাতা পাবে? নিভাদির ছেলে বিশু ওখানকার রেস্তরাঁয় চাকরি করে। ওরা নাকি ইচ্ছে হলেই বিরিয়ানি খেতে পায়। কিন্তু বাড়িতে আনতে পারবে না। এটাই নিয়ম নাকি। মৃদুকে নিয়ে একবার ওদের রেস্তরাঁয় গিয়েছিল সোহা। বিশু খুব খুশি হয়েছিল। বিদেশে কি বিরিয়ানি খেতে পায় মৃদু? ল্যাপির কাছে ফিরে এসে মৃদুর মেসেজের জবাব দিতে গিয়ে হাত থেমে যায় ওর। কী হবে আর এসব করে! মৃদু কি সোহাকে অন্যরকম চোখে দেখে? সোহা যেমন করে ভাবে, মৃদু কি সেভাবে সোহাকে ভাবে? কেন মনে হয় তেমন করে কাঁকন বাজছে না!

দরজা খুলে খোলা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল সোহা। লম্বা ঝুলের কুর্তির সঙ্গে পালাজো পরা সোহাকে দেখে ভিজিয়ে দিচ্ছিল বৃষ্টি। ভিজে ঝুব্বুস হয়েও অস্থিরতা কমছিল না সোহার। ওই মেয়েটা মৃদুর সঙ্গে ওভাবে নাচছিল! কখনও মৃদু সোহার হাত ধরেও হাঁটেনি তো! পার্ক স্ট্রিটের চার মাথার ট্র্যাফিকের মাঝে পড়ে সোহা থতমত খেয়ে গেলেও মৃদু পাশাপাশি থেকেছে। কিন্তু হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়নি। সোহা কি চায়নি মৃদুকে কাছে পেতে! মৃদু সেকথা বুঝতেও পারেনি। কেন বোঝেনি? ও কি বোকা? আসলে দিদা যেমন বলে, যার যাতে মজে মন! মৃদুর মন কার জন্য মজেছে?

বেলেঘাটার মাসি এসেছিল। মাসি আসা মানেই অদ্ভুত সব খবরের আমদানি। এবারে খবর, কে নাকি ভুয়ো প্রোফাইল তৈরি করে বন্ধুত্ব পাতিয়ে প্রতারণার ব্যবসা খুলেছে। সোহাকে বারবার সামধান করেছে মাসি, “দেখিস, তোদের তো আবার ফেসবুকের কারবার। ফাঁদে পড়িস না। ট্রাপে ফেলে কখনও প্রেমিক সেজে, কখনও মেয়েবন্ধু সেজে,” বলে-টলে সিল্ক শাড়ি খসখস করে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে চলে গেল মাসি। “মিল্ক পার্লারের সামনে যাত্রী-ছাউনির নীচে দাঁড়িয়ে গাড়ি ধরতে হবে। বৃষ্টির জন্য ছাউনিতে ভিড় হয়। এমনিতেই ভিজতে হয়,” বলে মাসি ঠোঁটের অদ্ভুত ভঙ্গি করেছিল। দেখে হি-হি করে হেসে ফেলেছিল সোহা। মা কড়া চোখে তাকিয়েছিল। ভাবটা, বড়দের কথায় হাসবে কেন? এসব নাকি অসভ্য আচরণ।

মাসি চলে গেলে আকাশের কালো মেঘের দিকে তাকিয়ে সোহার মনে হয় কোথাও খোলা হাওয়া নেই। বন্ধ ঘরে দম আটকে আসে। মেঘকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল ওর। এক কাপ কড়া কফি বানিয়ে খেতে-খেতে সোহা বাগানের মধ্যে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া চেনা ঢোঁড়া সাপটাকে দেখে। চেহারাটা দেখে ভয় হয়। কিন্তু এই সাপের বিষ নেই। অনেক রাত পর্যন্ত হাজরার সঙ্গে মিছে প্রেমালাপ সারতে-সারতে হাই তুলল ও। ঢলঢলে নাইটি পরে নিয়ে চুল আঁচড়ে নিল। হাল্কা হাতে আপার স্ট্রোকে ক্রিম লাগাতে-লাগাতে মাসির কথাটা ঘুরপাক খায় মাথায়। একটা ভুয়ো প্রোফাইল বানিয়ে মৃদুর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতালে কেমন হয়? এমন বন্ধু হতে হবে, মৃদু ওই মেয়েটাকে ভুলে যাবে! সময়টা ভাল না সোহা। হালফিল সময়ের সঙ্গে চলতে হলে সেভাবে স্টেপ ফেলো। ভয় কীসের? কোনও ক্রাইম তো করছ না! ও মৃদুকে ভালবাসে। ভালবাসায় কৌশল নিতে পারা যায় বলে শুনেছে সোহা।

খুঁজে-খুঁজে বেশ স্মার্ট সুন্দরী এক তরুণীর ছবি দিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেলে সোহা। ঠিক যেমনটি ভেবেছিল, সেভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে। একদিন মৃদুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল। অধীর প্রতীক্ষার ফলে ফল ফলেছে। আজ তিনদিন পরে মৃদু রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করেছে। সোহা আজ খুব ভাল করে ঘুমোবে। কাজ হচ্ছে। কিন্তু উৎপাত বেড়েছে। প্রচুর প্রেমিকের আবির্ভাব হয়ে গেল। একদিনেই। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় এত প্রেমিক? এদের কারও কি নিজের ভালবাসার তরঙ্গ নেই? নাকি মেয়ে দেখলেই হামলে পড়েছে? তবু মৃদু তিনদিন ওয়েট করেছে! মানেটা জেনে খুশি হবে কিনা ভাবে সোহারানি। মৃদু তেনার প্রেমে এতই মশগুল যে সোহার, মানে আলিয়ার রিকোয়েস্টটা চোখেই পড়েনি। কেমন এক ধরনের জালে জড়িয়ে পড়েছে মৃদু। কখনওই বুঝতে পারবে না কে আছে এর পিছনে। নেট ঘেঁটে অভ্যস্ত মৃদু আটকে পড়েছে এক অন্তর্জালে। সোহা মন দিয়ে আলিয়ার মেল আইডি বানিয়ে নিল। খুব ঘুম পাচ্ছে আজ। বাইরে বৃষ্টির হুলহুলা নাচন ঘরের ভিতরে সংক্রামিত হয়ে গেল সোহার মধ্যে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে সোহা। মৃদু ওকে খেয়াল করেনি কখনও, অথচ সোহা ভাবত মৃদুর এত মেসেজ পাঠানো, বিদেশে লোনলি ফিল করা – সবটাই সোহার জন্য!

পুজোর মার্কেটিংয়ে যেতেই হল উইকএন্ডে। এখন ফেসবুক ছেড়ে নড়তে ইচ্ছে করে না। ফেসবুক মানেই মৃদু। কিন্তু মন ভাল আছে বলেই হয়তো মাকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল। খুব পছন্দ করে জামাকাপড় কিনবে আজ। এখন ফ্যাশনে খুব ইন স্ট্রেট স্যুট, সঙ্গে বাহারি জ্যাকেট। একটা প্যাচওয়ার্ক জ্যাকেট কিনল সোহা। কালারটা মৃদুর ভারি পছন্দ। ডেনিম টপের সঙ্গে এথনিক ঘাঘরা নিল। মা একটু অবাক হল। সোহা ছিমছাম হালকা পোশাকেই কমফর্টেবল। এই ধরনের ড্রেস কালেকশন ওর ধাতে নেই। মুখে কিছু বলেনি মা। সোহা আজ সবার মন বুঝে যাচ্ছিল। মা অবাক হয়েছে। হোক। ঠকতে আসেনি সোহা। ওই শ্যামলা সুন্দরীর হাত থেকে মৃদু সরে না আসা পর্যন্ত সোহার শান্তি নেই। ও মৃদুর ক্ষতি চায়নি। যা করেছে, যেন মৃদুকে বাঁচাতে। সোহার ভালবাসা বাঁচাতে। সোহা কিছুটা বাগানের ঢোঁড়া সাপটার মতোই তো। কেবল এঁকেবেঁকে চলছে। আর কিচ্ছু নয় মৃদু, বিশ্বাস কর। মোট্টে বিষ নেই সোহার। এক্কেরে ঢোঁড়া ছাড়া আর কী ও? মায়ের জন্য কলমকারি শাড়ি পছন্দ করতে-করতে মুখ নিচু করে চোখের জল লুকোয় ও। কাউকে এই জল দেখাতে চায় না সোহা। ওর চোখের জলের প্রত্যেক অণুতে কেবল একটা ছেলের নাম লেখা, যার কাছে এই জলের কোনও মূল্য নেই!

আজ ইচ্ছে করে সময়ের পরে ফেসবুকে এসেছে আলিয়া। লগ ইন করতেই একত্রিশটা মেসেজ দেখে হাঁ হয়ে গেল। কী কাণ্ড! এরা কারা। মেসেজ বক্স খুলতে-খুলতে মৃদুকে পেয়েও গেল। মৃদু কেবল ‘হাই’ তুলে ছেড়ে দিয়েছে। সোহা জানতে চাইল মৃদু ঘুমোচ্ছে কি না। এত হাই তুলছে যখন। চটপট জবাব এল। একটা স্মাইলি। সঙ্গে রগড়, “ঘুমোইনি ডার্লিং। তোমার জন্য জেগে আছি।”

একটু অবাক হল সোহা। মৃদু এখন পাক্কা ফেবুদের মতো কথা বলতে শিখে গিয়েছে। কিন্তু মজা জমে গিয়েছে। মজ্জা হি মজ্জা। ঢোঁড়া এখন ল্যাজে খেলিয়ে ডাঙায় তুলবে মৃদুকে। মৃদু ওই সুন্দরীকে ভুলে যাবে, তারপর আলিয়ার ছুটি। বিধ্বস্ত মৃদুর পাশে সোহা ছাড়া আর কেউ থাকবে না! ও হো হো! এবারে সাম্বা নাচবে সোহা!

রবিবারের সকালে কনককাকু এসে হাল্লা মাচিয়ে দিল। ওরা নাকি লাক্ষাদ্বীপে বেড়াতে যাচ্ছে। তো সোহারা যদি যেতে চায়... সোহা মোটেই আগ্রহী হল না। কোথাও যাওয়া মানেই খরচ! তা ছাড়া গোছগাছ করবে, হইচই...ধ্যাত, ভাল্লাগে না ওর। মন ভাল না থাকলে কিছু কি ভাল লাগে? মৃদু কার সঙ্গে হাওয়াই দ্বীপে নেচেকুঁদে মরছে আর সোহা নিঃসঙ্গ মনে লাক্ষাদ্বীপে বেড়াতে যাবে?

মা কিছু আন্দাজ করেছে সম্ভবত। সোহার মধ্যের হাহাকার হয়তো মা বলেই একমাত্র টের পেয়েছে। প্রায় জোর করেই মা রাজি করাল বাবাকে। সোহাকে নিয়ে একটু বেড়িয়ে আসাই যাক। নিভা আছে। বাড়ি সে বেশ সামলাতে পারবে। জেঠুকে নিয়ে অত হাঙ্গামা নেই। নিজের মনে থাকেন। নিভা খুব ভাল ট্যাকল করে নিতে জানে।

অনেকটা অনিচ্ছা নিয়েই বেড়াতে গেল সোহা। ভেবেছিল হয়তো বিস্বাদটা কেটে যাবে। কিন্তু সঙ্গে আরও দুটো ফ্যামিলি যাচ্ছে। সোহা বিরক্ত হল একথা জেনে। চেল্লামেল্লি করে ক’টাদিনের শান্তি নষ্ট করে দেবে বেশি লোকজন হলে। কিছু মহিলা থাকবে নিশ্চয়ই, যারা সোহাকে নিয়ে প্রশ্নে-প্রশ্নে ঝাঁঝরা করে দেবে! তেমন শুরু হয়েছিল। সোহাও বিরক্ত হয়ে উঠেছে। ঠিক সেসময় লাক্ষাদ্বীপে পৌঁছে গেল ওরা। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরোজা রঙের সাগর, নীল আকাশে দেখে বিস্বাদ-টিস্বাদ হাওয়ায় উড়ে গেল ওর। সোহা ভাবল এইখানে একদিন ও মৃদুকে নিয়ে আসতে পারত। কিন্তু হল না। হয় না। ভাবতেই চমকে উঠেছে সোহা। কী আজেবাজে ভাবছে ও? আলিয়া কি হাল ছেড়ে দিয়েছে?

বিকেলের দিকে বেড়াতে বেড়িয়ে বৃষ্টির কোপে পড়ে গেল ওরা। মাচার উপর ছাউনি নেই। তাড়াতাড়ি করে হোটেলে ফিরে এল সবাই। পরদিন জাহাজে চেপে দ্বীপে বেড়াতে যাচ্ছে। জাহাজের নাম ক্যাভারান্ডি। নীল জল দেখতে-দেখতে মন উদাস হয়ে গেল সোহার। ল্যাপি খুলে আলিয়া মৃদুর সঙ্গে রসালাপ শুরু করে দিল। মৃদু ঠাট্টা ইয়ার্কি চালিয়ে যাচ্ছে তাল ঠুকে। রসালাপ করতে-করতে একসময় হাঁফিয়ে উঠল সোহা। এভাবে ক’দিন?

ইচ্ছে করছিল সোহা হয়ে মৃদুর সঙ্গে কথা বলতে। নিজের প্রোফাইলে গিয়ে অবাক হল। মৃদুর মেসেজ! ইনবক্সে গিয়ে আরও অবাক। মৃদু মেসেজ করেছে। আলিয়া নামের একটি মেয়ে বড্ড জ্বালাচ্ছে। আনফ্রেন্ড করে দিতে পারে। কিন্তু খারাপ লাগছে সেটা করতে। আজ আলিয়া মৃদুকে প্রপোজ করেছে। মৃদু তাই অন্য নামে অ্যাকাউন্ট খুলে আলিয়াকে সরিয়ে দেবে মৃদুর থেকে। দারুণ স্মার্ট মডেল টাইপ ছেলের ছবি খুঁজছে ও। আর নানা কথা লিখেছে মৃদু। সোহা সাবধান হল। মৃদু কি বুঝতে পেরেছে? ও মেসেজের জবাব দিল। আলিয়া বেশ ভালই তো। তাহলে কেন মৃদু ওকে...? হাওয়াই দ্বীপের সঙ্গিনীর জন্য?

একটু পরেই মেসেজ এল। একটা স্টিকার। রক্তাক্ত হৃদয় হাতে নিয়ে হাতটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছে একটা বাঁদর। তারপরেই মেসেজ এল, “আমার জেঠিমা টাইপের মেয়েটাকেই চাই।”

“মানে? কার কথা বলছিস?” সোহার গলা কি একটু কেঁপে গেল!

“চিরকাল বোকাই রয়ে গেলি। স্পষ্ট করে না বললে বুঝিস না? আমি তোর কথা বলছি। এবারে গিয়ে নিয়ে আসব তোকে।”

ভীষণ বোকা মেয়েটা কাঁপা হাতে হাওয়াই দ্বীপের ছবিটা বের করে। আজ গোলগাল ফুলের মালা পরা মেয়েটাকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করল। ছবিটাকে লাইক করল সোহা। এতদিন করা হয়নি! এই আন্তর্জালের হিসেব করেনি ও!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%