জমিজিরেত

সাগরিকা রায়

ভিজে পা মুছতে মুছতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল অনিকেত। কিছু কাজ বাকি রয়ে গেছে। কিন্তু কাজগুলো কীভাবে সামাল দেবে, তা ও জানে না। আর তাই একটা খিচ রয়ে যাচ্ছে মাথায়। ঘরে ধুনো দিচ্ছিল ইলোরা। ধুনোর গন্ধে ঘর ভরে আছে। কিছু বলল না ইলোরা। ধুনো ঘুরিয়ে চলে যাচ্ছে। অনিকেত ভিজেছে কিনা জানতেও চাইল না। দীর্ঘ বিনুনি কোমর ছাপিয়ে দুলছিল। বিড়বিড় করছে ঠোঁট। এসব সেরে কথা বলবে। ব্যাকুল হবে, ‘এ কী! ভিজে গেছ যে!’

ধোয়া লুঙ্গি, গেঞ্জি চেয়ারের হাতলের ওপর অনিকেতের জন্য অপেক্ষমান। ঝাঁটপাট দেওয়া পরিচ্ছন্ন ঘরে পরিপাটি বিছানা। সন্ধে হয়ে গেল। বৃষ্টিটা ফের শুরু হল। ভিজে এসে ম্যাজম্যাজ করছে শরীর। মধুর দোকান থেকে গরম সিঙাড়া নিয়ে এলে হত। চা-এর সঙ্গে ভালো লাগত। ওহো! কালোজিরের ছিটে দেওয়া কটকটি বিস্কুটও আনা হল না। রেনকোট কি বের করেছে ইলোরা? কবে থেকে বলে রেখেছে অনিকেত। নাঃ! বিস্কুটটা আনা উচিত ছিল। সব ভুল হয়ে যাচ্ছে। মনটা পড়ে আছে অন্যখানে।

জামাকাপড় চেঞ্জ করে বিছানার ওপর পা গুটিয়ে বসল অনিকেত। ইলোরা কখন আসবে এ ঘরে? আসলে মনের দুশ্চিন্তা কারও সঙ্গে শেয়ার করলে ভালো লাগে! ইলোরা ছাড়া আর কে আছে ওর? অথচ ইলোরা চলে গেল। কিছুই বলল না!

বৃষ্টির শব্দটা টিনের ওপর নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে সজোরে। বারান্দায় কে কথা বলছে? কে এল?

গলা বাড়িয়ে ইলোরার মুখের কিছুটা দেখা গেল। কী বলছে। ইলোরা? কার সঙ্গে কথা বলছে? বৃষ্টির কথা বলছে? তিনদিন ধরে টানা বৃষ্টি পড়ছে। এখন দু’জন মানুষের দেখা হলেই বৃষ্টির প্রসঙ্গ উঠছে। কিন্তু ইলোরা কার সঙ্গে কথা বলছে? এই বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কে এল আবার?

‘কে এল ইরা?’ জোরে ডেকে উঠেছে অনিকেত। শুনতে পেল কিনা বোঝা গেল না। তবু ইলোরার মুখটা একটু ঘুরে গেল অনিকেতের দিকে।

‘শাক্য। শাক্য এসেছে।’ ইলোরা হাসছিল।

শাক্য! বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এল ছেলেটা! আগে জানলে ওকে দিয়েই সিঙাড়া আনানো যেত! কটকটি বিস্কুটও। বৃষ্টি কি ধরেছে? শাক্যকে কি বিস্কুট আনতে বলবে? কিছু কি ভাববে শাক্য? শাক্যর কথার টুকরো অংশ মাঝে মাঝে ছিটকে আসছে। ওরা কি এঘরে আসবে না? এ কী? কোথায় চলল দু’জনে? ইলোরার পেছন পেছন বারান্দার শেষ প্রান্তে চলে যাচ্ছে শাক্য। আচ্ছা। পাখি দেখাবে ইলোরা। সকালে পাখিঅলা এসেছিল। ইলোরা চারটে পাখি কিনেছে। তাই নিয়ে মেতে আছে। কী যেন নাম পাখিগুলোর, বাবরি, বাগরি... মনে পড়ছিল না অনিকেতের।

বিছানার ওপর পা মুড়ে বসে মনটা চা চা করছিল। শাক্য এসেছে। এখন চা হবে নিশ্চয়ই। তিনজনে একসঙ্গে বসে চা খাবে। শাক্য এঘরে আসবে তো? কয়েকটা কথা ছিল ওর সঙ্গে। গরম চা, ছোলাসেদ্ধ দিয়ে মুড়ি মেখে নিয়ে এল ইলোরা। পেছনে শাক্য। জুত করে বসল চেয়ারে।

‘দাদা যে! এসময় বাড়িতে? জমিতে যাননি আজ?’

‘নাঃ।’ ঘাড় নাড়ে অনিকেত, ‘যাইনি। তবে যাব। মনটা ভালো নেই শাক্য।’ অন্যমনস্কভাবে কাপটা হাতে নিল অনিকেত।

‘কেন?’ শাক্য হেসে হেসে জানতে চাইল।

‘ফসলটা ভালো হচ্ছে না!’ জিভটাকে মূর্ধায় ঠেকিয়ে আফশোসের চিক শব্দ করল অনিকেত।

‘তোমার চাহিদা খুব বেশি!’ ইলোরার বিরক্তি ধুনোর গন্ধভরা ঘরে ছুটোছুটি করে, ‘ধান তো ভালোই হয়েছে। পেছনের জমিতে হলুদও ভালোই হয়েছে!’

‘আপনাকে একটা কথা বলব দাদা’, চায়ের কাপ টেবিলের উপর রাখল শাক্য, ‘আপনি যখন ভালো ফসল চান, তখন জমিটা তৈরি করুন আগে। আপনার জমিটা কিন্তু ভালো তৈরি হয়নি।’

‘মানে, সার-টার দিতে বলছ?’

‘সে তো আছে। তাছাড়াও আছে। একটু খরচাপাতি করতে হবে।’ হাসছিল শাক্য। খরচের প্রসঙ্গে চোখ কপালে তুলেছিল ইলোরা। সেটা দেখেই হাসছিল শাক্য। ওকে হাসতে দেখে মজা করে হাসল ইলোরা।

‘খরচ মানে?’ অনিকেত ছেলেটাকে ছুঁতে পারছিল না। গ্রাম বাংলার দৃশ্য আঁকা সাদা পাঞ্জাবি পরা ছেলেটা কী বলছে? কী ফ্যাচাং বাঁধাল আবার?

মনে মনে হিসেব কষছিল শাক্য, ‘যন্ত্রপাতি চাই, জমি তৈরি করবেন, অথচ খরচ করবেন না, তাই হয়?’ কিছু না বলে উৎসুক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে অনিকেত।

‘কী রকম খরচ?’ অবশেষে জিজ্ঞাসা করেই বসে।

চেয়ারের উপর নড়েচড়ে গুছিয়ে বসে শাক্য, ‘বীজতলা তৈরিতে কত্ত সময়, শ্রম খরচ করছেন। সময়মতো এসব না করলে ফসল নষ্ট। কিন্তু নিজের হাতে বীজতলা তৈরি করতে দেরি হচ্ছে না? সময় মতো ফসল রোপণও তো করতে হবে। আমার কথাগুলো বুঝতে পারছেন দাদা? রাগ করলেন না। তো?’

হাসে অনিকেত। রাগ কেন? শাক্যর কথার ওজন আছে। ঠিকই বলেছে ও। বীজ বপনের আগেও অনেক কাজ। জমি তৈরি করতে সোহাগ চাই। তবেই না বীজতলা তৈরি হবে। তারপর তো বপন।

নড়ে বসে অনিকেত। শখে পড়ে জমিটা কিনেছিল। অথচ জমির কী-বা বোঝে ও? ফলে অবস্থা দাঁড়িয়েছে যাচ্ছেতাই। এর তার বুদ্ধি ধার করে আর কদ্দুর হয়? বীজতলা তৈরি করতে গিয়ে সারারাত জমিতে পড়ে থাকতে হয়েছে ক’দিন। ইলোরা তো খেপে গিয়ে যথার্থ লাল। এদিকে অনিকেতের তো যাকে বলে ল্যাজে গোবরে দশা। দুটো কামলা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখে হুকুম দেবে কাকে? কামলা দু’টো যা জানে ও তার সিকিভাগও জানে না। মাটিকে কাদায় পরিণত করতে গিয়ে জান বেরিয়ে যাওয়ার জোগাড়। সেকথা মনে করে হেসে ফেলল অনিকেত।

শুনে শাক্যও হাসে, ‘মাটি কতটা কাদা হল, তার উপর জমির জলধারণ ক্ষমতা নির্ভর করে, না দাদা?’

‘আর বোলো না! এসব অভ্যেস কখনো ছিল?’

‘সে ঠিকই বলেছেন। তাই বলছি, কিছু আধুনিক যন্ত্রপাতি ইউজ করুন জমিতে। আপনারা শিক্ষিত মানুষ। আপনারাই যদি আধুনিক না হন, তাহলে বিজ্ঞানের আবিষ্কারগুলোর কী হবে?’

বাবাঃ! বেশ কথা বলে ছেলেটা। বয়সে ওর চেয়ে অনেকটা ছোটো। বোধ হয় ইলোরার বয়সি হবে। চটপটে। মিষ্টি চেহারা। ইলোরার সঙ্গে ঠাকুরপো-বউদি সম্পর্ক। ও আসায় ভালো হয়েছে। ইলোরা সঙ্গী পেয়েছে। অনিকেত তো বউ-কে সময় দিতেই পারে না।

‘শাক্য, বীজতলা তৈরির যন্ত্র আছে নাকি?’

‘বাঃ। আছে না? পুডলার, পাওয়ার টিলার...। জানেন না? শোনেননি কখনও?’

গুমোট বর্ষার দিনে শাক্য খোলা বাতাস নিয়ে এসেছে আজ। দিন কুড়ি মার্কেটে ঘোরাঘুরি করল অনিকেত। কয়েকদিন সঙ্গও দিল শাক্য। ছেলেটার জ্ঞানগম্যি আছে। হবেই। এগ্রিকালচার নিয়ে পড়েছে! তবে হ্যাঁ! বুদ্ধি ধার নিতে হল হাঁটুর বয়সির কাছে। ইলোরা এ নিয়ে ঠাট্টা করে।

বাড়ি ফিরতে সন্ধে হয়ে গেল সেদিন। যন্ত্রপাতি আনতে হচ্ছে। দাম কম নয় এসবের। ব্যাঙ্কেও যেতে হল। টাকা-পয়সা তুলতে হয়। ইলোরা আপত্তি করেনি। লোকটার ওই একটা দিকে ভারি ঝোক। নিজের জমি! বিয়ে হওয়া পর্যন্ত ওই এক কাহিনি! কাজেই বারণ করেনি ইলোরা। যদিও অনিকেত ইলোরার মতামত নেওয়ার কথাও ভাবেনি। কোনো অন্যায় কাজ তো করছে না! জমি কিনেছে। এখন সেই জমি তৈরির কাজ চলছে। ব্যাস!

‘নেক্সট? তারপর?’

রাতে ঘুমুতে গিয়ে হঠাৎ-ই সংলাপটা শুনতে পেল একদিন। পাওয়ার টিলার আনব আনব করেও হচ্ছে না। কোথায় যেন একটা দ্বিধা কাজ করছিল। একলাখ টাকা দাম! আবার মনে হয়, দরকারি জিনিসের দামের দিকে তাকাতে হয় না। পরক্ষণে ভয়, এতগুলো টাকা! শাক্য সাহস জুগিয়ে চলে, ‘কিনুন, কিনে ফেলুন। ভয় কী? টাকা ফের জমে যাবে ব্যাঙ্কে।’

ইলোরা বুঝেছিল অনিকেত ইতস্তত করছে। ও ইশারা করল। শাক্য ইশারা বুঝে পাশে বসল অনিকেতের ‘আপনি দাদা বারো হর্স পাওয়ারের পাওয়ার টিলার কিনুন। হেভি ধান চাষ হবে দেখবেন। আমার জেঠার বাড়িতে দেখেছি। খুব অল্প জায়গার মধ্যে ঘোরানো যায় যন্ত্রটা। একটা লোক লাগিয়ে দেবেন। ব্যাস।’

কিনেই ফেলল অনিকেত। এর সঙ্গে রোটোভেটর লাগিয়ে জমি কাদা করে নিচ্ছে। ফসল বয়ে নেওয়া, জমি উর্বর করা, ফসল ঝাড়াই সব ঘটা করে করার ব্যবস্থা হচ্ছে! সেদিন হাঁটু অব্দি কাদা মেখে বাড়িতে ঢুকেছে। দেখে শাক্য বসে। জ্যোতিষচর্চা করছে। ইলোরার হাত দেখছিল ও। অনিকেতের কিম্ভুত চেহারা দেখে দু’জনেই থ। হেসে উঠেছে অনিকেত, ‘কিগো! চাষিটাকে চিনতে পারছ?’

সত্যি! ইতিহাসের মাস্টারমশাইয়ের মধ্যে চাষি হওয়ার লোভটা কোথা থেকে এল? মাঝে মাঝে চিন্তাকুল হয়ে পড়ে অনিকেত। বাপ-ঠাকুরদার কারও মধ্যে কি এই মাটি-মায়া ছিল? নিজের জমি, একান্ত নিজের মাটিটুকুতে ফসল ফলবে, এই স্বপ্ন কত হাজার লক্ষ বার দেখে ফেলেছে ও! কাউকে বোঝাতে পারেনি। আবার, পাওয়ার টিলার বাড়িতে আসার পর ইলোরাকে দিয়ে যন্ত্রের গায়ে সিঁদুর ছুঁইয়েছিল অনিকেত। এই সংস্কার এল কোথা থেকে?

‘নেক্সট?’

বহু পুরোনো দৃশ্যপট ছিড়ে সেই শব্দ ভেসে আসে। বৃদ্ধ জেঠা ইজি চেয়ারে বসে আছেন। মাঝে মাঝে উচ্চারণ করতেন শব্দটা। হয়তো নিজেকেই প্রশ্নটা করতেন। তখন ছেলেবেলা। হাসাহাসি করত ভাইবোন মিলে। কিন্তু এখন আর হাসি আসে না। মনে হয় এখন নিজেকে যেন সেই প্রশ্নের সম্মুখীন করার সময় এসেছে। এরপর? কয়েকদিন আগে একটা খবর দিল শাক্য। আরও কিছু যন্ত্রপাতি কেনা চাই। কথাগুলো বলে মুচকি হাসে শাক্য। হাসতে হাসতে কালোজিরে ছিটানো বিস্কুট খাচ্ছিল ও। এই বিস্কুট... এল কোথা থেকে? ইলোরা শাক্যকে দিয়ে আনিয়েছে? ইলোরা কি শাক্যর জন্যই বেকারির বিস্কুট আনিয়ে রাখে? মন দিয়ে শাক্যর বিস্কুট চিবুনো দেখছিল অনিকেত। বেশ খেতে বিস্কুটগুলো। আচ্ছা, কালোজিরে কীরকম জমিতে চাষ হয়? কোন ঋতুতে? গম লাগাবে ভাবছে! সে সম্পর্কে একটু খোঁজ ...! শাক্য কি জানে?

অন্যমনস্ক অনিকেতের দিকে তাকিয়ে চোখে চোখে ইশারা হচ্ছিল। হাসি সামলাতে সরে পড়ল ইলোরা। শাক্য গম্ভীরভাবে হাতের ভেতরে বিস্কুটের গুঁড়ো নিয়ে দোলাতে থাকে। হাতের দুলুনি দেখতে দেখতে হাসি ফুটে ওঠে অনিকেতের ঠোঁটে। দুলছে। বাতাসে দুলছে ওর ধানের চারা। সোনালি রসে পুষ্ট চারা। চনমনে তাজা তার শরীর। ঢেউ উঠেছে জমির উপর। পাকা ধানের গন্ধ শরীরে মেখে জমির কাদা দিয়ে শিব সেজে তাথই নৃত্য করে অনিকেত, ‘চ্যাং বলে ব্যাং/ব্যাও বলে। চ্যাং/নাচো গনাই-এর বাপ গামছা মাথায় দিয়া/ও শিব নাচো - ও-ও-ও!’

টুকটাক বাজার করতে বেরিয়েছে ইলোরা। শাক্যকে সঙ্গে নিয়েছে। খুশি হয়েছে অনিকেত। ভাগ্যি শাক্য ছিল। ঘণ্টা দুয়েক ঘোরাঘুরি করে পেটিকোট বা ক্লিপ কেনার মধ্যে কীসের যে সুখ, এই ছয় বছরেও বুঝে উঠল না অনিকেত। দেখেশুনে একাই বাজারে যেত ইলোরা। বছরখানেক ধরে শাক্য সঙ্গ দিচ্ছে। ধৈর্য আছে ছেলেটার। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ বেছে দেয়। ইদানীং বিউটি পার্লারে যাচ্ছে ইলোরা। খুশি হয়েছে অনিকেত। ভালোই তো! লাগেও বেশ ইলোরাকে। মানায়ও। শাক্য বলেছিল একদিন সে কথা। তখন নতুন আলাপ হয়েছে শাক্যর সঙ্গে। ব্যাঙ্কে আলাপ, তারপর বাড়িতে চলে এসেছে, ‘এলাম বউদি। বলেছিলেন, কথা রাখলাম।’ ঝলমল হেসেছে ইলোরা, ‘বেশ করেছেন। যখন খুশি আসবেন।’

কথাটা মেনে নিয়েছে শাক্য। যখন খুশি আসে। সরকারি চাকরি করে। এরপর বিয়ে-থা করলে ইলোরার সঙ্গীর সংখ্যা বাড়বে। তো, প্রথম দিনই ইলোরাকে দেখে শাক্য বলেছিল, ‘আপনাকে দেখতে হুবহু বিদ্যা বালান।’ বিদ্যা বালানকে চেনে না অনিকেত। ওর দৌড় অপর্ণা সেন পর্যন্ত। হিন্দি ছবি দেখাই হয় না ওর। মনের সঙ্গে চোখও পালটে যায় মানুষের। এখন দেখলে অপর্ণা সেনকেও চিনবে কিনা সন্দেহ! প্রশংসা শুনে লাল হয়েছিল ইলোরার গাল। হেসে বলেছিল, ‘তবু আপনি বললেন! ও তো বলেনি কখনো।’

বোকা মুখে সাফাই গেয়েছে অনিকেত, ‘আমি কি চিনি? বিদ্যা বালানের নাম আজই শুনলাম।’ না শুনলেও যে বলা যায়, অন্যভাবেও বলা যায়, জানত না অনিকেত। ও নিজের জগতে মগ্ন। পটের ছবির মতো একটার পর একটা ছবি চোখের সামনে নাচে ওর। কখনো দুলকি চালে হাঁটে পাওয়ার টিলার। কখনো জমিকে কাদা করে তুলছে ও। কোথায় কোন পটুয়া বসে বসে পটের ছবি দোলাতে থাকে ইতিহাসের মাস্টারমশাইয়ের সামনে। ছেলেবেলায় দেখা সেই পটুয়া হাত ঘুরিয়ে ছবি দেখাতে থাকে, কালীঘাটের কালী আছে/চুলগুলান সব মেলিদিছে/পান খাওয়া, ঠোঁট লাল করিছে/খকর খকর হাসিতেছে ... এ ..এ! সেই ভাবে অনিকেত আর তার জমির ছবি পালটে যেতে থাকে। খেয়াল করেনি কখন ওর পাশ থেকে উঠে গেছে ইলোরা। খেয়াল হয়নি ওর বউয়ের বিনুনি টেনে খুনসুটি করছে শাক্য। ছদ্মকোপে তেড়ে যাচ্ছে বউ!

ইলোরা বুঝেছিল অনিকেত ঘুমোয়নি। আলগা খোঁচা দিতে চোখের ওপর থেকে ভাঁজ করা হাত সরাল অনিকেত, ‘কী হল?’

‘আমিও তা-ই জানতে চাইছি। কী হল?’

‘ভাবছি। জমিটা তৈরি করতে বেশ কিছু যন্ত্র তৈরি করতে হল। এগুলো ফেলে রাখা যাবে না। পাশের জমিটা কিনে নেব? ভালো জমি ওটা। অবশ্য তৈরি করতে হবে! তুমি কী বলো?’

ইলোরা জানে এসব প্রশ্নের জবাব অনিকেতের পথ ধরে দিতে হয়। ও হাসে, ‘বেশ তো!’

খুশি হল অনিকেত, ‘তাহলে এবার জমিতে যা ফসল উঠবে... দেখো! এভাবে লেগে থাকতে পারলে চাকরি ছেড়ে দেব!’

ইলোরা বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। কোনো জবাব এল না ওর তরফ থেকে। ঘুম নেই অনিকেতের। জমি তৈরি করছে। আদিম মানুষ ঘরবাসী হওয়ার চেষ্টায় এমন খেটেছিল হয়তো। স্কুলে সি এল নিয়ে জমিতে পড়ে থাকে অনিকেত। শাক্য উৎসাহ দেয়। ছেলেটা সবসময় পেছনে পড়ে থাকে ওর।

এটাই ভালো হল। প্রথমে জমি তৈরি। তারপর ফসল। ফসল! ভাবতে বসে যায় অনিকেত। সোনালি ধানের হাসির সুরেলা আওয়াজ এখনই টের পাচ্ছে। সোনা রোদ মাখবে সবুজ ধান। তারপর অনিকেতের ঘরে সোনা আসবে। মাস্টারসুলভ গাম্ভীর্য হারিয়ে অভিজ্ঞ চাষির মতো বীজ বপনের যন্ত্র ঘোরাতে থাকে অনিকেত। প্রাক্-অঙ্কুরিত ধানের বীজ চারটে ড্রামের ভেতরে ভরে যন্ত্রের উপর বসিয়ে দেয়। তারপর ঘোরাতে থাকে যন্ত্র। ড্রাম থেকে ছিটকে ছিটকে বীজ পড়ে মাটিতে। তৈরি জমিতে বসে যায় বীজ। মাটির ঘ্রাণে ডুবে যায় সেসব প্রাণ। ব্যাপারটা বুঝতে একদিন গেছিল ইলোরা। ওকে দেখে খুশিতে যন্ত্র ঘোরায় অনিকেত। বীজ ছিটকে পড়ে। একদৃষ্টে সেইসব কাণ্ডকারখানা দেখতে থাকে ইলোরা। জংলা ফুল তুলে ওকে দিচ্ছিল শাক্য। অন্য মনে ফুল নিল ইলোরা। ওর উপস্থিতিতে সোৎসাহে যন্ত্র ঘোরে।

আসলে প্রত্যেক মানুষের জীবনের ব্যস্ততা তাকে সুখী করে তোলে। অনিকেত তীব্র সুখাবেশে ভাসছিল। হলদিবাড়ি থেকে শর্মি-নিলয় এসেছে। ইলোরার দিদি-জামাইবাবু। সেলফোন মারফত খবর আগেই পেয়েছিল ইলোরা। দিদির ননদ দিয়ার বিয়ে। আপনজনদের পেয়ে খুব খুশি ইলোরা। আজ শাক্য আসেনি। গয়েরকাটায় ওর বাড়ি। ওখানে গেছে। আগামীকাল আসবে।

‘তারপর? দিদি, খবরটবর বলুন!’ অনিকেত আড্ডার মেজাজে।

‘দিয়ার বিয়ে। খবর ভালো। চিঠি নাও।’ শর্মিদি ঝলমল করছিল।

‘ও বাবা! আমি ভেবেছি আপনার মেয়ের বিয়ে।’ রসিকতা করে হা হা হাসে অনিকেত।

‘সে-ও হয়ে এল সময় প্রায়। ক্লাস সিক্স! আর কটাদিন সবুর করো। শর্মিদি হি হি করে।

ওরা কথা নিয়ে গেল। অনিকেতকে যেতেই হবে বিয়েতে। তিনদিন পরে বিয়ে। ইলোরা আগের দিন যাবে ভেবেছিল। শেষপর্যন্ত অনিকেত পারল না যেতে। কী করে যায়? জমিটা তৈরি হচ্ছে ... এ সময় কি...!

অগত্যা শাক্য ভরসা। ও-ই নিয়ে গেল ইলোরাকে। ইলোরা একটু চুপচাপ ছিল। তবে বিশেষ মাথা ঘামাল না অনিকেত। স্ত্রীজাতি সামান্য কারণকে অসামান্য করে দেখে। শাক্য যথেষ্ট ভালোভাবেই নিয়ে যাবে ওকে। চিন্তা কী? বাসে চাপিয়ে দিল। অনিকেত ওদের বাস ছাড়ার মুহূর্তে ইলোরা বলল, ‘ভালো থেকো!’

হাত নাড়তে নাড়তে জয় শিবশম্ভু বাসটা চলে যাচ্ছে। এই বাসে চেপেই তিনদিন পর বাড়িতে ফিরে আসবে ইলোরা। একটু ছুটি পেল সংসার থেকে। ভালো হল!

তিনদিন নয়, ইলোরা এল চারদিন পার করে। শাক্যকে নিয়ে ফিরেছে। তখনই জমি থেকে ফিরেছে অনিকেত। ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে ওরা ঢুকতেই সাদর অভ্যর্থনা জানাল ওদের।

‘এসো, এসো! তারপর... জানো শাক্য... জমিতে জলটা ভালো দাঁড়িয়েছে। গতকাল একটু খাটুনি গেল... তবে তাতে কী, কাজটা সফল হলেই হল... কী বলো...?’

ক্লান্ত ইলোরা সব কথা শুনছিল কিনা বোঝা গেল না। ব্যাগ নামিয়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিল শাক্য। অনিকেত বলে দিল, মধুর দোকান থেকে গরম সিঙাড়া নিয়ে এসো আসার সময়ে!

‘তাহলে, চলি?’

ঘাড় নাড়ে অনিকেত, ‘এসো।’

ওর নয়। ইলোরার অনুমতি চাইছে শাক্য। ইলোরা ঘাড় নাড়ল না, কথা বলল না, হাসল না। অথচ শাক্য কী করে যেন অনুমতি পেয়ে গেল। ঠোট সুচালো করে শিস দিতে দিতে চলে গেল।

স্কুল থেকে খবর নিতে এসেছে শুভেন্দু। পরপর দু’দিন স্কুলে যায়নি অনিকেত। কোনো খবরও দেয়নি।

‘বসুন। এসে পড়বেন।’ ইলোরা চেয়ার দেখাল।

‘কখন গেছেন?’

‘ভোরে।’ টুকটাক কাজ সারতে সারতে ফিরে তাকাল ইলোরা। ‘একদিন আসুন না। ওঁর জমি দেখে আসুন। এত ব্যস্ত ওটা নিয়ে!’

‘আপনি?’

‘ঘরকন্না!’ হাসল ইলোরা। ওর হাসিতে কিছু খুঁজছিল শুভেন্দু। কী খুঁজছে জানে ইলোরা। ছয় বছরের বিবাহিত জীবন কতটা হাসাতে পারছে তার মাপ নিচ্ছে অনিকেতের কোলিগ।

‘কাল কি স্কুলে যাবে?’

জানে না ইলোরা। অনিকেত নিজেও হয়তো জানে না!

অনিকেত ফেরার পরে প্রশ্নটা করেছিল ইলোরা। অনিকেত আশ্চর্য হয়, ‘কাল? না, না! কাল কী করে ...?’

পরদিন ভোরে বেরিয়ে সন্ধেয় ফিরল অনিকেত। শাক্য একটা বেলফুলের মালা নিয়ে এসেছে শিবমন্দিরের মোড় থেকে। সেটাই খোঁপায় জড়াচ্ছিল ইলোরা। বারান্দায় শাক্যর বাইক দেখেই শাক্যর উপস্থিতি টের পেয়েছে অনিকেত। চেঁচাল, ‘শাক্যসাহেব! আমার জমি রেডি। বীজ বপন বাকি শুধু।’ অসম্ভব গাঢ় গলায় শাক্য বলল, ‘জানি।’ জানি? ইয়ার্কি? বাড়ি বসে সব জেনে গেল?

মাঝরাতে প্রবল বৃষ্টি নেমেছে। ভিজে গেল অনিকেতের মাটি। শোঁ শোঁ শব্দে জল খাচ্ছিল। বহুদিনের উপোসি যেন। ওপাশ ফিরে শুয়ে আছে ইলোরা। ভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে না ঘুমোচ্ছে কিনা? অনিকেত কাছে টানল, ‘এসো।’ শরীর কুঁচকে নিল ইলোরা, ‘ধ্যাৎ!’ বৃষ্টির জল শরীর চুইয়ে কোন মহাসাগরে মিলিত হচ্ছিল কে জানে! বিমূঢ় অনিকেত বুঝতে পারে না জমিটা আর কীভাবে তৈরি করবে। গলতিটা কোথায়?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%