সাগরিকা রায়
ইদানিং খুবই অসুবিধেয় পড়েছে প্রকাশ সরকার। মাঝরাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় হুট হাট। ঘুটঘুটে ঘরে কিছুই চোখে দেখা যায় না। মগজ থেকে বোধ গুলোকে টেনে টেনে বের করতে হয়। মাথায় টোকা দিয়ে দিয়ে মনে করতে হয়ও কোথায় সোফা, কোথায় আলমারি, কোথায় ক্যাবিনেট। ওদের সঙ্গে মনে মনে বাক্যালাপ চালাতে হয়। ওদের, মানে এই ফারনিচারগুলোকে লোকে জড়বস্তু ভাবে। প্রকাশ তা ভাবে না। তেমন হলে ওদের সঙ্গে চিন্তার আদান প্রদান করতো কি করে? তবে রোজ রোজ কত আর কথা থাকে? অথচ ঘুমটা তো ঠিক ভেঙ্গে যায়ও। বন্ধ জানালা দরজার ভেতরে দম আটকে আসে। নিজেকে মনে হয় মৃত। রোজ এই কান্ড! মনস্তত্ত্ব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে এমন দুজন ওর কথা শুনল। দুজনেই বলল, তোমার অবচেতন তোমার মনের গোড়া ধরে নাড়া দিচ্ছে। তোমার পারসোনালিটি বিকশিত হচ্ছে না। অসুখ সেটাই। মন খারাপ করে রোজ শুতে যাও। দুঃখ জেগে থাকে। সে ঘুমুতে পারে না। আর তোমাকেও জাগিয়ে রাখে।
পরামর্শ পাওয়া গেল, কিন্তু ওষুধ কোথায়? গত সোমবার রাতেও ঘুম ভেঙ্গে গেল যথা নিয়মে। মনে হল ও যেন মরা মানুষ। ঠিক তখনই হু উ স স স, ফত ফত... শব্দে ভীষন চমকে উঠল প্রকাশ। পরক্ষণে সামলে নিল। আচ্ছা! নিকিতার নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ। বেঁচে থাকার শব্দ। তাহলে বৌটা বেঁচে আছে!
আর রে! বউ বেঁচে আছে! এটা তো জানা কথা। ও কি অবচেতনেও বউকে মৃত ভাবতো?প্রকাশ কি মাঝে মাঝে ইমপরট্যান্ট ব্যাপারগুলো ভুলে যাচ্ছে? আলঝাইমার্স? না না, মাথা নাড়ে প্রকাশ। বউএর কথা কেউ কি ভুলে যায়? নিকিতা আছে বলেই না ও আজ ঘর জামাই! আদুরে মেয়েকে কাছে রাখতে পেরেছে শাশুড়ি! সেটা সম্ভব হয়েছে প্রকাশ নিকিতার হাজব্যান্ড বলেই!
ঘরজামাই! শব্দটাই এমন, মনটা খারাপ করে রাখে সারাক্ষণ। জীবনে ঘেন্না ধরে গেল। পুরুষমানুষ হয়ে এমন একটা দুর্ঘটনায় জড়িয়ে পড়া! আবার তার জন্য দুঃখ করা ...। লোকে শুনলে দুয়ো দেবে যে! অথচ প্রকাশের অন্য উপায় নেই। শাশুড়ি মল্লিকা হালদারের দিকে তাকাতে ভয় করে। এই বিষয়টা নিয়ে ভেবেছিল প্রকাশ। কাউন্সিলং-এর প্রয়োজন আছে ওর। কথাটা চাউর হলে যা তা দশা হবে। হয়তো শ্বশুর বাড়িতেই খবর চলে গেল। তখন আর এক কেচ্ছা! নিজেই উদ্যোগ নিয়ে চলে গেল ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন- পরিবারের সবার সঙ্গে বোঝাপড়া থাকলে জীবনটা সুন্দর হয়। আপনি অ্যাডজাস্ট করার চেষ্টা করুন।
হচ্ছে না।
কেন? চেষ্টা করেছিলেন? – ডাক্তার জানতে চান।
‘করেছি। কিন্তু, উনি আমাকে মহিলা সমিতির নাম করে ভয় দেখান।’
আপনি কি এমন কিছু করেছেন, যার জন্য ...? বা, আপনার অবচেতন ...!
‘না, না, ডাক্তারকে থামিয়ে দিল প্রকাশ – আমার অবচেতন আমার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে স্যার। অপরাধ বলতে আমি একজন ঘরজামাই। রোজ স্বপ্নের ভেতরে হালদার শাশুড়ি আমাকে মহিলা সমিতিতে নিয়ে যাওয়ার ভয় দেখান।’ টানা কথা বলে হাঁপায় প্রকাশ।
চিন্তিতমুখে ডাক্তার প্রকাশকে দেখেন – ঘুম হয়? না? ঘুমের ওষুধ লিখে দিচ্ছি। সাতদিন খান। লাইট পাওয়ার। ঘুম হলেই এসব উপসর্গ চলে যাবে।
সাতদিন পর কী হবে, সেটা ডাক্তার খুলে বলেননি। কিন্তু প্রকাশ যা বোঝার বুঝে নিল। এখন কেবল শাশুড়িই নয়, বউকে দেখলেও ভয় করে। প্রসাদময়ি বিদ্যাপীঠের হেডমাস্টার মহিম সিকদারের দৃষ্টির সঙ্গে এত মিল হয় কী করে? ভেতরে ভেতরে কোন গড়বড় নেই তো?
এসব কথা উড়ে আসে মনে। পর মুহূর্তে ধিক্কার দেয় নিজেকে। নিজের স্ত্রী সম্পর্কে এসব মনে আসা উচিত নয়। অফিসের মাইতিদা বলেন– ‘বউএর নিন্দে করতে হলে গর্ত খুঁড়ে তার ভেতরে করো। ফের গর্ত বুজিয়ে রেখো। শোন, বউ হল ভগবান।’
ভগবানই বটে! মাধ্যমিক ফেল মেয়েকে গ্র্যাজুয়েট বলে বিয়ে দিয়েছিল শ্বশুর। তখন হাতে চাকরি নেই, ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছে। অযাচিত ভাবে একটা প্রস্তাব এল। সুন্দরী শিক্ষিতা পাত্রীর জন্য পাত্র চাই। বাবা, মায়ের একমাত্র সন্তান, দোতলা বাড়ি, জমি, রিসর্ট, চা বাগান... মানে যা তা কান্ড! শর্ত হল ঘরজামাই হতে হবে। কম্পিটিটর ছিল মন্দ নয়। কিন্তু, চেহারাটার জন্য প্রকাশ পাশ করে গেল। শ্বশুর বেকার যুবক চেয়েছিলেন। কিন্তু বিয়ে ঠিক হওয়ার পরই এক আধা সরকারি অফিসে চাকরি পেয়ে গেল প্রকাশ। শ্বশুর এতে বিরক্ত – কি দরকার ছিল চাকরির? তোমাকে পছন্দ করেছি, কিন্তু মেয়ে বলেছিল পাত্রর মধ্যে কনফিডেন্সের অভাব আছে। সম্পত্তি টম্পত্তি দেখে ভয় পেলে নাকি!’ শুনে লজ্জা পেয়েছিল প্রকাশ। আবার বুঝতে পারছিল না ওকেই কেন সিলেক্ট করা হল, যখন কনফিডেন্সের অভাব! তবে বুঝেছিল, যখন বিয়ের দিন চারেকের মাথায় ষন্ডাগুন্ডা টাইপের একটা লোক ওকে হাতছানি দিয়ে ডেকেছিল। ওই হাতছানি সর্বনাশের মুল কিনা বুঝতে পারেনি প্রকাশ। লোকটা করুণ চোখে ওকে দেখছিল। পাশের চায়ের দোকানে বসিয়ে যা বলেছিল, তাতে প্রকাশের কনফিডেন্স কাপের তলানিতে এসে ঠেকল- বড্ড ঠকিয়েছে দাদা আপনাকে। ওই মেয়ে পাড়ার অটোওলার সঙ্গে পালিয়েছিল। দিন সাতেক দিঘা পুরী করেছে। তারপর ওই শালা শ্বশুর আপনার, মেয়েকে পাকড়ে নিয়ে গেল বাড়িতে। কত্ত ভয় দেখালাম। বললাম, মোবাইলে ছবি তুলে রেখেছি। সব ফাঁস করে দেব। মেয়েটাও শালা নাম্বার ওয়ান খানকি। বলে কিনা দেব তোমার সব ফান্ডা ফাঁস করে। সাত–সাতটা দিন লেপটে থেকেও কুমারীই রয়ে গেছি। বাঁচতে চাও তো ফোটো হিঁয়াসে। কী জিনিস ভাগ্যে জুটল বুঝতে পেরেছেন তো মাইরি?
পুরো বিষয়টাই নড়বড় করছিল। অটোওলাই বা কে, এই লোকটাই বা কে? উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ, প্রথম পুরুষ মিক্সিতে ঘুঁটে একাকার।
‘আপনি তো ভাই মহা চালাক লোক, কিছুই বুঝিনা ভাব দেখিয়ে বেশ আছেন। অটো চালাই বলে ভেবলু ভাববেন না।’ লোকটা চায়ের পয়সা না দিয়েই চলে গেল। অগত্যা বিয়ের পর প্রথম খরচা বলতে বউএর প্রাক্তন প্রেমিকের জন্য চায়ের দাম দেওয়া। একটা মারাত্মক ভাবনা সেট করে দিয়ে গেল লোকটা। বউটা তো সাংঘাতিক জিনিস! ভয় পাওয়ারই কথা। তো, ভয় টয় পেয়েও টিকে ছিল। ইদানিং বউএর চোখ দেখলে নিদারুন ভয় হয়। শীত করে। ভেবেছিল শ্বশুরের সম্পত্তি দেখাশোনার কাজ করলে মনটা তাজা থাকবে। কিন্তু জীবনটা পানসে হয়ে উঠেছে দিনকে দিন। লাস্ট উইকে নিকিতার তুতো ভাই গুলু গুপ্ত কথা ফাঁস করে দিয়ে গেছে – নিকিতা ক্লাস এইট অব্দি পড়েছে। সিক্সে তিনবার ফেল। শুনে লজ্জায় মাথা হেঁট প্রকাশের। নিকিতা যদি জানতে পারে, ওর জীবনের গোপন কথা প্রকাশ জানতে পেরেছে, কী ভাববে! এরপর থেকেই নিকিতার দিকে তাকাতে বড্ড ভয় হয় ওর। নিজে পাশ করতে পারেনি, তাই ওর উচ্চাকাঙ্খা বেশি। নিজে যা পারেনি, স্বামীকে ঠেলে সেখানে তোলা নিকিতার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বোঝে প্রকাশ। মুশকিল হল, বুঝদার স্বামী পেয়ে নিকিতা ঝোপে ঝাড়ে সোনার হরিণ দেখে। আবদার করে, যাওনা গো, এনে দাওনা গো! আমার বড্ড শখ। প্রকাশের চোখে চালশে। সোনার হরিণের নামই শুনেছে। চোখে দেখেনি। তার উপরে কনফিডেন্স নেই। সুতরাং হরিন আর ধরা হয় না। ফেল করা বর ফেলু বউএর দিকে তাকাতে পারেনা।
শুক্রবার সকালে এক কান্ড হল। ল্যান্ড রেভিনিউ অফিসার এসে হাজির। মল্লিকা হালদার ত্রস্ত - যাও, জমিটুকু যে যাবে! কিছু কর!
কিছু যে কী করে করতে হয়, প্রকাশ তার বিন্দু বিসর্গ জানে না। শ্বশুর অজিত হালদার দু কথা শুনিয়ে দিল–‘সবই বোঝে, না বোঝার ভান করে।’ প্রকাশ তাও বুঝতে পারেনি কেন অটোওলা আর শ্বশুর ওর সম্পর্কে একই কথা বলে!
প্রকাশের উপর ভরসা না করে অজিত হালদার নিজেই নেমে পড়েছে মঞ্চে। অফিসারকে কেবল খাওয়ালই না, হাতে মোটা খামও দিল। দামি মোবাইল গিফট করল। নিজের রিসটে ঘুরে যাওয়ার আমন্ত্রন জানিয়ে রাখল। শুধু একটা ফোন, ব্যস।
প্রকাশকে বাঁ হাতে সরিয়ে পুরো স্টেজ দখল করে যেভাবে অজিত ম্যাজিক দেখাল, প্রকাশ তো অবাক। পরিবার পিছু সরকার যত বিঘা বেধে দিয়েছে, তার বেশি হলে সরকারের হাতে চলে যাবে। তবে বাগান নাকি এর মধ্যে পড়ে না। তাই কিছু জমিকে আম আনারসের বাগান দেখিয়ে দেওয়া হল।
পাশ করা শ্বশুর ফেল করা জামাইয়ের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে। ভাবটা হবে হবে, হতাশ হয়ো না! এদিকে, রাতে নিকিতা মুখ ভার করে থাকে। কমদিন তো হলনা দুজনে একসাথে রয়েছে। অথচ মা মল্লিকা হালদারের সামনে বাবা অজিত হালদার যেমন হাইভোল্টেজ দৃষ্টি মেলে দাঁড়াতে পারে, অজিতের সামনে মল্লিকাও হাইলি কনফিডেন্ট। মল্লিকা হালদার হতে ইচ্ছে হয় নিকিতার। হ্যাঁ, ইচ্ছে করলেই অমন ঝক্কাস মেজাজ দেখাতে পারে, কিন্তু অপোজিট পার্টি যদি ম্যাদামারা হয়, তাহলে কী সুখ! এইখানেই মায়ের কাছে হেরোভূত হয়ে যাচ্ছে নিকিতা। নিকিতার কালো মুখ দেখে বিছানার সঙ্গে লেপটে থাকে প্রকাশ।প্রসাদময়ী বিদ্যাপীঠের চওড়া বারান্দা দিয়ে ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে টের পায় সামনের ছেলেরা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। পোষা টিয়ে প্রকাশ খাঁচার ভেতরে বসে ভেজা ছোলা চিবুতে থাকে। শ্বশুর জল জোগায়, শাশুড়ি ছোলা। আর নিকিতা উপদেশ দেয় – উঠে দাঁড়াও, খুঁটে খেতে শেখ। অন্যদিনের মত চিন্তিত মুখে বাড়িতে ঢুকেছে। অফিসে জোর গুজব এবার ট্রান্সফারের অর্ডার এল বলে। প্যানেলে তিনজনের নাম রয়েছে। প্রকাশ তাদের একজন।
‘বল কি?’ নিকিতার গাল ঝুলে পড়ল। প্রকাশ ভয়ে ভয়ে তাকায়। নিকিতা এখনই গালাগালি শুরু করবে। কথা হল সেটা কাকে? প্রকাশ কে? নাকি সরকারকে? দুজনের জন্য অবশ্য একই ভাষা। এই ক্রুশিয়াল সময়ে মাইতিদাকে মনে পড়ে প্রকাশের। বলেন- বুঝলে, জীবন হল খেলার মাঠ। রেসে কে ফার্স্ট হবে সবসময় তারই কম্পিটিশন চলছে। তোমাকেও ছুটতে হবে। সেটাই দেখছে প্রকাশ। ছাদনাতলা থেকে নামার পর থেকেই দেখছে।
অফিসে হই চই! এসময়ে ট্রান্সফার মানেই জব্বর ক্ষতি। দীপকের সান্ধ্যকালীন সাইবার কাফের বারোটা বাজবে। শঙ্কুদার চা পাতার দোকানের চব্বিশটা বাজবে। অফিস করেও সাইড বিজনেস করে এরা। একমাত্র প্রকাশের এসব ঝামেলা নেই। ট্রান্সফার হলে ওর অসুবিধে নেই। শুনে প্রকাশ বিরক্ত হল। নেই মানে? শ্বশুর, শাশুড়ি বউ আছে না ওর? মাংস খুলে নেবে প্রকাশের গা থেকে! কেরিয়ারিস্টিক মাইণ্ডসেট নিয়ে সংসারে সেটল ডাউন করলে পরে ফ্রস্টেটেড লাগে। আবার সব ছেড়ে যাওয়া! নিকিতা ওর সঙ্গে যাবেনা নিশ্চয়! কী করবে প্রকাশ? বড় কঠিন এই ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট! ঘরজামাই চিরটাকাল হাঁদা হয়ে থাকুক! যার কোন গেম প্ল্যান নেই তার আছেটা কী?
বিছানার পাশে আয়না। চুলে চিরুনি চালাচ্ছে নিকিতা। কন্ডিশনারের ব্যবহারে সুন্দর সেট হয়েছে চুল। নিভাঁজ স্কিনে আলো পড়ে চকচক করছে। স্বচ্ছ নাইটির ভেতরে উদ্ধত নিকিতাকে দেখে শ্বাস ফেলে প্রকাশ। কত দূরে পাঠাবে কে জানে! দীর্ঘ নিশ্বাসের শব্দে ফিরে তাকাল নিকিতা – কি হল? ফোঁস ফোঁস করছ কেন?
-কিছু না।
-বাবা তোমাকে ডেকেছিল। দেখা করে এস।
হাঁটুতে জোর পায়না, তবু উঠতে হল। শ্বশুর ইশারায় বসতে বলল – তা, কী করবে, ভেবেছ কিছু?
প্রকাশ অবাক – কী ব্যাপারে?
-বদলির ব্যাপারে! বুদ্ধি জমিয়ে রেখ না। শুনলাম, তোমাদের অফিসে নাকি কনফারেন্স হচ্ছে?
-হচ্ছে। পঁচিশ দিন পরে।
-এখানেই হচ্ছে? শ্বশুর নাগাড়ে প্রশ্ন করতে থাকেন – ওপরওলারা আসছেন? কয়জন? কবে?
-ঠিক জানিনা, আসছেন বোধহয়।
-বোধহয়! এখনও খবর নাওনি? খোঁজ নাও কারা আসছেন। কোথায় উঠছেন। দেখভালের দলে ঢুকে যাও। সরু চোখের দৃষ্টিতে ষড়যন্ত্রর সোয়েটার বুনতে থাকে অজিত হালদার। ঘরজামাইএর মগজে জল, সার ছিটিয়ে দিতে থাকে – কাল অফিসে গিয়ে খোঁজখবর নাও। চোখ, কান খোলা রাখো। এখন যাও।
অফিসে গিয়ে চোখ কান খোলা রেখেও কিছুই বুঝতে পারেনা প্রকাশ। কেউই পরিষ্কার করে কিছু বলছে না।
শুনে শাশুমা সিরিয়াল থেকে চোখ সরিয়ে ওকে দেখল- কেউ তোমার মত নয়। সবাই সব জানে।
মনটা ফের বিষণ্ণ। হেডমাস্টার মহিম সিকদার প্রগতি পত্র হাতে দিতে দিতে ধমকেছিলেন – কী সব স্টুডেন্ট! উইক ইন অল সাবজেক্টস। কিস্যু হবেনা।
চার চারটে জেলা থেকে অফিসের লোকজন আসছে। একেবারে হাটের হই চই। কনফারেন্সের ঝামেলা কম নয়। ফাঁকা অফিসে বসেছিল প্রকাশ। নাইট গার্ড ওকে দেখে অবাক – আপনি যাননি? একটু খৈনি দিন।
আমি তো খৈনি খাইনা সুভাষ।
খাননা? ধুস, খৈনি না খেয়ে থাকেন কী করে?
লজ্জিত হল প্রকাশ। সত্যি, খৈনি খাওয়া উচিত ছিল।
আসলে মাথাটা কাজ করছে না সুভাষ! বলেই ফেলে প্রকাশ–খুব ঝামেলা চলছে।
আপনার আবার ঝামেলা কী? পুরোটাই সামলাচ্ছে শঙ্কুবাবুরা দুজন। দীপকবাবুর বউ এসেছিল সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে। শঙ্কুবাবু বাড়িতে নেমন্তন্ন করে রেখেছেন। ওরা গিফট দেবে সাহেবকে, শুনেছি।
তা-ই? প্রকাশ অবাক।
তাই মানে? আপনিও কাজে লেগে পড়ুন। সাহেব গেস্ট হাউসে আছেন। সাহেবের কাছাকাছি থাকবেন বলে দীপকবাবু নতুন জুতো কিনে পরেছেন। সুভাষ খবর দেয়।
শ্বশুরকে খুশি মনে এত সব খবর দিতে গিয়েছিল প্রকাশ। শ্বশুর অবাক – অফিসার যখন গেস্টহাউসে আছেন বলে জান, তখন সেখানে না গিয়ে বাড়িতে এসে ঢুকলে কি বলে? খিদে পেয়েছিল? এখন সাহেবকে খোশামোদ করার সময়। বদলিটা আটকাতে হবে না?
খোশামোদ? বদলি আটকানো? প্রকাশ কি পারবে?
-পারবে। মান-সম্মান নিয়ে ভাবতে নেই এসব ক্ষেত্রে। এতদিন যখন ভাবনি, এখন রেখে দাও সব ভাবনা। অর্জুনের মত লক্ষ্যভেদ কর। নজর রাখো পাখির চোখে। না পারলে পুরুলিয়ায় বদলির জন্য প্রস্তুত হও। শ্বশুরের এক ধাঁচের তাড়না, বউয়ের আরেক ধাঁচের।
-ওরা অফিসারদের বাড়িতে ডেকে খাওয়াচ্ছে, তুমিও ডাকো। যে দেবতা যাতে তুষ্ট। ওষুধ তো তোমার হাতের মুঠোয়।
ওফ! ঘরে বাঘ, বাইরে বাঘ। কপিশ রঙের চোখ দেখে দেখে ভয়ে প্রাণ পকেটে নিয়ে ঘোরে প্রকাশ। কনফারেন্স শুরু হয়েছে। এখন লুকিয়ে থাকেই বা কি বলে? দীপকের বাড়িতে কাল অগস্ত্য অন্নগ্রহণ করবেন। শঙ্কুদা চিতলের পেটি, আর আর কী, কী...খাওয়াচ্ছে। ওদের সাইবার কাফে আর চা পাতার দোকান বেঁচে গেল? প্রকাশের গায়ে পুরুলিয়ার বাতাসের ছ্যাঁকা লাগে!
নিকিতা ধমকায় – সারাদিন ভাব কী?
সত্যি! কী যে ভাবে সারাক্ষণ! সেদিন পশ্চিমের জমিতে ইয়াবড় এক গোখরো বের হল। তাড়াতাড়ি পালিয়ে আয়, তা নয়, হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। শ্বশুর শুনিয়ে শুনিয়ে বলল – কী যে হবে! আমি মরলে সব ছারেখারে যাবে। এসব শুনে মুখে ভাত তুলতে পারেনা প্রকাশ। মনে হয়, এইযে ভাত খাচ্ছে, এই চাল পশ্চিমের কাওশালি ধানের চাল। ওই ক্ষেতেই বিষধর গোখরোটা বেরিয়েছিল। সাপটা কি ধানের দুধ খেতে বেরিয়েছিল সেদিন? দুধ খেয়ে বিষ রেখে চলে গেছে, এমন হয়নি তো? সেই বিষ কোথায় গেল!
অবশেষে কনফারেন্স শেষ হল। সাহেবের যাওয়ার সময় হল। শেষবেলায় শ্বশুর ডেকে বলল– কিছু ব্যবস্থা নিলে না। যাও এখন, দেখা কর। সব সুযোগ অন্যকে দিলে। চাকরিটা ছেড়ে দাও। আমার যা আছে, দেখে রাখতে পারলে তোমারটা খায় কে? কী হবে ওই দু পয়সার চাকরি করে!
ঝট করে ছোরা বিঁধে গেল বুকে! চাকরি ছেড়ে দেবে? ওটাই তো বাঁচার একমাত্র উপায়। ঘরজামাই শব্দটাতে লজ্জা থাকলেও কিছুটা মান ইজ্জত চাকরির মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে প্রকাশ। এরপর বউয়ের দিকে সরাসরি তাকাতে পারবে! কিন্তু বদলির কথাটাও ফেলনা নয়। কী যে করে বেচারা ঘরজামাই!
সুভাষ বলেছিল, সাহেব আজই যাবেন। লজ্জা আর বিমর্ষতা নিয়ে স্টেশনে গেল প্রকাশ। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ঝাঁঝ মিশিয়ে নিকিতা বলেছিল – যাও, কিছু করে দেখাও। ঝাঁঝে চোখে জল এসে গেছিল প্রকাশের। ঝাপসা চোখে দেখল দীপকদা হাত কচলাচ্ছে – আবার আসবেন স্যার! শঙ্কুবাবু সুবিধে – অসুবিধের খোঁজ রাখছেন। সাহেবের ব্যাগ ব্যাগেজ তুলে দিচ্ছেন কামরায়। পিঠে খোঁচা খেতেই চমকে উঠল প্রকাশ। পেছনে শ্বশুর।
গিফট এনেছ কিছু?
না, মানে, এত তাড়াতাড়ি করে এলাম! প্রকাশ জিভ কাটে মনে মনে।
তবে? শ্বশুরের ভ্রু কুঞ্চিত হয় ডাকাত সরদারের মত। ওদিকে আবার ট্রেন নড়ে উঠল। পুরুলিয়ার বাতাসের হলকা ধা করে ছুটে গেল স্টেশনের উপর দিয়ে প্রকাশকে ছুঁয়ে। চাকরি ছেড়ে দেবে? একা ঘরে নিকিতা... স্বচ্ছ নাইটি... শ্বশুরের সম্পত্তি... নিজের মান সম্মান...।
তুমি কিছু করতে পারবেনা ঘরজামাই! জীবন তোমার এই গতিতে চলবে। কোন কাজেই লেটার মার্কস পেলেনা! আফশোস ছিল অজিত হালদারের কথায়। অপমানে ফ্যাকাশে হয় প্রকাশ। জীবন এই গতিতে চলবে? বুক জ্বালা করে। সাহেব গাড়িতে উঠেছেন, প্রকাশ নড়ে ওঠা গাড়িতে উঠে পড়ল – স্যার, সাহেব অবাক হবেন জানা কথা। এই লোকটা সামনেই আসেনি, এখন কী বলতে চায়?
স্যার, আমি প্রকাশ সরকার। চলে যাচ্ছেন, আমি দেখাশোনা করতে পারলাম না। নেক্সট টাইম আমি যেন সুযোগ পাই। আর স্যার, যদি জমি দরকার হয়, বলবেন। কাঠা দুই জমি স্যার ধরুন পেয়ে গেছেন। আমার কিছু জমি আছে। কোন অসুবিধে নেই স্যার।
ঘরজামাইয়ের পেছন পেছন অজিত হালদার ছিল। বোকা মানুষ কী বলতে কী বলে! সামলাতে এসেছিল শ্বশুর। এসে তো অবাক। ঘরজামাই কথা বলছে! প্রকাশ আরও অবাক! স্বপ্ন দেখছে নাকি? হেডমাস্টার মহিম সিকদার ওর সামনে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছে! আর, সাহেব হেসে হেসে পাশে বসতে বলছেন!
কী হবে জানেনা প্রকাশ। চেষ্টা করল বদলিটা আটকাতে! বাতাসের গন্ধ বলছে কাজ হবে। নিকিতাকে ছেড়ে যাওয়া অসম্ভব যেমন, চাকরি ছাড়াও তেমনই। মাস পয়লা মাইনে পেয়ে নিকিতার হাতে তুলে দেওয়ার সুখ কি কম? অন্তত, দুটো দিন জোর গলায় বলতে পারে – এক কাপ চা দিয়ে যেও ঘরে। সেই জায়গাটকু হারাতে চায়না ও। কিন্তু, এত বড় স্টেপ নিল, শ্বশুরের পারমিশন নিল না?
পিঠে হাত রাখে শ্বশুর। ঢোঁড়া বিষ পেল কী করে এটাই ভাবনার। তবে সে যে ফণা তুলেছে, এটাই স্বস্তির। এতদিনে যোগ্য হতে পেরেছে নিকিতার। বাড়ি ফেরার সময় ভারি আন্তরিক শ্বশুর – নিকিতা খুশি হবে। ও ওর মায়ের মত। লেটার মার্কস না পেলে পাত্রই মনে করে না। আমারই কি কম ঝামেলা গেছে জামাই?
সমমনস্ক, সমব্যথী শ্বশুর–জামাই হাত ধরে পাশাপাশি পথ চলে। প্রকাশ খেয়াল করল এই প্রথম শ্বশুর ওকে জামাই বলেছে। ঘর শব্দটা বাদ দিয়েছে।
কাওশালি ধানের ক্ষেতের গোখরো বিষ জমিয়ে রেখেছিল ধানের শিষে। প্রকাশ সেই চালের ভাত খেয়েছে। ঢোঁড়া গোখরো না হয়ে পারে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন