সাগরিকা রায়

জোড়াসাঁকো থেকে একটা সাহিত্য উৎসব সেরে ফিরছিল অতনু। তিনদিনের অনুষ্ঠানের মধ্যে প্রথম দুটো দিন তো যাওয়ারই সময় পায়নি। তৃতীয় দিনে আর অপেক্ষা করেনি। বেরিয়ে পড়েছিল বাড়ি থেকে। বের হওয়ার আগের মুহূর্তে ফোনের স্ক্রিনে তপসিয়ার অঞ্জলিদির নাম দেখেও ফোন রিসিভ না করেই পকেটে রেখে দিয়েছে। বেজে বেজে একটা সময় ফোনটা থেমে যেতে অতনু শান্তির শ্বাস ফেলল।
বাসের জন্য অপেক্ষা করেনি ও। মেট্রো চেপে সোজা কালিঘাট থেকে গিরিশ পার্ক। সেখান থেকে হন্টন যোগে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। বাড়ি থেকে বের হতে দেরির ফল, ফলেছে অনিবার্যভাবে। পৌঁছল পৌনে ছ’টায়। অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে আলোচনা জমে ওঠাতে আটকে গেল ও। তারপরেই জনপ্রিয় সাহিত্যিকদের ‘সাহিত্যে বাস্তবতার প্রয়োজনীয়তা’ নিয়ে আড্ডা...সুতরাং অতনুর মতো কবিকে কে আর সময় দেখতে বলবে! একবার মাত্র বাইরে গিয়ে একটু চা খেয়ে গলা ভিজিয়ে ফের এসে বসেছে।
সময়ের খেয়াল হয়েছিল খানিক পরে। পরবর্তী অনুষ্ঠানের আকর্ষণ যখন চেপে ধরতে যাচ্ছে, সেই মুহূর্তে ফের তপসিয়া...এবং অঞ্জলিদি! ফোনটা সাইলেন্ট মোডে রেখেছিল। ফোন নয়, ও সময় দেখতে যাচ্ছে, তখনই ফোনের স্ক্রিনে অঞ্জলিদির নামটা ভেসে উঠল মাগুর মাছের মতো। এবং তারপরেই ও চমকে উঠল। বাপরে! অঞ্জলিদি এটা কী করেছে? তেরটা মিসড কল? কেন?
স্টেজের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে উঠে পড়ল অতনু। অঞ্জলিদি বারবার ফোন করে চলেছে কেন? এমন স্বভাব নয় ওর। পারতপক্ষে ফোন করেই না। মাসে দুবার এসে সবার সঙ্গে দেখা করে যায়। মায়ের সঙ্গে ভাব আছে বলে মা খুশি হয় অঞ্জলিদি এলে। অঞ্জলিদি মায়ের দূর সম্পর্কের ননদের মেয়ে। মানে অতনুর দূরতুতো পিসির মেয়ে। তপসিয়ায় থাকে। একটাই ছেলে বেঙ্গালুরুতে চাকরি করে। সে মাকে না দেখে থাকতে পারে না বলে মাসে একবার হুট করে চলে আসবেই। এসেই বায়না, ‘এটা বানাও, খাব। ওই গল্পটা ফের বলো।’ একেবারে বাচ্চাদের মতো করে। অঞ্জলিদির বর দিব্যেন্দুদা বিরক্তি দেখিয়ে ছেলেকে মৃদু বকাবকি করে, ‘বড় হবি না? অফিসে এমন করিস নাকি?’
অতনুকে অঞ্জলিদি বারবার বলে, ‘যা, দুই ভাই একসঙ্গে চাকরি করবি। পরীক্ষা টরীক্ষা দে। একসঙ্গে থাকবি, আসবি। কেমন মজা হবে!’
অতনুর দায় পড়েছে কলকাতা ছেড়ে যেতে! এমন সাহিত্য উৎসবটুতসব কোথায় পাবে ও? তাছাড়া ওর নিজস্ব কবিতার পত্রিকা ‘মহুয়ার গন্ধ’-এর বা কী হবে? সে নাহয় পরের কথা, এই মুহূর্তের কথাটা বেশ উদ্বেগজনক। অঞ্জলিদি এখন আবার মেসেজ করেছে! কী মেসেজ...! ও বাবা! কোন মানে হয়? দিব্যেন্দুদা নাকি রাস্তা থেকে একটা আয়না তুলে এনেছে। অঞ্জলিদি ফেলে দিতে বললেও ফেলবে না। জেদ ধরে আছে। এখন অতনু যদি দিব্যেন্দুদাকে অনুরোধ করে তাহলে হয়তো কাজ হবে।
অতনুকে পছন্দ করে দিব্যেন্দুদা। সেটাই ভরসা অঞ্জলিদির। আসলে কার না কার আয়না! অঞ্জলিদি ভয় পাচ্ছে! আয়না নিয়ে অঞ্জলিদির খুব খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। সেটা দেখা হলে বলবে। আপাতত দিব্যেন্দুদাকে বুঝিয়ে আয়নার বায়না মাথা থেকে সরিয়ে দেওয়াই হল অতনুর একমাত্র কাজ।
ধুস! যত পাগলের কাণ্ড! দিব্যেন্দুদা কি ছোট নাকি? বুঝে সুজেই যা করার করেছে! আর একটা আয়না রাস্তা থেকে আনবে কেন? আয়না কি রাস্তায় পড়ে থাকার জিনিস? মানেটা হল ফুটপাথের দোকান থেকে কিনেছে আর কী! এটাও বলতে হবে তেরটা মিসড কল দিয়ে? নাহ, অতনু কাতর চোখে স্টেজের দিকে তাকিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরেটা আলোর ঢেউ তুলে সাগর হয়ে উঠেছে। কত লোকজন, কথাবার্তা...!
অতনু মানুষজনের পাশ কাটিয়ে একটু ফাঁকায় এসে রিং ব্যাক করল অঞ্জলিদিকে। ওদিকে ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল। কেউ রিসিভ করল না! বার দুই ফের চেষ্টা করেও অঞ্জলিদিকে পেল না অতনু। হয়তো অতনুকে না পেয়ে মাকে ফোন করেছে অঞ্জলিদি! এসব উল্টোপাল্টা না ভেবে বরং বাড়িতে চলে যাওয়াই বেস্ট। পরে অঞ্জলিদিকে ইনফর্ম করে দেবে। আর তখনই অঞ্জলিদির ফোন এল, ‘কী রে? খুব বিজি নাকি?’
‘আরে না। বল।’
‘কথা বলেছিস দিব্যেন্দুর সঙ্গে?’
‘তুমি অযথা ভাবছ একটা সামান্য বিষয় নিয়ে। আমি কথা বলব অবশ্যই। কিন্তু এটা এমন কী বিশাল ব্যাপার বল তো?’
‘তুই জানিস না বলে বলছিস। আয়না জিনিসটা খুব বিশ্রি। না, সব আয়না খারাপ তা বলছি না। সেটা হয়ও না। কিন্তু, তোকে বলছি আজ। আমাদের জয়েন্ট ফ্যামিলি। বাবা, জ্যাঠা, কাকা, তুতো ভাই-বোনদের মেলা। সারাদিন বাড়ি গমগম। তিনতলা বাড়ি। প্রত্যেকের ঘরেই আয়না রয়েছে। এছাড়া ওয়াশরুমেও আয়না মাস্ট। একদিন জেঠিমার সেরিব্রাল এট্যাক হল। হস্পিটালাইজড হলেন। একমাস বারো দিনের দিন এক্সপায়ার করলেন। তখন সকাল। আগের দিন দেখে এসেছি। কথা বলছিলেন না। কাউকে চিনতেও পারছিলেন না কদিন ধরেই। পরের দিন সকাল আটটা নাগাদ জেঠিমার ঘরের আয়নাটা ড্রেসিং ইউনিটের ওপর থেকে মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল।
সে কী শব্দ! আমরা যে যেখানে চিলাম শব্দ শুনে ছুটে গিয়েছি। মেঝে ভরে আছে কাচের টুকরোয়। সব টুকরোর মধ্যে ঘরের, কিছু মানুষ যারা ছিলাম ওখানে, তাদের প্রতিচ্ছায়া একটু একটু ফুটে উঠেছে। আমার মায়ের মন খারাপ হয়ে গেল। সবিতাকে ডেকে ঘর পরিষ্কার করতে বলতে বলতে ফের শব্দটা এল দোতলা থেকে। প্রবল শব্দে ভেঙে পড়েছে ওয়াশরুমের লম্বাটে আয়নাটা। আমরা হতচকিত হয়ে পড়েছিলাম। খুব আশ্চর্যের বিষয় নয় কি?
তখনই হাসপাতাল থেকে ফোন এল। জেঠিমা এক্সপায়ার করেছে আধঘন্টা আগে। আয়নার ভেতর দিয়ে কি নিজের চলে যাওয়ার বার্তাটা দিতে এসেছিলেন জেঠিমা? সবিতা এতগুলো কাচের টুকরো জড়ো করে কর্পোরেশনের গাড়িতে ফেলে দিল। সেই থেকে আয়না সম্পর্কে একটা ভীতি জন্মেছে আমার।’ অঞ্জলিদি শ্বাস ফেলল, ‘তুই তাহলে বাড়িতে যা। পরে কথা বলছি।’
অতনু মেট্রো স্টেশনের দিকে যাবে বলে পা বাড়িয়েছে, গলায় ডিএসএলআর ঝুলিয়ে সুজিতদা উল্টোদিক দিয়ে আসছিল, দেখা হয়ে গেল। জোড়াসাঁকোয় যাচ্ছে সুজিতদা। কিছু ছবি নেবে। ওকে মেট্রোর দিকে যেতে দেখে থামাল, ‘আজ কিন্তু মেট্রো ঝামেলা করছে! কাগজে দিয়েছে টালিগঞ্জ মেট্রোতে কিছু রিপেয়ারিং চলবে। রাত আটটার পরে মেট্রো অফ হয়ে যাবে। এখন কটা...হুম, সাড়ে আট। তাহলে আর কষ্ট কোরো না। উবর নিয়ে নাও।’
ইস, আজকের খবরের কাগজটা পড়ার সময় পায়নি অতনু। ভেবেছিল মেট্রোতে বসে নিউজ পোর্টাল খুলে দেখে নেবে। কিন্তু যাক যা গেছে তা যাক। সুজিতদার থেকে বিদায় নিয়ে রাস্তার উল্টো ফুটে চলে গেল অতনু। মোবাইল থেকে উবর বুক করে দাঁড়িয়ে রইল। ক্যাব-ড্রাইভার বলেছে দু’মিনিট দেরি হবে। জ্যামে পড়েছে গাড়ি। অতনু চুপচাপ অপেক্ষা করছে। অজস্র গাড়ির স্রোত দেখতে দেখতেই ওর গাড়ি চলে এল। নাম্বার মিলিয়ে দেখে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসেছে ও। অল্পবয়সী ড্রাইভার ছেলেটি বলল, ‘এত জ্যা জ্যা মম!’
সঙ্গে সঙ্গে অতনু বুঝে ফেলল ছেলেটি তোতলা। গাড়ির আয়নায় ছেলেটির মুখ দেখা যাচ্ছে। সামান্য লম্বাটে মুখ, ছোট ছোট চোখ, সরু নাক। ঠোঁট বা থুতনি দেখা যাচ্ছে না। চোখে ক্লান্তি লেপটে রয়েছে ময়লা বালাপোশের মতো। একটু ভয় করল অতনুর। এই ক্যাবের চালকরা এজেন্সির হয়ে ক্যাব চালায়। দিনরাত গাড়ি চালাচ্ছে! ভোর চারটে পর্যন্ত ডিউটি থাকে নাকি! সুতরাং ঘুমে ঢলে পড়বে এ আর আশ্চর্য কী?
এক কবি বন্ধুর কাছে শুনেছিল, একটা ঘটনা। বন্ধু গাড়ি বুক করে উঠে কেবল চোখ বুজে সিটে হেলান দিয়েছে, অমনি ড্রাইভার বলে উঠেছে, ‘স্যার, আপনি কথা বলুন, কথা বলতে থাকুন! আমার সঙ্গে কথা বলুন। প্লিজ।’
‘কথা বলব? কেন বলুন তো? কী কথা বলব?’ ড্রাইভারের কথা শুনে বন্ধু তো আশ্চর্য হয়ে গিয়েছে।
‘আমি ভোর চারটে থেকে সারাদিন-রাত গাড়ি চালাচ্ছি! ঘুমিয়ে পড়ছি! চোখ ঘুমে ঢলে পড়ছে। কথা বলুন, নইলে ঘুমিয়ে পড়ব...!’
সেই কবি বন্ধু অগত্যা কথার চাষ করে গিয়েছে যতক্ষণ ক্যাবে ছিল। নিজের প্রাণের দায় বলে কথা। যেন অদৃশ্য কেউ হাতে পিস্তল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কথা বন্ধ করলেই গুড়ুম! শোলে সিনেমার সেই ভয়ানক দৃশ্য যেন। নাচ থামালেই গুড়ুম। পিস্তলের গুলি বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে। বন্ধু ক্যাব থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকে নাকি মুখ কুলকুচো করেছে। গরম জলে গার্গল করেছে। আর একটি ঘণ্টা কথা বলেনি।
এই অবস্থা হলে খুবই ভয়ের কথা। অতনু আয়নার মধ্যে ছেলেটিকে দেখল। এই ড্রাইভারেরও একই দশা নয়তো? জিজ্ঞাসা করবে?
‘আচ্ছা ভাই,’ অতনু বলেই ফেলল, ‘আজ কতক্ষণ ডিউটি আপনার?’
‘ভোর চারটে পর্যন্ত। কিন্তু আমি ন’টার সময় চলে যাব সোদপুরে। সেখানেই আমার বাড়ি কিনা। রাতে ঘুমিয়ে ফের আসব। ভোরে। ফোনের সুইচ অফ করে রাখব।’ তোতলাতে তোতলাতে বলল ড্রাইভার।
‘সোদপুর? প্রপারে? না কি ভেতরের দিকে?’
‘ভেতরে। মাইল পাঁচেক ভেতরের গ্রামে। পোঁছতে রাত এগারোটা হয়ে যাবে! ঘুম যা পেয়েছে! সারারাত না ঘুমিয়ে কি পারা যায় দিনের পর দিন? বলুন?’
‘দিনের পর দিন না ঘুমিয়ে? মানে? কতদিন ঘুমোন না?’ অতনু জানতে চায়।
‘তিনদিন একফোঁটা ঘুমোইনি। আমার বাড়ি দূরে কিনা! তাই এখানে তপসিয়ায় একটা ঘর ভাড়া নিয়েছি। কখনও ইচ্ছে হলে রেস্ট নিতে পারি। বা ঝড় বৃষ্টিতে বাড়ি ফেরা ঝামেলা হয়ে যায়। তখন থেকে যাই। বুঝলেন, সেবার একটুর জন্য বেঁচে গিয়েছি! একটা গাছ আমার গাড়ির সামনে পড়ল ধাপাস করে! একটুর জন্য গাড়ির ওপরে পড়েনি! কী ভয়ঙ্কর ঝড় হয়েছিল সেদিন! তো মা বলল, ‘এভাবে হবে না। তুই কলকাতায় একটা ছোটখাটো দেখে ঘর ভাড়া নে। রাত হয়ে গেলে সোদপুরে ফিরে আসার দরকার নেই।’
আমার বন্ধু আছে দীপক, সেই দীপক একটা ঘর দেখে দিল। তপসিয়ায়! ভাড়া বেশি না। বারশো টাকা। ছোট্ট ঘর। তা, অসুবিধে নেই। আমার তো বেশি কিছু চাই না। রাতে গিয়ে শুয়ে পড়ি। ব্যস! একটা চৌকি আছে। একটা টেবিল। আয়না ছিল, আজ ফেলে দিয়েছি। ফালতু ওসব।’ গাড়ির ছোট মিররে ছেলেটির ভ্রূ কুঁচকে উঠতে দেখল অতনু।
‘তাহলে আজ সোদপুরে যাচ্ছেন?’ অতনু কথা চালিয়ে যাচ্ছিল। ড্রাইভার সাহেব ঘুমিয়ে না পড়েন! আর হাসিও পাচ্ছিল। এই ছেলেটা আয়না ফালতু বলে ফেলে দিয়েছে। আবার দিব্যেন্দুদা রাস্তা থেকে একটা আয়না নিয়ে গিয়েছে! সত্যি! আচ্ছা, দিব্যেন্দুদা এই ড্রাইভারের ফেলে দেওয়া আয়নাটাই তুলে নিয়ে যায়নি তো বাড়িতে? মনে মনে হাসে অতনু।
‘হ্যাঁ। আর ঢুকব না তপসিয়ার ভাড়া বাড়িতে। বাড়িটা ছেড়ে দেব।’
‘কেন? মন টানছে না? বাড়িতে কে কে আছে?’
‘আমার মেয়ে আছে। ছোট্ট। সৃজনী। ওর মামা নাম রেখেছে। সৃজনী চৌধুরী। আমি সোমনাথ, ও সৃজনী। আমার আর ওর জন্ম সোমবারে। কী মিল, তাই না?’ ছেলেটির চোখে হাসি দেখল অতনু।
‘হ্যাঁ। মেয়ে জেগে থাকবে?’
‘না। ছোট তো। ও ঘুমিয়ে পড়ে। ইয়ে, মানে, আসলে সেদিন একটা অদ্ভুত ঘটনা হয়েছে। আমি সেই জন্যই বাড়িতে যাচ্ছি আর কী! ভাড়াবাসায় দু’দিন ধরে থাকতে পারছি না। একটু ...মানে, কী হয়েছে বলুন তো? আমি, ভয় পেয়ে গিয়েছি...মানে আমি কিন্তু ভীতু নই। সত্যি! আমার মা বলে, ‘তোর খুব সাহস, এত রাতে সোদপুরে চলে আসিস গাড়ি নিয়ে...!’ আমি খুব একটা ভয়টয় পাই না কিন্তু! অথচ সেদিন...অদ্ভুত...আর কী...! কী যে হল, আমার মন ওখানে আর যেতে চাইছে না।’ গাড়ি সিগন্যালে দাঁড়াল।
‘কী ঘটনা?’ অতনুর ছেলেটির কথা শুনতে কৌতূহল হচ্ছিল আস্তে আস্তে।
‘আরে, আমি তো প্যাসেঞ্জারকে পৌঁছে দিয়েছি। দুজন প্যাসেঞ্জার ছিল। বেকবাগানে যাবে। ওদের পৌঁছে দিয়ে ফেরার সময়ে প্যাসেঞ্জার পাইনি তখনও। আমাদের তো ফোনেই বুক হয়। বুঝতে পারছি একটু পরেই বুক হতে শুরু করবে। শেয়ার পেলে শেয়ার নিয়ে নেব। সারাদিন গাড়ি চালাতে ভালো লাগে না। তাড়াতাড়ি ফিরে যাব ভেবে একটা সরু গলিতে ঢুকেছি। আসলে কী বলুন তো? শর্টকাট করার ইচ্ছে।
গলিটা বেশ সরু। একটা ক্যাব ঠিকঠাক যেতে পারবে, এমন। ঢুকেই দেখি, বড্ড নির্জন যেন গলিটা। এমনিতে গলি রাতে নির্জনই হয়। দিনেও দেখবেন, গলিগুলো নির্জন থাকে, তাই না? তো, নির্জন জায়গা দেখলে আমার খুব ভয় হয়। এত মার্ডার, এত ক্রাইম হয় রাতে...এতবড় শহর, কে কার খোঁজ রাখে...বলুন? আর বেশির ভাগ ক্রাইম এই রাতের বেলায় নির্জন গলিতেই হয়। আবার ধরুন মার্ডার হচ্ছে, ঠিক তখন আপনি সেখানে হাজির হয়ে দেখে ফেললেন ক্রাইমটা। তখন কিন্তু, হে হে, আপনাকে ছাড়বে না মার্ডারাররা। মেরে দেবে! আমার সেটাই ভয়! কিন্তু তাড়াহুড়ো করে ঢুকে পড়ার সময় অতশত মনে ছিল না। ঢুকেই পড়েছি।’ সিগন্যাল দেখে গাড়ি স্টার্ট দিল ছেলেটি। মানে সোমনাথ।
‘কিন্তু, কী একটা হয়েছিল বলছিলেন?’ অতনু জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ। আর বলবেন না! আমি তো ঢুকেছি গলিতে! বললাম তো ভীষণ নির্জন ছিল! একটা আলো ছিল গলির শেষে। হলদে হলদে আলো। আমি যাচ্ছি, গাড়িটার স্পিড কমিয়ে দিয়েছি। এমন সময় দেখি, গলির উল্টোদিক থেকে একটি লোক গলিতে ঢুকে পড়েছে। ভাবটা কেমন যেন! অন্যায় করলে মানুষের হাবভাব যেমন হয় আর কি! লোকটার হাতে একটা কিছু ছিল। দূর থেকে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। মনে হল, একটা লম্বা টাইপের প্যাকেট। আশ্চর্য হয়ে গেলাম এটা দেখে, লোকটা প্যাকেটটা গলিতে রেখে দিয়ে তাড়াতাড়ি করে চলে গেল! বোধহয় আমার গাড়ি দেখেই তাড়াহুড়ো করেছে। কোনদিকে যে গেল, বুঝতে পারলাম না। যেদিক দিয়ে এসেছিল, সেদিকেই গেল, কিন্তু সেদিকে কোন বাড়িতে, বা কোথায় গেল, বুঝব কী করে, তাই না?’ সোমনাথ মুখ ঘুরিয়ে অতনুর মুখ দেখার চেষ্টা করে।
‘আহ, তারপর কী হল? প্যাকেটে কী ছিল? দেখেছিলেন?’ অতনু উত্তেজিত হচ্ছিল কৌতূহলের চাপ নিতে না পেরে।
‘হ্যাঁ, দেখেছিলাম! আমার খুব কৌতূহল হয়েছিল। গাড়ি থামিয়ে নেমে প্যাকেটটা হাতে নেব বলে এগিয়ে গেলাম। গলির মধ্যে পড়েছিল প্যাকেটটা। নিউজ পেপার দিয়ে মুড়িয়ে রাখা প্যাকেটটা দেখে মনে হল, শক্ত টাইপের চ্যাপটা কিছু! লম্বা ধরনের। ভয় পেয়েছি সত্যি। কিন্তু ওটা যে মানুষের বডি টডি নয়, তা কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল। আজকাল কিন্তু বডির পার্টস রেখে দেয় খুনিরা। প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে মাথা, নয় ধড়, রেখে দেয় রাস্তায়, ড্রেনে! তারপর বোমা থাকে। আমি লোকটার ভাব দেখে তেমনই ভেবেছিলাম। ভয় যত হয়েছিল, তার থেকে কৌতূহলও কম হয়নি! আমি সেই জন্যই গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। দূর থেকে দেখলাম। বোমা মনে হচ্ছে না। জিনিসটা হাতে নিলাম। ভারী। খুব একটা ভারী নয় কিন্তু। মোটামুটি। চ্যাপ্টা বোর্ড মনে হচ্ছে। কাগজের মোড়কটা খুলতেই দেখি একটা আয়না! স্রেফ একটা আয়না! কেন রাতের অন্ধকারে আয়নাটাকে ফেলে দিয়ে গেল লোকটা, কে জানে! কিন্তু কী জানেন, আয়নাটা দেখতে খুব যে ভালো, তা নয়। সাধারণ। বড়বাজারে ফুটে দেখবেন লম্বা টাইপের আয়না বিক্রি হয়, ঠিক সেই রকম। আমি ভাবলাম, কী দরকার অন্যের জিনিসে লোভ করার? ধুস, আয়না দিয়ে হবে বা কী? কিন্তু, আমার ভাড়া বাসায় একটা আয়নার খুব দরকার ছিল। আয়না না থাকলে চুল আঁচড়াই কী করে? গাড়ির আয়নায় চুল আঁচড়ে নিই ঠিকই। কিন্তু ঘরে একটা আয়না থাকলে...তাই না?’ সোমনাথ অতনুর জবাবের জন্য ওয়েট করছিল।
‘তারপর আয়নাটা তুলে নিয়ে এলেন ঘরে? এই ঘটনায় কীসের ভয়?’ অতনু বিরক্ত হচ্ছিল লোকটার ভ্যানতাড়া কষায়। এত ডিটেইলস কে চায়? সোজাসুজি মূল ঘটনায় এসো দেখি বাছাধন। বোকার মরণ!
‘আনলাম দাদা! ঘরে নিয়ে এসে দেওয়ালে সেট করার জায়গা পেলাম না। তখন একটা টেবিল ছিল, তার ওপরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখলাম। আর সেদিনই লোডশেডিং হল। আর, আমাকে ঘরে মোমবাতি জ্বালাতে হল।’ সোমনাথ হঠাৎ করে চুপ হয়ে গেল।
মোমবাতি জ্বালাতে হল? মানে? তাতে ভয়? অতনু অবাকই হল। কথাটা বলেও ফেলেছে। শুনে ড্রাইভার মানে সোমনাথ অনেকক্ষণ কিছু বলল না। সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাচ্ছে। যেন কথাটা শুনতে পায়নি। গাড়ি বাইপাসে ঢুকে গিয়েছে।
একটু পরে নিজেই কথা বলল, ‘আসলে, আমি মোমটা জ্বালিয়েছি। আয়নায় মোমবাতির ছায়া পড়েছে। ঘরে আলো ডাবল হয়ে গিয়েছে যেন। জামাকাপড় চেঞ্জ করে শুতে যাব, মোমটা নিভিয়ে দেব বলে ফুঁ দিতে মোম নিভে গেল! ব্যস। কিন্তু দাদা, শুতে গিয়ে একটা কিছু মাথার মধ্যে চক্কর কাটছিল। কী একটা যেন অদ্ভুত হল! অস্বাভাবিক কিছু একটা হয়েছে, যেটা আমার মনের মধ্যে থেকে থেকে চিমটি কাটছিল। কী হল, মনে করতেই পারছিলাম না। একটু পরেই ছবিটা মনে পড়ল। কী হয়েছে বলুন তো? মোম জ্বলছে আয়নায় দেখতে পাচ্ছিলাম। মোম নিভিয়ে দিতে আয়নার মোমও নিভে গেল! কিন্তু, জানেন, আমার মনে হল, আয়নার মোমটা একটু পরে নিভল! সামান্য দু’সেকেন্ড কি আড়াই সেকেন্ড পরে নিভল যেন!’ সোমনাথ অল্প কেঁপে উঠল।
‘এটা আপনার মনের ভুল। চোখের ভুল। ভ্রম। প্রতিচ্ছায়া একই রকম কাজ করবে, ওসব নিয়ে ভাববেন না।’ অতনু বুঝিয়ে দেয়।
‘হুম, সেটা ঠিকই বলেছেন। আমিও সেটাই ভেবেছি। পরের দিন, মানে গতকাল সারাদিন ডিউটির চাপে রাতের কথাটা ভুলেই গিয়েছি! রাতে যখন ভাড়া বাসায় ঢুকেছি, টেবিলের ওপরে আয়নাটা দেখে মন কেমন করে উঠেছে! একটু ভয় ভয়, মানে ওই কেমন লাগে না?’ গাড়ি ডিসান মোড়ে এসে গিয়েছে।
সে ঠিকই। একা ঘরে লোকটা অযথাই হয়তো ভয় পেয়েছে। কিন্তু দিব্যেন্দুদা একটা আয়না নিয়ে ঘরে রেখেছে। সেটা সোমনাথের ফেলে দেওয়া আয়না যদি হয়? অঞ্জলিদি মনে করে আয়না মৃতের বার্তা বহন করে। সেই কারণে ভীত? সোমনাথের মতো?
‘তারপরে তো আর কিছু হয়নি? ওসব ঝেড়ে ফেলে দিন মাথা থেকে।’ অতনু বিষয়টা উড়িয়ে দিতে চাইল। মনে হয় সোমনাথের অটোফোবিয়া আছে। একাকীত্বের ভয়। একা একা থাকতে গিয়ে উল্টোপাল্টা ভেবে ভয় পাচ্ছে বেচারি।
‘আর কিছু হয়নি মানে, লোডশেডিং চলছেই ওই এলাকায় দুদিন ধরে। আজও চলছে কিনা কে জানে! আমাকে গতকালও মোম জ্বালাতে হয়েছিল!’
‘ফের নিভিয়ে দিতে গিয়ে কি একই রকম ঘটনা হল?’ অতনু মজা পাচ্ছিল সোমনাথের ভয় দেখে। ছেলেটার স্ক্রু ঢিলে আছে, ‘নিভিয়ে দিতে গিয়ে কী হল?’
‘না। নিভিয়ে দিতে গিয়ে নয়, মোমটা জ্বালাতে গিয়ে! আমি মোম জ্বালাতে গিয়েছি, জ্বালিয়েছি...!’
‘তখন?’ অতনুর আগ্রহ বাড়ছিল।
‘আমি আয়নার দিকে তাকিয়েছিলাম। দেখলাম আমি মোম জ্বালাতে জ্বালাতেই আয়নার ছায়ার মোমও জ্বলে উঠেছে।’
‘তাহলে? সেটাই তো স্বাভাবিক।’
‘আমি দেশলাই কাঠি জ্বেলে মোম জ্বালিয়েছি, আয়নার ভেতরেও মোম জ্বলেছে। কিন্তু আয়নার ভেতরে দেশলাই কাঠি ধরা হাতটা আমার নয়। অন্য কারও!’
অতনু স্থির হয়ে রইল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন