সাগরিকা রায়

সান্যালদা সন্ধ্যার ঝাপসা হয়ে যাওয়া আকাশের দিকে তাকিয়ে স্বপ্নাচ্ছন্ন গলায় বললেন, ‘অদ্ভুত স্বপ্ন! আমি জেগে উঠেও বুঝতে পারছিলাম না যে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখেছি। জীবনে এই প্রথমবার এমন হল।’
আমরা বসে আছি একটা বিশাল মাঠের এক কোণে। বেশ খানিকটা দূরে কিছু ছেলে ফুটবল নিয়ে ছুটোছুটি করছে। একটা হালকা হইহই ভেসে আসছে ওদিকটা থেকে। সঙ্গে অস্পষ্ট কিছু টুকরো শব্দ। আমাদের মাথার ওপরে গোল হয়ে মশা ঘুরছে। আমি আর সান্যালদা শনিবার করে এখানে এসে বসি। আসার পথে একটা ছোট বাজার পড়ে। পাঁচমিশেলি চানাচুর কিনি। বিকেলটা বেশ কেটে যায়। সান্যালদার বাড়ি ডুয়ার্সে। আমার বাড়ি কলকাতায়। আমরা দুজনেই জামসেদপুরে স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি করি। গতরাতের কথা বলছিলেন সান্যালদা। একটা সাঙ্ঘাতিক ভয়ের স্বপ্ন দেখেছেন উনি। এত ভয় পেয়েছিলেন যে, ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখেন সারা শরীর ঘামে ভিজে আছে। হাতের তালু ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
আমি আশ্চর্য হলাম। সান্যালদার সঙ্গে যতদিন মিশছি, তাঁকে ভিতু আখ্যা দিতে পারব না। কত অদ্ভুতুড়ে অভিজ্ঞতা আমার সঙ্গে শেয়ার করেছেন। তাহলে? কী এমন স্বপ্ন দেখলেন? এমন স্বপ্নই দেখলেন, যে ভুলতে পারছেন না। আবার এই বয়সে এসে স্বপ্ন দেখে ভয়ও পাচ্ছেন? অদ্ভুত সত্যি। আমার কিন্তু হাসি পাচ্ছিল না। সান্যালদার কথার মধ্যে, বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যে এমন কিছু ছিল, যা আমাকে চিন্তিত করছিল।
দেখছি, এক দুপুর পড়ো পড়ো সময়, আমি আমার এক ছেলেবেলার বন্ধুর সঙ্গে এই এদিকেরই কোন এক এলাকা দিয়ে যাচ্ছি। এলাকাটা আমার অচেনা, সেটা বেশ বুঝতে পারছি। রুক্ষ ধু-ধু প্রান্তর। ছোট ছোট মাটির ঘর। খুপড়ি জানালা। একজন আদিবাসী বৃদ্ধ বেতের ঝুড়ি বানাচ্ছিল ঘরের সামনে বসে। চোখ তুলে আমাকে দেখে বলল, ‘ফুলবাবুর বাড়ি যাবি? এই দিক দিয়ে চলে যা।’ বলে ডানদিকের রাস্তা দেখিয়ে দিল। ফুলবাবুটি আবার কে? কী জানি, কেনই বা আমাদের দেখে বুড়োর মনে হল যে আমরা তথাকথিত ফুলবাবুর বাড়িতে যাব। হয়তো অচেনা শহুরে লোকেরা ফুলবাবু নামের লোকটির বাড়িতে আসে। যাই, দেখেই আসি কে এই ফুলবাবু। আমরা দেখিয়ে দেওয়া রাস্তা ধরে অনেকটা গিয়ে দেখি একটা ফুলে ভরা বাড়ি। একজন লোক গাছে জল দিচ্ছেন। বয়স্ক মানুষ। আমাদের দেখে হাসলেন, ‘পিকনিক পার্টি নাকি?’ বুঝে ফেললাম, এই হলেন বুড়োর সেই ফুলবাবু।
আমরা মাথা নাড়লাম, ‘না, বেড়াতে এলাম এদিকে।’
‘তাহলে সামনেই নদী রয়েছে। যান, ঘুরে আসুন। আপনাদের বয়সের ছেলে-ছোকরা এসে নদীর ধারে পিকনিক করে। হা, হা।’
নদী শব্দটা শুনলেই মন চঞ্চল হয়ে ওঠে দেখার জন্য। আমি বন্ধুর দিকে তাকালাম। বন্ধু চোখ নাচাল, ‘চল।’
আমরা অনেকটা হেঁটে গিয়ে কোথাও নদী দেখতে পেলাম না। যখন ফিরে আসব ভাবছি, তখন দেখি, সামনেই নদী। কিন্তু, নদী মানে, কী বলব, এক বিন্দু জল নেই। বালির নদী। বালির সমুদ্র যাকে বলে আর কি। সেই বালির রঙ দেখে আমার বুক কেঁপে উঠল। কেমন যেন পরিবেশটা সেখানে। ধূসর রঙের বালি। সেই বালির মধ্যে মধ্যে একটা হাত ঢুকে যাওয়ার মতো গর্ত।
এমন গর্ত অনেক...অনেক। সেই গর্ত থেকে ক্ষণে ক্ষণে হুউউড় শব্দ করে বালি উপরে উঠে ছড়িয়ে পড়ছে। যেন গর্তের ভেতর থেকে অদৃশ্য কেউ বিশাল মুঠো ভরে বালি নিয়ে ওপরে ছুড়ে দিচ্ছে। বালি উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে যে শব্দটা হচ্ছে, সেটা গায়ে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে। বুঝতেই পারছ, নির্জন, ছমছমে পরিবেশে, বালির সমুদ্রের সামনে এমন অস্বাভাবিক ব্যাপার...আমরা দুজনেই বেশ ভয় পেয়েছি। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
বন্ধু বলল, ‘এবারে ফিরে যাই। মা বকবে দেরি হলে।’ আমার একবার মনে হচ্ছে আমি বড় হয়েছি, চাকরি করছি। আবার কখনও মনে হচ্ছে যেন ছেলেবেলায় আছি। কিন্তু ঘটনাগুলো বেশ গুছিয়ে ক্রমান্বয়ে ঘটছে। দুজনে ফিরব বলে পেছন ঘুরেছি কী, অমনি সে কী ঝড় রে ভাই! আকাশ যেন লালচে রঙ মেখে চোখ মেলে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। গাছপালা প্রবল বেগে দুলছে। সঙ্গে শোঁ-শোঁ শব্দে সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। ভয়ঙ্কর ভাবে ফুঁসে উঠছে বালি। একটা হা-হা শব্দে ঝড় তাড়া করেছে আমাদের। আমরা ছুটছি...ছুটছি...! উফ! কী যে স্বপ্ন দেখেছি! কী বলব আর।’ কথা বলতে বলতে সান্যালদার মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। যেন এই মুহূর্তে সেই ঝড়, সেই গা ছমছমে পরিবেশে আছেন।
এই সন্ধে নেমে আসা সময়ে সান্যালদার স্বপ্নটা আমার মাথায় একটা থিরথিরে ভয়ের সৃষ্টি করছিল। মাঠের হলদে ঘাসগুলোকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। ছেলেগুলো খেলা সেরে কখন চলে গিয়েছে খেয়ালই করিনি। সান্যালদাকে ডাকলাম, ‘উঠুন দাদা। ফিরি। অন্ধকার হয়ে আসছে। এদিকে রাতের দিকে অসামাজিক কাজকর্ম হয় শুনেছি। ড্রাগের কারবার, মাতালদের ঠেক বসে ! চলুন।’ আমরা উইকেন্ডে আসি। বিকেল থাকতেই উঠে যাই। আজ স্বপ্নের কথা শুনতে গিয়ে দেরি হল। সান্যালদা চটকা ভেঙে উঠলেন। মুখে কথা নেই। স্বপ্নাচ্ছন্ন ভাবটা কাটেনি। একটু চিন্তা হল। কোয়ার্টারে একা থাকেন। রাতবিরেতে অসুস্থ হলে দেখার লোক নেই। আমার কোয়ার্টারে নিয়ে যাব?
‘আরে দূর। ভয়-টয় নয়। আসলে পুরো স্বপ্নটা মাথা থেকে সরছে না। ঠিক হয়ে যাবে। ভাবছি আজ বিধুকে বলব আমার কোয়ার্টারে থেকে যেতে।’
বিধু সান্যালদার রান্নাবান্না করে। ছোকরা বয়স। সে থাকলে আমি একটু নিশ্চিন্ত হই। আমার সন্দেহ সান্যালদাও হন। আমার কাছে স্বীকার না করলেও তিনি একটু ডিস্টার্বড আছেন।
কাল সানডে। দেরি করে উঠব। নেক্সট শুক্রবার অফিস করে চলে যাব নেতারহাট। দু রাত থেকে রবিবার বিকেলে ফিরব। সুতরাং নেক্সট শনিবার আমার সঙ্গে সান্যালদার দেখা হচ্ছে না। সেটা জানিয়ে রাখলাম। সান্যালদার মনটা বিমর্ষ হল। নেতারহাট সান্যালদার বার তিনেক ঘুরে আসা হয়েছে। তিনি যাবেন না। আমি যাচ্ছি আমার কলিগ শান্তনুর সঙ্গে। শান্তনু লোধ জলপ্রপাত দেখেনি। আর আমি এই প্রথম নেতারহাট যাচ্ছি।
নেতারহাটে পৌঁছে ডাকবাংলোতে উঠেছি। শাল, মহুয়া, পলাশের দেশ নেতারহাট। পাহাড়ি উপত্যকা। এটি লাতেহার জেলায়। এখানকার বিশেষ ব্যাপার হল, এখান থেকে সানরাইজ, সানসেট চমৎকার দেখা যায়। ডাকবাংলোর ব্যবস্থা বেশ ভালো। আর মজার ব্যাপার হল, এই ডাকবাংলোতেই উঠেছে যারা, তারা আমাদের দুজনেরই পরিচিত। ঋতম আর কনিষ্ক। স্টিল প্ল্যান্টের অন্য সেকশনেই আছে। আমরা যে এখানে আসব, ওরা জানত না। তেমনি আমরাও ওদের কথা জানতাম না। ফলে দেখা হতে প্রবল উচ্ছ্বাস দেখা দিল আমাদের মধ্যে। আমরা কালই লোধ জলপ্রপাত দেখতে যাব ভেবেছিলাম। কিন্তু সেটা নেতারহাট থেকে ষাট কিমি দূরে। দু-ঘণ্টা লাগবে যেতে। শান্তনু বলল, ‘বরং এবারে আমরা কোয়েল ভিউ পয়েন্টে যাই। পাইনের বনে ঘুরে আসি। নেক্সট বারে লোধ দেখব।’
সেই কথানুযায়ী আমরা পরের দিন কোয়েল ভিউ পয়েন্টে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম তার সৌন্দর্যে। কী সবুজ! ছমছমে নৈঃশব্দ্য! পাইনের বন যে কী নিঃসীম! ভেতরে ঢুকতে গিয়ে ইতস্তত করলাম। আমরা চারজনই ভেতরে ঢুকতে চাইছিলাম না। অথচ তার কারণ আমরা জানি না। পাইনের বনের অসীম নৈঃশব্দ্য আমাদের অন্য জগতের ইশারা দিচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, একবার ভেতরে ঢুকলে আমরা ফিরে আসার রাস্তা খুঁজে না-ও পেতে পারি।
অবাক কথাটি হল, এই যে অনুভূতি, সেটা আমাদের চারজনের মধ্যেই ছিল। শান্তনু মুখ ফুটে একবার ভয়টা প্রকাশ করতেই আমি যখন সায় দিলাম ওর কথায়, তখন ঋতম আর কনিষ্কও একমত হল। ওদের মনে হচ্ছে পাইনের বনের ভেতরে না যাওয়াই ভালো। অচেনা জায়গা। লোকজন নেই। সাহায্যের দরকার হলেও কাউকে পাব না। অগত্যা, আমরা ফিরে অন্যদিকে যাব ভেবতেই ঋতম বলে উঠল, ‘দেখুন, কেমন চমৎকার সিঁড়ি।’
সিঁড়ি মানে? এখানে আবার সিঁড়ি এল কোথা থেকে?
আমরা থমকে দাঁড়ালাম। আমাদের সামনে বা পিছনে নিঃসীম নির্জনতা রি রি রি রি করে একটানা সুর ভেঁজে যাচ্ছিল। গাছপালা স্থির হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঋতমের দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি, ঘন বনের ভেতরে একটা সিঁড়ি দেখা যাচ্ছে। পাথরের সিঁড়ি। বনের ঝাপসা অন্ধকারে সিঁড়ির খানিকটা দেখা যাচ্ছে। বাকিটা অদৃশ্য। ঋতম আমাদের না বলেই এগিয়ে যাচ্ছে দেখে শান্তনু ওকে থামাতে চেষ্টা করল। ঋতম অল্প হেসে আমাদেরও ওকে অনুসরণ করতে বলল। আমরা পাইনের বনের ভেতরের অদেখা জগতের প্রতি একটা অসম্ভব টান অনুভব করছিলাম। হয়তো ঋতমও এই টানেই এগিয়ে গেল। আচ্ছা, আমরা একটু বেশিই ভাবছি কি? বনের ভেতরে খানিকটা গিয়ে সিঁড়িটা দেখে চলে আসব। এতে চিন্তার কী আছে? আসলে সমস্ত জায়গাটা জুড়ে একটা যে ছমছমে ভাব নিঃশব্দে হাসছিল, তাকে অস্বীকার করা কঠিন। অবশ্য আমরা চারজন আছি। এত ভয় ভয় করলে চলে নাকি?
সিঁড়িটাকে কাছে ভেবেছিলাম, দেখা গেল বাস্তবে সিঁড়িটা আমাদের থেকে অন্তত ত্রিশ পা দূরেই হবে। দূর থেকেই দু’তিনটে ধাপ দেখতে পাচ্ছি। বাকিটা বনের আবছায়ায় হারিয়ে আছে। শেষ ধাপটা কোথায় আছে!
অবশেষে সিঁড়ির কাছে পৌঁছে গেলাম। সিঁড়িটা পাথর কেটে কারা বানিয়েছিল কে জানে। কিন্তু বহু পুরোনো সেটা বোঝা যাচ্ছে। অনেক দিনের স্মৃতি নিয়ে ঘন কালচে সবুজ শ্যাওলা সিঁড়ির গায়ে লেপটে রয়েছে। প্রথমেই ঋতম সিঁড়ির ধাপে পা রেখে হুড় হুড় করে নেমে যাচ্ছিল। কোনও প্রশ্ন করার আগেই বাকি দুজন ঋতমকে অনুসরণ করল আমিও ওদের পিছু ধরলাম। সরু সরু আধভাঙা সিঁড়ি বেয়ে যেখানে নেমে এলাম, সেখানে একটা পায়ে চলা পথ দেখতে পাচ্ছি।
পথ একেবারে তকতকে নয়। একটু ঘাস, আগাছা জন্মে গিয়েছে পথের ওপরে। আমরা এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে যাচ্ছি। খানিক পরেই মনে হল, আমরা এখন আর বনের ভেতরে নেই। হঠাৎ করে পট পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। কোন একটা লোকালয়ের দিকে এসে পড়েছি যেন। এদিকে পাইনের বনের চিহ্ন নেই। ধু-ধু রুক্ষ মাটি। মানুষের উপস্থিতি বেশ টের পাচ্ছি। বোধহয় সামনে আদিবাসী গ্রাম আছে। ছোট ছোট মাটির বাড়ি। মাটির দেওয়াল। খুপড়ি খুপড়ি জানালা। সরু ছোট দরজা। একটা বাড়ির সামনে এক বুড়ো আদিবাসী বেতের ঝুড়ি বানাচ্ছে। আমাদের দেখে থমকে তাকাল। তারপর ফের নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সান্যালদা কি এই লোকটিকেই স্বপ্নে দেখেছেন? সান্যালদার স্বপ্ন আমার জীবনে এভাবে সত্যি হচ্ছে কেন? আমরা এখানে এলাম কেন আজ? আশ্চর্য! তাহলে স্বপ্নে বুড়ো যে রাস্তা দেখিয়েছিল সান্যালদাকে, ঠিক তেমন রাস্তা কি আছে ডানদিকে? কিন্তু, সান্যালদার অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি। যাব কি? নাকি ব্যাক করব?
ইতিমধ্যে শান্তনু ঋতমকে নিয়ে এগিয়ে গিয়েছে। বাঁদিকে একটা কাঁচা রাস্তা দেখতে পাচ্ছি। রাস্তার বাঁকে ওদের দেখতে দেখতে আমি আর কনিষ্ক পা বাড়ালাম। কনিষ্ককে কিছু বলার সুযোগ পেলাম না। ও হইহই করে এগিয়ে গিয়ে ওদের ধরে ফেলল।
এদিকটা বেশ রুক্ষ। একটু আগে প্রকৃতির সবুজের বাহার দেখেছি। ঝট করে সব সবুজ নিভে গিয়েছে যেন। এই রাস্তার দু’ধারে কোনও গাছ, ঝোপঝাড় নেই। ফসল তুলে ফেলা মাঠের মতো হা হা করছে চারপাশ। কেন যেন মন খুব বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছে। ভালো লাগছে না কিছু। মন খারাপের চাদর সারা শরীরে জড়িয়ে দিয়েছে কেউ। আমি চেষ্টা করেও সেই চাদর সরাতে পারছি না। বারবার সান্যালদার স্বপ্নের কথা মনে পড়ছে। ঠিক সেই রকম সব হচ্ছে এখানে। আমি তো স্বপ্ন দেখিনি! আমার জীবনে যা ঘটবে, সেটা কে বলে দিল সান্যালদাকে? কে টেনে আনল আমাকে এখানে?
উঁচু-নিচু রাস্তা। খানিকটা গিয়ে মনে হল, ওদের ডেকে নিয়ে ফিরে যাই। আর বলব বলব করতে করতেই দেখি, শান্তনু পেছন ফিরে হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাকে। আমি জোরে পা ফেলে এগিয়েই বুঝে ফেলি, কেন শান্তনু আমাকে ডাকছিল। আমার সামনেই একটি ছোট বেশ গুছোনো বাড়ি। বাড়ির সামনে ফুলবাগান। এক অশীতিপর বৃদ্ধ ভদ্রলোক গাছে জল দিচ্ছেন। হাতে ঝিঞ্ঝিরি। ওদের দিকে তাকিয়ে হাসলেন, ‘পিকনিক পার্টি নাকি?’
কনিষ্ক বলল, ‘না, পিকনিক পার্টি নই। এখানে কি পিকনিক করতে আসে লোকে?’
‘হ্যাঁ। আপনাদের মতো অল্প বয়সী ছেলেরা আসে। ওই তো, একটু এগিয়ে নদী। ওখানেই পিকনিক করে। করবেন নাকি? করতে চাইলে বলুন। আমিও দলে ঢুকে যাই। ওহ, সঙ্গে কিছু নেই? আমি হাঁড়ি, কড়া, চাল, ডিম, আলু দিচ্ছি। খিচুড়ি করে ফেলুন। আর ডিমভাজা। দুপুর হতে এখনও অনেক বাকি। আমি যাচ্ছি একটু পরে। এখানে যারাই পিকনিক করতে আসে, তারা আমার থেকে একটু সাহায্য পায়। কন্ডিশন আছে। আমাকে পিকনিকে নিতে হবে। হা হা হা। একটু লোকজনের সঙ্গে পেতে ইচ্ছে হয়। আসুন, জিনিসপত্র নিয়ে যান। আরে না না, পয়সা কড়ি দিতে হবে না। একটু আনন্দ পাব, এই ঢের। আগেই সব খাবার শেষ করে ফেলবেন না।’ বলে হাসতে হাসতে লোকটি দ্রুত হাতে হাঁড়ি, কড়া এনে দিল।
একটি পাত্রে চাল, ডিম, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচালঙ্কা...! আর দিলেন একটি কেরোসিন স্টোভ। আমি বাদে বাকিরা খুব খুশি। ঋতম তো হাঁড়ি, কড়া নিয়ে নদীর খোঁজে ছুট লাগাল। কনিষ্ক আর শান্তনু বাকি জিনিসপত্র নিল। ওরা বড় বড় পা ফেলে যাচ্ছে হইহই করে। আমি খানিকটা পিছিয়ে পড়েছি। একবার পেছন ফিরে ভদ্রলোকের বাড়ির দিকে তাকালাম। অল্প অল্প দেখা যাচ্ছে। তবু বুঝতে পারছি, ভদ্রলোক বাগানে জল দিতে নেমে পড়েছেন ফের।
এসব কী হচ্ছে? সবটাই কি কাকতালীয় ব্যাপার? আমরা ভুল করছি না তো? ভদ্রলোক পিকনিকের কর্মকাণ্ডে ঢুকিয়ে দিলেন। আমরা রাজিও হয়ে গেলাম। সত্যি! বাধা দেওয়ার সময় বা পেলাম কোথায়? ওরা তিনজন তো নাচতে নেমেছে। যাই, দেখি। আমার সব কিছুই কেমন লাগছিল। মন খারাপ ব্যাপারটা কাটছেই না।
পা চালিয়ে আরও অনেকটা গিয়েও ওদের দেখতে না পেয়ে বোমকে গিয়েছি। একী রে বাবা? ওরা সব কোথায়?
‘রাহুলদা, এদিকে আসুন।’
কনিষ্কর গলা পাচ্ছি। আমাকে ডাকছিল। আমি বাঁদিকে তাকিয়ে দেখি, কনিষ্ক ছুটতে ছুটতে আসছে। উত্তেজিত মনে হচ্ছে, ‘নদী ওদিকে। আসুন। দেখুন। দেখে যান।’
আমি ওর দেখাদেখি নদী দেখতে ছুটলাম। খানিকটা গিয়ে দেখি, হাঁড়ি কড়া পড়ে আছে বালির ওপরে। আর শান্তনু, ঋতম হাঁ করে সামনে কী দেখছে। আমি পৌঁছে দেখছি, অফুরন্ত, অসীম বালির সাগর। নদী কোথায়? আর সেই বালির মধ্যে ঠিক সান্যালদার বর্ণনামতো অসংখ্য গর্ত। গর্তগুলো থেকে ফুররর করে বালি বেরিয়ে আসছে। যেন গর্তের ভেতর থেকে কেউ মুখে করে শুকনো বালি ছিটিয়ে দিচ্ছে। আমি শুধু সান্যালদার স্বপ্নের কথাই ভাবছি। কী এক মন্ত্রের আওতায় পড়েছি আমি৷
‘এটাই নদী। জল হয়তো ছিল এককালে। এখন শুকিয়ে গিয়ে এই অবস্থা। বালির গন্ধ পাচ্ছেন? ভদ্রলোক বেশ আমুদে। একা থাকেন। একটু মানুষের সঙ্গে পেতে এসব করেন।’ বলে শান্তনু হাসল। ওদিকে কনিষ্ক আর ঋতম খাবার রেডি করতে নেমে পড়েছে। পেঁয়াজ ভাজার গন্ধ নাকে আসতেই মন স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। সান্যালদা কেন স্বপ্ন দেখেছেন আমি তার একটা যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পারছিলাম। তিনি অনেকদিন এদিকে আছেন। নেতারহাটে এসেছেন বেশ কয়েকবার। এই রাস্তা, ফুলবাগানের ভদ্রলোক...সবটাই তাঁর দেখা। অবচেতনে সেসব সঞ্চিত ছিল। বেরিয়ে এসেছে অদ্ভুত ভাবে। অনেক সময় ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কার্বন-ডাই অক্সাইডের প্রাচুর্যহেতু শ্বাসকষ্ট হয়ে তাঁর স্বপ্ন বিভীষিকার সৃষ্টি করেছে। প্রচণ্ড স্মোক করেন। ঘুমনোর আগে স্মোক করা তাঁর অভ্যেস। বন্ধ ঘরে ধোঁয়া জমেও শ্বাসের অসুবিধে হয়, এটা আমার নিজের অভিজ্ঞতা। সাধে কি আর সিগারেট স্মোকিং কে ইঞ্জুরিয়াস টু হেলথ বলে? কিন্তু, অন্যের স্বপ্ন আমাকে কেন সফল করতে হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি না।
আচ্ছা, ডিমভাজা হবে কখন? বেড়ে গন্ধ ছেড়েছে খিচুড়ির। দেখ কাণ্ড, আমরা কেউ ভদ্রলোকের নাম জিগ্যেস করিনি। খেতে আসবেন, তখন নাম জেনে নেব।
বেলা গেল। প্রায় দুপুর তিনটে পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরেও তিনি এলেন না। গিয়ে ডেকে আনতে হলে অনেকটা যেতে হবে। খিদে পাচ্ছে। ঠিক করলাম, আমরা খেয়ে নিয়ে ভদ্রলোকের খাবার গুছিয়ে নিয়ে যাব। হয়তো কোন কাজে আটকে পড়েছেন।
খেয়ে নিলাম। হাঁড়ি কড়া ওই অবস্থায় নিতে হবে। জল নেই। ধুতে পারব না। এইজন্যই একটা বড় জারিকেন করে জল দিয়েছিলেন ভদ্রলোক। উনি জানতেন নদীতে জল নেই? অথচ বলেননি। বললে আমরা আসব না ভেবে বলেননি কিন্তু আমরা না এলেই বা তাঁর কী আসত যেত? তিনিই তো এলেন না।
সব গুছিয়ে নিতে নিতে হঠাৎ করেই পরিবেশটা কেমন পাল্টে যাচ্ছিল। রোদের রঙ অনেক আগেই মরে গিয়ে ছাইরঙ হয়ে গিয়েছিল। এখন তাতে শেয়ালের গায়ের রঙ মিশে গেল। বালির সমুদ্র থেকে পাঁশুটে ছাইরঙের বালি উঠে আসছে হুর-র-র করে। আকাশের রঙ লালচে। এমন আকাশ ঝড়ের সংকেত দেয়। ঝড় আসবে কি?
শান্তনু চিন্তিত, ‘ঝড় আসবে বুঝলেন! তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। কুইক।’
আমি আগেই ভয় পাচ্ছিলাম। সান্যালদা ঝড় দেখেছিলেন স্বপ্নে। এখন সত্যিই যদি ঝড় শুরু হয়, আমরা দাঁড়াবার জায়গাটুকু পাব না। খা খা করছে চারধার। একটা প্রাণীর দেখা নেই। হাঁড়ি, কড়া ইত্যাদি নিয়ে জোরে পা চালাতে যেতে যেতে বালির সাগর যেন ফুঁসে উঠল। সন্ধের ঝাঁঝ কখন লেগেছে বালির গায়ে কে জানে। ঝাপসা আলোয় দেখছি বালিতে যেন ঢেউ উঠছে। কোন অজানা থেকে হো হো শব্দে হাওয়া তেড়ে এল। নামল ঝড়। উথাল-পাথাল করে দেওয়া ঝড়। সব ফেলে আমরা ছুট লাগালাম। আমাদের টেনে রাখার জন্য সেই অসীম নৈঃশব্দ্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আজ আমরা চারজন বের হতে পারব না। একজনকে থেকে যেতে হবে। মনে হচ্ছে ওই বালির গর্ত বলি চায়। ওখানে টেনে নেবে কাউকে। দেখতে পাচ্ছি, বালির ঢেউ এগিয়ে আসছে হামাগুড়ি দিয়ে, সন্তর্পনে।
প্রাণের ভয়ে ছুটছি। কতদূরে কোথায় এসেছি, জানি না। মনে হচ্ছে একই জায়গায় ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছি। ঋতম চিৎকার করে কিছু বলছে। ঝড়ের বিকট তাণ্ডবে ওর কথা শোনা যাচ্ছে না। শব্দগুলো কাঁদতে কাঁদতে ছড়িয়ে পড়ছে এদিকে ওদিকে। দ্রুত ঋতমের কাছাকাছি হতেই দেখি শান্তনু আর কনিষ্ক এলোমেলো ভাবে ছুটে আসছে। শান্তনু হাঁপাচ্ছে। কনিষ্ক শান্তনুর হাত ধরে টেনে ছুটতে শুরু করল ঋতমের বাড়িয়ে দেওয়া আঙুল অনুসারে।
আমি তাকিয়ে দেখছি দূরে অস্পষ্ট একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছে। এবারে উৎসাহে দ্বিগুণ বেগে ছুটতে শুরু করেছি। যে ভাবেই হোক ওই বাড়িতে গিয়ে উঠব। অবশেষে ছুটতে ছুটতে বাড়িটিতে উঠেছি। সরু বারান্দার পরেই খোলা দরজা। বারান্দায় একটা প্লাস্টিকের চেয়ার দেখলাম। ‘ভেতরে কে আছেন?’ ঋতম হাঁক ছাড়ল। কোনও জবাব এল না। উঁকি দিয়ে দেখতে গিয়ে ভেতরে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নজরে এল না।
শান্তনু বলল, ‘মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে দেখছি। সরু তীক্ষ্ণ আলোর রেখা ঘরের ভেতরে পড়তেই নিঝুম বাড়ির চেহারাটা কিছুটা নজরে এল। দেওয়াল ঘেঁষে একটা চৌকি পাতা রয়েছে। একটা কাঠের টেবিল। আর কিছু নাহ, নেই। কার বাড়ি? কার জিনিস এসব জানি না। কিন্তু আর পারছিলাম না আমরা। মনে হল, ওই চৌকিতে গিয়ে শরীর ছেড়ে দিই। আমি ঘরে ঢুকে চৌকির ওপরে বসলাম। বাকিরা ঘুরে ঘুরে ঘরটা দেখছে। দরজার ছিটকিনি ভেতর থেকে আটকে দিতে ঝড়ের তাণ্ডব অনেকটা স্তিমিত হয়ে এল কানে।
ঋতম চৌকির একপাশে বসে বলল, ‘রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। ভোর হলে বাঁচি।’ আমি সায় দিতে গিয়ে থমকে গেলাম কনিষ্ককে দেখে। কনিষ্ক দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠেছে। আমরা সচকিত হয়ে দেখি, দেওয়ালে ঝুলছে একটা আয়না। ছোট আয়না। সস্তার জিনিস। আয়নার সামনে গিয়ে ঋতম ফের হেসে উঠেছে। আয়নার সঙ্গে সাইডে সরু খাপের ভেতরে একটা চিরুনি। বাহ! বাড়ির মালিক বেশ সৌখিন বলতে হবে। শান্তনু বলল, ‘ঝড়ে চুল এলোমেলো হয়ে আছে। দিন তো, আঁচড়ে নিই।’ ঋতম প্রায় হুমড়ি খেয়ে চিরুনি কেড়ে নিল কনিষ্কর হাত থেকে আমি চৌকিতে শুয়ে পড়ে বললাম, ‘একজন একজন করে করুন।’
সব আয়নায় মুখ দেখছে, চুল আঁচড়ে পরিপাটি হচ্ছে। আমি ঘুমিয়ে পড়ছি। চুল টুল আঁচড়ে কী হবে? কে দেখবে আমাকে? ধুর।
রাত কত হবে জানি না। অস্পষ্ট গোঙানি শুনে ঘুম ভেঙে গেল। শব্দ আসছে একটা। অসহ্য যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠছে কে বা কারা! কী ব্যাপার? আমি ধাতস্থ হতে হতে বুঝতে পারছি শব্দ আসছে আমার পাশে শুয়ে থাকা তিনজনের গলা থেকে। অব্যক্ত যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে ওরা। মানেটা কী? আমার মোবাইল কোথায়...এই যে। টর্চ জ্বেলে ওদের গায়ে ফেলছি। স্বপ্ন দেখছে নাকি তিনজনই?
টর্চের আলো ক্রমান্বয়ে ঘুরছে আমার চোখকে অবিশ্বাসী করে। আমার ঠিক পাশে শুয়ে থাকা শান্তনু, কনিষ্ক, ঋতম, অস্বাভাবিক ভাবে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে! ওদের শরীর থেকে কেউ যেন টেনে নিচ্ছে প্রাণশক্তি। এ কী? দ্রুত ওদের শরীরের চামড়া বৃদ্ধের মতো লোল হয়ে উঠছে। ঝুলে পড়ছে চামড়া, নখ দন্তহীন শান্তনু কী বলছে বুঝতে পারছি না। উঠে দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই কারও। এ কী হল এদের? ভয়ে সমস্ত শরীর কাঁপছে আমার।
কখন টর্চ নিভে গিয়েছে খেয়াল হয়নি। আয়নার কাচের ওপরে অদ্ভুত কিছু খেলা করছে। আলো ছায়া এক ভাবে ঢেউ খেলে যাচ্ছে। তাকিয়ে দেখছি। আমার সাড় নেই। মাথা কাজ করছে না। শুধু মনে হচ্ছে আয়নাটা যেন জীবন্ত। যেন নিস্তরঙ্গ আয়নার গায়ে প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে। যেন জড় পদার্থটি অজড় পদার্থে পরিণত হচ্ছে। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম।
জ্ঞান যখন হল, ঘরের ভেতরে ঝাপসা আলো ঢুকেছে। ভোর হয়ে গেল? ঘরের তিনদিকে তিনজন পড়ে আছে। আমি উঠে ওদের টেনে কোনরকমে বাইরে নিয়ে আসি। ওরা কথা বলতে পারছিল না। ওদের দেখে চেনা যাচ্ছে না। একরাতে জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে তিনজনই।
অথচ আমার কিচ্ছু হল না কেন? কী এমন সৌভাগ্য আমার? ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় পেছন ফিরে তাকালাম। আয়নার কাচে এখন আর অস্বাভাবিকত্বের কিছু নেই। ওই আয়নার কাচে মুখ দেখেছিল এরা তিনজন। চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে ছিল। ওদের প্রাণশক্তি কি আয়নায় আটকে গিয়েছে?
কীভাবে ওদের নিয়ে ফিরেছি, মনে নেই। সে এক বিরাট ঘটনা। সারা রাস্তায় কারও সাহায্য পাওয়া যায়নি। লোকালয়ে ফিরে থানায় গিয়েছি। থানা থেকে পুলিশ এসেছে আমার সঙ্গে। দেখতে চেয়েছে সেই জায়গা। ফুলবাবুর বছর ষোলোর সম্ভবত নাতি সাইকেল চেপে ঘুরছে। ফুলবাবু লোকটি বলছিল এখানে একা থাকে। এত মিথ্যে বলার কারণ কী? জলজ্যান্ত নাতি বা রিলেটিভ কেউ তো আছে! মানুষকে চেনা সত্যি কঠিন।
আমি নিজেই চিনে সেইখানে গেলাম। কিন্তু বালির নদী দেখতেই পাচ্ছি না। কোথাও সেই ভয়াবহ ব্যাপারটা নেই। সবই খুব স্বাভাবিক। একটা ঝোরা দেখছি। অল্প জল। কিন্তু সেই বাড়িটা খুঁজে পেলাম না। এতসব ঘটনার কিছুই কি কেউ জানে না? একমাত্র ফুলবাবু কিছু বলতে পারবেন। সাক্ষী হিসেবে তাঁর দেওয়া হাঁড়ি, কড়া পড়ে আছে একটা গর্তের ধারে। তিনি অবশ্যই জানেন সব। তিনি কি বাড়িতে আছেন?
নাতি বলল, ‘দাদু শহরের দিকে গিয়েছেন। কখন ফিরবেন, আমি জানি না।’ আদিবাসী গ্রামের কাছে এসে দেখি, ঠিক আগের মতো সব রয়েছে। আদিবাসী বৃদ্ধ একবার চোখ তুলে তাকাল। তারপর এক মনে ঝুড়ি বুনে চলল।
আমরা ফিরে এলাম। স্থানীয় হাসপাতালে তিন বন্ধু রয়েছে। ওদের শরীর থেকে অদ্ভুত ভাবে সমস্ত শক্তি নিংড়ে নেওয়া হয়েছে। রক্ত চাই। ডাক্তার বললেন, বৃদ্ধদের শরীর খুব খারাপ। বাঁচবে কি না...! শরীর থেকে সমস্ত রস রক্ত শুষে নিয়েছে কেউ।
তখনও বেলা রয়েছে। আমি আবার সেখানে গেলাম। এই রহস্যের কি কিনারা হবে না? ফুলবাবু নিশ্চয় কিছু জানেন। বালির নদীর কথা তিনি জানেন না?
ফুলবাবুর বাড়ির সামনে নাতি গাছে জল দিচ্ছিল। আমি কথা না বাড়িয়ে ফিরে আসছি, আদিবাসী বৃদ্ধ চোখ তুলে তাকাল। এই লোকটি নিশ্চয় কিছু বলতে পারবে।
‘আচ্ছা, ফুলবাবু কখন ফেরেন বলতে পারবেন? এই রাস্তা দিয়েই গিয়েছেন। রোজ এখান দিয়ে যান। কখন ফেরেন? আমার খুব দরকার। আর, আপনি নিশ্চয় জানেন, ওইদিকে একটা বালির নদী মানে নদীতে জল নেই। শুধুই বালি। দেখেছেন তো? আর একটু দূরে একটা বাড়ি...কেউ থাকে না...! কার বাড়ি? কী হয় ওখানে?’
আদিবাসী বৃদ্ধ জোরে হেসে উঠল, ‘নদী নাই। বালুর নদী কেউ দেখে বটে। আমি দেখি নাই। তুর ইসব কুথা আমি অনেক শুনেছি। কত লোক আসে। তারা দেখে। কেউ ফির্যা যায় নিজের ঘরে। কেউ যাইতে পারে না। ইখান দিয়া ওই দিকে যায়। নদী দেখে। তাদের সব্বাইকে ফির্যা আসতে দেখি নাই।’
বৃদ্ধ অল্প হাসল, ‘ফুলবাবু কোথাও যায় নাই। দেখিস নাই বাগানে? ফুল গাছে জল দিচ্ছে বটে। বয়সটা একটুস কম্মে গেছে। লোকে দেখলে ভাববে কী ইটা ফুলবাবুর লাতি। ফুলবাবু চোর আছে রে। বয়স চুরি করে। পরমায়ু চুরি করে। ও শালো বুড়া হবেক নাই।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন