ছায়াসঙ্গী

সাগরিকা রায়

ঘুম ভেঙে গেল মোবাইলের শব্দে। টি টি টিং টি টি টিং বিরক্তিকর শব্দটা মুখ ভেংচে ভেংচে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। বাইরে রিমিঝিমি গিরে শাওন। আর ভেতরে কম্বলের নীচে আরাম উপভোগ করার সময়ে বিরক্তিকর ফোন। কার এত শখ আমার আরামের চব্বিশটা বাজানোর! সিধু? নাকি সিধু যার হয়ে কাজ করছে, সে? এই দুজনেই জানে আমি এই মুহূর্তে কোথায় আছি। আসলে একটা ছোট্ট অপরাধ করে পালিয়ে বেড়াচ্ছি আমি। মাত্র একটা লোককে মেরে দেওয়ার বরাত পেয়েছিলাম। পার্টি মালদার, সুতরাং মাল ভালো পেয়েছি। বরাত দিতে এসেছিল সিধু। সেদিন বৃষ্টি পড়ছিল। টিপটিপ বৃষ্টি। সারাদিন ধরে বৃষ্টি পড়লে একটা ঠান্ডার আভাস ঘুরে বেড়ায় চারধারে। রাত দশটায় এল সিধু। বলল, ‘ডাক পড়েছে। রাতে যাস।’

‘রাতে মানে? ক’টায়?’

‘বারোটা।’ সিধু অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

গেলাম। যাকে হাপিস করতে হবে, তার ছবি, সঙ্গে অ্যাডভানস পেলাম। বাকি টাকা কাজের পরে। সিধুর নেতা বসে রিল্যাক্স করছিলেন।

আমি মাথা নেড়েছি, ‘অসম্ভব। আমাকে দূরে ঘাঁটি গাড়তে হবে। খরচ কার?’

‘খরচ নিয়ে ভাবতে ডেকেছি? কাজ চাই। পারবে? একা করতে হবে।’

‘পারব। বাকি টাকা?’

‘কাজ হয়ে গেলে সোজা স্টেশনে চলে যাবে। ওখানেই সব পেয়ে যাবে। কবে হবে কাজ? কাল?’

‘তিনদিন সময় চাই।’

‘বেশ।’

কাজটা তিনদিন পরেই করতে হল। ভেবেছিলাম ঝড়জলের রাতে কাজটা করে ফেলব। কিন্তু লোকটাকে বাড়ির বাইরে আনতে হবে। ঝড়জলের রাতে বউ বের হতে দেবে না। কাজেই তিনদিনের দিন রোদ ফুটফুট করতেই আমার দিল গার্ডেন গার্ডেন। পলিটিক্স বুঝি না। আমার পলিটিক্স আমার নিজের। কিন্তু পলিটিক্সের জেরে দুপক্ষের মধ্যে মারপিট হলে, আড়াআড়ি হলে আমার লাভ। আমি চাই দুটো পার্টি লড়তে থাকুক। বেফালতু কিছু আসে আমার পকেটে। এটাও সেই কেস মনে হচ্ছে। কে মরবে, কে বাঁচবে সে তারা বুঝুক। আমি কে? নিজে থেকে খানিকটা খোঁজখবর নিয়েছি। চায়ের দোকানে বসে, ‘আচ্ছা, সেদিন যে পার্টি অফিসে হামলা হল, কারা করেছিল? শুনেছেন কিছু?’

চায়ের দোকানি চা ছাঁকতে ছাঁকতে সাবধানে চারপাশে তাকিয়ে নিল। হালকা করে ঠোঁট উল্টে দিল, ‘বোঝেনই তো! এসব ঝঞ্ঝাট লেগেই আছে বছরের পর বছর।’

বুঝলাম, পকেট মোটা না হলে আমারই বা চলে কী করে? বেশি বুঝেই বা কী করব? তাই তিনদিনের দিন শিকারকে ফোন করলাম পার্টির সহযোদ্ধার নাম করে। সে যুব নেতার বন্ধু হিতেন। হিতেনের গলার স্বর মেয়েলি। বিশেষত্ব থাকলে কপি করা সহজ হয়। আজই নতুন সিম ভরেছি ফোনে। মেয়েলি গলার জন্য হিতেনকে নকল করা সহজ। মাঝে মাঝে গলা খাঁকারি দেওয়া ওর অভ্যেস। সেদিন হিতেন মেলার মাঠে যুবনেতার সঙ্গে কথা বলছিল। আমি কাছাকাছি দাঁড়িয়ে কানে ফোন চেপে ঠোঁট নেড়ে যাচ্ছি যেন কত ব্যস্ত ফোনালাপে। এদিকে হিতেনের গলা রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে আমার ফোনে। কত কত কথা থাকে মাইরি মানুষের! কত প্রব্লেম! যাক, রেকর্ড হল কথাবার্তা। তারপর ঘরে ফিরে প্র্যাকটিস!

যুবনেতা ফোন পেল তিনদিনের দিন। হিতেন তখন বিজুর সঙ্গে হাসপাতালের বাইরে রক্ত খুঁজছে। বিজুর বন্ধুর রক্তের দরকার। হিতেনকে নিয়ে না গেলে আমার শিকার হিতেনকে দেখতে পায় যদি! হিতেন দূরে থাক খানিকক্ষণ। নইলে কেস পুরো গাবলুস খেয়ে যাবে।

সিধুর হেব্বি বুদ্ধি। কাজ হয়ে গেলে আর বিজুর বন্ধুর রক্তের দরকার থাকবে না। হিতেন রাতে বাড়ি ফিরবে যখন, শিকার ততক্ষণে বেরিয়ে গিয়েছে হিতেনের ডাক পেয়ে কোলাঘাটে।

ইয়াপ্পি! কাঁচা রক্তের গন্ধ নাকে আসছে রে দাদা। কত্তদিন গন্ধটা পাইনি! কিন্তু শিকার হিতেনের ফোন পেয়ে ভাববে হিতেন ডেকেছে। অন্য সিম? তাতে কী? হয়তো অসুবিধে আছে। পলিটিক্সে কত ভেক ধরতে হয় শিকার কি জানে না? জানে, জানে। কিন্তু সেটা মোদ্দা কথা নয়। মোদ্দা কথা হল, আজ এখনই ওকে কোলাঘাটে যেতে হবে। খুব দরকার। একজনের সঙ্গে দেখা করাটা জরুরি। তো যুব নেতা যাচ্ছে, আজ ফিরে আসবে। হিতেন ডেকেছে। হিতেন ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। কে আর বারণ করবে শিকারকে বাইরে যেতে?

খুব দরকারে কোলাঘাটে যেতে হচ্ছে বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেনি যুবনেতা। দেহ মিলল রেল লাইনে। হিতেন ফোনে বলেছিল ও ট্রেনে আছে। ট্রেনে হিতেন বলেছিল দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াও। আমি আসছি। এসে হিতেনের জন্য অপেক্ষা করছিল আমাদের যুবনেতা। পলিটিক্সে কত গোপন কথা থাকে। এল। দাঁড়াল। হিতেনকে খুঁজল। আমি আলতো চোখে চারপাশে তাকালাম। ভেন্ডার বা কেউ এই মুহূর্তে ধারে কাছে নেই। সময়ের সদ্ব্যবহার করা চাই। এরপর একটা ধাক্কা দিতে কতক্ষণ? হিতেন? ধুস, হিতেন কোথায় এখানে? সে ব্যাটা জানেই বা কী আর বোঝেই বা কী? হ্যাঁ, বাড়িতে হিতেন ডেকেছে বলে এসেছিল, না? হিতেন বুঝুক তাহলে। আমার এত চিন্তার কী আছে!

কাজ হতে আমি ফিরে এসে সিধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। সিধুর ইন্সট্রাকশন মতো চলে গেলাম স্টেশনে। সেখানে সিধুর হাত থেকে ট্রেনের টিকিট, হোটেলের ডিটেইলস নিয়ে আমি হাপিস হয়ে গেলাম।

এই চমৎকার হোটেলে এসে রয়েছি দুদিন হল। আরামদায়ক ওয়েদার উপভোগ করছি। এখানে অন্য নামে, অন্য পরিচয়ে আছি। আর, ধরা পড়ার ভয় নেই। আমার নাম ততক্ষণ উঠবে না যতক্ষণ না গোড়া ধরা পড়ে। আরে ধুস! এরা কি ধরা পড়ে নাকি? যে ধরবে সে যে এর কাজিন হয়! হে হে! ফোন বাজছে! কার ফোন? কম্বলের ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়েও স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েও বুঝতে পারলাম না।

আননোন নাম্বার! রিসিভ করব? না, দরকার নেই। চোখ কেবল বুজেছি, ফোনটা ফের বাজছে। হাত বাড়িয়ে ফোন নিয়ে জয় মা বলে সবুজ বোতামে চাপ দিলাম। দেখাই যাক, কে ফোন করেছে। নতুন পার্টি হয়তো। নতুন পার্টি মানেই ইনকাম। মোটা টাকা। এটাই আমার প্রফেশন। কী আর করা যাবে!

‘সব ঠিক আছে?’ পরিচিত গলা ভেসে এল৷ ‘ঘুম হয়েছে? শোনো, হোটেল থেকে বের হবে না। ওখানেই থাকো। পরে যোগাযোগ করব। কারও সঙ্গে যেচে কথা বলবে না। কোথা থেকে এসেছ জানতে চায় যদি কেউ, বলবে পুরুলিয়া। তোমার ভোটার আইডিতে সেটাই লেখা আছে। একবার কাগজপত্র দেখে নাও। নিজের পরিচয় জেনে নাও। তোমার নাম পাল্টে দেওয়া হয়েছে। মনে আছে নাম? পরে ফোন হবে। সিম ফেলে দাও কমোডে। অন্য সিম ভরে নাও। তোমার ব্যাগের ভেতরের পকেটে চারটে নতুন সিম আছে। দেখে নাও।’ ফোন কেটে গেল।

কী বলে সিধু? আমি হোটেল থেকে বের হব কেন? আমার ইন্টারেস্টটা কী? এখানে আমি চিনিই বা কাকে? ফোনটা বালিশের পাশে রেখে দিলাম। সিধুর যত ফালতু বকোয়াসস! তাছাড়া কাগজপত্র দেখিনি? আরে, ওসব না দেখলে চলবে আমার? আমার নিজেরই অন্য নামের ভোটার আইডি, আধার কার্ড সবই আছে সিধুদা। এখন তোমাদের দেওয়া নাম ধাম ইউজ করছি। পরে দরকারে নিজেরটা ইউজ করব। কিসিকো হাথ না আয়েগা ইয়ে লড়কা।

ফের কম্বল চাপা দিয়ে শুতে গিয়ে একটা হাসির শব্দ পেলাম। খিক খিক! আমি হাসছি। হাসব না? পটল তুলল কে, আর আরাম করছে কে! শুতে গিয়ে কম্বলটা গায়ের ওপর ভালো করে টেনে দিতে গিয়ে শব্দটা পেলাম। হাসির শব্দ। হাসি? না, এবারে আমি হাসিনি। তাহলে? এই ঘরেই শব্দ হয়েছে। কে হেসেছে? আমি একটু চুপ করে কান খাড়া করে রইলাম। না, কোনও শব্দ নেই! কিন্তু আমার কান ভুল শোনেনি! কেউ হেসেছে। এবং এই ঘরেই হেসেছে। কে আছে এখানে? আমাকে কেউ নজরে রাখতে চেয়ে লুকিয়ে নেই তো? আগে থেকে এই ঘরে কেউ আছে কি?

লোডেড পিস্তলটা বের করে কম্বল সরিয়ে একটু অপেক্ষা করলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে সাবধানে নেমে পড়লাম। খাটের নীচে রুম স্লিপার রয়েছে। পা দিয়ে টেনে পায়ে ঢুকিয়ে নিলাম। অন্ধকার ঘর। আলো চাই...আলোর সুইচটা...আমার থেকে একটু দূরে। বেডসাইডের টেবিলের আলোটা জ্বেলে দিলাম। খুট। আলো জ্বলল না। আলো জ্বলছে না কেন? খানিক আগেই আলো জ্বলেছে। এটা কি অস্বাভাবিক ঘটনা নয়? হতেই পারে। আলো চলে যেতেই পারে নানা কারণে। কিন্তু হোটেলে কি জেনারেটর নেই? অন্য বোর্ডাররা প্রতিবাদ করছে না? নাকি, আমার রুমেই আলো চলে গেল? হ্যাঁ, আমার ব্যাগে মোমবাতি রয়েছে। নিজের ব্যবস্থা নিজে খানিকটা করে থাকি আমি। অন্যের ওপর নির্ভর করে এই প্রফেশনে বাঁচা যায় না।

আমার ব্যাগ আমার কাছে থাকে। হুম, এই যে। ব্যাগের চেইন খোলার চিইইইক শব্দটা কানে লাগছে। আসলে এত নিশ্চুপ এই ঘরটা! বাইরের আওয়াজ ভেতরে আসে না। এমন জায়গায় নিজেকে লুকিয়ে রাখার কাজটা ভালোই হয়। কিন্তু একটু একটু নিরাপত্তার অভাব টের পাই আমি এসব জায়গায়। কে এসে দরজায় নক করবে জানি না। দরজা খুলে দাঁড়াতেই পয়েন্ট রেঞ্জ থেকে নিঃশব্দে একটা সিসে ঢেলে দিয়ে বডি ঠেলে ঘরে ফেলে দিয়ে বাইরে থেকে লক করে চলে যাবে আততায়ী।

এসব দিক দিয়ে বস্তি অঞ্চলে লুকিয়ে থাকা বরং সুবিধের। ঝট করে মেরে পালিয়ে যাওয়া খুব সুবিধের নয়। তবুও, বস্তিতে কি খুন হয় না? হচ্ছে না? দিনের বেলায় জনবহুল এলাকায় দাঁড়িয়ে চাল ব্যবসায়ীকে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিলও কারা? ধরতে পেরেছিল কেউ? বাইকে চেপে কেমন হাপিস হয়ে গেল আততায়ী!

আরে! ফের হাসির শব্দ! মাইরি আমি হাসিনি এখন! পটল তুলল কে, আর হাসছে কে! খস! দেশলাই জ্বলে উঠে মোমকে জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তে ঘরটা লালচে আলো মেখে তাকিয়ে রইল। আমার দিকে।

মোমের আলোয় ঘরটা হালকা লালচে আলোয় ভরে গেল। আমার ছায়াটা বিরাট হয়ে দেওয়ালে ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু খাটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকলে তো আর হবে না। একটু একটু করে চারপাশে তাকাতে তাকাতে ঘরের মাঝখানের ফ্লোরম্যাটের ওপর গিয়ে দাঁড়ালাম। মোমবাতির শিখা অল্প অল্প কাঁপছে। ঘরে বাতাস নেই। আমার শ্বাসের ধাক্কায় কেঁপে কেঁপে উঠছে আগুন। আগুন কি আমার ভয়ে কাঁপছে? হাসতে গিয়ে থমকে গেলাম। কারণ হাসির একটা আওয়াজ আসছে। এই ঘরে ফের হাসির শব্দ! আশ্চর্য! আমি হাসব বলেই হেসে ফেলল কেউ? নাকি আমি স্লো হয়ে গিয়েছি? আমার কান শুনতে দেরি করছে? শ্রবণেন্দ্রিয় কি কাজ করছে না ঠিকঠাক? আসল কথা হল, ওটা আমারই হাসি। যা হুজ্জোতির মধ্য দিয়ে এলাম! মাথাটা কটাদিন একটু টালমাটাল থাকবেই।

এমনই হয়। যে ব্যবসার যা। নার্ভাস না হলেও উত্তেজনা বা টেনশন থাকেই কাজটা ঠিকঠাক করতে পারব কিনা ভেবে। এই প্রফেশনে নাম নষ্ট করতে কেউ চায় না। এরপর আছে পুলিশের ঝামেলা। এইজন্যই আমি একা কাজ করে থাকি। সঙ্গে রামা, শ্যামা থাকলেই যত্ত সালার ঝামেলা। কেস করার পরে হাতে টাকা এল কি অমনি দু’হাতে খরচ করতে শুরু করবে। লোকের নজরে পড়বেই। চোলাই ছেড়ে হুইস্কি, স্কচ খেয়ে বাতেলা মারবে এমন...! তখনই ধরা পড়ে। হঠাৎ করে টাকা পেল কোথা থেকে? পুলিশের লিস্টে এরা থাকেই। সুতরাং একে একে দুই হতে আর কতক্ষণ? আর একবার ধরা পড়লেই দু, ঘা খেয়ে মূল হোতার নাম বলে ফেলে। আসল মাথাকে এরা চেনে না। দলের পাণ্ডাকে চেনে। পাণ্ডার হয়ে যায় ঝামেলা। আমি ওসব ঝামেলায় নেই। এই যুবনেতার কেসে সাগরেদের দরকার কী ছিল? কিস্যু না। বেশ একাই তো সামলে দিলাম।

না। আমি ছাড়া ঘরে আর কেউ নেই। এবারে কি মোমটা নিভিয়ে দেব? না, থাকুক আলো। অন্ধকার যে আমার বড্ড প্রিয়। কিন্তু, এখন কেন যেন আমার মনে হচ্ছে ঘর অন্ধকার করে দিলেই আমি একা হয়ে যাব। এবং সেটা এই মুহূর্তে অনভিপ্রেত। মোমটা জ্বলছে। মোমের রঙ লাল। মোম গলে গলে পড়ছে একটা ট্রের ওপরে। এঘরে মোমদানি নেই! মোম রাখার স্ট্যান্ডগুলো খুব সুন্দর হয়। নানারকম দেখেছি। একবার অচিন্ত্য এনে দিয়েছিল কর্ণাটক থেকে। চন্দন কাঠের মোমদানি। গরম মোম গায়ে পড়লেই চন্দনের সুবাস ছড়াত।

সেবারে একটা বুড়িকে মেরেছিলাম পেতলের মোমদানি দিয়ে। দেখতে বেশ দারুণ ভারী ছিল কিন্তু ওটা! একটা বাচ্চা মেয়ে যেন ঘাগরা উড়িয়ে চলেছে। আশ্চর্য ঘটনাটা ঘটেছিল বুড়ির মাথাটা ফটাস করে ফেটে যাওয়ার ঠিক পরে। বুড়ির ঘিলু বেরিয়ে এল আর মেয়েটা মানে মোমদানিটা একপাক নেচে উঠল! তখন ভেবেছিলাম হত্যার পরের উত্তেজনায় ভ্রম দেখেছি। পরে মাথা ঠান্ডা হলে মোম স্ট্যান্ডটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। মার্ডার ওয়েপন খুঁজে না পেলে পুলিশ আতান্তরে পড়ে। সেই মোম-মেয়ে রয়েছে আমার ঘরের টেবিলের ওপর। কোনও কেসে ঠিকঠাক সাকসেস পেলেই মোম মেয়ে নেচে ওঠে আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে। তারপরেই স্রেফ একটা ধাতুর মূর্তি ছাড়া আর কিছুই না ওটা।

হা হা হা! এমন সব কাণ্ড! মোমটাকে ট্রের ওপরে সেঁটে বসিয়ে ফের কম্বলের তলে ঢুকে যেতে যেতে হঠাৎ একটা অন্যরকম কিছু মনে হল। একটা অনুভূতি কাজ করছিল। মনে হল, এঘরে আমি ছাড়াও আর কেউ আছে! মহা ঝামেলা! এসব হচ্ছে কী?

কম্বলের ভেতরে পা দুটো ঢুকিয়ে নজর রেখে চললাম। দেওয়ালে আমার ছায়াটা আধশোওয়া হয়ে আছে কম্বলের ভেতরে দুটো পা ঢুকিয়ে দিয়ে। চারপাশে নজর রাখতে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে হুবহু আমারই মতো। আমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে চুল ঠিক করতে করতে ছায়াকেও চুল ঠিক করতে দেখলাম। ছায়া শরীরের ছায়া, ছায়া চুলে ছায়া হাত বুলোচ্ছিল!

বেশ মজাই লাগল! আচ্ছা! এ-ই তাহলে রয়েছে! এর উপস্থিতিটা ভুলেই গিয়েছিলাম! আচ্ছা, আমার সঙ্গে আমার ছায়া থাকবেই। অথচ ওকে ভুলে যাই? হে হে! আসলে আলো ছাড়া তো ছায়াকে দেখতে পাই না। আর আমার তো আবার অন্ধকারে বাস! দেখব কখন? তবে হ্যাঁ। আজ পর্যন্ত সব কেসেই ছায়াটা আমার সঙ্গেই আছে, থাকে, থাকবে। এমন কেস দেখিনি, যেখানে ছায়া ছিল না। সব কেসেই মদত দিয়ে গেছে। যাচ্ছে।

কে? দরজায় বেল বাজল! এত রাতে কে? আমি সন্তর্পণে উঠে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে পিপ হোলে চোখ রেখে দেখছি, একটা কেউ দাঁড়িয়ে আছে। রুম সার্ভিস? না। একে দেখে তেমন লাগছে না! তাহলে? উম, সাড়াশব্দ না করে থাকাই ভালো! দেখি।

কেন যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে! আমি আসলে কাউকেই বিশ্বাস করি না। সিধু হোটেল থেকে বের হতে নিষেধ করেছে। কেন? ওরা কি আমার মতো সাক্ষীকে সরিয়ে ফেলতে চায়? এই অজানা অচেনা জায়গায় আমাকে স্বনামে কেউ চেনে না। কোথাকার বিজয় সাক্সেনা কোথায় কার সঙ্গে চলে গেল, কে আর তার খোঁজ রাখবে? আর যদি এখানেই নিকেশ করে দেয়, তাহলে তো আরও ভালো। অনেক সময় কিছু হোটেল এই ধাঁচের কেসে পুলিশ ডাকে না। নিজেরাই বডি লোপাট করে দেয়। ঝামেলা কাঁধে রাখে না।

এখন কী করব? কী করা উচিত?

পেছন ফিরতেই দেখি ছায়া আমার মুখোমুখি। ওই যে, জানালা রয়েছে। ওখান থেকে বেরিয়ে হোটেলের পেছন দিকে চলে যাই?

আস্তে আস্তে জানালার পাল্লা খুললাম। শব্দ না হয় এমন ভাবে খুলতে হল বলে সময় লাগল। জানালা খুলতেই হিম ঠান্ডা বাতাস ঢুকে পড়ল ঘরে। ব্যাগটা টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। বেরিয়ে অন্ধকার সরু প্যাসেজে পড়লাম। এখান থেকে সিঁড়ি খুঁজে নীচে নেমে যেতে হবে। সেটা খুব একটা সমস্যা নয়। হোটেলের পেছনদিকে সবসময় একটা ঘুপচিমার্কা সিঁড়ি থাকে দেখেছি আগেও। এই হোটেলেও আছে নিশ্চিত। বড় বড় হোটেলের সামনেটা যত ঝকঝকে, পেছনে ততোধিক নোংরা। অন্ধকারে এগিয়ে যাচ্ছি হাতড়ে হাতড়ে। প্যাকিং বাক্সে ঠাসা প্যাসেজ। কোনওরকমে সিঁড়ি চাই। পালাতে হবে এখান থেকে। পেছনে কেউ ডাকছে।

অবশেষে সিঁড়ি! সন্দেহ হয়েছিল ঠিকই। এই প্যাকিং বাক্সগুলো সিঁড়ি লুকিয়ে রাখার কাজেই ব্যবহার করা হয় সম্ভবত। একটু আলোর রেখা চুলের মতো এসে পড়েছে। অন্ধকারে সেটুকুই বিরাট রোশনাই হয়ে দাঁড়াল। আর আমি বাক্সগুলো সরাতে সরাতে দরজাটা খুঁজে পেলাম। ভয় করছিল দরজাটা খুলে ফেলতে। যদি দরজার ওপারে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে!

অসুবিধে হল না। ব্যাকপ্যাক নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে নীচের দিকে নামছি। দেওয়ালে লেপটে আমার ছায়াও আমার সঙ্গে নেমে এল। কেউ নেই এদিকে! কারও আওয়াজ পাচ্ছি না। একটা খুট শব্দে আমি সিঁড়ির ধাপে নীচু হয়ে বসে পড়লাম। ছায়াও দেখাদেখি বসে পড়ল।

আস্তে নামছি। একটা দরজা দেখতে পেয়েছি। আমার সামনেই একটা দরজা।

একটা দরজার কাছে এসে সিঁড়ি শেষ হয়েছে। দরজার ওপাশেই কি বেরিয়ে যাওয়ার পথ? আস্তে ধাক্কা দিলাম। খুলছে না! ওদিকে আটকে রাখা আছে নাকি? মানে আমি এখন খাঁচায় আটকে থাকা বাঘ? ফের চাপ দিলাম। নাহ, একটু নড়ছে না দরজা। দুজন হলে হয়তো চাপটা বেশি পড়তো। তাহলে হতো। ছায়া আমার সঙ্গেই চাপ দিচ্ছে। আমি ফিসফিস করে বললাম, ‘এখন আমরা দুজন। চেপে ধাক্কা দাও। শব্দ যেন বাইরে না যায়, বুঝলে আমার ছায়া?’ ‘বলে আমি ঘাড় হেলিয়ে তাকালাম। ছায়াও ঘাড় হেলিয়ে তাকাল। আমরা একসঙ্গে চাপ দিচ্ছি। দুজনের চাপে দরজাটা খুলে যাচ্ছে সত্যি সত্যি!

স্বস্তির শ্বাস ফেলে পা বাড়িয়েই থমকে যেতে হল। লোকটা হিসহিস করে উঠল, ‘দাঁড়াও! নির্দেশ আছে এখানে তোমাকে আটকে দিতে। তুমি সাহিল রহমান? তুমি এখানকার বাসিন্দা নও। একজন যুবনেতার...! আমার ওপর অর্ডার আছে তোমাকে নিকেশ করে দেওয়ার। মানে খুন করার। তুমি ভগবানের নাম করো।’ লোকটা নির্বিকার স্বরে কথগুলো বলল। আমিও এভাবেই বলে থাকি অন্য কারও মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে যাই যখন। কিন্তু লোকটা ভগবান শব্দটা বলল! মানে এই লোকটা হিন্দু!

বললাম, ‘কে পাঠিয়েছে তোমাকে এটুকু অন্তত বল।’

আন্দাজ ঠিকই করেছিলাম। যার নাম বলল, সে-ই আমাকে যুবনেতাকে মেরে দেওয়ার বরাত দিয়েছিল। আমি ছায়ার দিকে তাকালাম। ছায়া আমার দিকে। কিন্তু আমাদের সামনে আর কোনও পথ নেই। আমাকে কি সত্যি এবারে মরতে হবে?

এক মুহূর্তের মধ্যে ডিসিশন নিয়ে লোকটাকে আচমকা ল্যাং মেরে ব্যাক করলাম হোটেলে আমার বুক করা ঘরের দিকে। লোকটা ছিটকে পড়েছে, সে শব্দ পেয়েছি। ও উঠে আসতে আসতে আমি অনেকটা এগিয়ে যাব। ছুটতে ছুটতে দেখছি ছায়াসঙ্গীও ছুটছে আমার মতোই মরিয়া হয়ে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে অন্ধকার প্যাসেজে পড়লাম। আমার ঘরটা এদিকেই...রুম নাম্বার টোয়েন্টি ফোর! রুম ভেতর থেকে বন্ধ। জানালা যেমন খুলে রেখে গিয়েছিলাম, তেমনই খোলা পড়ে আছে। ঢুকেই জানালা বন্ধ করে দিতেই মনে হল, ছায়াটা যেন বাইরে রয়ে গেল! অল্প করে পাল্লা ফাঁক করতেই হিম বাতাস ঢুকে পড়ল ঘরে। আমি নিশ্চিত হলাম ছায়াটা ঢুকেছে ঠিকঠাক। জানালা বন্ধ করে এখন কী করব ভেবে পেছন ঘুরেছি, ছায়াও ঘুরেছে। আর আমি পেছন ঘুরেই চমকে উঠেছি। ঘরে আগে থেকে দুজন বসে আছে। একজন উঠে এসে আমার ঘাড় শক্ত করে চেপে ধরল, অন্যজন নিঃশব্দে এসে আমার গলার নলিটা কেটে দিল! ক্লিচ শব্দটা শুনতে পেলাম অসহ্য যন্ত্রণার সঙ্গে।

ঘরের মোমটা ছোট হতে হতে অনেকটা ছোট এখন! অল্প অল্প লালচে আলোয় দেওয়ালে আমার ছায়া পড়েছে। আমি মরে যাচ্ছি! পড়ছি কার্পেটের ওপরে। কিন্তু মৃত্যুর যন্ত্রণা ছাপিয়ে একটা বিস্ময় স্থির হয়ে রইল আমার চোখে। আমার ছায়া উদগ্রীব হয়ে আমাকে দেখছে! ওকে মারেনি ওরা? ও মরে যাচ্ছে না? আমার সঙ্গে সঙ্গে ওরও কণ্ঠনালী কাটা পড়ার কথা।

হোটেলের বন্ধ ঘরে বিজয় সাক্সেনার বডি যখন পাওয়া গেল, পুলিশ মৃতের চোখে মুখে বিস্ময় আর ভয় দেখতে পাচ্ছিল। লোকটা ভয় পেয়েছিল মৃত্যুর আগে। কেন?

তদন্ত চলছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%