নীল কাচের শিশি

সাগরিকা রায়

কলকাতা শহরে আসাটা নেহাতই প্রকৃতির তাণ্ডবের ফল। ইয়াস এল এমন ভাবে, আমাদের ফ্রেজারগঞ্জের বাড়িটা এক ঘণ্টায় জলের তলায় গিয়ে আত্মগোপন করল। তার চেহারাটাই দেখা যাচ্ছিল না কোথাও। এদিকে বাঘের মতো ডাক ছাড়ছে ইয়াস। টর্নেডো আসার ইঙ্গিত পাচ্ছে বিশেষজ্ঞরা। মোবাইলে চার্জ দিয়েছিলাম। কিন্তু নেট কানেকশন ফল করাতে কোনও খবর পাচ্ছি না। প্রায় দেড়ঘণ্টা আগে সুবিনয় সাইকেলের সারা শরীরে বাড়িটাকে তুলেই নিয়ে যাচ্ছে প্রায়, আমাকে দেখে ম্লান হাসল, ‘ইয়াস এর পরে যে টর্নেডো আসছে, তা জানিস?’

‘হ্যাঁ, শুনেছি। টর্নেডো এলে আমরা আর বাঁচব না সুবিনয়। ইয়াসের শক্তিতেই আর উঠে দাঁড়াতে পারব কিনা কে জানে। আমফান ঝড়ে আমাদের বাড়ি উড়ে গিয়েছিল। বাড়ি মেরামত করাতেই কতদিন গেল। এখনও রান্নাশাল হয়নি। উপায় নেই বলে মা উঠোনে রান্না করে। এখন ইয়াস ফের কী যে করবে, ভেবে কাঁপছি।’

সুবিনয়ের কাছ থেকে টর্নেডো আসার খবর পেয়ে মন খারাপ হয়ে গেল। ইশকুল বাড়িতে উঠতে হয়েছে গ্রামের লোকদের। বাবা অসুস্থ। বাবা, মা, দিদি আর দুই ভাইকে ইশকুলবাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আর কিছু নেওয়া যায় কিনা দেখতে বাড়িতে এসেছিলাম। মিনিট দশেকের মধ্যে জল বেড়ে গিয়েছে। কোমর পর্যন্ত জল ঠেলে এগিয়ে যেতে যেতে একটা হাহাকারের ঘুর্ণি উঠল। জল, বাতাস, কালচে আকাশ ক্রমেই নেমে আসছে মাথার ওপরে। আমি টের পেলাম জল আমার বুক পর্যন্ত উঠে এসেছে। কোথা থেকে কেউ চেঁচিয়ে ডাকছে আমাকে। কেন ডাকছে বুঝতে বুঝতে আমি পায়ের নীচে মাটি পাচ্ছিলাম না। পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে করতে দেখছি একটা বিরাট নিমগাছ ঢল ঢল করতে করতে জলের ভিতরে পড়ে গেল।

প্রথমে বুঝতে পারিনি। কিন্তু নিমগাছের আয়তন দেখে আমি ভীষণভাবে চমকে উঠলাম। এই গাছটা আমাদের বাড়ির পিছনের সেই গাছটা? তাহলে, আমাদের বাড়িটা কোথায়?

খুঁজে পেলাম না। বাড়িটা হারিয়ে গেল। কোনওরকমে সাঁতরে ডাঙায় উঠে ইশকুলবাড়িতে গেলাম। মা আমার জন্য উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টির সামনে বাড়িটার হারিয়ে যাওয়ার কথা বলতে পারলাম না। মায়ের পাশে গিয়ে চুপ করে বসে থাকলাম।

দিন পেরিয়েছে। কাজ নেই। দারিদ্র্যের করাল ছায়া আমাদের মতো হাজার পরিবারের ওপরে ছেয়ে থাকল। রেশনে যা পাচ্ছি, তাতে খাবার পাচ্ছি না, তা নয়। কিন্তু সামনের দিনগুলো ভয় নিয়ে আসছে। কতদিন আর ইশকুলবাড়িতে থাকতে দেবে আমাদের? একটা ঝুপড়ি বানিয়ে নিয়ে চলে যাই সবাই মিলে!

ঠিক তেমনই এক দিনে সুবিনয় বলল, ‘কলকাতায় যাবি? সেখানে কাজ পাব, আশাকরি। যে কোনও কাজ করতে চাই। না খেয়ে মরতে পারব না।’

বাড়িতে বলেছি। মাকে না জানিয়ে যাওয়া যাবে না। তাছাড়া এ তো একদিনের জন্য বেড়াতে যাওয়া নয় যে না বলে গেলে অসুবিধে তেমন হবে না! এ হল জীবিকার সন্ধানে যাওয়া। কতদিনের জন্য যাচ্ছি, তার কি ঠিক আছে? দিনক্ষণ কি বলা যায়?

বাবা রেশনের চাল নিয়ে এসেছে। মা ভাত রান্না করেছে। গরম ভাতে সর্ষের তেল, কাঁচালংকা, নুন মেখে খেতে খেতে বাবা বলল, ‘দিনকাল বড্ড খারাপ রে বাবুল। দুমুঠো পেটে দিতে হাঁপিয়ে যাচ্ছি। এবারে সোনামনির পড়াশোনার কী হবে বল? ওর এত পড়াশোনার ইচ্ছে, সব শেষ হয়ে গেল বুঝি।’

সোনামনি বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতের ভাত হাতেই রয়ে গিয়েছে। আমি বললাম, ‘সুবিনয় কলকাতায় যাচ্ছে। ওখানে অনেকরকম কাজ আছে। আমি ভাবছি ওর সঙ্গে যাব। রিস্ক না নিলে চলে না বাবা। গ্রামে থেকে কী করব এখন? বাড়ি ডুবে গেল। নতুন করে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। সোনার পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হবে। তোমরা আপত্তি কোরো না।’

মা জলার ধার থেকে শান্তিশাক তুলে এনেছে। রাতে শাক রান্না হবে। আমার কথা শুনেছে, কিছু বলেনি মা। আপত্তিও করেনি।

আপত্তি করার উপায় ছিল না। সুতরাং সুবিনয়ের সঙ্গে আলোচনা করে একদিন সকালের দিকে ব্যাগ গুছিয়ে কলকাতার উদ্দেশে ট্রেনে উঠে বসেছি। যাব টালিগঞ্জের রসা রোডে। ওখানে সুবিনয়ের এক মাসি থাকে। নিজেরই বাড়ি। সুবিনয় আপাতত আমাকে নিয়ে মাসির বাড়িতে উঠবে।

কলকাতায় পৌঁছে রসা রোডের মাসির বাড়ি পৌঁছতে হ্যাপা কম হল না। অবশেষে ঠিকানা খুঁজে পেতে গিয়ে যখন পৌঁছুলাম, বেলা দুটো বেজেছে। একতলা বাড়ি। গাছপালার ভিড়ে বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভিতরে একটা বাড়ি আছে। সেই বাড়িতে মাসি থাকে। ভাড়াটে আছে একজন বৃদ্ধ লোক।

আমাদের দেখে মাসি খুশি হল কিনা বোঝা গেল না। কিন্তু কেউ এসেছে বুঝে ভাড়াটে বেরিয়ে এসে আমাদের দেখে আপ্যায়ন যথার্থ করল। দু’হাত জোড় করে নমস্কার ইত্যাদি করার পরে রেস্ট নিতে বলল সে। মাসি ভ্রূ তুলে ভাড়াটের আদেখলাপনা দেখছিল। এবারে এগিয়ে এসে ‘আয় তোরা ভিতরে’ বলে ভিতরে ডেকে নিল।

আমরা মাসির ছোট্ট ঘরের একখানা চৌকি, ছোট টেবিলের ওপরে রান্নার ব্যবস্থা, দড়ির আলনা দেখে বুঝতে শুরু করেছি যে এখানে থাকা যাবে না। দিন দুই কষ্ট করে চালিয়ে নিয়ে অন্য কোনও ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। মাসির ঘাড়ে বসে খাওয়ার তো প্রশ্নই নেই।

মাসি খুটখাট কী করে যাচ্ছে। এদিকে আমার প্রবল তেষ্টা পেয়েছে। মাসিকে বলব কিনা ভাবছি, দরজায় কেউ কড়া নাড়ল। অমনি মাসি, ‘কী হল সুধাংশুবাবু? কী চাই?’

দরজা ঠেলে ভাড়াটে ভদ্রলোক ঢুকে পড়ল, ‘ওরা জলটল খাবে কিনা জানতে এলাম। হ্যাঁ ভাই, জল খাবে?’

আমি লাফিয়ে উঠেছি, ‘খাব, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে। যা গরম!’

হেসে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে আনন্দে উদ্ভাসিত মুখে একটি নীল জলের বোতল এগিয়ে দিল লোকটি, ‘খাও ভাই। বেশ ঠান্ডা জল। মনে হবে যেন ডাবের জল।’

আমার তখন যে-কোনও জল পেলেই হতো। বোতল গলায় উপুড় করে দিয়ে আরামের শ্বাস ফেললাম। সুবিনয় তৃষ্ণার্ত চোখে বোতলের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাকি জলটুকু ও খেয়ে নিল।

এবারে খানিক স্বস্তি এল। আমি মাসিকে দেখিয়ে সুবিনয়কে বললাম, ‘স্নান করার ব্যবস্থা আছে নাকি? জিগ্যেস করে দেখ না।’

মাসির উদাসীন ব্যবহারে সুবিনয় আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে। ও ইশারায় নিষেধ করল আমাকে বাড়াবাড়ি না করতে। গলা নামিয়ে বলল, ‘ভোরে তো চান করেই বেরিয়েছি। আজ থাক। কাল দেখি কী করা যায়।’

সুধাংশুবাবু শুনতে পেয়েছে আমাদের নিচুগলার কথাবার্তা। তিনি অবাক গলায় বললেন, ‘চান করবে? আরে, এসো ভায়া। আমার ঘরের পিছনেই পুকুর আছে। বেশ ঠান্ডা শীতল জল হে। এসো, এসো।’

আমি সুবিনয়ের দিকে তাকিয়ে দেখি ও অনুমতির অপেক্ষায় মাসির দিকে তাকিয়ে আছে। মাসি একটু বিরক্ত গলায় বলল, ‘দেখ বাপু, চানটান যা করার তাত্তাড়ি করে এসো। সেদ্ধভাত করেছি। নেয়ে এসে খেয়ে উদ্ধার করো। যত্ত ঝামেলা কি লীলাময়ীর ঘাড়েই পড়বে? সারাজীবন পরের বেগার খেটেই মরব? ভেবেছিলাম আজ দুপুরে কেত্তন শুনতে যাব গোপালমন্দিরে। সন্ধের আরতি দেখে পেসাদ খেয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়ব। হল? এখন ফের রাতে রাঁধতে হবে।’

আমাদের দুজনকে ইশারায় ওর সঙ্গে যেতে বলে ঘরের বাইরে চলে গেলেন সুধাংশুবাবু। মাসি বকবক করে যাচ্ছে, আমরা বেরিয়ে এলাম।

সুধাংশুবাবুর ঘর ডানদিকের সরু প্যাসেজ দিয়ে বেরিয়ে পিছনের দিকে। দুটো ঘর। ঘরে ঢুকে কেমন একটা পুরোনো পুরোনো গন্ধে নাক ভরে গেল। অনেকদিন ঘর বন্ধ থাকলে যেমন হয়, ঠিক তেমন গন্ধ। ভ্যাপসা। দমচাপা। না, তাছাড়াও একটা অন্যরকমের গন্ধ আছে। লাশঘরে এরকম গন্ধ থাকে। বাসি মড়ার গায়ে এমন গন্ধ হয়। এখানে, সুধাংশুবাবুর ঘরে এমন গন্ধ কেন? কিছু পচেছে নাকি?

পাশের ঘরটা বন্ধ। সুধাংশুবাবু বললেন, ‘এখানে রান্নাবান্না করি আর কী। আজ এত্তটুকু বাধাকপি করেছিলাম, তো খেয়ে ফেলেছি ভায়া।’

হুম, ঘরটা বড্ড অগোছালো বটে। আমি ঘরের চারপাশে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, সুধাংশুবাবু তাড়া দিলেন, ‘যাও ভায়া। চান সেরে নাও। এসো, পুকুর এদিকে।’

বাড়ির পিছনে একটা পুকুর। পুকুর ঘিরে ঝোপঝাড়। কলাবাগান। নারকেল গাছ। নারকেলের ডাল পড়ে আছে পুকুরের জলে। পড়ে জলে ভিজে ঢোল হয়ে আছে। সুবিনয় বুদ্ধি করে ব্যাগটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। আমার ব্যাগ মাসির ঘরেই আছে। সুবিনয় স্নান করতে নেমে গেল জলে। আমি ফিরে গেলাম আমার গামছা নিয়ে আসতে।

দরজা খোলাই পড়ে আছে। ভিতরে স্টোভ জ্বলছে শোঁ-শোঁ করে। তাতে কী ফুটছে। মাসি ঘরে নেই। আমার ব্যাগটা দরজার একধারে যেমন পড়ে ছিল, তেমনই একা একা পড়ে আছে।

ব্যাগ খুলে গামছা আর ঘরে পরার শার্ট, বারমুডা নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। পুকুর পাড়ে কেউ ছিল না। আমি অবাকই হয়ে গেলাম। সুবিনয়ের কি স্নান হয়ে গেল? স্নান করে উঠে ও কোথায় গেল? সুধাংশুবাবুই বা কোথায়? দুজনে এত তাড়াতাড়ি কোথায় গেল?

জলের দিকে তাকিয়ে দেখি জলে কোনও কম্পন নেই। স্থির জলে পাড়ের গাছের ছায়া পড়েছে। ঘাটের ওপরে সুবিনয়ের জামাকাপড়ের চিহ্নটুকু নেই। ও কি স্নান না করেই চলে গেল? কোথায় যেতে পারে? সুধাংশুবাবুই বা কোথায়?

আমি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে সুবিনয়ের নাম ধরে ডেকে উঠেছি, ‘সুবিনয়! সুবিনয়!’

দূরের কলাবাগান নড়ে উঠল। আমি আশান্বিত হয়ে তাকালাম। নিশ্চয় সুবিনয় ওখানে আছে।

কলাবাগান নড়াচড়া করে স্থির হয়ে গেল। আশ্চর্য! সুবিনয় নেই ওখানে? আমি পরিস্থিতি বুঝতে পারছি না। রসা রোডের এই বাড়িতে মাত্র খানিক আগে এসেছি। কিচ্ছু চিনি না এই এলাকার। সুবিনয়ের মাসিকেও ঘরে দেখিনি। হচ্ছেটা কী?

আচ্ছা, সুবিনয় কি সুধাংশুবাবুর ঘরে গিয়েছে কোনও কারণে? সেটাই হবে নিশ্চয়। আমি পুকুরপাড় থেকে সুধাংশুবাবুর ঘরের দিকে যেতে যেতেই দেখি দুজনে কথা বলতে বলতে এদিকে আসছে। সুবিনয় আমাকে দেখেছে। ইশারায় দাঁড়াতে বলল।

কাছাকাছি হতে আমি ক্ষোভে ফেটে পড়েছি, ‘কী রে? আমাকে না বলে কোথায় চলে গিয়েছিলি? চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। নতুন জায়গা। কাউকে চিনি না। কোথায় গিয়ে খুঁজব তোকে?’

সুবিনয় বলল, ‘তিনি বললেন তাঁর একটা শিশি বোতলের কালেকশন আছে। এদিকে তুই ঘরে গেলি। ওই সময়ের মধ্যে শিশিবোতলগুলো দেখতে গিয়েছিলাম। তবে, তুই চিন্তা করবি বলে ভালো করে না দেখে ফিরে এলাম পরে দুজনেই দেখতে যাব, বুঝলি?’

সুধাংশুবাবু বললেন, ‘চান করে নাও ভায়ারা। তাড়াতাড়ি করে চান করে খেয়ে-দেয়ে নাও। কাজের খোঁজে কলকাতা এসেছ যখন, আমি দেখব যাতে কাজের সুযোগ পাও। যাও যাও, জলে নামো।’

আমরা দুজনেই স্নান করে নিলাম। জল ঠান্ডা। ডুব দিয়ে স্নান করে বেশ আরাম হল। ঘরে গিয়ে দাঁড়াতেই মাসি ভাত বেড়ে দিল। সামান্য আয়োজন। ডাল সিদ্ধ, আলুভাতে। কাঁচা সর্ষের তেল, লংকা মেখে খিদের পেটে খুব ভালো লাগল।

সুবিনয় বলল, ‘খেয়ে উঠে বের হব। সুধাংশুবাবুর কে এক চেনা লোক আছেন, তাঁর চামড়ার বিজনেস। তাঁর কাছে যাব। আরেকজন আছেন তাঁর ভাঙাচোরা লোহালক্কড়ের ব্যবসা। যাই। গিয়ে দেখি কী হয়।’

‘সুধাংশুবাবুও যাবেন আমাদের সঙ্গে?’ আমি শার্ট গায়ে দিতে দিতে জিগ্যেস করলাম।

‘হ্যাঁ। তিনি না গেলে হবে না। কে আমাদের চেনে বল? তবে সুধাংশুবাবুর চিঠি নিয়ে গেলে হত। তিনিই বললেন যাবেন সঙ্গে। তো ভালোই হল।’

আমরা বেরিয়ে গেলাম তিনজনেই। বাসে চেপে গেলাম এসপ্ল্যানেডে। সেখান থেকে মেছোপট্টিতে। তারপরে সুধাংশুবাবু নিয়ে গেলেন ঠনঠনিয়ায় এক ব্যবসায়ীর কাছে। শেষ পর্যন্ত একজায়গায় কথা পাকা হল। সুবিনয় হিসেবপত্র রাখার কাজ করবে ঠনঠনিয়ার ব্যবসায়ীর কাছে। আর আমি আপাতত কাজ পেলাম এক মনোরঞ্জন পানোরিয়ার কাছে। মেছোপট্টিতে। ভাঙাচোরা মালের ব্যবসা। সেখানে আমার কাজ দেখে টাকা দেবে।

যাই হোক, প্রথম দিনেই দুজনেই কাজ পেয়ে খুশি হলাম। বাড়িতে ফিরে মাসিকে জানালাম। বললাম, ‘মাসি, কয়েকটা দিন এখানে থাকতে দিন। তারপর একটা ব্যবস্থা হলেই চলে যাব। আপাতত পঞ্চাশ টাকা রাখুন। এর বেশি দিতে পারব না। হাতে কিছু নেই। চাকরিটা পাকা হলে মাইনে পেয়ে আপনাকে আরও কিছু টাকা দেব।’

মাসি অমনি একগাল হেসে টাকাটা নিয়ে নিল হাত বাড়িয়ে। রাত হয়েছে বলে আমাদের খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়তে বলল। কোনওরকমে দুটো মুখে দিয়ে আমরা মেঝেতে মাদুর পেতে শুয়ে পড়লাম। কাল তাড়াতাড়ি বের হতে হবে।

হঠাৎ করে ঘুমটা ভেঙে গেল। চোখে আলো লাগছে। সকাল হয়ে গেল নাকি? সুবিনয়কে ডাকতে যেতে অবাক হলাম। সুবিনয় শুয়ে নেই। ও কখন উঠে গিয়েছে? নিশ্চয় পুকুরঘাটে গিয়েছে।

আমিও উঠে পড়লাম। এখন তৈরি হয়ে বেরিয়ে যাব। বাইরে যা হোক কিছু খেয়ে নেব। মুড়ি কোথায় পাব এখানে? মাসিকে জিগ্যেস করে নিতে হবে।

মাসি কী খুটখাট করছে। আমাকে উঠতে দেখে বলল, ‘বিনয় কোথায়? ভোর রাতে উঠে পুকুরে চান করে এলাম। তখনই ওকে আর ঘরে দেখিনি। রাত থাকতে উঠে গেল কোথায়?’

‘তা তো জানি না। আমি এখন দেখছি ও ঘরে নেই। সুধাংশুবাবুর ঘরে গেছে নাকি?’

‘দেখো দেখি একবার। সুধাংশুর সঙ্গে বেশি মাখামাখি ভালো না। ও পাগলাটে। কী করে না করে, বুঝতে পারি না। যাও, বিনয়কে ডেকে আনো। চাকরি আজ থেকেই তো?’

আমি সুধাংশুবাবুর ঘরের দিকে গেলাম। এদিকটা বেশ শুনশান। পিছনে পুকুর, জঙ্গল। সুধাংশুবাবুর ঘর ভিতর থেকে বন্ধ। দরজায় ধাক্কা দিতে বেশ কিছু সময় পরে দরজা খুলে ঘুমচোখে দাঁড়ালেন, ‘আরে, আজ চাকরিতে জয়েন? তাই এত তাড়াতাড়ি উঠেছ ভায়া?’

আমি সুবিনয়ের কথা জিগ্যেস করেছি। তিনি ভারি অবাক হলেন। এত সকালে কাউকে না বলে কোথায় যাবে সুবিনয়? মর্নিং ওয়াকে যায়নি তো?

‘ওর মর্নিং ওয়াকের অভ্যেস নেই। দেখি একটু বাইরে গিয়ে। নতুন জায়গা, না বলে কোথায় গেল?’ বলতে বলতে আমি বাইরে বেরিয়ে এলাম।

রাস্তায় লোকজন নেই প্রায়। এদিকটা বেশ নিরালা। গাছপালা রয়েছে। একটু গ্রাম্য ভাব। কোথায় যাব সুবিনয়কে খুঁজতে? সমস্যা তৈরি হতে সময় লাগে না।

ফিরে ঘরে যাব, দেখি দূর থেকে সুবিনয় আসছে। আমাকে দেখে হাত নাড়ল, ‘দাঁড়া, দাঁড়া। বেশ ঘুরে ফিরে চিনে এলাম। নতুন জায়গায় রাস্তাঘাট চিনে নিতে হলে ভোরে বেরিয়ে পড়ে দেখে নেওয়া বেস্ট।’

আমার বেশ রাগ হল, ‘বলে যেতে পারিস না?’

হা হা করে হাসল সুবিনয়। দুজনে দ্রুত স্নান করে তৈরি হয়ে নিলাম। মাসি চা দিল। একবাটি মুড়ি দিল। দুজনে ভাগ করে খেলাম। তারপরে বেরিয়ে যাব, তখন সুধাংশুবাবুও এলেন, ‘বাস চিনিয়ে দিই চলো। দুজনে দুদিকে যাবে। আলাদা রুট। আজ চিনে নিলে আর অসুবিধে হবে না।’

বাসস্ট্যান্ড অনেকটা দূর। সুবিনয়ের বাস আসার আগেই আমার বাস চলে এল। সুধাংশুবাবু বেশ করে বুঝিয়ে দিলেন কোথায় নেমে কোনদিকে যেতে হবে। আমি ভিড় বাসে উঠে চলে গেলাম। সারাদিন কাজে কেটে গেল। বড় বড় ঝুড়িতে অজস্র কাচের শিশি। এক সাইজের শিশি একজায়গায় রাখতে হচ্ছে। প্রায় দশটি ঝুড়ি। কাজ করতে করতে চোখ তুলে তাকানোর সময় পেলাম না। টিফিন টাইমে রাস্তায় বেরিয়ে এক কাপ চা খেলাম। পয়সা খরচ করার মতো অবস্থা নয় এখন।

খিদেয় পেট জ্বলছে। কিন্তু কাজ করে যাচ্ছি। আজ বাড়িতে ফোন করে জানাব চাকরির কথাটা। জয়েন না করা পর্যন্ত কিছু জানাতে সাহস পাইনি।

বিকেল চারটের সময় ছুটি হল। বাড়ি ফিরে আসতে ঘণ্টা দেড়েক লেগে গেল। ঠিকঠাক বাসে উঠতেই সময় গেল। আজ যা অভিজ্ঞতা হল, এরপরে আর অসুবিধে হবে না।

বাড়িতে ফিরছি বাস থেকে নেমে। এদিকটা বেশ নির্জন। মাসির বাড়িতে ঢুকেছি। দেখি, সুধাংশুবাবু আমার আগে আগে বাড়িতে ঢুকছেন। আমি ডেকে বললাম, ‘কোথায় গেছিলেন?’

তিনি চমকে তাকালেন, ‘ও তুমি? একটু আনাজ কিনতে গেছিলাম। তা কাজকর্ম ভালো হল?’

‘তা হল। সুবিনয় ফিরেছে?’

‘তা জানি না। ফিরেছে হয়তো।’ সুধাংশুবাবু বাড়ির ভিতরে ঢুকে নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন।

আমি মাসির ঘরের দিকে গিয়ে দেখি মাসি রান্না করছে। ছ্যাঁক ছোক শব্দ হচ্ছে। পেঁয়াজ ভাজার গন্ধে খিদে চাগিয়ে উঠল। আমাকে দেখে মাসি বলল, ‘বিনয় আসেনি?’

‘আমি তো জানি না। আমরা এক জায়গায় কাজ করি না। ভেবেছি ও এসে গিয়েছে।’

‘আমি বাড়িতে ছিলাম না বুঝলে? কেত্তন শুনতে গেছিলাম। এই ফিরেছি। যাক, ও এসে যাবে। তুমি হাতমুখ ধুয়ে নাও। ভাত খাবে?’

ভাবলাম বলি, সুবিনয় ফিরে এলে খাব। কিন্তু সারাদিন না খেয়ে আমার শরীর ছেড়ে দিচ্ছিল। মাথা নেড়ে বললাম, ‘খাব। বড্ড খিদে পেয়েছে।’

হাতমুখ ধুয়ে খেতে বসেছি। মুসুর ডাল আর পেঁয়াজ ভাজা। খেয়ে উঠে শান্ত হল শরীর। কিন্তু এখনও সুবিনয় এল না। ধুর। ওর যত কাণ্ড। এসে পর্যন্ত এদিক ওদিক কোথায় চলে যাচ্ছে আর আমি চিন্তায় পড়ে যাচ্ছি।

রাত হচ্ছে দেখে সুবিনয়ের খাবার ঢেকে রেখে মাসি চৌকির ওপরে শুয়ে পড়ল। আমিও দরজায় খিল এঁটে মাদুর পেতে শুয়ে পড়ে সুবিনয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। ও এলেই দরজা খুলে দেব। ওর আবার কলকাতা ঘুরে দেখার ইচ্ছে হয়েছে হয়তো।

শুয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ সুবিনয়ের গলা পেলাম। আমাকে ডাকছে, ‘আমাকে বের কর। আমাকে বের কর। দম আটকে আসছে।’

ধড়মড় করে উঠে বসেছি। ব্যাপার কী? সুবিনয় কি কোনও সমস্যায় পড়েছে? বের করতে বলছে আমাকে! কোথা থেকে বের করবো? ও কোথায় আছে? ঘড়িতে দেখি রাত সাড়ে বারোটা।

কী কাণ্ড! এখনও বাড়ি ফেরেনি সুবিনয়? কী করব আমি? মাসিকে ডাকতে হল। সব শুনে মাসি বলল, ‘ভুল বাসে উঠে পড়েছে মনে হয়। ভোর না হলে কিছু করার নেই। সকালের আলো ফুটলেই ও চিনে ফিরে আসবে। ঘুমোও তুমি।’

ঘুম হল না। সারারাত বসে থাকলাম। সুবিনয়ের অভ্যেস আছে হুটহাট এদিক চলে যাওয়া। এখানে এসেও তেমনই করছে। যদি কাজের জায়গা থেকে বাড়ি ফিরতে ভুল বাসেই উঠে পড়ে, তাহলে ফোন করে জানাবে না? এত রাত হয়ে গেল, ও কিচ্ছু জানাল না?

আমার মন কু ডাকছে। স্বপ্নের মধ্যে সুবিনয় অমন করে ডাকল আমাকে! কেন? বিপদে পড়েছে সুবিনয়?

ভোর হয়ে এল। আমি বাইরে গিয়ে দাঁড়ালাম। হেঁটে গিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে সুবিনয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। সুধাংশুবাবু পিছন থেকে ডাকলেন, ‘বন্ধু ফেরেনি? বল কি ভায়া? গেল কোথায়? যাক, চিন্তা করো না। দিনের আলো ফুটেছে। ফিরে আসবে। এসো, আমার সঙ্গে বসে চা খাবে। কাকলিমাসি ঘুমোচ্ছে? আমার ঘরে চলো। চা খাবে।’

সুধাংশুবাবুকে বিপদের কথা বলেছি। বলেছি, সুবিনয় যদি কোনও বিপদে পড়ে থাকে, তাহলে আমি কী করব? সুবিনয়ের বাড়িতে কী বলব? এই কলকাতা আমার অচেনা। এখানে কোথায় খুঁজব সুবিনয়কে?

চা এগিয়ে দিচ্ছিলেন সুধাংশুবাবু। নিজের কাপটা হাতে নিয়ে চেয়ার টেনে বসলেন, ‘চিন্তা নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে। চা খাও ভায়া। গরম পানীয় খাওয়া দরকার। রাতে ঘুম হয়নি বুঝতে পারছি।’

চা খেতে খেতে আমার কানে সুবিনয়ের ডাক ভেসে এল। খুব কাছ থেকে সুবিনয় ডাকছে এই তো, যেন পাশের ঘরে ও আছে। পাশের ঘরে যেতে হবে আমাকে। সুধাংশুবাবু, আমি আপনার পাশের ঘরে যাব। সুবিনয় ওখানে আছে মনে হচ্ছে।’

‘এসো এসো ভায়া, তোমার দুশ্চিন্তা বুঝতে পারছি। পাশের ঘরে চলো ভায়া। ঘুরে ফিরে দেখে নাও। মনের দ্বিধা কাটাতে হবে।’ বলতে বলতে সুধাংশুবাবু উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে ইশারায় ডেকে নিলেন। পাশের ঘরের দরজায় তালাচাবি দেওয়া। সুধাংশুবাবু তালা খুলে দরজা খুললেন। ভিতরে অন্ধকার থমকে আছে। আমি ভিতরে ঢুকে একটা গন্ধ পেলাম। চেনা গন্ধ। সুবিনয়ের গায়ের গন্ধ!

আমি চেঁচিয়ে উঠেছি, ‘আছে, আছে। সুবিনয় এই ঘরেই আছে। আলো জ্বালুন, আলো জ্বালুন। সুবিনয়, তুই কোথায়?’

কেউ উত্তর দিল না। সুধাংশুবাবু আলোর সুইচে আঙুল দিতে আলো জ্বলে উঠল। এই ঘরের সবটা দেখতে পাচ্ছি। দেওয়ালের দিকে একটা ছোট আলমারি। সেখান থেকে শব্দ হচ্ছে খুটখাট। আমি এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে ঝাঁপিয়ে পড়েছি আলমারির বন্ধ পাল্লার ওপরে।

সুধাংশুবাবু আমাকে আটকালেন, ‘বিচলিত হবে না ভায়া। আমি আলমারি খুলে দিচ্ছি। তুমি ভালো করে দেখে নাও কেউ আছে কিনা। আমি কি সুবিনয়কে আলমারিতে লুকিয়ে রাখব?’ বলে চায়ের কাপ আমার হাতে দিলেন, ‘বাকি চা টুকু খেয়ে নাও। মাথা শান্ত করো। আমি ততক্ষণ আলমারি খুলে দিচ্ছি।’

আমি চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। হাত কাঁপছে আমার। চোখে ঝাপসা দেখছি। কী হল? এরকম করছে কেন শরীর?

সুধাংশুবাবু আমাকে ধরে ফেললেন। না হলে আমি পড়ে যেতাম মাটিতে। সুধাংশুবাবু আমাকে ধরে শুইয়ে দিলেন। আমার চোখে মুখে কোন তরল মাখাচ্ছেন। একটা অদ্ভুত তীব্র গন্ধে নাক জ্বলে যাচ্ছে। আমি তলিয়ে যাচ্ছি...তলিয়ে যাচ্ছি...।

সুধাংশুবাবু বলছেন, ‘ভায়া, কষ্ট হচ্ছে? কষ্ট কমে যাবে। অল্প সময় দাও। এখনই কষ্ট কমে যাবে। ও ভায়া...।’

এখন রাত না দিন জানি না। একটা অদ্ভুত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। আমার চারপাশে স্বচ্ছ নীলচে দেওয়াল। আমার চারপাশে একটা নীলচে ধোঁয়া আমার পায়ের দিক থেকে পাক খেয়ে ওপরে উঠছিল।

কেউ এসে দাঁড়াল স্বচ্ছ দেওয়ালের বাইরে। আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছে দেওয়ালের গায়ে। কে এ?

‘ভায়া, ও ভায়া? শুনতে পাচ্ছ? কাচের শিশিতে থাকতে ভালো লাগছে তো? অসুবিধে হল, এখান থেকে বের হতে পারবে না। আমার বড্ড শখ জানো। কাচের শিশি নানারঙের মানুষ পুষি হরেক ঢঙের। আলমারিতে কত্ত মানুষ পুষেছি। বিক্রির বাজার ভালো। সুবিনয় আজই বিক্রি হয়ে যাবে। পাকা কাস্টমার পেয়েছি। দুটো পার্টি আছে। ভালো টাকা পাব। আর সেই সময় তোমরা এলে কাকলিমাসির বাড়িতে।’

আমি কঁকিয়ে উঠেছি, ‘আমাকে এখান থেকে বের করুন দাদা। আমার মা, বাবা, বোনের কাছে যাব।’

‘যাবে? এখান থেকে বের হতে পারবে না যে। আহা! একবার বের হতে পারবে, কিন্তু বাইরের বাতাসে টিকতে পারবে না। ফিরে আসতেই হবে এই শিশিতে। তাই, বায়না করো না।’

আমি চেঁচাতে শুরু করেছি, ‘একবার আমাদের বাড়িটা দেখিয়ে আনুন। আর কিছু চাই না। সুধাংশুবাবু, প্লিজ।’

সুধাংশুবাবু ফিনিক মেরে হেসে ফেলেছেন, ‘আজই বিক্রি হয়ে যাবে। তোমার মালিক কোথায় নিয়ে যাবে তার আমি কী জানি?’

আমি আর কথা বললাম না। গভীর ঘুমে ঢলে পড়ছি আমি। স্বচ্ছ কাচের দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।

হাতবদল হয়ে কোথায় এসে পৌঁছেছি, জানি না। কিন্তু গন্ধ পাচ্ছি। এই গন্ধ আমাদের গ্রামের গায়ের গন্ধ। কে কিনেছে আমাকে? সে কি আমার গ্রামের কাছে থাকে? নাকি গ্রামের পাশ দিয়ে যাচ্ছে? আমি আমাদের গ্রামের নদীর গন্ধ পাচ্ছি কেন? এই শিশির ভিতরে বাইরের গন্ধ আসে কী করে? শ্বাস নেওয়ার জন্য কি শিশির ঢাকনায় ফুটো আছে? আমি পারি ওই ফুটো দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যেতে?

কে একজন শিশিসুদ্ধ আমাকে ধরে চোখের সামনে নিয়ে দেখছে। আমি তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। লোকটা আমাকে শিশি থেকে বের করছে নাকি? সে শিশির ঢাকনা খুলছে বুঝতে পারছি। আমি বাইরের বাতাসে টিকতে পারব না বলেছে সুধাংশু নামের শয়তানটা। সে কি মিথ্যে বলেছে?

দুটো আঙুলে আমাকে ধরে টেবিলের ওপরে দাঁড় করিয়ে দিল লোকটা। ফিসফিস করে নিজের সঙ্গে কথা বলছিল, ‘অনেক রকমের দুর্লভ পদার্থ সংগ্রহ করেছি। কিন্তু এটা বেস্ট। একে দিয়ে আমি কোটি কোটি টাকা ইনকাম করব।’

আমি আমফানের তাণ্ডবে প্রায় ডুবে যাওয়া আমাদের বাড়িটাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। আমিও ডুবে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। একবার মাকে দেখতে পাব না?

ফোন বাজছিল। লোকটা আমাকে টেবিলের ওপরে রেখে ফোন করতে ব্যস্ত। আমি টেবিল থেকে নেমে পড়েছি।

দুদিন হল বাড়ির ছেলে কলকাতায় গিয়েছে চাকরির খোঁজে। একটা ফোন করেনি এখন। বোন বসে পড়াশোনার চেষ্টা করছিল মোমের আলোয়। ঝুপড়ি ঘরের নড়বড়ে দরজাটা বাইরের হাওয়ায় দুলে উঠেছে। দাদা ঝুপড়ি বানিয়ে ওদের ইশকুলবাড়ি থেকে এখানে রেখে গিয়েছে। দাদা এলে ভালো হয়।

দরজাটা ফের নড়ে উঠল। কেউ ঠেলছে যেন। বোন অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। দরজা আস্তে আস্তে খুলে গেল। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে আছে স্বচ্ছ কাচের মানুষ। নীলচে আলো তাকে ঘিরে আছে।

সেই কাচের মানুষ বলে উঠল, ‘সোনা, কেমন আছিস?’

সোনা আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, ‘দাদা?’

শব্দের আঘাতে একটা শব্দ হল। ঝন ঝন ঝন! অজস্র কাচ ভেঙে যাওয়ার শব্দ।

সোনা ছুটে গিয়েছে। শব্দ শুনে ওর মা, বাবাও এসে দাঁড়িয়েছে। সোনা কেঁদে উঠেছে, ‘মাগো, দাদা এসেছে!’

সোনা দরজার দিকে আঙুল তুলেছে। ওখানে কেউ নেই। একগাদা কাচ গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে পড়ে আছে।

অধ্যায় ১ / ১৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%