চাকা

সাগরিকা রায়

হাতে ঘড়ি ছিল না। তার খুব প্রয়োজনও পড়ল না। বিশেষ করে যখন মোবাইল ফোনটা হাতের মুঠোয় আছে। সুমনাদি জিতকে আশ্বস্ত করল, মাত্র পৌনে দশটা! এখনই ঘুমবে?

জিত ঘুমের জন্য সময়ের খোঁজ করেছে, এমন নয়। কলকাতার সঙ্গে সময়ের তাল মেলাতে পারছিল না ও। পুরোদস্তুর গ্রাম ঘুরতে এসে বার বার সময় দেখতে হচ্ছে ওকে। অভীকদা ওর প্রবলেমটা বুঝতে পারছিল সম্ভবত। একটু হাসল তবু তো লোডশেডিং হয়নি এখনও! জিত তাহলে অন্ধকারেই ঝাঁপ দিত কলকাতায় ফিরে যেতে। লকডাউনের জন্য ট্রেন বন্ধ। ও হেঁটেই চলে যাবে।

অভীকদার ছেলের অন্নপ্রাশন উপলক্ষ্য এসে লকডাউনে আটকে পড়েছে জিত। করোনা ভাইরাসের কারণে সারা পৃথিবী জুড়েই লকডাউন চলছে। যানবাহন, লোকজনের মেলামেশা, ব্যবসাবাণিজ্য, অফিস কাছারি সব আটকে গেছে করোনার বক্রদৃষ্টির ফাঁদে। অন্নপ্রাশন উপলক্ষ্যেই কোদালকাটি গ্রামে আসা। এখানে অভীকদার বাবা, মা, ছোট ভাই সৌভিক থাকে। অভীকদা জিতের সঙ্গেই একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে চাকরি করে।

দিনের বেলা সবুজে সবুজ দেখে মুগ্ধ জিত। কিন্তু সন্ধেবেলায় বাদুড়ের আতাগাছে উড়ে এসে ঝুলে পড়া, বাঁশঝাড়ের ক্যাঁচচ্চচ খ্যাছ, শেয়াল-বাচ্চার কান্না শুনতে শুনতে প্রথমে বেশ অন্যরকম লাগলেও এখন এই রাত পৌনে দশটায় আর ভাল্লাগছে না। বাড়ির পেছনের পুকুরে একটু আগে কে যেন অন্ধকারে ঝাঁপ দিল। শব্দ উঠল—ঝপাস! ব্যস, আর কোন শব্দ নেই! এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেউ পা স্লিপ করে পড়ে গেছে পুকুরে! আতঙ্কিত হওয়ারই কথা। জিত উৎকণ্ঠিত—দেখুন, কেউ মনে হয় পড়ে গেছে! অভীকদা...তাড়াতাড়ি করুন...!’

অভীকদা ওর অবস্থা দেখে হাসি সামলাল—‘কেউ ঝাঁপ দেয়নি ভাই! পুকুরপাড়ে গুচ্ছের নারকেল গাছ আছে দেখেছ তো? নারকেলের শুকনো খোল বা ঝুনো নারকেল পড়ে জলে৷ কাল ভোরে দেখো। ওই রকম শব্দ হয়! আমাদের অভ্যেস হয়ে গেছে ঝুপ ঝপাস শব্দ শুনে শুনে!’

জিত লজ্জা পেয়েছিল নিজের নির্বুদ্ধিতায়। আসলে ও বুঝতেই পারেনি যে এমন কিছু হতে পারে৷ সুমনাদি ঘন দুধের কড়া চা এনে দিল, ‘খাও। আমি মুড়ি মেখে আনছি নারকেল কুচি, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, চিনেবাদাম দিয়ে। সবই আমাদের জমির। মুড়ি থেকে চিনেবাদাম পর্যন্ত।’

চা-মুড়িমাখা খেতে খেতে এতাল বেতাল গল্প চলল। রাজনীতি থেকে সমাজনীতি, প্রাচীন মন্দির থেকে পোচার...কিচ্ছু বাদ গেল না সেই আলোচনা থেকে। অভীকদার বাবা বেশ গপ্পে লোক। একসময় নর্থবেঙ্গলে ছিলেন। এগ্রিকালচার স্ট্যাটিস্টিক্যাল ডিপার্টমেন্টে। তখন অফিস-টুরে নানা গ্রামে গঞ্জে যেতে হতো। নানান অভিজ্ঞতা তাঁর। সে সব গল্প শেষ হতে হতে রাতের খাবারের ডাক পড়ল।

রাতে ঘুম আসছে না জিতের। নতুন জায়গার এই এক অসুবিধে। এপাশ ওপাশ করতে করতে পুকুরে নারকেল বা ওই জাতীয় কিছু পড়ার শব্দ শুনতে পেল জিত। অনেক দূরে কেউ কাউকে ও হে এ এ—বলে ডেকে উঠল। ওকে যে ঘরে থাকতে দেওয়া হয়েছে, সে ঘরের বাইরে কারা ফিসফিস করে কথা বলছিল। একগোছা চুড়ি বাজিয়ে কেউ চলে গেল দ্রুত পায়ে। শাড়ির খসখস শোনা গেল অল্প সময়ের জন্য। তারপরই সব চুপ হয়ে গেল। কেবল কোথায় একটানা গরুর গাড়ির চাকার শব্দ হয়ে চলেছে ক্যাঁচ...ক্যাঁচ...!

উত্তীয় ঘড়ি দেখল। বারোটা চল্লিশ। বাবা! গ্রামেগঞ্জে এতরাতে লোকজন জেগে থাকে। এ বাড়িতেই বা কারা জেগে আছে? অভীকদার বাবা, মা, ভাই? বাড়িতে আর কাউকে দেখা যায়নি৷ সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। কাল অন্নপ্রাশন, প্রচুর কাজ। অযথা জেগে থাকবে কেন? তাছাড়া খাওয়াদাওয়া করে সকলেই ঘুমোনোর তোড়জোড় করছিল৷ পাড়াপড়শি? হতে পারে আত্মীয়স্বজন আসা যাওয়া করছে ঘুম পাচ্ছিল জিতের।

অভীকদার বাবার অনেক রকম অভিজ্ঞতা৷ কতরকম মানুষ দেখেছেন জীবনে! লালু ওরাও নামের সেই চাষিকে বেশ মনে ধরেছে জিতের। যে অভীকদার বাবাকে উঠোনে বসিয়ে গরুটাকে মাঠ থেকে নিয়ে এসে সামনেই দুধ দুইয়ে খাইয়েছিল। সফেন দুগ্ধ! সে স্বাদ নাকি এখনও মুখে লেগে আছে অভীকদার বাবার। জিত জানতে চেয়েছিল—কাঁচা দুধ খেতে ভালো? অভীকদার বাবা হেসেছিল—দুধের স্বাদের কথা মনে নেই বুঝলে! লালু ওরাও এর সেই ভালোবাসা, আপ্যায়ন প্রাণে লেগে আছে, পাঁউরুটিতে মাখিয়ে রাখা মাখনের মতো। এসব মানুষ হারিয়ে গেছে! তখন মোবাইল ক্যামেরা হাতে ছিল না। নাহলে একটা ছবি তুলে রাখতাম লালুর।

লালু ওরাও! কোথায় থাকে লালু? এখনও কি বেঁচে আছে? কী চাষ করত লোকটা! আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল জিত। গরুর গাড়ির চাকার শব্দটা হালকা হয়ে এল।

সারাটাদিন বড্ড হুজ্জোতির মধ্য দিয়ে গেল। যদিও লকডাউনের কারণে খুব সাদাসিধেভাবে অনুষ্ঠান হচ্ছে। তবু গ্রামের দু-চার ঘরকে না বললে হয় না। অভীকদাদের বাড়ির সামনে দুটো কদম গাছ আছে। গেটের দুপাশে দাঁড়িয়ে অতিথিদের যেন স্বাগত জানাচ্ছে! অভীকদার ভাই সৌগত জিতকে দেখে এগিয়ে এল, ‘তোমাকে এখানকার বহু পুরোনো মন্দির দেখাব। কাল বিকেলে যাবে?’

ভেতর থেকে ডাক পড়তে সৌভিক চলে গেল। জিত ভাবল, কিছু গ্রামের ছবি আপলোড করবে ফেসবুকে। আচ্ছা এদিকে গরুর গাড়ি আছে কার? অত রাতে শব্দ হচ্ছিল কেন ক্যাঁচ ক্যাঁচ? এখন তো কোথাও তেমন কিছু দেখা যাচ্ছে না। বাড়ির সামনে অভীকদার স্থানীয় বন্ধুদের বাইকের সারি দেখে বোঝা মুশকিল এখানে গরুর গাড়ি আছে। কথাটা খেতে বসে বলেই ফেলেছে উত্তীয়। শুনে অভীকদার বন্ধু তন্ময়দা খাওয়া ফেলে তাকাল ‘গরুর গাড়ি? এখানে গরুর গাড়ি কোথায় রে বিপ্লব?’

‘নাহঃ, গরুর গাড়ি তো বহুকাল দেখিনি। সেই ছোটবেলায় আজিমের দাদুর একটা গাড়ি ছিল। হালকা মনে আছে।’ বিপ্লবদা মাংস চিবুচ্ছিল।

উত্তীয়র অদ্ভুত লাগছিল এই ভেবে যে হয়তো ওটা গরুর গাড়ির আওয়াজই না! ও-ই ভুল করছে! তাই যদি হয়, তাহলে ওটা কীসের আওয়াজ ছিল? যাকগে, উত্তীয় তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করে উঠে পড়ল।

লকডাউনের জন্য বাইরের লোকজন চলে গেল তাড়াতাড়ি। পুলিশের জিপ পাহারা দিচ্ছে। নিঝুম পরিবেশ। খাওয়া দাওয়ার পরে বেশিক্ষণ বসে থাকতে ভালো লাগছিল না জিতের। উঠে পড়ল ও। তারপর নির্দিষ্ট ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ল। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। এখন আলস্য জড়িয়ে ধরেছে।

ঘুমটা গভীর হল। সন্ধে নাগাদ ঘুম ভাঙতেই ধড়মড় করে উঠে বসল জিত। ঘর অন্ধকার। না, অন্ধকার নয়, একটা লালচে আলো আলো-ছায়ার কারিকুরি খেলা খেলছে। হ্যারিকেন জ্বলছে। মানে লোডশেডিং হয়েছে। অভীকদা কোথায়? ওকে ডেকে নিতে পারত! হয়তো অভীকদাও রেস্ট নিচ্ছে। জিত উঠে ঘরের বাইরে এল। বাইরেটা অন্ধকার। পাশের ঘরেও হ্যারিকেন জ্বলছে। আর তার পরের ঘরটা অভীকদার বাবা-মায়ের। ওই ঘরেও একটা নিভু নিভু হ্যারিকেন দরজার কাছে বসে থেকে একটুখানি আলো ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছে বারান্দার দিকে। এতগুলো হ্যারিকেন বাড়িতে! তার মানে হল এখানে মাঝে মাঝেই লোডশেডিং হয়ে থাকে। একটু চা পেলে ভালো হতো। বাড়ি বেশ চুপচাপ। হালকা কথাবার্তার আওয়াজ আসছিল। একটু হাসির রিনরিনে শব্দ ঘরের ভেতর থেকে বাইরে ছিটকে বেরিয়ে এসে কাঁপতে কাঁপতে বাইরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

অভীকদার ঘরের মুখোমুখি ঘরটা অন্ধকার। কেউ থাকে না ও ঘরে? দরজাটা সামান্য ফাঁক হয়ে আছে। মনে হয় ঘরটা ইউজ হয় না। যেদিক দিয়ে কথাবার্তার আওয়াজ আসছিল, সেদিকে এগোল জিত। অভীকদাদের ঘরে ঢোকার আগে একবার কী মনে করে অন্ধকার ঘরের দিকে চোখ চলে গেল। ঘরের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার দলা পাকিয়ে আছে। এই অন্ধকার জিনিসটা খুব অদ্ভুত। অন্ধকার কী করে তৈরি হয়? পদার্থবিদ্যায় পড়েছিল জিত। অন্ধকার বলতে সেইসব বস্তুকে বোঝায় যেগুলো থেকে ফোটন নির্গত হয়। একটি অনুজ্জ্বল ছবি যথেষ্ট পরিমাণে দৃশ্যমান আলো প্রতিফলিত করতে পারে না। তখনই অন্ধকারের জন্ম হয়। ওই অন্ধকার ঘরে কেউ কি আছে? নিঃশব্দে জিতকে লক্ষ করছে কি কেউ?

‘ওখানে কে? জিত নাকি?’ অভীকদার গলা পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে সাড়া দিল জিত ‘হ্যাঁ, আমি।’

‘এসো, এসো, বাইরে কেন? আমরা আড্ডা দেব বলে ওয়েট করছি।’ অভীকদার বাবার গলা ভেসে এল। আসলে ঘরের ভেতরটা হ্যারিকেনের লালচে আলোয় ঝাপসা ঝাপসা। কারও মুখ স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে না। ছায়া আর আলো মাখা মুখগুলো খাটে, চেয়ারে ইতস্তত বসে আছে। রেমব্রান্টের ছবির মতো। জিত ঘরে ঢুকতেই সুমনাদি খাটের ধার ছেড়ে দিল এখানে বসো। আমি চা দিতে বলছি।’

সুমনাদিকে বারান্দার অল্প আলো আর অনেকটা ছায়ার মধ্যে ঢুকে যেতে দেখল জিত। যেন কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকে গেল সুমনাদি!

‘তারপর, গ্রাম কেমন লাগছে? ভালো নয়, তাই না?’ সৌভিকের এর গলা ভেসে ভেসে এল।

‘আহ্, ওকে বসতে দাও আগে। ভালো লাগবে কেন বলো? আলো নেই কিছু না। এভাবে কি ভালো লাগে?’ অভীকদার মায়ের স্নেহের সুরে বলা কথাগুলো খুব ভালো লাগছিল জিতের। খাটে আরাম করে বসে পড়ল ও। চা-ও চলে এল এর মধ্যে। উঠোন পেরিয়ে রান্নাঘর। সেখানে চা হচ্ছিলই। সুমনাদি তার সঙ্গে পাঁপড় ভাজাও নিয়ে এসেছে। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সুমনাদি হেসে ফেলল। সুমনাদিকে হাসতে দেখে অভীকদা অবাক হল, ‘হাসছ যে? রান্নাঘরে কিছু মজার কাণ্ড হল নাকি?’

সুমনাদি ফের হেসে ফেলল। চা-পাঁপড় সবার হাতে হাতে তুলে দিল হেসে।

‘না, আসলে এই ঘরে ঢুকে তোমাদের অল্প হলদে আলোর মধ্যে দেখে আগেকার দিনের সাদা কালো ছবির কথা মনে হল। মনে আছে সে সব ছবিগুলো?’

অভীকদার মা উৎসাহিত—‘ওমা, মনে থাকবে না? আমার নিজের কত ছবি আছে সাদা কালো! সেই জন্মের পর থেকে কতরকম ছবি, সবই সাদা কালো।’

‘সত্যি, সাদা কালো ছবির একটা মূল্য আছে যাই-বলো না কেন। একটা সময়কে সুন্দর ধরে রেখেছে। একটা যুগ বলে—অভীকদার বাবা চায়ে চুমুক দিলেন।

জিত কথাটা মেনে নিল। ওদের বাড়িতে একটা কি দুটো অ্যালবাম৷ সব ছবিই সাদা কালো। নিরুমামার কত কমবয়সের একটা ছবি আছে! কজন বন্ধুর সঙ্গে ইস্কুল লাইফের ছবি। তখন মামা মিশনে পড়ত। দিদুর ছবি আছে নতুন বিয়ের পর ননদের সঙ্গে। খাটের ওপর বসে আছে দিদু। খাটের স্ট্যান্ডে ঝুলছে উপহার পাওয়া শাড়ি। আর সব ছবিতে বর বসে আছে বিশাল রাজকীয় চেয়ারে, বউ পাশে ইয়াব্বড় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে। দাদু ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে সজনে ডাঁটা তুলছে, হাতে বাজারের ব্যাগ। এই ছবিটা বেশ মনে পড়ে জিতের। যাঁদের ছবি, তাঁরা কেউ নেই। শুধু ছবি হয়ে আছে।

অভীকদা বলল, ‘আরে, আমার কত ছবি এইরকম। একটা ছবিতে আমাকে নেড়া করে দেওয়া হয়েছিল। নেড়া মাথা দেখে বীভৎস কাঁদছি। ঝট করে কে ছবি তুলে বসল। কে তুলেছিল মা? রজতকাকু?’

‘না, শ্যামল। ও তখন নতুন ক্যামেরা কিনেছে!’

‘ইস, খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। একদিন দেখিও তো সেই বিখ্যাত নেড়াদার ছবি।’ জিত হাসছিল।

‘একদিন কেন? হয়ে যাক। আজই হয়ে যাক। কবে আবার আসবি। আদৌ আর আসবি কিনা সন্দেহ। এই সুমনা, আমাদের বাড়ির পুরোনো অ্যালবামগুলো...কোথায় আছে মা?’

‘দাঁড়া, সুমনা জানবে না। আমার ট্রাঙ্কে আছে। নিয়ে আসছি।’

জিত দেখল ক্ষয়াটে চেহারার অভীকদার মা আস্তে আস্তে খাট থেকে নেমে হাতড়ে হাতড়ে রুম স্লিপার বের করছে খাটের ভেতরদিক থেকে। অন্ধকারে এর ওর পায়ে লেগে স্লিপারদুটো ছিটকে গেছে এদিকে ওদিকে। অ্যালবাম আনতে যাচ্ছে অভীকদার মা অন্ধকার আর হ্যারিকেনের লালচে ঝিম ধরা আলোর রহস্যময় বারান্দা ধরে। বাইরে পা দিতে কেমন ছায়া ছায়া হয়ে গেল অভীকদার মা।

অ্যালবামের জন্য অপেক্ষা করতে করতে অনেকটা সময় চলে যাচ্ছিল। জিত, অভীকদা, অভীকদার বাবা, আর সুমনাদি বসে এলোমেলো গল্প করে একটা সাদা কালো অ্যালবামের জন্য প্রতীক্ষা করছে। কোথায় আছে সে অ্যালবাম, কে জানে! এই অন্ধকারে মাসিমা খুঁজে পাবেন কিনা...! তাল না তুললেই হতো। ভাবছিল জিত। কোথায় আছে ট্রাঙ্কটা! অন্ধকারে কি মাসিমা ট্রাঙ্ক খুঁজে পাবে? সঙ্গে গেলে হতো।

অভীকদা কী একটা কথায় হেসে উঠতে ভাবনায় ছেদ পড়ল। আর তখনই অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এলেন মাসিমা। হাতে দুটো অ্যালবাম। অ্যালবাম দেখে অভীকদা চেঁচিয়ে উঠল, এই সুমনা, হ্যারিকেনটা এখানে দাও। আলোটা আজ আর আসবেই না মনে হচ্ছে।

সুমনাদি হ্যারিকেন নিয়ে খাটের সামনে একটা ছোট টেবিলের ওপর রাখল। লালচে আলোটা ছড়িয়ে পড়ল সবার মুখের ওপর। খানিকটা জামা কাপড়ে। কিছুটা অন্ধকার পেছনে কৌতূহলী বৃদ্ধার মতো দাঁড়িয়ে থাকল। অভীকদা একটা অ্যালবাম টেনে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ছবি খোঁজার চেষ্টা করছিল। মাসিমা বলল, একটা একটা করে দেখ।

অভীকদা ছবিগুলো বের করছে। কত ছবি! কত স্মৃতি! অনেক পুরোনো, চটে যাওয়া, ঘষে যাওয়া, ধুলোর পাউডার মাখা সাদা কালো ছবি প্রায় প্রত্যেকের ঘরের কোণে ভারি অবহেলায় পড়ে আছে পুরোনো অ্যালবামের মধ্যে। কেউ মন দিয়ে আর দেখে না পঁচিশ বছর আগে চলে যাওয়া বড় জ্যাঠার কোলে তার দুমাস বয়সের ছবি! সত্তরে পৌঁছে যাওয়া পিসতুতো দিদির বারো বছর বয়সের ঝাঁকড়া চুলে ফিতে বাঁধা ছবি। অনেক গল্প, অনেক পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে সাদা কালো ছবিগুলো অ্যালবামের গুপ্ত গহ্বরে আটকা পড়ে আছে।

অভীকদা একটা করে পাতা উলটে যাচ্ছে। কত অচেনা মুখ! অভীকদা চিনতে পারছে না। মাসিমাকেও মাঝে মাঝে চিন্তা করে সেসব ছবির মানুষদের পরিচয় মনে করতে হচ্ছে। কত মানুষ আজ আর পৃথিবীতেই নেই, কিন্তু তাদের প্রতিচ্ছবি রয়ে গেছে আজও এই পৃথিবীর একটা অ্যালবামের মধ্যে। একটা নেড়া বাচ্চার কান্নার ছবি খুঁজতে গিয়ে কত মানুষ হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল স্মৃতির দরজা ভেঙে দিয়ে।

সিপিয়া কালারের ছবিগুলো থেকে একটি বাচ্চা মেয়ের কাজল ধেবড়ে যাওয়া চোখ আর দন্তহীন মুখের ছবি দেখে মাসিমা ‘এই যে আমি!’ বলে ওঠায় ঝুঁকে পড়ল জিত। কতকাল আগের একটা সুন্দর প্রায় বিস্মৃত সময় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল এই আধো অন্ধকার ঘরে। হলদে হয়ে যাওয়া ছবিগুলো একটা নেড়া বাচ্চার ছবি খুঁজতে গিয়ে ফের শ্বাস নিতে পারল। কেউ ওদের মনে করেছে!

ছবি আর ছবি! দেখতে গিয়ে তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে এক ঝটকায় অতীতে ফিরে গেছে অভীকদার পরিবার। জিত চুপচাপ বসে এ বাড়ির লোকগুলোকে দেখছিল। হাস্যোজ্জ্বল মুখগুলো হ্যারিকেনের নরম আলোয় অন্যরকম দেখাচ্ছে। তখনই হঠাৎ সকলে চুপ হয়ে গেল। একটা পাতা বের করে সেদিকে সম্মোহিতের মতো তাকিয়ে আছেন মাসিমা, মেসোমশাই, অভীকদা। মাসিমা কাঁপা গলায়, ‘কতদিন পরে তোকে দেখলাম রে বিট্টু!’ বলে স্থির হয়ে রইলেন। হঠাৎ করেই সময় এখানে স্থির হয়ে গেছে।

জিত উঁকি মেরে দেখল একটি বছর ছয়েকের হাসিখুশি ছেলের ছবি। ‘কে এ?’

‘আমার দাদা। পাঁচ বছর বয়সের সময় জলে ডুবে...!’ অভীকদা কথাটা শেষ করতে পারল না। একটু থেমে সামলে নিল নিজেকে ‘আমার তখন সাড়ে তিন বছর। অল্প মনে পড়ে দাদাকে। মা আমাকে যখন স্নান করাত, ও তখন পাশে দাঁড়িয়ে হাততালি দিত গান করে করে—ছোট্টি সি পঞ্ছির ছোট্ট ঠোঁটে রে...! তাই না মা?’

সুমনাদি তাড়াতাড়ি করে অ্যালবামগুলো টেনে নিল ‘ব্যস, আজ আর নয়। অনেকক্ষণ গল্প হচ্ছে না। বাবা, একটা গল্প বলুন দেখি। সেই যে, বরযাত্রী গিয়ে সেবারে কী হয়েছিল...ওটা বলুন। আমার খুব ভালো লাগে শুনতে।’

অভীকদার বাবাও হয়তো চেয়েছিলেন এমন পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে। তিনি সজোরে, ‘আরেক রাউন্ড চা হয়ে যাক’, বলাতে সুমনাদি, ‘অবশ্যই’, বলে নেমে গেল খাট থেকে।

এখনও আলো আসেনি। খুব বিশ্রি লাগছে জিতের। মাসিমা চুপচাপ হয়ে গেছেন। হয়তো স্মৃতিতে ডুবে আছেন। ছয় বছরের ছেলের অনেক স্মৃতি! কত হাসি, কান্না, আবদার, ভালোবাসা...জলে ডুবে যায় কি সব? যায় না। কিছু রয়ে যায় ধানের শিষে, আমের বোলে, শীতের হিমে...! আর সবটুকু ছড়িয়ে থাকলেও মায়ের বুকে গুটিসুটি থাকে সে। নরম উষ্ণতার মধ্যে! মাসিমা ফিসফিস করছিল, ‘ও আমাকে ছেড়ে কোথায় চলে গেল!’

চা, চলে এসেছে। হাতে হাতে চা। মেসোমশাই বরযাত্রী যাওয়ার গল্প জুড়েছেন। কোথায় বরযাত্রী গিয়ে এক পরিত্যক্ত বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। সেখানে প্রবল ভয় পেয়ে একাকার অবস্থা হয়েছিল সকলের।

ব্যস, ভূত এল হাসি দিয়ে। মানে ভূতের অনুপ্রবেশ ঘটেই গেল। এই লোডশেডিং ভূত না এনে কি পারে? একটার পর একটা গল্প শুরু হল। উত্তেজনা, ভয়, সব মিলে সে এক রুদ্ধশ্বাস দশা যাকে বলে! সৌভিক একটা দারুণ ভয়ের গল্প বলতেই সুমনাদি বলে উঠল, ‘দেখো ভাই, আজ কিন্তু সারারাত আলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে। আমি কিন্তু অন্ধকারে বাইরে যেতে পারব না।’

ভয়ের রেশ ঘরের ভেতরে লেপটে আছে। জিত ভেবেছিল রাতের শব্দগুলোর কথা বলবে। গরুর গাড়ির চাকার শব্দ বা কার যেন চুড়ি বাজিয়ে ছুটে যাওয়ার শব্দ...! কিন্তু অভীকদা ভাবতে পারে জিত ওদের বাড়িকে ‘ভূতের বাড়ি’ আখ্যা দিতে চায়। অথচ এমন হতে পারে সত্যি রাতের বেলায় কোনও গরুর গাড়ি এখান দিয়ে যাচ্ছিল। বা কাজের বাড়িতে কোন তরুণী চুড়ি বাজিয়ে ছুটে গেছে! মানুষ কত সামান্য কারণে ভয় পায়। যেমন পেয়েছিলেন বরযাত্রী নারায়ণবাবু। আসলে অন্ধকার বস্তুটাই যত গন্ডগোলের। ওই যে মুখোমুখি ঘরটা...কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার! জিতের নিজেরই ভয় ভয় করছিল আধ ভেজানো দরজা’... ঘরটার পাশ দিয়ে আসতে! ওটা স্টোর রুম নিশ্চয়?

‘রাজ্যের পুরোনো জিনিস আছে। আজ খোলা হয়েছিল বাসন বের করার জন্য। বন্ধ করা হয়নি।’ মাসিমা বললেন।

‘ওখানে নেই এমন কিছু নেই ভূভারতে’, সুমনাদি হাসে, ‘কবেকার সব ট্রাঙ্ক, সাইকেল, ভাঙা কৌটো...!’

‘জিত, তুমি কি ভয় পেয়েছিলে নাকি অন্ধকার ঘরটা দেখে? অ্যাঁ? মেসোমাশাই জিতকে নিয়ে মজা করছেন।’

আসলে অন্ধকার ঘর খুব রহস্যময়। মনে হয় কেউ কি আছে ওখানে? কেউ কি লুকিয়ে দেখছে আমাকে! হা হা হা।

অভীকদা মুখোমুখি ঘরটার দিকে তাকাল, ‘তাহলে, জিত, ওই ঘর থেকে কেউ যদি বেরিয়ে আসে এখন?’

হাসল জিত। ওকে নিয়ে মজা হচ্ছে।

‘আয়, কে আছিস রে, আয়।’ মেসোমশাই অন্ধকার স্টোররুমের দিকে মুখ করে ডেকে উঠলেন।

হাসলেও সামান্য ভয় কি ছিল না? জিত শ্বাস বন্ধ করে তাকিয়েছিল ঘরটার দিকে। আধ ভেজানো ঘরের ভেতর থেকে কেউ যদি সত্যি বেরিয়ে আসে? না, কিছু হল না। আরেক রাউন্ড চা-এর অর্ডার দিতে হাতটা কেবল তুলেছে জিত, থেমে গেল একটা শব্দে। রাতে শোনা সেই ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজ আসছে ওই ঘরটা থেকে! দেখতে দেখতে অন্ধকার ঘর থেকে একটা সাইকেলের চাকা বেরিয়ে এল চলতে চলতে। ঘুরে যাচ্ছে চাকা, শব্দ হচ্ছে ক্যাঁচ ক্যাঁচ...! গরুর গাড়ির চাকা নয়, সে রাতে শব্দটা সাইকেলের চাকার ছিল, ঠিক এই রকমই! চাকাটা ঘুরে যাচ্ছে ঘরময়। ঘুরে যেতে যেতে ঘরের মাঝখানে এসে পড়ে গেল! শব্দ উঠল ট্যান ঠ্যান ঠ্যান ন ন ন ন!!

চিৎকার করে উঠলেন মাসিমা, ‘এ তো বিট্টুর চাকা। পুরোনো সাইকেলের চাকাটা নিয়ে খেলত ও! ও আমাকে ছেড়ে যায়নি! ও আছে...ও আছে!’

জিতের মনে পড়ল অ্যালবামের ছবিতে অভীকদার দাদার হাতে ধরা ছিল ঠিক এইরকম একটা চাকা। সাইকেলের। বাচ্চা ছেলেটা একটা পুরোনো সাইকেলের চাকা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ছবিতে।

স্টোররুমের ভেতরে এখন ঘুটঘুটে অন্ধকার...!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%