সাগরিকা রায়

শুক্রবার ঠিক সন্ধে ছ’টায় স্যার আসেন৷ ডুগি তবলা সাজিয়ে নিয়ে লিভিং রুমের একধারের ডিভানের ওপরেই বসে পড়ে দুজনে৷ তারপর শুরু হয় তবলা শেখা৷ অন্তুর বাবা তমালকান্তি সরকার অফিস থেকে ফেরার সময় প্রত্যেক শুক্রবার করে স্যারের জন্য কিছু মুখরোচক খাবার নিয়ে আসেন৷
স্যার খেতে ভালোবাসেন শুধু নয়, মুখে দিয়েই বলে দেন, কোন দোকান থেকে আনা হয়েছে খাবারটা৷ সে তোমার চপ হোক কি জিলিপি, কি তরকা রুটি৷
অন্তুদের পরিবারে এটা একটা আলোচনার বিষয়৷ কী করে পারেন স্যার? গত শুক্কুরবারেই তো, বিরাট সাইজের শিঙাড়া মুখে দিয়েই চোখ বুজে ফেললেন স্যার৷ চিবুতে চিবুতে বললেন, ‘নাড়ু, এটা গড়িয়া স্টেশন থেকে পঁচিশ টাকা রিকশা ভাড়ার দূরত্বে ভগবানপুরের সাহা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের শিঙাড়া মনে হচ্ছে!’
নাড়ু মানে অন্তুর বাবা তমালকান্তিকে স্যার অনেকদিন চেনেন৷ ছোট থেকেই চেনাশোনা বলতে গেলে৷ স্যারের কথা শুনে নাড়ু তো হতবাক, ‘কী করে বুঝলেন?’
স্যার মুচকি হাসলেন, ‘গন্ধ! গন্ধ যদি একবার ঠিকঠাক মাথায় ঢুকতে পারে,তাহলে তাকে ভোলা যায় না৷’
অন্তু অবাক হয়৷ গন্ধ মনে রাখা যায়? সূক্ষ্মভাবে গন্ধটা নিয়ে ফের স্মৃতিতে রেখে দিতে হয়? প্রয়োজনমতো সেই তথ্য স্মৃতির ভাঁড়ার থেকে বের করে আনতে পারা চাই? বাপরে! স্যারের স্মৃতিশক্তি সাংঘাতিক তাহলে?
এই প্রশ্ণের ভেতরের মজা খুঁজতে আজ স্যারের জন্য ভবানীপুরের মাকালী রেস্টুরেন্ট থেকে আনা হয়েছিল বড় বড় চিংড়ির চপ৷ আজ স্যার ভুল করবেনই৷ কারণ ভবানীপুর জায়গাটা তো কাছে নয়, যে স্যার ওখানকার মাকালী রেস্টুরেন্টের চপ খেয়েছেন বা নিয়মিত খান৷ ভবানীপুরে কত্ত চপের দোকান রয়েছে৷ সুতরাং স্যার স্বাদ পেয়েও ভুল বলতে বাধ্য হবেন৷ হবেনই৷ তো যথা সময়ে স্যার এলেন৷ অন্তু আগ বাড়িয়ে, ‘স্যার, চা খেয়ে নিন৷ তারপর বসছি৷’ অন্তুর মা বড় প্লেটে করে দুটো ম্যাগনাম সাইজের চপ নিয়ে এসেছে৷ নজর সেদিকে পড়তে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে স্যারের মুখ৷ মৃদু স্বরে ধা-ধা ধিন, তেরে কেটে তেরে কেটে বলে চলেছেন৷ অন্তু বুঝতে পারছিল এগুলো তবলার বোল নয়৷ স্যার চপগুলো কেটে কেটে খাওয়ার কথা বলছেন৷
সুন্দর প্লেটে চপ সাজিয়ে টমেটো সস দিয়ে স্যারকে দেওয়া হল৷ স্যার হাত বাড়িয়ে প্লেট নিলেন৷ প্রথমে ভালো করে দেখলেন৷ মুখে তবলার বোল, ‘কেটে ধা, কেটে ধা৷’ কেটে খা, কেটে খা৷ তারপরেই সেই মহান দৃশ্যের শুরু৷ স্যার চামচে করে খানিকটা চপ কেটে মুখে দিয়েই চোখ বুজে ফেললেন৷ ঠোঁট বন্ধ৷ মুখের ভেতরে আন্দোলিত হচ্ছে জিভ, দাঁত৷ চোয়াল নড়ছে মৃদু রিদমে৷ একসময়ে রুদ্ধশ্বাস দৃষ্টিগুলোর দিকে চোখ মেলে তাকালেন, ‘নাড়ু, এটা ভবানীপুরের মা কালী রেস্টুরেন্টের চপ, তাই না?’
নাড়ু বাকরুদ্ধ প্রায়, ‘মানে, হ্যাঁ...’
‘কিন্তু পুরোনো দোকানেরটা নয়৷ আসল দোকানের মালিকের ভাইপো পুরোনো দোকানের পাশেই একই নামে একটা দোকান দিয়েছে৷ সেই দোকানের চপ৷ পুরোনো দোকানের মতো সেই গন্ধ নেই৷’
অন্তুরা অবাক হয়৷ এটা অবাক হওয়ার মতোই বিষয়৷ কিন্তু সেদিন আরও অবাক হওয়ার বিষয় সামনে এল৷ অন্তুর পিসি এসেছে উত্তরবঙ্গ থেকে৷ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন নিয়ে নাকি খুব আন্দোলন চলছে ওদিকে৷ পিসি কাগজপত্র দেখাতে পারবে না৷ কারণ, পিসির শ্বশুরমশাই কোথায় কী রেখে স্বর্গে গিয়েছেন, পিসি তার খোঁজ রাখেনি৷ নানান কথা শুনে ভয় পেয়ে পিসি অন্তুর বাবার কাছে চলে এসেছে৷ পিসির মেয়ে কাজরী সুকলে পড়ে৷ ও কি এসব বোঝে? সুতরাং পিসিকে সাহস দেওয়ার মতো কেউ নেই৷ এই আইনের বলে নাগরিকত্বের প্রমাণ দেখাতে না পারলে নাকি দেশত্যাগ করতে হবে?
পিসির চোখ-মুখে কেমন এক ধরনের বিপন্নতা দেখতে পাচ্ছিল অন্তু৷ আগের পিসি যেন নেই৷ এসেই অন্তুকে আদর করে বড় চকোবার কিনে দেওয়া, কি শিলিগুড়ির হংকং মার্কেট থেকে ঘড়ি এনে দেওয়া পিসি এখন ভারি উদ্বিগ্ন মুখে ভাই নাড়ুর দিকে তাকিয়ে আছে৷
সন্ধেবেলায় স্যার এসে তবলা নিয়ে বসতেই পিসি চা নিয়ে এল স্যারের জন্য৷ স্যার পিসিকে আগে দেখেননি কখনও৷ দেখেই নাক টেনে শ্বাস নিলেন, ‘ট্রেনে এসেছেন! উত্তরবঙ্গ কি?’
পিসি সুদ্ধ সক্কলে অবাক৷ কী করে বুঝলেন স্যার? পিসি ট্রেনে এসেছে কিনা, স্যারের বোঝার কথা নয়৷ স্যার পিসিকে চেনেন না৷ পিসি কোথায় থাকে,জানেন না৷ তাহলে কি এবারেও গন্ধ পেলেন?
‘মানে, উনি ঘরে ঢুকতেই একরাশ ক্লোরোফিলের গন্ধের সঙ্গে ট্রেনের গন্ধ পেলাম৷ আর, অস্পষ্ট ভাবে কু ঝিঁক-ঝিঁক শুনতেও পেলাম যেন৷ তাই! এমন টাটকা সবুজের গন্ধ আর কোথায় উত্তরবঙ্গ ছাড়া!’
অন্তু সেদিন সত্যিই অবাক হয়ে স্যারকে দেখছিল৷ মনে হচ্ছিল, স্যারকে মনে মনে খানিকটা মজার মানুষ মনে হত৷ কিন্তু স্যার আসলে অদ্ভুত ক্ষমতাধর মানুষ একজন৷ যার মূল্যায়ন ওরা করতে পারছে না৷ এমন ক্ষমতা ক’জনের থাকে?
‘আপনি কি এমনটা আগেও বুঝেছেন কখনও?’ অন্তুর বাবা তমালকান্তি প্রশ্ণটা করেই ফেলেছে৷
‘অনেকবার৷ এই তো, কয়েকমাস আগেই নবীনকাকা এল৷ বত্রিশ বছর পরে বাবার সঙ্গে দেখা৷ আগে বাংলাদেশে ছিলেন৷ চলে এসেছেন ছেলের কাছে৷ আমি কিছুই জানি না তাঁর সম্পর্কে৷ বাবার দেশতুতো ভাই৷ তিনি আসতেই আমি জলের শব্দ পেলাম৷ বলে ফেললাম, ‘নৌকোয় এলেন? নাকি লঞ্চে?’
‘লঞ্চে৷’ বলেই আশ্চর্য চোখে তাকালেন, ‘আপনাকে চিনতে পারলাম না৷ আপনি কি আমাকে চেনেন? নৌকা বা লঞ্চের কথা জানলেন কী করে?’ আমি বোকার মতো মাথা নেড়ে সরে এসেছিলাম৷ আসলে তাঁকে কী বলতাম? স্যার মুচকি হাসলেন৷
অন্তু কিন্তু মনে মনে একটা কথা ভেবে ফেলেছে ততক্ষণে৷ স্যারের কাছ থেকে শিখে নিতে হবে এই বিদ্যে৷ গন্ধটা কীভাবে নিতে হয়? এক মনে শ্বাস টেনে টেনে? স্যারের কাছে এর গুপ্ত মন্ত্র একটা নিশ্চয় আছে৷ কেউ যখন কাছাকাছি থাকবে না, তখন শিখতে হবে৷
পরের শুক্রবার স্যার এলেন না৷ তার পরের শুক্রবারেও নয়৷ অন্তুর বাবা ফোন করেছেন৷ সুইচড অফ৷ কী হল ব্যাপারটা?
অন্তুর মা ডালে ধনেপাতার কুচি দিতে দিতে বলল, ‘মনে হয় পৈটিক গোলমাল৷ কোথায় কী খেয়ে ফেলে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন ঠিক৷’
তিন-তিনটে সপ্তাহ স্যার এলেন না৷ অন্তু একা একাই তবলায় চাটি মারে৷ ওর বাবা আর মা নিয়ম করে ফোনে ট্রাই করে করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে৷ স্যারের সাড়া পাওয়াই যাচ্ছে না৷ অন্তুর বাবা ঠিক করে ফেলল, আগামীকাল স্যারের বাড়িতে যেতে হবে৷ স্যারের বাড়ি অন্তুদের বাড়ি থেকে সাত টাকা অটো ভাড়ার দূরত্বে৷ অফিসের কাজের চাপে যাওয়া হয়নি৷ তাছাড়া অতটা গুরুত্বও দেওয়া হয়নি৷ কিন্তু, এবারে মনে হচ্ছে একটা খোঁজ অবশ্যই নেওয়া দরকার৷ স্যারের বৃদ্ধ মা, বাবা আছেন৷ তাঁদের কিছু হল না তো...!
পরের দিন বিকেলের দিকে অন্তুও বাবার সঙ্গে চলল৷ অটোতে উঠে জায়গামতো পৌঁছতে বেশি সময় লাগেনি৷ অটো স্ট্যান্ড থেকে হেঁটে মিনিট কুড়ির মধ্যে একটা ছোট্ট কাঠের ব্রিজ পেরিয়ে গেল ওরা৷ উল্টোদিক থেকে একটি সরুমতো লোক সাইকেল চেপে আসছে৷ বাবা তাকে থামিয়ে স্যারের কথা জিগ্যেস করে নিচ্ছিল৷ অনেকদিন এদিকে আসা হয়নি৷ জায়গাটা আগের মতো নেই৷ এদিকে একটা পুকুর ছিল৷ বুজিয়ে চারতলা বাড়ি উঠে গিয়েছে৷ সাইকেল আরোহী একটু ভেবে বলল, ‘কী নাম বললেন? দীপক ভৌমিক, লম্বামতো, চোখে চশমা, তবলা শেখায় বললেন? আচ্ছা...!’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, চেনেন?’
‘নাহ৷’ বলে লোকটা ব্যাজার মুখে সাইকেল চেপে চলে গেল৷
অবশেষে একটি ছোট পানের দোকানে জিগ্যেস করে খোঁজ পাওয়া গেল৷ পান দোকানি শ্বাস ফেলে খবর দিল, ‘খবর শুনে এসেছেন? সত্যি খুব খারাপ হল৷’
‘কী হল?’ তমালকান্তি উদ্বিগ্ন৷
‘দীপকের মা নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে তো৷’ লোকটা পানে মশলা ছিটিয়ে দিতে দিতে বলল৷
অন্তুর আশ্চর্য লাগল৷ স্যারের মা নিরুদ্দিষ্ট? হারিয়ে গিয়েছেন?
অন্তুর বাবাও হতবাক প্রায়৷ নিজেকে সামলে স্যারের বাড়ির নিশানাটা জেনে নিয়ে ওরা যখন রওনা হল, সন্ধে নেমে এসেছে৷ সারাটা রাস্তা অন্তু আর অন্তুর বাবা কথা বলেনি৷ এমন একটা ঘটনা ঘটেছে স্যারের জীবনে, স্যার কেমন আছেন, এসব চিন্তা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল অন্তুকে৷ ও ছোট নেই এখন৷ ক্লাস এইটে পড়ে৷ যার মা হারিয়ে যায়, তার কেমন লাগে? অন্তুর চোখে জল এল৷ মা নেই, ভাবতেই পারে না ও৷
‘অন্তু, মনে দ্রা আমরা এসে গিয়েছি৷’ অন্তুর বাবা আঙুল তুলে দেখাল৷
অন্তু রাস্তার উল্টোদিকের গলির মুখের বাড়িটা দেখল৷ একটা লো পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে বাড়ির গেটের সামনে৷ দরজা, জানালা বন্ধ৷ বাড়িটা অন্ধকার৷ যেন সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজে থাকা একজন বৃদ্ধা৷ ন্যুব্জ, বার্ধক্যে কাতর৷ গাছপালা, ঝোপঝাড়ে ভর্তি বাড়িটাকে দিনের বেলাতেও অন্ধকার ঘিরে ধরেছে৷ বাড়ির গেটে তালা ছিল না৷ ঝাপসা আলোর ভেতর বেলটা আন্দাজে খুঁজে নিল অন্তুর বাবা৷ ওরা বেল বাজাতে ভেতরে হালকা পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেল৷ পরমুহূর্তেই দরজা খুলে যে দাঁড়াল, তাকে দেখে চমকে উঠেছে অন্তু৷ এই কটাদিনে স্যারের চেহারা এত খারাপ হয়ে গিয়েছে? বিধবস্ত চেহারা৷
ওদের দেখে স্যার অবাক হলেন৷ ভেতরে আসতে বললেন৷ ভেতরে ছোট একটি লিভিং রুমে ওরা বসল৷ স্যার লো পাওয়ারের আলো নিভিয়ে উজ্জ্বল আলোর সুইচে হাত দিতেই ঘরটা স্বস্তির শ্বাস ফেলল৷
স্যার ওদের মুখোমুখি বসে জানালেন বিরাট দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে বাড়িতে৷ ঠিক একুশ দিন আগে মায়ের ভারি ইচ্ছে হল, নোনা ইলিশ খাবেন৷ স্যারের বাবা কাছাকাছির মধ্যে নোনা ইলিশ না পেয়ে কোলাঘাটে গেলেন বড় ইলিশ কিনে আনতে৷ এর আগে স্যারই ইলিশ কিনে বড় বড় পিস করে নুন মাখিয়ে কন্টেনারে রেখে নোনা ইলিশ বানিয়ে মাকে খাইয়েছেন৷ এবারে স্যারের বাবা গিয়েছিলেন৷ ওখানে পারিবারিক বন্ধু গোপালবাবু আছেন৷ তিনিই বাবাকে মাছ কিনে ঠিকঠাক গাড়িতে তুলে দেবেন৷
বাবার কোলাঘাটে যাওয়ার আগের রাতে বাড়ির নথিপত্র খোঁজাখুঁজি চলছিল৷ কিচ্ছু পাওয়া যাচ্ছিল না৷ পুরোনো কাগজপত্র ডাই করে কোথায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল৷ অজান্তে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সেসবের সঙ্গে চলে গেল কিনা ভেবে মা দুশ্চিন্তায় ছিল৷ বাবাও৷
পরের দিন বাবা কোলাঘাটে রওনা দেওয়ার খানিক পর থেকে মায়ের হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না৷ বাবা-ছেলে মিলে বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেছেন৷ পুলিশে খবর দেওয়া হয়েছে৷ আজ কুড়িদিন হয়ে গেল,স্যারের মায়ের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি৷ কী হল মায়ের, কেন চলে গেল, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷ একটা জলজ্যান্ত মানুষ কথা নেই, বার্তা নেই হারিয়ে গেলেন বললেই হল? এটা কি বিশ্বাসযোগ্য ঘটনা? অথচ ঘটেছে তো বটেই৷
অন্তুর মন খুব খারাপ হয়ে গেল৷ বাড়িটা কেমন করে যেন বুঝে গিয়েছে এই বাড়ির মা হারিয়ে গিয়েছে৷ স্যারের মতো বাড়িটাও বড্ড মন খারাপ করে আছে৷ কেমন এক ধরণের বিষণ্ণতার চাদর মুড়ে রেখেছে বাড়িটাকে৷ এইজন্যই প্রথম দেখার পরেই বাড়িটা দেখে দুঃখী মানুষ বলে মনে হয়েছিল৷
‘আপনার বাবা ঠিক আছেন কি?’ অন্তুর বাবা মুখ নিচু করে জিগ্যেস করলেন৷
‘বাবা ভেঙে পড়েছেন৷ কী যে করব বুঝতে পারছি না...সেদিন সকাল থেকেই বেশ উদ্বিগ্ন দেখেছিলাম৷ মুখে কিছু বলছিল না৷ চুপ করে উঠোনে পায়চারি করছিল৷ একটু ব্যস্ত ছিলাম বলে মন দিয়ে সেই মুহূর্তে খেয়াল করিনি৷ কিন্তু, যখন মা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, তখন আমার মনে পড়ল উঠোনে একা একা হেঁটে বেড়ানো মায়ের বিমর্ষ মুখটা৷ কী হয়েছিল মার? কেন বিমর্ষ ছিল সেদিন? ছেলে হয়ে এটুকু খেয়াল করিনি কেন বলো তো নাড়ু?’
অন্তুর মনে হল, স্যার ভেতরে ভেতরে খুব কাঁদছেন৷ অন্তুর ভালো লাগছিল না এখানে বসে থাকতে৷ দম আটকে আসছিল যেন৷
একটা সময় বিদায় নিতেই হল৷ অন্তুর বাবা স্যারকে ফোন অন রাখতে বলে এল৷ এখন সবসময় ফোনে যোগাযোগ থাকাটা দরকার৷
বাড়িতে ফিরেও অন্তুর মন খারাপ ছিল৷ এরই মধ্যে ক্লাসে একটা পরীক্ষাও দিতে হল৷ সব মিলিয়ে দিন সাতেক হবে হয়তো৷ একদিন দুপুরে স্যারের ফোন এল৷ স্যার ফোনের ওপারে হাউ হাউ করে কাঁদছিলেন৷ অন্তুর বাবা নার্ভাস হয়ে বলল, ‘আমি যাচ্ছি৷ এখনই৷’
অন্তুরা যখন গিয়ে পৌঁছল, তখন বিকেল৷ স্যারের বাড়িতে অনেক লোক৷ পুলিশের গাড়ি৷ কী হল ব্যাপারটা?
ওদের দেখে স্যার ছুটে এলেন, ‘আমার মাকে পেয়েছি নাড়ু৷ বিশ্বাস করো, আমি যদি একবার বুঝতে পারতুম, তাহলে আজ মা ওইখানে শুয়ে থাকত না৷ দুর্গাঠাকুরের বিসর্জন হয়ে গিয়েছে নাড়ু৷’
অন্তু বাবার সঙ্গে স্যারের বাড়িয়ে দেওয়া হাত লক্ষ্য করে এগিয়ে গেল৷ চওড়া বারান্দায় নীল প্লাস্টিকের শিটের ওপরে রংচঙে শতরঞ্চির ওপরে একটি কঙ্কাল পড়ে রয়েছে৷ হাতের লম্বা লম্বা হাড়-এ ঢল ঢল করছে শাঁখা, পলা, দুটো করে সোনার চুড়ি৷ চুলগুলো খানিকটা আছে৷ বিসর্জনের পরে মা দুর্গার কাঠামো শুধু পড়ে আছে৷
‘এটা কী করে হল?’ অন্তুর বাবা আর্তনাদ করে উঠেছে৷
‘আজ খেতে বসেছি৷ খাবার মুখে দিতেই হঠাৎ করে মায়ের গায়ের গন্ধটা তীব্র হয়ে নাকের কাছে ঘুরে গেল৷ আমি থমকে গেলাম৷ ভাত মুখে দিতেই মনে হল, মায়ের রান্না খাচ্ছি৷ সেই স্বাদ৷ সেই গন্ধ৷
আমার রান্নার দিদি সবিতা৷ ওকে ডেকে বললাম, ‘কে রান্না করেছে সত্যি করে বলো৷’ সে বলে, ‘রোজ আমিই রাঁধি৷ আজও আমিই রেঁধেছি৷’
কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, মা বোধহয় লুকিয়ে আছে রান্নাঘরে৷ নিশ্চয় ফিরে এসেছে৷ আমি কত যে খুঁজলুম, কত যে! কোত্থাও পেলুম না মাকে৷ কিন্তু ভাতের থালার সামনে এলেই সেই গন্ধ ঝট করে নাকে এসে লাগছে৷ বুঝতে পারছি না কেন এমন হচ্ছে৷ এমন সময় জলের পাম্পের মেকানিক এসেছে৷ সবিতা তার সঙ্গে কথা বলছিল৷ আজ নাকি সকাল থেকেই পাম্পে জল উঠছে না৷
আমি অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, ‘তাহলে রান্নাবান্না করলে কী করে?’
সবিতা বলল, ‘বাগানের কুয়োর জল তুলে ফুটিয়ে নিয়েছি৷’
এই কথা শুনেই আমার মাথা ঘুরে গেল৷ বাগানের শেষ মাথায় একটি কুয়ো আছে৷ ইউজ হয় না৷ পাম্প খারাপ বলে সেখান থেকে জল তুলেছে সবিতা৷ সেই জল থেকেই কি মায়ের গায়ের গন্ধ আসছে? কেন? মায়ের গায়ের গন্ধ পরিত্যক্ত কুয়োর জলে আসছে কী করে? মাথা খারাপ হয়ে গেল আমার৷ আমি লোকজন ডেকে, পুলিশকে খবর দিয়ে সব বুঝিয়ে বলাতেও কেউ বিশ্বাস করে না৷ অবশেষে কুয়োয় লোক নামিয়ে তুলে আনা হল মাকে৷
বাবা বলছে, বাড়ির নথি হারিয়ে যাওয়ার কথা উঠলে মা বলেছিল, অনেক কাগজপত্র পরিত্যক্ত কুয়োতে ফেলে দিয়েছিল মা৷ কে জানে, সেসব খুঁজতে কুয়োর দিকে ঝুঁকে পড়ে দেখছিল হয়তো৷ টাল সামলাতে পারেনি পড়ে গেছে...! আমরা জানতে পারলুম না, মা পড়ে গেছে!’ স্যার নিশ্চুপ হয়ে গেলেন৷ চোখ মেঝের দিকে৷ অন্তু স্যারের শুকনো চোখে জল দেখতে পাচ্ছিল৷
সেদিন অনেকটা সময় স্যারের পাশে থেকেছে ওরা৷ পরের কয়েকটা দিনও গিয়েছে৷ অন্তুর মা গিয়ে দেখাশোনা করেছে৷ অন্তুর বাবা বলে এসেছে, অন্তুকে তবলা শেখাতে আসতে৷ মনটা স্বাভাবিক হবে৷ এই শোক কি সহজে যায়? কাজের মধ্যে থাকতে হয় এই সময়৷ ব্যস্ততায় মানুষের শোকের তীব্রতা কমে আসে৷
সব কিছু মিটে গেল একটা সময়৷ একদিন স্যার এলেন৷ সেদিন অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল৷ সেই হাসিখুশি স্যার কোথায় হারিয়ে গিয়েছেন৷ অন্তুর মা স্যারের ফেভারিট চিংড়ির চপ নিয়ে এল৷ বড় বড় দুটো চপের বাইরে চিংড়ির খানিকটা বেরিয়ে আছে৷ এটা যাদবপুরের একটা নামি দোকানের চপ৷ স্যার চপের প্লেট নিলেন৷ বিমর্ষ ভাব কাটল না চপ দেখেও৷ স্যার চপ কেটে মুখে দিতেই অন্তু বলল, ‘বলুন তো কোন দোকানের?’
স্যার এলোমেলো চোখে তাকিয়ে রইলেন, ‘বুঝতে পারছি না৷ আজকাল আমি কোনও গন্ধ পাই না৷’ শুনে অন্তুর মা শ্বাস ফেলে অন্য ঘরে চলে গেল৷
অন্তুরও মন ভালো লাগছিল না৷ এইজন্য সেদিন তবলাটা ভালো করে শেখা হল না৷ স্যার বললেন, ‘আমি পরের দিন ভালো করে শিখিয়ে দেব, বুঝলে অন্তু? মনটা ভালো নেই৷ আজ যাই৷’
স্যার চলে গেলেন৷ অন্তু গেটে দাঁড়িয়ে দেখল, মাথা নিচু করে কী ভাবতে ভাবতে চলে যাচ্ছেন স্যার৷ সেই বিমর্ষ, অবসন্ন বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন৷ যেখানে ঝিম ধরা বাগানের এক ধারে একটি পরিত্যক্ত কুয়ো রয়েছে৷ সেই কুয়ো টেনে নিয়েছে স্যারের মাকে৷ স্যার কেন ওই বাড়িতে থাকেন?
‘আমি তোর স্যারকে বলেছি, পুলিশও বলেছে বড় কংক্রিটের স্ল্যাব দিয়ে কুয়োটা ঢেকে রাখতে৷ অঘটন যখন একবার ঘটেছে, সাবধান থাকাই শ্রেয়৷’ অন্তু স্যারের জন্য দুশ্চিন্তাটা বাবার কাছে প্রকাশ করেছে রাতে৷ বাবা আশ্বাস দিয়েছে, ‘আমরা মাঝে মাঝে যাব স্যারের বাড়িতে৷ একটু মেলামেশা করলে মন ভালো থাকবে স্যারের৷ নেক্সট শুক্রবার আসবেন তো? সেদিন কথা বলব৷’
নেক্সট শুক্রবার নয়৷ স্যার এলেন শুক্রবারের আগেই৷ বুধবারে৷ আগের উইকে ভালো করে শেখানো হয়নি৷ তাই চলে এসেছেন৷ অন্তু তবলা নিয়ে গুছিয়ে বসল৷ ওর মা ফোন করে অন্তুর বাবাকে বলে দিল স্যার এসেছেন৷ পঞ্চাননের দোকান থেকে ছোট গোটা আলুর শিঙাড়া নিয়ে আসতে৷
আজ স্যার তবলা শেখালেন৷ আগের মতোই তালে ভুল হলে হেসে ফেললেন একবার৷ অন্তুর মনে হল, স্যার স্বাভাবিক হয়ে উঠছেন৷ অন্তুর বাবা শিঙাড়া নিয়ে আসতেই চটপট পরিবেশন করে ফেলল অন্তুর মা৷ কিন্তু স্যার এবারেও বুঝতে পারলেন না৷ লজ্জিত চোখে তাকালেন, ‘ভুলে গিয়েছি গন্ধটা৷ কোন দোকানের শিঙাড়া এটা?’
সেদিন অন্তুর বাবার সঙ্গে দেশের অবস্থা নিয়েও আলোচনা হল৷ স্যার চোখ বুজে শ্বাস নিচ্ছিলেন৷ শিঙাড়ার দোকানটা চেনার চেষ্টা করছেন কি?
বাবা, মা ঘর থেকে যেতেই স্যার চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি ফেলে অন্তুকে কাছে ডাকলেন, ‘কেউ বিশ্বাস করবে না৷ কিন্তু আমি জানি তুমি বুঝবে৷ আমি সব গন্ধ চেনার ক্ষমতা ভুলে গিয়েছি৷ এখন একটাই গন্ধ পাই সারাক্ষণ৷ জল থেকে উঠে আসা মায়ের গায়ের গন্ধ৷ অনেকদিন জলে ডুবে ছিল বলে গায়ে জলের গন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ সঙ্গে একটু শ্যাওলা আর মা দুর্গার গায়ের গর্জন তেলের গন্ধ৷’ বলে জোরে শ্বাস নিলেন স্যার৷ উজ্জ্বল চোখে তাকালেন, ‘মায়ের কখনও বিসর্জন হয় না অন্তু৷ ফিরে আসে মা৷ এই যে, আমার ডান পাশে দাঁড়িয়ে মা৷ দেখতে পাচ্ছ?’
অন্তুর ভয় পাওয়ার কথা৷ অথচ অন্তু ভয় পাচ্ছে না৷ স্যারের মা স্যারের কাছে থাকবেন, এটাই তো স্বাভাবিক! মা কি ভয় দেখাতে পারে? অন্তু উঠে ছুটে কিচেনে মায়ের কাছে যাচ্ছিল৷ এখনই মায়ের গায়ের গন্ধটা বুক ভরে, শ্বাস ভরে নিতে হবে৷ কখনও যেন চিনতে ভুল না হয়৷ স্যার বলেছেন, ‘স্মৃতিটাকে বাঁচিয়ে রাখো অন্তু৷ ওটা ভূত নয়৷ ওটাই ভালোবাসা৷’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন