সাগরিকা রায়

পুরোনো বাড়ি থেকে নতুন বাড়িতে যাওয়ার সময় মনটা খারাপ হয়ে যায়। সবারই হয় নিশ্চয়। আমারও হয়েছিল। কিন্তু কিছু করার ছিল না। যেতেই হবে। বাবা বলল, প্রমোটার বলেছে, এ মাসের বাইশ তারিখের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে দিন। বাড়ি তৈরির কাজ যত তাড়াতাড়ি পারি শুরু করে দেব। আমাদের পুরোনো বাড়িটা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে হবে। অন্য কোথাও মানে কী? বাবা বলল, ‘প্রমোটারের একখানি বাড়ি আছে নাওভাঙার মাঠে। বহু পুরোনো বাড়ি। গাছপালায় ভরা। ওখানেই...!’
একদিন বাবার সঙ্গে গিয়ে দেখে এলাম বাড়িটা। অনেকটা দূর আমাদের এই বাড়ি থেকে। অলি গলি মাঠ বস্তি পেরিয়ে একটা শুনশান জায়গায় গিয়ে পড়লাম আমরা। গাছপালায়, ঝোপেঝাড়ে ঠাসা জায়গায় বাড়ি। পাশেই বিশাল আদিগন্ত মাঠ! এই সেই নাওভাঙার মাঠ। দিনেদুপুরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে মনে হচ্ছে।
মনটা বেশ দমে গেল। বহুদিন আগে এখানে নাকি বিরাট নদী ছিল। বড় বড় বাণিজ্যতরী আসত। কবে যেন সেই নদী গতি পাল্টে ফেলে। ধু-ধু বালুর ভেতর থেকে অনেক বছর পরে ভাঙা নৌকোর টুকরো টাকরা মিলেছিল। সেই থেকে এখানকার নাম নাওভাঙার মাঠ। এখানে লোকবসতি ছিল খুব সামান্য। লোকালয় থেকে অনেক দূর বলে ধীরে ধীরে এই জায়গা ছেড়ে চলে যায় তারা। এরপর থেকে এই নাওভাঙার মাঠ পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। আমাদের প্রমোটারের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল এখানে। কী নিঝঝুম চারপাশ! ভয় ভয় করছিল আমার। বাবা লোক লাগিয়ে কিছুটা ঝোপঝাড় সাফসুতরো করে ফেলে দিন পাঁচেকের মধ্যে। মা আর দিদি মিলে বাক্স প্যাঁটরা বাঁধাছাঁদা করে ফেলল। একদিন ছ’টা ভ্যান ভরে মালপত্র নিয়ে আমরা রওনা হলাম নাওভাঙার মাঠের দিকে। বাবার সাইকেলের পেছনে আমি বসলাম। মা আর দিদি ভ্যানে চেপে বসল। সেই তারপর থেকেই আমরা এই নাওভাঙার মাঠের বাড়িতে। আশেপাশে বাড়ি বলতে সেই ওই দিকে একটা পরিবার থাকে বলে শুনেছি বাবার থেকে। আমরা কেউ ওদিকে যাইনি কিনা। আমি বাবার সাইকেলের পেছনে বসে স্কুলে যাই। দিদি হেঁটে হেঁটে যায় আমাদের পাশাপাশি।
ছুটির দিনে বাড়িটার মধ্যে ঘুরে বেড়াই। ভেতর দিকে অনেক দূর পর্যন্ত চলে গেছে গাছপালায় ভরা জমি। ওদিকে কী আছে জানতে খুব ইচ্ছে হতো। কিন্তু দিদি সেদিন স্কুলের সেলাই নিয়ে বসেছিল বলে আমাকে ঘুরঘুর করতে দেখেছে। ভেবেছিলাম আজ পুরো বাড়িটা ঘুরে দেখব। ঝোপঝাড়, জঙ্গল ঠেলে যেতে যেতে কত কী দেখে ফেললাম! একটা ভাঙাচোরা ঘর। কবে কে থাকত এখানে কে জানে! গাছে ডালে জড়াজড়ি করে একাকার হয়ে আছে। এগোব তার সাধ্য কী? সড়সড় করে সাপ না কী যেন চলে গেল কলাগাছের ঝাড়ের দিকে। কী ঘন জঙ্গল রে বাবা! এ যে আফ্রিকার জঙ্গল!
দিদি আমাকে ডাকছিল, ‘নমি, নমি, কোথায় গেলি জঙ্গলের মধ্যে? ওখানে সাপখোপের বাসা আছে কিন্তু বলে দিচ্ছি! পুকুর আছে। দেখে নাকি মনে হয় মজে যাওয়া। আসলে চোরা জলে ভরা। ওপর থেকে দেখে কিচ্ছুটি বোঝার জো নেই! যাস নে। ভর দুপুরে হাত ধরে কেউ টেনে জলে নামিয়ে নেয় বলে শুনেছি। আমাদের স্কুলের তিয়াস বলছিল।’
আমার এমনিতেই ভয় করছিল। দিদির ডাক শুনে হুড়তাড় করে বেরিয়ে এলাম ওই অন্ধকার জঙ্গলের ভেতর থেকে। আমার ভয়তরাস মুখ দেখে দিদি ভয় পেয়ে গেল, ‘কী হল রে? ভয় পেলি কেন?’
‘কেন জানিনা, কিন্তু এই বাড়ির ভেতরটা ভারি ছমছমে রে! মনে হয় কে যেন আড়াল থেকে দেখছে আমাকে। আর কী জঙ্গল রে! ওদিকে একটা ভাঙাচোরা ঘর আছে। অনেক পুরোনো মনে হয়। জায়গাটা কেমন যেন নারে দিদি?’
তা তো হবেই। কবেকার পুরোনো জায়গা! কেউ আসেই না এদিকে। দূরে দু’একজন লোক দেখা যায়। অনেক দূর দিয়ে চলে যায় বলে তাদের ঝাপসা ঝাপসা দেখায়। আমি স্কুলে নাওভাঙার মাঠে থাকতে এসেছি শুনে সবাই অবাক প্রায়। বলে কী ‘হ্যাঁ রে, ওখানে কি বসবাস করা যাবে?’ কথা বলতে বলতে দম নিল দিদি।
দিদি বারণ করল, ‘আর কখনও যাসনা ওদিকে। সাপ আছে! কত দিনের পুরোনো জায়গা। ভারি জঙ্গুলে। দিনেদুপুরে অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশ৷’
বাবা লোক লাগিয়ে ঘর দোর সাফ করিয়ে রেখেছিল। বাড়িটারও ভগ্ন দশা যাকে বলে। বসবাসের যোগ্য করা হয়েছিল মোটামুটি। প্রমোটার নিজেই কার্বলিক অ্যাসিড ছিটিয়ে দিয়ে গেছে। দরজা জানালা রিপেয়ার হয়েছে। মা মোটে থাকতে চাইছিল না এই ঘুটঘুটে বাড়িতে। বাবা বলেছে, মাত্র তো কটা দিন। কষ্ট করে থাক। পরে বাড়ি হলে নতুন বাড়িতে যাবে৷ জানোই তো, কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে!’
তো মা সেই কেষ্টর আশায় এই নাওভাঙার বাড়িতে থাকতে রাজি হয়েছে। সেদিন ঘুরঘুট্টি বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গিয়েছিলাম বলে দিদি পরে আমাকে খুব বকেছে। ও বকলে হবে কি, আমি নিজেই যে ওদিকে আর যাব না ভেবে রেখেছি। বাবারে, খুব ভয় ভয় করে ভাই!
রাতে মা গরম রুটি আর মিষ্টি কুমড়োর চচ্চড়ি খেতে দিয়েছিল। খেয়ে তাড়াতাড়ি করে দিদির পাশে গিয়ে শুয়ে পড়েছি। অনেক রাতেও ঘুম আসছিল না। বাবা, মা, দিদি ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবার নাক ডাকছে—ঘুর র র র র ফোত! বাবার নাক ডাকা শুনতে গিয়ে আমার একটু একটু যে ঘুম ঘুম ভাব হচ্ছিল, সেটাও ভেঙে যাচ্ছিল।
বাইরে কোথায় যেন খুসখুস শব্দ হচ্ছে। টুপুস টাপ করে চালের মধ্যে কী পড়ছে! জাম গাছ আছে এখানে। এই জানালার পাশেই। জাম পড়ছে ঠিক। জঙ্গলের মধ্যে ওই বাড়িটা...অন্ধকারে দিদি কোথায়... কোথায় কে টিউবওয়েল পাম্প করছে! জল পড়ার শব্দ হচ্ছে খলখল ছলছল খলখল খল...। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল হতে বাবা চলে গেল জয়নগরে বাবার চায়ের দোকান খুলতে। মা সারাদিন ঘরের কাজ করবে। আমরা দুবোন এখন নিজেরাই চলে যাই স্কুলে। বিকেলে ফিরে আসি নাওভাঙার বাড়িতে। রোজ রাতে লণ্ঠন জ্বেলে আমরা পড়াশোনা করি। তারপর খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। অনেক রাতে ঘুমের মধ্যে শুনতে পাই টিউবওয়েল পাম্প করার শব্দ। শুনতে পাই জল পড়ার শব্দ খলখল খলখল। কলসীতে জল ভরছে কেউ...। পাশ ফিরে শুই ঘুমের মধ্যে।
রবীন্দ্রজয়ন্তীতে স্কুলে ফাংশন হবে। দিদি গেছে স্কুলে। মা গেছে সোনা পিসির বাড়িতে। বেলেঘাটায়। আমি একেবারে একা বাড়িতে। মা বলেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চলে আসবে। একটু একটু ভয় করছিল আমার। একা বাড়িতে থাকতে ভয় ভয় করে না? কিন্তু ভয় করলে কী আর করা যাবে!
আজ খুব রোদ উঠেছে। চড়চড় করছে রোদ। রোদ আমার বেশি ভালো লাগে না। কিন্তু রোদ ঝকঝক দিনে ভয়-টয় কম করে। ভয় হয় মেঘলা করে এলে। বা খুব বৃষ্টি হলে। বাবা, তখন একা একা থাকা আমার পক্ষে সম্ভবই না। একা একা থাকলে নিঝুম বাড়িটাকে আরও রহস্যময় বলে মনে হয়।
খুসখাস করে পাতা খসে পড়ছে। ঝিমঝিম করছে দুপুরের বাড়ি। আমি পা ফেলে ফেলে বাড়ির পেছনের দিকে চললাম। কোমর পর্যন্ত জুনি ঘাসের জঙ্গল। খসখসে পাতা এই ঘাসের। মাঝে মাঝে শান্তি শাক লকলক করছে। কচু গাছ আছে গুচ্ছের। মা কচুশাক রাঁধে ছোলা আর নারকেল দিয়ে। কী স্বাদ! এখান থেকে খানিকটা কচুর শাক তুলে নিয়ে গেলে হয়! কত রকম আগাছা! জন্মে দেখিনি। আর এদিকটা যেন বড্ড স্যাঁতস্যাঁতে! ভেজা ভেজা মাটি! খুব পুরোনো দিনের গন্ধ মেখে দাঁড়িয়ে আছে এই জায়গাটা।
কেমন যেন সিনসিন করে বুকটা। একটা বিরাট বড় গাছ ডালপালা মেলে ঝুপ্পুস হয়ে আছে। মাটি থেকে গাছের যে গোড়াটা উঠেছে, সেটা যে কী বিশাল মোটা, তা আর বলার নয়। এটার বয়স কত হবে? হাজার বছর? হতেও পারে! গাছের পেছন দিকটা দেখার জন্য ঘুরে ওপাশে গেলাম। বাপরে! কী বুনো জায়গা! কতকাল এখানে মানুষের পা পড়েনি! আচ্ছা, প্রমোটারের বাড়ি ছিল এখানে! তো? এরকম বাড়িতে উনি পরিবার নিয়ে থাকতেন কীভাবে? এই বাড়ি দেখে মনে হয় সুপ্রাচীনকাল থেকে এভাবে একা হয়ে আছে!
হিজসিসসস! আহহহহসসসস! আহ—হ!
চমকে উঠেছি কেমন একটা শব্দ পেয়ে। কারা যেন একসঙ্গে কথা বলে উঠল! বাতাসে বাতাসে সেই শব্দ ভেসে এল অনেক অনেক দূর থেকে! ভয়ের স্রোত বয়ে গেল আমার শরীরে। পেছন ফিরে চলে আসব, বাড়িতে ঢুকব, সেই সাহস নেই আমার। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি পাথরের মতো। আর নড়তে পারব না কখনও!
নমি! নমি! কতদূর থেকে মায়ের গলা পাচ্ছি! মা, তুমি কোথায়!
নমি? নাঃ, মেয়েটা কোথায় গেল? নমি?
সাড় ফিরে আসছে শরীরে। আমি নড়ে উঠলাম। জোরে শ্বাস নিয়ে ছুট লাগালাম বাড়ির দিকে।
মা দাঁড়িয়ে আছে উঠোনের মাঝখানে। অবাক হয়ে চারপাশে তাকাচ্ছে। আমি ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। মা রেগে বলল ‘আমাকে ভয় দেখাচ্ছ?’
সেদিন বাবা ফিরতেই আমি জানতে চেয়েছি, ‘বাবা, এই বাড়িতে প্রমোটারকাকু থাকতেন, কিন্তু, বাড়িটা এমন লাগে কেন? যেন কতকাল এখানে কেউ থাকত না।’
আরে, শোন, তোর ওই কাকুর পুর্বপুরুষের জায়গা এটা। থাকবে বলে ভেবেছিল, তবে ভদ্রলোকের পরিবার এত দূরে থাকতে চায়নি। তাই কেউ এখানে কখনোই থাকেনি। দেখছিস না, ঘরবাড়ির কেমন ভূতে পাওয়া দশা! বাবা বলল।
রাতে শুতে গিয়ে দিদির কাছে স্কুলের ফাংশনের গল্প শুনলাম। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছি। একসময় ঘুম ভেঙে গেল। মনে হল আমাকে একবার বাইরে যেতে হবে। আমাদের বাথরুমটা ঘর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। একা একা যেতে ভয় করছিল। সেই সময়েই শুনলাম কেউ একজন টিউবওয়েল পাম্প করছে। জলের শব্দ হচ্ছে খলখল ছলছল খলখল। কলসীতে জল ভরছে কেউ। ওহ! তাহলে আর কীসের ভয়! আমি বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লাম। এই জল ভরার শব্দ তো রোজই পাই। এর মানে হল একা একা বাথরুমে যেতে পারি।
দিদিটার যা ঘুম, ওকে আর ডেকে ঘুম ভাঙিয়ে কাজ নেই! আমি বিছানা ছেড়ে নেমে পড়লাম। পায়ে চপ্পল গলিয়ে নিয়ে দরজা খুলে বের হলাম। বাইরেটা কী অন্ধকার রে বাবা! ঘুটঘুট করছে একেবারে! এই অন্ধকারে কে জল ভরছে? যাক, জল ভরছে বলে তবু ভালো। নিজেকে একা মনে হচ্ছে না। আমি অন্ধকারেই উঠোনে পা রেখে একছুটে বাথরুমে চলে গেলাম। শুনতে পেলাম জল ছপ ছপ করতে করতে কেউ চলে যাচ্ছে।
এখন থেকে এই এক সুবিধে হল। রাতে বের হতে হলে মোটে ভয় করে না। আজ তো এক কাণ্ড হল।
কাণ্ডটা বলার আগে বলে নিই আজ আমার বেশ জ্বর এসেছে। সামার ভ্যাকেশন চলছে বলে স্কুলে যাওয়ার ঝামেলা নেই। সারাদিন শুয়ে থাকি। তো সেদিন শুয়ে আছি। দুপুর ঝুমঝুম করছে। মা আর দিদি বাজারে গেছে। বলেছে চিড়েভাজাটা খেয়ে শেষ করতে করতেই ওরা চলে আসবে। আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে গেল। খুব হইচই হচ্ছে! কী হল রে বাবা? আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দেখি...। ও মাগো, এত লোক নাওভাঙার মাঠে কী করছে? ভালো করে দেখতে গিয়ে আমার মাথায় হাত! মুখে কথা আসছে না। মাঠ কোথায় এখানে? বিখ্যাত নাওভাঙার মাঠ কোথায় গেল? জল থই থই বিশাল নদী! নদীতে সার দিয়ে পালতোলা নৌকো। এই কি বাণিজ্যতরী? এখন কী করে এসব হল? একটু আগেই তো এখানে হু-হু করা মাঠ ছিল! আমি ঠিক স্বপ্ন দেখছি! হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছি। দেখছি হইচই করে নৌকো থেকে মাল নামানো হচ্ছে। অচেনা লোকগুলো হাঁটু অব্দি ধুতি পরা, খালি পা, গায়েও জামা নেই। মাথায় করে ভারী ভারী মাল নিয়ে নৌকো থেকে নামছে এই বিরাট চওড়া তক্তার উপর পা রেখে। তীরে প্রচুর লোক দাঁড়িয়ে খ্যাঁচোড়-ম্যাচোড় করে চিল্লামিল্লি করছে! নৌকোগুলো খুব রঙচঙে করে সাজানো। মাঝি-মাল্লাদের হুমহাম শুনতে পাচ্ছি! আমি মোটেই স্বপ্ন দেখছি না। ওই তো লম্বা লোকটা চেঁচিয়ে কী বলে উঠল নৌকোর উপর থেকে! পাশাপাশি অন্য নৌকোগুলোতেও একই রকম ছবি! এত লোক কখন...এখানে নদী...আমার চোখের সামনে থেকে সব ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে! আমি ঘুমিয়ে পড়ছি...
নমি, নমি, এ কী? ঘর ছেড়ে বাইরে এসে শুয়েছিস কেন? দিদি ডাকছিল। আমার চোখ থেকে ঘুম যাচ্ছে না। কোনরকমে চোখ মেললাম। মা আমার কপালে হাত রেখে চমকে উঠল এ কী রে? গায়ে খুব জ্বর যে!
খুব জ্বর এসেছিল আমার সেদিন। পরে সেরে উঠে সেদিনের কথা বলাতে বাবা বলল আমি জ্বরের ঘোরে ওসব দেখেছি। বাবা বলল বলে আমি কিছু বলিনি। কিন্তু জ্বরের ঘোর হলেও অমন দৃশ্য কেন দেখব? যাকগে বাবা, ওসব নিয়ে আর কিছু ভাবিনি। হতেও পারে ঘোরের মধ্যে দেখেছি। বাবা কি ভুল বলবেন? তবে অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেলে সেদিনের কথা মনে হয়। কী স্পষ্ট সব দেখলাম! আচ্ছা, নৌকো এখানে আসত শুনেছি। মানে হল এখানে নদী ছিল। আমি কি সেই নদীকে দেখেছি? জানি না ভাই!
সামনেই পরীক্ষা। খুব ভোরে উঠতে পারি না বলে অনেক রাত পর্যন্ত পড়ি। সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। আমি লণ্ঠন জ্বেলে পড়ি রাত দেড়টা-দুটো পর্যন্ত। তো সেদিনও পড়ছি। একটু একটু ঘুম পাচ্ছে। মনে হল আজ ঘুমিয়ে পড়ি। দিদির সেলফোন অন করে সময় দেখলাম। রাত দুটো। বাথরুমে যাব। তারপর ঘুমবো। যে বউটি রাতে জল ভরতে আসে, আজও এসেছে। জল পড়ার শব্দ পাচ্ছি। খলখল। হয়তো দিনে সময় পায় না, তাই রাতে জল ভরে। আমিও যাই। বাথরুমে। বউটি থাকে বলে একটুও ভয় করে না।
আমি বাথরুমের দিকে যেতে যেতে দেখি দূরে আবছা মতো বউটিকে। কলসিতে জল ভরছে। আচ্ছা বউটিকে অন্য সময় দেখতে পাই না। কোথাও কাজ করে হয়তো। কোথায় থাকে? ঠিক মাঠের ওই দিকে। ওদিকে জল পায় না বলে এদিকে আসে। বাথরুম থেকে ফিরে আসতে আসতে দেখি বউটি তখনও জল ভরছে। কলসি উপচে জল পড়ে যাচ্ছে। তবু জল ভরেই যাচ্ছে। ভরেই যাচ্ছে। টিউবওয়েল থেকে মোটা ধারায় জল পড়ে কলসি ভরে উপচে পড়ছে! ভারি অবাক হলাম। কিন্তু তখন এত ঘুম পাচ্ছে যে বউটিকে ডেকে কথা বলার ইচ্ছে করল না। ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সাতসকালে ঘুম ভেঙে গেল।
আজ পরীক্ষা বলে তাড়াতাড়ি করে রেডি হয়ে নিয়েছি। বাবা আমাকে স্কুলে দিয়ে এসে জয়নগরে যাবে। আমি নিজেই যেতে পারতাম, কিন্তু পরীক্ষার সময় এক্সট্রা কেয়ার নেয় বাবা। যদি পৌঁছতে দেরি হয়? তখন? কিছু কি বলা যায় রাস্তাঘাটের কথা? ঘাট শব্দটা শুনেই সেদিনের কথা মনে পড়ে গেল। কিন্তু কিছু বললাম না। এখন পড়া ছাড়া অন্য কিচ্ছু বলা বারণ। মনে মনে ভাবলাম নদীটা কী বিশাল ছিল! ঘাটে কত্ত লোক ছিল। মাল নামিয়ে কোথায় নিয়ে যেত কে জানে!
বাংলা পরীক্ষা খুব ভালো হল। আজ অনেকক্ষণ পড়ব। দিদি বলল, ‘হু, আমরা সবাই ঘুমিয়ে পড়ি। তুমিও ঘুমোও কিনা কেইবা দেখতে যাচ্ছে। আজ জেগে থেকে দেখব, তুই কতক্ষণ জেগে পড়িস।’
খুব রাগ হল। দিদির খুব সন্দেহ বাতিক। একথা তো মাও বলেছে। রেগে মেগে বললাম, ‘নাক ডাকিয়ে যখন ঘুমোও, তখন মনে থাকে না যে একজন জেগে আছে! যাও না, রাত দুটোর সময় জল ভরতে আসে যে বউটা, তাকে আজ ডেকে জিগ্যেস করো না! সে রোজই আমাকে দেখতে পায়।
দিদি, মা, এমনকী বাবাও থমকে গেল আমার কথা শুনে। বাবা সাইকেল বের করতে গিয়ে থেমে গেল, রাতে জল ভরতে আসে? কে সে? এদিকে কেউ থাকে না।
‘থাকে বাবা। মনে হয় মাঠের ওই দিকে থাকে। কিন্তু জল ভরতে ভরতে কলসি উপচে পড়লেও থামে না।’
‘তুই বউটিকে দেখেছিস?’ দিদি উদগ্রীব।
‘হুঁ, রোজ দেখি। কেন তোরা দেখবি? আজ জেগে থাকিস। জলের শব্দ হলেই গিয়ে দেখে আসবি। কথাও বলব, হ্যাঁ?’
মা দিদি বাবা মুখ গোমড়া করে নিজেরা ফিসফাস করল। শুনলাম আজ রাতে সবাই জেগে থাকবে বউটিকে দেখার জন্য। ভালোই হল। আমারও ইচ্ছে জানার বউটি অত জল ভরে কেন!
রাতে খেয়েদেয়ে বসে আছি। রাত গভীর হতে দিদি হাই তুলতে লাগল। মা’র চোখ বুজে এল। বাবা আর আমি জেগে আছি। রাত গভীর থেকে গভীর হল। দুটো বেজে গেল। কী আশ্চর্য! কেউ এল না! আজ কেউ জল ভরতে এল না! এতদিনের মধ্যে এই প্রথম এমন কাণ্ড ঘটল। অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকালাম। বাবা আমাকে মিথ্যেবাদী ভাবল। কিন্তু আমার বাবার খুব সাহস। মা আর দিদিকে ডেকে তুলে, আমাকে সঙ্গে নিয়ে বাবা ঘর থেকে বের হল। হাতে লণ্ঠন। চারপাশে তাকিয়ে বাবা বলল, ‘কোথায় দেখিস?’
যেখানে বউটিকে দেখি, সেদিকে আঙুল তুলে দেখালাম। বাবা বলল, ‘চলো সবাই, দেখে আসি।’
বিশ্বাস করবে না কোথাও সেই বউটিকে দেখতে পেলাম তো না, কিন্তু ওইদিকের জঙ্গলের মধ্যে একখানি ভাঙা টিউবওয়েল দেখা গেল। হ্যান্ডেল বলতে কিছু নেই। পরিত্যক্ত, ভাঙা এই টিউবওয়েল দিয়ে কখনও জল পড়েছে বলে ভাবা গেল না। তাহলে?
জানি না কেন, পরের দিনই বাবা আমাদের নিয়ে আগের বাড়ির কাছাকাছি জনবহুল এলাকায় চলে এল। আস্তে আস্তে নাওভাঙার মাঠের সেই বাড়ির কথা ভুলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু অনেক রাতে ঘুম ভেঙে যেতে শুনতে পেলাম কেউ জল ভরছে কলসিতে। অনেক দূরে, জঙ্গলের মধ্যে, ঘুটঘুটে অন্ধকারে কেউ জল ভরছে! পাশ ফিরে শুতে শুতে ভাবলাম দিদিকে ডেকে শোনাই। কিন্তু, বিশ্বাস করবে না। কী দরকার? থাক যে যার মতো!
কিন্তু বউটির জন্য একটু একটু কষ্ট হয়। তবু আমরা ছিলাম। এখন একা একা জল ভরে। ওর বুঝি ভয় করে না? কে জানে কে ও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন