সাগরিকা রায়

সুন্দরপুর থেকে মেট্রোর ব্যবস্থা নেই। বাস ভরসা। সেটাই জানে অর্পণ। তুহিন বলেছিল, রাত না করতে। একটু তাড়াতাড়ি করে বের হতে। অর্পণ সেই হিসেব করেই বেরিয়েছিল। বেশ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিন যাকে বলে, তেমনই ছিল। বলা বাহুল্য, ওর মুড ফ্রেস ছিল। তুহিন অনেকবার সুন্দরপুরে যেতে বলেছে। কিন্তু যাওয়াই হয় না। কাঁচরাপাড়া থেকে সুন্দরপুর অনেকটাই দূর। হুট বলতেই যাওয়া যায় না। কিন্তু, তুহিন ফোন করেছিল, ‘এখানে সেন বাড়ির পুজো দেখতে এসো অর্পণ। পুরোনো দিনের মতো স্মেল পাবে। তাছাড়া, আমি এখানে বেশিদিন থাকব না। চাকরি নিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে যাব। আর সুন্দরপুরে কবে আসা হবে কে জানে? কাজেই, আমি থাকতে থাকতে এসে ঘুরে যাও।’
কথাগুলো মাথার ভিতরে ঢুকে গিয়েছে তুহিনের গলা শুনতে শুনতে। ও কথা দিয়ে ফেলল। সেই কথা রাখতেই আজ বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে বাসস্ট্যান্ডে। কিন্তু কুড়ি মিনিট হয়ে গেল, বাসের দেখা নেই। পাশেই অটোস্ট্যান্ডে একটাই অটো গ্যাঁট মেরে বসে আছে। অটো কি যাবে অতদূরে? অটোওলাকে জিগ্যেস করে দেখা যাক। যদি ভাড়ায় পুষিয়ে যায়, তাহলে অটো নিয়ে চলে যাওয়া যাবে অর্পণ।
অটোওলা গাড়ির ভিতরে বসে খৈনি ডলছিল। অর্পণকে দেখে থুক করে থুতু ফেলল বাইরে, ‘কোথায় যাবেন?’
‘সুন্দরপুর। যাবেন?’ অর্পণ আগ্রহে গলা বাড়াল উটের মতো।
‘সুন্দরপুর? অটো যাবে না। বাস খুব কম ওই রুটে। আপনি ট্রেনে চলে যান। নতুন নাকি এদিকে?’ লোকটি খৈনি ঠুসে দিচ্ছে ঠোঁটের ভিতরে।
‘হ্যাঁ, মানে সুন্দরপুরে যাইনি আগে। রুট জানি না ঠিকঠাক।’
‘হুম। লোকাল ট্রেন পাবেন। ডানদিকে খানিকটা এগিয়ে যান। একদিকে দেখবেন রিকশাস্ট্যান্ড। রিকশা করে স্টেশনে যান।’
অগত্যা। রিকশা করে স্টেশনে পৌঁছতে সময় লাগল পনেরো মিনিট। ঘড়িতে সময়টা দেখে রাখল অর্পণ। এরপর ট্রেনে উঠতে সময় বেশি লাগল না। ট্রেনে উঠে একজনকে জিগ্যেস করল, সুন্দরপুর স্টেশন থেকে লালুয়া গ্রাম কতদূরে?
দাঁত বের করে একজন কাছে এসে দাঁড়াল, ‘লালুয়া যাচ্ছেন? আমিও লালুয়া যাচ্ছি। এই তো, স্টেশনে লেবে সোজা উত্তরমুখে হেঁটে যেতে যেতে ডানদিকে শিবমন্দির, তারপরে ইস্কুল। তারপরে মাঠ পেরিয়ে বাজারে এসে পড়লেই লালুয়া।’
অর্পণ মনে মনে আঁতকে ওঠে। এত্ত হাঁটাহাঁটি?
ও তুহিনকে মেসেজ করল। স্টেশনে নেমে তোদের বাড়ি পৌঁছব কীভাবে?
তুহিন সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘সুন্দরপুর স্টেশনে নেমে দু-নম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বেরিয়ে টোটো, রিকশা বা অটোতে লালুয়া। এখানে এলেই আমাকে পাবে। আমি দাঁড়িয়ে থাকব মাঠের ধারে। অটো, টোটো, রিকশা সবই এখানে এসে মাঠের ধারে দাঁড়ায়। মাঠ হেঁটে পার হতে হবে।’
সত্যিই তুহিন দাঁড়িয়ে ছিল। অর্পণ খুশি হল তুহিনকে দেখে। একসময় কলেজে সহপাঠী ছিল ওরা। তারপর যে যার পেশাগত জীবনে ঢুকে গিয়েছে। অর্পণ আইটি সেক্টরে আছে। তুহিন স্কুলমাস্টার। কিন্তু এখন অন্য চাকরি নিয়ে চলে যাচ্ছে ব্যাঙ্গালুরু। দেখা হয়েছিল বছরখানেক আগে বইমেলায়। ওইটুকুই।
সামনেই বিরাট মাঠ। রিকশা থেকে নেমে মাঠের ওপরে পা রাখতেই কেন যেন শরীরের ভিতরে তীব্র ঝাঁকুনি খেল অর্পণ। মাথা ঘুরে গেল। মাঠ, তুহিন সব কিছু ঝাপসা হয়ে এল। শরীরের ভিতরে ইলেক্ট্রিক শক লেগেছে হঠাৎ করে।
তুহিন ডাকছিল। অর্পণ আস্তে আস্তে সমে ফিরছিল। ফের সব দেখতে পাচ্ছে। তুহিন উদ্বিগ্ন ভাবে ওকে ধরে আছে। ডাকাডাকি করে চলেছে।
ওকে চোখ মেলে তাকাতে দেখে তুহিন স্বস্তির শ্বাস ফেললেও চিন্তা ছিল গলার স্বরে, ‘কী হল? খাওনি অনেকক্ষণ বুঝি? চলো চলো। এরকম আগে হয়েছে?’
লজ্জা পেয়েছে অর্পণ। তুহিন বিব্রত হয়ে আছে ওকে নিয়ে ও দ্রুত মাথা নারে, ‘আরে না, না। হঠাৎ করে মাথা ঘুরে গেল কেন কে জানে। আগে তো হয়নি কখনও। সকালে বের হওয়ার আগে এগচাউ খেয়েছিলাম বলেই হয়তো অ্যাসিডিটি হয়েছে। একটা ওষুধ খেয়ে নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। চলো, চলো।’
মাথার ওপরে রোদের তাপ চাড়া দিয়ে উঠেছে। মাঠের ভেজা ঘাস তাপে শুকোতে শুকোতে চড়া সোঁদা গন্ধ ছেড়েছে। কাদা শুকোচ্ছে, তারই গন্ধ। খাঁ খাঁ করছে মাঠ। অনেক দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে ক্ষীণ স্বরে। কাদার গন্ধে গা গুলোচ্ছিল অর্পণের। গা গুলোনো ক্রমেই বাড়ছে। তুহিন একনাগাড়ে কথা বলে চলেছে। কিছুক্ষণ কথা চালিয়ে যাচ্ছিল অর্পণ। নিজেকে অন্যমনস্ক রাখার চেষ্টাও ছিল কথা বলে যাওয়ার মধ্যে। কিন্তু ক্রমেই গা গুলিয়ে বমি আসছিল। এরকম কেন হচ্ছে হঠাৎ করে, বুঝতে পারছিল না অর্পণ।
একসময় থাকতে না পেরে তুহিনের হাত চেপে ধরল। ইশারায় নিজের শরীর খারাপের কথাও বোঝাতে চাইল। কিন্তু তুহিন কিছু বুঝতে না বুঝতেই অর্পণ মাঠের ওপরে বসে পড়ে উগড়ে দিল স্টমাকের সবটুকু। তুহিন সময় দিল ওকে। পিঠে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে ডলে দিতে লাগল। অর্পণ একটু সুস্থবোধ করতেই তুহিন ওকে ধরে তুলল, ‘আস্তে আস্তে বাড়িতে চলো, রেস্ট নাও। ঠান্ডায় শুয়ে থাকতে হবে। জল খেতে হবে। সঙ্গে ওষুধ চাই। তার আগে আমাদের গ্রামের ডাক্তারকাকুকে দেখাতে হবে। ভয় নেই। আমি আছি।’
দুজনে বাজার পেরিয়ে যেতে যেতে ঢাকের আওয়াজ তীব্র হচ্ছিল। অর্পণ বুঝতে পারছিল, কাছেই সেনবাড়ি। আর তার পাশে নিশ্চয় তুহিনদের বাড়ি।
তুহিনকে জিগ্যেস করতেই তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ, সেনবাড়ি আমাদের রিলেটিভ। আমিও সেন, মনে নেই? তুহিন সেন।’ বলতে বলতে অল্প হাসে তুহিন, ‘একই জমির ওপরে আমাদের বাড়ি। তিনবিঘে জমির ওপরে আমরা চারঘর রিলেটিভ থাকি। নিজেদেরই বাড়িতে পুজো বলতে পারো। যদিও পুজোটা হয় অখিলজেঠার বাড়িতে। কাজকর্ম আমরা সবাই মিলে করি। খাওয়া-দাওয়া সব ওখানে পুজোর কটাদিন। আত্মীয়স্বজন আসে বাইরে থাকে। এবারে এসেছেন মুম্বাই থেকে দীপেনদাদু, তাঁর ছেলে, নাতি...। কলকাতা থেকে দুটো পরিবার এসেছে বিনু কাকার বাড়িতে। আমাদের তরফে তুমি এলে, সজলদা এসেছে নর্থ বেঙ্গল থেকে। সজলদা দারুণ ভূতের গল্প বলতে পারেন। আর খেতে পারেন বটে।’ হাসছে তুহিন।
অর্পণ জিগ্যেস করে, ‘মুম্বাই থেকে যিনি এসেছেন, তিনি কার তরফ থেকে এসেছেন?’
‘অখিলজেঠার নিজের ভাই তিনি। দারুণ হিন্দি বলেন। ওর স্ত্রী নাকি একসময়ে বলিউডে সাইড রোল করেছেন। শচীন ভৌমিক নাকি রিলেটিভ দিদার। শচীন ভৌমিক হলেন ফিল্মের স্টোরি রাইটার। নামি মানুষ। নাম শুনেছ তো?’
অর্পণ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ে, ‘খুব শুনেছি। দিদা এসেছেন নাকি? দীপেন দিদা? এলে বলিউড নিয়ে গল্প শুনব।’
তুহিন একটু তাকিয়ে দেখে অর্পণকে, ‘শরীর ঠিক আছে অর্পণ?’
শরীর? অর্পণ বিস্ময়ে তুহিনের দিকে তাকায়, ‘কী আশ্চর্য! আমার তো মনেই ছিল না শরীর খারাপের কথা! একদম সুস্থ আমি এখন। কী হয়েছিল, কে জানে!’
তুহিন অর্পণের পিঠে হাত রাখে, ‘আমি বুঝেছি। তোমার গরমে শরীর খারাপ লাগছিল। চড়া রোদ উঠেছে। অনেকটা সময় ট্রেনে এসেছ। বাড়িতে চলো। স্নান করে খেয়ে ঘুম দেবে। তারপর বেশ আড্ডা হবে। চলো না একবার। দেখবে কত মজা।’
সত্যি। কী যে হয়েছিল অর্পণের! মাথামুন্ডু নেই। ঝট করে কী হয়ে গেল!
ওরা সেনবাড়ির সামনে এগিয়ে গিয়েছে। অর্পণের মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ ভেসে এল যেন। দুর্গাপুজোর ধূপধুনোর গন্ধে মন প্রফুল্ল হয়ে উঠল। তুহিন ওকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে ডানদিকের বিরাট বাড়িটা দেখিয়ে বলল, ‘ওটাই হল অখিলজেঠার বাড়ি। ওদিকেই পুজো হচ্ছে। এখন আমাদের বাড়িতে চলো। ঠান্ডা হয়ে এখানে আসবে।’
সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে ওরা এসে পৌঁছল গাছপালায় ঘেরা একটি বাড়িতে। লোকজনে গমগম বাড়িটাই তুহিনদের বাড়ি। তুহিনের আওয়াজ পেয়ে এইসা মোটা একটি লোক বাঁদিকের উঁচু বারান্দায় এসে দাঁড়াল, ‘হিরো এলেন তুহিন? যার জন্য গতকাল থেকেই উদগ্রীব হয়েছিলে? আরে ভাই, এসো, এসো। গ্রামের পুজো দেখ।’
আপ্যায়নে মন ভরে গেল অর্পণের। তুহিন বলল, ‘অর্পণ, এই হলেন সজলদা। থাকেন নর্থবেঙ্গলে। ফালাকাটায়। তুমি সজলদার পাশের ঘরে থাকো। আমিও তোমার সঙ্গে থাকব।’
অর্পণ তুহিনের পিছন পিছন দুটো সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরে ঢুকে পড়ল। বেশ বড় ঘর। দেওয়ালে পরপর দুটো জানলা। ঘরের দুপাশে দুটো খাট। বিছানা টানটান। সুতোর ফুল তোলা বালিশ। গায়ে দেওয়ার জন্য হালকা কাঁথা পায়ের কাছে ভাঁজ করা। ঘরের এক কোণে কাঠের আলনা। একটা টেবিলের ওপরে কাচের জলের জগে টলটলে জল।
জল দেখেই তেষ্টা টের পেল অর্পণ। বলতেই তুহিন কাচের গ্লাসে ভরে দিল জল। ঠান্ডা জল গলা বেয়ে নেমে যাচ্ছে হৃদয় শীতল করে। অর্পণ বলল, ‘তোমার সোনা মা কেমন আছেন?’
তুহিন অবাক হল, ‘সোনা মার কথা বলেছিলাম বুঝি? এখন খুব ভালো আছে সোনা মা। বয়স হয়েছে, মাঝে মাঝে অসুস্থ থাকে। তুমি রেস্ট নিয়ে নাও। সোনা মার ঘরে নিয়ে যাব। তার আগে আমার মা, বাবা আর দিদির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব।’
উঠোন পেরিয়ে আতাগাছের পাশ দিয়ে গিয়ে বড় বড় দুটো বাথরুম। টয়লেট আলাদা। এটাচড ওয়াশরুম নেই এখানে। তোয়ালে, পাঞ্জাবি পায়জামা নিয়ে স্নান ঘরে গেল অর্পণ। তুহিন সব বুঝিয়ে দিয়ে কোথায় একটা গেল। সেই অবসরে ফ্রেস হয়ে নিল অর্পণ।
সজলদা সাতসকালেই স্নান সেরে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি পরে বারান্দায় উদগ্রীব ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। অর্পণের চিরুণি হাত থেকে পড়ে যেতে ও নিচু হয়ে তুলতে গিয়ে থমকে গেল। খাটের ঠিক নীচে একটা ট্রাঙ্ক। একমুহূর্তের জন্য অর্পণের মনে হল ট্রাঙ্কটা ওর চেনা। খুব চেনা। তখনই শরীর কেমন করে উঠল। যেন সোঁদা গন্ধে ভরে যাচ্ছে ঘরটা। বিশ্রী গন্ধে মাথা ঘুরছে ওর। তাড়াতাড়ি করে মাথা তুলে নিল। চিরুনিটা তোলা হল না। সত্যি বলতে নিচু হতে ওর মানসিকভাবে অসুবিধে হচ্ছিল। ভয় হচ্ছিল। ট্রাঙ্কটা দেখে ফেলার ভয়।
তুহিন ডাকছে বাইরে, ‘অর্পণ এসো, এসো। খাবার দেওয়া হয়েছে। পঞ্চমীতে আমাদের বাড়িতে নিরামিষ হয়। নবমীর আগে আমিষ হবে না। এখন দুপুর হয়ে গিয়েছে। খেয়ে নিয়ে রেস্ট নাও।’
অর্পণ গিয়ে দেখে টেবিল পাতা হয়েছে বেশ কয়েকটি। খেতে বসেছেন সবাই। হাসাহাসি, কথাবার্তা চলছে। ওখানেই বাড়ির সকলের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল তুহিন। অখিলজেঠুকে প্রণাম করে উঠতেই পাশে দাঁড়ানো লম্বা ফর্সা বয়স্ক ভদ্রলোককে দেখে মনে পড়ল ইনি হলেন দীপেনকাকা। মুম্বাইতে থাকেন।
খাওয়াদাওয়ার পরে তুহিনের সঙ্গেই ঘরে এল অর্পণ। দুটো খাটে দুজন শুয়ে পড়ল। ঘরটা বেশ ঠান্ডা। খোলা জানলা দিয়ে হু হু করে হাওয়া আসছে। ঘরে ফ্যান ঘুরছে ঠিকই, কিন্তু অর্পণের মনে হচ্ছিল ফ্যান না থাকলেও চলতো। তুহিন শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছে। নতুন জায়গা বলে অর্পণের ঘুমোতে সময় লাগছিল। খোলা জানলার দিকে তাকিয়ে দেখছিল। তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে কখন।
ছেলেটা ডাকছে ওকে। বাইরে থেকে জানলায় মুখ চেপে ধরে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে অর্পণকে ডাকছে। প্রথমে ডাক শুনতে পায়নি অর্পণ। তাকিয়ে দেখে শ্যামলা চেহারার ছেলেটি চারপাশে তাকিয়ে দেখে ওকে ডাকছে। অর্পণ অবাক হল, ‘কী ব্যাপার? কে তুমি?’
অমনি ছেলেটা ভালো করে অর্পণকে দেখল। যেন অর্পণকে আগে দেখেনি, সেই ভাব ছেলেটার চোখেমুখে ফুটে উঠছিল। হয়তো তুহিনকে খুঁজছিল ও। অর্পণকে দেখে অবাক হয়েছে। এমনভাবে দেখছে, যেন বহুদিন পরে নিকটাত্মীয় কে দেখে মানুষ। দেখতে দেখতে ছেলেটির দৃষ্টি সহজ হয়ে এল। তারপর অর্পণের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত হাসি হাসল ছেলেটি। হাতছানি দিয়ে ডাকল। ইশারায় বাইরে যেতে বলছে। অর্পণের ইচ্ছে হল ছেলেটির কাছে যাবে বাইরে। বিছানা থেকে উঠে জানলা পর্যন্ত যেতে পারছিল না অর্পণ। পায়ে পা বেঁধে যাচ্ছে। ও তুহিনকে ডাকবে, সে কথা মনেই পড়ল না। জানলা দিয়ে ছেলেটি ওকে তাড়া দিচ্ছে তাড়াতাড়ি করে বের হওয়ার জন্য। কী একটা দেখাতে চায় ও অর্পণকে। আঙুল তুলে বাইরের দিকের কোন একটা দিকে বারবার দেখাচ্ছে।
অর্পণ ছেলেটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে দিতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল। আর দুম করে হাতটা গিয়ে পড়ল খাটের বাইরে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুম ভেঙে গেল অর্পণের। প্রথমে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আস্তে আস্তে সমে ফিরছিল অর্পণ। জানলার দিকে তাকিয়ে রইল খানিকক্ষণ। ওই জানলাটা ওকে তীব্র আকর্ষণ করছে। কী এক অমোঘ আকর্ষণে বিছানা থেকে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল অর্পণ। কে ছেলেটা? কেন ডাকছিল ওকে?
বাইরে বিকেল নেমে এসেছে। দুর্গামণ্ডপে ঢাক বাজছে। ধুনোর গন্ধ আসছে গাছপালার ফাঁকফোকর দিয়ে। এদিকে মানুষজন দেখতে পাচ্ছে না অর্পণ। বাড়ির পিছনদিক এদিকটা। গাছপালায় ভরে আছে। কোথা থেকে শিউলি ফুলের গন্ধ আসছে। সব খুব চেনা দৃশ্য। ওদের আসানসোলের বাড়িতেও শিউলিগাছ আছে। পুজো হয় আশেপাশে। ছোট থেকেই দেখেছে এসব। কিন্তু, এখানে এসে এমন লাগছে কেন? শিউলির গন্ধে মন ভারাক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। মন খারাপ লাগছে। কেন?
‘উঠে পড়েছ? আমি এত ঘুমিয়েছি...। চলো, চা খেয়ে নিয়ে মণ্ডপে যাই। ষষ্ঠীপুজো শুরু হয়ে যাবে আর খানিক পরেই। তার আগে দেবীকে সাজানো হবে। চলো।’
দুজনে বেরিয়ে পড়ল। দরজায় তালা এঁটে দিল তুহিন, ‘এখানে এখন অনেক রকম লোকজনের যাতায়াত চলবে। জিনিসপত্র আছে ঘরে। তাই...।’
‘জানলা বন্ধ করলে না?’
‘জানলা? লোহার গরাদ আছে। এদিকে ভয় নেই। তবে, খানিক পরে এসে আমি জানলা বন্ধ করে দেব। তুমি বললে যখন, মন খচখচ করছে।’
যেতে যেতে অর্পণ বলল, ‘তোমাদের বাড়িতে ছোট ছেলে আছে কেউ? শ্যামলা রঙ, বড় বড় চোখ, কোঁকড়া চুল?’
অবাক হয়ে গেল তুহিন, ‘না তো! বাইরের কেউ এসেছিল নাকি?’
লজ্জা পেয়ে অর্পণ বলল, ‘আসলে আমি স্বপ্ন দেখছিলাম। একটি বছর পনেরোর ছেলে জানলা দিয়ে আমাকে ডাকছে। ভারি মিষ্টি হাসি। স্বপ্নের কথা আর বলো না ভাই।’ হেসে উঠেছে অর্পণ, ‘আচ্ছা, খাটের নীচে ট্রাঙ্কে দামী কিছু নেই তো?’
ট্রাঙ্ক? তুহিন প্রথমে অবাক হয়ে তাকাল, তারপর কিছু মনে পড়াতে বলল, ‘দামী নয়। কিছু পুরোনো জামাকাপড় আছে। নীপুদাদার জামাকাপড়। দামী নয়।’
তুহিন কী ভাবতে ভাবতে নাক টেনে শ্বাস নিল, ‘শিউলির গন্ধ আসছে।’
রাতে তুহিন বলল, ‘সোনা মা অনেক রাতে মণ্ডপে আসে। তখন দেখা করবে? অবশ্য ঘুম পেয়ে থাকলে চলো ঘুমোতে।’
দুপুরে অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ঘুমের ভাব নেই। এই ফাঁকে সোনা মার সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে ভালোই হয়। তুহিনের অখিলজেঠুর দাদার স্ত্রী হলেন সোনা মা। তিনি কারো সঙ্গে কথাবার্তা বলেন না বেশি। নিজের মনে থাকেন। পুজোপাঠ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সারাক্ষণ বারান্দায় আরামকেদারায় বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে আকাশপাতাল ভাবেন। মাঝে অসুস্থ হয়েছিলেন। তুহিন বলেছিল সেকথা। এখন নাকি ভালো আছেন। এখানে এসে তুহিনের সোনা মার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে হয়েছিল অর্পণের।
অখিলজেঠুর দাদা কোথায় থাকেন? তাঁকে তো দেখতে পায়নি অর্পণ।
‘নিখিলজেঠু বহুদিন হল মারা গিয়েছেন। কুড়ি বছর হল প্রায়। স্ট্রোক হয়েছিল। সোনা মার বয়স হয়েছে। ঠিকঠাক খাওয়াদাওয়া করেন না। একটি মেয়ে সারাক্ষণ দেখাশোনা করে। অখিলজেঠুই সোনা মার দেখাশোনা করেন। জেঠু ভালো মানুষ। সোনা মার কোনও অভাব রাখেননি জেঠু জেঠিমা।’
খানিকপরেই মণ্ডপে গেল দুজনে। দুজন ঢাকি বসে ঝিমোচ্ছিল। ওদের দেখে ফের ঝিমোতে লাগল। আর তখনই মা দুর্গার সামনে উপবিষ্টা একজনকে দেখে ফেলেছে অর্পণ। তিনিই সোনা মা?
ধবধবে সাদা শাড়ি, পাকা চুলের কোনওরকমে বেঁধে রাখা খোঁপা, মা দুর্গার দিকে অনিমেষে তাকিয়ে থাকা বয়স্কা মহিলাকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেল অর্পণ। মুখে কথা নেই, দু’চোখ বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা।
তুহিন ঠোঁটে আঙুল দিল। চুপ। এখন কথা নয়। কোনও শব্দ নয়।
ওরা নিঃশব্দে সোনা মার পিছনে গিয়ে দাঁড়াল। খানিকক্ষণ পরে সোনা মা চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াতেই তুহিন ডাকল, ‘সোনা মা!’
চমকে তাকালেন না। এমনই ধীরে মাথা ঘুরিয়ে দেখলে তুহিনকে। তুহিনের পাশে অর্পণকে দেখে একটু তাকিয়ে থাকলেন। ফের তুহিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঘুমোওনি কেন?’
‘ঘুম আসছে না সোনা মা। তাই আমার বন্ধু অর্পণকে বললাম মণ্ডপে গিয়ে ঘুরে আসি। এসে দেখি, তুমি আছ। শব্দ করিনি।’
সোনা মা কথা না বলে মণ্ডপ থেকে নেমে যাচ্ছিলেন, অর্পণের মনে হল প্রণাম করা উচিত। কিন্তু দেবতার সামনে মানুষকে নাকি প্রণাম করতে নেই। ও সোনা মার মণ্ডপ থেকে নেমে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করল। তারপর পিছন পিছন নেমে পড়ল। ডেকে বলল, ‘সোনা মা, আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল। প্রণাম করব।’
সোনা মা ভারি অন্যমনস্ক চোখে অর্পণের দিকে তাকালেন। অর্পণের মনে হল সোনা মায়ের দৃষ্টি ওকে ছাড়িয়ে কোথায় উধাও হয়ে গিয়েছে। তিনি অর্পণকে দেখেও যেন দেখতে পাচ্ছেন না। যেন...যেন অন্য এক জগতের বাসিন্দা সোনা মা।
অর্পণ ঝুঁকে সোনা মায়ের পায়ে হাত ঠেকাতেই সোনা মা অদ্ভুত একটা চিৎকার করে উঠলেন। চিৎকার শুনে আতঙ্কে দু-পা পিছিয়ে গেল অর্পণ। তুহিন ছুটে মণ্ডপ থেকে নেমে এলো, ‘কী হল সোনা মা?’
‘এ কে রে? কোথা থেকে এসেছে? ও কে? আমাকে স্পর্শ করেছে, মনে হল শক লেগেছে পায়ে। কে এ?’ সোনা মা হাঁপাচ্ছেন।
অর্পণ সংকুচিত হয়ে গেল। ও কিচ্ছু করেনি। স্রেফ সোনা মায়ের পায়ে হাত ঠেকিয়েছিল মাত্র। সোনা মা ভীষণ কাঁপছেন। তুহিন একটু বিব্রত হয়ে পড়ল, ‘তুমি ঘরে যেতে পারবে অর্পণ? তাহলে চলে যাও। আমি সোনা মাকে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আসছি। কী হল হঠাৎ করে, কে জানে!’ বলতে বলতে রোরুদ্যমানা সোনা মাকে ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তুহিন। অর্পণের বুক ভেঙে যাচ্ছিল সোনা মাকে দেখে। তুহিনের বুকের কাছে শিশুর মতো লুকিয়ে আছেন যেন!
খুব আশ্চর্য হয়ে গেল অর্পণ। কেন সোনা মা এমন অপ্রকৃতিস্থ? স্বামীর মৃত্যুর জন্য? মৃত্যু অবশ্যই দুঃখের, সন্দেহ নেই। কিন্তু তার জন্য এমন অস্বাভাবিক হয়ে যাওয়াটা আরও অদ্ভুত।
অর্পণ ঘরে ঢুকে তুহিনের জন্য অপেক্ষা করছিল। আধঘণ্টা পরে তুহিন। একটু ফ্যাকাশে লাগছে তুহিনকে। এসে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল। ওদিকে আলোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু তুহিন অন্যমনস্ক বলে সুইচ অন করেনি। অর্পণ ব্যাপারটা খেয়াল করে আলো জ্বালিয়ে দিল। সাপখোপ থাকতে পারে।
খানিক পরে তুহিন এল। চোখেমুখে জল দিয়ে এসেছে। একটু ফ্রেস লাগছে ওকে। কিন্তু, ও সোনা মায়ের এরকম আচরণের জন্য বিব্রত হল কেন? কোনও রহস্য কি লুকিয়ে আছে সোনা মায়ের মধ্যে?
তুহিন দরজা বন্ধ করে জানলাও বন্ধ করে দিল। সোঁদা বাতাস আসছিল জানলা দিয়ে। এই গন্ধটা সহ্য করতে পারছে না অর্পণ। জানলা বন্ধ করার পরে গন্ধটা ফিকে হয়ে ঘরে। শ্বাস নিতে সুবিধে হচ্ছিল অর্পণের। তুহিন বলল, ‘আজ তুমি আশ্চর্য হয়েছ তো? আমিও আশ্চর্য হয়েছি। সোনা মাকে কখনো এরকম ভাবে অস্থির হতে দেখিনি। যেদিন নীপুদাদা হারিয়ে গেল, সেদিন থেকে সোনা মা আশ্চর্য রকমের নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে। বাষট্টি বছরের সোনা মাকে দেখে মনে হয় পঁচাত্তর বছরের বৃদ্ধা। নীপুকে হারিয়ে এরকম হয়ে গিয়েছে। ছেলেকে হারিয়ে ফেলার শোক সহ্য করতে না পেরে বড়জেঠা নিখিলচন্দ্র সেন মাত্র চল্লিশ বছরে মারা যান। সেই শোকও সোনা মাকে সর্বহারা করে দিয়েছে।’
অর্পণ আগ্রহী হল, ‘নীপুদাদা হারিয়ে গিয়েছিল কী করে?’
‘আমি তখনও জন্মাইনি। পরে শুনেছি, বাশুলির মেলায় গিয়েছিল চোদ্দো বছরের নীপুদাদা। সঙ্গে গিয়েছিল দারোয়ান লক্ষ্মীন্দর। বিকেলের দিকে সে ছুটতে ছুটতে এসে বাড়িতে জানায় যে নীপুদাদাকে পাওয়া যাচ্ছে না। এক জায়গায় ম্যাজিক দেখানো হচ্ছিল। সেখানেই দাঁড়িয়েছিল নীপুদাদা। দারোয়ান এদিক তাকিয়ে দেখতে দেখতে একসময় খেয়াল করে যে ম্যাজিকের ওখানে নীপুদাদাকে আর দেখা যাচ্ছে না। সেই যে হারিয়ে গেল, আর ফিরে আসেনি সে। সোনা মা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। সেই থেকে এই অবস্থা চলছে। কিন্তু আজ তোমার স্পর্শ পেয়ে তিনি কেন অমন করে বেসামাল হয়ে পড়লেন, কে জানে। তোমাকে তাঁর ঘরে নিয়ে যেতে বলেছেন কাল। যাবে?’
অর্পণের কাছে সবটাই ধোঁয়াটে। একটা জিনিস বুঝেছে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন সোনা মা। ও ঘরে গেলে যদি খুশি হন, তাহলে নিশ্চয় যাবে অর্পণ।
তুহিন শুয়ে পড়েছে, ‘ঘুমিয়ে পড়ো। কাল ভোরে উঠতে হবে।’
অর্পণ ভাবল, ভোরে উঠে ও কী বা করবে? মর্নি ওয়াকে গেলে হয়। গ্রামটা ঘুরে দেখা যাবে।
ভোরে ঢাকের আওয়াজ কানে আসতেই উঠে পড়েছে অর্পণ। তুহিন অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ওকে ডিস্টার্ব না করে নিজেই ঘর থেকে বেরিয়ে এল অর্পণ।
এখনও রাতের আভাস রয়ে গিয়েছে গাছের পাতায়, বাড়িঘরের গায়ে। মণ্ডপে ঢাক বাজছে মানে পুজো শুরু হয়েছে বা হবে। অর্পণ মণ্ডপের দিকে গেল। তুহিনদের বাড়ির থেকে অখিলজেঠার বাড়ি একটু ঘুরপথ। অর্পণ মণ্ডপে গিয়ে দেখল, সজলদা কলাপাতা কেটে রাখছে ছোট ছোট করে। ওকে দেখে বলল, ‘ঘুম ভেঙে গেল? এত তাড়াতাড়ি না উঠলেও হতো। তুমি ভাই একটু এদিক ওদিক ঘুরে আসতে পারো। বেশিদূরে যেও না ভাইটি। নতুন জায়গায় হারিয়ে গেলে আবার থানা পুলিশ...।’ বলে হেসে উঠতে গিয়ে ঝট করে থেমে গেল। জিভ কেটে বলল, ‘কিছু মনে করো না ভাই। এই বাড়িতে হারিয়ে যাওয়ার কথা বলতে নেই। মুখ ফসকে বলে ফেলেছি। যাও, তুমি বেড়িয়ে এসো। তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।’
অর্পণ বাড়ির মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে বাঁ-দিকে হাঁটতে শুরু করল। খানিকটা যাওয়ার পরে চেনা ঠেকল রাস্তাটা। এদিক দিয়েই এসেছিল স্টেশন থেকে নেমে। এদিকেই বাজার। আচ্ছা, এখানে আর কোনও পুজো হয় না? হয় নিশ্চয়। কে জানে কোথায় হয়। তুহিন সঙ্গে থাকলে ও বলে দিতে পারত।
অর্পণ বাজার ছাড়িয়ে আরও খানিকটা যেতেই একটা লোকের সঙ্গে দেখা পেল। লোকটা একটা শাটার টানা দোকানের বারান্দায় বসে আছে। হাঁটু পর্যন্ত কাটা পা। কেউ বসিয়ে রেখে গিয়েছে নিশ্চয়। একা এভাবে বাজারের মধ্যে এসে বসা অসম্ভব। কিন্তু এত ভোরে কে রেখে গেল? মুখটা বিষাদে আচ্ছন্ন। কালশিটে পড়া মুখের কুঞ্চিত চামড়ায় এমন একটা ভয়ংকর ব্যাপার আছে, দেখলে থমকে দাঁড়াতে হয়। অর্পণ দাঁড়াল বটে, কিন্তু লোকটি অর্পণের দিকে তাকিয়েও দেখল না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রয়েছে।
অর্পণ চলে যাবে বলে পা বাড়িয়েছে, অমনি লোকটি মুখ ফেরাল। অর্পণ লোকটির চোখের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠল ভিতরে ভিতরে। কী অদ্ভুত দৃষ্টি! যেন নরকের কীট! সাপের দৃষ্টি।
অর্পণ তাড়াতাড়ি করে মুখ সরিয়ে পা বাড়ায়। ওর মনে পড়ল একজন কুখ্যাত পার্টি নেতার কথা। বিপক্ষের বাড়িকে সন্ধের অন্ধকারে পুড়িয়ে দিয়েছিল সেই নেতা। বাড়িসুদ্ধ সকলেই পুড়ে ঝামা। বছর দশেকের মেয়েটিকে প্রাইভেট পড়াতে এসেছিলেন একজন মাস্টারমশাই। তিনিও রেহাই পাননি। বাড়ি থেকে কেউ বের হতে পারেনি। বাড়ির চারপাশ ঘিরে রাখা হয়েছিল, যাতে কেউ পালাতে না পারে। সেই নেতার বয়স্ক অবস্থার ছবি দেখেছিল অর্পণ। পঙ্গু, ঘাড় হেলে আছে একপাশে। কথা বলার ক্ষমতা নেই। আজ এই লোকটিকে দেখে সেই নেতার চোখের দৃষ্টি মনে পড়ল। কোথায় বসে কে ঠিক হিসেব রেখে চলেছেন। পার পেতে পারবে না কেউ।
পা বাড়িয়েছে, অমনি সেই লোকটি ফ্যাঁসফেঁসে গলায় বলল, ‘কিছু খেতে দে। খিদে বড্ড।’
অর্পণ বিপাকে পড়ল। এখানে খাবার কোথায় পাবে ও? বাজার খোলেনি এখনও। সেই কথাটাই বলতে এগিয়েছে সামান্য। লোকটি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘মারিস না, মারিস না। খাবার দিতে হবে না। যা। যা।’
বিস্ময়ে হতবাক হওয়ার জোগাড় অর্পণের। ও ওখান থেকে তাড়াতাড়ি করে সরে পড়তেই চাইল। নতুন জায়গা। এখানে কোনওরকম ঝামেলায় পড়তে চায় না অর্পণ।
জোরে পা চালিয়েছিল। মন বিমূঢ় হয়ে আছে। সাতসকালে এরকম একজনের দেখা পেয়ে মুড নষ্ট হয়ে গেল।
সোঁদা গন্ধটা উড়ে আসছে। গা গোলানো গন্ধে সেই প্রথম দিনের মতো ভমিটিং টেন্ডেন্সি হচ্ছে। অর্পণ নিজেকে মনের জোরে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছিল। এই মাঠের কাছাকাছি আসতেই অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। মন বলছে ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু শরীর এগিয়ে যাচ্ছে মাঠের দিকে। ও নিজেকে আটকাতে পারছে না। এগিয়ে যেতে যেতে মাঠে নেমে পড়েছে অর্পণ। ধু ধু মাঠ। রাতে বৃষ্টি হয়েছে বলে ঘাস ভিজে আছে জবজবে হয়ে। অনেকটা দূরে কুয়াশা যেন স্থির হয়ে আছে। অর্পণের মন বলছে ওদিকে যেতে হবে। ওখানে যেতেই হবে ওকে।
অর্পণ কি যাচ্ছে? নাকি ওকে কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে ওদিকে? ইচ্ছে অনিচ্ছের চাপাচাপি নেই। কিচ্ছু নেই। অদ্ভুত ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ও একতাল কুয়াশার দিকে। ওই কুয়াশাই কি টেনে নিচ্ছে অর্পণকে?
কুয়াশা ফুঁড়ে বেরিয়ে এল একটি ছেলে। অর্পণ চমকে গেল। সে-ই ছেলেটি? জানলা দিয়ে অর্পণকে ডেকেছিল। কিন্তু, সেটা তো স্বপ্ন ছিল। সত্যি করে কি ছেলেটি গিয়ে জানলায় দাঁড়িয়েছিল! নাকি, আজ দেখা হবে বলে সেদিন ভবিষ্যতের ছবিটা দেখেছিল অর্পণ?
কুয়াশার ভিতর দিয়ে বেরিয়ে এসে অর্পণকে একই রকম ভাবে হাতছানি দিয়ে ডাকল। একমুখ হাসি তার। এই ভোরে একটা শার্ট পরে আছে। আকাশ রঙের শার্ট। সে একমুঠো শিউলির মতো হাসল। অর্পণ তার কাছাকাছি হতেই সে সরে গেল পিছনে। ফের হাতছানি দিয়ে ডাকল। একটু করে পিছিয়ে যাচ্ছে, হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
অর্পণের মাথা কাজ করছিল না। ও ছেলেটির ইশারা অনুযায়ী হেঁটে যাচ্ছে। কে ছেলেটি, কেন ওকে ডাকছে, কোনও প্রশ্ন আসছে না অর্পণের মধ্যে। ও সম্মোহিতের মতো এগিয়ে যাচ্ছে।
এক জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল ছেলেটি। কুয়াশা এখানে অসম্ভব ঘন। কুয়াশার মধ্যে মিশে যাচ্ছে ছেলেটি। ওকে মাঝে মাঝে স্পষ্ট করে দেখা যাচ্ছে না। অর্পণ ওকে দেখার জন্যই আরও এগিয়ে গেল। এক জায়গায় গিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। বিষাদাচ্ছন্ন মুখে ছেলেটি তাকিয়ে রইল অর্পণের দিকে।
অর্পণ বুঝতে পারছে না ছেলেটি কথা বলছে না কেন? অর্পণের ইচ্ছে হল ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে। কথা বলতে যেতেই দেখতে পেল ছেলেটি মাটির দিকে মুখ নিচু করে কী দেখাচ্ছে। অর্পণ সেদিকে তাকাতেই আতঙ্ক জাপটে ধরল ওকে। জল কাদার মধ্যে একটা নরকরোটি দেখা যাচ্ছে।
অর্পণ চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘কী সর্বনাশ! এখানে এটা কী?’
ওর কথার জবাব দেওয়ার জন্য কেউ বসে নেই। হু-হু করে বয়ে যাচ্ছিল মাঠের ওপর দিয়ে। অর্পণ পিছন ফিরে ছুটতে শুরু করেছে। মুখে চিৎকার করে চলেছে, ‘তুহিন, তুহিন’করে। বাজারের ওপর দিয়ে ছুটছে, দোকানের বারান্দায় বসে থাকা লোকটি কুতকুতে চোখ দিয়ে দেখছে ছুটন্ত অর্পণকে। হে হে হাসতে হাসতে একহাত তুলে বলল, ‘কী হল? ভূত দেখলে নাকি?’
জবাব দেওয়ার জন্য দাঁড়াতে পারল না অর্পণ। তুহিনকে ডাকার জন্য ফোন যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সে কথা মাথায় ছিল না অর্পণের। বাড়িতে ঢোকার মুখে দেখা হয়ে গেল তুহিনের সঙ্গে। তুহিন পাটখড়ির বান্ডিল নিয়ে মণ্ডপের দিকে যাচ্ছিল। অর্পণকে ওভাবে আসতে দেখে বিস্ময়ে থমকে দাঁড়াল, ‘অর্পণ, কী হল? কী হয়েছে?’
অর্পণ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল, ‘তুহিন, তুহিন, মাঠের মধ্যে একটা মানুষের মাথার খুলি! জলে কাদায় ডুবে আছে। ওখানে কি কবর ছিল কখনও? চলো, দেখবে চলো।’
ওরা দুজনেই ছুটেছে মাঠের দিকে। সজলদা কিছু না বুঝেই ওদের পিছু নিয়েছে। মাঠের দিকে যেতে বাজারের ওপরে শাটার টানা দোকানের সামনে পঙ্গু লোকটিকে একই ভাবে বসে থাকতে দেখল অর্পণ। বাজারে এখনও সব দোকান খোলেনি। দু’চারটে দোকান খুলেছে। চায়ের দোকানে দুটো লোক দাঁড়িয়ে আছে। ওদের ছুটতে দেখে সবাই তাকিয়ে দেখছিল। একজন তুহিনকে ডাকল, ‘কী হয়েছে তুহিন?’
তুহিন হাত নেড়ে ‘পরে বলব’ ভাব করে ছুটছিল।
মাঠের মধ্যে অপার নীরবতা। ভোরের আমেজ এখনও স্থির হয়ে আছে মাঠ জুড়ে। মাঠের শেষ সীমায় কুয়াশা। অর্পণ আঙুল তুলে ওদিকটা দেখাল,’ ওখানে, ওখানে দেখেছি।’
মাঠের শেষ সীমায় অনেকটা জায়গা জুড়ে কাদাজল জমে আছে। থকথকে কাদা। এরপরেই নলবন। দেখেই বোঝা যায়, একসময় মাঠ জুড়ে ছিল এই নলবন। মাঠের এদিকে কেউ কখনও আসে বলে মনে হয় না। একটা ভ্যাপসা গন্ধ আসছে কাদাজল থেকে। অর্পণ কাদাজলের দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘ওখানে দেখেছি। ওই যে, ওখানে।’
তুহিন নিচু হয়ে দেখতে চেষ্টা করল। হ্যাঁ। একটা মানুষের করোটির খানিকটা দেখা যাচ্ছে। পিছন থেকে এসে হাঁপাচ্ছে সজলদা, ‘কী সর্বনাশ! মানুষের মাথা? এখানে কবর ছিল বলে তো শুনিনি। কম দিন তো আসছি না সুন্দরপুরে।’
‘অর্পণ, থানায় জানাই। দাঁড়াও, ফোন করি।’
পুলিশ আসতে আসতে মোটামুটি ভিড় জমে গেল মাঠের মধ্যে। দুজন জমাদার কাদাজলের ভিতর থেকে করোটি বের করতে গিয়ে মুখ তুলে তাকাল, ‘স্যার, এখানে পুরো বডি আছে। কিন্তু আস্ত নেই। আরও একজন লোক লাগবে।’
অবশেষে মাটি খুঁড়ে একটি কঙ্কালের ভগ্ন অংশ বের হল। প্লাস্টিক শিটের মধ্যে সবটুকু তুলে আনা হল।
পায়ের হাড়, পাঁজরের হাড়, হাত...। দেখতে দেখতে শরীর কাঁপতে শুরু করেছে অর্পণের। দম আটকে আসছে ওর। এই কাদাজলে ডুবে থাকতে থাকতে কী প্রবল কষ্ট হয়েছিল মানুষটার!
আচমকা অর্পণ চিৎকার করে ওঠে, ‘গলা টিপে মেরেছিল। গলা টিপে...। তারপর এখানে পুঁতে দিয়েছিল। আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। খুব কষ্ট...।’ বলতে বলতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল অর্পণ।
চোখ মেলে সোনা মাকে দেখতে পেল অর্পণ। সোনা মা ওর হাত ধরে বসে আছেন পাশে। ওকে তাকাতে দেখে সোনা মা আকুল স্বরে বলে উঠলেন, ‘কেমন আছো বাবা?’
কিছু বুঝতে পারছিল না অর্পণ। মনে আছে ও মাঠে গিয়েছিল। তারপর কী হল?
‘একটা নরকঙ্কাল বেরিয়েছে অর্পণ। একটা ভয়ংকর ঘটনা সামনে এল বোধহয়। কেন যেন মনে হচ্ছে বিরাট রহস্য জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। তুমি চিৎকার করেছিলে কেন, ‘গলা টিপে মেরেছিল, বলে? কে মেরেছিল? কাকে? তোমার খুব কষ্ট হয়েছিল বলেছ। তুমি কেন কষ্ট পেয়েছিলে?’
সোনা মা ফিসফিস করেন, ‘কে তুমি? আমার নীপু? ফিরে এসেছ আমার কাছে?’
মাথায় কিছু আসছে না। অসহ্য ব্যথা করছে মাথায়। অর্পণ কপাল টিপে ধরে বলল, ‘আমার কিছু মনে নেই সোনা মা। কিছু মনে নেই। কী বলছেন আপনারা, আমার কিছু মনে নেই।’
তুহিন বলল, ‘এই ঘটনার ওপরে তদন্ত হবে। আমাদের সন্দেহ, ওটা নীপুদাদার কঙ্কাল। অনেকবছর আগে নীপুদাদা হারিয়ে গিয়েছিল। ওর সঙ্গে ছিল লক্ষ্মীন্দর। একমাত্র সে বলতে পারে আসল ঘটনা কী। লক্ষ্মীন্দরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে থানায় নিয়ে গিয়েছে পুলিশ। আমরাই কেসটা করছি। অনেক পুরোনো কেস, আবার ওপেন হচ্ছে। সেদিন নীপুদাদাকে মেরে ফেলেছিল কেউ। কে? নতুন করে কেস শুরু হচ্ছে। কার স্বার্থ ছিল নীপুদাদার মৃত্যুতে?’
মণ্ডপে ঢাক বাজছে। তুহিন বলল, ‘মা দুর্গা সব জুড়ে দেবেন। মণ্ডপে চলো অর্পণ।’
সোনা মা ওকে ছাড়ছেন না। সঙ্গে চললেন। বাড়ির মধ্যে যেন ঝড় বয়ে গিয়েছে। তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে সব। অখিলজেঠা অন্ধকার মুখে পায়চারি করছিলেন। ওদের দেখে বিরক্ত মুখে তাকালেন, ‘এসব কী হচ্ছে? কোথায় একটা কঙ্কাল পেলে, তা নিয়ে যতসব বাজে ধারণা করে পুজোর বারোটা বাজাতে চাও? চল্লিশ বছর আগে এই বাড়ি থেকে একজন হারিয়ে গিয়েছে। তাকে কেউ তুলে নিয়ে গিয়েছিল। ছেলেধরা ছিল সে সময় হাটে বাজারে। কেন মেরে মাঠে পুঁতে রাখবে? আমি থানায় কথা বলছি। এসব কেস নতুন করে তুলে পরিবারের মধ্যে ঝামেলা বাধিও না তুহিন।’
সোনা মা ঝট করে ঘুরে তাকালেন, ‘আমি বলেছি কেস ওপেন করতে। আমার নীপু হারিয়ে যায়নি অখিল। তাকে মেরে ফেলে হয়েছিল। নইলে বড়ভাইয়ের সম্পত্তি তুমি ভোগ করতে কী করে? সব নিয়েছ। আমি স্বামী-পুত্র হারা হয়ে বেঁচে আছি। ভেবেছ কিছু বুঝি না?’
তুহিন সোনা মাকে টেনে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল মণ্ডপের দিকে। তখনই থানা থেকে ফোন এল। সোনা মাকে নিয়ে থানায় যেতে হবে। কঙ্কালের হাতের আঙুলে সোনার আংটি পাওয়া গিয়েছে। ওটা সনাক্ত করতে হবে।
একটা হাতের অংশবিশেষ রাখা আছে টেবিলের ওপরে ট্রের ওপরে। পাশেই রাখা একটি আংটি। বাচ্চা বয়সের হাতের অনামিকায় ছিল আংটিটা। বাম হাতে।
সোনা মা কম্পিত পায়ে এগিয়ে গেলেন। ভালো করে আংটিটা দেখলেন। তারপরই কান্নায় ভেঙে পড়লেন, ‘আংটির গায়ে এন লেখা আছে। এন। নৃপেন্দ্র। আমার নীপুর তেরো বছরের জন্মদিনে এই আংটিই দিয়েছিল ওর বাবা।’
ফিরে যাচ্ছে অর্পণ। আসানসোলে মা, বাবার কাছে যাচ্ছে। কী একটা মনে পড়ি পড়ি করেও মনে পড়ে না। অথচ মন আপ্লুত হয়ে আছে কোন এক অজানা আকর্ষণের মায়াবী ছায়ায়। এক জন্ম থেকে আরেক জন্ম। কত জন্ম পেরিয়ে আসতে হয়। কোথাও রেখে আসা প্রিয় মানুষ, প্রিয় খেলা, প্রিয় জিনিস। এক মুহূর্তের মধ্যে অন্য জন্মের দিকে পাড়ি দিতে হয়। হয়তো অবেলায় রওনা হওয়া। তখনও মায়ের বুকের ঘ্রাণ নাকে লেপটে আছে। তখন লোভের শিকার হয়ে কাদাজলে দেহ রয়ে যায়। কেউ জানতে পারে না ছেলেটি কোথায় চলে গেল। মেলায় ঘুরতে গিয়েছিল। আর বাড়িতে ফেরা হয়নি। আর মায়ের মুখ দেখা হয়নি। ঘুরে বেড়াত সেকথা জানান দিতে। কিন্তু পারছিল না। অর্পণ কেন ওই বাড়িতে গেল? কেন যাওয়ার সময় মাঠের মধ্যে ও অসুস্থ বোধ করেছিল? কে জানাতে চেয়েছিল, এখানেই রয়ে গিয়েছে গতজন্মের শরীর, এখানে এই মাটির ভিতরে!
লক্ষ্মীন্দর সব স্বীকার করেছে। মেজবাবুর হুকুমে নীপুবাবুকে মেলায় যাওয়ার নাম করে মাঠের শেষে নিয়ে গিয়ে গলা টিপে মেরেছিল। তারপর পুঁতে দিয়েছিল। লক্ষ্মীন্দর বলেছে, ‘সেই পাপে দুটো পা কাটা পড়েছে। ছেলে বাজারে বসিয়ে দিয়ে যায়। ভিক্ষে করি। কিন্তু আমি চাকর। হুকুমের চাকর। আমার পাপ কেন হল? মেজোবাবুর কিছু পাপ নেই?’
অর্পণ থাকতে চায়নি। এসবের মধ্যে থাকার মন ছিল না ওর। বাড়িতে ফিরতে চেয়েছে ও। সোনা মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। একটা ইচ্ছে ছিল। লক্ষ্মীন্দরকে দেখার।
দেখেছে। থানায় দেখেছে সেই শাটার টানা দোকানের সামনে বসে থাকা দুটো পা কাটা কুতকুতে চেহারার লোকটিকে। ওকে দেখে লোকটি বলেছিল, ‘খিদে পেয়েছে।’
এই ‘খিদে’ শব্দটা ভয় পাইয়ে দিয়েছে অর্পণকে। নরকের কীটের খিদে পাওয়া ভালো নয়। এদের খিদে মেটে না।
ট্রেনে উঠে পড়ল অর্পণ। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল সুন্দরপুরকে। গতজন্মের একটা কাজ বাকি ছিল। সেটা শোধ করতেই আসতে হয়েছিল। আর কোনদিন আসা হবে না।
ট্রেন হুইসিল দিয়েছে। হঠাৎ করে চোখে জল এল অর্পণের। সোনা মার মুখটা ভুলতেই পারছে না। ধীরে ধীরে ভুলে যাবে নিশ্চয়। কত কিছু ভুলে যায় মানুষ। এই লুকোচুরি চলে নিজের সাথে। জন্মের পর জন্মে। কে এসে নিয়ে যায় এক জন্ম থেকে অন্য জন্মের রাস্তায়। কে বলে ‘এসো, চলো। আর এখানে নয়। অন্য কোথাও তোমার জন্য জায়গা করা হয়েছে। আসন পাতা হয়েছে ফুলতোলা নকশায়। বসবে না?’
চলে যেতে হয়। ফের সেই লুকোচুরি খেলা। এক জন্ম থেকে অন্য জন্মের সঙ্গে। এক জন্মের জমাকাপড় ঢুকে থাকে পুরোনো ট্রাঙ্কে। আর কারও কাছে যার কোনও দাম নেই।
অর্পণ চোখ মুছে নিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন