সাগরিকা রায়

ঠিক বিকেল নামলেই আমাদের বাড়ির দরজা-জানলা বন্ধ করে দেওয়া হয়৷ বড়পিসি বলে, ‘শীতের দেশে দুপুর ফুরোলেই সন্ধে৷ তবে, ঠান্ডাকে ঘরে ঢুকতে দেওয়া কেন বাপু? তাড়াতাড়ি করে ঘর-দোর এঁটে বস সব৷ সাবধান! ঠান্ডা যেন না ঢোকে৷ বড্ড ভয় ঠান্ডাকে৷ সারাক্ষণ বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে ভেতরে ঢুকবে বলে৷ একটু ফাঁক যেন না থাকে কোথাও!’
আমার ছোট ঠাম্মা দাদুর ফেলে দেওয়া পুরোনো মাঙ্কি ক্যাপ পরে বিছানার এক সাইডে বসে সুপুরি কুচোচ্ছিল৷ পাশেই অমলাদি চাদরে, সোয়েটারে জবুথবু৷ আমি অমলাদির কাছে বসে অঙ্ক শিখছি৷ কোথাও আটকে গেলে অমলাদিকে জিজ্ঞাসা করলে গরম জামাকাপড়ের ভেতর থেকে কী বলছে, বুঝতেই পারছি না৷ নাইন বলল নাকি ফাইভ? কী জানি! ভুলভাল লিখে দিলে গোমেস স্যার এমন রাম পিটুনি দেবে, জানো না তো! শীতের মধ্যে মার খেলে বড্ড ব্যথা লাগে৷ একথা কে জানে না? যারা মার খেয়েছে, তারা জানে৷
চারটে দোকানে তালা চাবি দিয়ে গোরাদাদু, কাকাই, জেঠু, মামাবাবু বাড়ি ফিরলে দরজায় ঘণ্টা বাজবে৷ ওটা কলিং বেল৷ কিন্তু পলকদা ঘণ্টা বলে৷ তাই বাকিরাও সবাই ঘণ্টাই বলে৷ ঘণ্টা বাজালে সরমাদি গিয়ে দরজা খুলে দেবে৷ একা পারে না অবশ্য৷ সঙ্গে থাকে পিন্টুদা আর হরিমোহন৷ দুটো কাঠের দরজায় চারটে করে তালা, মানে চার ইনটু আটটি তালা৷ কোলাপসিবল গেটের আরও চারটি তালা মানে টোটাল চার ইন্টু থ্রি ইকোয়াল টু বারোটি তালা খুলে, ডাঁসা খুলে দেওয়া কি চাট্টিখানি কথা? দোকানিরা ফিরলে তখন তাদের কাঁপুনির শব্দ ওঠে-- উ হু হু! কী ঠান্ডা...চাদর, কম্বল কোথায় কী আছে দে রে! গ...রম চা দে!
বাড়িতে সবাই মিলে এমন হইচই শুরু করে দেয় যে বলার না৷ হরিমোহন চা, আর পাঁপড়ভাজা সার্ভ করতে থাকে ঘরে ঘরে৷ এই যে সময়টুকু, এর মধ্যে সবার অজান্তে কখন যে ঠান্ডা বাড়ির ভেতরে ঢুকে যায়, কেউ বলতে পারে না৷
দোকান বন্ধ করে এসে সবাই যার যার ঘরে লেপের তলায় ঢুকে যায়৷ বাড়ি ফের চুপচাপ৷ যেন কেউ কোত্থাও নেই! শুধু আমাদের বাড়ির সামনের ছাতিম গাছ থেকে একটা কী পাখি ওয়াও ওয়াও করে ডাকে৷ বড়পিসি বলে, ‘ওটা বড্ড অলুক্ষণে৷ এই জন্য ওর মা খুব বকত ওকে৷ সারাক্ষণ এমন করে চেঁচাত৷ মরে গিয়েও চেঁচায়৷ কিন্তু ও মরে যাওয়ার পর ওর মা নিজেই কত কাঁদে! ঠিক এমনি করেই সেগুন গাছে বসে ওয়াও ওয়াও করে ডাকে৷ ও ডাকে ওর মাকে৷ ওর মা ডাকে ওকে৷ ডাকাডাকি চলছে, কিন্তু কেউ কাউকে দেখতে পায় না৷ যে বেঁচে আছে, আর যে মরে গিয়েছে, দুজনের মাঝখানে থাকে দুস্তর ব্যবধান৷ যেন মাঝখানে একটা কাচের দেওয়াল৷ কিছুতে সেই দেওয়াল ভেদ করা যায় না৷’
এই সব শুনে মন খারাপ হয়ে যায় আমার৷ আমাদের সবার৷ আমার নিজের মা-বাবার কথা মনে পড়ে৷ কতদিন মাকে দেখতে পাই না৷ ভুট্টাওলার থেকে গরম ভাজা ভুট্টা কিনতে গিয়ে আমি গাড়িচাপা পড়েছিলাম৷ তখন জেঠু আমাকে এই পাহাড় চুড়োর বাড়িতে নিয়ে এল৷
জেঠু আমার আসার অনেক আগেই এবাড়িতে এসেছিল৷ সেই সিকিমে গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে খাদে পড়ে ছিল! তারপর জেঠুকে এখানে, এই শীতের দেশের বাড়িতে নিয়ে আসে গোরাদাদু৷ মানে, জেঠুর বাবা৷ সে হয়ে গেল কতদিন৷ কাকাই, মামাবাবু, জেঠু, হরিমোহন...এই বাড়ির সকলেই এভাবেই এই বাড়িতে এসেছে৷
অমলাদি বড়পিসির কথা শুনে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল, ‘আর বলো না৷ আমারও এসব শুনলে বড্ড মনখারাপ হয়৷ কোথায় ছিলেম, কোথায় যাব, কে জানে!’ আর সরমাদি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে চোখ মোছে৷ সব মনে পড়ে সরমাদিরও৷ সরমাদির কেউ ছিল না৷ ফুটপাতে থাকত৷ এক ঝড় জলের রাতে গাছের ডাল ভেঙে পড়ল মাথায়৷ সেখানেই শেষ৷ তারপর জেঠু গিয়ে নিয়ে এল৷ এখন পুবদিকের বড় ঘরে থাকে সে৷ জেঠু বলেছে, ‘তোমার যা যা ইচ্ছে, যেমন করে সাজাতে চাও ঘরটিকে, সাজিয়ে নাও৷ এখানে ইচ্ছে হলেই সব পাওয়া যায়৷ ড্রেসিং টেবিল চাই? আলমারি? টিভি? দামি শাড়ি? সাজগোজের জিনিসপত্র? যা চাও৷ পানের বাটা চাইলেও পাবে৷’
সরমাদি চাইল একটা ফুলতোলা খাট,ওতে আয়না ফিট করা, যেমন ছিল নাগবাবুর বউয়ের৷ ওদের বাড়িতে বাসন মাজত সরমাদি৷ তখন দেখেছে সেই খাট৷ নাগবাবুর বউ চান করে খাটের গায়ে ফিট করা আয়না দেখে দেখে মুখে বোরোলিন মাখত৷ এখন সরমাদিও আয়না দেখে দেখে মিছিমিছি বোরোলিন মাখে৷ মিছিমিছি ছাড়া আর কি?
মুখ বা কোথায় এখন? সবই তো ছায়া ছায়া৷ আর চাইল একটা কেরোসিনের স্টোভ৷ খুব ভোরে উঠে সরমাদি স্টোভ জ্বেলে আদা চা খায় ঘরে বসে, অখিলের মায়ের মতো করে৷
অখিলের মায়ের খুব ডাঁট ছিল৷ গ্রামে একমাত্র তার স্টোভ ছিল কিনা! তখন সরমাদি বড্ড ছোট৷ কিন্তু মনে আছে স্টোভের শব্দ হত শোঁ-শোঁ৷ সঙ্গে কেরোসিনের গন্ধ৷ অখিলদের বাড়ির শিউলিগাছে যা ফুল ফুটত! গাছ ধরে নাড়িয়ে দিলেই ঝুর ঝুর করে ফুল পড়ত৷ সরমাদি ফুল তুলতে গিয়ে স্টোভের শোঁ-শোঁ আর কেরোসিনের গন্ধ পেত৷ অখিলের মা নাক ফুলিয়ে চা খেত আঁচলে চায়ের গ্লাস জড়িয়ে৷ সরমাদিকে দেখে চোখ কুঁচকে বলত, ‘এই এসেচে আবাগির বেটি৷ ফুল চুরি করতে এসেচে!’ একবার তো ঝুড়ি থেকে ফুল কেড়েই নিয়েছিল অখিলের মা৷ মনে পড়ে৷ মানুষ মরে যায়৷ কিন্তু তার মন কি মরে যায়?
এখন সরমাদির ঘরের পুব দিকের জানলার পাশে একটা শিউলি ফুলের গাছ৷ সারাবছর তাতে ফুল ফোটে৷ রোজ ভোরে সরমাদির ঘর থেকে কেরোসিনের গন্ধ ভেসে আসে৷ স্টোভের শব্দ হয় শোঁ-শোঁ৷ উঁকি দিয়ে অবশ্য কিছুই দেখতে পাবে না৷ শুধু দেখবে ভারি খুশি মনে সরমাদি হাতের আড়ালে কাচের গ্লাসে চা নিয়ে খাচ্ছে৷ আদা চায়ের গন্ধ আসছে৷ আসলে ওই চা, চায়ের কাপ, আদার গন্ধ, সব ভেবে নিতে হয় এখানে৷
বড়দিদু বলে, ‘পার্থিব বস্তু বলে এখানে কিছু নেই৷ সব অলীক৷ এই যে ওরা সব দোকানদারি করে, দোকান বলে সত্যি কিছু আছে নাকি? বেঁচে থাকতে যা করত, মরে গিয়েও ভাবে সেটাই করছে৷ অভ্যেস আর কি৷ মরে গেলে কী থাকে ভালোবাসা ছাড়া? বাকিটা বানিয়ে বানিয়ে চলতে হয় যদ্দিন না ডাক আসে৷’
আমি এত কিছু বুঝি না৷ বড়রা বড্ড ঘুরিয়ে, পেঁচিয়ে কথা বলে৷ জেঠু বলে, ‘মৃত্যুর পরে মানুষের খুব কষ্ট হয়৷ আপনজনদের ছেড়ে আসা কি কম কষ্টের? তাই এই বাড়িটি আমার বাবা মৃত্যুর পর থেকে জন্ম নেওয়ার আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করার জন্য বানিয়েছেন৷ জীবিত প্রাণী বাড়িটিকে দেখতে পায় না৷ তারা দেখে পাহাড় চুড়ো শূন্য৷ ফাঁকা৷ আমাদের দেখতে হলে আমাদের মতো হতে হয়৷’
বড়পিসি কাল থেকে মন খারাপ করে আছে৷ পুজো-আচ্চা বন্ধ করে দিয়েছে প্রায়৷ জেঠু, ছোট ঠাম্মা, সবাই জিজ্ঞাসা করে করে হয়রান হয়ে গেল৷ কিন্তু বড়পিসি মুখে কুলুপ এঁটেছে৷ কিছুতে মুখ খোলে না৷
কতদিন হল বড় ঠাম্মাকে দেখিনি৷ চলে গিয়েছে বড় ঠাম্মা৷ ডাক এসেছিল৷ একবার ডাক এলে আর এখানে থাকা যায় না৷ কে ডাকে, কার ডাক...আমি জানি না৷ কিন্তু ডাক আসে৷ এই ডাককে বলে জীবনের ডাক৷ সে ডাক অনেক দূর থেকে আসে৷ ডাক এলে কেউ আটকে রাখতে পারে না কাউকে৷ কী জানি বাবা! কবে আবার আমার ডাক আসে! এই পাহাড় চুড়োর বাড়ি ছেড়ে যাওয়া খুব কষ্টের৷ মাকে, বাবাকে ছেড়ে, আমাদের সেই ছোট্ট দোতলা কাঠের বাড়িটা ছেড়ে, আমার বন্ধু মিতুকে ছেড়ে, খেলা ছেড়ে...চলে এসেছিলাম এই বাড়িটিতে৷ খুব কষ্ট! তবু জেঠু ছিল এখানে! জেঠুই আমাকে নিয়ে এসেছে এই পাহাড় চুড়োর বাড়িতে৷
জেঠু, বড় ঠাম্মা, ছোট ঠাম্মা, বড় পিসি, আমার নিজের কেউ নয়৷ মানে আমি যে বাড়িটা ছেড়ে, মাকে ছেড়ে এসেছি, সেই রিলেশনের কেউ নয়৷ আসলেই কি আমরা সকলেই সকলের আপনজন নই?
এক জন্মে আপন, মানে অন্য জন্মে সে কি ফের পর? বা আপন? খুব ঝামেলার কথা! কিন্তু বড় পিসি কেন যে মন খারাপ করে আছে! ওই যে, হরিমোহন আসছে৷ ওকে জিজ্ঞাসা করা যাক৷
‘আচ্ছা, হরিমোহন, এখন কি কারও ডাক এসেছে?’
হরিমোহন মাথা নাড়ে, ‘কুছু ভি না জানি৷ হামি দোঠো টমাটর নিতে আসলাম৷ চাটনি হবে৷’
আচ্ছা, বেশ৷ আমি নিজেই জিজ্ঞাসা করে দেখি৷ বড়পিসি কী বলে দেখি৷
অল্প অল্প বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ পাহাড় চুড়োয় দারুণ ঠান্ডা নামল৷ চারপাশ বরফে বরফ! সন্ধে নামতে বাড়ির জানালা-দরজা বন্ধ করে দেওয়া হল৷ বড়পিসি সকলকে আজ তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলে দিয়েছে৷ গতকাল ষোলোটা কুকুরের বাচ্চাকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে কাকাই৷ সঙ্গে ওদের মা৷ পাহাড় চুড়োর বাড়িতে জায়গার অভাব নেই৷ ওদের থাকার চমৎকার ব্যবস্থা হয়ে গেল৷ নরম গদির বিছানা, গরম ঘর,খাবার...সব পেল ওরা৷ ওদের নাম দিল সরমাদি৷ এ, বি, সি, ডি,...একেবারে পি পর্যন্ত৷ আর ওদের মায়ের নাম রাখা হল—মাম্মি৷ কী মজা! কী মজা! শুনেছি কোথায় ওদের মেরে ফেলা হয়েছিল পিটিয়ে, বিষ খাইয়ে৷ এখন ওরা এই পাহাড় চুড়োর বাড়িতে আনন্দে থাকবে৷
বড়পিসি নাক মুছতে মুছতে বলল, ‘বেশি ভালোবেসে কাজ নেই৷ যেন কোনও কষ্ট না হয়, সেটা দেখ৷ আজ এসেছে, ডাক পড়লেই চলে যাবে৷’
‘তা যাবে৷ কিন্তু ফের ফিরে আসতে হবে৷’ জেঠা মুচকি হাসে, ‘আমাকেও যেতে হবে ফের৷ অনেকদিন হল এসেছি৷ কবে ডাক আসে দেখি৷’
শুনে সবার মুখ কালো৷ বড়পিসি মালপোয়া ভেজে রেখেছিল৷ চোখ ছলছল করতে করতে নিয়ে এল সরমাদি, ‘নাও৷ খাও৷’ বলে আমাকে এত্তগুলো দিল৷ অলীক হলেও ভালোবেসে দিলে তার মধ্যে সত্যির থেকেও বেশি স্বাদ থাকে৷ আমার প্লেটে এত্ত মালপোয়া দেখে হিংসুটে অমলাদি অমনি পলকদার কানে কানে ফিসফিস করল, ‘পার্শিয়ালটি৷’
আমি শুনে গাল ফোলালাম, ‘যাও, খাব না৷ অমলাদিকে দাও৷’
বড়পিসি কাঁপা-কাঁপা গলায় আমার মাথায় হাত রাখল, ‘সবাই শুনে রাখো, বুড়নের ডাক এসেছে৷ ওকে চলে যেতে হবে৷ তোমরা ঝগড়াঝাটি করো না অমলা৷ চলে যাচ্ছে বুড়ন৷ প্রার্থনা করো ও যেন সুন্দর একটা জীবন পায়৷’
‘আবার আসবে তো?’ অমলাদি কেঁদে ফেলে৷
‘ছিঃ! কেন আসবে? অনেকদিন থাকবে ওখানে৷ নিজের মায়ের কাছে৷ ওকে খুশি মনে বিদায় দাও৷ যেন ভালো থাকে পৃথিবীতে৷ অনেক ভালো ভালো কাজ করো জীবন পেয়ে৷’
আমি চমকে উঠেছি৷ আমাকে যেতে হবে? ডাক এসেছে আমার? ছোট ঠাম্মি, সরমাদি, অমলাদি, পলকদা, হরিমোহন আর মাম্মি এ, বি, সি, ডি...সবাই কাঁদতে শুরু করেছে৷ আমি কী যে করব বুঝতে পারছি না৷ কষ্ট হচ্ছে ভাই, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে! আমি সত্যি চলে যাচ্ছি, দেখো! কোথায় যাচ্ছি আমি বুঝতে পারছি না৷ আমার পাহাড় চুড়োর বাড়িটা কুয়াশায় ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে...! আমি দেখতে পাচ্ছি না বাড়িটাকে৷ অনেক অনেক দূর থেকে, কুয়াশার ভেতর থেকে আমি এ, বি, সি, ডি-র ডাক শুনতে পাচ্ছি...আস্তে-আস্তে হালকা হয়ে আসছে ওদের গলা...! ওরা কোথায়?
হেঁটে যেতে-যেতে দেখি কত পাখি উড়ছে আকাশে৷ চারদিক কেমন ঝকঝকে সুন্দর৷ রামধনু বেয়ে নেমে আসছে মা দুর্গা৷ সঙ্গে চার ছেলে মেয়ে, তাঁদের বাহন৷ আমাকে দেখে সবাই হাত নাড়ল৷ লক্ষ্মীর প্যাঁচাটা ঠোঁট সূঁচালো করে বলল, ‘বুড়ন ভুতুম থুম৷’
আমি একটা নদীর কাছে এসে দাঁড়ালাম৷ অল্প-অল্প ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে৷ কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি...! জলের শব্দ হচ্ছে! ছল ছল! কেউ আসছে! জলের ভেতরে পা ডুবিয়ে-ডুবিয়ে আসছে কেউ! আকাশ কী নীল! সাদা মেঘের দল ঘুরে বেড়াচ্ছে নীলের মাঠে৷ কেমন সুন্দর মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি৷ আমার মায়ের গায়ে এরকম গন্ধ ছিল৷ ঠিক এইরকম৷ মা কি আসছে আমাকে নিতে? আমি কি আমার সেই মায়ের কাছেই যাচ্ছি? মা ডেকেছে আমাকে? আমি কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না কেন? কে আছো, আমার সামনে এসো৷ আমার ভয় করছে যে! কতক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকব বলো?
‘বুড়ন, আমি এসেছি৷ দেখ, তাকিয়ে দেখ৷’
আমি চোখ মেলে তাকালাম৷ আমার সামনে আমার মা! সেই মা! মার কাছে এসেছি? আনন্দে, আর তার সঙ্গে পাহাড় চুড়োর বাড়িটাকে একবার ঝাপসা হয়ে মনে আসতেই আমি কেঁদে উঠলাম, ‘ওঁয়া... ওঁয়া...!’
অমনি কে মোটা গলায় বলে উঠল, ‘এখন সপ্তমীর ভোর৷ ওর নাম রেখো, সপ্তমী৷ আর ডাকনাম ভোর৷’
কে সরু গলায় চেঁচাচ্ছে, ‘শঙ্খ বাজাও গো৷ মা দুর্গা এসেছে বাড়িতে৷ হুবহু বুড়নের মতোই দেখতে দেখো৷’
দেখেছ! এঁরা জানেই না আমিই বুড়ন! হি-হি৷ ফের ফিরে এসেছি মায়ের কাছে! বাবার কাছে৷
হালকা হালকা দেখতে পেলাম, অনেক অনেক দূরের একটা পাহাড়ের চুড়োয় দাঁড়িয়ে কারা সব আমাকে দেখছে ঝুঁকে পড়ে৷ হাত নাড়ছে...হাত নাড়ছে...! ঝাপসা হয়ে হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে! আমি একটু একটু চিনতে পারছি তোমাদের৷ জীবনে ঢুকে গেলে পাহাড় চুড়োর বাড়িকে ভুলে যেতে হয়৷ আমিও ভুলে যাব৷ যতক্ষণ না ভুলি, দেখি তোমাদের৷
বড় ঠাম্মি,বাবা, জেঠু, হরি...ভালো থেকো তোমরা৷
আমি ভালো আছি৷
প্যান্ডেলে ঢাক বাজছে৷ সন্ধিপুজোর আরতি শুরু হল৷ মা জড়িয়ে ধরল আমাকে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন