শিস

সাগরিকা রায়

ইদানীং গভীর রাতে একটা তীক্ষ্ন শিসের শব্দ শুনতে পায় সমীর!

ফুল কিনতে বেরিয়েছিল সমীর৷ ঝড় ঝঞ্ঝা যা-ই থাকুক না কেন, আজ যে করে হোক, ফুল আনতে হবে৷ রবি বসাকের মেয়ের বিয়ে বলে কথা৷

সমীর নতুন নেমেছে ব্যবসায়৷ বসাকের মেয়ের বিয়ের বরাত পেয়ে উত্তেজনা তুঙ্গে৷ কারণ এই বিয়েতে ফুল সাপ্লাই দেওয়া মানে অনেক টাকার ব্যাপার৷ ব্যবসার জন্য নিজেকে কিছুটা টাকা ইনভেস্ট করতে হয়৷ সমীর গতকাল সেই জন্য টাকা তুলেছে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে৷

এদিকে ভোর থেকে এমন বৃষ্টি নেমেছে যে সমীর প্রমাদ গুনল৷ ফুল আনতে যেতে হবে রসিকনগর ছাড়িয়ে গঙ্গাপুরে৷ রসিকনগরে বাস থেকে নেমে দাঁড়াতে হবে ভাঙরে৷ মোটা বটগাছের নীচে অপেক্ষা করতে হবে বাসের জন্য৷ ওটাই বাসস্ট্যান্ড৷ বাস আসবে ঠিক দশটায়৷ বেলা দশটার বাসটা ফের ফিরে আসবে ভাঙরের এই বটতলায়৷

পুজো শেষ হয়ে কার্তিকমাস পড়ো পড়ো৷ বাতাসে হিম হিম ভাব৷ গঙ্গাপুরে পৌঁছে ফুলের বাজারে গিয়ে দরদাম করে কেনাকাটা করতে করতে বেলা দুটো হয়ে গেল৷ মোবাইল ফোন ভালো কাজ করছিল না৷ টাওয়ার নেই বলে এদিকে নেটওয়ার্ক মেলে না৷ আরেকটু গেলে তাহলে পাওয়া যায়৷ আরেকটু মানে মাইল দুয়েক প্রায়৷ আর সেও এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে টাওয়ার পাওয়ার৷ দুটো উঁচু লম্বা গাছ আছে৷ একটা হলগে শালগাছ৷ আরেকটি অশ্বত্থ! তো লোক আছে৷ তারা

গাছে উঠে যাবে ফোন নিয়ে৷ যা বলার তাদেরকে বলে দিতে হবে৷ গাছের ওপরে টাওয়ার পাওয়া যায়৷

সমীরের অতশত সময় ছিল না৷ সমীর তড়িঘড়ি করছিল৷ বলা কি যায় বাস ধরতে যদি না পারে! এরই মধ্যে ফের নামল বৃষ্টি৷ এই এক অদ্ভুত অবস্থা হয়েছে৷ বর্ষাকালে বৃষ্টি হল না৷ শরৎ জুড়ে তুমুল বৃষ্টিতে পুজো মাটি হল৷ এখন এই কার্তিকমাসে কিনা বৃষ্টি নামল! গায়ে বৃষ্টির জল পড়তে সূচ ফোটানোর মতো লাগছে৷

ইঃ, কী ঠান্ডা গো! ই হি হি হি! বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতা সকলেই কাঁপতে লেগেছে৷ ওরই মধ্যে একটা ভ্যান রিকশা খুঁজে হয়রান হয়ে গেল সমীর৷ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছতে হবে৷ এত ফুল নিয়ে হেঁটে যায় কী করে সেখানে! যেতে যেতে বাস ছেড়ে যাবে৷ ফুল কিনে বেজায় বেকুব হয়ে পড়ল সমীর৷ একটা বিয়েবাড়ির ফুল মানে কম কিছু নয়৷ এখন সমস্যা হল, নিয়ে যাওয়া৷ বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার একটি ভ্যান পাওয়া যাচ্ছে না! সমীর কী করবে ভাববারও সময় নেই৷ অগত্যা ফুলের ঝুড়ি মাথায় তুলে হাঁটতে যেতেই রে রে করে এল দু-চারজন—সে কী? এভাবে যাবেন কী করে? আচ্ছা, দেখি, পরাণকে বলে টলে, যদি রাজি হয়৷

সমীর অবাক৷ পরাণ আবার কে? এতক্ষণ ধরে সমীর কম লোককে তো অনুরোধ করেনি৷ পয়সার লোভও দেখিয়েছে৷ দেখা যাক, পরাণ নামের সেই লোক তাদের মধ্যেই ছিল কিনা৷ স্থানীয় লোকেদের কথা হয়তো শুনবে৷ কিন্তু পরাণ মহাশয় কোথায়?

দূরে দেখা গেল একটি রোগা-পাতলা লোক আসছে হেলতে দুলতে৷ লোকটাকে খুব কিছু বোঝাচ্ছে বাজারের লোকেরা৷ মাঝে সমীরের দিকে আঙুল তুলেও কিছু বলল কেউ কেউ৷ সমীর ইচ্ছে করে কাঁচুমাচু ভাবটা প্রকট করে দাঁড়াল৷ এতে যদি লোকটার দয়া হয়৷ যা রোগা লোক! ভ্যানে মাল টানতে পারে কিনা বোঝা যাচ্ছে না৷

লোকটা এসে সমীরের খুব কাছাকাছি দাঁড়াল৷ মনোযোগ দিয়ে সমীরকে দেখে যাচ্ছে৷ দেখেই যাচ্ছে৷ হঠাৎ চেহারার বিপরীতে জলদ গম্ভীর স্বরে প্রশ্ণ করল—মাসখানেকের মধ্যে কোন কি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে?

মাসখানেক? অ্যাকসিডেন্ট? মানে? সমীর তোতলা যদুর মতো হাওয়ায় সাঁতার কাটে—ম্মা ম্মানে? আক্সিডেন্ট? লোকটার চেহারার সঙ্গে গলার স্বর বেমানান৷ সমীর থতমত খায়৷

হয়নি তো? আমি অল্প দিনের মধ্যে আহত হয়েছে এমন লোককে ভ্যানে তুলিনা বুঝলেন?

খুব ভালো বুঝেছে সমীর৷ একেবারে রবিস্যারের পড়া বোঝানোর মতো জল হয়ে গেছে৷ লোকটার ব্রেন শর্ট আছে৷ এই লোকের ভ্যানে চড়ে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত যাওয়া যে সমস্যার, সেকথা সমীর অনুধাবন করে ফেলেছে অনেকক্ষণ৷ কিন্তু প্রয়োজন বড় দায়/কী আর করা যায়—বলে একটা কথা আছে৷

সমীর মাথা নাড়ল—না, না, আমার দু-বছরের মধ্যে কেন, আরও বেশিদিন আগেও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে বলে মনে পড়ছে না৷ চলবে তো আমাকে? মানে প্যাসেঞ্জার মানা যাবে?

আরে, উঠুন উঠুন৷ আপনার মতো প্যাসেঞ্জারের জন্যই বসে থাকি৷ বলে একটু হেসে চোখ সরু করল লোকটা৷ এতক্ষণ সমীর একটা খেপা আধ পাগলা লোকের সঙ্গে কথা বলছিল বলে মনে করছিল৷ কিন্তু লাস্ট মোমেন্টে লোকটার হাসিতে কী একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার উঁকি দিতে ভয় পেল সমীর৷ সত্যি সত্যি গা শিরশির করে উঠল৷ লোকটা কে? কেমন কেমন যেন!

আরে দাদা, উঠুন উঠুন৷ এরপরে আর কিচ্ছুটি পাবেন না৷

বাজার উঠে যাবে এখন৷ দেখছেন না, কেমন বাদলা করেছে! পান- দোকানগুলোও উঠল বলে৷

সমীর আর দ্বিতীয়বার চিন্তা করল না৷ মাল তুলে নিজেও পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল৷ ভাগ্যি একটা ছাতা সঙ্গে নিয়ে এসেছিল৷ নাহলে হয়েছিল আর কি! লোকটা ভ্যান চালাতে শুরু করেছে৷ সমীর তাকিয়ে দেখল মেঘে মেঘে আকাশ ঘুমঘুম করছে৷ জোর একটা বৃষ্টির আভাস বাতাসে৷ নদীর পাড় থেকে হু-হু ঠান্ডা বাতাস উড়ে এল৷ কোথাও বৃষ্টি নেমে গেছে৷ বাতাসে কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া গন্ধ৷ নদীর বাতাসে ধোঁয়ার গন্ধ কেন!

ভ্যানওলা চুপচাপ ভ্যান চালিয়ে যাচ্ছে৷ এই গতিতে ভ্যান চালালে আজ কি আর বাস পাওয়া যাবে! সমীর হতাশ হয়ে ভ্যানওলার দিকে শরীর বেঁকিয়ে তাকায়—এই যে ভাই, একটু তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ৷ বাস ধরতে হবে যে! আর জানেনই তো, একটাই বাস সাকুল্যে৷ ওটা মিস করলেই গেছি৷ আমাকে অনেক দূর যেতে হবে৷

লোকটার পিঠটা দেখতে পাচ্ছে সমীর৷ মুখটা দেখতে হলে সমীরকে ভ্যান থেকে নেমে সামনের দিকে যেতে হবে৷ সেটা করাই যায়৷

কারণ ভ্যান চলছে ঢিমে তালে৷ টুপ করে নেমে পড়া কোনও ব্যাপারই না৷ সমীর নামবে ভেবে ঝুঁকে পড়তেই হঠাৎ-ই একটা কাণ্ড হল৷

ভ্যানটা অস্বাভাবিক দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করল৷ যেন সমীরের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছে৷ সমীর টাল সামলাতে না পেরে ভ্যানের ওপর চিৎপাত৷ আর তখনই আকাশ জুড়ে মেঘ ডেকে উঠল—ডওওডডমমম! ওডওওওডমম! চমকে উঠেছে সমীর৷ চারপাশ কেমন অন্যরকম হয়ে উঠেছে৷ পুরো এলাকাটায় একটা হালকা ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে৷ ঝুপ করে ভীষণ নির্জন হয়ে আছে রাস্তাটা৷ এখন যদি জোরে বৃষ্টি নামে, ফুলগুলো নষ্ট হয়ে যাবে! তাহলে অনেকগুলো পয়সাও নষ্ট হবে৷

লোকটা এত জোরে ভ্যান চালাচ্ছে কেন! যেন হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছে ভ্যানটা৷ সমীর উঠে বসতে বসতেই কোথা থেকে আচমকা শোকের শব্দের মতো বৃষ্টি নামল৷ শয়ে শয়ে মানুষ আর্তনাদ করে উঠেছে যেন৷ বৃষ্টির শব্দ এরকমও হয়? ভিজে নাকাল হতে হতেও কথাটা মনে এল সমীরের৷ ভ্যানটা এমন ভাবে না চালিয়ে একটু দাঁড়ালে ফুলগুলো বাঁচত৷ কিন্তু তাতে আবার সমস্যা আছে৷ বাস ধরতে পারত না সমীর৷ যাচ্ছে জোরে যাক৷ এদিকে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ে মাথা গোঁজার জায়গা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না৷ রাস্তার দু-পাশে ঝোপঝাড়, জঙ্গল৷ বৃষ্টির তোড়ে সব ঝাপসা যেন৷ ভিজে গিয়ে কাঁপুনি ধরেছে৷

আশ্চর্য তো! ভ্যানওয়ালা একবারও পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখছে না! সমীর ডাকল—ও দাদা, একটু আস্তে আস্তে! ফুলের ঝুড়ি উলটে যাচ্ছে যে ভাই!

মনে হচ্ছে লোকটা কানে কম শোনে! কিন্তু সেকথা একবারও আগে বোঝা যায়নি তো! সমীর রেগে যাচ্ছিল৷ কেমন টাইপের লোক?

কথা শুনছে না! ও রীতিমতো চেঁচিয়েই উঠেছে— আরে, ও ভাই, শুনছ? বলতে বলতে অবাক হয়ে গেল সমীর৷ কী অদ্ভুত! এমন ধূসর রাস্তাটা এল কখন! চারপাশে সবুজের নাম গন্ধ নেই! লম্বা লম্বা তালগাছ ছিল এদিকে, কোথায় গেল সেগুলো? একটা অন্যরকম পরিবেশের ভেতর দিয়ে চলেছে ভ্যানটা! এ কোথায় এল সমীর? ভয় হচ্ছে সমীরের৷ গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছে৷ লোকটা কোথায় নিয়ে এসেছে ওকে! বেলা তিনটের সময় চারপাশ এমন ধোঁয়াটে সন্ধের চেহারা নিল কখন? আসার সময় একটা পুকুর ছিল রাস্তার ডানধারে৷ যতটা ভ্যানে চেপে এল, অনেক আগেই তো পুকুরটা চলে আসার কথা! তাহলে কি বৃষ্টির মধ্যে অন্য রাস্তায় চলে এসেছে ওরা? ভ্যানওয়ালা কি বুঝতে পারছে না ভুলটা? অথবা লোকটা বদমাশ টাইপের লোক হতে পারে! সমীরের কাছে পয়সাকড়ি আছে মনে করে হয়তো এদিকে নিয়ে এসেছে!

সমীর চেঁচাতে শুরু করল—কী হচ্ছে? আরে থাম দেখি! পড়ে যাচ্ছি যে!

ভ্যানওলার ভ্রুক্ষেপটুকু নেই৷ মনে হল সে কানে শুনতে পাচ্ছে না! এদিকে রাস্তাটা ক্রমে সরু হয়ে নীচের দিকে নেমে গেছে এমন ভাবে যেন কোনও গর্তে গিয়ে পড়বে ভ্যানটা সমীরকে নিয়ে৷ ভ্যান এত তীব্র গতিতে যাচ্ছে যে সমীর লাফ দিতে গিয়েও ভয় পেল৷ হাড়গোড় আস্ত থাকবে না! আর ঠিক এই সময়ে কোথা থেকে একটা তীব্র শিসের শব্দ এসে মাথার ভেতরে ঢুকে পড়ল৷ যেন হাজার হাজার মাইল দূরের এক অপার্থিব জগৎ থেকে শিসটা আসছে! বাতাসের দুরূহ সব স্তর পেরিয়ে আসছে কাঁপা কাঁপা সেই শিস!

সন্ধ্যের রং ঘন হয়ে এল একটা সময়৷ ভ্যান থামল এসে নির্জন এক মাঠের মধ্যে একটি প্রাচীন অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ-এর সামনে৷ এখানে কি কেউ বাস করে! সমীর ভ্যানওলার মুখোমুখি হয়ে ধমক দিতে গিয়ে থেমে গেল৷ ভ্যানওয়ালা অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে ওর দিকে৷ সেই দৃষ্টিতে ভয়, ত্রাস, করুণা ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে৷ ঘণ্টাখানেক ধরে তীব্র উৎকণ্ঠার পর যখন রাগ চূড়ো স্পর্শ করতে যাচ্ছে, তখন ধবস নামল হঠাৎ করে৷

কে এ? সমীর কার সঙ্গে এসেছে এখানে এই নির্জন মাঠের মধ্যে? লোকটা কি প্রথম থেকেই সমীরের দিকে নজর রেখেছিল? প্রথম দর্শনেই সমীরকে প্রশ্ণ করেছিল কিছুদিনের মধ্যে কোনও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে কিনা! কেন? অ্যাকসিডেন্টের কথা কেন বলেছিল? শরীরে কোনও ক্ষত আছে কিনা জানতে চেয়েছিল কি? ক্ষত থাকলে বা অ্যাকসিডেন্ট হয়ে থাকলে সমীরকে ভ্যানে তুলত না? অন্য কাউকে তুলত? কেন? কিসের জন্য খুঁতওয়ালা মানুষকে ভ্যানে তুলছিল না!

একটা গল্প পড়েছিল সমীর৷ রাজার হাত কেটে গিয়েছিল বলে ডাকাতেরা রাজাকে নিখুঁত ভাবতে পারেনি৷ কারণ খুঁতো মানুষকে বলি দেওয়া যায় না! বলি? বলি মানে? ভ্যানওয়ালা সমীরকে বলির জন্য কি নিয়ে এসেছে এখানে? তিনমাসের মধ্যে কোনও অ্যাকসিডেন্ট হলে ক্ষত টাটকা থাকে৷ আর সেই কারণেই সে হয় খুঁতো৷ তাকে সাধনার কাজে গ্রহণ করা যায় না! লোকটা নিখুঁত মানুষের জন্যই তাহলে অপেক্ষা করে থাকে বাজারের মধ্যে৷

পুরো ছবিটা স্পষ্ট হয়ে উঠল চোখের সামনে! ফাঁদে পড়ে গেছে সমীর! না জেনে বুঝে ভয়ঙ্কর এক ফাঁদে পড়েছে ও৷ এই অজানা,অচেনা নির্জন এলাকায় ওকে সাহায্য করার জন্য কেউ নেই কোথাও! তাছাড়া রাত নেমে আসছে এখানে৷ অন্ধকারে পালিয়ে যাবে কোথায় সমীর? কোনদিকে যাবে? এই বিশাল মাঠের মধ্যে এখন আর দৃষ্টি যায় না৷ অথৈ অন্ধকার চোখের সামনে থেকে মাঠটা অদৃশ্য করে দিয়েছে৷ ভ্যানওয়ালাকেও দেখতে পাচ্ছে না সমীর! এখনই সুযোগ পালিয়ে যাওয়ার৷ যে কোনও একদিকে ছুটে পালালেই নিশ্চয় কোনও সুরাহা হবে! অন্তত এই অদ্ভুত লোকটার হাত থেকে তো রক্ষা পাওয়া যাবে!

সমীর পা তুলেছে কেবল, অন্ধকার ফুঁড়ে কার শুকনো গলার আওয়াজ পাওয়া গেল—পালাতে চাইছে! পা তুলেছে!

কে? কার কণ্ঠস্বর কানে এল সমীরের? এ তো ভ্যানওয়ালার গলার স্বর নয়! অন্ধকার ভেদ করে অনেক অনেক দূর থেকে যেন কার গলা ভেসে এল! এক বৃষ্টিস্নাত অন্ধকার মাঠের মধ্যে এক ভগ্নপ্রায় পরিত্যক্ত অন্ধকার-মাখা অট্টালিকার সামনে দাঁড়িয়ে ত্রাসে কেঁপে উঠল সমীর৷ কী হচ্ছে এখানে! এ কোন বিপদের মধ্যে ঢুকেছে ও!

চল৷ নির্দেশ এসেছে! লম্বা শুকনো চেহারার এক নারীমূর্তি বাতাসে ভর করে নেমে এল৷ খি খি খি হেসে উঠল—আয়! বলে হাত বাড়িয়ে দিল৷ দিতে দিতেই বাতাসের স্রোতে হারিয়ে গেল নাকি মিশে গেল!

নির্দেশ এসেছে মানে? কে দিল নির্দেশ? কাকে দিল? কখনোই বা দিল? এই নারী কে? ও কি স্বপ্ণ দেখছে?

মন বলছে কোথায় যেন যেতে হবে! অনেকদূরের রাস্তায় রওনা দিতে হবে৷ ভেঙে পড়া পুরোনো সেই প্রাসাদোপম বাড়ি থেকে একটা আলোর আভা বাইরে আসছে! আলোর পেছনে কেউ তো আছে!

ক্রমে আলোর পেছনের লোকটিকে দেখা গেল৷ একটি অদ্ভুত দর্শন মানুষ একটি জ্বলন্ত চ্যালা কাঠ নিয়ে এগিয়ে আসছে৷ চিত্র বিচিত্র করা মুখে ভয়াল হাসি৷ অতি নোংরা এক ফালি কাপড়ে নিম্নাঙ্গ আবৃত৷ ঊর্ধ্বাঙ্গে হাড়গোড়ের মালা গলা বেষ্টন করে নাভিতল পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে৷

এ কে? সমীর নড়াচড়া করতে ভুলে গেছে যেন৷ গ্রিক দানবী মেডুসা যেমন করে দৃষ্টি দিয়ে যে-কোনও প্রাণীকে পাথরে পরিণত করত, এই অদ্ভুত দর্শন লোকটিও সমীরকে নিঃসাড় করে দিয়েছে৷ ওর চেতনা শক্তি, বুদ্ধি, আবেগ, ইচ্ছেশক্তি সব কিছু ওই লোকটির চ্যালাকাঠের আগুনের মধ্যে দাপাচ্ছে যেন৷ চোখের সামনে থেকে ক্রমে মুছে যাচ্ছে মানুষের অস্তিত্ব, পরিবেশ৷ অর্জুনের পাখির চোখ দেখার মতো সমস্ত অনুভূতি গিয়ে জড়ো হয়েছে জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে৷

লোকটি দাঁড়িয়ে পড়ল৷ ধপ ধপ করে আগুন একই ভাবে জ্বলছে৷ আগুনের গনগনে শিখায় বীভৎস দর্শন লোকটিকে নরকের বাসিন্দা বলে ভ্রম হয়!

সমীর কখন চলতে শুরু করেছে, ও নিজেই জানে না৷ সোজা এগিয়ে যাচ্ছে জ্বলন্ত কাঠ হাতে লোকটির দিকে৷

সমীর ঘোর অন্ধকারের ভেতর যেন সাঁতরে যাচ্ছে৷ লোকটি আগে আগে যাচ্ছে৷ অট্টালিকার মধ্যে ভাঙা চোরা অজস্র গলি ঘুঁজি পেরিয়ে যেতে যেতে এক জায়গায় গিয়ে থামল লোকটি৷ সেখানে জলের শব্দ হচ্ছিল৷ হিরহিরে জলের শব্দ৷ ধিকি ধিকি আগুন জ্বলছে৷ ছায়া ছায়া কিছু অবয়ব স্থির হয়ে আছে৷ কেউ সামান্য নড়াচড়া করছে না৷ সমীর গিয়ে দাঁড়াল৷ জ্বলন্ত কাঠ হাতে লোকটি একবার পেছন ফিরে দেখল৷ অদ্ভুত শব্দে হেসে উঠল সে৷ সেই হাসির শব্দ গাছ পালা, জল, ধিকি ধিকি আগুনে ধাক্কা খেতে খেতে সমীরের কাছে এসে হুমড়ি খেয়ে পড়ল৷ আর প্রবল ভাবে কেঁপে উঠল সমীর৷ ওর সমস্ত চেতনায় তীব্র আঘাত লাগল৷ শরীরের প্রতি কোষে শিহরন সাঁতরে বেড়াতে লেগেছে! সমীর সম্পূর্ণ জেগে উঠল৷ সেই শিসের শব্দ আসছে ফের৷ একটা করোটির ভেতর দিয়ে শিসের শব্দ আসছে৷

ওর সামনে একটি চিতা জ্বলছে৷ চিতা থেকে ঝলসানো মৃতদেহ উলটে পালটে ছিঁড়ে নিয়ে হামলে পড়ে খাচ্ছে সেই ছায়া মূর্তিগুলো৷ আতঙ্ক কোন পর্যায়ে গেলে মানুষ স্থবির হয়ে যায়, সেটা এই মুহূর্তে অনুভব করতে পারছিল সমীর৷ সেই শব্দে জীবনের গন্ধ ছিল৷ একসঙ্গে ফিরে তাকাল ছায়ামূর্তিরা৷ এসেছে! খাদ্যের জোগান এসেছে! উল্লাস ছড়িয়ে পড়ল হিম বাতাসে ভর করে! মহামাংসের ভোজের জোগান বন্ধ হয়নি! চলে এসেছে সে নিজ পায়ে হেঁটে মৃত্যুর দরজায় কড়া নাড়তে নাড়তে! এক ভয়ানক মৃত্যুর জন্য অপেক্ষমান সে৷ সম্মোহিতের ছায়ায় ভর করে আছে৷ এরকমই হয় হতভাগ্য মানুষটির৷ চেতনা লুপ্ত হয়ে যায় বলে মৃত্যুর ইশারা টের পায় না হয়তো৷

চিতার পাশ থেকে একজন উঠে আসছে! বিশাল দেহী এক নরপিশাচ৷ শরীরের টাল সামলাতে না পেরে টলমল করতে করতে এগিয়ে আসছে৷ তার হাঁটুর আর পায়ের গোঁড়ালির হাড় শব্দ করে উঠল কট কটাস! প্রতি পদক্ষেপে হাড়ে হাড়ে আওয়াজ উঠছে! ওর হাতে ওটা কী?

সমীর ত্রাস মিশ্রিত দৃষ্টিতে দেখল একটি লম্বা মোটা হাড় নিয়ে এগিয়ে আসছে লোকটি! চিতা থেকে মৃতের পায়ের হাড় নিয়ে আসছে!

ভঙ্গিতে আক্রমণের ছাপ স্পষ্ট! ওটা ওর অস্ত্র! ওটা দিয়েই কি জীবিতকে হত্যা করে পরে ঝলসে খায়?

সমীর কী করে পালাবে এখন? ওরা অনেকজন! ওদের হাত এড়িয়ে কোথায় পালাবে ও? সমীর অথৈ অন্ধকারের দিকে তাকাল৷ ছুটে পালাতে পারলে, যেদিকে খুশি চলে যেতে পারলে প্রাণ বাঁচানোর একটা চেষ্টা করা যাবে! না-হলে দাঁড়িয়ে থেকে পিশাচের খাদ্য হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে ও? এরা নরক থেকে উঠে এসেছে! এদের হাতের বলি হওয়াই কি ভাগ্যে ছিল সমীরের?

পিশাচের পদক্ষেপের আওয়াজ উঠছে মাটিতে! জলের গন্ধ আসছে! আঁশটে গন্ধে ভরে আছে এই জায়গাটা৷ ভেজা ভেজা মাটিতে পায়ের ভারী শব্দ কানে এসে বাজছে! লোকটা বা পিশাচ,যা-ই হোক না কেন, সে আর বেশি দূরে নেই৷ সমীর আস্তে মাথা ঘুরিয়ে বাঁ দিকের অন্ধকারে চোখ সরিয়ে দেখে নিল৷ পালাবে! ওরা তাড়া করে আসবে, কিন্তু সমীর শেষ পর্যন্ত আশা ছাড়তে পারবে না! একমুহূর্তমাত্র! সমীর ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে নিল৷ তারপরেই অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ আর সঙ্গে সঙ্গে পিশাচ হাড়টি ছুড়ে মারল৷ প্রচণ্ড আঘাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল সমীর৷

হল কী? ক্ষণে ক্ষণে কী হয় আপনার? তখন থেকে ডেকে

চলেছি৷ আপনার বাস এসে যাবে এখনই৷ উঠুন৷

সমীর অতল থেকে উঠে আসছিল! কে ওকে ডাকছে! কোথায় এসেছে সমীর? মাথায় যন্ত্রণা! উফ্!

ভ্যানওলা ওকে সাহায্য করছিল উঠে বসতে—আপনার কী হয়েছে? মনে হচ্ছে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন!

মানে? কী বলছে লোকটা? ওই তো সমীরকে নিয়ে একটা ভয়ানক মাঠের ভেতরের ভাঙা অট্টালিকার...৷

আমি আপনাকে নিয়ে ভাঙা অট্টালিকার সামনে নিয়ে গিয়েছিলাম? বলছেন কী? আরে, ওই ভয়ানক জায়গাটা তাড়াতাড়ি করে পেরিয়ে যাওয়ার জন্যই ভ্যানটাকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম! আপনার চেঁচামেচি শুনেও দাঁড়াইনি৷ কেন জানেন? আপনাকে বাস ধরিয়ে দিতে চেয়ে শর্টকাট করতে অন্য রাস্তা ধরেছিলাম৷ সেই রাস্তা ভালো নয়৷ অনেক বদনাম ওই রাস্তার৷

বদনাম মানে? সমীর সমে ফেরার চেষ্টা করে—কী বলছ?

ওখানে পিশাচ থাকে! ওরা আকর্ষণ করে৷ যদি শরীরে কোনও ক্ষত থাকে, তাহলে ওদের খপ্পরে পড়ার ভয় থাকে৷ শুনেছি, একটা তীব্র শিসের শব্দ শুনতে পায় সেই মানুষ! কিন্তু আপনার তো কোনও ক্ষত নেই বলেছিলেন!

আছে ক্ষত! সমীর ভ্যান না পাওয়ার ভয়ে মিথ্যে বলেছিল৷ মাত্র পরশু দিনই নিধুদার বাইক থেকে পড়ে গিয়ে হাঁটু কেটে গিয়েছিল৷ কিন্তু সেকথা বললে যদি পরাণ ভ্যান ভাড়া না দেয় ভেবে মিথ্যে বলেছে! আচ্ছা, ফুলগুলো? ওগুলো কোথায়? নেই?

আছে৷ এই যে দেখুন, নীচে নামিয়ে রেখেছি৷

যাক, সব মিটে গেল৷ কিন্তু সত্যি কি মিটে গেল? ফের শর্টকাট করার ইচ্ছে থেকে আবার কি পরাণ বা অন্য কেউ সেই নরকের রাস্তাটা ধরবে না, একথা কি বলা যায়?

বলা কি যায়, সে শিসের শব্দ যদি সে শুনতে পায়...!!!!

বাড়িতে ফিরে ক্লান্তি বোধ করছিল সমীর৷ ঘুমিয়ে পড়তে পড়তে একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছিল৷ তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ! কোন গহন জলের ভেতর দিয়ে, একটা শ্মশানভূমির ওপর দিয়ে, এক অন্তহীন অন্ধকারের হিমশীতলতার মধ্যে অজানা কার করোটির শূন্য গহ্বর থেকে আসছে শব্দটা৷ কেউ শিস দিয়ে সমীরকে ডাকছে! শব্দটা চেনা সমীরের৷ পাশ ফিরে শুতে শুতে সমীর বলে উঠল—আসছি!

অধ্যায় ১৮ / ১৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%