আমপাতা জোড়া জোড়া

সাগরিকা রায়

একটা বেড়াল ওর দিকে তাকাতে তাকাতে চলে গেল ঝোপের মধ্যে। বেড়ালটা এলেই রিবু বুঝতে পারে ওর আবার জ্বর আসবে। জ্বর এলে ওর ভয় হয়। ভয়টা এমনি এমনি হয় তা নয়। আসলে কাউকে ও বোঝাতে পারে না যে জ্বর ও অদ্ভুত কী কী দেখতে পায়। তখন এত্ত ভয় করে! আর, বেড়ালটা! অন্য সময় কোথায় যে থাকে! খুঁজেও পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে কোথা থেকে যে ওর সামনে আসে!

বেড়ালটা ওর দিকে তাকায়, তারপর হুট করে ঝোপের ভিতরে ঢুকে যায়। রিবুর তারপর থেকেই শরীর খারাপ করতে থাকে। আধঘণ্টার মধ্যে হু হু করে জ্বর নেমে আসে ওর শরীরে। তখন দিদুমা ওকে চাদর চাপা দিয়ে তার নিজের বিছানায় শুইয়ে দেয়। চাদরের নীচে রিবুর শরীরটা কেঁপে কেঁপে ওঠে। দিদুমা বারবার ঘরে আসে, রিবুর কপালে হাত রেখে তাপ পরীক্ষা করে।

দিদুমার ঠান্ডা ঠান্ডা হাতের স্পর্শে আরাম হয় রিবুর। চোখ বুজে আসে। মনে হয় ঘুমের মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছে। আর তখনই আগুন জ্বলছে দেখতে পায় ও। দাউ দাউ আগুন। সেই আগুনে কেউ একজন ঝলসে যাচ্ছে। চিৎকার করতে করতে এ ঘর থেকে ও ঘরে ছুটে যাচ্ছে। কী ভয়ানক উঃ!

রিবু চেঁচিয়ে উঠলেই বেড়ালটা ঝুপ করে জানলা দিয়ে ওর বিছানার ওপরে এসে পড়ে। এসে মনে দিয়ে রিবুকে দেখে। একটা থাবা উঁচু করে রিবুর মুখের ওপরে বুলিয়ে দিল। তারপর আর কিছু মনে থাকে না রিবুর। জ্বর বাড়ে। কপালে জলপটি দিতে দিতে দিদুমা কাঁদে আর বিড়বিড় করে, ‘এই বাচ্চা নিয়ে আমি কী করি এখন? হায় ভগবান! মা ছাড়া বাচ্চা কি ভালো থাকে গো? ও আলপনা, কোথায় চলে গেলি মা? বাচ্চাটাকে কে দেখে?’

দিদুমার কান্নার আওয়াজ কাঁপতে কাঁপতে অনেক দূর পর্যন্ত চলে যায়। কান্নার দমকে বাড়ির পিছনের বাঁশবাগানের কচিপাতাগুলো থরথর করে কাঁপে। পুকুরের জল হিরহির করে কান্নায়।

রিবু জ্বরতপ্ত চোখ মেলে দিদুমাকে দেখার জন্য এদিক ওদিক তাকায়। দিদুমা কাঁদতে কাঁদতে জলপটির কাপড় পাল্টায়। ঠান্ডা কাপড়ের স্পর্শে সামান্য শিউরে ওঠে রিবু। বেড়ালটা জানলার বাইরে বসে দেখে ওকে। মাঝে মাঝে মুখ খুলে কিছু বলে। কিন্তু কোনও শব্দ হয় না। রিবু কিছু শুনতে পায় না। কান খাড়া করে বেড়ালের কথা শোনার চেষ্টা করে। বেরাল বারবার মুখ খোলে। কিছু বলে। রিবু শুনতে পায় না।

একসময় ঘুমিয়ে পড়ে রিবু। দিদুমা ওর গায়ে চাদর টেনে দেয়। আস্তে আস্তে গায়ে চাপড় দেয়। গুনগুন করে। এক অদ্ভুত ঘুমপাড়ানি সুরের মধ্যে ডুবতে থাকে। ডুবতে ডুবতে কোথায় তলিয়ে যায়। ঠিক তখন দিদুমা উঠে যায়। সন্ধে লেগে গেছে। ঠাকুরের সামনে প্রদীপ দিতে হবে। প্রার্থনা করবে নাতির জন্য। বাচ্চাটা খুব ভোগে। হঠাৎ হঠাৎ জ্বর আসে। ডাক্তার দেখিয়েও খুব কাজ হচ্ছে না। কলকাতায় নিয়ে যাওয়া সহজ কথা নয়। তবে কল্পনা আছে সেখানে। বলেছে, ‘একবার ছেলেটাকে নিয়ে এসো। আমাদের এখানে নীহার ডাক্তারকে দেখিয়ে যাও। আমার কতদিনের পেটের গোলমাল সারিয়ে দিল সে!’

দিদুমা, সন্ধে দিচ্ছিল ওই আধো অন্ধকারেই কে যেন ঢুকে এল ঘরে৷ তাকে কেউ দেখতে পেল না। দেখতে পেল না বলে কেউ বাধাও দিল না৷

সে ঢুকে আস্তে আস্তে চাপড় দিতে থাকে বাচ্চার গায়ে। গুন গুন করে ঘুম পাড়াতে থাকে,

‘আদা কুচি কুচি কুমড়োর বিচি

কে রেঁধেছে পঞ্চাদিদি/

মা গেছে কোথায়?

দত্তপাড়ায়

খুঁজে দেখ গে পাড়া পাড়া...।’

বলতে বলতে কুসকুস করে কাঁদে সে। কান্নায় জল পড়ে না। সব জল বাষ্প হয়ে গেছে। তবু তার আত্মা কাঁদে। হাঁটুতে মুখ লুকিয়ে সে কাঁদে, ‘ও খোকা, মা কোথায়? কোন পাড়ায় গেছে? খুঁজেও যে পাবি না তাকে!’

রিবু ঘুমের মধ্যে হাত বাড়িয়ে ডেকে ওঠে, ‘ও মা, মা! কোথায় ছিলে তুমি? আদর করো।’

একটা হাত রিবুর গায়ের ওপরে বুলিয়ে দিতে থাকে। রিবু ঘুমের ভিতরে হাসে। পাশ ফিরে শোয়। অমনি বেড়ালটা লাফ দিয়ে জানলা দিয়ে নেমে পড়ে কোথায় হাওয়া হয়ে যায়। বেড়ালটা যে ঘরের ভিতরে ছিল, তা রিবু জানতই না! একটুও শব্দ করেনি বুঝতেই দেয়নি যে ও ঘরে আছে!

রাতে ঘুম ভেঙে রিবু দেখে গায়ের জামা ভিজে গিয়েছে ঘামে। দিদুমা ডাকে, ‘দিদুমা, খিদে পেয়েছে। পাটিসাপটা দাও।’

দিদুমা তাড়াতাড়ি রিবুর কপালে হাত দিয়ে তাপ পরীক্ষা করে। গা ঠান্ডা, স্বাভাবিক। জ্বর ছেড়ে গেছে।

এরকম ঘটে চলেছে রিবুর মা আল্পনার মৃত্যুর পর থেকেই। মাকে মাত্র তিন বছর বয়স পর্যন্ত দেখেছে রিবু। তারপর থেকেই ও দিদুমার কাছে থাকে। মা কোথায়? জিজ্ঞাসা করলে দিদুমা আর কল্পনা মাসি চুপ করে থাকে। কিচ্ছু বলে না। কিছুতেই বলে না রিবুর মা কোথায়! কোথায় চলে গেল মা?

জ্বর সেরে গেছে বলে সকালে ফেনা ভাত আলুসেদ্ধ দিয়ে মেখে খাইয়ে দিয়েছে দিদুমা। বলেছে, ‘ভাত পেটে পড়লে শরীরে বল আসে। আজ ছুটোছুটি করো না। বিশ্রাম নাও। শুয়ে থাকো গে বিছানায় গিয়ে। দুপুরে খেয়েদেয়ে নিয়ে তোমাকে তালপাতার সেপায়ের গল্প বলব।’

তালপাতার সেপায়ের গল্প শুনতে খুব ভালোবাসে রিবু। কিন্তু এখন এই রোদ ভরা উঠোন, হাঁস চরা সরু রাস্তার ঘাস আর ঘাসফুল দেখতে দেখতে রিবুর মনে হল একটুখানি হেঁটে হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখে হাঁসদের। এই সময় টিয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে নারকেল গাছের মাথায় বসে থাকার জন্য। হেঁতে যেতে যেতে পিছনে দিদুমার গলা শুনতে পেল রিবু, ‘পুকুরের দিকে যেও না সোনা। চলে আসো ঘরে।’

পুকুর ভরে আছে জলে। দিদুমার ঘরের পিছনে খানিকটা গেলেই পুকুর। কেউ একজন পুকুরের দিকে যাচ্ছিল। লাল ফুল ফুল শাড়িতে টিয়েপাখির ঝাঁক। সে চলে যাচ্ছে, রিবু ছুটেছে পিছনে পিছনে, ‘মা, মা,’ করে। এইরকম টিয়ে রঙা শাড়ি পরেছিল মা। সেদিন। একটা টুকরো আছে রিবুর কাছে। সেই শাড়ির একটা টুকরো অংক খাতার ভিতরে রেখে দিয়েছে রিবু। এত্তটুকু টুকরো, কেইবা দেখবে? রোজ পড়তে বসার আগে শাড়ির টুকরোটা বের করে গন্ধ নেয় রিবু। মায়ের গন্ধ পেতে অনেক সময় লেগে যায়। তার আগে শুধু পোড়া পোড়া গন্ধে নাক জ্বলে যায় রিবুর। মায়ের শাড়িটা আগুনে পুড়ে গিয়েছিল। একটুখানি জায়গা শুধু পোড়েনি। সেটুকু পড়ে ছিল বারান্দার এক কোণে। সবাই পালাচ্ছিল পুলিশের ভয়ে। কেউ রিবুকে নিয়ে যায়নি।

গ্রামের লোকজন, তপনকাকুরা সবাই মিলে রিবুর মাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা একসময় ফিরে এসেছিল, রিবুর মা ফেরেনি। সারারাত বারান্দার এক কোণে মায়ের পোড়া শাড়ির টুকরোর মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে ছিল রিবু। সকালে পুলিশ এসে ওকে ডেকে তুলেছে। অনেক কথা জানতে চেয়েছিল পুলিশ রিবুর কাছে। কী হয়েছিল বাড়িতে?

কী হয়েছিল? শুধু আগুন আর আগুন হয়েছিল! আর লাল শাড়ি পরে আগুন নিয়ে ছুটছিল রিবুর মা। একবারও ওকে ডাকেনি। ভয়ে কাঁদছিল রিবু।

‘আগুন কে লাগিয়ে দিয়েছিল?’

আগুন? বাবা আর ঠাকুমা দুজনে। দেশলাই দিয়েছে বাবা। ঠাকুমা আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। কেরোসিন আছে না? ঢেলে দিয়েছিল রিবুর মায়ের গায়ে। মা ভিজে গিয়েছিল তেলে। মা চিৎকার করেছে। এদিক ওদিক যাচ্ছে আর যাচ্ছে। তারপর হাসপাতালে গিয়েছে। আর ফেরেনি এখনও।

কবেকার কথা এগুলো! দিদুমা ওকে নিয়ে এসেছে এই গ্রামে। এখানে নতুন স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছে। রিবু ছোট বাচ্চাদের ক্লাসে পড়ে।

হাঁসদের পাশ কাটিয়ে পুকুরের দিকে যেতে যেতে রিবুর মনে হল অনেকদিন মা ওর সঙ্গে আমপাতা জোড়া জোড়া খেলেনি। বিছানায় বসে বসে দুজনে বসে বসে খেলত। মা দু’হাত তুলে তালি দিত। ওর দুহাতের তালুতে তালি দিয়ে কেমন সুন্দর করে বলত,

‘আমপাতা জোড়া জোড়া

মারব চাবুক চড়বে ঘোড়া

ওরে বিবি সরে দাঁড়া

আসছে আমার পাগলা ঘোড়া...।’

আর যখনই মা বলত,

‘পাগলা ঘোড়া ছুটেছে

বন্দুক ছুড়ে মেরেছে,’

অমনি মা বন্দুকের মতো করে হাতের আঙুল তুলে ধরত রিবুর দিকে।

পুকুরের জলে কেউ নেমেছে। ডুব দিয়েছে জলে সে। জলে গোল গোল রিং হচ্ছে। ছোট গোল আস্তে আস্তে বড় হতে হতে জলে মিশে যাচ্ছে। কে আছে জলের ভিতরে? লাল লাল শাড়িতে টিয়ে পাখির ছাপ দেখেছে রিবু। তাহলে কি মা নাইতে এসেছে?

রিবু পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে দুলে দুলে ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’ বলতে লাগল। রোদ ছিটকে পড়েছে পুকুরের জলে। মাঝে মাঝেই জলে ঢেউ উঠছে। যেন কেউ সাঁতার দিচ্ছে। ডুব সাঁতার। মা ডুব সাঁতার দিত। রিবুকে চমকে দিয়ে হুট করে জল থেকে উঠে আসত। জল ছিটিয়ে দিয়ে হাসত মা। কিন্তু, বাড়িতে মাকে খুব বকত বাবা, ঠাকুমা, দাদু। কেন বকত ওরা, জানে না রিবু। মা যেদিন বাবার কাছে খুব মার খেত, সেদিন মা কাঁদত। রিবুকে বুকের ভিতরে টেনে ধরে কাঁদত। মা কাঁদলে রিবুর খুব কষ্ট হতো। ও ছোট, তাই বড়দের বকতে পারে না। মাকে ঠাকুমা আর বাবা মিলে সবসময় বকাবকি করে। মারে। ঠাকুমা মাকে খেতে দেয় না। সব জানে রিবু। সব দেখে ও। মায়ের বুকের মধ্যে ঢুকে ও কুঁকড়ে থাকে।

দিদুমা ওকে খুঁজতে খুঁজতে পুকুরের পাড়ে এসে দেখে ছেলেটা একা একা দুলে দুলে ‘আমপাতা জোড়া জোড়া’ খেলছে। শূন্যে হাতদুটো ছুড়ে দিচ্ছে বারবার। দিদুমা তাড়াতাড়ি করে এসে রিবুকে কোলে তুলে নিল, ‘কী করছ সোনাবাবা? জ্বর আসেনি তো?’

রিবুর কপাল ছুঁয়ে তাপ পরীক্ষা করে দিদুমা। গা ফের গরম হচ্ছে। যখনই মাকে দেখে ছেলেটা, তখনই জ্বর আসে ওর। আবার চট করে ছেড়েও যায়। মা আসে ছেলের জ্বর ছাড়িয়ে দিতে। মেয়েটা মরেও মরতে পারছে না। মায়ার টানে আটকে আছে।

চোখের জল মোছে দিদুমা। মেয়েটাকে পুড়িয়ে দিয়েছিল ওরা। কেন আজও মেয়েটা ঘুরে বেড়ায় যন্ত্রণা নিয়ে! বাবা, ঠাকুমা, দুজনেই হাজতবাস করছে পুড়িয়ে মারার অপরাধে। ফাঁকা বাড়িতে ঘাস গজাচ্ছে। ওই অপয়া বাড়িতে আর নাতিকে পাঠাবে না দিদুমা।

বয়সের কারণে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে রাধুমণি মন্ডল। তাছাড়া প্রমাণের অভাব ছিল যথেষ্ট। তাকে কেউ পুত্রবধুর গায়ে আগুন দিতে দেখেনি রিবু বলেছিল, মায়ের গায়ে আগুন দিয়েছে বাবা। আর ঠাকুমা দেশলাই দিয়েছিল বাবাকে। যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায় রাধুমণি জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। বাড়িঘর সাফ করে নাতিকে আনতে গিয়েছিল। রীতিমতো দাবি জানিয়ে নাতিকে প্রায় কেড়ে এনেছে। রিবুও খুব আপত্তি করেনি দিদুমাকে ছেড়ে আসতে। দিদুমা কেঁদেছে। কিন্তু দাবি জোরদার করতে পারেনি। দাদু বলেছে, রিবু যাক। আমার লোক আছে ওই গ্রামে। তারা আমাকে রিবুর খবর দেবে। কোনরকম অত্যাচার যদি করে বুড়ি, এবারে আর জেল থেকে বের হতে হবে না।’

রিবু চলে গেল ঠাকুমার হাত ধরে। স্কুলের ব্যাগে করে ওর জামা প্যান্ট, দুটো বই দিয়ে দিয়েছে দিদুমা। রিবু সঙ্গে করে নিল মায়ের পোড়া কাপড়ের টুকরোটি।

এই বাড়িতে এসেই মায়ের গায়ের গন্ধ পেল রিবু। অথচ দেখ, ঘরের কোনও জায়গায়, বাড়ির চারপাশে মায়ের চিহ্ন বলতে রিবুর কাছে রাখা সেই কাপড়ের পোড়া অংশটি। চারদিকে মাকে খুঁজে না পেয়ে রিবু বারান্দার ধুলো ভরা জায়গায় চুপচাপ বসে থাকল। ঠাকুমা ঘরের ভিতরে কী করে চলে খুটখাট, মুখে বিড়বিড় করে রিবুর গুষ্টির তুষ্টি করে চলেছে একটানা। রিবুই নাকি বাবা আর ঠাকুমাকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। ও যদি না বলত বাবা, ঠাকুমা মিলে মাকে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে, তাহলে কি আর ওরা ধরা পড়ত? গ্রামে মুখ দেখানো কঠিন হয়ে পড়েছে। জেল ফেরত মহিলাকে কেউ জলের কলে পর্যন্ত দাঁড়াতে দিচ্ছে না। কথাও বলছে না চেনা পরিচিতরা। ঠারেঠোরে কথা শুনিয়ে চলেছে। এসব কি রিবুর জন্য নয়? যেমন মা, তার তেমন ছা!

কথাগুলো কানে আসছে বলেই রিবু ভয় পাচ্ছিল। বারান্দার এককোণে সিঁটিয়ে বসেছিল ও। স্কুলব্যাগটা ঘরের ভিতরে। ওর ভিতরেই মায়ের শাড়ির টুকরো আছে। রিবুর ভয় করছে। ঠাকুমা যদি স্কুলব্যাগ খুলে কাপড়ের টুকরোটা পেয়ে যায়? আস্ত রাখবে না রিবুকে!

‘এই ছেলে, এটা কী রে? মায়ের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে রেখেছ? আজই সব দূর করে দেব।’ বলতে বলতে ঠাকুমা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাতে মায়ের শাড়ির টুকরোটা।

রিবু ভয়ে চোখ বুজে ফেলেছে। ঠিক ঠাকুমা স্কুলব্যাগটা খুলেছে! দেখতে গিয়েছে মামাবাড়ি থেকে আসার সময় রিবু কী নিয়ে এসেছে। সেটা দেখতে গিয়েই এই যত্নে রাখা টুকরোটা পেয়েছে ঠাকুমা।

রিবুর দিকে তাকিয়ে ভ্রু তুলে মুখ বেঁকিয়ে কেমন একরকম চোখ করে তাকাল ঠাকুমা। তারপর উঠোনের কোণে জমিয়ে রাখা একগাদা শুকনো পাতার দিকে ছুড়ে ফেলে দিল মায়ের শাড়ির পোড়া টুকরোটা। তারপরেই দাপাতে দাপাতে দেশলাই নিয়ে শুকনো পাতার মধ্যে আগুন লাগিয়ে দিল।

রিবু অবাক হয়ে দেখে, ঠাকুমা কেমন সুন্দর আগুন লাগাতে শিখেছে। একটা কাঠি দিয়ে আগুন ধরাতেই আগুন লাফিয়ে লাফিয়ে উঠেছে। লাফিয়ে উঠে উঁচু হচ্ছে আগুন। আরও ওপরে উঠবে কি? ভাবল রিবু। মায়ের শাড়িটা পুড়ে যাচ্ছে? মায়ের কি আবার পুড়ে যাওয়ার মতো যন্ত্রণা হচ্ছে? রিবুর খুব কান্না পাচ্ছে। রিবু কাঁদতে পারছিল না। আগুনের তাপ ওর পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। এদিকে আসবে নাকি আগুন? ভয়ে উঠে দাঁড়াল ও।

না তো! আগুন যে ঠাকুমার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! ছুটছে যেন আগুনের ঝোপ। একদিক লক্ষ্য করে সে ছুটে যাচ্ছে। অন্য কোনও দিকে যাচ্ছে না। যেন রিবুর ঠাকুমাকে ধরে ফেলবে বলেই আগুনের মণ্ডটা ছুটে যাচ্ছে।

ঠাকুমা প্রথমে বুঝতে পারেনি। পরে প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে ছুটতে শুরু করেছে। কিন্তু আগুন থেমে থাকেনি। সে সমান তালে ছুটে যাচ্ছে ঠাকুমার দিকে। গনগনে, দাউদাউ, লাল শিখার আগুন টিয়ে পাখির মতো করে উড়ে যাচ্ছে ঠাকুমার দিকে।

ঠাকুমা ‘ওরে বাবারে’ বলেই ছুটেছে পুকুরের দিকে। রিবু বারান্দা থেকে নেমে আগুনের পিছনে ছুটেছে। দেখবে না কোথায় যাচ্ছে আগুনটা? ঠাকুমা ঝোপঝাড়, ঘাসে ছাওয়া সরু রাস্তা দিয়ে পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়ল নাকি? ঝপাং করে শব্দ উঠেছে! ঠাকুমা জলে ঝাঁপিয়েছে! কে না জানে জল আগুনকে নিভিয়ে দেয়? আগুন জলকে ভয় পায়! ঠাকুমাকে আর ধরতে পারবে না আগুন।

রিবু আশ্চর্য হয়ে দেখল, আগুনসুদ্ধ একদলা পাতার ঝোপ পুকুরের জলে ঝাঁপ দিয়েছে। রিবুর চোখের সামনে এখন পুকুরে আগুন জ্বলছে। পুকুরের সমস্ত জল ভয়ে জবুথবু হয়ে একেবারে কোণের দিকে চলে যাচ্ছে। আগুনকে কে ভয় পায় না?

ঠাকুমা কোথায়? ডুব সাঁতার দিচ্ছে? ডুব সাঁতার দিয়ে দিয়ে ওপাড়ে পৌঁছে যাবে ঠাকুমা। আর আগুন ধরতে পারবে না ঠাকুমাকে?

অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও ঠাকুমাকে জল থেকে উঠতে না দেখে ফিরে এসে বারান্দার কোণে ঘুমিয়ে পড়েছে রিবু। সেই কখন দিদুমার বাড়ি থেকে এসেছে। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে রিবু। ঘুম আসছিল ওর। বারান্দার কোণটিতে মায়ের পোড়া শাড়ির টুকরোটা বিছিয়ে রয়েছে ছেলের জন্য। আদর হয়ে অপেক্ষা করছিল। তার ওপরেই ঘুমিয়েছে রিবু।

চেঁচামেচি শুনে গ্রামের লোক এসে দেখে বাচ্চাটা অঘোরে ঘুমিয়ে আছে। বাচ্চাটিকে জাগিয়ে আশ্চর্য ঘটনার কথা শুনলেও ঠিকঠাক বুঝতে পারছে না গ্রামের লোক। তারাই ফোন করেছে রিবুর মামাবাড়িতে।

দিদুমা আর দাদু এসে পৌঁছেছে তাড়াতাড়িই। দিদুমা রিবুকে কোলে নিয়ে কথা বলছিল গ্রামের লোকের সঙ্গে। কী হয়েছে, কেউ জানে না। একটা চেঁচামেচি শুনেছে তারা। কিন্তু এসে কিছুই দেখতে পায়নি। বাচ্চাটা বারান্দায় ঘুমোচ্ছিল শুধু। ব্যাপার বুঝতে না পেরে দিদুমাকে খবর দিয়েছে তারা। কিন্তু কেউ রাধুমণি মন্ডলকে বাড়িতে এসে দেখেনি। সে নেই কোথাও। একগাদা পাতাপোড়া ছাই পড়ে আছে উঠোনের একপাশে।

রিবুর দাদু বাড়ির চারপাশ, বাগান, পুকুরঘাট সব দেখে এসে বলল, ‘তাকে তো কোথাও দেখলুম না। বাচ্চাটাকে জোর করে মামাবাড়ি থেকে নে’ এল কি ঢং দেখাতে? একা একা বাচ্চাটা পড়ে আছে বারান্দায়। বাচ্চার বাপ এখন জেলে। আর ঠাকুমার পাত্তাটি নেইকো। গ্রামের মানুষদের অনুমতি নিয়ে নাতিকে আমাদের কাছে নিয়ে রাখব।’ বিরক্তি নিয়ে দাদু বলে, ‘পুকুরে হাতমুখ ধুয়ে আসিগে। ফের অতটা রাস্তা যেতে হবে।’

পুকুরের নাম শুনে রিবু কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই দাদু চলে গিয়েছে। পুকুরের ঘাটে গিয়ে অবাক হয়ে গেল রিবুর দাদু। পুকুরে একফোঁটা জল নেই! এখন বর্ষার সময়। অথচ পুকুর দেখে মনে হচ্ছে বড়সড় পোড়া খাল। এ গাঁয়ে কি বৃষ্টি হয়নি?

কে সে প্রশ্নের জবাব দেবে? এক দিতে পারে রিবু। বাচ্চার আবোল তাবোল কথাকে কে আর বিশ্বাস করে। তাছাড়া রিবু এখন ব্যস্ত। দিদুমার সঙ্গে দিদুমার বাড়ি চলে যাচ্ছে ও। ঠাকুমা পুকুর থেকে উঠতে পারেনি। আগুন তাড়া করেছিল ঠাকুমাকে। কেউ বিশ্বাস করে না ওর কথা। বাচ্চা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল। রাধুমণি বাচ্চাকে ফেলে পালিয়েছে। জেলফেরত আসামি, কোথায় গিয়ে আড্ডা গেড়েছে কে জানে!

মায়ের পোড়া কাপড়ের টুকরোটা গুছিয়ে নিয়ে স্কুলব্যাগে ঢুকোচ্ছিল ও। এই টুকরোটা কী করে না পুড়ে বেঁচে গেল, ও জানে না। কিন্তু, মায়ের গন্ধটা সঙ্গে সঙ্গে যাচ্ছে, রিবুর ভারি আনন্দ হচ্ছে। মা ফিসফিস করে যেন। নাকি বাতাস বয়ে যাচ্ছে কানের পাশ দিয়ে? আমপাতা জোড়া জোড়া...! আজ খেলবে রিবু, মায়ের গন্ধের সঙ্গে।

দূরে দাঁড়িয়ে বেড়ালটা ওকে দেখছে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখে একলাফে চলে গেল ওদিকে ঘাসের জঙ্গলের দিকে। আর দেখা গেল না বেড়ালটাকে। উঁকিঝুঁকি দিয়েও দেখতে পেল না রিবু।

মায়ের গায়ের গন্ধটা তীব্র হচ্ছে। রিবু জানে, আজ ওর জ্বর আসবে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%