সাগরিকা রায়

আকাশে তৃতীয়ার চাঁদ। আলো অল্প। গাছের ছায়ায় মাটি খানিক ঢাকা, খানিক ঝাপসা আলোয় মাখামাখি। আর কদিন পরে হলুদ চাঁদ আকাশ জুড়ে হাসবে। মণিময় বাঁধানো বেদির ওপর বসে পড়ল। সায়ন নীরব চরাচরের দিকে তাকিয়ে কেঁপে উঠল কেন জানে না। এই মহুলপুরে এসে স্বস্তি পাচ্ছে না ও। আসলে মণিময় বারবার এখানে আসতে বলায় আর অগ্রাহ্য করতে পারেনি। কেবল একটা কৌতূহল ছিল। মণিময় এত উদ্বিগ্ন কেন! এমন ডাকাডাকি করছে বারবার!
চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে সায়ন। এস এস সি দিয়েছে। এবার থার্ড টাইম। মনে হচ্ছে এবারে সাকসেস আসবে কারণ পরীক্ষা ভালো হয়েছে ওঁর! মণিময়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব সেই কলেজ লাইফ থেকে। মনের মিল থাকায় সম্পর্ক পড়াশোনার শেষেও অটুট রয়েছে। ইদানীং দেখা সাক্ষাৎ হয় না। কিন্তু ফোনে নিয়ম করে যোগাযোগ রেখেছে ওরা। পরীক্ষা ছিল বলে কিছুদিন খুব ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে গেছে। সায়নের মেজাজ খুশ ছিল পরীক্ষা দিয়ে। সেকথা জেনে মণিময় চেপে ধরল, ‘এবারে ছুটি পাচ্ছিস কিছুদিন। এখন আসতেই হবে আমাদের বাড়ি। অনেক কথা আছে।’
ছ’মাস হল সায়নের বাবার হার্টের বাইপাস সার্জারি হয়েছে। সায়নের ইচ্ছে ছিল না বাবাকে ছেড়ে বাইরে যাওয়ার। কিন্তু মধুদি আর মা জোর করল, ‘যা, ঘুরে আয়। সবচেয়ে বড় কথা হল, বাবা এখন অনেক ভালো। ডাক্তারকাকু নিয়মিত চেক আপে রেখেছেন। চিন্তা নেই।’
চিন্তা নেই বললেই কি চিন্তা থাকে না? বরং আরও বেশি বেশি থাকে। চিন্তা নামের বিচ্ছিরি প্রেতটা সারাক্ষণ আশেপাশেই ঘুরঘুর করতে থাকে। এদিকে মণিময় সেদিন অনেক রাতে ফোন করল। সায়ন একটি থ্রিলার নিয়ে সবে বিছানায় ঢুকে পড়েছে। মোবাইল স্ক্রিনে মণিময়ের নাম দেখে অবাকই হয়েছিল। এত রাতে...? মণিময় আর্লি রাইজার বলে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে যায়। এত রাতে জেগে আছে আজ? প্রশ্নটা করে ফেলেছে সায়ন। সে কথার জবাব না দিয়ে মণিময় জানতে চেয়েছে সায়ন মহুলপুরে যাওয়ার ব্যাপারে কিছু ভেবেছে কিনা। সায়নকে খুব দরকার মণিময়ের। শেষের বাক্যতে এসে মণিময় কেমন রহস্যময় সুরে গলা নামাল, ‘আমি খুব অসহায় বোধ করছি রে! খুব দরকার তোকে!’
সায়নের মন খারাপ হয়ে গেল মণিময়ের গলা শুনে। এমন কী হল, মণিময়ের মতো হাসিখুশি ছেলে মনমরা হয়ে পড়েছে? সায়ন কথা দিয়ে দিল, ‘যাচ্ছি। আগামী পরশু।’
বাবা, মায়ের থেকে পারমিশন আগেই পাওয়া গিয়েছে। সায়ন ব্যাগ গুছিয়ে নিল। হাওড়া স্টেশন থেকে দিঘাহাওড়া বাসে উঠে মেচেদায় নেমে পড়ল সায়ন। এখান থেকে মহুলপুরে যাওয়ার বাস ধরতে হবে। সারাদিনে দুটো বাস যাতায়াত করে। সায়ন পানের দোকানির থেকে বাসের তথ্য জেনে নিল। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে বাস এল। গ্রাম দেশের বাস যেমন হয়, তেমনই খানিকটা নড়বড়ে, ভিড় ঘিজঘিজ বাস।
সায়ন বাসে উঠে খানিক পরেই বসার জায়গা পেয়ে গেল। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল মাঠের পর মাঠ বাসের সঙ্গে সঙ্গে ছুটছে। বেলা পড়ে এসেছে বলে চারপাশ ঝিমিয়ে পড়েছে। শরৎকাল শেষ হয়ে হেমন্তর দিকে ঝুঁকে পড়েছে কেবল। শেষ বিকেলের বাতাসে হিম হিম গন্ধ। বাসটা ছুটতে ছুটতে দুটো গ্রাম পেরিয়ে সন্ধে হব হব সময়ে এসে থামল মহুলপুরে। একটা বিশাল বটগাছ হল বাস স্ট্যান্ড। বাস থামতেই দু-চারজন লোক নেমে হুড়ুম ধুড়ুম করে মাঠের ওপর দিয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। সায়ন বুঝল ওরা বোধহয় শর্টকাট করছে। কিন্তু সায়ন কোনদিকে যাবে এখন?
মণিময়কে ফোন করল সায়ন। মণিময় জানাল, শম্ভুদা সায়নকে আনতে রওনা হয়েছে। চিন্তা নেই। শম্ভুদার নামটা প্রথম শুনল সায়ন। এর আগে কখনই শম্ভুদা নামের কারও কথা শোনেনি সায়ন। কে এই শম্ভুদা? যাকগে, পরে জানা যাবে। কিন্তু শম্ভুদা কোথায়?
‘এখেনে আমি, দাদা।’
চমকে তাকিয়ে পেছনে মুখ ঘুরিয়ে সায়ন দেখে লম্বা চওড়া কুচকুচে কালো লোকটির চোখের সাদা অংশ বড্ড বেশি! ঝট করে মনে হয় যেন চোখে মণি নেই মোটেই! সায়ন প্রথমে থতমত খেয়ে গেল। লোকটি হাসে না। হয়তো স্বভাবটাই এই রকম। কিন্তু লোকটা থট রিডিং জানে নাকি!
‘আমার আসতে খানিক দেরি হল। ভয় পাননি তো?’ লোকটা অকারণে সাফাই দিচ্ছে যেন বলে মনে হল সায়নের।
ভয় মানে? কীসের ভয়? মণিময় কিছু বলে দেয়নি। ভয় থাকলে অবশ্যই বলে দেওয়া উচিত ছিল। না জেনেই সায়ন হয়তো কোনও ঝামেলায় পড়ে যেত!
‘ঝামেলা যদি বলেন, তাহলে ঝামেলা। নাহলে কিছুই না। চলেন। হাঁটতে পারেন তো? নাকি রিসকা ডাকব?’ লোকটা হাঁটতে শুরু করে পেছন ফিরে তাকাল।
সায়ন অবাক হয়ে গেল। ও মনে যা ভাবল, শম্ভুদা সেটাই বলে দিল! শম্ভুদার কথা শুনে চারপাশে তাকিয়ে রিকশা দেখতেও পেল না। অগত্যা হন্টন। সন্ধের আলো এই ছায়া, এই আবছা আলোর মধ্যে কারিকুরি খেলছে। দূরে দূরে বাড়ি ঘরের আবছা আভাস দেখা দিতে দিতে ছাই ছাই চাদরে শরীর ঢেকে নিচ্ছে। একটা মাঠের দিকে নেমে যেতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল শম্ভুদা। কী ভেবে তৃতীয়ার একচিলতে চাঁদের দিকে মুখ তুলে তাকাল। চাঁদটা একটুখানি মুখ বের করে বোধহয় শম্ভুদাকে দেখল। পরেই হালকা হালকা মেঘের মধ্যে ভেসে গেল।
‘নাগো। অই পানে একখান সরু পথ আছে। অদিকটা দিয়ে যাই।’ বলে ব্যাক করল শম্ভুদা। মাঠের দিক দিয়ে সরে এসে বাঁ-দিকের সরু পথটা ধরল, ‘দেখো, বেশি ডাইনে পা দিয়ে চলতে যেও না! সোজা গর্তে পড়বে।’
সায়ন ত্রস্ত চোখে ডান দিকে তাকাল। অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে ইত্যবসরে। এদিকে গর্ত বা কোথায় কে জানে! এখন মানে মানে মণিময়ের বাড়িতে পৌঁছতে পারলে বাঁচা যায়! এত রাত হয়ে যাবে, বুঝলে আরেকটু আগে বাড়ি থেকে রওনা হওয়া যেত। মা ঠিকই বলে। যে-কোনও অচেনা জায়গায় দিনে দিনে ঢুকতে হয়! রাতের চেহারা অন্যরকম! সাহায্য পাওয়ার আশা প্রায় থাকে না বললেই হয়! এখন অবশ্য শম্ভুদা আছে। তবু এই লোকটাকেই অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে!
বাপরে! হাঁটছে কী শম্ভুদা! ধাঁই ধাঁই করে হেঁটে চলেছে! এত তাড়া কেন? সায়ন হাঁপিয়ে পড়ল। শম্ভুদা পেছন ফিরে হাঁক পাড়ল, ‘তাড়াতাড়ি যেতে হবে যে! এট্টু তাড়াতাড়ি করলে ভালো হয়! দিনকাল ভালো না। ওদিকে কী হচ্ছে কে জানে!’
সায়ন ফ্যাকাশে অন্ধকারেই দাঁড়িয়ে পড়ল। কী বলল শম্ভুদা? ওদিকে মানে? কোনদিকে? কী হচ্ছে সেদিকে?
আকাশে চাঁদ এই সময় মেঘ ফুঁড়ে মুখ বাড়াল। চাঁদের আলোয় সব কেমন নিস্তব্ধ দেখাচ্ছে। যেন প্রাণের অস্তিত্ব নেই কোথাও। উল্টো দিক থেকে কেউ একজন বউ দ্রুত হেঁটে আসছে। মাথায় ঘোমটা টানা। শম্ভুদা রাত চিরে ফেলে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে যাও? এই সময়ে কে যাও?’
বউটি শম্ভুদার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে এক ভাবে হেঁটে আসছে। যেন ওদের ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে! শম্ভুদা বিকট চিৎকার করে উঠে এক হাত দিয়ে সায়নকে বেড় দিয়ে রাখল, ‘এই! এদিক পানে আসপে না বলে দিচ্ছি! দাঁড়াও! দাঁড়াও!’
বউটি প্রায় ছুটে এসে ওদের ভেদ করে চলে গেল। সায়ন কিছু বুঝতেই পারল না! বউটির সঙ্গে ধাক্কা লাগার ভয়ে ও খানিক পিছিয়ে যেতে চাইছিল। কিন্তু তার আগেই মহিলাটি ওদের ভেদ করে চলে গেল। সায়ন কোন ধাক্কা অনুভবই করল না! আশ্চর্য! মহিলাটি যেন বাতাস দিয়ে তৈরি! পেছন ফিরে তাকিয়ে আরও অবাক হল। কেউ নেই এই চরাচরে! এইমাত্র যদি বউটি পেছনদিকে গিয়ে থাকে, তাহলে ওদের কাছাকাছির মধ্যেই তো থাকার কথা! কিন্তু পুরো এলাকার মধ্যে কেউ নেই কোথাও! শম্ভুদা ওর হাত ধরে টান দিয়ে চলতে শুরু করেছে ততক্ষণে, ‘তাকিও না গো! সামনে তাকাও। পেছনে তাকিয়ে দেখতে নেই।’
‘কী হবে তাকালে?’ ভয়ে, কৌতূহলে প্রশ্ন না করে পারল না সায়ন।
‘সে তোমাকে টানবে নিজের দিকে! এটাই ওদের দস্তুর। নিয়ম। একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছ? কেউ ছুটে আসতেছে যেন? পায়ে তার মল পরা। মলের শব্দটা শোনো। তাকাবে না মনে রেখো। শব্দটা শোন। খন খন খন খন!’
সায়ন শুনতে পেল সত্যি কেউ ছুটে আসছে যেন! পায়ের মলের শব্দ উঠেছে খন খন খন! রুপোর একগোছা মল পরেছে যে আসছে। ছুটে এদিকেই আসছে।
‘কে আসছে শম্ভুদা?’
‘এ কে, সে আমি এখন বোঝাতে পারব না। মাঠের পথে এইজন্য নামিনি। অথচ আমাদের সে ছাড়েনি। আসছে সে। যে এইমাত্র উল্টোদিক দিয়ে এসেছে! চল চল। এরা মানুষ নয়। পিশাচী। পায়ে রুপোর মল ভেবেছ? আছে। তবে তা মরা মানুষের পাঁজরের হাড় দিয়ে তৈরি! শ্মশান মশানের জীব। এদের কথা ভাবতে নেই। ভাবনার পথ ধরেই ঢুকে পড়বে মনে। মন থেকে শরীরে।...যাক, এসে পড়েছি। ওই যে আমাদের বাড়ির সামনের বটের বাঁধানো বেদি দেখতে পাচ্ছি।...শব্দটা আর নেই, শুনেছ? গেছে!’
এখন আঁধার বড় নির্মম। শক্ত ঢালের মতো। চোখ ভেদ করে না। কিন্তু শম্ভুদা দেখছে! দেখতে পাচ্ছে! বটের বেদি দেখেছে শম্ভুদা, কাজেই বাড়ি খুব দূরে নয় নিশ্চয়! সায়ন শম্ভুদার হাত ছাড়িয়ে দ্রুত হেঁটে চলে যাবে মনে করেছিল। কিন্তু শম্ভুদা শক্ত হাতে সায়নকে ধরে রেখেছে, ‘হুড়োতাড়া করনি গো। এসে গেছি।’ বলতে বলতে একখানি আলো হাতে কেউ এগিয়ে আসছে দেখা গেল। শম্ভুদা হাঁক পাড়ল, ‘যাদব নাকি? বেশি এগিয়ে এসোনি। আমরা এসে গেছি। দুবার শ্বাস টানো। এরি মধ্যে পৌঁছে যাব।’
সায়নরা যখন মণিময়ের বাড়িতে পৌঁছল, তখন সন্ধের রঙ কালোর দিকে ঝুঁকেছে অনেকটা। বিশাল বাড়ি ওদের। প্রাসাদোপম বলা যায়। মণিময় যথারীতি আপ্লুত সায়নকে পেয়ে। বহুদিন পরে দেখা হলে যা হয়! দুজনেই কুশলাদির পরে একসময় চুপ করে পরস্পরের দিকে তাকাল। মণিময়ের চোখে বিব্রত ভাব। সায়নের চোখে প্রশ্ন। কেন মণিময় ওর হেল্প চেয়েছে? এখানে হচ্ছেটাই বা কী? অনেক অনেক প্রশ্নের জবাব চাই সায়নের।
মণিময় স্বাভাবিক সুরেই ওকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল। গ্রাউন্ড ফ্লোরের বিরাট হলঘরে প্রাচীনত্বের ছোঁয়া। দেওয়ালে বর্শা, খাঁপে ঢাকা তরোয়াল আড়াআড়ি ভাবে রাখা। ব্রোঞ্জের নারীমূর্তি। দামি কার্পেট। কৌচ। সিল্কের কভার দেওয়া তাকিয়া। ভারী ভারী ঘন রঙের পর্দা। অবাকই হল সায়ন। মণিময়কে দেখে বনেদি ঘরের ছেলে বলে বোঝা গেলেও এমন জমিদারি–যাপনে আছে, বুঝতে পারেনি সায়ন।
ঘরের মাঝ বরাবর চওড়া সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার দিকে। মণিময়ের পেছন পেছন সিঁড়ি ভাঙছিল সায়ন। দেওয়ালে পরপর বশানুক্রমিক ভাবে রাজকীয় পুরুষদের অয়েল পেন্টিং। সিঁড়ি শেষ হয়ে লম্বা করিডর। ভারি নিশ্চুপ চারধার। কারও অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে না! একটা ভারী পর্দা দেওয়া ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল মণিময়। আস্তে দরজায় টোকা দিতেই দরজা খুলে গেল। মধ্যবয়সি একজন মহিলা দরজা খুলে সরে দাঁড়ালেন। খোলা চুল কোমর ছাপিয়ে নেমেছে নীচে। চোখে ক্রুরতার সঙ্গে রহস্যময় হাসি। এ কে? ভেতরে বিশাল খাটে বসে আছেন শীর্ণকায় পুরুষ। চোখের দীপ্তিতে মৃত্যুর ছায়া। গাল চুপসে গেছে। কে ইনি?
‘আমার বাবা! বাবা মরতে বসেছেন। অথচ মাত্র তিনমাস আগেও বাবার চেহারা টগবগে...অন্যরকম ছিল! বাবা শুকিয়ে যাচ্ছেন। মৃত্যু এসে মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে! অথচ, কিচ্ছু করার নেই। কোনও ডাক্তার রোগ ধরতে পারছে না!’
‘এমন হয়েছে কেন?’ সায়ন বুঝতে চেষ্টা করল।
‘সে অনেক কথা। আমি সব বলব বলেই তোকে ডেকেছি। আমার বন্ধু বলতে তুই! আর কাকেই বা বলি! আয় এদিকে, বাবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দি।’ বলে মণিময় সায়নের হাত ধরে এগিয়ে গেল ওর বাবার দিকে।
‘বাবা, এই আমার বন্ধু সায়ন। ওর কথাই বলেছিলাম।’
সায়নের বাবা অনচ্ছ চোখ তুলে সায়নকে দেখলেন। মুখে কিছু বলার মতো শক্তি নেই বলে মনে হল সায়নের। মণিময় ওকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।
চা, কফি, নানারকম খাবার সাজানো ছিল। খিদে ছিল। সায়ন খাবার খেল পেটপুরে। মণিময় কফি নিল। তারপর বাড়ির বাইরের বাঁধানো বটগাছের নীচে বসল ওরা। রাত নেমে আসছে। মণিময় বোধহয় কীভাবে শুরু করবে ভাবছিল।
বেশ কিছুদিন আগে পাশের গ্রামের জোতদার অজিত চোঙদারের সঙ্গে বিবাদ চলছে মণিময়ের বাবা রত্নময় সিকদারের। একশো বিঘে জমি নিয়ে এই বিবাদ। প্রথমে ব্যাপারটা আলাপচারিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেটা ক্রমে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। অজিত চোঙদার ভালো লোক নয়। সে শাসিয়েছে এর শেষ দেখে ছাড়বে। এরপরই মণিময়ের বাবা অসুস্থ হতে শুরু করেন। একদিন আচমকা পড়ে যান সিঁড়ি থেকে। তারপর থেকে হাঁটাচলায় অসুবিধে। অন্যের সাহায্য না নিয়ে চলাফেরা করতে পারেন না।
‘এই অবস্থায় কী করা উচিত?’ সায়ন কী করবে বুঝতে পারছিল না।
‘আসলে, শম্ভুদা বলেছিল, এটা রোগ নয়। কেউ জোর করে বাবাকে অসুস্থ করেছে। এর পেছনে বাবার কোনও শত্রু আছে। সে শত্রু আর কেউ না। অজিত চোঙদার। সে নাকি তান্ত্রিক দিয়ে বাবার পেছনে প্রেত লেলিয়ে দিয়েছে! জানি না কী সত্যি, কী মিথ্যে!’ মণিময় শ্বাস ফেলে, ‘তবে, বাড়ির ভেতরে একটা অদ্ভুত থমথমে ভাব ছেয়ে আছে। ভয় করে অজানা কারণে। সিঁড়িতে কার পায়ের আওয়াজ...রাতের অন্ধকারে কে ছুটে বেড়ায় সারা বাড়িময়...খন খন শব্দ হয়! সবার শরীর খারাপ হয়ে যাচ্ছে এসব কারণে!’
‘শম্ভুদা কে রে? কোথা থেকে পেলি?’
‘সেটাও একটা ঘটনা। আমাদের এই বাড়িতে মাধবদা ছিল। বাড়ি পাহারা দিত। সে মাধবদাকে সাপ কামড়েছিল। খবর পেয়ে ওর গ্রাম থেকে ভাই শম্ভুদা এল। মাধবদাকে সারিয়ে তো দিল। বাড়িতে পাঠিয়ে দিল রেস্ট নেওয়ার জন্য। আর নিজে রয়ে গেল এখানে। বলল, ‘তোমাদের সামনে ভারি বিপদ। আমাকে এখানে থাকতে হবে। এই বাড়ির চারপাশে মড়া মানুষের গন্ধ পাচ্ছি।’...সেই থেকে আছে। বাবা যেদিন পড়ে গেল, সেদিন শম্ভুদা বলল, ‘কাজ শুরু করে দিয়েছে কেউ। আমি খবর নিচ্ছি।’ দুটোদিন পরে শম্ভুদা খবর আনল। তখনই জানা গেল অজিত চোঙদার আর তার তান্ত্রিকের কথা। আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। কী যে করব!’ মণিময় শ্বাস ফেলল।
ছায়াচ্ছন্ন এই রাতের দিকে তাকিয়ে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে চেষ্টা করছিল সায়ন। আজ রাতের পরিবেশটা অন্যরকম! শম্ভুদার সঙ্গে আসার সময় সেই বউটা...সেই হাড়ের মল পরা কেউ একজনের ছুটে আসা...! মণিময় অস্বস্তিতে পড়ে আছে, এ আর এমন কী? আজ এসেই সায়নেরও অস্বস্তি হচ্ছে।
‘তোমরা বাইরে থেকো না গো। ভেতরে যাও।’ শম্ভুদা অন্ধকারে কখন এসে দাঁড়িয়েছে! কোনও শব্দই হয়নি তো! ভাবল সায়ন।
ওরা শম্ভুদার কথামতো বাড়ির ভেতরে গেল।
দুদিন পরে একঘেয়ে লাগল। এভাবেই শুয়ে বসে কাটাতে ভালো লাগছিল না। দিনের বেলায় একদিন অজিত চোঙদারের এলাকায় যাওয়ার জন্য তৈরি হলেও শম্ভুদার নজরে পড়ে গিয়ে আর যাওয়া হল না। সে রাতে সায়ন চুপিচুপি মণিময়ের বাবার ঘরে উঁকি দিয়েছে। প্রেত কি এই ঘরে আসে? উঁকি দিয়ে স্থবির হয়ে গেল সায়ন। আবছা অন্ধকার ঘরে শুয়ে আছেন রত্নময়। একটা লিকলিকে সরু সাপ পেঁচিয়ে রেখেছে তাঁকে! সাপটা সায়নকে দেখেছে মনে হল। চট করে মাথা তুলে তাকাল চকচকে কুটিল চোখ তুলে। তারপর সরসর করে নেমে যাচ্ছে শরীর থেকে! ভয়ে ছুটতে ছুটতে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে হাঁপাতে লাগল। এ-ই কি প্রেত!
কদিন পরে শম্ভুদাকে বেশ উদ্বিগ্ন লাগছিল। মণিময়ের বাবার শরীর আজ বেশ খারাপ। শম্ভুদা সবাইকে বাইরে বের হতে বারণ করেছে। সন্ধে নামতে আকাশ জুড়ে পূর্ণিমার বিশাল গোল চাঁদ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল মণিময়দের বাড়ির দিকে। মণিময়ের বাবাকে দেখাশোনা করেন যে মহিলা, তিনি পায়ের নুপুরের খন খন শব্দ করে চলে যাচ্ছেন গাছপালার আড়ালে...ওই দিকে! শম্ভুদা তাকিয়ে দেখে ইশারা করল, ‘ওকে বিশ্বাস করো না। ও চোঙদারের দূত। আমি ওর শরীর থেকে নরকের দুর্গন্ধ পেয়েছি। ও বাবুকে ভালো হতে দিচ্ছে না। ওকে দিয়ে বাবুর সেবা করিওনা গো। কেউ আমার কতা শুনছ না! কোথা থেকে এসে হাজির হল, আর ওকে রেখে দিলে সেবা করার কাজে! ছ্যা, কী বুদ্ধি তোমাদের!’
‘আমরা এখন একটু হেঁটে আসব শম্ভুদা। বাড়ির ভেতরে দম আটকে আসছে আমার!’ মণিময় উঠে দাঁড়াল।
‘হেঁটে আসতে চাও? বেশ, চল, আমিও সঙ্গে যাচ্ছি। আমার চাকুটা নিয়ে যাচ্ছি।’ওরা তিনজনে আস্তে আস্তে হাঁটতে শুরু করল। মনে চাপা অস্বস্তি ছিল। সারাদিন খুব টেনশনে কেটেছে। এখন খোলা হাওয়ায় বের হতে দিতে আপত্তি করেনি শম্ভুদা। কিন্তু নজরে রেখেছে চারপাশ। সায়নের মনে হল দূরে কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে ওদের। শম্ভুদাকে দেখাতেই শম্ভুদা একমুঠো বালি তুলে মন্তর পড়ে ছিটিয়ে দিল সায়ন আর মণিময়ের গায়ে। একটু পরে আর কাউকে দেখা গেল না। শিরশিরে ভয় কাঁপতে থাকল সায়নকে ঘিরে। কালই মহুলপুর থেকে চলে যাবে। এখানে প্রতি পদে ভয় জাল ছড়িয়ে আছে!
চরাচর নিস্তব্ধ! একটি মানুষ চোখে পড়েনি এতকক্ষণের মধ্যে। জ্যোৎস্নার ফকফকে আলোতে প্রকৃতি নিশ্চুপ হয়ে গেছে! কোথা থেকে লেবু ফুলের গন্ধ আসছে! অনেকদূরের কোনও মন্দিরে ঘণ্টা বাজছে। ঢং ঢং ঢং ঢং! এদিকে কোথায় মন্দির?
শম্ভুদা জবাব দিল না। ইশারায় দাঁড়াতে বলল। খোলা মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে সায়ন ভাবল মন্দির তাহলে কাছেই। ঘণ্টার শব্দটা ক্রমে কাছে এগিয়ে আসছে! খুব কাছে! কোনদিক দিয়ে আসছে শব্দটা? শম্ভুদা হঠাৎ আকাশের দিকে মুখ তুলে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সায়ন আকাশের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেল। চাঁদের গায়ে কালো ছায়া। একটি কালোমতো বস্তু মাঠের মাঝখানে নড়াচড়া করছিল! ছোট থেকে যত কাছে যাচ্ছে ওরা, ততই বড় হচ্ছে আকারে। মণিময় আতঙ্কিত, ‘সায়ন! ওটা কী?’
ততক্ষণে শম্ভুদা ওদের দুজনকে ঘিরে একটা লক্ষ্মণ রেখা টেনে দিয়েছে। মুখে অবিরাম বিড়বিড় করে চলেছে। ঘণ্টার শব্দ ক্রমে খুব কাছে, যেন ওদের মাথার ওপর দুলছে–-ঢং ঢং ঢং! শম্ভুদা আরেকটি বৃত্ত এঁকে নিল। জ্যোৎস্নায় শম্ভুদাকে একটা প্রেত বলে মনে হচ্ছে। বৃত্ত এঁকে শম্ভুদা দু’হাত মেলে হাঁক পাড়ল, ‘আয়! আয়! এইখানে আয়!’
সেই বস্তুটা সেই ভয়াল আহবানে সাড়া দিয়ে যেন গড়াতে শুরু করেছে মাঠের মধ্যে। বিজবিজে সুরে কেউ কথা বলছে ওই বস্তুটার ভেতর থেকে। ধীরে ধীরে শম্ভুদার আঁকা বৃত্তের ঠিক মাঝখানে গড়িয়ে গড়িয়ে এসে পড়ল। একখানা কালো কুচকুচে মাটির হাঁড়ি! বেশ বড় আকারের! দূরে থাকাতে একফোঁটা বিন্দু মনে হয়েছিল এটাকে। কোথা থেকে এসেছে এটা? কে রেখেছে?
‘আঁধার ফুঁড়ে এসেছে গো। এ হল আঁধারের জীব।’ বলে শ্বাস টানল শম্ভুদা ‘দেখ, এসব প্রেত-পিশাচের কাজ।’
হাঁড়ির ভেতর থেকে টানা গুনগুন কথা ভেসে আসছে! কেউ সুর করে কিছু বলছে। উঁকি দিল ওরা ভয়ে ভয়ে! এই জ্যোৎস্নায় কোনও অলৌকিক জগৎ থেকে ভেসে এসেছে এটা! কী আছে এতে!
একটা সদ্য কাটা হাতের পাঞ্জা হাঁড়ির ভেতরে। কাটা অংশ দিয়ে তখনও কাঁচা রক্ত পড়ছে। হাতে ধরা রয়েছে ছুরি। অদ্ভুত সুরে অদৃশ্য কেউ টানা বলে চলেছে, ‘রক্ত চাই! রক্ত চাই...।’
শম্ভুদা একবার মেঘ জড়িয়ে যাওয়া চাঁদের দিকে তাকাল। তারপরে কাটা হাতের থেকে ছুরিটা তুলে নিল। নিজের হাতের আঙুল কেটে রক্তের ফোঁটা টুপ টুপ করে ফেলল হাঁড়ির মধ্যে, ‘যা! যেখান থেকে এসেছিস, সেখানে রক্ত পাবি!’
যেন জিভ দিয়ে চেটে চেটে রক্তের স্বাদ নিল হাঁড়িটা। তারপর নড়ে উঠল। আস্তে আস্তে ওপরদিকে উঠে যাচ্ছে দুলতে দুলতে। ক্রমশ উঠে যাচ্ছে আরও ওপরে! একসময় চাঁদের আলোয় হাঁড়িটাকে একফোঁটা বিন্দুর মতো দেখাচ্ছিল।
শম্ভুদা বলল, ‘এখনই বাড়িতে ফিরতে হবে।’ বলে ওদের হাত ধরে ছুট লাগাল। পেছনে খন খন শব্দে কারা ছুটে আসছিল। আস্তে আস্তে শব্দ ক্ষীণ হয়ে এল। বাড়ির গেটের ভেতরে ঢুকে শম্ভুদা রত্নময় সিকদারের ঘরে দৌড়ে গেল। মণিময়ের বাবা নিঝুম হয়ে শুয়ে আছেন। সারারাত সমস্ত বাড়িতে আলো জ্বালিয়ে রাখল শম্ভুদা। নিজে জেগে বাড়িময় ঘুরে বেড়ালো।
ভোরে সাঙ্ঘাতিক খবর নিয়ে এল গ্রামের লোকেরা। পাশের গ্রামের অজিত চোঙদারকে কে বা কারা গলা কেটে খুন করেছে। দরজা সেঁটে ঘুমোচ্ছিল চোঙদার। সাড়া দিচ্ছে না বলে দরজা ভাঙা হয়েছে...। নিজের ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে চোঙদারের পরামর্শদাতা তান্ত্রিকের প্রাণহীন দেহ। তারও গলা কাটা।
শম্ভুদা চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভয় নেই। বাবু ভালো হয়ে যাবেন। ওই নারীকে ঢুকতে দিও না বাবুর ঘরে।’
সেই নারীকে বাড়ির কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। সে চলে গেছে। অথবা মিশে গিয়েছে বাতাসে। অন্ধকারের প্রাণী, অন্ধকারে ঢুকে গিয়েছে। আর ভয় নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন