পার্থিব অপার্থিব

সাগরিকা রায়

কুড়ি কুতকুতে চোখে তাকিয়ে দেখল। শুভ ঘরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। এরকম অদ্ভুত দৃষ্টির সামনে ভয় করে উঠল ওর। অথচ ভয় করার আক্ষরিক কোনও কারণ নেই! তবুও ভয় করে। এঘরে ঢুকলেই একটা অস্বাভাবিক ফিলিংস হয়। সায়ককে কথাটা বলবে ভেবেও বলেনি। দাদা অর্ককেও বলেনি। আসলে এসব কথা ঠিক বলার মতো নয়। অনুভবের। বুড়ি সম্পর্কে শুভর মাসিদিদা। মায়ের দূর সম্পর্কের মাসি। তিনকুলে থাকার মধ্যে আছে কেবল এক বোনঝি। শুভর মা। আসেন মাঝে মাঝে সম্পর্ক ঝালিয়ে নিতে। এবারেও এসেছেন। মাসখানেক থাকবেন।

ঢাকুরিয়ার বাবুবাগান লেনে মাসিদিদার মস্ত তেতলা বাড়ি। শুভ গিয়েছিল বার তিনেক মায়ের সঙ্গে। অনেক পুরোনো বাড়ি। দুশো বছরের ওপর নাকি বয়স। ওরকম একটা বাড়িতে যেতে ইচ্ছে করছিলই। গিয়ে কিন্তু ভালো লাগেনি শুভর। ঠিক এখন যে অস্বস্তি হচ্ছে, মাসিদিদার বাড়িতে পা দিয়েও একই অস্বস্তি হয়েছিল। শিরশিরে ভয় পা থেকে উঠে আসছিল সাপের মতো ঠান্ডা শরীর নিয়ে! আসলে বাড়ির ভেতরের জমাটি গল্পই টেনেছিল শুভকে। শুনেছিল ওই বাড়িতে ইতিহাসের একটি পাতা নাকি লুকিয়ে আছে লোকচক্ষুর আড়ালে। বহুকাল আগে, মাসিদিদার ঠাকুর্দার বাবা এই বাড়ি বানিয়েছিলেন। সে অনেককাল আগের কথা।

সিপাহি বিদ্রোহ চলছে। ১৮৫৭ সাল। সিপাহিদের তাড়া খেয়ে দুজন সাহেব এসে এই বাড়িতে লুকিয়েছিল। ফ্যামিলিসুদ্ধ। প্রায় দেড়মাস তারা লুকিয়েছিল। তেতলার কোণের ঘরে তাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ওদিকে সাধারণত কেউই যেত না বলে নিরাপদ ছিল ওদিকটা। আর, কলকাতায় বিপদের ভয় খুব কিছু ছিলও না। তবু, চর কোথায় থাকে না? চরের ভয়টাই বেশি ছিল মাসিদিদার ঠাকুরদার বাবার। সে বুড়োর নাকি বেদম সাহস ছিল। সেই সাহসে ভর করে সাহেব দুজনের ফ্যামিলিসুদ্ধ ঘরে নিয়ে তুলেছিলেন। চাকর বাকরদের তেতলার ঘরের দিকে যেতে দেওয়া হত না। বাড়িতে সযত্নে রটিয়ে দেওয়া হল, তিনতলায় ভূত দেখা গেছে! সে ভূতের নাকি আগুনে পুড়ে শরীর সাদা হয়ে গেছে। শুনে তো দুজন চাকর দেশে ভাগল। আরেকজন ক্ষণে ক্ষণে জ্ঞান হারাতে শুরু করলে পুকুরের ধারের কবিরাজবাড়ি থেকে হিতেন কবিরাজকে ডেকে আনা হল। সে এসে এমন কিছু পাতা পোতা নেই যা দেয়নি। সেসব খেয়ে পেশেন্ট হেগে মুতে একাকার!

যাই হোক, এটাই হয়তো বিধান ছিল কবিরাজি ওষুধের। বড় বাইরে করতে করতে সেটা নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর কথায় বলে হাগার নেই বাঘার ভয়। সে সেরে গেল। কিন্তু ভয় জমিয়ে রেখে ছিল বলে রোজ সন্ধের দিকে একটা নিমের বড়ি খেতে হত। এভাবেই সাহেবদের বাঁচিয়েছিলেন মাসি দিদার ঠাকুরদার বাবা।

দেড়মাস পরে পাথুরেঘাটা থেকে কে এক ধনী ব্যক্তির লোক এল খবর নিয়ে। সাহেবদের নাকি হোমে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। তারা যেন রেডি থাকে। সাহেবরা রাতের অন্ধকারে দুটো জুড়িগাড়ি চেপে চলে গেল। তবে কোথায় গেল, কীভাবে গেল সে খবর মাসি দিদার বাড়ির কেউ রাখেনি। তবে, যাওয়ার আগে সাহেবরা একটা স্মোকিং পাইপ দিয়েছিল, যার গা সোনায় মোড়া। আর দিয়েছিল ওয়াকিং স্টিক। দুটোই উত্তরাধিকার সূত্রে মাসি দিদার হাতে এসে পড়ে। এখনও মাসি দিদা যেখানে যান, ঢাকনা দেওয়া বাক্সের মধ্যে করে শাড়ি, জামা, তেল, চিরুনির সঙ্গে সেগুলোও থাকে বলে শুনেছে শুভ।

কেন ওগুলো সঙ্গে করে ঘোরেন দিদা? সোনায় মোড়া স্মোকিং পাইপের কারণ নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু ওয়াকিং স্টিক নিয়ে ঘোরা কেন? বাড়িতে বিরাট সিন্দুক দেখেছে শুভ। তো? সিন্দুকে না রেখে সঙ্গে করে ঘোরা কেন? মাঝে থেকে মাসি দিদা মনে করেন যে এঘরে আসছে, সেই সোনায় মোড়া পাইপ নিতে আসছে! লজ্জা করে এমন হলে। কেউ শুভকে চোর ভাবলে শুভ ছেড়ে দেবে? হোক সে গুরুজন। মাসি দিদার চোখের দৃষ্টিটাই অস্বস্তির শুভর কাছে! যেন শুভকে দেখেই চোখ দুটো বলতে লেগেছে, ও-ই চোর, ও-ই চোর!

এখনও শুভ ঘরে ঢুকতে গিয়ে থেমে গিয়েছে। বুড়ির চোখ ওকে অনুসরণ করছিলেন। শুভ ফিরে যাবে ভেবেও একবারের জন্য তাকাল। উঁচু গদিমোড়া নরম বিছানায় বড় বড় লেসের ঝালর দেওয়া বালিশে পিঠ রেখে শুভকে দেখছে মাসি দিদা। শুভ হাসার চেষ্টা করল, ‘ভালো আছ? মা বলছিল, তোমার শরীর ভালো নেই নাকি! দেখা করতে বলে দিয়েছে মা। তাই...!’

মুখে কথা নেই। চুপচাপ শুভকে দেখছে। শুভ দাঁড়াল না। মুখে একটা কিছু আছে। সেটাই চিবুচ্ছে মাসি দিদা।

চিবোক। শুভর মোটেই ইচ্ছে নেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খোসামুদে কথা বলার। ও মনে মনে বোঝে একটা ব্যাপার। সাহেবদের দেওয়া উপহার দুটোকে মহার্ঘ ভাবেন দিদা। সেই জন্যই সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ঘোরেন। কেউ পাছে নিয়ে যায়, ভয়ে সবাইকে সন্দেহ করে।

শুভ ইদানিং পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত আছে বলে মাসিদিদার ব্যাপারটা মন থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। রাত জেগে পড়াশোনা চলছে। সেদিন রাতে রিলিফ নিতে সোজা ছাদে চলে গিয়েছে। গরমের দিন। ঘরে এসি চালিয়েও ভালো লাগে না বেশিক্ষণ। হাড়ের ভেতরে কাঁপুনি ধরে যায় যেন। ওর কথা শুনে হাসে সবাই। কিন্তু অসুবিধেটা একান্তই শুভর। কাউকে বলে লাভ নেই। লোকসানও নেই।

ছাদে যাওয়ার সিঁড়িতে পা রেখে ওর মনে হল, কোথাও কেউ কথা বলছে। বাবাহ! এত রাতে কে কথা বলছে? কার সঙ্গেই বা বলছে? অনিসন্ধিৎসু মন বলে শুভ দাঁড়িয়ে থেকে বোঝার চেষ্টা করছিল শব্দটা আসছে কোথা থেকে! ঠিক কোন ঘরে কে কথা বলছে? রহস্যময় ব্যাপার। এতবড় বাড়ি। আত্মীয় স্বজনে ভরপুর। প্রায় সময়েই কাটোয়ার কাকা, ডায়মন্ডের মাসতুতো দাদা, উত্তরবঙ্গের কাজুদা, বর্ধমানের নরেশ জেঠু...কেউ না কেউ আসছেন। কেউ ডাক্তারের সঙ্গে কন্সাল্ট করে, কেউ কলেজের ব্যাপারে, কেউ জাস্ট কলকাতা বেড়াতে...!

সবাইকে চেনেও না শুভ। এই তো সেদিন শেওড়াফুলির কোন এক পিসি পুরো পরিবার নিয়ে হাজির। নাতি, নাতনিকে মিউজিয়াম দেখাতে নিয়ে এসেছেন। ওরা মমি দেখতে চায়। শুভর ওপরে ভার পড়ল নিয়ে যাওয়ার। অথচ সেদিনই শুভর কলেজ স্ট্রিটে খুব দরকার ছিল। হল না। ভদ্রতা বলে একটা কথা আছে। তেমনই কেউ হয়তো গালগল্প করছে ঘরে বসে। সেবার যেমন টুনিদিদু এসে সারারাত ঘুমোলেন না। বসে বসে রামায়ণের গান গাইলেন। কী ব্যাপার? ‘তোগো এহানে রাইত হয় না। আলো আর আলো। আন্ধার না অইলে ঘুম আহে?’ তেমন ঘটনাই হবে। ভেবে সোজা ছাদে চলে গেল শুভ। ছাদে তুমুল হাওয়ায় আরাম হচ্ছিল। ঘুম পাচ্ছিল। শুভ ভাবল, আগামিকাল ফোল্ডিং খাটটা নিয়ে এসে এখানেই ঘুমোবে।

ঘুরে ফিরে যখন নেমে আসছে, ফের সেই কথার আওয়াজ শুনতে পেল ও। কে এত রাত অব্দি কথাই বলে চলেছে, জানতে হবে। শুভ আস্তে আস্তে চওড়া বারান্দা দিয়ে হেঁটে হেঁটে প্রায় প্রতিটি ঘরের পাশ দিয়ে কান খাড়া করে যাচ্ছিল। এই ঘর থেকে কি কথার আওয়াজ আসছে? না। এভাবে একটার পর একটা ঘর পেরিয়ে যেতে যেতে এসে পৌঁছল মাসিদিদার ঘরের সামনে। এসেই দাঁড়িয়ে পড়ল।

হ্যাঁ। এই ঘরই হল কথার উৎসস্থল। ভেতরে কথা বলছে মাসিদিদা। কার সঙ্গে কথা হচ্ছে? আস্তে আস্তে দরজার ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করল শুভ। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। মানে দিদা ভেতরে যার সঙ্গে কথা বলছেন, সে দিদার আয়ামাসি হবে। দরজায় কান পাতল শুভ। খিটখিটে গলায় দিদা কাউকে ধমকাচ্ছেন, ‘কী দশা করেছিলাম, মনে আছে? ভেব না, দুর্বল হয়ে গিয়েছি। এখনও অমন দু-চারটে নামিয়ে দিতে জানি। ভালো চাও তো...!’ পরের কথাগুলো বোঝা গেল না।

আশ্চর্য যেমন হল, পাশাপাশি ভয়ও পেল শুভ। ভেতরে কী হচ্ছে কে জানে! কার কথা বলছে মাসিদিদা? কী দশা করেছেন এবং কার? অদ্ভুত ব্যাপার তো। নজর রাখতে হবে মাসিদিদার ওপরে। কিচ্ছু বুঝতে দেওয়া যাবে না। ভদ্রমহিলা কুচুটে বলেই মনে করত শুভ, এখন দেখা যাচ্ছে আরও অনেক রহস্য নিয়ে আছেন তিনি! তাঁর সম্পর্কে খোঁজ খবর করতে হবে। মন বলছে উনি একটা বড়সড় কোনও ক্রাইমের সঙ্গে যুক্ত। কাকে ধমকাচ্ছেন, সেটাও দেখতে হবে। কে আছে ঘরে?

প্রায় সারারাত পাহারা দিয়ে বসে রইল শুভ। কেউ বের হল না মাসিদিদার ঘর থেকে। কেউ ঢুকল না। ভোরবেলায় আয়া গরম জলের ফ্লাস্ক নিয়ে মাসিদিদার ঘরের দরজায় নক করেছে। ভেতর থেকে দরজা খুলে দিলেন মাসিদিদা নিজেই। শুভ ওইটুকু সময়ের মধ্যে লুকিয়ে ভেতরটা দেখে নিল। কেউ নেই ভেতরে। আশ্চর্য ঘটনা হল আয়া ঘরে থাকে না রাতে? দিদা একা থাকেন রাতে? কথাটা হয় কার সঙ্গে? স্বগতোক্তি? সেটা কেন?

কয়েকটা দিন নজর রেখে শুভ অবাক হল। যা ভেবেছে, ঠিক তাই। আয়া ঘরে থাকে না। অসুস্থ মানুষের জন্য রাতেই বেশি নজর দেওয়া দরকার। তো?

আয়াকে পেয়ে গেল ছাদে। সে দিদার শাড়ি শুকোতে এসেছিল। শুভ সরাসরি জিজ্ঞাসা করা উচিত মনে করল না। দিদার কানে কোনও ভাবে যেন কথাটা না পৌঁছয়, যে, শুভ দিদার ব্যাপারে খোঁজ নিচ্ছে।

‘মাসি, দিদার ঘুম ভালো হয় তো রাতে? ওয়াশরুমে কি একাই যান?’

আয়া আমতা আমতা করে, ‘আমি, আসলে, তিনি আমাকে রাতে ঘরে থাকতে দেন না। বলেন, ঘরে লোক থাকলে তাঁর অসুবিধে হয়। তাই আমি বাইরের ঘরে শুয়ে থাকি।’

‘মা জানে? ধর, দিদার যদি রাতে শরীর খারাপ করে, তখন তোমার ঘাড়ে দোষ পড়বে যে তুমি দেখাশোনা করনি।’

‘সে আমি জানি। কিন্তু তিনি বলেন লোক থাকলে তিনি দূর করে দেবেন চাকরি থেকে। কী করব বল ভাই?’

শুভ কথা বাড়াল না। খবর পেতে হলে মাসিদিদার বাড়িতে যেতে হবে। দিদার জীবনের একটা অংশ ঢাকা পড়ে আছে ওই বাড়িতে। কার কী দশা করেছিলেন দিদা, সেটা জানতে হবে।

শুভ কলেজে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে গেল। ঢাকুরিয়ায় যেতে হবে। ওখানে যারা বাড়িঘর দেখাশোনা করে, তারা শুভকে চেনে। শুভ খানিকটা সময় ওখানে কাটিয়ে আসবে। দাদাকে বা সায়ককে জানাল না কিছু। বলে, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট।

স্টেশন থেকে রিকশা নিল শুভ। বাবুবাগান লেনে পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগার কথা। এদিকে খুব বেশি আসা হয় না। মাসিদিদার বাড়ি পুরোনো দিনের ছাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুভ বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যেতেই অভিরামদার দেখা পেল। সে বাইরে ছিল। ওকে দেখে প্রথমে চিনতে পারেনি। পরে অবশ্য বুঝতে পেরে ভারি অবাক হল। ‘মাইজি এখানে নেই। মাইজি তো তোমাদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে।’

‘আরে হ্যাঁ। আমি এদিকে এক বন্ধুর বাড়িতে এসেছিলাম। ভাবলাম তোমাদের সঙ্গে দেখা করে যাই। মাসিদিদা ভালো আছে। তা, তোমরা কেমন আছ? দেশের বাড়িতে যাবে না?’

‘নেহি দাদা। এখানে থাকতে হবে। মাইজি আমাকে থাকতে বলেছে। বাড়ির দেখভাল করতে বলেছে। এখন আমি কী করে যাব?’

‘সে তো ঠিক। তুমি অনেকদিন ধরে আছ এখানে, তাই না?’

‘ও, সে অনেকদিন হল। আমার তখন দশ সাল। এত্ত বছর আমি এখানে আছি। মাইজি তখন বহু। নতুন। আর বাবা, মানে মাইজির স্বামী, আমাকে খুব ভালোবাসত। খানাপিনা দিত ভালো করে। বলত, ‘অভিরাম, তুই সব দেখেশুনে রাখবি।’ বেচারা বাবা, খুব খারাপ হল তার সঙ্গে।’

‘কী হয়েছিল?’

‘আপনি জানেন না? মাইজির স্বামী, আপনার দাদাজি, খুন হয়েছিলেন।’

স্তম্ভিত হয়ে গেল শুভ। খুন মানে? ও কখনোই শোনেনি দাদুকে খুন করা হয়েছিল! কী বলছে অভিরামদা?

‘আমি ঠিক বলছি। আমি সেদিন গিয়েছিলাম গঙ্গার ঘাটে। মাইজি বলেছিল গঙ্গা জল লাগবে। দুটো জারিকেন নিয়ে চলে গেলাম। ফিরে এসেছি, মাইজি বলল, ‘বাবাকে ডেকে আন। শরবত খাবে।’ বাবা দোতলার ঘরে ছিল। দরজা বন্ধ ছিল। দরজা ধাক্কা দিতেও দরজা খুলছিল না। তখন দরজা ভাঙতে বলল মাইজি। কিন্তু ম্যানেজারবাবু বলল কী, পুলিশকে ডাকতে হবে। নিজেরা দরজা ভাঙা ঠিক হবে না। তখন পুলিশকে ডাকা হল। পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখে বাবা পড়ে আছে কার্পেটের ওপরে। হাতে ছুরি। সারা শরীরে ছুরির দাগ। গলায় ছুরির দাগ। কত রক্ত ঘরে বাপরে বাপ! বিছানার ওপরে একটা মাংস কাটার ছুরিও ছিল।

মাইজি কান্নাকাটি করছিল। ‘কিউ তুম সুইসাইড কিয়া’, বলছিল মাইজি। পুলিশ বলল, এটা সুইসাইড নয়। খুন। মার্ডার। মাইজিকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করেছে পুলিশ। কিন্তু পরে আর কিছু বলেনি পুলিশ। সুইসাইড বলল। লেকিন এরপরে থেকে মাইজির বিমার দেখা দিল। অকেলা বাত করে। আমার ডর লাগে। লেকিন মাইজিকে এসব বলবেন না। মাইজি বহুত গুসসা করবে। আমাকে পিটবে।’

অভিরাম ভেতরে ঢুকে একটু জলখাবার খাওয়ার কথা বলছিল। শুভ আরেকদিন আসার কথা দিয়ে বেরিয়ে এল। একদিনে অনেক কথাই জানা হল। খুবই ভয়ের কথা বলতে হবে। দাদুর মৃত্যুটা কি মাসিদিদার হাতে হয়েছিল? কেন? পুলিশ কেনই বা খুন বলে পরে সুইসাইড বলল দাদুর মৃত্যুকে? আজ রাতে ফের মাসিদিদার ঘরের বাইরে আড়ি পাততে হবে। কিচেনের মাংস কাটার ছুরি দাদুর বিছানার ওপরেই বা কেন?

গভীর রাতের একটা শব্দ আছে। রহস্যময় শব্দ। অজানা জগৎ দরজা খুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কার প্রতীক্ষায়। শুভ বিছানা থেকে আস্তে আস্তে নেমে আসে। ঘরের দরজা বাইরে থেকে টেনে রাখে। ও অনেক রাত অব্দি পড়াশোনা করে, সবাই জানে। কিন্তু আজকের দিনটায় শুভর অনেক কাজ। এমন হতে পারে একদিনে কাজটা হল না। তাতে ক্ষতি নেই। শুভ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করবে।

পা টিপে টিপে নেমে আসছে শুভ। কথাও বা কোনও শব্দ পাচ্ছে না। সব নিঝুম। দিদার ঘরের ভেতরে নৈঃশব্দ্য বিরাজ করছে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসবে বলে পা তুলেছে, অমনি দিদার গলা পেল, ‘আমার সব চাই। সব। দেব না বলে লাভ কী হল? সেই তো নিলামই। তোমরা বাইরে বল একরকম, ভেতরের গল্পটা আরেক। জনসন তোমাকে কী দিয়েছিল লুকিয়ে? বলে দিলে ল্যাঠা চুকেবুকে যেত। মাঝে থেকে প্রাণটা দিলে। অথচ মালটা আমি পেয়েছি কর্তা। যত সাবধানেই রাখ না কেন, আমাকে ফাঁকি দিতে পারলে? আর ওই ছেলেটা...আমার মালের খোঁজ পেয়েছে। সব সময় এই ঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। ওর ব্যবস্থা করে দেব যদি বাড়াবাড়ি দেখি...!’

হিম হয়ে গেল শুভ। বলছে কী মাসিদিদা? ছেলেটা মানে তো শুভ! আর কেউ এই ঘরের ধার কাছ দিয়েও যায় না। মাসিদিদা নাকি অসুস্থ। বয়স তো হয়েইছে। তাহলে শুভকে টাইট দিতে হলে কীভাবে দেবে? এর জন্য নিজস্ব লোক চাই। হয়তো টাকা খাইয়ে আয়াকে দিয়ে শুভর খাবারে বিষ মিশিয়ে দেবে। কিচ্ছু বলা যায় না। শুভ প্রচুর রহস্য গল্প, ক্রাইম থ্রিলার পড়েছে। এরকম হয় জানে ও। দিদার হাতের লোক ওই আয়া। যে কিনা টাকার লোভে দিদার কথায় দিদাকে একা রেখে দেয় রাতে।

শুভ একবার ভাবল অর্ককে ব্যাপারটা খুলে বলে দেয়। কিন্তু দাদা খুব সাবধানী। ও মাকে বলবে প্রথমে। তারপরে বাড়িতে হুজ্জোতি যা হবে! ভয়ের কথাটা হল, শুভকে কেউ যদি অবিশ্বাস করে, তাহলে কী হবে! তবে কি মামাতো ভাই সায়ককে বলবে? ও যথেষ্ট বুদ্ধিমান। কিন্তু ছোট। ওকে এসব ব্যাপারে ফাঁসিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। বেশ, দেখা যাক, শুভ একাই যা করার করবে। কিন্তু একটা কথা স্ট্রাইক করেছে মাথায়। কী বলছিল দিদা? জনসন যা দিয়েছে সেটা দিদা দাদুর থেকে আত্মসাৎ করেছে? আচ্ছা। তার মানে সেই মাল নিয়ে নিয়ে দিদা ঘুরে বেড়ায়। সেটা কী? বুড়ি যেভাবে ঘর পাহারা দেয়, তাতে তো ঘর তল্লাশি করাই যাবে না।

শুভ নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে খাটে বসে। দিদা একজন ক্রিমিনাল? হাজব্যান্ডকে হত্যা করেছে? তার সঙ্গে ভালোমানুষি করার দরকার নেই। দিদা যা ভাবছে, শুভ যদি সেটাই করে? না, খুন জখম সুস্থ মানুষ করে না। শুভর সেই লোভ নেই যে দিদাকে খুন করে তাঁর ‘মাল’ হস্তগত করবে! ও শুধু জানতে চায়। রহস্যের পর্দা তুলতে চায়।

পরদিন সকালে দিদার ব্রেকফাস্ট যাচ্ছে দিদার ঘরে। মা বানিয়ে দিয়েছে। সাদা লুচি, একটু হালুয়া। অল্প ফল। কাকার ঘুমের ওষুধের শিশি থেকে গুনে গুনে তিনটে বড়ি নিয়ে গুঁড়ো করে রেখেছে শুভ। আয়ার সঙ্গে কথাবার্তা চালাতে চালাতে এক ফাঁকে হালুয়ায় ওষুধ মিশিয়ে দিল। আয়া বকবক করতে ভালোবাসে। নিজের ছেলে কাজ করতে চায় না বলে দুঃখ করছিল। শুভ সমর্থন করে চলছিল ওকে। সেই সময়ে আয়া কাচের গ্লাসে জল ভরে নিল। আর সেই ফাঁকটাকেই ইউজ করল শুভ।

সারাদুপুর পড়ে পড়ে ঘুমল মাসিদিদা। আয়া নিজের ঘরে ঘুম দিচ্ছে। শুভ দিদার কোমরে কষি থেকে চাবি খুলে দিদার প্রিয়তম বাক্সটি খুলে ফেলল। খুলেই অবাক হয়ে গেল। রেশমি কাপড়ে মুড়িয়ে রাখা অজস্র রত্ন বসানো ছুরি, একছড়া এই মোটা সোনার হার, যা প্যাঁচ দিয়ে গলায় পড়লে্ তিন প্যাঁচ হয়েও পেট অব্দি ঝুলে থাকবে, আরেকটি পোটলায় একগাদা জহরত। হিরে, মুক্তো, চুনি, পান্না, মোহর। এসব ওই জনসন কোথায় পেয়েছিল? দেশের বাদশাদের কারও খাজানা থেকে এগুলো এসেছিল সাহেবের হাতে। এসব দেশি জিনিস। সিপাহী বিদ্রোহের ডামাডোলে এসব ধনরত্ন অন্যের হাতে চলে গিয়েছে বলে শুনেছিল শুভ। দেখা যাচ্ছে সে কথাটা মিথ্যে নয়।

সব আগের মতো গুছিয়ে রেখে দিল শুভ। কেসটা সলভ হল। এই ধনরত্নের লোভে স্বামীকে খুন করেছেন এই মহিলা। এখন আবার শুভর দিকে নজর দিয়েছেন!

দিদার কোমরে চাবি বেঁধে ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে এসেছে ও। এসে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে খাটে উঠে বসেছে। পকেট থেকে বের করেছে একমুঠো হিরে, আর সোনার মোহর।

সন্ধের দিকে ঘুম ভাঙল দিদার। ঘুম ভেঙেই চিল চিৎকার শুরু করেছে, ‘মীনাক্ষী, আমার ঘরে আয় এখনই। আমি এত ঘুমোলাম কেন? জবাব দে।’

মা বিরক্ত, ‘অসুস্থ মানুষ। ঘুমিয়েছ ভালো করেছ। এর কারণ আমি জানি? হয়তো রাতে ভালো ঘুম হয়নি।’

দিদা কাঁপতে কাঁপতে সবাইকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে বলল। দরজা বন্ধ করে দিল। শুভ জানে দিদা এবারে বাক্স খুলে দেখবে। ঠিক ধরে ফেলবে কিছু জিনিস কম আছে। বাপ রে! তারপরে যে কী হবে ভাবতে মুখ শুকিয়ে গেল ওর। ‘কলেজে যাচ্ছি’, বলে নাকে মুখে গুঁজে বেরিয়ে পড়ল। আজ অনেকটা সময় বাইরে থাকতে হবে।

বাইরে বাইরে আর কোথায় বা যাবে। ওর পছন্দের জায়গা ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে অনেকটা সময় কাটাল। কিন্তু বাড়ির চিন্তাটা মনের ভেতরে পাক খাচ্ছিল। কী যে হচ্ছে বাড়িতে। নাহ! ওসব ফিরিয়ে দেবে শুভ। আসলে খুব লোভ হয়েছিল ওই প্রাচীন ধনরত্ন দেখে। সব তো নেয়নি। যা আছে, তা থেকে খুব সামান্য নিয়েছে একটা স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। সাধারণত দেখা যায়, এসব জিনিস রোগীর আত্মীয়-স্বজনের আগে আয়াদের হাতেই চলে যায়। কত কেস দেখেছে শুভ। শুনেছেও। মাসিদিদার বাক্সটা নিয়ে আয়ার কি কৌতূহল নেই?

তেরোটি মিসড কল! কী হল আবার? দাদার ফোন থেকে এতগুলো মিসড কল কেন? শুভ অর্ককে ফোন করল। অর্ক ওকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে বলছে। মাসিদিদা হার্টফেল করেছে। আজ দুপুরে।

শুভর অনুশোচনা হচ্ছিল। কিন্তু, মাসিদিদার ব্যাপারটাও বুঝতে পারছিল না। মহিলা কী করে অত ধনরত্নের মধ্যে মাত্র কয়েকটা জিনিসের অভাব বুঝতে পারলেন?

বাড়িতে ঢুকে সব শুনল শুভ। খেতে বসে চেঁচাচ্ছিল দিদা, কে নাকি তাঁর সব চুরি করেছে। তার শেষ দেখে ছাড়বে...! চেঁচামেচি করতে করতেই দিদা শেষ। তখন সন্ধে ঘনিয়ে এসেছে বাড়ির পেছনের বকুল গাছের মাথায়। বাসা বেঁধে থাকা পাখিরা কেঁপে উঠেছে। তাদের ঘন ভালোবাসায় মোড়া বাসা থেকে বেরিয়ে এসে প্রাচীন বাড়িটির সানসেটের ওপরে আশ্রয় নিয়েছে। মায়ের পালকের নীচে লেপটে থেকে বাচ্চা রাতের হিমে তিরতির করছে। বুড়ো বটের নীচে সরকারদের গৌরগোপালের মন্দিরে শেতল ভোগ দেওয়া হচ্ছে। ঘণ্টার শব্দ বাতাসে কেঁপে কেঁপে মাঠ পেরিয়ে, পুকুরের হিরহিরে ঠান্ডা জল পেরিয়ে কোথায় চলে গেল, গৌরগোপাল ছাড়া কেউ তার খবর রাখে না।

শেষকৃত্যের জন্য দিদার মরদেহ নিমতলা শ্মশানে নিয়ে যেতে যেতে সন্ধ্যে ছটা হল। ভালো ভাবেই অন্ত্যষ্টি হল। শুভর খুব খারাপ লাগছিল একজনের মৃত্যুর দায় ঘাড়ে পড়ায়। এটা সত্যি ও দিদার বাক্সে হাত দিয়েছে। কিন্তু, যখন ও কিছুই করেনি, তখনও দিদা ওকে সন্দেহ করেছে। কিচ্ছু করার নেই। যার যা নিয়তি। রাতে পৌনে দশটার দিকে সৎকার শেষ হলে অস্থি বিসর্জন দিতে গঙ্গায় নামল শুভ।

শুভর মধ্যে অনুশোচনা ছিলই। ও দিদার আত্মার শান্তি প্রার্থনা করছিল গঙ্গায় দাঁড়িয়ে। রাত বেড়েছে। গঙ্গার জল দেখা যাচ্ছে না ভালো করে। অল্প অল্প আলোর ছটা জলের ঢেউয়ে উঠে পড়ছে মাঝে মাঝে। মৃত্যু কি আশেপাশে দাঁড়িয়ে আছে দিদাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্য? কেমন এক ছায়াচ্ছন্ন বিষাদময় হয়ে পড়ছিল শুভ। আরেকটু এগিয়ে গিয়ে অসম্ভব নির্জনতার মধ্যে নিজেকে ঢুকিয়ে রাখল শুভ। কেন মনে হচ্ছে, ওই জলের শীতলতায় শান্তি রয়েছে। সব অনুশোচনার নিবৃত্তি ওখানেই। হাঁটু ভাঁজ করে বসল শুভ। আর ঠিক তখনই, ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক বিরাট জলোচ্ছ্বাস আছড়ে পড়ল ওর ওপরে। এমন ঢেউ, যেন সব ভেঙে নিয়ে যাবে। শুভ কিছু বোঝার আগেই জল আক্রমণ করেছে ওকে। দাঁড়িয়ে পড়ছে জলের একটা শরীরী অবয়ব। জলের শরীরী অবয়ব অস্বাভাবিক শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ওর ওপরে। লড়াই চালাতে পারল না ও। আতঙ্কিত শুভ অসাড় হয়ে পড়ছিল ও। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগে জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে তীব্র প্রতিশোধ স্পৃহা অনুভব করল।

প্রত্যক্ষদর্শীদের তৎপরতায় রিভার ট্র্যাফিক উদ্ধার কাজে নামে। খানিক পরে শুভকে পাওয়া যায়। অর্ধ অচেতন।

হঠাৎ করে এই জলোচ্ছ্বাসের কারণ কী? ভূবিজ্ঞানীরা বলেন, নদীর গর্ভে অতিরিক্ত পলি জমলে জলস্তর বাড়ে। সেক্ষেত্রে জোয়ারের জলস্তর কিন্তু অনেকটাই বাড়তে পারে। পাড়ে তার ঝাপটাও বেশি হবে। দিনটা পূর্নিমা ছিল। ওসব দিনে জোয়ার জোরালো হয়। পৃথিবী, চাঁদ, সূর্য একই সরলরেখায় থাকে ওসব দিনে। জলস্তরও বেশি থাকে।

সুস্থ হয়ে এসব শুনেছে শুভ। কিন্তু মন মানে না। সেই প্রবল জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে যে অবয়ব শুভ দেখেছিল, তাকে ভুলবে কী করে? অজস্র জলের মধ্যে মাসি দিদার চোখ দুটোকে স্মৃতি থেকে ডিলিট করা যাবে কি কখনও?

সুস্থ হয়ে এক দুপুরে কলেজে যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে পড়ল শুভ। রোদে জ্বলে যাচ্ছে দুপুর। শুভ গঙ্গার পাড়ে পৌঁছে সেই নির্জন জায়গাটা খুঁজে বের করল। এদিকে কেউ নেই। অনেক দূরে এক বৃদ্ধা স্নান করছেন। লাল গামছাটা মাথায় পেঁচিয়ে সূর্য প্রণাম করছেন বুক সমান জলে দাঁড়িয়ে। একটা নৌকো লি লি করে চলে যেতে যেতে এতটুকু হয়ে গেল। বয়াগুলো ডুব জল ডুব জল খেলছে। শুভ ব্যাকপ্যাক থেকে প্যাকেটটা বের করল। খুলে দেখল না। প্রথমদিন যা একবার দেখেছে আর দেখার ইচ্ছে নেই। তীব্র বিরাগ উপস্থিত হয়েছে যেন ধনরত্নের নামে। আস্তে আস্তে জলে নামল ও। একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করল। কাকে? আত্মাকে? যদি তিনি কাছাকাছি থাকেন, ক্ষমা করে দেন যেন শুভকে।

প্যাকেটটা ঢেউয়ের মাথায় নেচে নেচে অনেক দূরে চলে যাচ্ছিল। শুভ জল থেকে উঠে পড়বে বলে পিছন ফিরল। তাই, ওর পিছনে কী হচ্ছে দেখতে পায়নি। একজোড়া বার্ধক্যপীড়িত হাত জল থেকে উঠে এসে প্যাকেটটা ধরে ফেলতে যাচ্ছিল। শুভ দেখেনি। জানে না পার্থিবকে স্পর্শ করার ক্ষমতা অপার্থিবের আছে কি না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%