সাগরিকা রায়

বরুণদের বাড়ির উঠোনের শেষ প্রান্তে ছিল করবী গাছটা। সারাবছর হলুদ ফুলে ভরে থাকত। লম্বা লম্বা ফুলগুলোকে বরুণ বলত মাইক ফুল। বরুণের ছোট বয়সে করবীর বীজ ফেটে পড়ল মাটিতে। ছোট ছোট চারা গাছে ভরে গেল। এর মধ্যে একটি চারাগাছে কী করে কে জানে এইটুকু একটা ফুল ফুটে উঠল। সে কী বাহারি রঙ! ফুলটি যেন সূর্যের রঙ শুষে হলুদ হয়ে গেছে।
তখন বর্ষা শেষ হয়ে আসছে। পুকুরের জল টুম্বুর হয়ে আছে। দুটো চারটে ঘাস ফড়িং ইতিউতি লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল পুকুরের ধার ঘেঁষে। তারাকাকি সেঁচি শাক তুলছিল ফুটো ফুটো প্লাস্টিকের ঝুড়িতে। গোপলা চান করতে নেমেছে চুপচুপে করে সর্ষের তেল গায়ে মেখে। চান করতে নেমে গামছা দিয়ে ছেঁকে মাছ ধরে গোপলা। রোজ। এই পুকুরে মৌরলা, পুঁটি, চুনো মাছের রাজত্ব। গোপলাকে মাছ ছাঁকতে দেখে তারাকাকি থমকে দাঁড়াল। গোপলা তারাকাকিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক মুঠো গুঁড়ো মাছ তুলে দিল, ‘সেঁচি শাক দিয়ে খেও কাকি।’
বরুণ পুকুরের জল বোতলে ভরে নিয়ে যাচ্ছে। করবীর চারার গোড়ায় পুকুরের জল দিতে বলেছে কে। গোপলা ডুব দিচ্ছে বলে বরুণকে দেখতে পায়নি। তারাকাকি চলে গেল ভেজা পায়ের ছাপ রেখে রেখে সরু পায়ে চলা পথ দিয়ে নিজেদের বাড়ির দিকে। বরুণ বোতলের জল নিয়ে চলে এল রান্নাবাড়ির পেছনের খোলা জমিতে। কলি মিস্ত্রিকে দিয়ে গতকাল একটা গর্ত খুঁড়িয়ে রেখেছিল বরুণ। সেই গর্তে বরুণের ইচ্ছেটুকু জমা হয়ে রইল। করবী গাছ ছাড়া আর কেউ জানল না বরুণের ইচ্ছের কথাটা। বরুণ কলিকে বলেছিল, এই গাছটকে দত্তক নিচ্ছি। ভালোবাসব, দেখভাল করব, মেলা থেকে রিবন, ক্লিপ এনে দেব।’ বরুণের কথায় কলি মিস্ত্রি হেসেছে খুব। একজন হাসেনি। সে করবী গাছটা। একজন কাউকে আপন করে নিতে চেয়েছিল চারাটা। তো, বরুণ ওকে বলল, ‘আমি তোকে দত্তক নিলাম। তোর ভালোমন্দের ভার আমার। আমিই তোর আপনজন। মনে রাখিস।’
সেই করবী এখন কত বড় হয়ছে। অল্প অল্প টিপ টিপ বৃষ্টিতে করবীর মাথায় ছাতা ধরে দাঁড়িয়েছিল বরুণ। ওর মা দেখতে পেয়ে ঘরে ডেকে ভেজা গা মুছিয়ে দিয়েছে। বরুণ করবীর পাশে সোনুদের বাড়ি থেকে চেয়ে আনা ছোট ছোট সরু জামের ডাল ভেজা মাটিতে পুঁতে দিয়েছে। সেই পুঁতে রাখা ডালের সঙ্গে বরুণের ঠাকুর্দার বাঁশের দণ্ডওলা ছাতাটা মেলে রেখেছে। এখন করবির গায়ে জল লাগে না। করবী ভেজে না বৃষ্টিতে। ছাতা বেয়ে জল সরু ধারায় মাটি ভিজিয়ে দিচ্ছিল। মাটি ভিজে ভিজে করবীর গোঁড়া শক্ত হচ্ছিল।
আস্তে আস্তে শরতের মাঝামাঝি যখন হুসলুর ডাঙা থেকে বিশু মিস্ত্রি এল নারকেল গাছের ঝাড়াই বাছাই করতে, তখন বরুণ দেখল সারা বর্ষা জল খেয়ে, মাটির রস টেনে করবী সদ্য যুবতী হয়েছে। চকচকে সবুজ ঘাঘরা দুলিয়ে রোদের নরম আভা নিচ্ছে। চোখে কাজল, ঠোঁটে লাজুক হাসি। বরুণ আদর করল পাতায়, ডালে। ফিসফিস করে বলল, ‘ভালো থাকিস করবী। পুজো আসছে। ঢাকের শব্দে তোর ভোরেই ঘুম ভেঙে যাবে। মণ্ডপ থেকে কেমন ধুনোর গন্ধ পাবি, দেখিস। আর অমূল্যকে বলে দিয়েছি, খানিকটা সার এনে দেবে। তোকে আরও পোক্ত হতে হবে। সামনেই পরীক্ষা বলে তোর দেখাশোনা ঠিকঠাক করে উঠতে পারছি না। নিজে একটু সাবধান থাকিস। রাতের অন্ধকারে কি তোর ভয় করে করবী? ভয় পাসনে। আমি এই পাশের ঘরেই থাকি। রাত জেগে পড়ি কিনা। আর ভয় পেলে বলিস। একটা মোম জ্বালিয়ে রাখব উঠোনে।’
করবী চুপচাপ কথা শোনে। সামনের ডালটা একটু ঝুঁকে আসে। বরুণের কথা শেষ হলে ডালটা সোজা হয়ে অল্প দুলে ওঠে। বাকি ডালপালা পাতাসুদ্ধ হি হি করে হাসতে থাকে। বরুণ রেগে যায়, ‘বেশি ইয়ে হয়েছে? ঠাট্টা হচ্ছে আমাকে?’
অনমিত্র কয়েকদিনের জন্য চেন্নাই থেকে এসেছিল। ওখানেই চাকরি করে। বরুণের দত্তক কন্যাকে দেখে ভ্রূ তুলেছে, ‘তুই কি কেএমডি-এর পারমিশন নিয়েছিস? গাছ দত্তক নিতে হলে পারমিশন নিতে হয়।
বরুণ খুব ভয় পেল, ‘ও মা, আমি তো জানিই না। কেএমডি-কে কোথায় পাব? আর পারমিশন নিতে হলে অনেক দেরি হয়ে যেত। করবী ততদিন বাঁচত নাকি?’
অনমিত্র যতটুকু জানত, বলল। প্রশাসন থেকেই গাছ দত্তক নেওয়ার একটা প্রকল্প হয়েছে। বছর দেড়েক আগেই ঢাকঢোল পিটিয়ে এই প্রকল্পের উদ্বোধন হয়েছিল। কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য যে কমিটি করা হয়েছিল, সেখানে প্রবল জটিলতা দেখা দেয়। যা হয় আর কী! আর তাই প্রকল্পটি এগোয়নি। তবুও, গাছ দত্তক নিতে হলে অবশ্যই কেএমডি-কে জানাতে হবে।
ধুস। অনমিত্রর পরামর্শকে পাত্তাই দিল না বরুণ। কেউ কি জানে যে বরুণ করবীকে দত্তক নিয়েছে? সত্যি কথাটা জানে একমাত্র করবী। অনমিত্রকে বললেই হবে, বরুণ জাস্ট মজা করেছে। গাছ আবার দত্তক নেয় কেউ?
বরুণের হাসি দেখে অনমিত্র অবাক হয়ে ভ্রু তুলল। তারপর মজটা বুঝে হেসে ফেলল, ‘তোর বুঝি করবী নামটা পছন্দ? তুই যখন অনেক বড় হবি, তোর মেয়ে হলে নাম রাখিস করবী।’
বরুণ লজ্জায় ফের হেসেছে। অনমিত্র চলে যাওয়ার পরে করবীকে মজার কথাটা বলতে যেতেই করবীর ডালগুলো সরে গেল ওর মাথার ওপর থেকে। খানিকটা ওপরে সটান দাঁড়িয়ে গেল। তখন একটিও পাতা নড়ছে না। অন্য গাছের পাতা কি নড়ছে বাতাসে? হ্যাঁ। বরুণ তাকিয়ে দেখল, আমগাছের, নিমগাছের...পাতা দুপুরের বাতাস পেয়ে হিরি হিরি কাঁপছে। তাহলে কি অনমিত্রর সঙ্গে কথোপকথন শুনেছে আগেই করবী? বরুণ যে করবীকে সবাইকে জানিয়ে দত্তক নেয়নি, সেটা শুনে ফেলল করবী? নাকি বিশ্বাস করেছে বরুণের কথাটা, ‘গাছ আবার কেউ দত্তক নেয় নাকি?’ ইস!
বরুণ অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে রাগ ভাঙাল করবীর। বরুণের গলায় গান শুনে রাগ ভেঙে গেল। মোটা গলায় গান,
‘রাগ করে না করবী
আমার সোনা আমার সবই
তুমি যদি রাগ কর
বহুত হবে খারাবি।’
রাগ ভাঙতেই করবী দোল খেল বাতাসে। আরামে চোখ বুজে এল ওর।
সেদিন রাতেই বরানগরে ফুলুকাকিমার এখন তখন অবস্থা হতেই বরুণকে চলে যেতে হল। ফুলিকাকিমা নিঃসন্তান। বরুণকে বড্ড ভালোবাসেন। বরুণ ছাতা গুছিয়ে নিল ব্যাগে। আজকাল যখন তখন বৃষ্টি আসে। মা-ই মনে করাল, ‘বরু, মনে করে ছাতা নিস। আর শুকনো খাবার দিচ্ছি। কে জানে কাকিমার কী অবস্থা। খাবারদাবার পাবি কি না! আর জলের বোতল নিস।’
বরুণ বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে করবীর কাছে গিয়ে বলে এল। বলে না গেলে রাগ করবে করবী। তখন ছড়া শোনালেও একটুও দোল খায় না সে। এমন ভাবে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যে দেখে মনে হয় বরুণকে ও চেনেই না। বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যাবে না করবীর মনে এত প্যাঁচ। ঠিক যেন শৈলেশ সরকারের জয়কালী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের দশটাকা পিস জিলিপির প্যাঁচ।
কল্পনাদি বলেছিল, শৈলেশের ভাই বাদলের ভেতরে নাকি ঠিক ওইরকম প্যাঁচ রয়েছে। আর, কে না জানে যে, বাদল মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের পুরো ব্যাপারটা সামলায়? শৈলেশ তো শুয়ে বসে আড্ডা মেরে সময় কাটায়। সেই সুযোগে ওর ভাই বাদলই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিক হয়ে গেল বলে। কটাদিন পরে দোকানের সাইন বোর্ড চেঞ্জ হয়ে যাবে। তখন নাকি লেখা হবে দোকানের নতুন নাম। জয়বাদল মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।
করবী এই প্যাঁচপয়জার বেশ শিখেছে। আসলে বিকেলের দিকে পাড়ার মাসিমা, কাকিমারা আসেন। বরুণের মা পুরো শ্রাবণ মাস জুড়ে মনসা মঙ্গল পাঠ করে। পাঠ শুরু হওয়ার আগে সবাই মিলে নিজের নিজের বাড়ির নিন্দেমন্দ, কূটকচালি করে। করবী সেসব নিজে থেকে শুনে শুনে এসব চালাকি শিখেছে বলে মনে হয় বরুণের।
সকালে চাপান সার দেওয়ার আগে আগাছা সাফ করতে করতে ফুলিকাকিমার কথা বলেছে বরুণ। মন দিয়ে শুনেছে গাছ। ওর পাতায় ছত্রাক হয়েছে। এক লিটার জলে এক গ্রাম কার্বেন্ডাজিম, দুই গ্রাম ম্যাঙ্কোজেব জলে গুলে স্প্রে করেছে। করবী পছন্দ করেনি বরুণের বাইরে যাওয়াটা। বরুণ সান্ত্বনা দিয়েছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ও চলে আসবে। করবী যেন সাবধানে থাকে। পোকামাকড় কামড়ায় না যেন।
বিকেলের ট্রেনে চলে গেল বরুণ। ফুলিকাকিমার বাড়িতে পৌঁছতে পৌঁছতে আকাশ কালো করে এল। তারপরেই নামল ঝড়। ছুটতে ছুটতে ফুলিকাকিমার বাড়িতে পৌঁছল যখন, বাড়ি ভর্তি লোক ফিসফিস করে কথা বলছে। বরুণ বুঝল, ফুলিকাকিমার অবস্থা ভালো নয়। হাসপাতালে যেতে হলে এখনই যাওয়া উচিত। অথচ এমন ঝড়ের মধ্যে যাওয়া যাবে কী করে? ঘণ্টায় পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার বেগে ঝড় নেমেছে। এর মধ্যে পাওয়ার কাট হয়ে গেল। গোড়া থেকে উপড়ে গেল ফুলিকাকিমার বাড়ির সামনের মোটা বকুল গাছটা।
বরুণ হতবাক। কয়েক বছর আগে আয়লা ঝড়ের যে চেহারা দেখেছিল, আজকের অবস্থাতাও অনেকটা তেমনই। এই অবস্থায় কী করে বের হবে বরুণ বুঝে উঠতে পারল না। এই মুহূর্তে হাসপাতালে না নিলে কাকিমার বাঁচার আশা নেই। এখানে যারা আছেন, সকলেই খুব বয়স্ক মানুষ। এঁদের থেকে সাহায্য পাওয়ার আশা করা অনুচিত। কিছু মহিলা আছেন। অবশেষে পাশের বাড়ির কুণ্ডুবাবুর সঙ্গে কথা বলা গেল। তিনি রাজি হলেন গাড়ি দিতে। ভাগ্যিস ড্রাইভার কুণ্ডুবাবুর বাড়িতেই থাকে। নইলে তাকে পাওয়া যেত না এই ঝড়ের রাতে। ড্রাইভার সন্তোষ ইতস্তত করছিল গাড়ি নিয়ে বের হতে। বরুণ হাতে পায়ে ধরে রাজি করাল। সন্তোষ যদি এসময় সাহায্য না করে, কাকিমা বাঁচবে না। সন্তোষ বহুদিন থেকে কাকিমাকে দেখছে। বরুণের কথায় ও আপত্তি করতে পারল না, ‘ঠিক আছে, চলুন।’
গাড়ির পেছনের সিটে ফুলিকাকিমাকে শুইয়ে নিয়ে রওনা হল বরুণ। কী ভেবে কুন্ডুবাবুও সঙ্গী হলেন, ‘নাহ, আমিও যাই। একা তুমি রাত বিরেতে কী করবে...!’ এতে সাহস পেল বরুণ। এসব জায়গা খুব বেশি চেনা নয় ওর। লোকাল মানুষ সঙ্গে থাকলে সাহস বাড়ে সত্যি। কুন্ডুবাবুকে এখানে প্রায় সকলেই চেনে। দরকারে সাহায্য পাবে নিশ্চয় বরুণ। রাস্তা জুড়ে গাছ, গাছের ডাল, ভেঙে পড়ে আছে। গাড়ি ঘুরিয়ে নিতে হল। রাস্তার ধারের রুদ্রপলাশ গাছটা পড়ল। এমন সময় পড়ল, একমিনিটের ব্যবধানে ওদের গাড়িটা গাছের নীচ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে।
‘যা দেখছি, প্রায় ডজন ডজন গাছ ভেঙে পড়েছে কাকু।’ বলল সন্তোষ। ‘সামনে দেখুন, ইউক্যালিপটাস গাছটা কেমন দুলছে। এখনই পড়বে নাকি? বহুত পুরোনো গাছ। বেরিয়ে যাই তাড়াতাড়ি।’ সন্তোষ গাড়ির স্পিড বাড়াবে ভেবেছে, ঠিক ওই সময়েই দুজন পথচারী গাছের পাশ দিয়ে ছুটছিল। আরও দুজন একটু দূরে আসছে। আচমকা শিকড়সুদ্ধ ভেঙে পড়ল ইউক্যালিপটাস গাছটা। দূরের দুজন বেঁচে গেল। অন্য দুজন গাছের নীচে পড়তে পড়তে বেঁচে গেলেও আঘাত পেয়েছে। বেশ একটা হইহই হচ্ছে।
কুন্ডুবাবু ভয়ার্ত গলায় বললেন, ‘এই রাত কাটলে বাঁচা যায়। সন্ধের দিকেই যখন ঝড় উঠল, টিভিতে দেখাচ্ছিল, সল্টলেকে নারকেল গাছ ভেঙে পড়ে এক মহিলার মৃত্যু হয়েছে। অটোর ওপর গাছ ভেঙে পড়েছে। রাতটা ভালো নয় আজ।’
সন্তোষ বলল, ‘দেখেছেন কাকু, রাস্তার ধারের কৃষ্ণচূড়া সবই প্রায় পড়েছে।...ইস, গাড়িটা দেখুন, গাছ পড়ে চ্যাপ্টা হয়ে আছে।’
বরুণ করবীর জন্য চিন্তা করছিল। একা একা করবী কত যে ভয় পাচ্ছে! কী করবে বরুণ! এদিকে কাকিমাকে নিয়ে যেতে এত সময় লাগছে যে বলার নয়। সন্তোষ খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে। সকলেরই প্রাণের দাম আছে। কাকিমার জ্ঞান নেই। বরুণের কোলে মাথা রেখে চোখ বুজে আছে। অ্যাম্বুলেন্স ডাকলে আসত কি?
‘আরে, ডেকেছিলাম। ওরা বলল, দেরি হবে। ঝড় না থামলে বের হতে পারছে না।’
এটা কোনও কথাই হল না। পীড়িতকে সেবা করতে হলে রিস্ক নিতেই হয়। সন্তোষ বের হল কী করে?
‘কৃষ্ণচূড়া মূল মাটির বেশি ভেতরে যেতে পারে না। সহজেই উপড়ে যায়। কিন্তু মাসিমার প্রাণরক্ষা করাটাই সমস্যার হয়ে যাচ্ছে দেখছি। গাড়ি ঘুরিয়ে সেবা নিকেতনের দিকে চল সন্তোষ। ওদিকে বেশি গাছ নেই। সাফ থাকবে রাস্তা। শহরে হাওয়া চলাচলের পথ নেই। হাওয়া বাড়ির গায়ে ধাক্কা খেয়ে গাছের গায়ে এসে পড়ে।’ কুণ্ডুবাবু বললেন।
মাকে ফোন করার চেষ্টা করল বরুণ। কানেক্ট হল না। করবীর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে।
অবশেষে হাসপাতালে না হোক, নার্সিং হোমে ফুলিকাকিমাকে ভর্তি করিয়ে, সারারাত থেকে সকালে কাকিমার বাড়িতে ফিরেছে বরুণ। কাকিমার দূরসম্পর্কের এক ভাইঝি ছিল। বরুণকে জোর করে দিল। বরুণ এখনই বাড়ি ফিরতে পারছে না। ট্রেন লাইন চালু হয়নি। তাছাড়া কাকিমার অবস্থাটা একটু ভালো না হলে...!
বিকেলের দিকে কাকিমা অনেকটাই সুস্থ হলেন। বয়স হয়েছে। এখন এভাবে একা থাকাটা ঠিক নয়। বরুণ ভাবল, কাকিমা সুস্থ হলে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাখবে। একটা আয়া রেখে দিলেই মায়ের ওপরে চাপ পড়বে না। এভাবে অসুস্থ মানুষকে একা ফেলে যাওয়া যায় না।
আজ বাড়ি ফিরে যেতেই হবে। কাল আবার আসতে হবে। হাসপাতাল থেকে বের হতেই সন্ধে লেগে গেল। তারপর স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরে বাড়ি পৌঁছতে রাত নেমে গেল। রাস্তার লাইটগুলো নেই। ভেপার আলোও নেই। অন্যদিন আলোয় আলোয় ভরে থাকে রাস্তা দিনের মতো। টর্চ বলতে মোবাইল ভরসা। ঝড়ের পরে শহরের দশা চোখে দেখা যায় না। সব এলোমেলো হয়ে আছে। যদিও দ্রুত সাফ সুতরো করার কাজে নেমেছে প্রশাসন, তবুও বিপর্যস্ত অবস্থা দেখলে বোঝা যায়। বাড়ির কাছাকাছি আসতে আসতে বুক কাঁপল বরুণের। বাড়ির সামনের গলিপথ ধরে অন্ধকারে আসতে গিয়ে কেন যেন শোকাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল ও। মন ভীষণভাবে কুডাক ডাকছে। করবী বেঁচে নেই ঠিক। যেভাবে বড় বড় গাছগুলো ধপাধপ পড়ছিল, করবী কত দুর্বল গাছ। ও কী করে একা একা নিজেকে বাঁচাবে?
রাস্তাঘাটে লোকজন নেই। কেউ কি বের হয়নি বাড়ি থেকে? বাড়িঘরও পড়েছে কি না কে জানে! মা কেমন আছে?
গলির উল্টোদিক থেকে কেউ আসছিল। সেই পাগলাটা নিশ্চয়। ঝাঁকড়া মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটে। ওর কোনও হেলদোল নেই। ঝড় বৃষ্টি কিছুই ওর কাছে কিছুই না। সুকুমার রায়ের সেই গল্পের মতো। লোকটা সারাদিন গাছের তলে বসে আনন্দে হেসে চলেছে...! এই পাগলটা অবশ্য সেই গল্পের লোকটার মতো নয়। এটা বাজে। বিচ্ছিরি স্বভাব। আসছে দেখ, যেন মাতব্বর।
ঝালিম ঝুলিম জামাকাপড়, ঝাঁকরা চুলওলা লোকটার স্বভাব বিশ্রি। এই পাগলটাকে ভয় পায় বরুণ। পাগলটা কাউকে একা পেলেই জাপটে ধরে। বরুণ ভাবল, ব্যাক করবে। পাগলের পাশ দিয়ে যেতে পারবে না। ওটা কী যে করবে তার ঠিক নেই। হয়তো বা পাথর ছুড়েই মারবে।
পাগলটা অন্ধকার আঁকড়ে আঁকড়ে এগিয়ে আসছে। কাছে! আরও কাছে! বরুণ স্থির হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়ে। গলির ভেতরে অন্ধকার ঘুরপাক খায়। অন্ধকারে নিজেকে মিশিয়ে দিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে বরুণ। পাগলটা সম্ভবত সামনে চলে এসেছে। বরুণ চমকে উঠল। পাগল ওর খুব কাছে...ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে...!
বিস্ফারিত চোখ মেলে বরুণ দেখল, ওর করবী এই গলির মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে! পাগল নয়। ওটা করবী! ও কী করে বুঝল বরুণ এই গলিতে আছে? করবী হেঁটে এল কী করে এখানে?
গা বেয়ে টপ টপ করে জল ঝরছিল। ঝড়ের তাণ্ডবে করবীর শরীর বিধ্বস্ত। গোড়া উপড়ে গিয়েছে। কিন্তু অপেক্ষা করছিল বরণের জন্য।
বরুণ হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল। কান্নার শক্তি নেই ওর। ও বুঝেছে করবী আর নেই। মাটির ওপর আছড়ে পড়ে বরুণ। করবী ফিসফিস করে, ‘ঝড়ে তোর ক্ষতি হয়নি তো?’ বরুণ করবীকে আঁকড়ে ধরতে যায়। পারে না। করবী সরে সরে যাচ্ছে!
ছুটতে ছুটতে বাড়িতে ঢুকে উঠোন জুড়ে ভাঙা গাছপালা দেখে বরুণ করবীর খোঁজ করে। করবী হেঁটে হেঁটে গিয়েছিল দুর্যোগের রাতে বরুণকে এগিয়ে নিয়ে আসতে। নাকি করবীর আত্মা একটিবারের জন্য বরুণকে দেখতে গিয়েছিল?
করবী পড়ে আছে মাটিতে। বরুণ রাতের অন্ধকারে গর্ত খুঁড়তে থাকে। করবীকে বাঁচাতে হবে। মাটি, জল সব দেবে বরুণ। আর দেবে ভালোবাসা।
পরদিন সকালে করবী সোজা হয়ে দাঁড়াল। দাঁড়াতেই হবে। এত ভালোবাসা ছেড়ে থাকবে কী করে করবী?
বরুণ করবীর গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়, ‘তুই হেঁটে গেলি কী করে গলিতে?’
নতুন শেকড়কে আঁকড়ে ধরতে ধরতে করবী বলে, ‘তুই ভয় পাস ঝড়কে। তাই তোকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি যাইনি রে। যাওয়ার জন্য মন টানছিল।’
তাহলে গলির মধ্যে করবীকে দেখল কী করে বরুণ? করবীর হয়ে কে গিয়েছিল?
খুব কষ্ট হচ্ছিল বরুণের। ফুলিকাকিমাকে নিয়ে আসবে ও। রোদ, তাপ আর ভালোবাসা দিলে সবাই কাছাকাছি থাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন