সাগরিকা রায়

দিন আর রাতের সন্ধিক্ষণ হল সন্ধ্যা। এই সান্ধ্যক্ষণে প্রেতের আগমন হয়। তারা আসে। এইসময়ে জীবিতের সঙ্গে মৃতের দেখা হতে পারে। উপযুক্ত সময় এইটে। একে বলে রাক্ষসক্ষণ’, অবনীদা হ্যারিকেনটার নিভু নিভু আগুনটা বাড়িয়ে দিলেন, ‘এখন আমি যা বলছি, সেইটে মনে রেখ। আমাদের শাস্ত্রে বলে, সান্ধ্যক্ষণে খাদ্য গ্রহণ করা উচিত নয়। সেই খাদ্য পরিপাক হতে চায় না। আর হ্যাঁ, খাদ্য দরজার মুখে দাঁড়িয়ে খাওয়া উচিত নয়। রাক্ষসক্ষণের খাদ্য মানুষের পক্ষে পরিপাক অসম্ভব।’ হ্যারিকেনের আলোয় অবনীদার মুখটা অদ্ভুত দেখাচ্ছিল।
সন্ধে হয়ে এসেছে। চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। অবনীদা একটা চাদর টেনে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে বসলেন, ‘ভালো করে তাকিয়ে দেখ, কী ভীষণ চুপচাপ হয়ে যায় এসময়টা। গাছের পাতাটুকু নড়ে না। পশু-পাখি সব নিজেকে নিরাপদ জায়গায় রাখে। মানুষ তাড়াতাড়ি করে বাড়িতে ফেরে। সন্ধে বড্ড রহস্যময়। সন্ধেকে বিশ্বাস কর না। ভ্রমে ফেলে। যা নেই, তা যেন আছে, যা ছিল না, তা আছে, যে চলে গিয়েছে, সে ফিরে এসেছে...এই ভ্রমে পড়ে যাই আমিও।’
আমার শীত করছিল। সলিল, অময়, আর কনিষ্ক বিছানার ওপর গুছিয়ে বসেছে। কনিষ্ক একটু হাসল, ‘অবনীদা, একদম গল্পের বইয়ের মতো লাগছে। এমন একটা পরিবেশ যে সত্যি পাব ভাবতেই পারিনি। আশ্চর্য, এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই? লণ্ঠনের লালচে আলোয় গুটিসুটি হয়ে ভৌতিক আবহে নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়া? অ্যাঁ? তোমরা চালিয়ে যাও। আমি ভিডিও করছি। সোশ্যাল মিডিয়া ফাটিয়ে দেব।’
সলিল খেপে গেল, ‘দেখ, তুই কিন্তু আসর নষ্ট করবি না বলে দিচ্ছি। তোর সোশ্যাল মিডিয়ার খোরাক বানাবি না আজকের সন্ধেটা। বেশ জমাটি আড্ডা হচ্ছে, এর মধ্যে ভিডিও ফিডিও এনে সব গুবলেট করছিস কেন?’
আমরা ইশারায় দেখালাম অবনীদাকে। অবনীদা বন্ধ জানালার দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছেন। হয়তো কিছু বলবেন। একটু সময় দিতে হবে অবনীদাকে। কিন্তু অবনীদা কিছুই বললেন না। খানিক পরে এতোয়ারি এসে বলল, ও নাকি কাছে লাইনের ধারের সন্ধে বাজার থেকে মুরগি নিয়ে এসেছে। দেশি মুরগি। রান্না কি সে করবে? ঝাল দিয়ে। মোটা মোটা বুলেট লংকা নিয়ে এসেছে মাংসে দেবে বলে। অবনীদা হাসলেন, ‘এতোয়ারি আমার একার জন্য এক কেজি মাংস আনে। আজ বেশি করে টাকা নিয়েছে মাংস আনবে বলে। হ্যাঁ রে, কতটা মাংস এনেছিস?’
‘ঢাই কেজি। চারটে জোয়ান ছেলে আর তুই খাবি। পাঁচজন। কম হবে? আমিই রেঁধে দিই কালা মরিচ দিয়ে? আদা দিব।’
অবনীদা আঁতকে উঠেছেন, ‘রক্ষে করো মা। আমিই করে নিচ্ছি। তুই আলুর খোসা ছাড়িয়ে দে। গোটা রাখবি আলু। সাত আটটা। আর পেঁয়াজ, কুচিয়ে দে। আদা, রসুন, লংকা সব গুঁড়ো মশলা আছে। গরম মশলাও।’
আমরা লাফিয়ে উঠলাম। মুরগি, আর?
‘গরম ভাত। গোবিন্দভোগ চাল আছে। মাংস এন্তার আছে। অসুবিধে হবে না।’ অবনীদা অল্প হাসলেন।
রাতে মেঝেতে শতরঞ্চি লম্বা করে পেতে নিয়ে হ্যারিকেনের চারপাশে বসে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হল। অবনীদা সন্ধের আগেই দরজা জানালা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখানে বেশ ঠান্ডা পড়ে। কলকাতায় এমন ঠান্ডা নেই। পাশাপাশি দুটো বেডরুম। আমরা চারজন একটি ঘরে রয়েছি। আমি, সলিল, একটি খাটে, অন্য খাটে কনিষ্ক আর অময়। পাশের ঘরে অবনীদা। এতোয়ারি অনেকক্ষণ হল চলে গেছে ওর বাড়িতে। যাওয়ার সময় টিফিনবাটি করে মাংস দিয়ে দিয়েছেন অবনীদা। ও আর ওর বাবা খাবে।
কম্বল ছাড়াও একটি করে লেপ দিয়েছেন অবনীদা। তবুও কাঠের ঘরের ভেতরে হিরহির করে ঠান্ডা ঢুকে যাচ্ছে। সলিলের ভূতের ভয় আছে। ও হ্যারিকেন নেভাতে দেয়নি। নিভু নিভু হ্যারিকেনের আলো বেশ রহস্যময় করে তুলেছে ঘরটাকে। কেউ একজন পাশের ঘরে হেঁটে গেল। অবনীদা নিশ্চয় ওয়াশরুমে গিয়েছিলেন। আলো না জ্বেলে কেন যাচ্ছেন ওয়াশরুমে? নতুন জায়গায় ঘুম হয় না আমার। ভাবলাম একবার ওয়াশরুমে ঘুরে আসি।
অবনীদার এখানে একটিই ওয়াশরুম। আমি আস্তে উঠে পাশের ঘরে গিয়ে অবনীদার ওয়াশরুম ইউজ করব বলে অবনীদাকে ডাকতে গিয়ে দেখি, লেপ কম্বলের তলে অঘোরে ঘুমিয়ে আছেন। বাবাহ! এই এলেন, এসেই ঘুম? আমি একটু হেসে ওয়াশরুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখি মেঝেতে জল পড়ে আছে। সাবধানে পা রেখে ভেতরে ঢুকে একটু দাঁড়ালাম। টর্চটা নিভে যাচ্ছিল বারবার। মোবাইলের টর্চ। চার্জ নেই বেশি নাকি? একটু আগেই চার্জ দিয়েছি। যাকগে।
ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে মোবাইলের টর্চ নিভে গেল। টর্চ নিভে গেলে হঠাৎ করে চোখশুদ্ধ মানুষটাই মনে হয় অন্ধকারে ডুবে গেলাম। তারাতাড়ি করে টর্চ জ্বালাতেই এক পলকের মধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল। মনে হল, একটি ছোট ছেলে ওয়াশরুমের বাইরে থেকে আমাকে দেখছে। টর্চ নিভে গেল। ফের টর্চ জ্বেলে দরজার দিকে তাকালাম। কিছু নেই। শান্ত সমাহিত চারপাশ। এসব মনের ভ্রম। নির্জন জায়গায় আধিভৌতিক আলোচনার পরে এমন হয়। রজ্জুতে সর্পভ্রম! কিন্তু রজ্জু তো থাকতেই হবে! নইলে সর্পভ্রম হবে কী করে? রজ্জু কোথায়? আমি টর্চের আলো চারপাশে ঘুরিয়ে কিছু দেখতে পেলাম না।
এখন একা ঘরে যেতে ভয় করছে! একা ঘরে ঘুমোতে পারতাম না আজ যদি ওরা একই রুমে না থাকত! মনের মধ্যে অলীক কল্পনা ঘুরছে কেন? আমার কি ফেসমোফোবিয়া হয়েছে নাকি? ভূতের ভয় থেকে যে ফোবিয়ার জন্ম। কিন্তু আমি এমন ভিতু নই। কখনোই নই। তাহলে? অবনীদা এখানে এতদিন ধরে আছেন, তিনি কি তেমন ভয়ের কিছু থাকলে জানতেন না? টর্চ জ্বেলে ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে চারপাশে আলো ফেলতে ফেলতে ঘরে ঢুকে পড়লাম। নিজের বালিশে মাথা রাখার পরেও দরজার আড়াল থেকে উঁকি দেওয়া বাচ্চা ছেলের মুখ ভুলতে পারছিলাম না।
সকালে অবনীদাকে ঘটনাটা বলে ফেললাম। চা ভালোই বানিয়েছে এতোয়ারি। চা-বিস্কুট গুছিয়ে নিয়ে এসেছে। দূরে কোথায় বেকারির বিস্কুট পাওয়া যায়। অবনীদা নিয়ে এসেছেন। একটু নোনতা, একটু মিষ্টি মিষ্টি স্বাদ। চা খেতে খেতে অবনীদাকে রাতের ঘটনাটা বলার পরে অবনীদা আপসেট হয়ে পড়লেন। আসলে একা থাকেন। আমরা দুদিনের জন্যই এসেছি। চলে যাব। অবনীদা ফের একা হয়ে যাবেন। তাহলে কি আমার কথায় তিনি ভয় পেলেন? এমন নির্জন জায়গায় থাকেনই বা কেন একা একা? কে জানে বাবা, প্রেতাত্মা-ট্রেতাত্মা আছে কিনা! অবনীদা এসব বেশ বিশ্বাস করেন দেখেছি। কণিষ্ক, অময় আর সলিলকে ব্যাপারটা খুলে বলব ভেবে বললাম, ‘চল, চা খেয়ে একটু ঘুরেফিরে আসিগে।’
আমরা চারজনে বাইরে বেরিয়ে এলাম। অবনীদা এলেন না। রান্নার তদারকি করবেন এখন। আমরা হেঁটে হেঁটে সোনা বাউরির ঘাটের দিকে গেলাম। পুরোনো দিঘি। সিঁড়িতে বট অশ্বত্থের চারা ঝেঁপে আছে। শ্যাওলায় ভরা ঘাট। ঘাটের সিঁড়িতে বসে ঘটনা খুলে বললাম। ওরা ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিল। আসলে আমরা কেউ ভিতু নই। আমি যা দেখেছি, তার মধ্যে যথার্থ কিছু আছে বলেই আমার বন্ধুরা বিশ্বাস করে।
অময় ঘাসের ডগা ছিঁড়তে ছিঁড়তে জলের দিকে তাকাল, ‘অবনীদা কি কিছু গোপন করছেন? তিনি কিছু জানেন না? আমরা জাস্ট এসেছি। এর মধ্যেই রেহান অদ্ভুতভাবে মধ্যরাতে ঘরের ভেতরে একটা বাচ্চা দেখে ফেলল, আর এত বছর ধরে তিনি এখানে আছেন, কিছুই কি জানেন না? আমি মেনে নিতে পারছি না।’
‘তাহলে?’ কণিষ্ক আমাদের সবার মুখের দিকে তাকাল, ‘একটা প্রস্তাব দেব? আজকের রাতটা আমরা জেগে থেকে দেখব, আসলে কিছু আছে কি না?’
আমাদের সকলেরই পছন্দ হল কণিষ্কর প্রস্তাব। আমরা মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। উল্টোদিক থেকে একজন সাইকেল চালিয়ে আসছিল। আমাদের দেখে দাঁড়াল, ‘নতুন মনে হচ্ছে? বেড়াতে?’
‘হ্যাঁ’। আমি বললাম। লোকটা একটা খাকি পোশাক পরেছিল। পুলিশ নাকি?
‘নাহে, আমি বাসের কন্ডাক্টর ছিলাম। রাজ্য সরকারি বাসের। রিটায়ার করেছি অনেকদিন। লোকে আমাকে কন্ডাক্টর বলেই ডাকে। ওই দিকে আমার বাড়ি। এলে এসো। আমার গিন্নি চমৎকার খিচুড়ি রাঁধেন। আচ্ছা, দেখা হবে।’ সাইকেল মাঠের মধ্যে উঁচু-নিচু জায়গায় টাল খাচ্ছিল। কিন্তু কন্ডাক্টর বেশ ড্রাইভিং শিখেছে দেখছি। মজার লোক।
সলিল বলল, ‘তাহলে আসল কথায় আসি। আজ আমরা কেউ ঘুমোব না, তাই তো? একথাটা কেউ অবনীদাকে ভুলেও বলবে না। মনে রাখিস। আমরা সিরিয়াস, এটা জানালে অবনীদা কী করবেন, কে জানে। ভয় হয়তো আছে অবনীদার মনে। সেই জন্য রেহানের কথাটা শুনে চা খেতে খেতে কেমন চুপচাপ হয়ে গেলেন।’
অময় উত্তেজিত, ‘মনে আছে, কেমন কাকুতি-মিনতি করে আমাদের এখানে ডেকে পাঠালেন! আরও কিছুদিন থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন!’
‘হু, লোভ দেখাচ্ছেন কোনও এক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ দেখাতে নিয়ে যাবেন! আমার ওই ব্যাপারে আগ্রহ আছে সেটা অবনীদা জানেন।’
হ্যাঁ, মনে আছে। সব মনে আছে। কিন্তু সেটা যে ভয় বা অস্বস্তি রয়েছে বলে আমরা বুঝতে পারিনি আগে। অবনীদাকে আমিই চিনতাম। আমাদের বাগুইহাটির পাড়ায় অবনীদাদের একটা গ্যারেজ ছিল। সারাক্ষণ তেলকালি মেখে অবনীদার বাবা গাড়িগুলোর অসুখ সারাতেন। একচুয়ালি তিনি ভালো মেকানিক ছিলেন। কুচো কুচো চুল ছিল ভদ্রলোকের। কম কথা বলতেন। কিন্তু অবনীদা বাবার পথ মাড়ালেন না। চাকরি নিয়ে বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে চলে এলেন। আমি বিশ্বকর্মা পুজোর দিন সন্ধেতে বাবার সঙ্গে অবনীদার বাবার গ্যারাজে যেতাম। একটা খুপড়ি মতো ঘরে সাদরে আমাদের বসানো হতো। সেটা ছিল অবনীদার বাবার অফিসরুম। সেখানে একটা কাঠের চেয়ারে তেলকালি মাখা টাওয়েল ঝুলে থাকত পোষা বেড়ালের মতো। একটা লোক কাগজের ফুল তোলা প্লেটে সরু সরু ঝুরিভাজা আর দুটো করে রসগোল্লা দিয়ে যেত। অবনীদা চলে গিয়ে বাড়ির সঙ্গে সংযোগ রাখেননি। শুনেছিলাম কোন এক চা বাগানে চাকরি করতেন। একবার ট্রেনে হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেল নর্থবেঙ্গল যাওয়ার সময়ে। অবনীদা ঠিকানা দিয়ে যেতে বলে দিলেন শুধু নয়, রীতিমতো জুলুম করছিলেন। কথা দিয়েছিলাম যাব। অবশেষে এসেছি। অবনীদা রিটায়ার করেছেন। একটা ছোট বাড়ি কিনে নির্জন এলাকায় আছেন। এর মধ্যে এই কাণ্ড। কোন এক বাচ্চাকে দেখে ফেললাম আমি। আর তারপরেই আমাদের যত অস্বস্তি শুরু হল।
রাতের খাবার খেয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম। অবনীদা বাচ্চা সংক্রান্ত কোনও কথা তোলেননি। আমরাও যেন কিছুই হয়নি ভাব করে ঘুমোতে চলে গেলাম। খানিক পরে উঁকি দিয়ে দেখি অবনীদা ঘুমোচ্ছেন। নিজেদের ঘরে খাটে বসে আছি। নিভু নিভু হ্যারিকেন আছে ঘরে। পাশের ঘরে, অর্থাৎ অবনীদা যেখানে ঘুমোচ্ছেন, সেই ঘরেও নিভু নিভু হ্যারিকেন। ঘুম পাচ্ছিল। জোর করে জেগে আছি। হঠাৎ করে অময় আমাকে খোঁচা দিল, ‘কেউ কি চলে গেল ওই ঘরে?’
আমারও মনে হয়েছিল কেউ যেন হেঁটে চলে গেল! হালকা একটা কিছু দেখলাম যেন। একটা অস্পষ্ট অস্তিত্ব চলে গেল! তাকে দেখতে পাইনি, কিন্তু অনুভব করেছি আমরা দুজনেই। এমন লালচে অল্প অল্প আলো ছায়ার মধ্যে বেড়াল-টেড়াল দেখেছি ঠিক। আমাদের উসখুস বুঝে কণিষ্ক আর সলিল উঠে বসেছে, ‘চল, অবনীদাকে দেখে আসি। ঠিক আছেন কিনা...! সত্যি কেউ ঢোকেনি তো অবনীদার ঘরে!’
আমরা চারজন আস্তে আস্তে পাশের ঘরে উঁকি দিলাম। দেখি অবনীদার খাটের পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটি বাচ্চা ছেলে। কণিষ্ক আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই, কে? কে তুমি?’
অবনীদা জেগে উঠে আমাদের দেখে অবাক। আমরা দেখছি ঘরে কেউ নেই! অবনীদাকে লুকনোর কিছু ছিল না। শুনে খাট থেকে নেমে দাঁড়ালেন, ‘সত্যি? সত্যি এসেছিল? তোমরা দেখলে? আমি কেন দেখতে পাই না?’
‘সে কী? কে এই বাচ্চাটা? লুকিয়ে ঢোকে আপনার ঘরে আপনি জানেন? থাকে কোথায়? আমি সেদিন ঠিক এই বাচ্চাকেই দেখেছি অবনীদা!’
অবনীদা ফ্যাকাশে মুখে তাকালেন, ‘আসলে জানো, আমি ওকে রাস্তা থেকে তুলে এনেছিলাম। বড় করেছি। সাত বছর বয়স তখন, ও পুকুরে পড়ে যায়! আমারই দোষ। আমি ওকে নিরাপত্তা দিতে পারিনি। সেই অভিযোগ জানাতে আসে ও! হয়তো ডুবে যাওয়ার সময় আমাকে ডেকেছিল বাঁচাবার জন্য! আমি জানতাম না। আমি আসিনি! আমার এই বাড়ির পেছনের পুকুরে ও পড়ে মরেছে। যখন এসেছি, তখন আর ও নেই হয়ে গিয়েছে। আটমাস আগের ঘটনা। ও আমার জন্য কষ্ট পেয়েছে। আমি ক্ষমা চাই বাবুলাল!’
কী হল, হঠাৎ ছেলেমানুষের মতো কেঁদে উঠলেন অবনীদা। খাট থেকে নেমে জুতো না পরেই ঝট করে ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে যাচ্ছিলেন, আমরা ভয় পেয়ে তাঁর পেছনে ছুটছিলাম, ‘যাবেন না দাদা, যাবেন না, এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন?’ বলে চেঁচাচ্ছিল অময়। অবনীদা কারও কথাই শুনছিলেন না। অন্ধকারের মধ্যে ছুটে গিয়ে বাড়ির পেছনের পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন অবনীদা। জলে বিরাট শব্দ হল। একরাশ কালো জল চিৎকার করে উঠল, ‘আহা হা হা...!’
সেই রাতে আমরা একটা সাহায্যকারী পেলাম না। কণিষ্ক হইচই করে লোক জোগাড় করতে করতে ঘণ্টা কেটে গেল। একজনকে পাওয়া গেল। সে রাতে জলে নামতে রাজি নয়। নেশা করে চুর হয়ে আছে। অময় বলল, ‘থানায় জানাতে হবে।’
থানা থেকে লোক নামিয়ে পরদিন বেলা আটটার দিকে অবনীদাকে তুলে আনা হল। অবনীদার বন্ধ চোখ, জলে ভেজা শরীর। অবনীদার মুখে স্মিত হাসি। দুহাতে আঁকড়ে ধরে আছেন একটি ছয়-সাত বছরের বাচ্চাকে। দুজনেই জলে ডুবে থেকে সাদা হয়ে আছে।
এতোয়ারি ত্রাসে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এই বাচ্চাটা অনেক মাস আগে জলে ডুবে মরে গিয়েছে! ওকে বাগানেই গোর দেওয়া হয়েছে! ওকে কোথা থেকে তুলে আনলে?’
কন্ডাক্টর খবর শুনে এসেছে। ওদের দেখে দাঁড়াল। হাতছানি দিয়ে ডাকল, ‘তোমরা এখানে এসেছ? থাকছ কোথায়?’
ওরা কাঁপছিল। সমস্ত ঘটনার তাণ্ডবে শরীর যাকে বলে বেপথুমান। কণিষ্ক দাঁড়াতে পারছিল না। একটু সামলে নিয়েছে অময়। ও বলল, ‘আমরা অবনীদার কোয়ার্টারে এসেছি। কিন্তু কী যে হল বুঝতে পারছি না। এতোয়ারি কী বলছে বলুন তো? বাচ্চাটা অনেকদিন আগেই যদি মরে গিয়ে থাকে, তাহলে ঘরের ভেতরে যেত কী করে? আর, বাচ্চাটাকে নাকি কবর দেওয়াও হয়েছে। এতোয়ারি সেটাই বলছে। কবর দেওয়ার পরেও জলে ডুবে থাকে কী করে?’
কণিষ্ক কাঁপতে কাঁপতে বলে, ‘আমি আজ এখনই বাড়িতে যাব। এখানে আর নয় রে। কী মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে গেল! সারাদিন আমরা একই সঙ্গে আছি। কথাবার্তা, গল্প...! সেই অবনীদা মরে গেলেন? বিশ্বাস হয়?’
কন্ডাক্টর বলল, ‘তোমাদের আর কোয়ার্টারে গিয়ে কাজ নেই। আমার বাড়ি কাছেই। চল। রাতটুকু কাটিয়ে যাও। এখানে থাকার দরকার নেই আর। প্রেতের সঙ্গে থাকা, বাপরে৷’
ওরা কন্ডাক্টরের প্রস্তাবে সায় দিয়ে ওই অবস্থায় রওনা দিচ্ছিল। কন্ডাক্টর বলল, ‘ব্যাগ-ট্যাগ আছে? সেগুলো ফাঁকা বাড়িতে রেখে যাবে?’
পাঁচজনে মিলে অবনীদার কোয়ার্টারে ঢুকে নিজেদের ব্যাগগুলো ধুম ধাম তুলে নিয়ে ছুট লাগাল। এতোয়ারি কোথায় গেল? ওর দেখা মিলল না। কন্ডাক্টরের বাড়ি খুব কাছে নয়। একতলা ভাড়াটে বাড়ি। দুটো ঘর। একটা ঘর ওদের ছেড়ে দিল কন্ডাক্টরের বউ। কন্ডাক্টর ফিসফিস করে কী বলছে বউকে। বউ বিস্ময়ে, ‘সে কী গো?’ বলে এমন চিলচিৎকার দিয়েছে যে ওরা চারজন উঠে বসেছে বিছানায়। কী হল?
কন্ডাক্টর, ‘না, সে অন্য কথা’ বলাতে বউ চেঁচিয়ে উঠল ফের, ‘ছেলেগুলোকে বলে দাও। নয়তো ফের ভুল করবে যে। ওদের জানা দরকার।’
‘কী হয়েছে বলুন প্লিজ।’ বলে কন্ডাক্টরের ঘরে এসেছে চারজন। কন্ডাক্টর বলল, ‘কী বলি? তোমাদের ভারি বিপদ। কাল পুলিশের কাছে কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। সে হবে, তা নিয়ে ভাবনা নেই। আবার আছেও। পুলিশকে কী করে বোঝাবে? পুলিশ তোমাদের গাঁজাখোর না ভাবে। এদিকে গাঁজার রমরমা কিনা।’
‘আহ, গাঁজাখোর কেনই বা ভাববে বলুন? এতোয়ারি সব জানে। ওখানে যারা ছিল, সবাই বলবে যে ছেলেটা কবর থেকে বেরিয়ে ফের জলে ডুবে ছিল। অবনীদা ওকে তুলে আনতে গেল কেন? সে জানতো ছেলেটা কবরের নীচে আছে। তাহলে?’
‘তাহলে আর কী? রোজ একই নাটক করে দুজনে মিলে। সেই কবে ছেলেটা জলে ডুবল। অবনীবাবু জল থেকে তুলতে গিয়ে নিজেই ডুবে গেল। যখন দুজনের বডি তোলা হল, দেখা গেল, অবনীবাবুর কোলে মরা বাচ্চাটা। আজ দিন ক্ষণ দেখে সেই ঘটনা ঘটল। সবাই জানে না। কেউ কেউ জানে। এতোয়ারিও জানে। তবু কেন পড়ে ছিল ওখানে কে জানে।’
‘মানে, অবনীদা...’
‘অনেকদিন হল মরে গিয়েছেন। এক সন্ধেবেলায় বাচ্চাটাকে জল থেকে তুলে আনতে গিয়েই...! আটমাস হল।’
চারজন নির্বাক হয়ে রইল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন