সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

'ঘোড়া ইজ ঘোড়া৷' বাঁট্টুবাবু-ডাক্তার খাপ্পা হয়ে বললেন৷ 'এইচ ও আর এস ই হর্স৷ খবরদার! আর কক্ষনো আমার ঘোড়াকে টাট্টু-ফাট্টু বলবে না৷'
পণ্ডিতমশাই ফিক করে হেসে বললেন, 'এই চতুষ্পদ বক্রগতি বামন প্রাণীটিকে যদি ঘোড়া বলতে হয়, তাহলে সিঙ্গিমশাইয়ের রামছাগলটিও ঘোড়া!'
বাঁট্টুবাবু-ডাক্তার তেড়েমেড়ে বললেন, 'তুমি পণ্ডিতমূর্খ! রামছাগলের শিং থাকে৷ আমার ঘোড়ার শিং আছে?'
'ছিল৷ তুমি তো ডাক্তার৷ অস্ত্রচিকিৎসা করে কেটে দিয়েছ৷' পণ্ডিতমশাই ডিবে বের করে একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন এবং বিকট হাঁচলেন৷
হয়তো হাঁচির শব্দেই ভয় পেয়ে আচমকা টাট্টু ঘোড়াটি পিঠে ডাক্তারবাবু সমেত প্রায় দিশেহারা হয়েই পালিয়ে গেল৷ পণ্ডিতমশাই খিক খিক করে হাসতে লাগলেন৷ ভিড় করে দাঁড়িয়ে যারা তর্কাতর্কি শুনছিল, তারাও হাসতে লাগল৷
বাঁট্টুবাবুর আসল নামটা কী, এখনও অনেকে জানে না৷ বেঁটে গাবদাগোবদা মানুষ বলে সবাই বাঁট্টুডাক্তার বলে৷ এই গ্রামের সরকারি দাতব্য চিকিৎসালয়ে তিনি বদলি হয়ে এসেছেন৷ এলাকার অবস্থা শোচনীয়৷ না রাস্তাঘাট, না কিচ্ছু, বিষ্টিবাদলা হলেই জল-কাদা৷ সাইকেলও চলে না৷ তাই বুদ্ধি করে ডাক্তারবাবু ঘোড়াটি কিনেছেন৷
গুজব আছে, দূরের পাহাড়ি মুল্লুক থেকে ঘোড়ার পিঠে জাঁতা-শিল-নোড়া চাপিয়ে এ-তল্লাটে যারা বেচতে আসে, তাদের কাছেই নাকি বাঁট্টুবাবু ঘোড়াটি কিনেছেন৷ হাড়-জিরজিরে একটা টাট্টুই বটে৷ নড়বড় করে দৌড়োয়৷ এ-ও শোনা যায়, টাট্টু ঘোড়াটির স্বভাব বেয়াড়া বলেই জাঁতাওয়ালারা তাকে কম দামে বেচে দিয়ে যায়৷ কেউ বলে পাঁচ টাকায়, কেউ বলে মাত্র দু-টাকায়৷ আবার কেউ বলে, জাঁতাওয়ালাদের আন্ত্রিক রোগ হয়েছিল৷ তারই ভিজিট৷
তবে এটা সত্যি, ডাক্তারবাবুর একটা ঘোড়ার খুব দরকার ছিল৷
সেবার দেশে খুব আন্ত্রিক রোগের প্রাদুর্ভাব৷ গ্রামকে গ্রাম উজাড় হয়ে মানুষ মরছে৷ ডাক্তারবাবুর দম ফেলার ফুরসত নেই৷ ওই টাট্টুর পিঠে চেপে গাঁয়ে গাঁয়ে চিকিৎসা করে বেড়াচ্ছেন৷ লোকে তারিফও করে, এমন জনদরদি ডাক্তার বহুকাল আগে দেখেনি৷ খুব শিগগির তিনি দারুণ পপুলার হয়ে উঠেছেন এলাকায়৷
বাঁট্টুবাবু এমনিতে হাসিখুশি মানুষ৷ কিন্তু কেউ তাঁর ঘোড়ার বদনাম করলে বেজায় চটে যান৷ স্কুলের প্রাক্তন সংস্কৃতশিক্ষক পণ্ডিতমশাইয়ের সঙ্গে তাঁর বেশ ভাব৷ পণ্ডিতমশাই বাইরে বাইরে কাঠখোট্টা, ভেতর ভেতর কিন্তু ভারি রসিক৷ ডাক্তারবাবুর সঙ্গে দেখা হলেই ফিক করে হেসে বলেন, 'ওহে ডাক্তার, কিঞ্চিৎ শাস্ত্রবাক্য শ্রবণ করো৷'
'সময় নেই৷ কাল যাচ্ছি৷'
'আহা, শাস্ত্রবাক্য শ্রবণে পুণ্য হয়৷' পণ্ডিতমশাই আকর্ণ হেসে বলেন৷ 'দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত, মতান্তরে উচ্চৈঃশ্রবা৷ শিবের বাহন ষণ্ড৷ লক্ষ্মীর বাহন পেচক৷ গণেশের বাহন মূষিক৷ কার্তিকের বাহন ময়ূর৷ সরস্বতীর বাহন রাজহংস৷ শীতলার বাহন গর্দভ৷ আর বাঁট্টুর বাহন টাট্টু!'
ডাক্তারবাবু বাঁকা হেসে বলেন, 'তুমি খুব ভোজনরসিক শুনেছি৷ সিঙ্গিবাড়ির বুড়োসিঙ্গির শ্রাদ্ধে একশো আটখানা পান্তুয়া খেয়েছিলে৷ কিন্তু সাবধান! এটা আন্ত্রিকের সময়৷ আন্ত্রিকে ধরলে তখন, দেখছ তো?' ব্যাগ খুলে প্রকাণ্ড ইঞ্জেকশন-সিরিঞ্জ বের করে দেখান৷
পণ্ডিতমশাইয়ের ইঞ্জেকশনকে বড়ো ভয়৷ ঝটপট গম্ভীর হয়ে বলেন, 'কিমাশ্চর্যম! আমি তো তোমার ব্যাজস্তুতিই করলুম! নিন্দার ছলে স্তুতি! টাট্টুপৃষ্ঠে বাঁট্টু৷ কেমন অনুপ্রাস অলংকার দিলুম, ভাবো!'
ডাক্তার আর একদফা শাসিয়ে টাট্টু ছোটান৷ বেঁটে গোবদা মানুষের চাপে বেঁটে রোগা টাট্টু ঘোড়াটি নড়বড় করে বক্রগতিতে অর্থাৎ এঁকেবেঁকে কী দৌড় দৌড়োয়, দেখবার মতো দৃশ্য৷ দুষ্টু ছেলেরাও কখনো হল্লা করে পেছনে দৌড়োয়৷ তাতে বাঁট্টুডাক্তারের টাট্টু ভয় পেয়ে কেলেঙ্কারি বাধায়৷ ডাক্তার হয়তো রুগি দেখতে যাচ্ছেন কেষ্টপুরে, তাঁকে নিয়ে গিয়ে তুলল বিষ্টুপুরে৷
তবে সবখানেই আন্ত্রিক রোগ৷ বিষ্টুপুরের লোকেরা খুশি হয়৷ ডাক্তারও রুগি পেয়ে খুশি হন৷
পণ্ডিতমশাই গড়নে বাঁট্টুবাবুর দোসর৷ পরনে অবশ্য খাটো ধুতি আর হাতকাটা ফতুয়া৷ মাথায় দেখার মতো টিকি৷ স্কুলে রিটায়ার করেছেন কবে৷ তারপর থেকে পেশা যজমানি৷ এ-গাঁ সে-গাঁ থেকে পুজোআচ্চায় ডাক আসে৷ তাই তাঁরও বাহনের অভাবে বড়ো অসুবিধে৷ জল-কাদা ভাঙা এ-বয়সে কষ্টকর৷
বাঁট্টুডাক্তারের টাট্টু নিয়ে মুখে যতই রসিকতা করুন, ব্যাপারটা দেখার পর তাঁকেও ঘোড়ারোগ ধরেছিল৷ ভাবতেন, যেমন-তেমন, একটা ঘোড়া পেলে ভালো হয়৷ কিন্তু ঘোড়ার যা দাম, তাঁর পক্ষে ঘোড়া কেনা সম্ভব নয়৷ এক ভরসা, শীতের শেষে পাহাড়ি মুলুকের জাঁতাওয়ালারা যদি আসে এবং দৈবাৎ একটা রোগাভোগা ঘোড়া কম পয়সায় পেয়ে যান, ডাক্তারবাবুর মতোই৷
পেলে দানাপানি খাইয়ে তাজা করে ফেলবেন৷ বাঁট্টুবাবুর মতো মাঠে কি জলার ধারে চরে নিজের আহার নিজেকে খুঁজতে দেবেন না৷ ডাক্তার বড়ো কঞ্জুস!
তখন সদ্য শরৎকাল চলছে৷ বিচ্ছিরি বিষ্টিবাদলা, জল-কাদা৷ কবে ফাল্গুন আসবে, তখন পাহাড়ি লোকেরা এসে যাবে৷ আজকাল জাঁতার চল কমে গেছে৷ তবে শিলনোড়ার চাহিদা আছে৷ পাথরের থালাবাটিও লোকে কেনে৷ সেই ভরসা৷ পণ্ডিতমশাই প্রতীক্ষায় ছিলেন৷
দেখতে দেখতে কালীপুজো এসে গেল৷ প্রায় ছ-কিমি দূরে কালীপুরে এক যজমানবাড়ি আছে৷ পণ্ডিতমশাই তাঁদের কালীপুজোর পুরুত৷ প্রত্যেক বছর অবশ্য গোরুর গাড়ি পাঠায়! এবার ওই এলাকায় বন্যা হয়েছিল৷ রাস্তা ভেঙে-টেঙে ধুয়ে গেছে৷ জল-কাদায় গাড়ি আসবে না৷
কিন্তু লোক তো আসবে৷ পায়ে হেঁটেই যাবেন বরং৷ কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল৷ যজমানবাড়ি থেকে লোক এল না৷ বংশানুক্রমে যজমান ওরা৷ এমন তো হওয়ার কথা নয়৷ বন্যায় মূর্তি গড়িয়ে পুজো না করতে পারুন, শাস্ত্রে ঘটপুজোর বিধি আছে না৷ গৃহদেবীর বাৎসরিক পুজো না হলেই অকল্যাণ৷ দিনে দিনে পাষণ্ড নাস্তিক হয়ে যাচ্ছে লোকেরা৷ পণ্ডিতমশাই ভাবলেন, নির্বোধ৷ তাই শাস্ত্রবিধি জানে না৷ বরং নিজে গিয়ে ব্যবস্থা করবেন পুজোর৷ আজই অমাবস্যা৷ পণ্ডিতমশাই বেরিয়ে পড়লেন৷ দিন ফুরিয়ে আসছে৷ আর তো দেরি করা যায় না৷ অতখানি পথ৷
গ্রামের শেষে দিঘি৷ দিঘির পাড় দিয়ে পায়ে-চলা পথ৷ পণ্ডিতমশাই হঠাৎ দেখতে পেলেন বাঁট্টুবাবুর টাট্টুটি জলের ধারে তখনও ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে৷ অমনি থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন৷
জল-কাদা ভেঙে বাঁট্টুডাক্তার যদি কাঁহা কাঁহা মুল্লুক ওই টাট্টুর পিঠে চেপে ঘুরতে পারেন, তিনিই-বা পারবেন না কেন? বেগড়বাঁই করলে ছাত্রদের যেমন কান টেনে শাস্তি দিতেন এবং আকর্ণ হেসে বলতেন, 'কান টানলেই মাথা আসে, মাথা এলেই বুদ্ধি আসে', তেমনি টাট্টুব্যাটার কান টেনে শায়েস্তা করবেন৷
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে পণ্ডিতমশাই নেমে গেলেন৷ হাতে একটা যষ্ঠি আছে৷ সাপখোপের ভয়, জল-কাদায় আছাড় খাওয়ারও ভয়৷ সেজন্যই এই যষ্টি৷ আস্ত বাঁশের খেঁটে৷ এটাই ছিপটির কাজ দেবে৷
ঘোড়াটিকে গুঁতো মেরে জলের ধার থেকে ওঠালেন৷ দেখলেন, বেশ শান্ত মেজাজের প্রাণী তো! আসলে বাঁট্টুডাক্তার খামোকা ওকে ছিপটি মারতেন বলেই অমন করে দৌড়োত৷
পণ্ডিতমশাই তার গায়ে হাত রেখে আদর করে সাধুভাষায় বললেন, 'বৎস! পুণ্যকর্মে গমন করিলে পুণ্যলাভ হইবে৷ প্রচুর চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় হেঁ হেঁ হেঁ...! তোমার উচ্চৈঃশ্রবার ন্যায় সুচিক্কণ বপু হইবে, হেঁ হেঁ হেঁ...!'
টাট্টুটি বোধ করি আনন্দে বিকট হ্রেষাধ্বনি করল, 'চিঁ হিঁ হিঁ হিঁ...' এ-যাবৎ তার হ্রেষাধ্বনি শোনা যায়নি৷ পণ্ডিতমশাই এক লাফে তার পিঠে চাপলেন৷ এমন যার হাঁকডাক, তাঁর গায়ে জোর আছে বই কী!
লাগাম ছাড়া টাট্টু৷ আচমকা পিঠে ওজনের হেরফের টের পেয়ে থাকবে৷ তক্ষুনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দৌড়োল৷ পণ্ডিতমশাই অমনি ঝুঁকে তার গলা জড়িয়ে না ধরলে আছাড় খেতেন৷ সামলে নিয়ে তাকে কালীপুরমুখী করতে লাঠির গুঁতো মারলেন৷ টাট্টু আরও ভয় পেয়ে দিশেহারা হয়ে দৌড়োল৷
তারপর আর থামবার নাম নেই৷ আবছা আঁধারে জল-কাদা ভেঙে পক্ষীরাজের মতো যেন ডানা মেলে উড়ছে৷ দেখতে দেখতে আঁধার ঘনিয়ে এল৷ পণ্ডিতমশাই তাঁকে যত থামানোর জন্য গুঁতো মারেন, তত তার গতি বাড়ে৷ শেষে তিনি হাল ছেড়ে দিলেন৷
অমাবস্যার রাত্তির৷ ঘুরঘুটে আঁধার৷ দূরে একটা আলো জুগ জুগ করছিল৷ ঘোড়াটা সেই আলোর দিকেই ছুটছে মনে হল পণ্ডিতমশাইয়ের৷ ততক্ষণে ঝাঁকুনিতে তাঁর কোমরে ব্যথা ধরে গেছে৷ হাড় মট মট করে নড়ছে৷ জীবনে কখনো ঘোড়ায় চড়েননি৷ তাতে জিন নেই ঘোড়ার পিঠে৷ পাদান নেই৷ ঝুলন্ত পা দু-খানিও জল-কাদা কাঁটাখোঁচে একেবারে বিচিত্তির! হাতের লাঠিটাও কখন গেছে পড়ে৷ দু-হাতে ঘোড়ার গলা আঁকড়ে উবু হয়ে আছেন পণ্ডিতমশাই৷

আলোর কাছাকাছি গিয়ে বাঁট্টুবাবুর টাট্টুর গতি কমল৷
একটা গ্রামই বটে৷ দু-ধারে ঘরবাড়ি আবছা দেখা যাচ্ছে৷ একটা বারান্দায় লন্ঠন জ্বলছিল৷ ঘোড়াটি সেখানে গিয়ে থামল এবং বিকট ডাক ছাড়ল, 'চিঁ হিঁ হিঁ হিঁ!'
অমনি কারা চেঁচিয়ে উঠল, 'এসে গেছেন! ডাক্তারবাবু এসে গেছেন!'
তারপর চারদিকে হল্লা৷ একটা সাড়া পড়ে গেল৷ 'ওরে, ডাক্তারবাবু এসে গেছেন! ইঞ্জেকশন নিবি তো চলে আয়!'
পণ্ডিতমশাই কথা বলার চেষ্টা করলেন৷ গলা শুকনো৷ কথা বেরোল না৷
যে বারান্দায় লন্ঠন জ্বলছিল, সেখান থেকে কেউ হেঁড়ে গলায় ধমক দিল, 'চো-ও-প সব! চো-ও-প!'
হল্লাটা থেমে গেল৷ তখন সে ঘোড়ার কাছে এল৷ হাতের লন্ঠন তুলে পণ্ডিতমশাইকে দেখে বলল, 'ডাক্তারবাবু, আপনার ব্যাগ দেখছিনে যে?'
এবার পণ্ডিতমশাই অতিকষ্টে শুধু বললেন, 'জল!'
লোকটা হাঁক ছাড়ল, 'ওরে, জল নিয়ে আয়৷'
তক্ষুনি এক ঘটি জল এসে গেল৷ পণ্ডিতমশাই টের পেলেন জলটা বেজায় ঠান্ডা হিম! তা হোক! ঢক ঢক করে খেয়ে চোখে-মুখে ছড়িয়ে একটু সুস্থ হলেন৷ বললেন, 'আমাকে নামাও বাবাসকল৷ তারপর সব বলছি!'
কয়েক জন মিলে তাঁকে চ্যাংদোলা করে নামাল৷ মনে হল, গাঁয়ের চাষি মানুষজন দিনমান জল-কাদায় মাঠে কাজ করেছে, তাই এখনও হাতগুলো জলটার মতোই ঠান্ডা হিম৷
লন্ঠনের আলোটা খুব কম৷ স্পষ্ট করে কিছু দেখা যাচ্ছে না৷ যেটুকু দেখা গেল, বারান্দাটা পাকা৷ বাড়িটাও পাকা এবং দোতলা৷ কিন্তু পলস্তারা-খসা পুরোনো বাড়ি৷ জরাজীর্ণ অবস্থা বোঝা যায়৷ বারান্দাতেও ফাটল ধরেছে৷ লন্ঠনধারী লোকটি ঢ্যাঙা, রোগাটে গড়ন৷ পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি৷ প্রৌঢ় বলা চলে৷ মাথায় কাঁচা-পাকা সিঁথে করা লম্বা চুল৷ ঘরে পণ্ডিতমশাইকে ঢুকিয়ে পিছু ফিরে বললেন, 'ওরে ডাক্তারবাবুর ঘোড়াটা দেখিস!'
বাইরে থেকে সাড়া এল, 'দেখছি বাঁড়ুজ্যেমশাই! ভাববেন না৷'
পণ্ডিতমশাই নমস্কার করে বললেন, 'আপনি ব্রাহ্মণ?'
পালটা নমস্কার করে তিনি বললেন, 'আজ্ঞে হ্যাঁ৷ আপনি?'
পইতে দেখিয়ে পণ্ডিতমশাই করুণ হাসলেন৷ বললেন, 'আর বলবেন না৷ যাচ্ছিলুম একখানে, এসে পড়লুম আর একখানে৷ ওই পাষণ্ড টাট্টু...'
কথা কেড়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'শুনেছি বটে! আপনাকে না-দেখলেও যেমন আপনার কথা শুনেছি, তেমনি আপনার টাট্টুর কথা শুনেছি৷ আপনি নাকি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি! কী সৌভাগ্য, আপনাকে পাওয়া গেল ডাক্তারবাবু!'
পণ্ডিতমশাই হাত নেড়ে বললেন, 'গণ্ডগোল হয়ে গেছে! গণ্ডগোল হয়ে গেছে!'
'কী গণ্ডগোল বলুন তো ডাক্তারবাবু? ব্যাগটা পড়ে গেছে তো? এক্ষুনি লোক পাঠাচ্ছি খুঁজতে৷ আপনি আগে রুগিকে দেখুন৷ আপনি চোখে দেখলেই আদ্ধেক সেরে যাবে৷ বাকি আদ্ধেক ইঞ্জেকশন৷ আগে একটু জিরিয়ে নিন৷'
পণ্ডিতমশাই একটা নড়বড়ে চেয়ারে ধপাস করে বসে বললেন, 'না, না! আপনি ভুল করছেন৷ আমি বাঁট্টুডাক্তার নই৷'
অদ্ভুত হেসে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'তা বললে কি চলে? এলাকা জুড়ে প্রবাদবাক্য চালু হয়ে গেছে জানেন তো?
যেখানে দেখবে টাট্টু
পিঠে ডাক্তার বাঁট্টু৷৷
খুরে খট খট শব্দ
শুনে আন্ত্রিক জব্দ৷৷'
পণ্ডিতমশাই জোরে মাথা নেড়ে বললেন, 'ভুল! ভুল! আমি হলুম ভেঁটু ভটচাজ৷'
বাঁড়ুজ্যেমশাই তেমনিই হেসে বললেন, 'তা বললে চলে? পায়ে হেঁটে এলে বুঝতুম, বাঁট্টুবাবুর বদলে ভেঁট্টুবাবুই নাহয় এসেছেন!'
পণ্ডিতমশাই রাগ করে বললেন, 'খবরদার, ভেঁট্টু বলবেন না!'
এই সময় বাইরে কে খ্যানখেনে গলায় চেঁচিয়ে উঠল, 'বাঁড়ুজ্যেমশাই, আপনার জামাই টাট্টুর পিঠে চেপে পালিয়ে যাচ্ছেন!'
বাঁড়ুজ্যেমশাই হাঁক ছাড়লেন, 'ধর! ধর! ধরে আন!'
আবার হল্লার শব্দ৷ অন্ধকারে ধুপ ধুপ শব্দে দৌড়োদৌড়ি৷ 'ধর! ধর! পালাল! পালাল!'
পণ্ডিতমশাই বললেন, 'ওই যাঃ! ঘোড়াটা...'
তাঁকে থামিয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'ভাববেন না৷ এক্ষুনি ধরে ফেলবে৷'
'কিন্তু ব্যাপারটা কী? আপনার জামাইবাবাজি অমন করে পালালেন কেন?'
গম্ভীর হয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'সুখে থাকতে ভূতে কিলোয়৷ আন্ত্রিক রোগের ভয় হয়েছে বাবাজির৷ পালানোর ধান্দায় আছে টের পেয়ে পেছনে লোক লাগিয়ে রেখেছিলুম৷ এই সুযোগে কেটে পড়েছে৷ কিন্তু যাবেটা কোথায়?'
বলে তিনি পা বাড়ালেন ভেতরের দিকে৷ 'কই আসুন৷ আগে রুগি দেখে নিন৷ তারপর প্রেসক্রিপশন, ইঞ্জেকশন ওসব হবে৷ আসুন, আসুন!'
পণ্ডিতমশাই মরিয়া হয়ে বললেন, 'আমি ডাক্তার নই৷ যজমেনে বামুন৷'
'তাতে কী? আমরাও যজমেনে বামুন ছিলুম৷ নইলে এই মুখ্যুদের গ্রামে কি কেউ বাস করতে আসে? আসুন, আসুন! যজমেনে বামুনরা কি আজকাল ডাক্তার হচ্ছে না?'
পণ্ডিতমশাই কাঁদো-কাঁদো মুখে বললেন, 'কিন্তু আমি যে ডাক্তারির কিস্সু জানিনে!'
'জানার দরকার নেই৷' চাপা গলায় বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন৷ 'আপনাকে দেখলেই গিন্নির আন্ত্রিক সেরে যাবে৷ পথ তাকিয়ে শুয়ে আছেন৷ খালি বলেন, কই! বাঁট্টুডাক্তার তো এলেন না! ওঁকে নাকি কল দিয়ে আসিনি বলে আমাকে শাসান৷ আমার হয়েছে জ্বালা!'
ফিসফিস করে এসব কথা বলতে বলতে সিঁড়িতে উঠছিলেন তিনি৷ একটা হাতে পণ্ডিতমশাইয়ের একটা হাত ধরে টেনে নিয়ে চলেছেন৷ অন্য হাতে লন্ঠন৷ ওপরতলার বারান্দায় উঠে পণ্ডিতমশাই বললেন, 'আপনার হাতটা বিচ্ছিরি ঠান্ডা কেন বলুন তো?'
বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'যা বিষ্টিবাদলা আর আন্ত্রিক!'
'আন্ত্রিকের সঙ্গে ঠান্ডার কী সম্পর্ক?'
পণ্ডিতমশাইয়ের দিকে ঘুরে তিনি বললেন, 'চুপ! চুপ! ওসব কথা বলতে নেই৷'
অন্ধকার ঘরের ভেতর প্রকাণ্ড সেকেলে খাট৷ তাতে গলা অবধি চাদর মুড়ি দিয়ে চিত হয়ে এক ভদ্রমহিলা শুয়ে আছেন৷ বাঁড়ুজ্যেমশাই লন্ঠনটা তুলে ধরে বললেন, 'ওগো, শুনছ? বাঁট্টুবাবু এসেছেন!'
বাঁড়ুজ্যেগিন্নি চোখ খুলে তাকালেন৷ তারপর একটা হাত বাড়িয়ে দিলেন৷
বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'নাড়ি দেখতে বলছে৷ দেখুন তো! নইলে কেলেঙ্কারি বাধাবেন৷'
পণ্ডিতমশাই নাড়ি দেখতে জানেন না৷ কিন্তু উপায় নেই৷ নাড়ি দেখার ভঙ্গিতে বাঁড়ুজ্যেগিন্নির হাতটা ধরতেই নিজের হাত হিম হয়ে গেল৷ কী ঠান্ডা! চোখ দুটোই-বা অমন নিষ্পলক কেন?
বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'নাড়ি টের পাচ্ছেন?'
পণ্ডিতমশাই ভয়ে ভয়ে বললেন, 'পাচ্ছি, আবার পাচ্ছিও না৷ কিন্তু এঁর হাত দেখছি আপনার চেয়েও ঠান্ডা!'
ফিক করে হেসে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'তা তো হবেই৷ বুঝলেন না? আমার তিন দিন আগে টেঁসে গেছেন৷'
পণ্ডিতমশাই অবাক হয়ে বললেন, 'টেঁসে গেছেন মানে? ওই তো দিব্যি তাকাচ্ছেন৷ হাত বাড়িয়ে দিলেন!'
'অভ্যেস!' বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'ডাক্তার দেখলেই হাত বাড়ানো অভ্যেস৷ কথায় বলে অভ্যেস যায় না মলে৷'
'মলে-মানে মৃত্যু হলে?'
'আবার কী?'
পণ্ডিতমশাই এক-পা, দু-পা করে পিছোতে পিছোতে বললেন, 'তার মানে উনি মড়া?'
'বাসি৷ আমার চেয়েও তিন দিনের বাসি!'
'সর্বনাশ!'
বাঁড়ুজ্যেমশাই মুচকি হেসে বললেন, 'সর্বনাশ কীসের? যতক্ষণ না আপনার ব্যাগ খুঁজে আনছে ওরা, বসুন এখানে৷ ততক্ষণ আপনাকে বেহালা বাজিয়ে শোনাই৷ বসুন, বসুন! ওই দেখুন দেওয়ালে আমার বেহালা ঝুলছে! সাধে কি এমন চুল রেখেছিলুম? বেহালা বাজালে ঠিক এইরকম চুল রাখতে হয়৷'
পণ্ডিতমশাই কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, 'আপনি বেহালা বাজান নাকি?'
'বাজাতুম৷' বেহালা পেড়ে নিয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাই বললেন, 'যাত্রাদলে বেহালা বাজাতুম৷'
'বাজাতুম! তার মানে?'
'দল উঠে গেল৷'
'কেন? কেন?'
'আবার কেন? আন্ত্রিক! আন্ত্রিকে গাঁসুদ্ধু লোক...' বাকি কথাটা শোনা গেল না বেহালার ক্যাঁক-কোঁ সুরে৷ সুরটা কেমন যেন রাতবিরেতে বাঁশ বনের শব্দের মতো, অস্বস্তিকর৷
ওদিকে বাঁড়ুজ্যেগিন্নির সেই হাতটা একই অবস্থায় বেরিয়ে উঁচু হয়ে আছে তো আছেই৷ চোখ দুটো পণ্ডিতমশাইয়ের দিকে৷ পণ্ডিতমশাই ততক্ষণে যা বোঝবার বুঝে গেছেন৷ যেই বাঁড়ুজ্যেমশাই বেহালা বাজাতে বাজাতে সুরের আবেশে চোখ বুজেছেন, অমনি তিনি পা টিপে টিপে দরজার কাছে৷
বাঁড়ুজ্যেগিন্নি চিঁচিঁ করে বলে উঠলেন, 'পালিয়ে যাচ্ছে যে!'
বাঁড়ুজ্যেমশাই সুরে তন্ময় হয়ে আছেন৷ শুনতে পেলেন না৷ সেই সুযোগে পণ্ডিতমশাই পড়ি-কি-মরি করে বাইরে এবং সিঁড়ি দিয়ে অন্ধকারে গড়াতে গড়াতে নীচে৷
তারপর বেরিয়েই দৌড়৷ সেই টাট্টুর মতো দৌড়৷ একেবারে দিশেহারা৷
একটু পরে পেছনে হল্লা শুনলেন, 'ধর! ধর! পালাচ্ছে! ডাক্তার পালাচ্ছে!'
অমাবস্যার রাতে পণ্ডিতমশাই রামনাম জপতে জপতে জল-কাদা ভেঙে দৌড়োতে থাকলেন৷...
ভোর হয়ে আসছে৷
গায়ে আর এতটুকু জোর নেই পণ্ডিতমশাইয়ের৷ ধুতি-ফতুয়া কাদায় বিচিত্তির৷ চুলে কাদা, হাত-পায়ে কাদা৷ থপ থপ করে পা ফেলে হাঁটছেন৷ মাঝে মাঝে একটু বসে জিরিয়ে নিচ্ছেন৷
দিনের আলো আরও একটু পরিষ্কার হল৷ কাঁচা রাস্তার দু-ধারে গাছ৷ ধান খেত৷ একটা গাছের তলায় কেউ বসে ছিল৷ তাঁকে দেখা মাত্র 'ওরে বাবা' বলে দৌড়োনোর উপক্রম করল সে৷
পণ্ডিতমশাই হাত তুলে চেঁচিয়ে বললেন, 'মানুষ! মানুষ! আমি ভূত নই! মানুষ!'
এক যুবক৷ পরনের প্যান্ট-শার্টের অবস্থা পণ্ডিতমশাইয়েরই মতো৷ সে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, 'মা কালীর দিব্যি?'
পণ্ডিতমশাই বললেন, 'মা কালীর দিব্যি!'
যুবক সন্দিগ্ধ দৃষ্টে তাকিয়ে বলল, 'আসা হচ্ছে কোথা থেকে?'
'বেহালা-বাজিয়ে বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের বাড়ি থেকে৷'
'ওরে বাবা! দিনের বেলা এতদূরেও লোক পাঠিয়েছে!' বলে যুবকটি আবার দৌড়োনোর জন্য পা বাড়াল৷
পণ্ডিতমশাই ঝটপট বললেন, 'বাবাজি! তোমায় চিনেছি৷ তুমিই তাহলে বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের সেই পলাতক জামাই? শোনো, শোনো, আমি সত্যিই মানুষ৷'
'তাহলে রামনাম করুন!'
'রাম রাম রাম রাম রাম...'
বাঁড়ুজ্যের জামাই ফিক করে হেসে বলল, 'থাক৷ থাক৷ বুঝেছি৷ তাহলে আপনিই সেই বাঁট্টুবাবু-ডাক্তার?'
'ধুস! আমি ভেঁটু ভটচাজ৷ লোকে বলে পণ্ডিতমশাই৷ বাঁট্টুডাক্তারের টাট্টু চুরি করেই তো বিপদে পড়েছিলুম!'
'বিপদ তার চেয়ে আমারই বেশি, পণ্ডিতমশাই!' বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের জামাই করুণ মুখে বলল, 'অবস্থা বুঝুন! গাঁসুদ্ধু মড়া৷ আমার শ্বশুরমশাই, শাশুড়িঠাকরুন পর্যন্ত৷ অথচ আমাকে নড়তে দেবেন না শ্বশুরমশাই৷ কারণ আমি যে ঘরজামাই৷ আমাকে ভিটে আগলাতে হবে৷'
এতক্ষণে প্রাণভরে হাসতে পারলেন পণ্ডিতমশাই৷ বললেন, 'তা বাবাজি, টাট্টুব্যাটাচ্ছেলে কোথায় গেল?'
'বলা কঠিন৷ অন্ধকারে আমাকে পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে উধাও!'
'চলো, বাবাজি! কথা বলতে বলতে এগোই৷'
'পণ্ডিতমশাই! আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আর গাঁয়ের লোক যে ভূত হয়ে রইল?'
পণ্ডিতমশাই বললেন, 'ভেবো না৷ গয়ায় তোমাকে নিয়ে গিয়ে পিণ্ডদান করলেই হল৷ সব পৃথিবী ছেড়ে প্রেতলোকে চলে যাবে৷ কিন্তু বাবাজি, বউমাকে তো দেখলুম না?'
'আমার মামাশ্বশুর গয়ার স্টেশনমাস্টার৷ এখন মনে হচ্ছে, ভাগনির পিণ্ডি দিয়েছেন৷ তাই আমিও আপনার বউমাকে দেখতে পাইনি৷'
এবার পাকা রাস্তার মোড় এসে গেল৷ রাস্তা চিনতে পেয়ে পণ্ডিতমশাই বললেন, 'চলো বাবাজি! আপাতত আমার বাড়ি গিয়ে দু-মুঠো খাবে৷ তারপর দুপুরের ট্রেনে দু-জনে গয়াযাত্রা করব৷'
গ্রামের দিঘিতে স্নান করে জল-কাদা ধুয়ে নিয়ে দু-জনে ঘাটে নামলেন৷ নেমেই পণ্ডিতমশাইয়ের দৃষ্টি গেল ওপারে জলের ধারে৷ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ওই দেখো! ওই সেই পাষণ্ড পামর চতুষ্পদ হতচ্ছাড়া! রামছাগল!'
বাঁট্টুডাক্তারের সেই টাট্টুই বটে৷ হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে গম আর ঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে৷ সবে রোদ্দুর উঠেছে৷ বুদ্ধিমান টাট্টু৷ দিব্যি চান করেও নিয়েছে৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন