সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

বিকেলে রোজকার মতো ঝিলের ধারে বেড়াতে বেরিয়েছিলুম৷ সঙ্গে আমার প্রিয় কুকুর জিম৷ পাশের খেলার মাঠে ছেলেরা ফুটবল খেলছিল৷ কিছুক্ষণ তাদের খেলা দেখে ঘাসের ওপর বসে জলের শোভাদর্শনে মন দিলুম৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত বলেন, মাঝে মাঝে জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে বুদ্ধি খোলে৷ পৃথিবীর অনেক ঘোরালো-প্যাঁচালো ব্যাপার একেবারে জল হয়ে যায়!
তবে সেজন্য নয়, আমার এটা নিছক অভ্যাস৷ শেষবেলায় জলের ওপর নরম গোলাপি রোদ্দুর, জল-মাকড়সার রেস, সবুজ দামে প্রজাপতির ওড়াউড়ি, মাছরাঙার জিমন্যাস্টিক- কত কী দেখার আছে!
জিম বড্ড ছটফটে প্রাণী৷ যতক্ষণ বসে থাকি, সে খুদে চার ঠ্যাঙে আনাচেকানাচে ছুটোছুটি করে বেড়ায়৷ দৈবাৎ ঝিলের দাম থেকে একটা প্রজাপতি ডাঙার দিকে উড়ে এলেই জিম তাকে তাড়া করবে৷ বেচারা প্রজাপতি৷ তার আর বাড়ি ফেরা হবে না! সমস্যা হল, জিম এ-সময় কিছুতেই আমার বারণ মানবে না৷
আজও তার ওই দুষ্টুমি দেখছি, হঠাৎ পাশের একটা ঝোপ থেকে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত বেরিয়ে এলেন৷ মুখে মিটিমিটি হাসি৷ বললেন, 'জল দেখছেন? দেখুন, দেখুন! মশাই, যে বলেছিল জলের আর এক নাম জীবন, তাকে নোবেল প্রাইজ দেওয়া উচিত৷'
চন্দ্রকান্ত আমার পাশে বসলেন৷ বললুম, 'ঝোপের ভেতর আশা করি কোনো সায়েন্টিফিক এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন৷'
চন্দ্রকান্ত ফিক করে হাসলেন৷ 'চেপে যান৷ নো কোয়েশ্চন!'
'আহা, আমাকে বলতে দোষ কী?' চাপা স্বরে বললুম৷ 'আমি তো কাউকে ফাঁস করতে যাচ্ছি না!'
অমনি বিজ্ঞানীপ্রবর গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ বললেন, 'চুপ! রামু শুনতে পাবে৷'
ঘুরে দেখলুম, রামু ধোপা যথারীতি ঝিলের ধারে শুকোতে দেওয়া কাপড় তুলতে এসেছে৷ তার গাধাটিও তৈরি৷ জিম কেন কে জানে, রামুর গাধাকে একেবারে বরদাস্ত করতে পারে না৷ তাকে ক্রমাগত ধমক দেয়৷ আজ জিম ধমক দিতে যেই কাছে গেছে, রামুর গাধা পেছনকার ঠ্যাং ছুড়ে পালটা বিকট হুংকার দিল৷ জিম ভয় পেয়ে পালিয়ে এল৷ আমার কোলে এসে বসে পড়ল৷
বিরক্ত বিজ্ঞানী বললেন, 'দিলে মেজাজটা তেতো করে৷ একে তো এই শহরটা দিনে দিনে বিচ্ছিরি তেতো হয়ে যাচ্ছে, ওই গাধাটা তাকে আরও তেতো করে দেয়৷ ছ্যা ছ্যা! নেচারের কোনো বুদ্ধিশুদ্ধি নেই৷ গাধাকে কখনো ভয়েস দিতে আছে?'
চন্দ্রকান্ত আপনমনে বকবক করতে থাকলেন৷ একটু পরে ফের বললুম, 'রামু চলে যাচ্ছে৷ এবার বলুন, কী এক্সপেরিমেন্ট করছিলেন?'
চন্দ্রকান্ত চোখ টিপে বললেন, 'চেপে যান৷ বাতাসেরও কান আছে৷'
'প্লিজ! আমার কানে কানে বলুন না! বাতাসের কানে বলতে বলছি না৷'
চন্দ্রকান্ত আবার ফিক করে হেসে বললেন, 'কালই জানতে পারবেন৷ হইচই পড়ে যাবে৷ কিন্তু সাবধান মশাই! স্পিকটি নট৷ এবার আমার এক্সপেরিমেন্ট সাংঘাতিক ধরনের৷'
বলে হঠাৎ উঠে চলে গেলেন৷
গেলেন ঝিলের ধারে ঘন ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে৷ এদিকটায় ভাঙা মন্দির আর ঘন জঙ্গল৷ দিনশেষের ধূসরতার ভেতর তাঁর বেঁটে মূর্তিটি আবছা হতে হতে গাছপালার ভেতর মিলিয়ে গেল৷ ব্যাপারটা সন্দেহজনক৷
সকালে আমার বিচ্ছু ভাগনে ডনকে সংস্কৃত পড়াতে আসেন ভবভূতি ভটচাজ৷ আমরা বলি পণ্ডিতমশাই৷ ডনের বাবার মতে, 'বাংলা ভালো করে শিখতে হলে সংস্কৃত শেখা দরকার৷ স্কুলে আজকাল সংস্কৃত ঐচ্ছিক বিষয় করে মাতৃভাষার বারোটা বাজানো হচ্ছে৷' বেচারা ডনের অবস্থা করুণ৷ কারণ পণ্ডিতমশাই তার চেয়েও বিচ্ছু৷ বেগড়বাই দেখলেই 'পুরাতন দণ্ড' বরাদ্দ৷ ডনের বাবার ঢালাও হুকুম৷
আর পণ্ডিতমশাইয়ের 'পুরাতন দণ্ড' মানে কানের পাশের 'কেশাকর্ষণ', আঙুলের ভেতর ডট পেন গুঁজে 'করনিষ্পেষণ'-বড়ো সাংঘাতিক! পণ্ডিতমশাই কঠিন কঠিন শব্দ আওড়ান৷ সাধু ভাষায় কথা বলেন৷ তাঁর শাস্তিও ওই সাধু ভাষার মতো উচ্চস্তরের৷ ডনের জন্য দুঃখ হয়৷
এদিন সকালে পণ্ডিতমশাই হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে হাঁফাতে হাঁফাতে প্রায় আর্তনাদ করে উঠলেন, 'হত্যাকাণ্ড! বীভৎস হত্যাকাণ্ড!' তারপর দমাস করে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেলেন৷
বাড়িতে সাড়া পড়ে গেল৷ জল, টেবিল ফ্যান, ছোটাছুটি৷ ডনের বাবা, অর্থাৎ আমার জামাইবাবু গর্জন করলেন, 'ডাক্তার! ডাক্তার!'
পণ্ডিতমশাইয়ের অবশ্য তক্ষুনি জ্ঞান ফিরল৷ উঠে বসে বললেন, 'অহো! অহো! কী নিদারুণ দৃশ্য এই প্রভাতে অবলোকন করিলাম!'
বললুম, 'কী হয়েছে পণ্ডিতমশাই?'
পণ্ডিতমশাই বললেন, 'হত্যাকাণ্ড! শোচনীয় হত্যাকাণ্ড!'
সবাই চেঁচিয়ে উঠল, 'কোথায়? কোথায়?'
'লৌহবর্ত্মের দুই পার্শ্বে৷' পণ্ডিতমশাই শ্বাস ছেড়ে বললেন, 'একপার্শ্বে কবন্ধ দেহ, অন্য পার্শ্বে মস্তক৷ অহো! অহো!'
'লৌহবর্ত্ম' যে রেললাইন, সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেছি৷ পণ্ডিতমশাই থাকেন রেললাইনের ওধারে৷ বললুম, 'ট্রেনে মানুষ কাটা পড়েছে?'
পণ্ডিতমশাই খাপ্পা হয়ে বললেন, 'তুমি হস্তীমূর্খ৷ স্বচক্ষে দর্শন না করিলে বুঝিবে না৷ সহস্র জনসমাগম! তিন আরক্ষাধক্ষ্যের কূট দ্বন্দ্ব! অহো! মনুষ্যগণ গর্দভে পরিণত!'
ব্যাপারটা দেখতে বেরিয়ে পড়লুম৷ 'আরক্ষাধ্যক্ষ' মানে দারোগাবাবু তাতে ভুল নেই৷
গিয়ে দেখি, সহস্র না হলেও লোকের ভিড় জমেছে বটে! রেললাইনের ওধারে একটা ভিড়, এধারে একটা ভিড়৷ আর রেললাইনে দাঁড়িয়ে আছেন তিন জন দারোগাবাবু, একদঙ্গল কনস্টেবল৷
প্রথমে এধারের ভিড়ের ভেতর উঁকি মেরেই আঁতকে উঠলুম৷ একটা রক্তাক্ত 'কবন্ধ', অর্থাৎ, মুণ্ডুকাটা ধড়৷
রেললাইনের ওধারে গিয়ে ভিড়ে উঁকি মেরে আরও আঁতকে উঠলুম৷ একটা কাটা মুণ্ডু৷ চোখ দুটো খোলা৷ বীভৎস দৃশ্য!
রেললাইনে উঠে এলুম৷ পুলিশের মধ্যে সত্যিই 'কূট দ্বন্দ্ব' চলেছে৷ এধারে আমাদের থানার দারোগাবাবু বঙ্কুবিহারী ধাড়া৷ ওধারে আলাদা থানা৷ সেখানকার দারোগাবাবু নীলমাধব রক্ষিত৷ দু-জনেই দুঁদে পুলিশ-অফিসার৷ তৃতীয় দারোগাবাবু রেলের গয়ারাম পাণ্ডে৷ তিনিও কম দাপুটে নন৷ তিন জনে আইন নিয়ে চুলচেরা বিচার আর তর্কাতর্কি চলেছে৷
বঙ্কুবাবু বলছেন, 'ধুর মশাই! রেলে কাটা বডি৷ রেল-পুলিশ বডি তুলুক৷'
নিলুবাবুও তাঁকে সায় দিয়ে বলছেন, 'আলবত তাই! পাণ্ডেজি বডি নিয়ে যান৷'
গয়ারাম পাণ্ডের গোঁফ তিরতির করে কাঁপছে৷ বলছেন, 'কভি নেহি! কাঁহা রেলবে লাইন, কাঁহাপর বডি৷ দেখিয়ে! উঁহা বডি, উঁহা হেড৷'
তারপর আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন৷ 'দেখুন তো মোশা! রেললাইনে কুছু ব্লাড দেখা যায়? কেমন চমক দিচ্ছে লাইন-একদম সিলভারকা মাফিক চমক! হামি বলছে, ইয়ে মার্ডার আছে৷ অ্যাকসিডেন্ট না আছে৷' বলে তিনি অপর দুই দারোগাকে চার্জ করলেন, 'লাইনপর ব্লাড দেখাইয়ে!'
বঙ্কুবাবু এবং নিলুবাবু মুখ-তাকাতাকি করলেন৷ লক্ষ করে দেখলুম, সত্যি এখানে রেললাইনে কোনো রক্তের চিহ্ন নেই৷
হঠাৎ একজন পুলিশ বলে উঠল, 'পাওয়া গেছে! পাওয়া গেছে! এই তো রক্তের দাগ!'
সবাই হন্তদন্ত হয়ে সেখানে গেলেন৷ লাইনের পাশে খানিকটা রক্ত৷ বঙ্কুবাবু ও নিলুবাবু এক গলায় বললেন, 'পাণ্ডেজি, বডি আপনার!'
রেল-দারোগা বাঁকা হেসে বললেন, 'বাজে কোথা বলবেন না, বাজে কোথা বলবেন না! মার্ডার কোরে লাইনকা উপ্পর দিয়ে হেড লিয়ে গেছে, তো ব্লাড গিয়েছে! এহি উও ব্লাড আছে৷ ঝামেলা মাত করিয়ে৷' তারপর ফের আমাকে মধ্যস্থ করলেন৷ 'আপনি বলুন তো মোশা! ইয়ে অ্যাকসিডেন্ট আছে?'
আমি কিছু বলার আগেই বঙ্কুবাবু বললেন, 'কাম টু দা পয়েন্ট অব ল পাণ্ডেজি! রেলের মাটিতে বডি আর হেড৷ কাজেই মার্ডার হলেও এর রেসপন্সিবিলিটি রেল-পুলিশের কি না?'
নিলুবাবু বেটন তুলে আমাকে বললেন, 'আপনিই বলুন! কমনসেন্স থেকে বলুন!'
পুলিশকে আমার বড্ড ভয়৷ আমতা-আমতা করে বললুম, 'আজ্ঞে, তা...'
পাণ্ডেজি আমাকে থামিয়ে দিয়ে গর্জালেন, 'কভি নেহি৷ রেলবে মে কুছু হোলে উই আর রেসপন্সিবল ফর দ্যাট৷ ইয়ে আউটসাইট মার্ডার আছে৷ আপনারা বডি লিয়ে যান৷'
বলে উনি খইনির ডিবে বের করলেন৷ বগলে বেটন৷
বঙ্কুবাবু এবার নিলুবাবুর দিকে তাকালেন৷ 'মি. রক্ষিত! আপনি কী বলেন?'
নিলুবাবু বললেন, 'আমি আইন বুঝি৷ পাণ্ডেজির আইনের ব্যাখ্যা আমি মানি না৷'
পাণ্ডেজি খইনি ডলতে ডলতে বললেন, 'হামি ভি আইন জানে! আপকা ইলাকামে হেড৷ আপ উঠাকে লে যাইয়ে৷ ধাড়ামোশাকা ইলাকামে বডি৷ উনহি বডি উঠাকে লে যাইয়ে৷ ব্যাস!'
বলে উনি খইনিতে থাপ্পড় মারলেন৷ নিলুবাবু ফুঁসে উঠলেন৷ 'মুণ্ডু নিয়ে গিয়ে কড়মড়িয়ে খাব? আমি রাক্ষস না খোক্কস মশাই?'
বঙ্কুবাবুও আরও খাপ্পা হয়ে বললেন, 'আর আমি বডি নিয়ে গিয়ে ঝোল রেঁধে খাব? বলেছেন ভালো!'
পাণ্ডেজি খইনি জিভের তলায় গুঁজে বললেন, 'তব হম লে যাকে খায়েগা, ক্যা? আ জি, হামি ভেজেটারিয়ান আছে৷ হাঃ হাঃ হাঃ!'
ওঁর হাসিতে বঙ্কুবাবু-নিলুবাবু আরও চটে গিয়ে একগলায় বললেন, 'ডোন্ট জোক!'
ততক্ষণে দু-পাশ থেকে একজন-দু-জন করে লোক এসে এখানে ভিড় করেছে৷ মাতব্বরগোছের একজন বললেন, 'কী খামোকা তর্কাতর্কি করছেন স্যার? শিগগির বডি মর্গে পাঠান৷ পচে গন্ধ ছুটবে যে!'
আর একজন বললেন, 'বডি শনাক্ত করা দরকার৷ চেনা যাচ্ছে না৷ ধড়-মুণ্ডু এখনই এক করা উচিত৷'
বঙ্কুবাবু বাঁকা হেসে বললেন, 'মি. রক্ষিতকে বলুন! মুণ্ডু হালকা জিনিস! বডি ভারী জিনিস!'
নিলুবাবু বললেন, 'আইনের পথে আসুন! মুণ্ডু পড়ে আছে রেলের জায়গায়৷ পাণ্ডেজি মুণ্ডু নিয়ে এসে বডিতে লাগান!'
পাণ্ডেজি বললেন, 'সিয়ারাম! সিয়ারাম! রেলের জায়গা তো কী হইয়েছে? আগাড়ি কাম হল, আইডিন্টিফিকেশন! মোশাইরা দেখুন, কোন ইলাকার আদমি আছে৷ হেড দেখনেসে মালুম হোগা!'
ওধারের মাতব্বর নাদুবাবু বললেন, 'আমাদের এরিয়ার কেউ হলে চিনতে পারতুম৷ ওধারের এরিয়ার কেউ হবে!'
আমাদের এরিয়ার মাতব্বর হাঁদুবাবু হাত নেড়ে বললেন, 'আমাদের নয়! আমাদের নয়! হেড বডি দুই-ই দেখলুম৷ ওধারেরই৷'
নাদুবাবু চটে গেলেন৷ 'নৌ! নেভার! আপনাদের এরিয়ার লোক৷'
হাঁদুবাবু তেড়ে গেলেন৷ 'বাজে কথা বললেন না, বাজে কথা বলবেন না৷ আমাদের এরিয়ার লোক আমি চিনি না?'
আমি মধ্যস্থতা করে বললুম, 'বাইরের লোক হতে পারে৷ কিন্তু এখনই বডি মর্গে পাঠিয়ে তদন্ত করা দরকার৷ আপনারা দারোগাবাবুদের বলুন৷'
নাদুবাবু-হাঁদুবাবু দারোগাবাবুদের বললেন, 'আর দেরি নয় স্যারেরা!'
স্যারগণও একগলায় বললেন, 'আইন ইজ আইন!'
নাদুবাবু বললেন, 'আইন মানে? বডি পড়ে থাকবে? পচে ভুট হবে? আর আপনারা আইনের তক্ক করবেন?'
এবার হাঁদুবাবুও তাঁকে সায় দিয়ে বললেন, 'পচা বডি থেকে রোগ ছড়াবে৷ মহামারি হবে৷ মাইন্ড দ্যাট!'
বঙ্কুবাবু বললেন, 'আহা! বুঝলেন না মশাই? খুন যদি ওপারে হয়ে থাকে, তার তদন্তের ভার মি. রক্ষিতের৷'
নিলুবাবু বললেন, 'আগে তা প্রমাণ করুন৷ কমনসেন্স বলছে, বডি যেখানে পড়ে আছে, সেখানেই খুন হয়েছে৷ মুণ্ডুটা নিয়ে গিয়ে ওপারে ফেলেছে! অতএব তদন্তের দায়িত্ব আপনার৷ মুণ্ডু হালকা জিনিস৷ বয়ে নিয়ে যাওয়া সোজা৷'
বঙ্কুবাবু বিরক্ত হয়ে বললেন, 'হ্যাত্তেরি! খুন তো রেলের জায়গায় হয়েছে৷ অতএব...'
পাণ্ডেজির গোঁফ কাঁপতে লাগল৷ বললেন, 'রেলের এরিয়ায় খুন হইয়েছে, তার পরমান? এভিডেন্স? বাহারমে খুন হো শকতা!'
বঙ্কুবাবু-নিলুবাবু এবার একগলায় বললেন, 'ধড়-মুণ্ডু রেলের জায়গায়৷ কাজেই রেল-পুলিশই প্রমাণ করুক, বাইরে খুন হয়েছে!'
এইবার তিন দারোগাবাবুর মধ্যে হাঁকডাক বেড়ে গেল৷ তিন পক্ষের তিনটি পুলিশ বাহিনী পজিশন নিল, যেন এখনই যুদ্ধ বেধে যাবে৷ তিন দারোগাবাবু বাংলা ও হিন্দি ছেড়ে এবার যাচ্ছেতাই ইংরেজি বলতে শুরু করলেন৷ আইনের ধারার, নম্বর উল্লেখ করতে করতে...
'ইউ শাট আপ!'
'ইউ-উ শাট আপ!'
'ইউ-উ-উ শা-আ-ট আপ!'
এইসব বলতে বলতে তিন জনেই রিভলবার বের করলেন৷ কনস্টেবলরা বন্দুক তাক করল৷ লোকেরা আতঙ্কে পড়ি-কি-মরি করে পালাতে শুরু করল৷ আমি এক লাফে রেললাইনের ধারে একটা ভাঙাচোরা ওয়াগনের আড়ালে গা-ঢাকা দিলুম৷
সেইসময় জোরে হুইসল দিতে দিতে একটা ট্রেন এসে পড়ল৷ আতঙ্কে চোখ বন্ধ করলুম৷ ট্রেনটা অসম্ভব সময় নিয়ে চলে গেল৷ তারপর চোখ খুললুম৷
আশা করেছিলুম একগাদা বডি রেললাইনে পড়ে থাকবে৷ কিন্তু নাঃ, তেমন কিছু দেখা গেল না৷ 'চাচা আপন প্রাণ বাঁচা' করে তিনটি বাহিনী রেললাইনের দু-ধারে নিরাপদে অবস্থান করছে৷ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে রেল-পুলিশ এপারের পুলিশ ওপারের পুলিশ৷ বঙ্কুবাবু-নিলুবাবু-পাণ্ডেজিও একত্র৷
নাদুবাবু-হাঁদুবাবুকে আবিষ্কার করলুম, ওয়াগনটার ভেতরে বসে ঠক ঠক করে কাঁপছেন৷ দু-জনেই আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'ক-টা বডি পড়ল?'
বললুম, 'পড়েনি৷ বেরিয়ে আসুন৷ ভেতরে সাপ-টাপ থাকতে পারে৷'
ওয়াগনের তলা ফুঁড়ে জঙ্গল গজিয়েছে৷ দু-জনেই ঝটপট বেরিয়ে এলেন৷
দেখা গেল, আবার তিন দারোগার আইনের ঝগড়া গোড়া থেকে শুরু হয়েছে৷ ট্রেনটা এই গণ্ডগোল বাধিয়ে দিয়ে গেল হয়তো৷ চরম অবস্থাটা ধপাস করে নীচে পড়েছিল৷ আবার নীচে থেকে ওপরে উঠছে৷
আবার নাদুবাবু-হাঁদুবাবু এগিয়ে গেলেন ওঁদের দিকে৷ পালিয়ে-যাওয়া লোকেরাও এক-পা দু-পা করে ফিরে আসতে থাকল৷
আমি কিন্তু এবার সতর্ক৷ দৈবাৎ বন্দুকের লড়াই বেধে গেলে, 'ক্রস-ফায়ার'-এর মাঝখানে পড়ে আমিও বডি হয়ে যাব৷ বাপস!
উঁকি মেরে আইনের সূত্রপাত দেখছি, হঠাৎ পেছনে কার আঙুলের গুঁতো খেয়ে চমকে ঘুরে দাঁড়ালুম৷
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত!
খিখি করে হেসে চাপা স্বরে বললেন, 'কী বুঝছেন?'
বললাম, 'সাংঘাতিক ব্যাপার!'
'সাংঘাতিক তো হবেই৷' চন্দ্রকান্ত চোখ নাচিয়ে বললেন, 'কাল বিকেলে আপনাকে বললুম না?'
অমনি মনে পড়ে গেল৷ শিউরে উঠলুম৷ 'কী সর্বনাশ! এই আপনার এক্সপেরিমেন্ট? নরহত্যা? ছি ছি! এ আপনি কী করলেন? আপনি খুনি?'
বিজ্ঞানীপ্রবর আরও হেসে বললেন, 'ধুর মশাই! কিচ্ছু বোঝেন না৷ আসুন, সব প্রবলেম সলভ করে দিচ্ছি৷ সব জল হয়ে যাবে৷ বলেছিলুম না জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে বহু জটিল ব্যাপার জল হয়ে যায়?'
বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তকে আমাদের এই মফসসল শহরের সবাই খাতির করেন৷ ওঁর অসাধারণ কীর্তিকলাপ কাগজে বেরোয়৷ তাঁকে দেখেই তিন দারোগাবাবু নড়ে উঠলেন৷ 'আসুন, আসুন!' বলে সসম্মানে অভ্যর্থনা করলেন৷ পাণ্ডেজি নমস্কার করে বললেন, 'চন্দরজি যোখোন আছেন, তোখোন সবকুছ ফয়সালা হোবে৷ আইয়ে, আইয়ে! আপনাকে হামরা জাজ বনাইয়ে দিই৷ আপনি সুবিচার কোরেন!'
চন্দ্রকান্ত কিছু বললেন না৷ শুধু মুচকি হেসে হনহন করে রেললাইনের ওপরে ঘাসজমিতে নেমে গেলেন৷ অবাক হয়ে দেখলুম, কাটামুণ্ডুটি উনি কুড়িয়ে নিয়ে আসছেন৷
সবাই হাঁ করে দেখছে৷ বিজ্ঞানীপ্রবর এবার রেললাইনের এধারে গিয়ে মুণ্ডু-কাটা বডিটার কাছে ঝুঁকে পড়লেন৷ তারপর এক অবাক কাণ্ড! এ কি স্বপ্ন না সত্যি?
পড়ে থাকা বডিটা সটান উঠে দাঁড়াল৷ দাঁত বের করে চারদিকে করজোড়ে নমস্কার করল৷ কী আশ্চর্য! এ যে দেখছি রামু ধোপা!
দারোগাবাবুত্রয়, নাদুবাবু-হাঁদুবাবু, পুলিশবাহিনী এবং বাকি সবাই হইহই করে দৌড়ে গেল৷ আমিও গেলুম৷ গিয়ে দেখি, মুণ্ডুটা চন্দ্রকান্তের হাতে৷ অথচ...
চন্দ্রকান্ত মুচকি হেসে বললেন, 'ম্যাজিক! সায়েন্স নয়, স্রেফ ম্যাজিক! রামুকে অনেক বলেকয়ে ডেডবডি সাজতে রাজি করিয়েছিলুম৷ ওর মাথার দিকটা ঢেকে নকল গলা বানিয়েছিলুম স্রেফ প্ল্যাস্টিকের৷ রামুর মাথাটা বডির চেয়ে ছোট্ট তো! দারুণ ফিট করেছিল প্ল্যাস্টিকের গলা! আর এই মুণ্ডুটাও প্ল্যাস্টিকের! খি-খি-খি৷'
বঙ্কুবাবু-নিলুবাবু ফোঁস করে একসঙ্গে শ্বাস ছেড়ে বললেন, 'বাঁচা গেল!'
পাণ্ডেজি হাসতে হাসতে নেতিয়ে পড়লেন৷ 'চন্দরজি... হাঃ হাঃ হাঃ চন্দরজি...'
আমি বললুম, 'কিন্তু যদি ব্যাপারটা সত্যি হত?'
বিজ্ঞানীপ্রবর বললেন, 'শিক্ষা! একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিলুম৷ আইনকেও ঠেকে শিখতে হয়৷ বুঝলেন তো? ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটলে কক্ষনো আইন তুলবেন না৷ মানুষের জন্য আইন, না আইনের জন্য মানুষ? মানুষ বড়ো, না আইন বড়ো?'
সবাই চেঁচিয়ে উঠল, 'মানুষ বড়ো! মানুষ বড়ো!'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন