জিমি

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov38

ভোঁদড়কে কোথাও উদবেড়াল, আবার কোথাও জলবেড়াল বলা হয়৷ এর একটা বড়ো কারণ, ভোঁদড় বেড়ালের মতনই মাছ খেতে খুব ভালোবাসে৷ কিন্তু ভোঁদড় যে পোষ মানে আমি জানতুম না৷ বনের যেখানে আমার আড্ডা অর্থাৎ কাঠের একটা বাংলোবাড়ি, তার পিছনে পাহাড়ি নদী আছে৷ ওখানটায় নদী বেঁকেছে৷ আর বাঁকের মুখে অতল জলের দহ৷ কোনো স্রোত নেই৷ ঝকঝকে কালো জল৷ তলা অব্দি পরিষ্কার দেখা যায়৷ ওই জলে ছিপ ফেলে মাছ ধরা আমার নেশা ছিল৷ শরৎকালের এক সকালে ছিপ হাতে গিয়ে দেখি, বিশাল বট গাছের শেকড়ে একটা বড়ো মাছের মুড়ো আটকে রয়েছে৷ আশেপাশে কয়েক টুকরো কাঁটাও দেখতে পেলুম৷ শেকড়টা যেখানে জলে নেমেছে, সেখানে চোখ পড়তেই মনে হল কী একটা লুকোবার চেষ্টা করছে৷ আমার চোখে পুবের সূর্য নদীর তলায় প্রতিফলিত হয়ে জলে ঠিকরে পড়ছিল৷ তাই তক্ষুনি বুঝতে পারলুম না ওটা কী৷

মাছটা যে ভোঁদড়েই মেরেছে, তা বোঝা গেল৷ হয়তো এখনও খাচ্ছিল, আমি এসে পড়ায় লুকিয়ে গেছে ঝোপে৷ তাই একটু তফাতে ছিপ ফেলে বসলুম৷ কিন্তু একটা চোখ রাখলুম সেদিকে৷ শেকড়ের তলায় যেটা নড়ছিল, সেটা কী, এতক্ষণে বুঝলুম৷ সেটা একটা পাইথন-যাকে বলে অজগর সাপ৷ আমি জানতুম, সাপটা বটের তলায় কোনো একটা গর্তেই থাকে৷ মাঝে মাঝে জলে ওর মাথা দেখতে পেতুম৷ কিন্তু আমার সাড়া পেলেই লুকিয়ে পড়ত৷

এখন দেখি সাপটা সাবধানে এবার শেকড় বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছে৷ কী ব্যাপার? ভোঁদড়বাবাজির এঁটো খাবে নাকি? মাছের মুড়োটা আন্দাজ কিলো দুইয়ের কম নয়৷ সাপটার সকালের খাওয়াটা ভালোই হবে মনে হল৷ কিন্তু অতবড়ো মাছ যে মেরেছে, সেই চতুর ও শক্তিমান শিকারিকে দেখতেই আমার লোভ হচ্ছিল বেশি৷

সাপটা যেভাবে এগোচ্ছিল, আমার হাসি পাচ্ছিল৷ অত সাবধান হওয়ার কারণ কী? ওই তো পেট ভরাবার মতন চমৎকার সুস্বাদু খাবার৷ মুখ বাড়ালেই পেয়ে যাবে৷

পরক্ষণেই আমাকে চমকে দিয়ে গাছের ওপর থেকে কী একটা ঝাঁপ দিল৷ তারপর সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড শুরু হল৷ ফোঁস ফোঁস-খক ররর... খাঁক খকরর...! ঠাহর করে দেখি, হ্যাঁ-সেই শিকারি ভোঁদড়টাই বটে৷ ভোজে ভাগ বসানো সে একেবারে বরদাস্ত করতে রাজি নয়৷

রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তখন৷ দু-জনে লড়তে লড়তে কখনো ঝোপের দিকে এগোচ্ছে৷ আবার পিছিয়ে জলের দিকেও চলে আসছে৷ আমার ভয় হল, ভোঁদড়টা যদি বোকা হয়, তাহলে অজগরটার ফন্দি টের পাবে না-জলে নেমে আসবে৷ কিন্তু এখন আমার করার কিছু নেই৷ হঠাৎ গাছ থেকে আবার কী একটা ঝুপ করে পড়ল৷ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম না৷ অতটুকু খুদে একটা বাচ্চা ভোঁদড় বুঝি এতক্ষণ চুপচাপ বসে সব লক্ষ করছিল৷ এতক্ষণে মায়ের বিপদ আঁচ করে মায়ের পাশে দাঁড়াতে এল৷ বড়ো ভোঁদড়টা যে মাদি, তা বোঝা যাচ্ছিল৷ আমার খুব ভালো লেগে গেল ওই বাচ্চাটার এই মাতৃভক্তি এবং মরিয়াপনা৷ বার বার দু-পাশে লাফিয়ে লাফিয়ে সে সাপটার গায়ে কামড় বসাবার চেষ্টা করছিল৷ কিন্তু সাপটা প্রকাণ্ড লেজ তুলে তাকে পালটা আক্রমণ করতেই সে ভড়কে গেল৷

ইতিমধ্যে সাপটা বড়ো ভোঁদড়টাকে প্রায় জলের মধ্যে এনে ফেলেছে৷ হঠাৎ যেই বড়ো ভোঁদড়টা বোকার মতন সাপের মাথা লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল, অমনি গিয়ে জলে পড়ল৷ সাপটা যেন এই সুযোগই খুঁজছিল৷ তার লম্বা বিকট মাথাটা বোঁও করে ঘুরে জলে ডুবতে দেখলুম৷ তারপর জলের গভীরে সে কী আলোড়ন! বাচ্চাটা তখন জলের ধারে প্রায় দু-পায়ে দাঁড়িয়ে কাঁপছে৷ বেচারার অসহায় অবস্থা দেখে খুব মায়া হল৷

সেই সময় সাপটা এতক্ষণে জল থেকে মাথা তুলল৷ এবার আমার মাথার চুল শিরশির করে উঠল৷ বড়ো ভোঁদড়টার মুণ্ডু কামড়ে ধরেছে সাপটা৷ ওই অবস্থায় সে আবার ডুবল৷ কিছু দূরে যখন মাথা তুলল, দেখি তখনও মাথা কামড়ে ধরে ভোঁদড়টাকে নিয়ে যাচ্ছে৷ মনে হল ওপারের পাথরের খাড়ির মধ্যে কোনো গর্তে ঢুকে জন্তুটাকে গিলে খাবে৷ রাগে-দুঃখে আমি কাঁপতে থাকলুম৷ কিন্তু বুদ্ধির ভুলে সঙ্গে বন্দুক আনিনি৷ কী আর করব? পাথর ছুড়ে হয়তো লড়াই থামাতে পারতুম৷ কিন্তু সারাক্ষণ ব্যাপারটা হাঁ করে শুধু দেখে গেছি৷ ভাবতেই পারিনি যে একটা সাংঘাতিক কাণ্ড এ-থেকে ঘটতে পারে৷

বেচারা মাতৃহারা খুদে ভোঁদড়টাকে আর দেখতে পেলুম না৷ মাছধরা রেখে ওকে সে-বেলা খুব খোঁজাখুঁজি করলুম৷ কিন্তু তার পাত্তাই নেই৷

তারপর কয়েকটা দিন ওখানে মাছ ধরতে গেছি৷ দূর থেকে সাপটাকে অনেক বার মাথা তুলতে দেখেছি, কিন্তু খুদে বেচারার পাত্তা নেই৷ একদিন মাথায় বুদ্ধি খেলল৷ একটা ফাঁদ পেতে ওকে ধরা যায় কি না ভাবলুম৷ আমার মনে হচ্ছিল, কবে না ও বেচারাও রাক্ষুসে অজগরটার পাল্লায় পড়ে যায়৷ তা ছাড়া অত ছোটো প্রাণী, এখনও কি নিজের গায়ের জোরে শিকার ধরতে শিখেছে? ও হয়তো না খেয়েই মারা যাবে?

একটা ফাঁদের খাঁচা তৈরি করে জলে কিছুটা ডুবিয়ে রাখলুম৷ খাঁচার ভেতরে রাখলুম একটা মাছ৷ তারপর দূরে বসে পাহারায় থাকলুম৷

সেদিনই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাচ্চাটা বার তিনেক এল৷ জলের ধারে ধারে ঘুরঘুর করল৷ মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে চমকে দৌড় দিল ঝোপের দিকে৷ চার বারের বার সোজা খাঁচার দিকে চলে গেল সে এবং মাছটা ধরতে গিয়েই আটকে গেল ফাঁদে৷

এভাবেই 'জিমি' আমার বাড়ির অতিথি হয়ে এল এবং তারপর রীতিমতো ভদ্র সভ্য চমৎকার একটি প্রাণী হয়ে উঠল৷ স্বাস্থ্যও হয়ে উঠল অপূর্ব৷

এক মাস পরে দেখলুম ছেড়ে দিলেও জিমি পালাবার নাম করে না৷ আমার কুকুর জ্যাকির সঙ্গে ওর দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে৷ মাঝে মাঝে যখন জ্যাকিকে নিয়ে শিকারে যাই, জিমির সে কী ছটফটানি! কিন্তু তাকে সঙ্গে নিতে ভয় পাই-ওকে তো জ্যাকির মতন ডাঙার জন্তু শিকারের শিক্ষা দেওয়া হয়নি! বড়ো জোর ছিপে মাছ ধরার সময় ওকে সঙ্গে নেওয়া যায়৷ তবে নদীর দহে ওকে নিয়ে যাচ্ছি না৷ শয়তান অজগরটা রয়েছে! ওটাকে অবশ্য মেরে ফেলা যায়৷ কিন্তু কষ্ট হয়৷ আহা, বুড়ো হয়ে কতকাল বেঁচে আছে সে৷ ওর ভয়েই তো এদিকে জেলেরা কেউ মাছ ধরতে আসে না৷ নয়তো কবে দহের মাছ শেষ হয়ে যেত৷ ফলে জিমিকে বাঁচানো যেত না৷ মাছের অভাবে৷

তখন বেশ শীত এসে গেছে জাঁকিয়ে৷ ঘন কুয়াশায় বন সকাল-সন্ধ্যা ধূসর হয়ে থাকে৷ সন্ধ্যায় আগুন জ্বেলে জ্যাকি আর জিমিকে নিয়ে বসে থাকি৷ সকাল সকাল শুয়ে পড়ি৷ সারারাত নিজঝুম বনে শীতেকাতর জন্তুজানোয়ার ডেকে ওঠে৷ জ্যাকি ও জিমি কম্বলের তলায় শুয়ে নাক ডাকায়৷

হঠাৎ একরাত্রে ঘুম ভেঙে গেল৷ কেন ভাঙল বুঝতে পারলুম না৷ কিন্তু পরক্ষণেই জ্যাকি খুব গরগর করতে থাকল৷ টর্চ জ্বেলে দেখি জ্যাকি কোনার দিকে মেঝেয় ঝুঁকে গর্জাচ্ছে৷ উঠে গেলুম৷ তারপর আমি তো বোকা বনে তাকিয়ে রইলুম৷ ওরে দুষ্টু! এত ধুরন্ধর হয়েছ তলায় তলায়! সিঁদ কাটতেও শিখে গেছ!

আমার এই ঘরটা মাটি থেকে সাত ফুট উঁচুতে-মেঝেয় কাঠের পাটাতন৷ ওই কোনার একজায়গায় কীভাবে ফাটল ধরেছিল এবং পেরেকগুলোও ছিল মরচে-পড়া৷ তাই সাবধানতার জন্যে একটা ড্রাম রেখেছিলুম ওখানে৷ জিমি করেছে কী, ড্রামটার তলায় কবে কবে পেরেক ছাড়িয়ে কাঠ সরিয়েছে৷ একটা কাঠের তক্তা ঝুলে গেছে নীচে৷ আর সে সেই ফাঁক গলিয়ে কোথায় পালিয়েছে৷

রাগে-দুঃখে অস্থির হলুম৷ কিন্তু এই শীতের রাতে আর কী করা যাবে? জ্যাকিকে খুব ধমক লাগালুম৷ কেন সে আগে আমাকে জানায়নি? জ্যাকি খুব দুঃখিত মুখে তাকিয়ে থাকল৷ মনে হল, সেও ব্যাপারটা তলিয়ে দেখেনি৷

কিন্তু গেল কোথায় জিমি এত রাতে? পালাবার হলে তো দিনে যেকোনো সময় পালাতে পারত৷

শুয়ে এইসব ভাবছি, হঠাৎ ড্রামটা নড়ে উঠল৷ টর্চ জ্বেলে দেখি-হ্যাঁ-শ্রীমান ফিরছে৷ কিন্তু ও কী, জিমি কী একটা টেনে তোলার চেষ্টা করছে তলা থেকে৷ টর্চের আলোয় ওর নীল চোখে পালটা ধমক দেখলুম-যেন বলছে, আঃ, আলোটা বন্ধ করো তো!

এবার দেখলুম, জিমির যে স্বভাব এতদিন চাপা ছিল, তার বশেই সে নিশুতি রাতে বেরিয়ে পড়েছিল৷ একটা কিলো দশেক ওজনের মহাশের মাছ মেরে খুদে শিকারিমশায় গর্বিত মুখে ফিরছেন৷

জ্যাকিও লেজ নেড়ে খুব আনন্দ প্রকাশ করল৷ আমি জিমির পিঠে হাত বুলোতে গিয়ে দেখলুম জল ঝরছে৷ বললুম, 'ওরে, নিমুনি হবে যে! আয় মুছে দি৷ তারপর ফায়ারপ্লেসে গিয়ে আগুন জ্বালি-সেঁকে নিবি৷'

জিমি ড্যামকেয়ার-গোছের মাথা দোলাল৷ যেন বলল, আরে যাও যাও! রাতবিরেতে জলই তো আমাদের বড়ো আড্ডা৷ ওসব ভেবো না৷ বরং, গা মুছতে রাজি আছি৷ তার বেশি নয়৷

তারপর থেকে ওকে নিশিরাতের অভিযানে যেতে আর বাধা দিতুম না৷ জানতুম বাধা দিলে ও মানবে না৷ শুধু ভয় হত সেই অজগর সাপটার কথা ভেবে৷ তার পাল্লায় পড়লে জিমি নিজেকে বাঁচাতে পারবে তো? অবশ্য এখন শীত৷ সাপটা নিশ্চয় গর্তে ঘুমোতে গেছে৷

সারা শীতকালটা জিমি খুব মাছ শিকার করে খাওয়াল৷ বসন্তের এক রাতে সে বারোটায় বেরিয়ে ফিরল একেবারে রাত তিনটেয়৷ উদবিগ্ন হয়ে দেখলুম, তার নখে, ঠোঁটে, গায়ে চাপ চাপ রক্ত৷ শিউরে উঠে বললুম, 'এ কী রে জিমি! কী হয়েছে?'

জ্যাকি খুব গর্জন শুরু করল৷ জিমিকে কোলে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখি, রক্ত জিমির নয়৷ অন্য কারও৷

চমকে উঠলুম৷ এতদিন বসন্তে অজগরটার ঘুম ভেঙেছে নিশ্চয়৷ তাহলে কি জিমি তাকেই আক্রমণ করে বসেছিল? বললুম, 'জিমি, জিমি! কার সঙ্গে লড়াই করে এলি তুই? এ কার রক্ত?'

জিমির নীল চোখে আশ্চর্য হাসি ফুটে উঠল৷

সেই রাতেই বন্দুক হাতে বেরিয়ে পড়লুম টর্চ নিয়ে৷ সঙ্গে চলল জ্যাকি আর জিমি৷ নদীর দহের কাছে গেলুম৷ টর্চের আলো ফেলতেই চমকে উঠলুম৷ হ্যাঁ, রাক্ষুসে অজগরটা রক্তাক্ত হয়ে মরে পড়ে আছে৷ এতদিনে জিমি তার মায়ের হত্যার প্রতিশোধ নিয়েছে৷

Cov39
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%