সবুজ সংকেত

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov47

'সবুজ আলোটাকে তাড়া করাই ভুল হয়েছিল,' বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ঘুম ঘুম স্বরে বললেন৷ চাউনি উদাস৷ 'আসলে আমার উদ্দেশ্য ছিল ওটাকে ফোটনকণায় পরিণত করে হিমায়িত মিথেনে বন্দি রাখা৷'

হালদার ডিটেকটিভ এজেন্সির সুখ্যাত গোয়েন্দা কৃতান্তকুমার হালদার, ওরফে কে.কে. হালদার, ওরফে আমাদের হালদারমশাই হাঁ করে তাকিয়ে কথা শুনছিলেন৷ এবার মুচকি হেসে বললেন, 'চোর-ডাকাতকে তাড়া করার মতো আলো-টালোকেও তাড়া করা যায় বুঝি?'

চন্দ্রকান্ত শুধু বললেন, 'যায়৷'

'হাজতে ঢোকানোর মতো বন্দি রাখাও যায়?' হালদারমশাইয়ের ঠোঁটের কোনায় চলে গেল হাসিটা৷ আলপিনের ডগার মতো আটকে রইল৷

যেন খোঁচা খেয়েই চটে গেলেন বিজ্ঞানী৷ বললেন, 'ও আপনি বুঝবেন না৷'

হালদারমশাইও চটলেন৷ পুলিশের চাকরি করে মাথাটি সাংঘাতিক সাংঘাতিক অভিজ্ঞতায় ঠাসা৷ রিটায়ার করার পর প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলেছেন৷ রহস্যের লেজের ডগাটুকু দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়েন৷ তাই বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের বাড়ির পেছনের বাগানে রাতবিরেতে সবুজ আলোর ঝলকানি দেখা যায় শুনে তাক করেই ছিলেন৷ কিন্তু তারপর 'তাড়া করা' এবং 'বন্দি রাখা'র কথা শুনে টের পেলেন, কেসটিতে তাঁকে পাত্তা দেওয়া হবে না৷ তেতো মুখে একটিপ নস্যি নিয়ে হাঁচার ভঙ্গিতে বললেন, 'হিং টিং ছট!'

বেগতিক দেখে বললুম, 'আপনি বলুন চন্দ্রকান্তবাবু! ব্যাপারটা সত্যি ইন্টারেস্টিং!'

যাঁর ঘরে আমাদের এই সমাবেশ, তিনি একটু তফাতে ইজিচেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়তে পড়তে সাদা দাড়িতে আঙুলের চিরুনি টানছিলেন৷ চওড়া টাকে সকালের রোদ্দুরের প্রতিফলন৷ এতক্ষণে মুখ খুললেন, 'হালদারমশাই! আশা করি, প্রাচীন ভারতের যুদ্ধাস্ত্র নাগপাশের কথা শুনেছেন?'

হালদারমশাই একটু অবাক হলেন, 'শুনেছি কর্নেল স্যার! আমার ধারণা, নাগপাশ আসলে ল্যাসো, স্রেফ দড়ির ফাঁস!'

বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত নড়ে বসলেন৷ 'লেসার বিমকেও নাগপাশের মতো ব্যবহার করা যায়,' উত্তেজিতভাবে বললেন তিনি৷ 'আমার উদ্দেশ্য ছিল লেসার নাগপাশে সবুজ আলোটাকে আটকে ফেলা৷ তারপর যা বলছিলুম, হিমায়িত মিথেনে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই কেল্লা ফতে!'

হালদারমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, 'বেশ৷ তাতে হতটা কী?'

'পৃথিবীতে প্রাণসৃষ্টির প্রথম পর্যায়টা জানা যেত,' চন্দ্রকান্ত জোর গলায় বললেন৷ 'আমার একটা রে-ডিটেক্টর আছে৷ তা থেকে বুঝতে পেরেছি, সবুজ আলোটা আসছে ইউরেনাসের ন-টা বলয়ের কোনো একটা থেকেই৷ মার্কিন মহাকাশযান ভয়েজার থেকে পাঠানো ডাটা ডিকোড করে জানা গেছে, বলয়গুলোতে সৌর নীহারিকার মতোই মহাজাগতিক ধুলো আর হিমায়িত মিথেনকণিকা ঠাসা৷ তো...'

'হিং টিং ছট!' হালদারমশাই খিখি করে হেসে উঠলেন৷

কথায় বাধা পড়ায় বিজ্ঞানী খাপ্পা হয়ে বললেন, 'এ আপনি বুঝবেন না৷'

না-এর টংকার বিচলিত করতে পারল না গোয়েন্দাকে৷ 'আলবাত বুঝি,' বলে তিনিও বাতটাকে থাপ্পড় মারলেন চটাস করে৷

বিব্রত মুখে গৃহকর্তার দিকে তাকালুম৷ তিনি সাধুবাবার মতো চুপ৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত এবার মারমুখী হয়ে ঝুঁকে এলেন গোয়েন্দা কে.কে. হালদারের দিকে৷ গরম শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'কী বোঝেন?'

'কোনো দুষ্টচক্রের কারসাজি,' চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে জবাব দিলেন গোয়েন্দা৷ 'কেসটা আমাকে দিন৷ সাত দিনের মধ্যে সবুজ আলোর রহস্য ফর্দাফাঁই করে দেব৷'

বিজ্ঞানী রণে ভঙ্গ দিলেন, বলা যায়৷ ফিক করে হেসে ফেললেন এবার, 'ঠিক আছে৷ দিলুম৷ কিন্তু সাবধান, উলটে নিজেই বিপদে পড়লে আমাকে যেন দায়ী করবেন না৷'

হালদারমশাই তাঁর জরাজীর্ণ ব্রিফকেস খুলে বললেন, 'আমার এজেন্সির ফর্ম আছে৷ লিখিত চুক্তি হবে৷ আমি মশাই মুখের কথায় আজকাল আর কেস নিই না৷' দু-কপি ফর্ম বের করে চন্দ্রকান্তের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, 'বাই দা বাই, একটা কথা৷ আপনার বাগান কর্নেল স্যারের মতো শূন্যোদ্যান নয় তো?'

'শূন্যোদ্যান মানে?'

'সেই যে ব্যাবিলনে ছিল, কোন এক নেবুকাটা রাজার যেন?'

হাসি চেপে বললুম, 'নেবুকাটা রাজার নয়, হালদারমশাই! সম্রাট নেবুকাডনাজারের!'

গৃহকর্তা কর্নেল নীলাদ্রি সরকার শুধরে দিলেন, 'নামটা নেবুকাডনাজার বা নেবুচাডনাজার বলে পরিচিত৷ খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-সপ্তম শতকে যে-সম্রাট ব্যাবিলনে তথাকথিত শূন্যোদ্যান তৈরি করেছিলেন, তাঁর প্রকৃত নাম ছিল নেবুকাদরাগগার৷ যাই হোক, আমার ছাদের 'প্ল্যান্ট-ওয়ার্ল্ড'কে হালদারমশাই শূন্যোদ্যান বলেছেন৷ খাসা! অপূর্ব! এবার থেকে আমার প্ল্যান্ট-ওয়ার্ল্ডকে 'শূন্যোদ্যান' বলব৷'

বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ফর্মে চোখ বুলোচ্ছিলেন৷ মুখ তুলে বললেন, 'ছাদে বাগান করেছেন? বলেন কী! তাহলে তো মহাজাগতিক রশ্মি উদ্ভিদকোষে কীসব প্রতিক্রিয়া ঘটায়, সেটা পরীক্ষা করতে হলে আপনার বাগানই আদর্শ৷ এত উঁচু বাড়ির ছাদে বাগান! পৃথিবীর গা থেকে যেসব ধুলোময়লা সব সময় ছড়াচ্ছে, তা আপনার বাগানের নাগাল পাবে না৷ কই, চলুন তো দেখি!'

চন্দ্রকান্ত উৎসাহে উঠে দাঁড়ালেন৷ সঙ্গের কিটব্যাগটা কাঁধে ঝোলালেন৷ বুঝলুম, ওর ভেতর বিস্তর যন্ত্রপাতি আছে৷ হালদারমশাইয়ের ফর্ম দুটো পড়ে রইল সোফায়৷ কর্নেলের মুখে প্রশংসা শুনে তাঁর মুখে যে প্রশান্ত হাসি ফুটেছিল, মিলিয়ে যেতে দেখলুম৷ ফর্ম দুটো কুড়িয়ে নিয়ে গুম হয়ে আমাদের অনুসরণ করলেন গোয়েন্দা কে.কে. হালদার৷

কর্নেলের বাড়ির বিশাল ছাদের এই বাগানে আমি কদাচিৎ আসি৷ এখানে এলেই কেমন গা ছমছম করে৷ রাজ্যের যত কিম্ভূতকিমাকার ক্যাকটাস আর রং-বেরঙের অর্কিডের এক আজব জঙ্গল৷ অর্কিড কোনো জ্যান্ত গাছকে আশ্রয় করেই বাঁচে৷ কিন্তু আমার বিজ্ঞ বন্ধু কী রাসায়নিক প্রকৌশলে শুকনো কাঠের মাচানে বা ক্রসে অর্কিডগুলো আটকে রেখেছেন এবং তারা দিব্যি বেঁচে আছে৷ ফুলও ফোটাচ্ছে৷ সকাল-বিকেল উনি এসে পরিচর্যা করেন৷ হরেক লোশনের শিশি, তুলো, মসৃণ কাঠির বান্ডিল চিলেকোঠার ভেতর দেওয়ালের তাকে রাখা আছে৷ কিন্তু এ যেন কোনো অজানা গ্রহ৷ বেঁটে, চ্যাপটা, গোল, বাঁকাচোরা উদ্ভুট্টে উদ্ভিদের দল সেই গ্রহের প্রাণী৷ মানুষ দেখলেই তাদের শরীরের অসংখ্য অদৃশ্য চোখে চক্রান্তের ঝিলিক ফুটে ওঠে৷

আমারই মনের ভুল হয়তো৷ আসলে হয়েছে কী, এদের প্রত্যেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি করে সাংঘাতিক রহস্যময় ঘটনার স্মৃতি৷ কোথাও কোনো অদ্ভুত চুরিচামারি, কোথাও কোনো রহস্যময় খুনখারাপি অথবা কোনো দুর্গম জায়গায় রোমাঞ্চকর অভিযানের সাক্ষী এরা৷ পৃথিবীর নানা জায়গা থেকে ওইসব সূত্রে এদের সংগ্রহ করে এনেছেন প্রকৃতিবিদ৷

বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে উঠলেন, 'দুর্দান্ত জ্যান্ত ল্যাবরেটরি!' তারপর কিটব্যাগ থেকে একটা টর্চের গড়নের যন্ত্র বের করে কয়েক পা এগোতেই একটা দুষ্টু ক্যাকটাসের পাল্লায় পড়লেন৷ অবস্থা শোচনীয় হল৷ দুষ্টু ক্যাকটাসটা তাঁর ঝাঁকড়া চুল টেনে শার্ট খিমচে অস্থির করে ফেলল৷

কর্নেল তাঁকে উদ্ধার করে বললেন, 'এর পাল্লায় পড়ে রোজ একটা করে কাকের মৃত্যু হয়৷ তবু বোকা কাকগুলোর শিক্ষা হয় না৷' পুবের বিরাট নিম গাছটিতে কাকের ঝাঁকের দিকে তাকালেন, মুখে বিরক্তির ছাপ৷

চন্দ্রকান্ত এবার সর্তক হলেন৷ যন্ত্রটা বাগিয়ে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে খুটখাট শব্দে সুইচ টেপাটিপি করতে থাকলেন৷ হালদারমশাই সামনেকার একটা লম্বাটে উদ্ভিদ দেখে তারিফ করলেন, 'অসাধারণ! ও মাসে বেগমপুর হর্টিকালচারাল সোসাইটিতে একটা চুরির তদন্তে গিয়ে ঠিক এমনি একটা ক্যাকটাস দেখেছিলুম৷'

কর্নেল একটু হেসে বললেন, 'দেখতে ক্যাকটাসের মতো হলেও এটা ক্যাকটাস নয়, হালদারমশাই! ওটা দাইদিয়েরিয়া গাছ৷ মালাগাসি থেকে এনেছিলুম৷'

'মালাগাসি?' হালদারমশাইও হাসলেন, 'মালাগাছি বলুন৷ নদিয়ার করিমপুর থানায় যখন ছিলুম, তখন এক সায়েব পাদরি মালাগাছিতে মিশন খুলেছিলেন৷ তিনিও আপনার মতো মালাগাসি বলতেন৷'

'হালদারমশাই, মালাগাসি মাদাগাস্কার দ্বীপের অপর নাম,' হালদারমশাইকে ভ্যাবাচ্যাকা খাইয়ে কর্নেল একটা অষ্টাবক্র ক্যাকটাসের পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন৷ বুকপকেট থেকে একটা আতশকাচ বের করে ওটার গায়ে রেখে খুব মন দিয়ে কিছু দেখতে থাকলেন৷

ঠিক এই সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল৷

আকাশপথে মার্বেলের গুটির সাইজের কী একটা জিনিস এসে কর্নেলের টুপিতে ঠকাস করে পড়ল৷ পড়াটা উনি টের পেলেন৷ কারণ সঙ্গেসঙ্গে টুপিসুদ্ধু মাথাটা জোরে নাড়া দিলেন৷ ফলে খুদে জিনিসটা ছিটকে এসে আমার পায়ের কাছে পড়ল৷ তারপর চমকে উঠলুম৷

ছোট্ট একটা নুড়ি৷ তাতে লাল সুতো দিয়ে একটা ভাঁজকরা চিরকুট জড়ানো আছে৷

দেখামাত্র চারদিকে উঁচু ও নীচু বাড়িগুলোর ছাদ লক্ষ করলুম৷ সন্দেহজনক কেউ কোথাও নেই৷ শুধু দক্ষিণের চার-তলা বাড়ির ছাদের কার্নিশে একটা বেড়াল ঘাপটি মেরে বসে নীচে কিছু দেখছে৷ বেড়ালের পক্ষে এ-কাজ সম্ভব নয়৷ পুবের নিম গাছের কাকগুলোকেও সন্দেহ করা চলত৷ কাকেরা বড্ড ঝগড়াটে এবং কোনো জিনিস ঠোঁটে কামড়ে নিয়ে যেতে যেতেও ঝগড়া করতে ছাড়ে না, তাই ঠোঁট থেকে জিনিসটা পড়ে যাওয়াও সম্ভব৷ কিন্তু তাই বলে চিরকুট-বাঁধা নুড়ি? যদ্দূর জানি, কাকেরা অন্তত পায়রাদের মতো ডাকপিয়োনের কাজ করে না৷

ডাকপিয়োনের কথা মাথায় আসার কারণ ওই চিরকুটটা৷ হালদারমশাই ঢ্যাঙা মানুষ৷ দু-হাঁটুতে দুটো হাত রেখে ঝুঁকে কর্নেলের কাজকারবার দেখছেন৷ একটু তফাতে দাঁড়িয়ে চন্দ্রকান্ত একটা অর্কিডের গায়ে তাঁর যন্ত্রটা ঠেকিয়ে অনবরত খুটখুট শব্দে সুইচ টেপাটিপি করছেন৷ চিরকুট-বাঁধা নুড়িটা কাঁপা কাঁপা হাতে কুড়িয়ে নিলুম৷ তারপর সুতো ছিঁড়ে ভাঁজ খুলে দেখতেই বুকের ভেতরটা ধড়াস করে উঠল৷ আঁকা-বাঁকা হরফে লাল কালিতে লেখা আছে: 'কো-২-কে চুরি করেছি৷ নাক গলিয়ো না৷ টাক ফুটো হয়ে যাবে৷ ইতি-

হাহা হুহু'

দম-আটকানো গলায় চেঁচিয়ে উঠলুম, 'কর্নেল! কর্নেল! সর্বনাশ!'

হালদারমশাই ছিলেছেঁড়া ধনুকের মতো সিধে হয়ে গেলেন৷ চন্দ্রকান্তও ঘুরে দাঁড়ালেন৷ দু-জনেই একগলায় বলে উঠলেন, 'ক্কী, ক্কী?'

'কিডন্যাপিং!' হেঁপো রুগির মতো বললুম, 'কারা কাউকে কিডন্যাপ করে এইমাত্র চিঠিটা ছুড়ে মেরেছে৷'

হালদারমশাই এক লাফে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে চিরকুটটা ছিনিয়ে নিলেন৷ তারপর তিনি এই মাদাগাস্কারি দাইদিয়েরিয়ার মতোই খেঁকুটে এবং টানটান হয়ে গেলেন৷ চন্দ্রকান্ত হন্তদন্ত হয়ে এসে উঁকি মেরে চিরকুটটা পড়ার চেষ্টা করলেন৷ কিন্তু তিনি বেঁটে মানুষ৷ তাই যন্ত্রের শরণাপন্ন হলেন৷ কিটব্যাগ থেকে একটা পেরিস্কোপ-জাতীয় যন্ত্র বের করে ফেললেন৷

কর্নেল একেবারে নিশ্চল৷ বিদঘুটে ক্যাকটাসটার গায়ে আতশকাচ রেখে হাঁটু মুড়ে তেমনি বসে আছেন৷ কাছে গিয়ে বললুম, 'ব্যাপারটা দেখবেন তো? একটা সাংঘাতিক ঘটনা...'

'হাহা-হুহু!'

চমকে উঠে বললুম, 'আপনি জানেন, জানতেন?'

ধুরন্ধর প্রকৃতিবিদ আর মুখ খুললেন না৷ ঘুরে দেখি, হালদারমশাই চোখের ইশারায় আমাকে কাছে ডাকছেন৷ এদিকে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত আপনমনে বিড়বিড় করছেন, 'কো প্লাস কো, ইজ ইকোয়াল টু কো-টু... হা প্লাস হা, ইজ ইকোয়াল টু হা-টু... হু প্লাস হু, ইজ ইকোয়াল টু হু-টু... জয়ন্তবাবু!' কাছে পেয়ে উত্তেজিতভাবে আমার হাত চেপে ধরলেন৷ 'বাড়ি ফিরে কম্পিউটারে ফিড করাতে হবে৷ দেখব, কী বেরিয়ে আসে৷ আপাতত ম্যাথামেটিক্যালি ব্যাপারটা কী দাঁড়ায় দেখুন৷' তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে যন্ত্র দুটো কিটব্যাগে ঢুকিয়ে নোটবই, ডট পেন বের করলেন৷ খসখস করে লিখে ফেললেন:

(KO+KO)%(HA+HA)+(HOO+HOO)=2KO%(2HA+2HOO).

অঙ্ককষা চলতে থাকল৷ এবার হালদারমশাই আমাকে টানলেন৷ একটু তফাতে নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললেন, 'একটা ব্যাপার লক্ষ করার আছে৷'

'কী বলুন তো?'

হালদারমশাই আমার কানের কাছে মুখ আনলেন৷ 'কর্নেল স্যার ব্যাপারটা জানেন মনে হচ্ছে৷'

'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন৷'

'আরও একটা ব্যাপার আছে৷'

'কী?'

'ছাদে ওঠার সময় কর্নেল স্যার টুপি পরে এসেছেন৷'

'ছাদে অবশ্য টুপি পরেই আসেন৷ ষষ্ঠীর কাছে শুনেছি, কাকের ঠোকর খাবার ভয়েই...'

আমার কথার ওপর খিক করে হাসলেন হালদারমশাই৷ 'এই নুড়িটাতে চিঠিটা বাঁধা ছিল, তাই না? আপনি বলার আগেই আমার চোখে পড়েছে৷ এখন বুঝুন, কনের্ল স্যার টুপি পরে না এলে ওঁর টাক রক্তারক্তি হত কি না?'

'তা তো হতই,' সায় দিয়ে কর্নেলের দিকে তাকালুম৷ এতক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছেন৷

হালদারমশাই শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'খুব রহস্যজনক ঘটনা, বুঝলেন?' বলেই উত্তরের পুরোনো দোতলা একটা বনেদি বাড়ির দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ দৃষ্টিতে ঘোরতর সন্দিগ্ধতা৷

জিজ্ঞেস করলুম, 'কী দেখছেন অমন করে?'

'একটা বা দুটো মুখোশপরা মুখ, এইমাত্র সরে গেল জানলা থেকে৷ ব্যাপারটা এখনই দেখা দরকার৷'

গোয়েন্দা কে.কে. হালদার দ্রুত সিঁড়ির দিকে ধাবিত হলেন৷

কর্নেল ডাকলেন, 'হালদারমশাই! কোথায় চললেন অমন করে?'

'আসছি৷ এখনই আসছি কর্নেল স্যার!'

কর্নেল একটু হেসে বললেন, 'হাহা-হুহু রহস্যের কিনারা করার আগে একবার মহাভারত পড়ে নেওয়ার দরকার ছিল৷'

হালদারমশাই এমন অদ্ভুত কথায় বোধকরি ক্ষুব্ধ হলেন৷ মুখ গোমড়া করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেলেন৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তও তাঁকে অনুসরণ করলেন৷ বুঝলুম, এখনই বাড়ি ফিরে কম্পিউটারের সামনে বসবেন৷ কর্নেল তাঁকে ডাকলেন না৷

'কী জয়ন্ত?' কর্নেল এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন৷ 'তোমাকে অমন দেখাচ্ছে কেন?'

'ব্যাপারটা সাংঘাতিক৷ আপনি সব জানেন, তাও বোঝা যাচ্ছে৷ অথচ আপনি নির্বিকার৷'

কর্নেল আমাকে নিয়ে চললেন সিঁড়ির দিকে, 'চলো! কড়া কফি খাওয়া যাক৷ কফি হিমায়িত ঘিলু চাঙ্গা করে, ডার্লিং!'

নীচের সেই বিশাল জাদুঘর-সদৃশ ড্রয়িংরুমে ফিরে সোফায় ধপাস করে বসে পড়লুম৷ কর্নেল টুপি খুলে ইজিচেয়ারে বসে হাঁক দিলেন, 'ষষ্ঠী!'

ষষ্ঠী ওপাশের দরজার পর্দা তুলে করুণ মুখে বলল, 'বাবামশাই! একটু আগে আবার সেই ভূতপেরেতের ফোং এয়েছিল৷'

কর্নেল চোখ পাকিয়ে বললেন, 'কোনো কথা নয়৷ কফি! ঝটপট!'

ষষ্ঠী দ্রুত অদৃশ্য হল ভেতর দিকে৷ বললুম, 'ষষ্ঠী ফোনের কথা বলল! খুলে বলবেন এবার?'

'তোমার কাগজের খবর হবার মতো কিছু নয়,' কর্নেল হাসলেন, 'অন্তত এই হাহা-হুহু ব্যাপারটা তো নয়ই৷ তবে আমার ভয় হচ্ছে, হালদারমশাই কোনো বিপদে না পড়েন৷'

'উনি উত্তরের একটা দোতলা বাড়ির জানলায় মুখোশপরা কাদের দেখেছেন৷'

কর্নেল কোনো কথা বললেন না৷ চোখ বুজে দোল খেতে থাকলেন৷ এই সময় ফোন বাজল৷ অনিচ্ছা অনিচ্ছা করে ফোনটা তুলে সাড়া দিতেই ভূতুড়ে গলায় হুমকি ভেসে এল, 'এই বুড়ো ঘুঘু! সাবধান! হাহা-হুহু কোকোকে চুরি করেছে৷' তারপর ফোন রাখার শব্দ হল৷ আতঙ্কে আমার শরীর হিম হয়ে গেল৷ অবশ হাতে ফোনটা রেখে দিলুম৷ তারপর ব্যস্তভাবে বললুম, 'কর্নেল! কর্নেল! কিডন্যাপাররা শাসাল! বলল, হাহা-হুহু কোকোকে চুরি করেছে৷'

ষষ্ঠী চুপচাপ কফির ট্রে রেখে গেল৷ কর্নেল বললেন, 'কফি খেয়ে নাও ডার্লিং! এখনই বেরোনো দরকার৷ হালদারমশাইয়ের জন্য আমার ভাবনা হচ্ছে৷':

কফিটা ছিল যেমন গরম, তেমনি কড়া৷ কষ্ট করে গিলে উঠে দাঁড়ালুম৷ আমার তর সইছিল না৷ কর্নেল টুপি পরে একটা ছড়ি হাতে বেরোলেন৷ দাঁতে কামড়ানো জ্বলন্ত চুরুট৷ বাড়ির নীচে ডান দিকে একটা গলি৷ সেই গলি-রাস্তায় আন্দাজ একশো মিটার এগিয়ে ফের ডাইনে ঘুরে একটা গেট দেখতে পেলুম৷ গেটের মাথায় ঘন বোগেনভিলিয়ার ঝাঁপি৷ কোনো দরোয়ান নেই৷ ভেতরে লনে একফালি রাস্তা দেখা যাচ্ছিল৷ দু-ধারে একসময় বাগিচা ছিল৷ এখন জঙ্গল হয়ে আছে৷ বনেদি বড়োলোকের বাড়ি বলে মনে হল৷ কিন্তু এখন সেই সচ্ছলতার চেকনাইটি খয়ে গেছে৷ দেওয়ালে, কার্নিশে ফাটল আর শ্যাওলা৷ নিষ্ঠুর চেহারার উদ্ভিদ হিংসুটে শেকড় ঢুকিয়ে বাড়িটাকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করছে৷ গেটের পাশে ভাঙাচোরা ফলকে কী লেখা, পড়তে পারলুম না৷ তাহলে এই বাড়িটারই জানলায় কি হালদারমশাই মুখোশপরা কাদের দেখতে পেয়েছিলেন কর্নেলের শূন্যোদ্যান থেকে? কর্নেল গেট খুলে বললেন, 'হুঁ, হালদারমশাই বিপন্ন৷'

আঁতকে উঠে বললুম, 'কেন এ-কথা বলছেন?'

'অ্যালসেশিয়ানটার সাড়াশব্দ নেই, তাই৷'

'বুঝলুম না৷'

'একটু পরেই বুঝবে৷'

এইসময় লনের রাস্তায় কোন আমলের বিছানো নুড়িগুলোর দিকে চোখ গেল৷ বললুম, কর্নেল! এই বাড়ির ছাদ থেকেই চিরকুটটা নুড়িতে বেঁধে গুলতিতে করে ছোড়া হয়েছিল৷ কারণ, এই দেখুন, একই সাইজের কত নুড়ি৷'

কর্নেল কানে নিলেন না৷ গাড়িবারান্দার তলায় গিয়ে ডাকলেন, 'গোবিন্দ আছ নাকি? ও গোবিন্দ!'

সাড়া না পেয়ে কড়া নাড়তে থাকলেন৷ সিঁড়ির ওপর প্রকাণ্ড দরজা ভেতর থেকে বন্ধ৷ একটু পরে দরজা খুলে গেল৷ এক মারকুটে চেহারার ভদ্রলোক, পরনে যেমন-তেমন প্যান্ট-শার্ট, কিন্তু জুলফি-গোঁফ আর চিবুকে দেখনসই দাড়ি, কর্নেলকে দেখে উত্তেজিতভাবে বললেন, 'আসুন কর্নেল! স্বচক্ষে দেখুন, আইন-শৃঙ্খলার কী অবস্থা হয়েছে আজকাল!'

কর্নেল বললেন, 'কী ব্যাপার হরবাবু?'

হরবাবু বললেন, 'দিনদুপুরে ঘরে চোর ঢুকেছিল! ব্যাস, অমনি পড়েছে ডনের পাল্লায়৷ গোবিন্দকে থানায় খবর দিতে পাঠিয়েছি৷ ফোনে লাইনই পাওয়া গেল না থানার৷'

কথা বলতে বলতে একটা হলঘরে আমাদের ঢোকালেন হরবাবু৷ দেওয়ালে বড়ো বড়ো পুরোনো পোর্ট্রেট৷ মেঝেয় জীর্ণ কার্পেট৷ বেরঙা সোফাসেট, গদিছেঁড়া চেয়ার আর কুশন৷ বাঁ-দিকের একটা ঘরের দরজা খোলা এবং পর্দা ঝুলছে৷ সেখানে একটা লেজ দেখা আর গজরানি শোনা গেল৷ বুঝলুম, ডন নামক চতুষ্পদ দজ্জাল প্রাণীটি ওখানে দু-ঠ্যাং মুড়ে বসে আছে৷

হরবাবু পর্দা তুলতেই করুণ দৃশ্যটা চোখে পড়ল৷

কোনার দিকে জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন গোয়েন্দা কে.কে. হালদার৷ কাকতাড়ুয়া বলাই ভালো৷ উনি আমাদের দেখে নড়ে ওঠামাত্র ডন আওয়াজ দিল৷ অমনি হালদারমশাই কাঁচুমাচু হাসলেন৷ অবস্থাটা বোঝা গেল৷

কর্নেল হাসি চেপে বললেন, 'হরবাবু, একটা ভুল হয়ে গেছে৷'

হরবাবু বললেন, 'কী ভুল বলুন তো?'

'আপনি ফোনের ভরসা না করে থানায় চলে যান৷ গোবিন্দকে ফিরিয়ে আনুন৷ পুলিশ কিছু জিজ্ঞেস করলে বলবেন, চোর পালিয়ে গেছে৷'

হরবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'সে কী! ওই তো চোর!'

'না হরবাবু! উনি আমাদের বিশেষ পরিচিত প্রাইভেট ডিটেকটিভ মি. কে.কে. হালদার৷ উনি একজন রিটায়ার্ড পুলিশ ইনস্পেকটরও!' বলে কর্নেল কুকুরটার নাকের কাছে তাঁর ছড়ির ডগা এগিয়ে দিলেন৷

অমনি অতবড়ো কুকুরটা লেজ গুটিয়ে কুঁইকুঁই করতে করতে আমাদের পাশ কাটিয়ে হলঘরে ঢুকল৷ তারপর কোথায় বেপাত্তা হয়ে গেল৷ হরবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, 'এর মানে?'

'মানে পরে শুনবেন৷ আপনি প্লিজ থানায় গিয়ে গোবিন্দকে ডেকে আনুন৷'

হরবাবু গোমড়া মুখে বেরিয়ে গেলেন৷ এবার হালদারমশাই 'বাপস' বলে কাছের একটা চেয়ারে বসে পড়লেন৷ নস্যিও নিলেন৷ ঘাম ঝরছে দরদর করে৷

কর্নেল তাঁর দিকে মনোযোগ না দিয়ে ডাকলেন, 'হাহা-হুহু! চলে এসো এবার৷ একহাত লড়া যাক৷'

পেছনে হলঘরের ভেতর থেকে কেউ বলে উঠল, 'হাতেনাতে বামাল ধরা পড়েছে৷ হাহা-হুহু বন্দি কর্নেল!'

ঘুরে দেখি, এক অমায়িক চেহারার বৃদ্ধ হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন৷ পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি৷ পাতা-চাপা ঘাসের মতো ফ্যাকাশে গায়ের রং৷ হাতে একটা নকশাদার ছড়ি, লাঠি বলাই উচিত৷ কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, 'মাঝখান থেকে আমাদের হালদারমশাইকে ভুগিয়ে ছাড়ল! কই, চলুন, ওদের কী অবস্থা দেখি৷'

বৃদ্ধ ভদ্রলোক উঁকি মেরে হালদারমশাইকে দেখে বললেন, 'কে উনি?'

'আপনি তাহলে নীচের তলার ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানেন না দেখছি!'

'না তো৷ কী ব্যাপার?'

কর্নেল হালদারমশাইয়ের পরিচয় দিয়ে আগাগোড়া ঘটনাটি বললেন৷ বৃদ্ধ ভদ্রলোক খুব হাসলেন৷ তারপর বললেন, 'যাই হোক, শ্রীমানদ্বয়ের দৌলতে এই একঘেয়ে নিরানন্দ জীবনে মাঝে মাঝে কিছু বৈচিত্র্য মেলে৷ আজ ভোর বেলা থেকে মনটা বিশেষ ভালো ছিল না৷ এখন আবার চাঙ্গা হওয়া গেল৷ আসুন! ওপরে গিয়ে বসা যাক৷'

হলঘরের একদিকে ঘোরালো চওড়া কাঠের সিঁড়ি৷ দোতলার একটা ঘরে আমাদের অভ্যর্থনা করে বসালেন ভদ্রলোক৷ ঘরটা সেকেলে আসবাবে সাজানো৷ উনিশ শতকি বনেদিয়ানার ছাপ আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে আছে৷ হালদারমশাই এবং আমার উদ্দেশে কর্নেল বললেন, 'এ-বাড়ির অনেক ইতিহাস আছে৷ নবাবি আমলের দলিল-দস্তাবেজ ঘাঁটলে প্রচুর তাক-লাগানো খবর পাওয়া যাবে এ-বাড়ি সম্পর্কে৷'

বাড়ির কর্তা বললেন, 'পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে লাভ নেই, কর্নেল! আসুন, কয়েদিদের উদ্ধার করবেন৷ সাবধান! রীতিমতো যুদ্ধের সম্ভাবনা আছে কিন্তু৷'

কর্নেল ওঁর সঙ্গে বেরিয়ে গেলে হালদারমশাইকে জিজ্ঞেস করলুম, 'কুকুরের পাল্লায় পড়লেন কী করে?'

হালদারমশাই কাঁচুমাচু হেসে বললেন, 'গেট থেকে উঁকি মেরে দেখি, নীচের হলঘরের দরজা খুলে ওই হরবাবু বেরিয়ে সন্দেহজনকভাবে বাড়ির পেছন দিকটায় চলে গেলেন৷ চেহারাখানা তো দেখলেন৷ দাগি ক্রিমিন্যাল মনে হয় না? তো সেই ফাঁকে আমি হলঘরে ঢুকে পড়লুম৷ সেই সময় ওপরে কুকুরের গজরানি৷ অমনি পাশের ওই ঘরটাতে ঢুকে পড়লুম৷ তারপর কুকুর ব্যাটাচ্ছেলে এসে দরজায় বসে পড়ল৷ ভাগ্যিস ঝাঁপিয়ে পড়েনি৷ কিন্তু আশ্চর্য, যতবার পকেটে হাত ঢুকিয়ে রিভলবার বের করতে যাচ্ছি, ততবার গজরে গজরে উঠছে৷ বেগতিক দেখে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলুম নট-নড়নচড়ন অবস্থায়৷ একটু পরে হলঘরের বাইরের দরজা বন্ধ করার শব্দ হল৷ তখন বাধ্য হয়ে সাড়া দিতে হল৷ বুঝলেন না? অ্যালসেশিয়ান বলে কথা! কিন্তু হরবাবু না টরবাবু এসে আমাকে দেখেই চোর বলে হাঁক ছাড়লেন৷ অমনি কালো হোঁতকা চেহারার এক পালোয়ান, মানে গোবিন্দ না টোবিন্দ এসে হাজির৷ ওঃ! জীবনে এমন বোকা কখনো বনতে হয়নি৷'

কর্নেল এবং বাড়ির কর্তা দু-জন মুখোশপরা খুদে মানুষকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ ওদের দু-জনেরই হাতে দুটো কালো রঙের লম্বাটে খেলনাপিস্তল, এক জনের বুকপকেটে একটা গুলতি৷ কর্নেল ওদের মুখোশ খুলে দিতেই বেরিয়ে পড়ল সুন্দর দুটো ছেলে৷ ন-দশ বছর বয়স মোটে৷ মুখে মিটিমিটি হাসি৷ দেখামাত্র বুঝলুম, ওরা দুটো যমজ ভাই৷ একে অন্যের প্রতিমূর্তি৷ কর্নেল বললেন, 'শেঠমশাই! ভিলেনদের পরিচয় করিয়ে দিন৷ কে হাহা, কে হুহু, আপনিই ভালো জানেন৷'

শেঠমশাই এক জনের চুল টেনে দিয়ে বললেন, 'ইনি হাহা, গুলতিবাজ৷' অন্য জনের কান টেনে দিয়ে বললেন, 'ইনি হুহু৷ আর বলবেন না! এদের দস্যিপনায় সারাক্ষণ অস্থির হয়ে থাকি৷ হাহা গুলতি ছোড়ে আর হুহু চিরকুট লেখে৷'

হালদারমশাই জিজ্ঞেস করলেন, 'কিন্তু কো-২ ব্যাপারটা কী?'

'এরাই,' শেঠমশাই বললেন, 'কোমল আর কোরক৷ কোমল হল হাহা, আর কোরক হল হুহু৷ সেই ড. জেকিল আর মি. হাইডের মতো আর কি! নিজেরাই হিরো, নিজেরাই ভিলেন৷ নিজেরাই নিজেদের কিডন্যাপার৷' শেঠমশাই হাসতে হাসতে একটা আরামকেদারায় বসে পড়লেন৷

সেই সুযোগে হাহা-হুহু সুড়ুৎ করে বেরিয়ে গেল৷ কর্নেল এসে হালদারমশাইয়ের পাশে বসলেন৷ বললেন, 'আপনাকে মহাভারত পড়তে বলেছিলুম, হালদারমশাই!'

হালদারমশাই রহস্য কেঁচে যাওয়ায় নিরাশ৷ শুধু বললেন, 'হুঁ:!'

'মহাভারতে হাহা আর হুহু নামে দুই গন্ধর্বের কথা আছে৷'

শেঠমশাই বললেন, 'আসলে ওদের প্রাইভেট টিউটর তপোব্রত এই চক্রান্তের মূলে৷ কর্নেলকে নিয়ে মজা করার ফন্দি৷ আজ যেই-না গুলতি ছুড়েছে অমনি ধরে ফেলেছি৷ শ্রীমানরা একটু আগে কবুল করেছে সব৷ মহাভারতের হাহা-হুহু গন্ধর্বের কথা ওরা কেমন করে জানবে? তপোব্রত শিখিয়েছে৷ সেও একটা বোকার বোকা, তা যত ডিগ্রির জাহাজ হোক-না-কেন৷ কর্নেলকে ফাঁকি দেওয়া কি অত সহজ কথা? তপোব্রতকে ধমকে দিতে হবে৷'

কর্নেল বললেন, 'না, না৷ ও বেচারাকে কিছু বলবেন না৷ খুব ভদ্র আর সুশিক্ষিত ছেলে৷ অনেক খোঁজখবর রাখে৷ আজকাল তপোব্রতের মতো প্রাইভেট টিউটর পাওয়া ভাগ্যের কথা৷'

হালদারমশাই ফের একটিপ নস্যি নিয়ে বললেন, 'ব্যাকগ্রাউন্ডটা একটু ক্লিয়ার হলে ভালো হত৷'

কর্নেল বললেন, 'কোরক-কোমল শেঠমশাইয়ের নাতি৷ দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাই বলব, বছর দুই আগে কোরক-কোমলের বাবা-মা শোচনীয় দুর্ঘটনায় মারা গেছেন৷ ওঁরা রিকশো করে আসছিলেন৷ একটা প্রাইভেট কার পেছন থেকে এসে ধাক্কা মারে৷ শেঠমশাইয়ের দুই ছেলে৷ ছোটো ছেলে হরনাথবাবুকে তো দেখেছেন একটু আগে৷'

হালদারমশাই নড়ে বসলেন৷ 'অ্যাক্সিডেন্টটা কেমন যেন...' বলেই থেমে গেলেন৷ মুখে সন্দেহের ছাপ৷

শেঠমশাইকে মুহূর্তের জন্য বিরক্ত দেখাল৷ কিন্তু চেপে গিয়ে ম্লান হাসলেন৷ 'আপনি ডিটেকটিভ৷ সবেতেই আপনি সন্দেহপ্রবণ, সেটা স্বাভাবিক৷ কিন্তু পুলিশ তো বটেই, আমিও এর মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখিনি৷ এমন অ্যাক্সিডেন্ট তো আজকাল প্রায়ই হচ্ছে৷ তা ছাড়া তখন সন্ধ্যে বেলা৷ ওই এরিয়ায় লোডশেডিংও ছিল৷ তার চেয়েও বড়ো কথা, ওদের শত্রু কেন থাকবে?'

'কর্নেল স্যারকে দিয়ে একবার তদন্ত করালেও পারতেন!' হালদারমশাই তবু দমে গেলেন না, 'আমরা প্রাইভেট ডিটেকটিভরা তো কোন ছার, পুলিশের বাঘা বাঘা ডিটেকটিভকে কর্নেল স্যারের পায়ের ধুলো নিতে দেখেছি৷'

কর্নেল বললেন, 'আমি তখন বাইরে ছিলুম৷ তা ছাড়া কোরক-কোমলের বাবা অমরবাবুকে এ-পাড়ার পুরোনো বাসিন্দা হিসেবে ছোটোবেলা থেকেই চিনতুম৷ অত্যন্ত সজ্জন মানুষ ছিলেন৷ ওঁর স্ত্রী সবিতাকেও চিনতুম৷ স্বামী-স্ত্রী দু-জনেই ছিলেন পরমাণু বিজ্ঞানী৷ সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্সের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ওঁরা৷'

'সায়েন্টিস্ট!' হালদারমশাই গলার ভেতর বললেন৷ ঠোঁটের কোনায় সেই আলপিন-হাসি৷

বুঝলুম, বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের কথা মনে পড়ে গেছে৷ কর্নেল বললেন, 'যাই হোক, হালদারমশাই, তাহলে হাহা-হুহু রহস্য ফাঁস হয়েছে৷ এবার ওঠা যাক৷ সাড়ে দশটা বাজে৷ এগারোটায় আমার একটা জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে৷'

শেঠমশাই হাঁ হাঁ করে উঠলেন, 'সে কী! কতদিন পরে এলেন৷ সঙ্গে এঁরা সব রয়েছেন৷ অন্তত একটু চা বা কফি না খাইয়ে বিদায় দিই কী করে? একটু বসুন৷ গোবিন্দ এখনই এসে যাবে৷ সমস্যা হয়েছে, রান্নাবান্নার জন্য কাজের লোক জোটে না৷ গোবিন্দই সব করে-টরে অগত্যা৷ হর-র যা মেজাজ! একটা কাজের লোক টেঁকে না৷ ক-দিন থেকেই কেটে পড়ে৷'

হালদারমশাই বললেন, 'হরনাথবাবুর, মানে, ফ্যামিলি-ট্যামিলি নেই?'

জবাব দিলেন কর্নেল৷ 'উনি বিয়ে করেননি৷ তবে দাদার মতোই গুণী মানুষ৷ দারুণ ছবি আঁকেন৷ নীচের একটা ঘরে ওঁর স্টুডিয়ো আছে৷ সারাক্ষণ সেখানেই থাকেন৷'

শেঠমশাই বিরক্ত মুখে বললেন, 'ও একটা পাগল৷ বদ্ধ পাগল৷ পাগল আর গোঁয়ার৷ অকম্মার ধাড়ি!'

কর্নেল হাসলেন, 'আর্টিস্টরা একটু খেয়ালি স্বভাবের মানুষ৷'

এইসময় সেই গোবিন্দ এল হাঁফাতে হাঁফাতে৷ হালদারমশাই ঠিকই বলেছেন, পালোয়ানই বটে৷ তাগড়াই চেহারা৷ চুলে পাক ধরেছে কিন্তু শরীরটি ঢালাইকরা লোহা একেবারে৷ পরনে খাটো নীলচে লুঙ্গি আর লাল ছেঁড়াখোঁড়া গেঞ্জি৷ গলায় তক্তি৷ সে অবাকচোখে শুধু হালদারমশাইকে দেখতে থাকল৷

বুড়োকর্তা ধমক দিয়ে বললেন, 'দেখছিস কী? এঁদের জন্য চা-কফি যা হোক একটা কিছুর ব্যবস্থা কর৷'

কিছুক্ষণ পরে আমরা তিন জনে বনেদি শেঠ বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলুম৷ গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন শেঠমশাই৷ গলি-রাস্তায় যেতে যেতে হালদারমশাই বললেন, 'একটা এক্সপিরিয়েন্স হল বটে৷ তা কর্নেল স্যার, আপনার শেঠমশাইয়ের পুরো নামটি কী?'

'অচিন্ত্যকুমার শেঠ৷ পদবি শেঠ, কিন্তু এঁরা বাঙালি৷ নবাবি আমল থেকে ব্যাঙ্কিং এঁদের বংশগত পেশা ছিল৷' কর্নেল একটু দাঁড়িয়ে নিভে যাওয়া চুরুট জ্বেলে নিলেন, 'অচিন্ত্যবাবুর বয়স এখন প্রায় আশি৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে উনি যখন যুবক, তখন ওঁদের দরিয়াগঞ্জ প্রাইভেট ব্যাঙ্ক ফেল করে৷ ওই সময় দেশে অসংখ্য প্রাইভেট ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল৷ ব্যাঙ্ক ফেল করার হিড়িক বলা যায়৷ ফলে শেঠমশাই বংশগত পেশা ছাড়তে বাধ্য হন৷ মুর্শিদাবাদে পদ্মার ধারে দরিয়াগঞ্জে ওঁদের পূর্বপুরুষের বসবাস ছিল৷ সেই সূত্রে কিছু জমিজমাও ছিল৷ এখনও কিছু আছে শুনেছি৷ সম্ভবত তাই থেকে কোনো রকমে এখন সংসার চলছে৷ অমরের মৃত্যুর পর অবস্থা শোচনীয় হয়ে গেছে৷ হরনাথ তো ছবি নিয়েই মশগুল৷'

এতক্ষণে মনে পড়ল, বাড়িটার গেটে ভাঙাচোরা ফলকে যে নামটা লেখা দেখেছিলুম, সেটা নিশ্চয় 'দরিয়াগঞ্জ ভবন'৷

হালদারমশাই ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন, 'আসি, কর্নেল স্যার!'

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, 'আজ রাতে, আশা করি, চন্দ্রকান্তবাবুর বাগানে সবুজ আলোর রহস্য ভেদ করতে যাবেন, হালদারমশাই?'

উনি শুধু হাসবার চেষ্টা করলেন৷ আমি হাসতে হাসতে বললুম, 'হাহা-হুহু রহস্য ফাঁস করতে গিয়ে যা ভুগেছেন, এবার হালদারমশাই সাবধানে কেসে হাত দেবেন৷'

হালদারমশাই নির্লিপ্ত মুখে পা বাড়ালেন৷ কয়েক পা এগিয়ে হঠাৎ ঘুরে বললেন, 'একটা কথা৷'

কর্নেল বললেন, 'বলুন৷'

'কুকুরটা আপনার ছড়ির গুঁতো খেয়ে অমন লেজ গুটিয়ে নিপাত্তা হয়ে গেল কেন বলুন তো?'

'ফর্মুলা-২০৷'

'তার মানে?'

কর্নেল আমাকে বললেন, 'তুমিই বুঝিয়ে দাও, জয়ন্ত! আর শোনো, ওঁকে তোমার গাড়িতে বাড়ি পৌঁছে দাও৷ বড্ড ক্লান্ত দেখাচ্ছে হালদারমশাইকে৷'

বলে নিজের বাড়ির গেটে ঢুকে গেলেন কর্নেল৷ হালদারমশাই শুকনো হেসে বললেন, 'কর্নেল স্যার ঠিকই ধরেছেন৷ আমি সত্যি বড্ড টায়ার্ড, মানে, বুঝলেন না? খামোকা একটা ঝামেলা৷ তার ওপর কুকুর-টুকুর আমার চক্ষুশূল৷ কামড়ালে কী হত ভাবুন! পেটে চোদ্দোখানা ইয়া মোটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ ঢোকানো, মাইন্ড দ্যাট, ফোরটিন!... বাপস! আর তা না হলে ভয়াবহ অবস্থা৷ হাইড্রোফোবিয়া! জলাতঙ্ক রোগ!'

আমার গাড়ি পার্ক করা ছিল গেটের ভেতর চওড়া লনের পাশে৷ গাড়িতে ঢুকে হালদারমশাই মনে করিয়ে দিলেন, 'ফর্মুলা-২০৷'

কাশ্মীর-সীমান্তে কান্দ্রা উপত্যকায় সেবারকার রোমাঞ্চকর অভিযানের গল্পটা আগে বলে নিতে হল৷ কারণ 'ব্যাকগ্রাউন্ড' ছাড়া হালদারমশাই কোনো কথা শুনতে চান না৷ যাযাবর গুজরদের ভেড়ার পালের রক্ষী হিংস্র কুকুরবাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে কর্নেল ফর্মুলা-২০ নামের রাসায়নিক জিনিসটি উদ্ভাবন করেছিলেন৷ জিনিসটার ভীষণ বিচ্ছিরি গন্ধ৷ একবার শুঁকলে কুকুর কেন, বাঘ-ভাল্লুক-সিংহ সবাই লেজ গুটিয়ে নিপাত্তা হয়ে যায়৷ কান্দ্রা উপত্যকার সেই গল্প শুনে হালদারমশাই ফের চাঙ্গা হলেন৷ এমনই চাঙ্গা যে গড়িয়াহাট মোড়ে পৌঁছেই বলে উঠলেন, 'এখানেই নামিয়ে দিন, জয়ন্তবাবু! আর কষ্ট করতে হবে না৷'

অবশ্য তখন মোড়ে প্রচণ্ড ট্র্যাফিক জ্যাম!

সেদিনই সন্ধ্যায় 'দৈনিক সত্যসেবক' পত্রিকার আপিসে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের ফোন এল, উত্তেজিত কন্ঠস্বর, 'জয়ন্তবাবু! চলে আসুন! হাহা-হুহু মিস্ট্রি ম্যাথেমেটিক্যালি সলভড! এসে স্বচক্ষে দেখে যান৷ পিক্টোরিয়াল ফর্মেশনে৷'

বললুম, 'আহা, বলুন না ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?'

'ধুর মশাই,' বিজ্ঞানী খাপ্পা হয়ে বললেন, 'ফোনে কি এ-অঙ্কের ফর্মুলা বলা যায়? চলে আসুন না৷'

'কিন্তু...'

'কী মুশকিল! এলে আপনারই লাভ৷ কাগজের দারুণ খবর হবে৷ হিড়িক পড়ে যাবে৷'

'ঠিক আছে যাচ্ছি,' বলে ফোন রেখে দিলুম৷ খুব হাসি পাচ্ছিল৷ তারপর মনে পড়ে গেল ওঁর বাগানে রাতবিরেতে সবুজ আলোর ঝলকানির কথা৷

হ্যাঁ, এটা অবশ্য একটা খবর হওয়ার মতো জিনিস৷ কিন্তু চন্দ্রকান্ত আজ সকালে নিজেই বারণ করেছিলেন, ব্যাপারটা যেন না রটে৷ রটে গেলে আলোটাকে পাকড়াও করতে পারবেন না৷ বড্ড চালাক আলো, সাবধান হয়ে যাবে৷

বেরোনোর আগে কর্নেলকে রিং করলুম৷ ষষ্ঠী জানাল, 'বাবামশাই বিকেলে বেইরেছেন৷'

বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত মাস ছয়েক আগে ভি.আই.পি. রোডের তল্লাটে একটা পুরোনো বাগানবাড়ি কিনে তার আমূল ভোল ফিরিয়েছেন৷ বড়ো রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গুলে পরিবেশের ভেতর নিরিবিলি এক-তলা বাড়ি৷ একেবারে পাড়াগাঁ বলে মনে হয়৷ তবে শহরের যাবতীয় সুযোগসুবিধার ঘাটতি নেই৷ গাছপালার ভেতর আলো জুগজুগ করছে চারদিকে৷

পৌঁছোতে সাতটা বেজে গেল৷ গেটে দাঁড়িয়ে আমারই প্রতীক্ষা করছিলেন চন্দ্রকান্ত৷ ভেতরে গাড়ি পার্ক করে বেরোনোমাত্র খপ করে আমার একটা হাত ধরে ফেললেন৷ তারপর হিড়হিড় করে টানতে টানতে সোজা ওঁর ল্যাবে নিয়ে গেলেন৷

কম্পিউটারের সামনে বসে বিজ্ঞানী বললেন, 'স্ক্রিনের দিকে লক্ষ রাখুন৷'

ভিশন-স্ক্রিনে লাল-নীল-সবুজ রঙের ফুটকি, কাটাকুটি রেখা, নানান হিজিবিজির রেস শুরু হয়ে গেল৷ একটু পরে সেই হিজিবিজি রঙিন চিত্রকলার ভেতর থেকে নাচতে নাচতে এসে দাঁড়াল, কী অবাক! কী আশ্চর্য! দুটো খুদে মূর্তি-শ্রীমান কোমল ও শ্রীমান কোরক!

মাত্র কয়েক সেকেন্ড! তারপর ওরা জিমন্যাস্টিকসের ভঙ্গিতে ওলটপালট হতে হতে মিলিয়ে গেল৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত ফিক করে হেসে বললেন, 'বড্ড অস্থিরমতি বালক তো! তাই আটকে রাখা যায় না৷'

'কিন্তু এ কীভাবে সম্ভব হল?'

'বিশুদ্ধ অঙ্ক, জয়ন্তবাবু! যাকে বলে পিয়োর ম্যাথ৷' চন্দ্রকান্ত কম্পিউটার বন্ধ করে উঠে পড়লেন৷ পা বাড়িয়ে বললেন, 'সঠিক ডাটা ফিড করাতে পারলে সঠিক সমাধান বেরিয়ে আসে৷ চলুন, ও-ঘরে গিয়ে সব বলছি৷'

বসার ঘরে গিয়ে বললুম, 'আমি সত্যি অভিভূত৷ মুগ্ধ হয়ে গেছি আপনার কীর্তি দেখে৷ আপনি সত্যিই একজন জিনিয়াস!'

চন্দ্রকান্ত বসে পা দোলাতে দোলাতে বললেন, 'না, না৷ জিনিয়াস নয়৷ ডাটা! স্রেফ তথ্য৷ তথ্যকে অঙ্কে সাজানো৷ ব্যাস! কেল্লা ফতে৷'

'কিন্তু ওই চিরকুট থেকে এমন কী ডাটা পেলেন যে...'

হাত তুলে আমাকে থামিয়ে চন্দ্রকান্ত বললেন, 'কর্নেলের সঙ্গে তারপর আর আপনার যোগাযোগ হয়নি?'

'না৷'

চন্দ্রকান্ত মিটিমিটি হেসে বললেন, 'কর্নেলের সাহায্য ছাড়া এটা সম্ভব হত না৷ ওঁর বাড়ি থেকে আসার পর, নোটবইতে যে অঙ্কটা দেখেছেন, তাই নিয়ে জেরবার হচ্ছিলুম৷ তিনটে নাগাদ বুঝলুম, আরও কিছু ডাটা চাই৷ তখন কর্নেলকে ফোন করলুম৷'

'কর্নেল সব বললেন?'

'হ্যাঁ৷' চন্দ্রকান্ত শিশুর মতো খিক খিক করে হাসতে থাকলেন৷

'কিন্তু তা থেকে কোমল-কোরকের ছবি কীভাবে ভিশন-স্ক্রিনে ধরা পড়ল?'

চন্দ্রকান্ত হাসি থামিয়ে বললেন, 'এটাই আধুনিক জ্যোতিঃপদার্থ বিজ্ঞানের প্রযুক্তিকৌশল, জয়ন্তবাবু! তবে একটা ব্যাপার আপনিও এখনও জানেন না৷ আমিও আজ সকাল পর্যন্ত জানতুম না৷ সেটা হল, অমর আর সবিতা, মানে আপনার এই হাহা-হুহুর বাবা-মা, আমারই কলিগ ছিল৷ বাঙ্গালোর অ্যাস্ট্রোফিজিক্স রিসার্চ ইনস্টিটিউটে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি একসময়৷ ওরা কলকাতায় সাহা ইনস্টিটিউটে চাকরি নিয়ে চলে এল৷ তারপর আর যোগাযোগ ছিল না৷ কর্নেলের কাছে অ্যাক্সিডেন্টে ওদের মৃত্যুর খবর শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেছে৷ শেঠমশাইয়ের সঙ্গে দেখা করে সান্ত্বনা জানিয়ে আসব ভাবছি৷'

চন্দ্রকান্ত কথা শেষ করেছেন, এমন সময় বাইরে কার আর্তনাদ শোনা গেল, 'বাপ রে! গেছি রে! আঃ, ছাড়ো, ছাড়ো!' তারপর হেঁড়ে গলায় চিৎকার, 'চন্দ্রকান্তবাবু-উ-উ! বাঁচান! বাঁচান!'

চন্দ্রকান্ত তড়াক করে উঠে বাইরে এলেন৷ আমিও বেরিয়ে গেলুম৷ দেখলুম, চন্দ্রকান্ত বারান্দায় একটা সুইচ টিপে দিলেন৷ বাঁ-দিকে বাগানের খানিকটা অংশে উজ্জ্বল আলো পড়ল৷ সেই আলোয় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেল৷

Cov48

গোয়েন্দা হালদারমশাইকে শূন্যে তুলে ধরেছে, হ্যাঁ, চন্দ্রকান্তের সেই বেঁটে রোবটটিই বটে, যার নাম 'ধুন্ধুমার'৷ যাই হোক, দুঃখও হল, রাগও হল, সকালে অমন কাণ্ডের পরেও দেখা যাচ্ছে হালদারমশাইয়ের শিক্ষা হয়নি৷ নাকগলানোর স্বভাব যাবে কোথায়?

চন্দ্রকান্ত হাঁক দিয়ে বললেন, 'ধুন্ধুমার! ট্রিও ট্রাও টাট৷'

নিশ্চয় রোবটের ভাষা৷ দেখলুম, বিদঘুটে যন্ত্রমানুষটি হালদারমশাইকে ঘাসে দাঁড় করিয়ে দিল৷ তারপর গটগট করে হেঁটে বাগানের অন্ধকার দিকটায় চলে গেল৷ হালদারমশাই সটান এসে বারান্দায় উঠলেন৷ মুখে যথারীতি কাঁচুমাচু হাসি, সকাল বেলাকার মতোই৷ চন্দ্রকান্ত ফ্ল্যাশলাইটের সুইচ অফ করে বললেন, 'তাহলে মি. হালদার, দেখলেন তো যেখানে-সেখানে নাকগলানোর বদভ্যাস না ছাড়লে কী দুর্গতি ঘটতে পারে? আমার বাড়িতে আপনার সব সময় অবারিত দ্বার৷ এভাবে লুকিয়ে আসার কোনো দরকার ছিল কি?'

হালদারমশাই হাসবার চেষ্টা করে বললেন, 'বুঝলেন না? প্রফেশনাল হ্যাবিট৷ তবে আমি আপনার ভালোর জন্যই ওত পাততে এসেছিলুম, সেদিকটাও আপনার ভেবে দেখা উচিত৷ উইদাউট ফি... একেবারে বিনি পয়সায়, মাইন্ড দ্যাট৷'

চন্দ্রকান্ত তেমনি গম্ভীর মুখে বললেন, 'ভেতরে আসুন৷'

ঘরে ঢুকে পা ছড়িয়ে বসে হালদারমশাই বললেন, 'জয়ন্তবাবু, কতক্ষণ?'

বললুম, 'এইমাত্র৷'

চন্দ্রকান্ত ভেতরে গেলেন৷ হালদারমশাই বললেন, 'কর্নেল স্যার এলে ভালো হত৷ কেন বলছি জানেন? সবুজ আলোর ব্যাপারটা, আমার মনে হচ্ছে, সকালের ব্যাপারটার মতো হোক্স নয়৷ আপনার কী ধারণা?'

'না, হোক্স নয়৷ কারণ চন্দ্রকান্তবাবু ধুন্ধুমারকে পাহারায় রেখেছেন৷'

'ধুন্ধুমার?' বলে হালদারমশাই ফিক করে হাসলেন, 'ওই ব্যাটাচ্ছেলে যন্তরমন্তরটা!'

'ওটা একটা রোবট, হালদারমশাই!'

'ওই হল আর কি!' হালদারমশাই হাত-পা ছুড়ে রক্ত চলাচলের ব্যায়াম শুরু করলেন৷ 'কী ঠান্ডা, আর কী শক্ত! বাপস! হাড় মটমটিয়ে দিয়েছে৷ পাজিটা! গুন্ডাটা! হত...'

চন্দ্রকান্তকে ঢুকতে দেখে থেমে গেলেন৷ চন্দ্রকান্তের হাতে ট্রে৷ এখন মুখে অমায়িক ভাব৷ ট্রে টেবিলে রেখে বললেন, 'হাত লাগান প্লিজ! জয়ন্তবাবু তো দেখেছেন, আমার কাজের লোক বলতে ওই ধুন্ধুমার৷ কিন্তু এখন সে পাহারা দিচ্ছে৷ আমি আবার এসব কাজে একেবারেই অকম্মা৷'

বড়ো প্লেটে পকৌড়া দেখে হালদারমশাই সুড়ুৎ করে জিভে জল টেনে বললেন, 'খাসা! গরম পকৌড়া জমবে ভালো৷' তারপর হাত বাড়িয়ে তুলে মুখে পুরলেন৷ চিবোনো দেখে বোঝা গেল, সত্যিই গরম৷

একটু অবাক হয়ে বললুম, 'আধ মিনিটের মধ্যে গরম পকৌড়া ভেজে ফেললেন চন্দ্রকান্তবাবু? আর বলছেন আপনি এসব কাজে অকম্মা?'

চন্দ্রকান্ত মিঠে হাসলেন, 'কম্পিউটারের কাজ৷ সিন্থেটিক পকৌড়া৷'

হালদারমশাই কান দিলেন না৷ সানন্দে চিবোতে থাকলেন৷ আমি ইতস্তত করে বললুম, 'সিন্থেটিক পকৌড়া৷ মানে সত্যিকার পকৌড়া নয়?'

'উঁহু৷'

'কী জিনিস দিয়ে তৈরি বলুন তো?'

'কয়েক রকম সিন্থেটিক ফাইবারের সঙ্গে ভিটামিন মিশিয়ে৷'

ঝটপট বললুম, 'বুঝেছি৷'

হালদারমশাই একা প্রায় পুরো প্লেট সাবাড় করলেন৷ ভয় হল, এবার পেটের কেলেঙ্কারিতে না পড়েন৷ কফিতে চুমুক দিতেও ভয় করছিল৷ কে জানে, সিন্থেটিক কফি কি না৷ জিজ্ঞেস করতে সাহস হল না৷ অবশ্য কফিটা কফির মতোই৷ চন্দ্রকান্ত ঘড়ি দেখে বললেন, 'কর্নেলের আসবার সময় হয়ে এল৷'

বললুম, 'কর্নেল আসবেন নাকি?'

'সাড়ে সাতটায় পৌঁছোনোর কথা৷'

হালদারমশাই খুশি হয়ে বললেন, 'সবুজ-আলোওয়ালা বদমাশগুলোর এ-রাতেই দফারফা হবে৷ কর্নেল স্যার তো আর আমি নন!'

কফি শেষ করে চন্দ্রকান্ত বেরিয়ে গেটের দিকে গেলেন৷ তখন হালদারমশাইকে বললুম, 'কম্পিউটারের ভিশন-স্ক্রিনে কোমল-কোরকের ছবি দেখলুম, জানেন?'

হালদারমশাই সোজা হয়ে বসে বললেন, 'কার কম্পিউটার? কোথায় দেখলেন?'

'চন্দ্রকান্তবাবুর ল্যাবরেটরিতে৷ ওঁকে বললে নিশ্চয় আবার দেখাবেন৷ অবাক হয়ে যাবেন হালদারমশাই! শুধু ডাটা, মানে অঙ্কের সাহায্যেই বলা যায়, দুই যমজ ভাইয়ের ছবি ফোটাতে পেরেছেন চন্দ্রকান্তবাবু! তার মানেটা কী, বুঝলেন? উনি হাহা-হুহু রহস্য ঘরে বসেই ফাঁস করে ফেলেছেন৷'

'বলেন কী,' খুবই অবাক হয়ে গেলেন গোয়েন্দা কে.কে. হালদার৷ মুখে কিছুক্ষণ কথা বেরোল না৷

বাইরে গাড়ির চাপা গরগর শব্দ শোনা যাচ্ছিল৷ শব্দটা বাড়তে বাড়তে খুব কাছাকাছি এসে থামল৷ একটু পরে চন্দ্রকান্তের 'ওয়েলকাম' শোনা গেল৷

কর্নেল ঘরে ঢুকে থমকে দাঁড়ালেন, 'আরে! হালদারমশাই যে!'

হালদারমশাই নস্যি নিয়ে হাঁচার ভঙ্গিতে বললেন, 'এসে গেছি আর কি!'

'আশা করি, সকালের মতো কোনো ঝামেলায় পড়েননি?'

হালদারমশাই ঝটপট স্বীকার করলেন, 'পড়েছিলুম৷'

'এবার ডনের বদলে দানোর পাল্লায়?'

'কী বললেন? দানো?' হালদারমশাই খিখি করে হেসে ফেললেন৷ 'ঠিক, ঠিক৷ দানোই বটে৷'

কর্নেল বসতে যাচ্ছিলেন, চন্দ্রকান্ত বললেন, 'আগে আমার রেজাল্টটা দেখুন৷ আমি প্লাস আপনি, দু-জনের ডাটা ফিড করিয়ে হাহা-হুহু দারুণ বেরিয়ে এসেছে৷ জয়ন্তবাবুকে দেখিয়েছি৷ উনি স্বীকার করেছেন, ওরা অমর ও সবিতার যমজ সন্তানই বটে৷ কী যেন নাম?'

হালদারমশাই বললেন, 'কোমল আর কোরক৷'

'আমার ব্রেন সব জিনিস নেয় না,' চন্দ্রকান্ত ল্যাবের দিকে যেতে যেতে বললেন, 'কম্পিউটার আছে সেজন্য৷ যাই হোক, স্বচক্ষে দেখুন, কী আশ্চর্য কীর্তি করে ফেলেছি!'

ল্যাবে ঢুকে কম্পিউটারের সামনে বসে চন্দ্রকান্ত আগের মতো বোতাম টেপাটিপি শুরু করলেন৷ স্ক্রিনে তেমনি হিজিবিজি রঙের রেস চলতে থাকল৷ তারপর ওলটপালট জিমন্যাস্টিকসের ভঙ্গিতে নাচতে নাচতে দুটো মূর্তি এসে গেল৷ কয়েক সেকেন্ড পরে মিলিয়েও গেল৷ হালদারমশাই বলে উঠলেন, 'ম্যাজিক! ম্যাজিক! ভাবা যায় না!'

চন্দ্রকান্ত কম্পিউটার বন্ধ করে বললেন, 'দেখলেন তো কর্নেল?'

কর্নেল বললেন, 'দেখলুম!'

চন্দ্রকান্ত আহ্লাদে গলায় বললেন, 'আহা! বলুন, কেমন হুবহু এসেছে৷'

'এসেছে, তবে...৷'

বিজ্ঞানী একটু অবাক হয়ে বললেন, 'তবে? তবে কী?'

কর্নেল হাসলেন, 'আপনার কৃতিত্ব অস্বীকার করছি না৷ স্ক্রিনে আমরা দু-জন বালকের ছবি ঠিকই দেখলুম৷ তাদের চেহারা একইরকম৷ তবে...'

চন্দ্রকান্ত এবার বিরক্ত হয়ে বললেন, 'কী মুশকিল! তবেটা কী?'

'চন্দ্রকান্তবাবু, আপনি কি কোমল-কোরককে দেখেছেন?'

'নাঃ,' চন্দ্রকান্ত জোরে মাথা দোলালেন, 'কিন্তু তাতে কী? জয়ন্তবাবু, হালদারমশাই! আপনারাও তো দেখলেন৷ জয়ন্তবাবু দু-বার দেখলেন৷ বলুন, ঠিক আসেনি?'

হালদারমশাই বললেন, 'আলবাত এসেছে৷ সেই দুষ্টু ছেলে দুটোই বটে৷'

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, 'মানুষের ঘিলু আর কম্পিউটারের ঘিলু এক হতে পারে না চন্দ্রকান্তবাবু! ভুলে যাবেন না, মানুষই কম্পিউটারকে চালায়৷ যাই হোক, জয়ন্ত আর হালদারমশাইকে বলি, মনের মাধুরী মেশানো বলে কী যেন একটা কথা আছে না৷ স্ক্রিনে আমরা দুটো একই চেহারার বালককে দেখেছি এবং দেখামাত্র তাদের ওপর শ্রীমান কোমল আর শ্রীমান কোরককে আরোপ করেছি৷ স্মৃতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য যতটা সময় দরকার, পাইনি৷ এক সেকেন্ডের দেখা ছবি৷ পুরো ব্যাপারটা সাইকোলজিক্যাল কারচুপি৷ না না চন্দ্রকান্তবাবু, তবু আপনার কৃতিত্ব অস্বীকার করছি না৷ নিছক ডাটা থেকে ছবি তৈরির ক্ষমতা খুব সোজা ব্যাপার নয়৷ আপনার এ কৃতিত্ব অসাধারণ৷ কনগ্রাচুলেশান!'

চন্দ্রকান্তবাবু এই প্রশস্তিতে খুব খুশি হলেন বলে মনে হল না৷ ড্রয়িং রুমে গিয়ে মিনমিনে গলায় বললেন, 'বসুন! আর একদফা কফি-পকৌড়া হোক৷'

আমার বিজ্ঞ বন্ধু চোখ নাচিয়ে বললেন, 'সিন্থেটিক কফিতে আপত্তি নেই৷ তবে সিন্থেটিক পকৌড়া চলবে না৷'

চন্দ্রকান্ত ভেতরে চলে গেলেন৷ মুখখানি ম্রিয়মাণ৷ হালদারমশাই মন্তব্য করলেন, 'টেরিফিক!'

'কী?'

'পকৌড়া৷'

'কতগুলো খেয়েছেন?'

হালদারমশাই সহাস্যে পেটে হাত বুলিয়ে বললেন, 'রাত্তিরে আর কিছু না খেলেও চলবে৷'

কর্নেল দাড়ি থেকে একটা রাতপোকা বের করে ছুড়ে ফেলে বললেন, 'চন্দ্রকান্তবাবুর কাছে সিন্থেটিক হজমি বড়ি চেয়ে নিতে ভুলবেন না, হালদারমশাই!'

আগের মতোই শিগগির কফি নিয়ে এলেন বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত৷ কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, 'সত্যি টেরিফিক!'

চন্দ্রকান্তকে অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল৷ ওঁকে খুশি করার জন্য বললুম, 'কর্নেল, জানেন? কোমল-কোরকের বাবা-মা চন্দ্রকান্তবাবুর কলিগ ছিলেন বাঙ্গালোরে?'

কর্নেল বললেন, 'জানি৷ উনি আমাকে সব বলেছেন৷'

হালদারমশাই বললেন, 'কী আশ্চর্য যোগাযোগ তাহলে!'

'হ্যাঁ, আশ্চর্য বলা যায়,' কর্নেল চুরুট ধরালেন এবং ধোঁয়ার সঙ্গে বললেন, 'বিকেলে সাহা পারমাণবিক পদার্থবিদ্যা গবেষণা সংস্থায় গিয়েছিলুম৷ কারণ সকালে চন্দ্রকান্তবাবু সবুজ আলোর কথাটা বলার পর থেকে মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরছিল৷'

চন্দ্রকান্ত ভুরু কুঁচকে বললেন, 'প্রশ্ন? কী প্রশ্ন বলুন তো?'

'অমর ও সবিতার সঙ্গে আমার শেষবার দেখা ওদের দুর্ঘটনার মৃত্যুর মাস তিনেক আগে৷ পরদিনই ব্রাজিলে চলে গেলুম৷ তা কথায় কথায় ওদের জিজ্ঞেস করেছিলুম, কী নিয়ে রিসার্চ করছে ওরা? বলল, কসমিক রে, মহাজাগতিক রশ্মি নিয়ে৷ অদৃশ্য অতি-সবুজ রশ্মিকে কীভাবে দৃশ্যমান করা যায় এবং করতে পারলে পার্থিব বস্তুতে তার কী প্রতিক্রিয়া ঘটে, এই ছিল ওদের গবেষণার বিষয়৷'

চন্দ্রকান্ত নড়ে বসলেন, 'তারপর, তারপর?'

'আজ বিকেলে সাহা গবেষণাসংস্থায় গিয়ে আমার পুরোনো বন্ধু ড. সতীশ চন্দ্রের সঙ্গে দেখা হল৷ সৌভাগ্যই বলব৷ তাঁর কাছে জানতে পারলুম, অমর ও সবিতা গবেষণায় সফল হয়েছিল৷ ব্যাপারটা দু-জনে ডেমনস্ট্রেট করেছিল ওখানে৷ কিন্তু রিসার্চ পেপার ওখানে তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাওয়া গেল না৷ ড. চন্দ্রের ধারণা, পেপার ওরা জমা দেয়নি৷ যথাসময়ে যদি দিত, তাহলে সেই পেপার গেল কোথায়? ওখান থেকে ছুটে গেলুম শেঠমশাইয়ের দরিয়াগঞ্জ ভবনে৷ অমর-সবিতার ঘরে তেমন কোনো কাগজপত্র নেই৷ শেঠমশাই একটা সূত্র দিলেন শুধু৷ ছেলে-বউমার সঙ্গে সব সময় একটা কালো রঙের ব্রিফকেস দেখতেন, হয় ছেলের হাতে, নয়তো বউমার হাতে, দুর্ঘটনার পর সেটা আর দেখতে পাননি৷'

হালদারমশাই হাঁসফাঁস করে বললেন, 'রহস্য! রহস্য! সাংঘাতিক রহস্য!'

চন্দ্রকান্ত নিজের বড়ো বড়ো চুল টানাটানি করছিলেন৷ মুখে উত্তেজনার ছাপ৷ বললেন, 'তাহলে তো সমস্যা!'

হালদারমশাই ঘন ঘন নস্যি নিচ্ছিলেন৷ আমি বললুম, 'কী চন্দ্রকান্তবাবু?'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'সমস্যা নয়? কেউ রিসার্চ পেপার থেকে সবুজ আলোর ফর্মুলা চুরি করুক, যন্ত্র তৈরি করুক তার সাহায্যে, যা খুশি করুক হতচ্ছাড়া, আমার পেছনে লেগেছে কেন?'

হালদারমশাই বললেন, 'নিশ্চয় আপনার চেনা কোনো সায়েন্টিস্ট-চোর?'

কর্নেল হাসলেন, 'সেটা অসম্ভব নয়৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'কিন্তু আমার এখানে কেন? সারা পৃথিবী পড়ে আছে৷ কসমিক সবুজ আলোর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষার জন্য আমার বাগানে কেন?'

এইসময় বাইরে মৃদু শিসের শব্দ শোনা গেল৷ অমনি চন্দ্রকান্ত লাফিয়ে উঠলেন৷ হালদারমশাই বললেন, 'ক্কী, ক্কী? ও ক্কীসের শব্দ?'

চন্দ্রকান্ত চাপা স্বরে বললেন, 'ধুন্ধুমার টের পেয়েছে কিছু৷ কর্নেল! জয়ন্তবাবু! আমার সঙ্গে আসুন৷ হালদারমশাইও আসতে পারেন, তবে সাবধান!'

আমাদের সেই ল্যাবের ভেতর নিয়ে গেলেন চন্দ্রকান্ত৷ একটা ড্রয়ার খুলে টর্চলাইটের গড়নের কী একটা যন্ত্র বের করলেন৷ তারপর অন্য দরজা সাবধানে খুলে বেরোলেন৷ আমরা ওঁকে অনুসরণ করলুম৷ আঁকাবাঁকা করিডরে মিটমিটে নীল আলো জ্বলছে৷ খানিক গিয়ে নিঃশব্দে দরজা খুললেন চন্দ্রকান্ত৷ বাইরে এদিকটায় ঘুরঘুট্টে অন্ধকার৷ পোকামাকড় ডাকছে৷ অন্ধকার বারান্দায় চার জনে দাঁড়িয়ে রইলুম৷ একটু তফাতে লাল-নীল-হলুদ আলোর ফুটকি জ্বলছে-নিভছে৷ নড়াচড়া করে বেড়াচ্ছে জন্তুর মতো কী একটা জিনিস৷ বুঝলুম, উনিই শ্রীমান ধুন্ধুমার৷ মাঝে মাঝে চাপা শিসের শব্দ৷ তারপর দূরে এয়ারপোর্ট থেকে একটা প্লেন উড়ল৷ কয়েক মিনিট ধরে তুমুল গরগর শব্দ হতে থাকল৷

তারপরই ডান দিকে খানিকটা দূরে দপ করে জ্বলে উঠল একটা উজ্জ্বল সবুজ আলো৷ ক্রিকেট বলের সাইজ৷ শূন্যে, মাটি থেকে অন্তত ফুট দশেক উঁচুতে স্থির হয়ে ভেসে রইল আলোটা৷ চন্দ্রকান্ত তাঁর যন্ত্রে বোতাম টিপলেন, খুট করে শব্দ হল৷ অমনি গোল আলোটা কড়া চিনির পাকের মতো আঠালো আর টানটান হয়ে এসে আটকে গেল চন্দ্রকান্তের যন্ত্রটার মাথায়৷ তারপর শুরু হল টাগ অব ওয়ার, টানাটানির খেলা৷ কিন্তু শেষপর্যন্ত চন্দ্রকান্ত হেরে গেলেন৷ আলোটা ছিটকে গিয়ে আগের মতো গোল হল এবং নিভে গেল৷ চন্দ্রকান্ত 'যাঃ' বলে দেওয়ালে সুইচ টিপে দিলেন৷ উজ্জ্বল সার্চলাইটের ছটায় দেখা গেল, ধুন্ধুমার বাবাজি কাত হয়ে ঝাউঝোপে পড়ে আছে৷ চন্দ্রকান্ত দৌড়ে গেলেন৷ আমরাও ছুটে গেলুম বেচারার কাছে৷

কে বা কারা রোবটটিকে অকেজো করে দিয়ে গেছে৷ চন্দ্রকান্ত ব্যস্তভাবে ওটার কলকবজা টেপাটিপি করেও জ্যান্ত করতে পারলেন না৷ ভাঙা গলায় বললেন, 'জয়ন্তবাবু, হালদারমশাই! প্লিজ একটু সাহায্য করুন৷ একে ল্যাবে ঢোকাতে হবে৷'

ধুন্ধুমারের ওজন আছে বোঝা গেল৷ ওকে তিন জনে ধরাধরি করে নিয়ে যাওয়ার সময় লক্ষ করলুম, কর্নেল টর্চ জ্বেলে বাগানের ভেতর হনহন করে এগিয়ে চলেছেন৷

ল্যাবে হাসপাতালের অপারেশন টেবিলের মতো একটা টেবিলে ধুন্ধুমারকে শোয়ানো হল৷ চন্দ্রকান্তর মুখ করুণ৷ ঘেমেছেনও প্রচুর৷ আশ্বিনের রাত্তিরে আজ গাছের পাতা নড়ে না, ভ্যাপসা গরম৷ কিন্তু ল্যাবের ভেতরটা এয়ারকন্ডিশনড৷ চন্দ্রকান্ত ধুপ করে একটা চেয়ারে বসে মাথার চুল আঁকড়ে ধরে বললেন, 'একচক্ষু হরিণের অবস্থা হল আমার৷ যেদিক থেকে হামলা হবে না ভেবেছিলুম, সেদিক থেকেই হল৷ জয়ন্তবাবু, আপনারা ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসুন৷ কী ক্ষতি হয়েছে, দেখে নিয়ে আমি যাচ্ছিখন৷'

সেই ঘরটাতে হালদারমশাই আর আমি গুম হয়ে বসে রইলুম কয়েক মিনিট৷ তারপর হালদারমশাই ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন, 'অবিশ্বাস্য! এমন ঘটনা কখনো ঘটতে দেখিনি! আলো কি দড়ি, বলুন তো জয়ন্তবাবু?'

বাইরে কর্নেলের সাড়া পাওয়া গেল৷ ঘরে ঢুকে বললেন, 'কী হালদারমশাই, কেমন বুঝছেন?'

হালদারমশাই মাথা চুলকে বললেন, 'এ আমার কম্ম নয়, কর্নেল স্যার! সেটাই তো বলছিলুম জয়ন্তবাবুকে৷ কে কবে দেখেছে আলো দড়ির বান্ডিলের মতো গুটিয়ে যায়, আবার লম্বা হয়... গুটিয়ে যায়, আবার লম্বা হয়... বাপস! যেন চিটেগুড়ের সঙ্গে পিঁপড়ের লড়াই৷'

একটু পরে চন্দ্রকান্ত এলেন৷ তেমনি ম্রিয়মাণ মুখ৷ চুল এলোমেলো৷ বললেন, 'ধুন্ধুমার নিজের বুদ্ধির দোষেই কাবু হয়েছিল৷ ব্যাপারটা হল, যার ওপর যে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তার বাইরে আগ বাড়িয়ে কিছু করতে গেলে যা হয়, ঠিক তাই৷ বুদ্ধু! গবেট! কেন তুই আলোটার লাইন বরাবর দাঁড়াতে গেলি?' আপনমনে বকবক করতে থাকলেন বিজ্ঞানী, 'যে-সে আলো নয়, রীতিমতো তেজস্ক্রিয় কণিকা৷ ঘিলুকে একেবারে বিগড়ে দিয়েছে৷'

হালদারমশাই চুপ করে শুনছিলেন৷ বললেন, 'পাগল-টাগল হয়ে গেছে বুঝি?'

'কিছু বলা যায় না,' চন্দ্রকান্ত শ্বাস ছেড়ে বললেন, 'দেখি, জ্ঞান ফিরলে কী করে৷'

'জ্ঞান ফিরলে?' হালদারমশাই অবাক, 'মানে, মূর্ছা গেছে?'

'হুঁ:!'

গোয়েন্দা আমার দিকে তাকালেন৷ মুখে অবিশ্বাসের ছাপ৷ 'কী কাণ্ড! যন্ত্র বিগড়ে যায় শুনেছি৷ মূর্ছা যাওয়ার কথা তো কখনো শুনিনি!'

হাসবার মতো অবস্থা নয়, চোখের সামনে যে অদ্ভুত ঘটনা দেখেছি৷ তবু হাসি পেল৷ আমাকে হাসতে দেখে চন্দ্রকান্ত চোখ কটমট করে বললেন, 'হাসবেন না৷ এ হাসির ব্যাপার নয়৷'

কর্নেল ছাইদানিতে চুরুট ঘষটে নিভিয়ে বললেন, 'হ্যাঁ, ব্যাপারটা সিরিয়াস৷ চন্দ্রকান্তবাবু, তাহলে এবার ওঠা যাক৷ আর জয়ন্ত, তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, ফিরে গিয়ে তোমার কাগজে জমকালো, একখানা খবর ঝাড়বে৷ হেডিং দেবে: 'সবুজ আলোর রহস্য' অথবা 'বিজ্ঞানীর বাগানে রহস্যময় সবুজ আলো'৷ তাই না?'

আমি কিছু বলার আগে চন্দ্রকান্ত জোরগলায় বললেন, 'না৷ সে খবর বেরোলে আমি কন্ট্রাডিক্ট করব৷ আমি চাই না এ-নিয়ে হইচই হোক৷ তাতে আমার উদ্দেশ্য পণ্ড হবে৷ আলোটাকে পাকড়াও করা যাবে না৷'

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, 'ঠিক তাই৷ জয়ন্ত, চেপে যাও৷'

বিমর্ষ বিজ্ঞানী চুপচাপ বসে রইলেন৷ আমরা বেরিয়ে এলুম৷ কর্নেল তাঁর লাল রঙের ল্যান্ডরোভার গাড়ির দরজা খুলে বললেন, 'হালদারমশাই বরং আমার গাড়িতে আসুন৷'

হালদারমশাই এতে খুশিই হলেন৷ আমিও খুশি হলুম৷ এত রাতে দক্ষিণ কলকাতায় ওঁকে পৌঁছে কাগজের অফিসে ফিরতে খুব দেরি হয়ে যেত৷ খিদিরপুর ডক এলাকার স্মাগলিং র্যাকেট নিয়ে একখানা চমকদার রিপোর্তাজ লেখা এখনও বাকি৷ কালকের কাগজেই ওটা বেরোনো দরকার...

রাত এগারোটায় সেই রিপোর্তাজ লিখে সবে উঠতে যাচ্ছি, আমার টেবিলে ফোন বাজল৷ সাড়া দিতেই কর্নেলের কন্ঠস্বর ভেসে এল, 'তোমার ফ্ল্যাটে রিং করেছিলুম৷ কেউ ধরল না৷ ভাবনা হল, কোনো ঝামেলায় পড়লে নাকি৷'

'নাঃ! নিরাপদে ফিরেছি৷ আপনারা?'

'আমরাও নিরাপদে ফিরেছি৷ তবে...'

'তবে?'

'লেকভিউ রোডে হালদারমশাইয়ের ফ্ল্যাটে গেছ কি কখনো?'

'গেছি৷ কেন বলুন তো?'

'ওঁর ফ্ল্যাটের কি-হোলে একটা চিরকুট গোঁজা ছিল৷ তাতে লেখা আছে: 'সাবধান৷ ইতি-হাহা-হুহু৷' তুমি বরং...'

চমকে উঠেছিলুম৷ তারপর হাসতে হাসতে বললুম, 'কো-কো-র কীর্তি!'

'জয়ন্ত, ওরা হালদারমশাইকে চেনে না৷ তা ছাড়া ওদের দাদু ওদের কোথাও একা একা বেরোতে দেন না কক্ষনো৷ তার চেয়ে বড়ো কথা, হালদারমশাইয়ের ফ্ল্যাটের ঠিকানাই-বা ওরা জানবে কী করে? তুমি বরং সকালে একবার এসো৷... আর শোনো!'

'বলুন৷'

'সবুজ আলোর খবরটা দৈনিক সত্যসেবকে ছাপানোর ব্যবস্থা করো৷ প্রথম পাতায় বক্স আইটেম করলে ভালো হয়৷ চোখে পড়ার মতো হওয়া চাই৷'

'চন্দ্রকান্তবাবু চটে যাবেন কিন্তু৷'

'উপায় নেই৷ সিচুয়েশান দ্রুত বদলে যাচ্ছে৷'

ফোন রাখার শব্দ হল৷ অন্তত এক মিনিট চুপচাপ বসে রইলুম৷ তারপর সবুজ আলোর খবর লিখতে শুরু করলুম৷ উত্তেজনা আর অস্বস্তিতে আমার হাত কাঁপছিল...

ইলিয়ট রোড এলাকায় কর্নেলের বাড়িতে যখন পৌঁছোলুম, তখন সকাল ন-টা৷ ঘুম ভাঙতে এমনিতে রোজ দেরি হয়৷ তাতে কালকের ওইসব গোলমেলে ঘটনা সারারাত জ্বালিয়ে মেরেছে৷ ঘুম এলেই উদ্ভুট্টে সব স্বপ্ন৷ ধুন্ধুমার রবীন্দ্রসংগীত গাইছে, গাছে গাছে ফলের মতো ফলেছে সবুজ আলো, শেঠবাড়ির অ্যালসেশিয়ানটা হাতির মতো প্রকাণ্ড হয়ে কামড়াতে আসছে, হালদারমশাই রকেটের মতো আকাশে উঠে যাচ্ছেন, চন্দ্রকান্ত লেসার-পিস্তল তুলে আমাকে শাসাচ্ছেন, 'কর্নেল, কর্নেল' বলে এত চ্যাঁচাচ্ছি, তবু শুনছেন না, খালি হাসছেন আর হাসছেন, তারপর চড়াৎ করে ওঁর টাক ফেটে রক্তারক্তি৷ বিচ্ছিরি একটা রাত্তির৷...

ষষ্ঠী দরজা খুলে দিয়ে ফিক করে হাসল৷ বললুম, 'কী ব্যাপার?'

সে চাপা গলায় বলল, 'হালদারবাবুর মাথায় কাকে ঠুকরে দিয়েছে৷ দেখুন গে না, ব্যান্ডেজ বেঁধে বসে রয়েছেন৷ রক্তারক্তি কাণ্ড!'

তাহলে আমার দুঃস্বপ্নের ধাক্কাটা হালদারমশাইয়ের ওপর দিয়েই গেছে! ওঁর অবশ্য টাক নেই৷ তবে কাকের ঠোঁট ধারালো বলেই জানি৷ ড্রয়িং রুম ফাঁকা৷ ষষ্ঠী ইশারায় ওপর দিকটা দেখাল৷ অর্থাৎ ছাদে আছে ওঁরা, শূন্যোদ্যানে৷

সেখানে গিয়ে দেখি, সত্যি হালদারমশাইয়ের কপালের ঊর্ধ্বপ্রান্তে একটুকরো ব্যান্ডেজ সাঁটা৷ কিন্তু বসে নেই, নির্ভীক দাঁড়িয়ে আছেন৷ চোখে সম্ভবত কর্নেলেরই বাইনোকুলার৷ লক্ষ্যস্থল উত্তরের সেই শেঠবাড়ি 'দরিয়াগঞ্জ ভবন'৷

কর্নেল হাঁটু মুড়ে বসে অষ্টাবক্রকে লোশন মাখাচ্ছেন৷ হালদারমশাইয়ের কাছে গিয়ে বললুম, 'কী হালদারমশাই? কাক আপনার ওপর খাপ্পা হল কেন?'

হালদারমশাই প্রচণ্ড চমকে তড়াক করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলেন৷ বাইনোকুলার নামিয়ে একটু হাসলেন, 'ও, আপনি!'

'বলছিলুম, হঠাৎ আপনার ওপর কাকার রাগের কারণ কী?'

হালদারমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, 'রং ইনফরমেশন৷ কাকা নয়, কো-কো৷'

কর্নেল লোশন মাখাতে মাখাতে বললেন, 'গুলতি, জয়ন্ত! ঠিক কালকের মতো৷ তবে আজ ওটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে৷'

বুঝতে পেরে বললুম, 'তাই বলুন! ষষ্ঠী বলল কাক৷ কাককে আমি কাকা বলি৷'

হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে পকেট থেকে কালকের মতো একটা ভাঁজকরা চিরকুট বের করলেন৷ 'এই দেখুন! বড়োলোক দাদুর আদর খেয়ে বাঁদর হয়ে গেছে ছেলে দুটো৷ আরও কী কাণ্ড করেছে জানেন? আমার ঠিকানা পর্যন্ত জোগাড় করে আমার ফ্ল্যাটের দরজার কি-হোলে এমনি একটা চিরকুট গুঁজে রেখে এসেছে গতকাল৷ কর্নেল স্যার স্বচক্ষে দেখে এসেছেন গত রাত্তিরে৷'

চিরকুটটা আমার হাতে গুঁজে দিলেন হালদারমশাই৷ তেমনি আঁকাবাঁকা হরফে লাল কালিতে একই কথা লেখা:'কো-২-কে চুরি করেছি৷ নাক গলাতে এলে টাক ফুটো করে দেব৷ ইতি-হাহা-হুহু'৷

পড়ে ফেরত দিয়ে বললুম, 'আপনার ফ্ল্যাটের চিরকুটটা দেখি?'

'কর্নেল স্যারের কাছে আছে৷'

কর্নেল বললেন, 'মিলিয়ে দেখে নিয়েছি৷ একহাতের লেখা নয়৷ অবশ্য, যে চিরকুটটা তুমি দেখলে, ওটা শ্রীমান কোরকের হাতের লেখা৷ গতকাল তুমিও শুনেছ জয়ন্ত, শ্রীমান কোরক লেখে, আর শ্রীমান কোমল গুলতি ছুড়ে সেটা যথাস্থানে পৌঁছে দেয়৷'

কর্নেল কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ালেন, 'সকাল থেকে চন্দ্রকান্তবাবু বার তিনেক ফোন করেছেন৷ ভীষণ খাপ্পা হয়ে গেছেন তোমার ওপর৷ বাড়ির সামনে ভিড় জমে গেছে৷ অসংখ্য রিপোর্টার গিয়ে জ্বালাচ্ছে৷ টিভির লোকেরা পর্যন্ত গিয়ে হাজির৷ ভিড় হটাতে পুলিশ ডাকতে হয়েছে৷ শেষে লাঠি চার্জ!' কর্নেল হাসতে হাসতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন৷

'হালদারমশাই, মুখোশপরা হাহা-হুহু-র দর্শন পেলেন বাইনোকুলারে?'

আমার প্রশ্নের জবাবে হালদারমশাই গলার ভেতর বললেন, 'নাঃ৷ মহাধড়িবাজ, বিচ্ছু৷ বাইনোকুলার দেখেই গা-ঢাকা দিয়েছে৷'

ড্রয়িং রুমে বসে কফি খেতে খেতে সিন্থেটিক পকৌড়ার কথা মনে পড়ল৷ কিন্তু হালদারমশাইয়ের চেহারায় তেমন কোনো গণ্ডগোল চোখে পড়ল না৷ পটাটো চিপস আর বাদাম চিবোতে চিবোতে বললেন, 'কর্নেল স্যার, আর দেরি করা উচিত নয়৷ সেনমশাইকে বলে এর একটা বিহিত করা দরকার৷'

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, 'ঠিক বলেছেন৷ এখনই বেরোব৷ তবে সেনমশাই নন উনি, শেঠমশাই৷'

কিছুক্ষণ পরে আমরা দরিয়াগঞ্জ ভবনের গেটে পৌঁছোলুম৷ গাড়িবারান্দার কাছে পালোয়ান গোবিন্দ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে ছিল৷ দৌড়ে এল৷ কর্নেলকে বলল, 'সাংঘাতিক কাণ্ড হয়েছে স্যার! কর্তামশাইকে জানাতে সাহস হচ্ছে না৷ কুকুরটাকে ছেলের মতো ভালোবাসেন৷ কোন মুখে গিয়ে বলি যে...'

বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, 'ডন মারা পড়েছে নাকি?'

'আজ্ঞে! ছোটোবাবুর ছবির ঘরে পড়ে আছে৷ দেখবেন, আসুন,' পালোয়ান কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল৷

আমরা ব্যস্তভাবে সেই হলঘরে গিয়ে ঢুকলুম৷ ডান দিকের একটা ঘরের দরজায় গিয়ে পর্দা তুলল গোবিন্দ৷ দেখলুম, ঘরভরতি নানা সাইজের ফ্রেমে আঁটা ক্যানভাসে, রং-বেরঙের চিত্রকলা ওলটপালট হয়ে পড়ে আছে৷ একধারে দাঁড় করানো ইজেলে একটা অসমাপ্ত কী ছবি৷ তার তলায় অ্যালসেশিয়ানটা পড়ে আছে৷ মুখে জমাট চাপ চাপ রক্ত৷ কর্নেল কুকুরটাকে পরীক্ষা করতে থাকলেন৷

গোবিন্দ চাপা গলায় বলল, 'আরও সাংঘাতিক কাণ্ড, এ-ঘরের দরজার তালা ভাঙা৷ পর্দার আড়ালে কী হয়েছে, কেমন করে বুঝব? ভোর বেলা থেকে ডনের সাড়াশব্দ নেই দেখে তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি৷ একটু আগে কী খেয়াল হল, ছোটোবাবুর ঘরে পর্দা তুলে দেখতে এলুম৷ দেখি, তালা ভাঙা৷ দরজা ভেজানো৷'

কর্নেল বললেন, 'হরবাবু কোথায়?'

'উনি কাল বিকেলের ট্রেনে দরিয়াগঞ্জ গেছেন৷ বলে গেছেন, ফিরতে দেরি হতে পারে৷'

'কোমল-কোরক কী করছে?'

'মাস্টারমশাই এসেছিলেন কিছুক্ষণ আগে৷ ওদের চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে গেলেন৷'

এইসময় হলঘরের ভেতরকার সিঁড়ির ওপর থেকে শেঠমশাইয়ের গলা শোনা গেল, 'গোবিন্দ! কী হয়েছে? কাদের সঙ্গে গুজুর-গুজুর কচ্ছিস হতচ্ছাড়া? মতলবটা কী, অ্যাঁ?'

গোবিন্দ বেরিয়ে বলল, 'কিছু না কর্তাবাবু! কর্নেলসায়েবরা এসেছেন!'

কাঠের সিঁড়িতে শব্দ হতে থাকল৷ গোবিন্দ ছবিঘরে ঢুকে ঝটপট কয়েকটা বড়ো ক্যানভাস চাপিয়ে ডনকে ঢেকে দিল৷ ইশারায় ডনের কথা বলতে বারণ করল আমাদের৷

কর্নেল বেরিয়ে গিয়ে বললেন, 'চলুন শেঠমশাই! আজ রোববারের দিনটা কোথাও আড্ডা না দিলে ভালো লাগে না৷ চলুন, ওপরে যাই৷'

কিন্তু শেঠমশাই সন্দিগ্ধভাবে নেমে এসে এঘরের পর্দা তুললেন৷ হালদারমশাই ও আমাকে দেখে ভুরু কুঁচকে তাকালেন একবার৷ তারপর ঘরের ভেতরটাতে চোখ বুলিয়ে হাঁক দিলেন, 'অ্যাই গোবিন্দ!'

গোবিন্দ উঁকি মেরে বলল, 'আজ্ঞে?'

'হর-র স্টুডিয়ো খুলল কে? আর মারদাঙ্গাই-বা করল কারা? হাহা-হুহু নিশ্চয়?'

'তাই মনে হচ্ছে কর্তাবাবু!'

'হর ফিরে এ-অবস্থা দেখলে কী কেলেঙ্কারি করবে বুঝতে পারছিস?'

'আজ্ঞে৷'

'স্টুডিয়োর চাবি কে দিল ওদের? নিশ্চয় তুই দিয়েছিস!' বলে শেঠমশাই তালাটার দিকে তাকালেন৷ তালাটা যে ভাঙা, সঙ্গেসঙ্গে তাও বুঝে ফেললেন৷ বেঁটে, নকশাদার লাঠিটা তুলে বললেন, 'এই হতভাগা! তালা ভাঙল কে? হাহা-হুহু-র অত ক্ষমতা নেই৷ বল, কে তালা ভাঙল?'

'আজ্ঞে...'

'তুই বড্ড বেয়াড়া হয়ে উঠেছিস গোবিন্দ! তোকে পইপই করে বলেছি, সবসময় চারদিকে নজর রাখবি,' বলে শেঠমশাই গোবিন্দের দিকে ঘুরলেন, 'ডন কোথায়? বেঁধে রেখেছিস নাকি? তোকে বলেছি না, ওকে সবসময় খুলে রাখবি? ডন খোলা থাকলে কখনো এমন কেলেঙ্কারি হত না৷ দেখ তো এবার, হর এসে সব দেখে কী বলবে! ও যা বদরাগী আর গোঁয়ার!'

কর্নেল বললেন, 'গোবিন্দ সব গুছিয়ে রাখছেখন৷ চলুন, আমরা আড্ডা দিই৷'

শেঠমশাই ওঁর কথায় কান দিলেন না৷ ছত্রভঙ্গ স্টুডিয়োতে ইতিউতি সন্দিগ্ধ দৃষ্টি৷ সোজা চলে গেলেন প্রকাণ্ড ইজেলের সামনে৷ ভুরু কুঁচকে অসমাপ্ত ছবিটা (কী ছবি আঁকা হবে কে জানে, খালি ধ্যাবড়া রং-বেরঙের ছাপ) দেখতে দেখতে নকশাদার লাঠির ডগায় একটা জায়গা খুঁচিয়ে দিলেন৷ 'ফের সেই জিনিসটা এঁকেছে হর? দেখছ কাণ্ডটা? মরণ-পাখা উঠেছে হতভাগার!'

কর্নেল কাছে গিয়ে বললেন, 'কী এঁকেছে, শেঠমশাই?'

'দেখতে পাচ্ছেন না?' শেঠমশাই লাঠির ডগা দিয়ে ঘষতে শুরু করলেন৷ ইজেলটা নড়তে থাকল৷ 'সেই অলক্ষুণে সবুজ বল! এত করেও ওর শিক্ষা হয়নি, আবার এঁকেছে!' লাঠির ঘষায় সবুজ বলটাকে মোছা গেল না দেখে নীচের টুল থেকে একটা কালো রঙের টিউব তুলে নিলেন৷ মুখটা খুলে টিউব টিপে একদলা কালো রং চাপিয়ে দিলেন৷

হালদারমশাই আমাকে চিমটি কাটলেন৷ কর্নেলের দিকে তাকিয়ে দেখি, মাছের চোখে দেখছেন ব্যাপারটা৷ ইজেলের ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া নানা রঙের ছোপের ভেতর একটা ক্রিকেটবলের মতো গোল সবুজ জিনিস আমার কেন চোখে পড়েনি, ভেবে অবাক হলুম৷

শেঠমশাই টিউবটা টুলে রাখলে কর্নেল বললেন, 'সবুজ বল কেন অলক্ষুণে শেঠমশাই?'

উনি গলার ভেতর বললেন, 'অমর আর বউমা একটা সবুজ বলের পাল্লায় পড়েছিল৷ তারপর ওরা অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ল৷ গোবিন্দকে জিজ্ঞেস করুন, সত্যি কি না!'

গোবিন্দ বলল, 'বড়োবাবু আর বউদিমণি রাত্তিরে ছাদে বসেছিলেন৷ খাওয়ার জন্য ওঁদের ডাকতে গিয়ে দেখি, একটা সবুজ রঙের এইটুখানি বল ওঁদের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে৷ আগুনের বল! যেই-না আমি গেছি, ভূতুড়ে বলটা হারিয়ে গেল৷ বড়োবাবু বারণ করলেন, কর্তাবাবুকে যেন কথাটা না বলি৷ ঠিক তার এক হপ্তা পরে অ্যাক্সিডেন্ট! তখন কর্তাবাবুকে কথাটা বলতেই হল৷ ছোটোবাবুকেও বললুম৷ বলুন না আপনারা, এমন সাংঘাতিক কথা এরপর চেপে রাখা যায়?'

হালদারমশাই আবার আমাকে চিমটি কাটলেন৷ শেঠমশাই উলটে পড়ে থাকা ছবিগুলো লাঠির ডগায় সিধে করতে ব্যস্ত হয়েছেন৷ একটা করে সিধে করছেন আর বিড়বিড় করে বলছেন, 'দেখছ, দেখছ পাগলের কীর্তি? খালি সবুজ বল এঁকেছে! আর যেন কিছু আঁকবার ছিল না!' তারপরই আবিষ্কার করে ফেললেন ডনের লেজ৷ এবার হন্তদন্ত হয়ে লাঠি ফেলে হাত লাগালেন৷ বড়ো বড়ো ফ্রেমে আঁটা ক্যানভাস দুমদাম করে ছুড়তে থাকলেন৷

কুকুরটার লাশ বেরিয়ে পড়ল৷ অমনি কাঠপুতুল হয়ে গেলেন শেঠমশাই৷ ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকল৷ চোখ দিয়ে জলের ধারা নামল৷

কর্নেল তাঁর হাত ধরে টানলেন, 'শেঠমশাই! আসুন, আমরা ওপরে যাই!'

শেঠমশাই অতিকষ্টে ভাঙা গলায় বললেন, 'আমি কিছু বুঝতে পারছি না, কিছু বুঝতে পারছি না! এ কী দেখছি! এ স্বপ্ন না সত্যি?'

কর্নেল তাঁকে টানতে টানতে সরিয়ে নিয়ে গেলেন৷ হলঘরে গিয়ে বললেন, 'ডনকে কেউ বা কারা বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলেছে, শেঠমশাই!'

বৃদ্ধ শেঠমশাই শিশুর মতো কান্নাকাটি করতে করতে ফের বললেন, 'কিচ্ছু বুঝতে পারছি না... আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!'

'প্লিজ, শান্ত হোন৷ ওপরে চলুন, সব বুঝিয়ে বলছি৷ আর গোবিন্দ, তুমি সদর দরজা বন্ধ করে দাও৷ এখানেই থাকো, যতক্ষণ না পুলিশ আসে৷ আমি থানায় ফোন করে পুলিশকে জানাচ্ছি৷' বলে কর্নেল শেঠমশাইকে ধরে কাঠের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন৷ হালদারমশাই আর আমি তাঁদের অনুসরণ করলুম৷

শেঠমশাইয়ের ঘরে পৌঁছে তাঁকে বিছানায় বসিয়ে দিলেন কর্নেল৷ তারপর পাশের টেবিলে রাখা টেলিফোনটা তুললেন৷ কিন্তু তুলেই নামিয়ে রাখলেন তখনই৷ আস্তে বললেন, 'ফোনটা ডেড৷ মনে হচ্ছে, লাইন কেটে দিয়েছে চোরেরা৷'

হালদারমশাই শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'সাংঘাতিক রহস্য!'

শেঠমশাই ভাঙা গলায় বললেন, 'চোরেরা লাইন কেটে দিয়েছে? কী চুরি করতে এসেছিল তারা? কী ছিল হর-র স্টুডিয়োতে? আমি তো কিচ্ছু বুঝতে পারছি না?'

কর্নেল উদবিগ্ন মুখে বললেন, 'নিশ্চয় কোনো মূল্যবান জিনিস ছিল৷ হরবাবু থাকলে কিছু বোঝা যেত৷ হালদারমশাই, আপনি শিগগির পার্ক স্ট্রিট থানায় একটু খবর দিন৷ আমার নাম করে ওঁদের বলুন, কয়েকজন কনস্টেবল নিয়ে কোনো অফিসার যেন এখনই আসেন৷ অন্তত চব্বিশ ঘণ্টার জন্য পুলিশ পাহারা দরকার৷ এক মিনিট! বরং আমি একটা চিঠি লিখেই দিই৷'

কর্নেলের চিঠি নিয়ে হালদারমশাই সবেগে বেরিয়ে গেলেন৷ শেঠমশাই হতাশ ভঙ্গিতে বললেন, 'কিছুতে কিছু হবে না৷ আমি বুঝতে পেরেছি, এ সেই অভিশাপের ফল৷ পঞ্চাশ বছর ধরে সেই অভিশাপের ফল ভুগে আসছি৷ অথচ গ্রাহ্য করিনি৷ ভাবতাম, কুসংস্কার! এবার স্পষ্ট বুঝতে পারছি, সত্যিই অভিশাপ বলে একটা ব্যাপার আছে৷'

কর্নেল তাঁর মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে বসে বললেন, 'কীসের অভিশাপ, শেঠমশাই?'

শেঠমশাই চোখ মুছে ধরা গলায় বললেন, 'সব কথা গুছিয়ে বলার মতো অবস্থা নয়৷ তবু বলছি৷ দরিয়াগঞ্জের নবাব পরিবারের কথা আপনাকে বলেছিলুম৷ আমার পূর্বপুরুষ নবাবি আমলে বংশপরম্পরা ওঁদের ব্যাঙ্কার ছিলেন৷'

'হ্যাঁ, সেসব কথা বলেছেন৷ কিন্তু কে অভিশাপ দিয়েছিল?'

'নবাব বংশের একজন লোক৷ তাঁর নাম ছিল বাচ্চু খান৷ শেষ বয়সে তিনি ফকির হয়ে যান৷ মাথায় জটা গজিয়েছিল সন্ন্যাসীদের মতো৷ কালো আলখাল্লা পরে থাকতেন৷ টোটো করে ঘুরে বেড়াতেন নানা জায়গায়৷ বছর পঞ্চাশ আগের কথা৷ তখন আমাদের দরিয়াগঞ্জ ব্যাঙ্কের অবস্থা ভালোই ছিল৷ একদিন বাচ্চু ফকির, ওই নামেই উনি পরিচিত ছিলেন, হঠাৎ আমার বাড়িতে এসে হাজির হলেন৷ সাধুফকির, তাতে নবাব বংশের লোক৷ খুব যত্ন-আত্তি করলুম৷ রাত্তিরটা থাকলেন৷ সকালে খাবার সময় একটা ভেলভেটের কৌটো চুপিচুপি আমাকে দিয়ে বললেন, জিনিসটা যেন আমি লুকিয়ে রাখি৷ উনি সময়মতো এসে ফেরত নেবেন৷' শ্বাস ফেলে শেঠমশাই বললেন, 'কোনো কথা জিজ্ঞেস করারও সুযোগ পেলুম না৷ কৌটোটা দিয়েই চলে গেলেন৷ ঘরে এসে খুলে দেখি, একটা প্রকাণ্ড সবুজ রঙের পান্না!'

কর্নেল চমকে উঠলেন, 'পান্না! সবুজ রঙের!' বলে প্রায় দাড়ি ছেঁড়ার তাল করলেন৷

'হ্যাঁ৷ মরকতও বলা হয় রত্নটাকে৷ ব্যাঙ্কে ধনী লোকেদের হিরে-জহরত বন্ধক নেওয়া হত৷ কাজেই চিনতে পারলুম৷ পরীক্ষা করে বুঝলুম, খাঁটি রত্ন৷ তখনকার দিনেই দাম অন্তত লাখ দুয়েকের কম নয়৷ কিন্তু একেবারে গোল সাইজ৷ বলের মতো৷'

'তারপর?'

'বাড়িতে রাখতে সাহস হল না৷ পার্ক স্ট্রিটে আমাদের ব্যাঙ্কের আয়রনচেস্টে রেখে এলুম৷ এর কয়েক মাস পরে এক বৃষ্টির দিনে সকাল বেলায় বাচ্চু ফকির আবার এলেন৷ বললেন, জিনিসটা ফেরত নিতে এসেছেন৷ ওঁকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাঙ্কে গেলুম৷ তারপর আয়রনচেস্ট খুলে দেখি, সব আছে-শুধু সেই ভেলভেটের কৌটোটাই নেই!'

'সে কী!'

শেঠমশাই দুটো বালিশ টেনে হেলান দিয়ে গলার ভেতর বললেন, 'থানা-পুলিশ করেও কোনো কিনারা হল না৷ আয়রনচেস্টের চাবি থাকত আমারই কাছে৷ বাচ্চু ফকির ছিলেন পাগলাটে প্রকৃতির মানুষ৷ কিছুতেই ওঁকে বোঝাতে পারলুম না, আমি সবুজ পান্নাটা চুরি করিনি৷ উনি যাবার সময় অভিশাপ দিয়ে গেলেন, তোর সর্বনাশ হবে৷ হলও তাই, এখন বুঝতে পারছি সব৷ পরের বছর ব্যাঙ্ক লিকুইডেশনে গেল৷ মামলায় মামলায় প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেলুম৷ তারপর একটার পর একটা উটকো বিপদ! আমার স্ত্রী দরিয়াগঞ্জ বেড়াতে গিয়ে পদ্মায় স্নান করতে নেমেছেন৷ আমি পাড়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ হঠাৎ ডুবে গেলেন৷ বডিটাও খুঁজে পাওয়া গেল না৷ এইভাবে একের পর এক...৷' চাপা শ্বাস ফেলে চুপ করলেন শেঠমশাই৷

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, 'অমরবাবু এই পান্না-চুরির কথা জানতেন?'

'অমর তখন ছোট্ট৷ হর-র জন্মই হয়নি৷ তবে বড়ো হয়ে আমার মুখে শুনেছিল৷ ঘটনাটা তো অদ্ভুত৷'

'বাচ্চু ফকির নিশ্চয় এতদিন বেঁচে নেই?'

'জানি না৷ তবে বেঁচে না থাকাই সম্ভব৷ বেঁচে থাকলে এখন বয়স নব্বইয়ের কম নয়৷ আর তাঁর সঙ্গে দেখা হয়নি৷ তাঁর খোঁজে পরে বহুবার দরিয়াগঞ্জ গেছি৷ সব কথা বুঝিয়ে বলে ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা ছিল৷ কিন্তু খোঁজ পাইনি৷'

কর্নেল একটু চুপ করে থাকার পর বললেন, 'হরবাবু দরিয়াগঞ্জ গেলেন কেন?'

'মাঝে মাঝে যায়৷ ওর খেয়াল৷ বলে, ছবি আঁকতে যাচ্ছে৷ অবশ্য কিছু জমিজমা এখনও আছে ওখানে৷ হোসেন নামে একটা লোক আছে৷ সে-ই চাষবাস করে৷ আমার পৈতৃক বাড়িটাও দেখাশোনা করে৷ খুব বিশ্বাসী লোক৷'

আমি বললুম, 'কর্নেল, আমার ধারণা, হরবাবুর সবুজ বল আঁকার সঙ্গে বাচ্চু ফকিরের হারানো সেই সবুজ পান্নার কী যেন একটা সম্পর্ক আছে৷'

'কী সম্পর্ক?' শেঠমশাই সোজা হয়ে বসলেন আমার কথা শুনে৷

বললুম, 'সাইকোলিজক্যাল ব্যাপার আর কি! হারানো পান্নাটা ওঁর মনের ভেতর একটা গণ্ডগোল সৃষ্টি করেছে!'

শেঠমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, 'কী বলেন মাথামুণ্ডু নেই!'

কর্নেল হাসলেন, 'জয়ন্ত, ইদানীং তুমি বুঝি কোনো সায়েবের মনস্তত্ত্বের বই পড়তে শুরু করেছ?'

বললুম, 'এরিকসনের চাইল্ডহুড অ্যান্ড সোসাইটি বইটা পড়ছি৷ পড়ছি বলেই বুঝতে পারছি, এটা একটা অবসেশনঘটিত ব্যাপার৷ হরবাবুর মনে তাঁর বাবার ব্যাঙ্ক থেকে পান্নাচুরির ঘটনাটা একটা জোর ধাক্কা দিয়ে থাকবে৷ বাবা যে-জিনিসটা ফেরত দিতে পারেননি, একটা পাপবোধে ভুগছেন যা নিয়ে, ছেলে বাবাকে সেই পাপবোধ থেকে মুক্তি দেবার আকাঙ্খাতেই ছবিতে বড়ো করে সবুজ পান্না আঁকেন৷ অবদমিত ইচ্ছার প্রকাশ৷'

শেঠমশাই অবিকল হালদারমশাইয়ের ভঙ্গিতে বললেন, 'হিং টিং ছট! মাথামুণ্ডু নেই৷'

কর্নেল চোখের ইশারায় আমাকে চুপ করতে বললেন৷ তারপর বললেন, 'শেঠমশাই, গোবিন্দ একরাত্রে ছাদে একটা সবুজ আলোর বল দেখেছিল৷ আপনি কখনো দেখেছিলেন কি?'

জোরে মাথা নেড়ে শেঠমশাই বললেন, 'নাঃ! কথাটা গোবিন্দের কাছেই শুনেছিলুম৷'

কর্নেল দাড়িতে অভ্যাসমতো আঙুলের চিরুনি টানলেন কিছুক্ষণ৷ শেঠমশাই বালিশে হেলান দিয়ে চোখ বুজে রইলেন৷ তারপর কর্নেল বললেন, 'আচ্ছা শেঠমশাই, অ্যালসেশিয়ানটা কি আপনিই পুষেছিলেন?'

শেঠমশাই চোখ না খুলে বললেন, 'আমি না, অমর৷ বাঙ্গালোর থেকে বদলি হয়ে আসার সময় ডনকে সঙ্গে এনেছিল৷ কুকুর-টুকুর আমার বরাবর অপছন্দ ছিল৷ কিন্তু ক্রমশ কুকুর সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে দিয়েছিল ডন৷ খুব ন্যাওটা হয়ে উঠেছিল দিনে দিনে৷ অমরের মৃত্যুর পর থেকে ডন আমার কাছে অমরের স্মৃতির প্রতীক৷ ব্যাপারটা আশা করি বুঝতে পারছেন?'

'পারছি,' কর্নেল বললেন, 'কিন্তু হরবাবুর সঙ্গে ডনের কেমন সম্পর্ক ছিল?'

শেঠমশাই বিরক্ত হয়ে চোখ খুললেন, 'অদ্ভুত প্রশ্ন হল না? বাড়িতে অমন একটা কুকুর থাকলে বাড়ির সকলের সঙ্গেই তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে৷ হরও ওকে ভালোবাসত৷'

এতক্ষণে হালদারমশাই এলেন হন্তদন্ত হয়ে৷ বললেন, 'ওঁরা এসে গেছেন৷'

নীচের হলঘরে একজন পুলিশ অফিসার আর রীতিমতো একটা পুলিশবাহিনী এসে হাজির৷ পুলিশ অফিসার কর্নেলের পরিচিত৷ কর্নেলকে নমস্কার করে মুচকি হেসে বললেন, 'মানুষ-খুন নিয়ে আপনার মাথা ঘামানোর কথা শুনেছি৷ কিন্তু কুকুর-খুন নিয়েও যে আপনি মাথা ঘামান, জানতুম না কর্নেল!'

কর্নেলের সঙ্গগুণে পুলিশি তদন্তের রীতিনীতি আমার জানা৷ এক ফাঁকে হালদারমশাইকে ডেকে নিয়ে বাইরে গেলুম৷ বাড়ির পুবদিকটায় পুরোনো বাগিচা জঙ্গল হয়ে আছে৷ সেখানে একটা ঝাঁকড়া অমলতাস গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে বললুম, 'কী হালদারমশাই! কী থিয়োরি দাঁড় করালেন, বলুন?'

হালদারমশাই নাকে নস্যি গুঁজে বললেন, 'প্রচুর রহস্য!'

'হুঁ, রহস্য প্রচুর তো বটেই৷ কিন্তু আপনি কিছু সূত্র খুঁজে পেলেন?'

'হুঁউ, পেয়েছি বই কী,' হালদারমশাই চাপাস্বরে বললেন৷ 'ওই সায়েন্টিস্ট ভদ্রলোকের সঙ্গে এই কুকুর-মারা কেসের সম্পর্ক আছে৷'

'কেন বলুন তো?'

'সবুজ আলোর বল! তা ছাড়া উনিও সায়েন্টিস্ট, এ-বাড়ির তিনিও সায়েন্টিস্ট৷ অবশ্য উনি প্রেজেন্ট, তিনি পাস্ট৷ আমার ভয় হচ্ছে, চন্দ্রকান্তবাবুও না পাস্ট হয়ে যান৷'

'পাস্ট! তার মানে?'

'ধাক্কা! রামধাক্কা এবং পাস্ট টেন্সে পরিণত হওয়া আর কি!'

'বুঝলুম না!'

হালদারমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, 'ধুর মশাই! অ্যাক্সিডেন্টের কথা বলছি৷ আপনার চন্দ্রকান্তবাবুও পেছন থেকে কখন আচমকা না ধাক্কা খান! ওঁকে সাবধান করে দেওয়া দরকার৷'

কথাটা আমার মনে ধরল৷ বললুম, 'ঠিক বলেছেন৷ আর আপনি যে প্রচুর রহস্য বললেন, সেই ব্যাপারে আরও কিছু তথ্য কিছুক্ষণ আগে শেঠমশাইয়ের কাছে পাওয়া গেছে৷ আপনাকে বলা উচিত৷'

আসলে বাচ্চু ফকিরের পান্না চুরি যাওয়ার ঘটনাটা শুনে তখন থেকে আমি মনে মনে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলুম৷ আগাগোড়া হালদারমশাইকে না জানিয়ে পারলুম না৷ গভীর মনোযোগে শুনতে শুনতে সেই মাদাগাস্কারের দাইদিয়েরিয়া গাছটার মতো সিধে ও লম্বাটে হালদারমশাইয়ের শরীর অষ্টাবক্র ক্যাকটাসটার মতো বেঁকে আমার দিকে ঝুঁকে পড়েছিল৷ কথা শেষ হতেই সটান ছিলে-ছিঁড়ে-যাওয়া ধনুকের মতো খাড়া হল৷ তারপর দেখলুম, উনি দ্রুত আমার কাছ থেকে সরে যাচ্ছেন৷ সরতে সরতে একেবারে গেটের কাছে গেছেন, তখন মুখে কথা বেরোল৷ ডাকলুম, 'হালদারমশাই! হালদারমশাই! কোথায় যাচ্ছেন?'

হালদারমশাই বক্রগতিতে পুলিশভ্যানের পাশ কাটিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটাকে পেরিয়ে গলিরাস্তায় জমে-ওঠা কৌতূহলী জনতার ভিড় ভেদ করে নিপাত্তা হয়ে গেলেন৷ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম৷

কথাটা বলে ঠিক করেছি কি না বুঝতে পারছিলুম না৷ কর্নেল কী বলবেন কে জানে! উদবিগ্ন হয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ভাবতে থাকলুম, হালদারমশাই এমন করে কোথায় গেলেন? সেই সময় হঠাৎ দৃষ্টি গেল বাড়িটার ভিতের কাছে একটা ঝোপের দিকে৷ ঝোপের ভেতর উজ্জ্বল রোদ্দুর পড়েছে চকরা-বকরা হয়ে৷ সেখানে কী একটা জিনিস ঝিকমিক করছে৷ কাছে গিয়ে দেখি একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ৷ এমন ছোট্ট ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ কখনো দেখিনি৷ নিডলটাও খুব মিহি, এতটুকু৷ হেঁট হয়ে কুড়োতে যাচ্ছি, কর্নেলের গলা শুনে থমকে দাঁড়ালুম৷ সামনে একটু ওপরে একটা জানলায় কর্নেলের সান্তাক্লজ মুখ৷ 'ওখানে কী করছ জয়ন্ত?'

'একটা ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ, কর্নেল!'

'ছুঁয়ো না৷ আমি যাচ্ছি৷'

একটু পরেই কর্নেল এবং সেই পুলিশ অফিসার এসে গেলেন৷ কর্নেল বললেন, 'সিরিঞ্জটা রুমালে জড়িয়ে নিন, মি. অধিকারী৷ সাবধান, ওতে আপনার আঙুলের ছাপ যেন না পড়ে৷ ওটা ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাতে হবে৷'

পুলিশ অফিসার হাসলেন, 'ওক্কে! তবে আমার মনে হয় না, এতে কারও আঙুলের ছাপ পাওয়া যাবে৷ হাতে গ্লাভস পরা ছিল নিশ্চয়৷ কুকুরকে ইঞ্জেকশন দিতে গেলে কামড় খাওয়ার ভয় আছে না?'

কর্নেল, অন্যমনস্কভাবে বললেন, 'তবু পরীক্ষা করে দেখা দরকার৷ তা ছাড়া ওতে কী বিষ ছিল, সেটাও জানা যাবে৷'

পুলিশ অফিসার মি. অধিকারী সিরিঞ্জটা রুমালে জড়িয়ে হস্তগত করলেন৷ তারপর বললেন, 'আপাতত আমাদের কাজ শেষ৷ মর্গের রিপোর্ট যাতে তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়, সে-চেষ্টাও করব৷ তবে আমার ধারণা, এটা স্রেফ ছবি চুরির কেস৷ আজকাল পেন্টিংয়ের কদর বেড়েছে৷ বেচলে খদ্দেরের অভাব হয় না৷ যা বিশ-পঞ্চাশ টাকা পাওয়া যায়, তাই চোরের লাভ৷'

পুলিশ অফিসার চলে গেলে কর্নেল জিজ্ঞেস করলেন, 'হালদারমশাই কোথায়, জয়ন্ত?'

বললুম, 'হঠাৎ চলে গেলেন একটু আগে৷'

কর্নেল আমার দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন, 'পান্না-চুরির ব্যাপারটা ওঁকে বলেছ?'

'মানে... মুখ ফসকে বলে ফেলেছি৷'

'সঙ্গেসঙ্গে উনি অভিযানে বেরিয়ে গেছেন!'

'কে জানে কোথায় গেলেন,' বিব্রতভাবে বললুম, 'বলা উচিত হয়নি, তাই না?'

কর্নেল হেসে ফেললেন, 'তুমিও হালদারমশাইয়ের চেয়ে কম যাও না, বরাবর লক্ষ করে আসছি৷ যাই হোক, আবার ভদ্রলোক কী বিপদে পড়বেন কে জানে! এসো, আর এখানে থেকে লাভ নেই৷ বাড়ি ফিরে চন্দ্রকান্তবাবুকে রিং করতে হবে৷'

অ্যাম্বুলেন্সে কুকুরের মড়াটা এতক্ষণে ঢোকানো হচ্ছে৷ গাড়িবারান্দায় দু-জন পুলিশ কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে৷ গোবিন্দকে দেখতে পেলুম না৷ মি. অধিকারী শেঠমশাইকে আশ্বাস দিচ্ছেন৷ কর্নেল শেঠমশাইয়ের উদ্দেশে হাত নেড়ে বললেন, 'চলি শেঠমশাই! পরে আসবখন৷' শেঠমশাই কোনো কথা বললেন না৷ মনে হল, একটা পাথরের মূর্তি, নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে৷ হাতের সেই নকশাদার মোটা ছড়ি বা লাঠিটাও যেন পাথরে গড়া৷

গলিরাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কর্নেলকে জিজ্ঞেস করলুম, 'হরবাবুর স্টুডিয়োতে কিছু সূত্র-টুত্র মিলল?'

আনমনে কর্নেল বললেন, 'কীসের?'

'চোর ও-ঘরে কেন ঢুকেছিল? খুঁজছিলই-বা কী?'

'বোঝা যাচ্ছে না৷ হরবাবু থাকলে বোঝা যেত, কিছু চুরি গেছে কি না৷'

'একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না৷ চোর হলঘরে ঢুকল কেমন করে? দরজা বন্ধ থাকার কথা৷'

'মাস্টারমশাই, মানে, তপোব্রতবাবু কোমল-কোরককে চিড়িয়াখানা দেখাতে নিয়ে গেছেন,' কর্নেল অন্যমনস্কভাবে বললেন, 'গোবিন্দ নীচে এসে দরজা বন্ধ করতে দেরি করেছিল বলল৷ সেই ফাঁকে চোর বা চোরেরা ঢুকে কোনো একটা ঘরে লুকিয়ে থাকতে পারে৷ নীচের সবগুলো ঘরে তো তালা দেওয়া থাকে না৷ কাল যেভাবে একটা ঘরে হালদারমশাই ঢুকে পড়েছিলেন, সেইভাবে কেউ বা কারা ভেতরে ঢুকে থাকবে৷'

'কিন্তু ডন ছিল! হালদারমশাই ডনের পাল্লায় পড়েছিলেন৷ কিন্তু চোরকে ডন স্টুডিয়োর তালা ভাঙবার সুযোগ দিল কেন? তার আগেই সে চোরকে জব্দ করল না কেন?'

কর্নেল আমার কথায় সায় দিয়ে বললেন, 'ঠিক ধরেছ৷ সেটাই ভেবে পাচ্ছি না৷'

'আমার খুব সন্দেহ ওই হোঁতকামতো লোকটাকে৷'

'গোবিন্দের কথা বলতে চাও তো?'

'ঠিক ধরেছেন৷ গোবিন্দকে আমার ভালো লোক বলে মনে হয় না৷'

'কেন?'

'পালোয়ান গুন্ডার মতো চেহারা, কেমন যেন হাবভাব৷ ঠিক বোঝাতে পারছি না!'

কর্নেল হাসলেন, 'গোবিন্দ শেঠবাড়িতে ছেলেবেলা থেকে আছে, ডার্লিং! দরিয়াগঞ্জ থেকে শেঠমশাইয়ের বাবা ওকে কলকাতায় এনেছিলেন৷ গোবিন্দ একসময় এ-পাড়ায় কুস্তির আখড়া গড়েছিল৷ সবাই ওকে চেনে৷ আমিও বরাবর চিনি৷ তার কোনো বদনাম এ-পর্যন্ত কানে আসেনি৷'

কর্নেলের তিন-তলার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছোলুম, তখন বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে৷ ষষ্ঠী জানাল, 'ফোং-এর জ্বালায় অস্থির৷ খালি বলে, চন্দরকান্তবাবুকে ফোং করতে বলবে৷'

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, 'জয়ন্ত আজ তো রোববার৷ তোমার অফ-ডে না?'

'হ্যাঁ৷ স্পেশাল রিপোর্টার হয়ে এই সুবিধেটি আদায় করেছি৷ এতকাল শুক্কুরবার অফ-ডে বরাদ্দ ছিল৷ কিন্তু আপনার হাসির কারণ কী?'

'এ বেলা তোমার লাঞ্চের নেমন্তন্ন৷ শুধু একটাই শর্ত৷'

'শর্তে লাঞ্চের নেমন্তন্নে আমার আপত্তি থাকা উচিত নয়৷ কিন্তু শর্তটা জানা দরকার৷'

'তুমি চন্দ্রকান্তবাবুর সঙ্গে ফোনে বাক্যালাপ করবে৷'

লাফিয়ে উঠলুম, 'অসম্ভব৷ আপনিই বলেছেন, ভদ্রলোক আমার ওপর রেগে আগুন হয়ে আছেন৷ ফোনের ভেতর দিয়ে লেসার-অস্ত্র চালিয়ে আমাকে খতম করে ফেলবেন, ওঁর অসাধ্য কিছু নেই৷'

ঠিক এইসময় দরজার ঘণ্টা বাজল৷ ষষ্ঠী গিয়ে দরজা খুলল এবং তার পাশ কাটিয়ে বেঁটে ডাগরডোগর কেউ ফুটবলের মতো এসে দমাস করে আমাদের সামনে পড়লেন৷

স্বয়ং বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত!

আমি আঁতকে উঠে সোফার কোনায় সেঁটে গেলুম৷ কিন্তু চন্দ্রকান্তের মুখে জ্বলজ্বলে উল্লাস৷ প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'কর্নেল! প্রবলেম সলভড! কেল্লা ফতে!' তারপর আমার পাশে এসে ধপাস করে বসে খপ করে একটা হাত ধরে বললেন, 'জয়ন্তবাবু! আপনাকে অসংখ্য অসংখ্য ধন্যবাদ!'

কর্নেল বললেন, 'ব্যাপার কী চন্দ্রকান্তবাবু?'

বিজ্ঞানী খিক খিক করে হেসে বললেন, 'ভাগ্যিস খবরটা জয়ন্তবাবু দৈনিক সত্যসেবকে ছেপে দিয়েছিলেন৷ সাহা ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার ফিজিক্স থেকে স্বয়ং ড. সতীশ চন্দ্র আমার বাড়িতে হাজির৷ সঙ্গে ওঁর পুরো টিম৷ বাঘা বাঘা এক্সপার্ট সব সায়েন্টিস্ট৷ কই, কফি বলুন!'

কর্নেল ষষ্ঠীকে ডেকে কফির কথা বললেন৷ তারপর চন্দ্রকান্তকে বললেন, 'হুঁ, বলুন!'

চন্দ্রকান্ত চোখে ঝিলিক তুলে বললেন, 'কনগ্রাচুলেশনের ঠেলায় অস্থির৷ সবুজ আলোটাকে হিমায়িত মিথেনে বন্দি করার জন্য যে লেসার-যন্ত্রটা তৈরি করেছি, সেটা দেখে তো ওঁদের চক্ষু চড়কগাছ৷ এ পর্যন্ত কোনো সায়েন্টিস্ট এতে সফল হননি, আমি হয়েছি৷'

'বুঝলুম৷ কিন্তু কী প্রবলেম সলভড হল, বলুন৷'

চন্দ্রকান্ত চাপা স্বরে বললেন, 'ওই সবুজ আলোটা, বুঝলেন? ওটা অমর আর তার স্ত্রীর উদ্ভাবিত ফর্মুলা থেকে তৈরি৷ ফর্মুলাটা চুরি করে কেউ সবুজ আলোর বল সৃষ্টি করছে আর আমার বাড়ির আনাচে-কানাচে রাতবিরেতে এসে হানা দিচ্ছে৷ কেমন তো? এখন প্রশ্ন হল, আমার ওখানে কেন? ড. চন্দ্র একটা থিয়োরি দিলেন৷ আমার ল্যাবে এমন কিছু মেটিরিয়াল আছে, যার ওপর সবুজ আলোর ওই বলের প্রতিক্রিয়া ঘটবে৷ ঘটলে কী হবে-না, সেই জিনিসটা মূল্যবান কোনো রত্নে পরিণত হবে৷ লক্ষ-লক্ষ টাকা দামের রত্ন৷'

আমি চমকে উঠে বললুম, 'পান্না?'

'হুঁ, পান্না হতেও পারে,' চন্দ্রকান্ত সায় দিলেন, 'পান্নার রং সবুজ৷ আপনি ঠিক ধরেছেন৷'

কর্নেল আমার দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বললেন, 'জয়ন্ত সাবধান! এ খবর ছেপে চন্দ্রকান্তবাবুর বিপদ বাড়িয়ো না৷'

বুঝতে পারলুম, পান্নার কথাটা বলা ঠিক হয়নি৷ শুকনো হেসে বললুম, 'না, না৷ চন্দ্রকান্তবাবুর কাছে অনুমতি না নিয়ে আর কোনো খবর আমি ছাপব না৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ছাপলেই-বা কী? ধুন্ধুমার আবার ফর্মে এসে গেছে৷ তার হেলমেটে এবার একটা লেসারচালিত রিঅ্যাকটর বসিয়ে দিয়েছি৷ সবুজ আলোর লাইনে দাঁড়ালে আর ওর কোনো ক্ষতি হবে না৷ আলোটা পিছলে যাবে, বুঝলেন তো? যেই আসবে, অমনি সড়াৎ করে পিছলে যাবে৷' খিক খিক করে হাসতে থাকলেন বিজ্ঞানী৷

'বুঝলুম,' কর্নেল বললেন, 'কিন্তু আপনার ল্যাবে কী এমন জিনিস আছে, সবুজ আলোটার প্রতিক্রিয়ায় যা দামি রত্নে পরিণত হবে?'

বিজ্ঞানী বড়ো বড়ো চুলে হাত বুলিয়ে বললেন, 'সেটাই খুঁজে পাচ্ছি না৷ ড. চন্দ্র এবং তাঁর দলবল ল্যাবে ঢুকে খুব খোঁজাখুঁজি করলেন৷ ওঁরাও বুঝতে পারলেন না৷ তবে আমিও চন্দ্রকান্ত চৌধুরী, সহজে হাল ছাড়িনি৷ ঠিকই খুঁজে বের করব দেখবেন৷'

ষষ্ঠী কফি আনল৷ কফি খেতে খেতে চন্দ্রকান্ত আবার কিছু বলতে যাচ্ছেন, ওঁর বুকের কাছে হঠাৎ চাপা পিঁপিঁ আওয়াজ হল৷ সঙ্গে সঙ্গে কফি রেখে বুকপকেট থেকে একটা সিগারেট-লাইটারের মতো জিনিস বের করলেন৷ দেখে নিয়ে বললেন, 'ধুন্ধুমার সন্দেহজনক কিছু দেখেছে৷ সিগন্যাল দিচ্ছে৷ আমার বরাত! সিন্থেটিক কফি খেয়ে মুখ তেতো হয়ে গেছে৷ ভাবলুম, আরাম করে কর্নেলের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে বিশুদ্ধ ন্যাচারাল কফি খাব, হল না৷' বলেই উঠে পড়লেন এবং কিক-খাওয়া ফুটবলের মতো বাঁই করে বেরিয়ে গেলেন৷ দরজার পর্দাটা দুলতে থাকল৷

কর্নেল উঠে গিয়ে দরজা বন্ধ করলেন৷ ফিরে এসে বললেন, 'কী বুঝলে, ডার্লিং?'

হালদারমশাইয়ের ভঙ্গিতে বললুম, 'প্রচুর রহস্য৷'

'হ্যাঁ, রহস্য তো প্রচুর৷ কিন্তু তোমার কী মনে হচ্ছে?'

একটু ভেবে নিয়ে বললুম, 'বাবাকে পাপবোধ থেকে মুক্তি দেওয়ার তাগিদে হরবাবু যেমন সবুজ আঁকেন, অমরবাবুও একই তাগিদে সবুজ আলোর বল সৃষ্টি করে কৃত্রিম উপায়ে পান্না তৈরির চেষ্টা করতেন৷ অমরবাবুরই কোনো বিজ্ঞানী কলিগ সেই ফর্মুলা হাতিয়ে সে-চেষ্টা করছেন৷ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সেই বিজ্ঞানীই অমরবাবু আর তাঁর স্ত্রীর দুর্ঘটনায় মৃত্যুর জন্য দায়ী৷'

'কিন্তু আজ শেঠবাড়িতে যা ঘটেছে, তার ব্যাখ্যাটা কী?'

আবার খানিকটা ভেবে-চিন্তে বললুম, 'চন্দ্রকান্তবাবুর বাড়িতে যে উদ্দেশ্যে সেই চোর-বিজ্ঞানী হানা দিচ্ছেন, হরবাবুর স্টুডিয়োতেও সেই একই উদ্দেশ্যে আজ হানা দিয়েছিলেন৷ তার মানে, পান্না তৈরির উপাদান হরবাবুর স্টুডিয়োতেও হয়তো আছে৷'

কর্নেল এমন অট্টহাসি হাসলেন যে, ষষ্ঠী দরজার ফাঁকে উঁকি দিল৷ আমিও হকচকিয়ে গেলুম৷

কর্নেলের বাড়ি লাঞ্চ বা ডিনার খাওয়ার সুযোগ প্রায়ই ঘটে৷ তাঁর মতে 'ভোজনরসিক' হল সে, যে নিজে কম খায়, কিন্তু অপরকে বেশি খাওয়ায়৷ তার মানে, তিনিই নাকি যথার্থ ভোজনরসিক৷ সে-বেলা লাঞ্চে যে ভূরিভোজন হয়ে গেল, তার ধাক্কা সামলাতে সোফায় চিত হয়ে ছিলুম, ষষ্ঠী না ডাকলে রাত্তিরটাও পুইয়ে যেত৷ ষষ্ঠীর হাতে কফির পেয়ালা৷ কাঁচুমাচু হেসে বলল, 'ডাকব ডাকব করে পাঁচটা বেজে গেল দাদাবাবু৷ ঘুমোনো মানুষকে খামোকা জাগাতে ইচ্ছে করে না৷ তবে দিনের বেলা ঘুমোলে বড্ড গা ম্যাজম্যাজ করে৷ করছে না?'

হাই তুলে বললুম, 'করছে৷'

'নিন দাদাবাবু, গরম গরম চুমুক দিন৷ শরিল কিলিয়ার হয়ে যাবে৷'

কয়েক চুমুক কড়া গরম কফি সত্যি 'শরিল কিলিয়ার' করে দিচ্ছিল৷ বললুম, 'তোমার বাবামশাই কি ছাদের বাগানে?'

'আজ্ঞে না৷ বেইরেছেন৷'

'কিছু বলে যাননি?'

'না তো!' বলে ষষ্ঠী ফিক করে হাসল, 'বলে গেছেন, দাদাবাবুকে যেন বিরক্ত করবিনে, যতক্ষণ ইচ্ছে ঘুমোক৷ কিন্তু সেটা কি ঠিক হয়, বলুন দাদাবাবু! আশ্বিন মাসের বিকেলে ঘুমোলে পরে শরিল...'

'কিলিয়ার হয় না?'

ষষ্ঠী বুঝতে পারে না ওকে নিয়ে ঠাট্টা করা হচ্ছে কি না৷ গম্ভীর হয়ে বলল, 'ওই হল আর কি! আমি কি আপনাদের মতো ইংরিজি জানি, না ইশকুলে পাশ দিয়েছি? বাবামশাইয়ের কাছে শুনে দু-চারটে শিখেছি৷'

ওকে আর ঘাঁটালুম না৷ কফি শেষ করে বেরিয়ে পড়লুম৷ নীচের লনের একধারে পার্কিং স্পটে আমার গাড়িটা পার্ক করা ছিল৷ স্টার্ট দিয়ে বড়ো রাস্তায় পৌঁছে ঠিক করলুম, বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের কাছে যাওয়া যাক৷ ধুন্ধুমার কী সন্দেহজনক ব্যাপার দেখে সিগন্যাল দিচ্ছিল, জানা যাবে৷

রবিবারেও যেখানে-সেখানে ট্রাফিকজ্যাম৷ চন্দ্রকান্তের বাড়ি পৌঁছোতে সন্ধ্যে সাড়ে ছ-টা বেজে গেল৷ ধুন্ধুমারের কথা ভেবে একটু ভয় করছিল৷ সবুজ আলোর পাল্লায় পড়ে গত রাতে ওর যা দশা হয়েছিল, এখন হয়তো খেপে আছে৷ বাইরের লোক দেখলেই তেড়ে আসবে এবং হালদারমশাইকে যেভাবে শূন্যে তুলে আছাড় মারতে যাচ্ছিল, আমাকেও গাড়িসুদ্ধু তুলে ছুড়ে মারবে৷ ভয়ের চোটে সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের আওড়ানো মন্ত্রটা মনে পড়ে গেল: 'ট্রিও ট্রাও ট্যাট!'

ঠিক আছে৷ মনে মনে তৈরি হয়ে হর্ন বাজালুম৷ কিন্তু ধুন্ধুমারকে দেখা গেল না৷ গেট আপনা-আপনি খুলে গেল এবং অদৃশ্য বিজ্ঞানীর সম্ভাষণ শোনা গেল, 'ওয়েলকাম, জয়ন্তবাবু! ওয়েলকাম!'

ভেতরে গাড়ি ঢুকিয়ে এদিক-ওদিক দেখে নিয়ে তবে মাটিতে পা রাখলুম৷ গেটটা আপনা-আপনি বন্ধ হয়ে গেছে৷ বোঝা যাচ্ছে, চন্দ্রকান্ত কাল রাতের ঘটনার পর তাঁর এই বাড়িটিতে কিছু নতুন কলকবজা যুক্ত করেছেন৷ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে গেটটাকে স্বয়ংক্রিয় করে দিয়েছেন৷

বারান্দায় চন্দ্রকান্তের আবির্ভাব ঘটল৷ মুখে উজ্জ্বল হাসি, 'ল্যাবে বসে আপনাকে আসতে দেখেছিলুম৷ আপনাকে মানে আপনার গাড়িটাকে৷'

'টেলিস্কোপ, নাকি সেই পেরিস্কোপে?'

'রেডারে৷ টেলিস্কোপ-পেরিস্কোপ ওসব সেকেলে জিনিস৷ এ যুগে অচল৷' চন্দ্রকান্ত আমাকে খুব খাতির করে ঘরে ঢোকালেন৷ 'এ রেডার সাধারণ রেডার নয়৷ ভূপৃষ্ঠ থেকে আকাশে আমার বাড়ির দুশো মিটারের মধ্যে যা-কিছু আনাগোনা করবে, আমি টের পাব৷ সে পিঁপড়ে হোক আর মশাই হোক৷'

'এ এলাকায় তো প্রচুর মশা!'

আমার মন্তব্য শুনে চন্দ্রকান্ত একচোট হাসলেন, 'তাতে কী হয়েছে? মশা ইজ মশা৷ থাকগে, কর্নেলের খবর বলুন!'

'জানি না৷ আমি এলুম আপনার খবর জানতে৷ ধুন্ধুমার সন্দেহজনক কী দেখে সিগন্যাল দিচ্ছিল?'

'ধুন্ধু একটি গাড়লস্য গাড়ল! ষাঁড় দেখেই অস্থির৷'

'গুঁতোতে এসেছিল বুঝি?'

'নাহ৷ কাঁটাতারের বেড়ার ওধারে দাঁড়িয়ে শিং নাড়ছিল৷ ধুন্ধু কখনো ষাঁড় দেখেনি৷ কাজেই একটু গণ্ডগোলে পড়েছিল৷ ওদিকে ষাঁড়টার অবস্থাও তাই৷ সেও গণ্ডগোলে পড়েছিল৷ আমি এসে মিটমাট করে দিলুম৷'

এইসব কথাবার্তার সময় বাইরে দু-বার শিস শোনা গেল৷ চন্দ্রকান্ত গ্রাহ্য করলেন না৷ বললুম, 'দেখে আসা উচিত৷ সবুজ আলোর বলটা...'

বিজ্ঞানী আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'লেসার-ল্যাসোটাও ধুন্ধুর মাথায় আটকে দিয়েছি৷ চিন্তার কারণ নেই৷' বলে আমার দিকে ভুরু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর নড়ে উঠলেন, 'হ্যাঁ, তখন কর্নেলের বাড়িতে আপনি পান্নার কথা বলছিলেন৷ তাই না?'

বহুবছর আগে শেঠমশাইয়ের ব্যাঙ্ক থেকে পান্না-চুরির ঘটনাটা কর্নেল সম্ভবত চন্দ্রকান্তকে বলতে নিষেধ করেছিলেন৷ কারণ, হঠাৎ অমন করে কথার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এই মানেটাই দাঁড়ায়৷ কিন্তু এ মুহূর্তে কথাটা চন্দ্রকান্তকে খুলে বলা উচিত মনে হল৷ যদি চন্দ্রকান্ত কম্পিউটারের সাহায্যে এ রহস্যের সমাধান করতে পারেন, কাজ অনেকখানি এগিয়ে থাকবে৷

আগাগোড়া ঘটনাটা শেঠমশাইয়ের মুখে যেমন শুনেছিলুম, সবটাই বললুম৷ তারপর আজ সকালে শেঠবাড়ির কুকুর-খুন এবং স্টুডিয়োতে চোরের হামলার ঘটনাও বর্ণনা করলুম৷ চন্দ্রকান্ত নোটবই বের করে কোনো সাংকেতিক ভাষায় অথবা শর্টহ্যান্ডে ব্যস্তভাবে নোট নিচ্ছিলেন৷ আমার কথা শেষ হলে উত্তেজিতভাবে উঠে দাঁড়ালেন৷ 'চলে আসুন! প্রচুর ডাটা পাওয়া গেল৷ কী রেজাল্ট বেরোয়, দেখা যাক৷' বলে ল্যাবের দিকে পা বাড়ালেন৷

ল্যাবে কম্পিউটারের সামনে বসে খটাখট চাবি টিপতে থাকলেন বিজ্ঞানী৷ আমি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলুম৷ রং-বেরঙের বিচিত্তির খালি৷ কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটা রঙিন চতুষ্পদ প্রাণীকেও যেন দেখতে পেলুম, হয়তো সেই অ্যালসেশিয়ানটাই, যার নাম ছিল ডন৷ তারপর অসংখ্য ফুটকি, সোজা ও বাঁকা রেখা, জ্যামিতির ত্রিভুজ-চতুর্ভুজ, 'স্কোয়ার-রুট নির্ণয় করো'-ধরনের অঙ্ক, এইসব জটিল ও মুণ্ডু-ঘুরিয়ে-দেওয়া ব্যাপারের পর একটা সবুজ আলোর বল ফুটে উঠল স্ক্রিনে৷ চন্দ্রকান্ত বললেন, 'দেখছেন?'

'দেখছি৷'

'কী দেখছেন?'

'সবুজ আলোর বল৷'

'ওটাই অমরের বাবার চুরি-যাওয়া পান্না!'

'তাই বুঝি?'

'হুঁ:!'

'কিন্তু ওটা এখন কোথায় কার কাছে আছে জানতে পারলেন কি?'

চন্দ্রকান্ত খুট করে আবার বোতাম টিপলেন৷ সবুজ আলোর বলটা ছিল ক্রিকেট বলের সাইজ, এবার লাফাতে লাফাতে মার্বেলগুলির সাইজে পরিণত হল৷ বিজ্ঞানী বললেন, 'অন্তত আড়াইশো কিলোমিটারের বেশি দূরে আছে জিনিসটা৷ আরও ডাটা পেলে বলা যেত, কার কাছে আছে৷'

কম্পিউটারের সামনে থেকে উঠে এলেন চন্দ্রকান্ত৷ এই সময় ল্যাবের কোনার দিকে ব্লিপ ব্লিপ শব্দ শোনা গেল৷ সেদিকে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলেন৷ তারপর ঘোষণা করলেন, 'জয়ন্তবাবু৷ আপনার ওল্ড বস আসছেন৷'

'কর্নেল আসছেন?'

'হ্যাঁ৷ আসুন, ওঁকে রিসিভ করা যাক৷'

স্বয়ংক্রিয় ফটকটি খুলে গেল৷ কর্নেলের লালরঙের গাড়িটা ঢুকতে দেখলুম৷ চন্দ্রকান্ত দৌড়ে গিয়ে বললেন, 'ওয়েলকাম কর্নেল! ওয়েলকাম! এতক্ষণ আপনার কথাই ভাবছিলুম৷'

কর্নেল গাড়ি থেকে বেরোলেন৷ মুখটা বেজায় গম্ভীর৷ আমাকে এখানে দেখেই কি? একটু অস্বস্তি হচ্ছিল৷ কিন্তু উনি বারান্দায় উঠে আমাকে আস্তে বললেন, 'তোমাকে ফোন করেছিলুম৷ যা ভেবেছিলুম, তা-ই ঘটেছে৷'

চমকে উঠলুম, 'কী ঘটেছে?'

'এসো, বলছি৷'

চন্দ্রকান্ত বোধকরি সিন্থেটিক কফি-পকৌড়া দিয়ে কর্নেলকে আপ্যায়নের জন্য পা বাড়াচ্ছিলেন, কর্নেল বললেন, 'বসুন চন্দ্রকান্তবাবু! কথা আছে৷'

চন্দ্রকান্ত সঙ্গেসঙ্গে ধুপ করে বসে বললেন, 'পান্না সম্পর্কে তো? একটু আগে জয়ন্তবাবুর কাছে সব ডাটা নিয়ে কম্পিউটারে ফিড করিয়ে দেখলুম, চুরি যাওয়া পান্নাটা অন্তত আড়াইশো কিলোমিটারের বেশি দূরে লুকোনো আছে৷'

কর্নেল তেমনি গম্ভীরমুখে বললেন, 'হ্যাঁ, ঠিক তাই৷ দরিয়াগঞ্জেই কোথাও লুকোনো আছে৷ কিন্তু সেই লুকিয়ে-রাখা পান্নাটার দাবিতে আজ কোমল-কোরককে কেউ বা কারা সত্যিই চুরি করেছে৷'

চন্দ্রকান্ত সোজা হয়ে বসলেন৷ আমি হাঁ করে তাকিয়ে ছিলুম৷ বললুম, 'সে কী! ওরা তো সকালে ওদের মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে গিয়েছিল!'

কর্নেল বললেন, 'সন্ধ্যে অবধি ওরা ফিরছে না দেখে শেঠমশাই ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন৷ তারপর থানায় খবর দিয়েছিলেন৷ আমি গিয়েছিলুম ড. সতীশ চন্দ্রের বাড়ি৷ ফিরে এসে শুনি, গোবিন্দ ডাকতে এসেছিল৷ তখনই শেঠমশাইয়ের বাড়ি চলে গেলুম৷ লেটার বক্সে একটা চিঠি পাওয়া গেছে দেখলুম৷ হাতের লেখা কিন্তু কোরকেরই, এটাই আশ্চর্য! চিঠিতে লেখা আছে, 'আগামী রবিবারের মধ্যে দরিয়াগঞ্জের কালীমন্দিরে পান্নাটা পৌঁছে না দিলে কো-২-কে বলি দেওয়া হবে৷ ইতি, হাহা-হুহু'৷'

'ওই প্রাইভেট টিউটর লোকটিরই কীর্তি!'

কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, 'আপাতদৃষ্টে সেটাই পুলিশের ধারণা৷ মাস তিনেক হবে তপোব্রতবাবু শেঠ বাড়িতে টিউশনি করছেন৷ শেঠমশাই নাতিদের প্রাইভেট টিউটর রাখার জন্য কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন৷ অনেক দরখাস্ত এসেছিল৷ সেটা স্বাভাবিক৷ আজকাল দেশে অসংখ্য শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে বেকার৷ যাই হোক, তপোব্রতকে পছন্দ হয়েছিল শেঠমশাইয়ের৷ পছন্দ হওয়ার একটা কারণও শুনলুম৷ তপোব্রতের সংস্কৃত ভাষাতেও নাকি একটা ডিগ্রি আছে৷ শেঠমশাই এদিকে সংস্কৃত প্রচার সমিতির সভাপতি৷'

দেখলুম, চন্দ্রকান্ত নোটবই বের করে নোট করছেন৷ হিজিবিজি আঁচড়৷ বললুম, 'লেটার বক্সটা গেটেই দেখেছি মনে হচ্ছে৷ কিন্তু পুলিশ পাহারা ছিল তো আজ৷ তাদের চোখ এড়িয়ে...'

কর্নেল বাধা দিয়ে বললেন, 'কেউ লেটার বক্সে চিঠি ঢোকাতে এলে পুলিশ বাধা দেবে কেন? কিন্তু কথাটা হল, যে দু-জন কনস্টেবল গেটে পাহারা দিচ্ছিল, তারা কাউকে লেটার বক্সে চিঠি ঢোকাতে দেখেনি৷ তার মানে, চিঠিটা পুলিশ, এমনকী, আমরা শেঠবাড়ি যাওয়ার আগে থেকেই লেটার বক্সে ছিল৷'

'তপোব্রত কোমল-কোরককে নিয়ে বেরোনোর সময় চিঠিটা ঢুকিয়ে দিয়েছিল লেটার বক্সে৷'

কর্নেল একটু হাসলেন, 'পুলিশের তাই ধারণা৷ কিন্তু ওই সময় কোমল-কোরকের সামনেই হরবাবুর স্টুডিয়োর তালা ভাঙা, ডনকে ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলা, ছবি তছনছ করে কিছু খোঁজা, এসব সাংঘাতিক কাজ তপোব্রত করেছে বলে মনে হয় কি তোমার?'

'সে নিজে করেনি৷ সে ওদের নিয়ে বেরিয়ে গেছে৷ তারপর তার স্যাঙাতরা ঢুকেছে৷ গোবিন্দ ওপরে ব্যস্ত ছিল কোনো কাজে৷ সে নীচের হলঘরের দরজা বন্ধ করতে আসার আগেই তপোব্রতের স্যাঙাতরা ওই কাজগুলো করেছে৷ ডন বাধা দিতে এসেছিল৷ তাই তাকে বিষাক্ত ইঞ্জেকশন দিয়ে মেরে ফেলেছে৷'

কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, 'পুলিশের থিয়োরির সঙ্গে তোমার থিয়োরি মিলে যাচ্ছে, জয়ন্ত৷'

'কিন্তু আপনার থিয়োরি কী?'

'আপাতত কিছু দাঁড় করানো যাচ্ছে না৷ কারণ,' কর্নেল একরাশ নীল ধোঁয়ার ভেতর বললেন, 'কারণ শেঠমশাইকে অবিশ্বাস করতে বাধছে৷ তিনি পঞ্চাশ বছর আগে চুরি-যাওয়া পান্নার কোনো হদিশ পাননি৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'অথচ কিডন্যাপাররা সেই পান্নাটা তাঁর কাছেই দাবি করেছে! বড্ড বেয়াড়া লোকগুলো তো!'

বললুম, 'কর্নেল! কিছুক্ষণ আগে আপনি বলেছেন, হারানো পান্নাটা দরিয়াগঞ্জেই কোথায় লুকোনো আছে৷'

কর্নেল টুপি খুলে টাকে হাত বুলিয়ে বললেন, 'বলেছি!'

'তাহলে নিশ্চয় কোনো সূত্র পেয়ে গেছেন?'

'পেয়েছি৷'

অধীর হয়ে বললুম, 'খুলে বলতে অসুবিধেটা কী?'

কর্নেল সুর করে এই অদ্ভুত ছড়াটা আওড়ালেন:

'দুই ডাক বাট

উত্তরে হাঁট

ঘাটে মহাবল

তার নীচে জল

ওইখানে থাম

সিদ্ধ মনস্কাম৷৷'

চন্দ্রকান্ত খিক খিক করে হেসে বললেন, 'কী অদ্ভুত! কী অদ্ভুত!'

বললুম, 'ব্যাপারটা জট পাকিয়ে দিলেন দেখছি! হঠাৎ কোত্থেকে এই উদ্ভুট্টে ছড়া এসে গেল!'

কর্নেল বললেন, 'ছড়াটা কোরকের খাতায় লেখা ছিল৷'

'শেঠমশাইকে দেখিয়েছেন?'

'না৷ এ সময় ওঁর যা মনের অবস্থা, নাতির খাতায় লেখা এই আজব ছড়াটা দেখানো উচিত মনে করিনি৷'

'কিন্তু হারানো পান্নাটা দরিয়াগঞ্জে আছে, সেটা কী করে বুঝতে পারলেন?'

'এই ছড়া থেকে৷'

হকচকিয়ে গেলুম শুনে৷ চন্দ্রকান্ত উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'দু-মিনিট সময় দিন৷ ডাটাগুলো কম্পিউটারে ফিড করিয়ে দেখি, কী বেরোয়৷'

কর্নেল বললেন, 'সে পরে হবেখন৷ এবার শুনুন, আপনার কাছে দৌড়ে এসেছি...'

চন্দ্রকান্ত বাধা দিয়ে বললেন, 'আমার কাছে তো এসেছেনই৷ এ আর নতুন কথা কী হল? কেন এসেছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ৷' বলে নোটবই খুলে কলম বাগিয়ে ধরলেন৷

কর্নেল বললেন, 'আপনি তো অমরবাবু এবং তাঁর স্ত্রীকে চিনতেন?'

'বাঙ্গালোরে ওরা আমার কলিগ ছিল, আগেই বলেছি৷'

'ত্রিভুবন দাশ নামে ওঁদের এক বন্ধু ছিলেন৷ চিনতেন তাঁকে?'

চন্দ্রকান্ত তেতোমুখে বললেন, 'চোর! এক নম্বর চোর৷ ইউরেনিয়াম চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল৷ সায়েন্টিস্টকুলের কলঙ্ক৷'

'ত্রিভুবনবাবু কী নিয়ে রিসার্চ করতেন জানতেন কি?'

চন্দ্রকান্ত বাঁকা হাসলেন, 'ওর আবার রিসার্চ! ধাতুবিজ্ঞানে কী যেন একটা ডিগ্রি ছিল মনে পড়ছে৷ ওই পর্যন্তই৷ অমর আর তার বউ কেন যে ওকে পাত্তা দিত কে জানে? প্রায়ই দেখতুম, তিন জনে একখানে বসে আড্ডা দিচ্ছে৷ আমাকে দেখলেই চুপ করে যেত৷'

'কলকাতায় আসার পর ত্রিভুবনবাবুর সঙ্গে আপনার আর দেখা হয়েছিল কি?'

'মাথা খারাপ! ওই চোরকে আমি পাত্তা দেব ভাবছেন?'

'আহা, দেখা হয়েছিল কি না?'

'হয়েছিল মনে পড়ছে৷ তবে দূর থেকে৷' চন্দ্রকান্ত তর্জনী তুলে হিসেব দিলেন, 'একশো মিটার দূর থেকে৷'

'কতদিন আগে?'

চন্দ্রকান্ত স্মরণ করার চেষ্টা করলেন৷ তারপর বললেন, 'মাস তিন-চার আগে৷ চৌরঙ্গিতে ভিড়ের ভেতর দেখা৷ দেখেই সঙ্গেসঙ্গে সরে গেলুম৷ চোর! চোর!'

বললুম, 'ত্রিভুবনবাবুর কথা কীভাবে জানলেন, কর্নেল?'

'অমরবাবুর নামে কলকাতার ঠিকানায় লেখা একটা চিঠি থেকে,' কর্নেল চুরুটের একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, 'আচ্ছা চন্দ্রকান্তবাবু, খনিজ রত্ন থেকে এমন কিছু কি তৈরি করা সম্ভব, যা হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও ভয়ংকর শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে?'

বিজ্ঞানী হাসলেন, 'পারেই তো৷ ইউরেনিয়াম, প্লুটোনিয়াম, এ সবই তো খনিজ ধাতু৷ রত্নও বলতে পারেন৷ তবে সাংঘাতিক রত্ন৷ কারণ এগুলো তেজস্ক্রিয়৷ এরাই পারমাণবিক বোমার উপাদান৷ তবে সাধারণ খনিজ রত্ন, যেমন ধরুন হিরে, পান্না, এরা তেজস্ক্রিয় নয়৷ কিন্তু তেজস্ক্রিয় না হলেও এদেরও এক ধরনের বিকিরণ ঘটে৷ নির্দোষ বিকিরণ৷ এখন কথা হল, বিকিরণ মানে রশ্মি নির্গমন৷ কোনো উপায়ে কেউ যদি মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মি কেন্দ্রীভূত করে সেই সাধারণ রশ্মিকে বন্দুকের ট্রিগার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, কেন্দ্রীভূত মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মিতে মারাত্মক বিক্রিয়া শুরু হবে৷ পৃথিবী ঝলসে পুড়ে চাঁদের অবস্থা হবে৷ নিষ্প্রাণ, কঠিন, মড়ার খুলির মতো ভয়ংকর!'

শুনে শিউরে উঠলুম৷ চন্দ্রকান্তের মুখে নিষ্ঠুর একটা ভাব৷ কর্নেল খুব মন দিয়ে শুনছিলেন৷ এবার বললেন, 'ড. সতীশ চন্দ্র বলছিলেন, কৃত্রিম উপায়ে পান্না তৈরি করাও সম্ভব৷'

'আমাকেও বলেছেন,' চন্দ্রকান্ত সায় দিলেন, 'আমিও চেষ্টা করে দেখব ভাবছি৷ কিন্তু সমস্যা হল, অমর ও সবিতার যুগান্তকারী ফর্মুলাটা জানতে পারলে সবুজ আলোর বল তৈরি করা সহজ হত৷ ওটাই তো প্রথম ধাপ৷ তাই না? দেখা যাক৷'

'সবুজ আলোর বলটা আপনার বাড়ির আনাচে-কানাচে এসে উঁকি দিচ্ছে৷ ওটাই পাকড়াও করে ফেলুন৷'

'এসে দেখুক না আর এক বার৷ ধুন্ধু তৈরি হয়েই আছে৷'

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, 'চলি চন্দ্রকান্তবাবু!'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ডাটাগুলো কম্পিউটারে ফিড করিয়ে দেখি, আসুন না ল্যাবে! যদি ছেলে দুটোর কোনো হদিশ বেরিয়ে আসে৷'

'বেরোলে আমাকে ফোনে জানিয়ে দেবেন৷ আমার একটু তাড়া আছে৷'

কর্নেলের সঙ্গে আমিও বেরিয়ে পড়লুম৷ চন্দ্রকান্ত হাত নেড়ে বিদায় জানালেন৷ কর্নেলের গাড়ি আগে, আমার গাড়ি পেছনে৷ ভি.আই.পি. রোড হয়ে উলটোডিঙির মোড়ে পৌঁছোলে, এদিক-সেদিক থেকে একঝাঁক গাড়ি এসে আমাদের দু-জনকে আলাদা করে ফেলল৷ তারপর আর কর্নেলের লাল গাড়িটা দেখতে পেলুম না৷

ইলিয়ট রোডে কর্নেলের বাড়ির গেটের কাছে গাড়ি থামিয়ে ভেতরের পার্কিং স্পট খুঁটিয়ে দেখলুম৷ কোনো লাল রঙের গাড়ি নেই৷ এখনও পৌঁছোননি! মিনিট পনেরো অপেক্ষা করার পর বিরক্ত হয়ে নিজের ডেরায় ফিরে চললুম৷ মাথার ভেতরটা ঝিম ঝিম করছে৷

রাত এগারোটায় একটা জমজমাট বিলিতি ভূতের গল্পের বই পড়ছি, কারণ বিকেলের ঘুমটা রাতের ঘুমকে পণ্ড করেছে, সেই সময় ফোন বাজল৷ বিরক্ত হয়ে ফোন তুলে বললুম, 'রং নাম্বার!'

'রাইট নাম্বার, ডার্লিং!'

'সরি, কর্নেল!'

'আমিও দুঃখিত, জয়ন্ত! তোমাকে ভিড়ে হারিয়ে ফেলেছিলুম৷'

'বাজে কথা৷ ইচ্ছে করেই কেটে পড়েছিলেন৷ যাকগে, বলুন, কী ব্যাপার?'

'জয়ন্ত একটু আগে দরিয়াগঞ্জ থেকে হালদারমশাই ট্রাঙ্ক কল করেছিলেন!'

'বলেন কী! উনি দরিয়াগঞ্জ চলে গেছেন?'

'আমরাও যাচ্ছি৷ আমি এবং তুমি৷ সকাল সাতটায় এসপ্ল্যানেডের বাস-স্টেশনে দরিয়াগঞ্জের বাস ছাড়ে, তুমি সাড়ে ছ-টার মধ্যে অবশ্য পৌঁছোবে ওখানে৷'

'কিন্তু ব্যাপারটা কী?'

'প্রচুর রহস্য, ডার্লিং! প্রচুর রহস্য৷'

ফোন রাখার শব্দ হল৷ বুঝলুম, আর মুখ খোলানো যাবে না৷ ফোন নামিয়ে ভূতের গল্পে চোখ রাখলুম, কিন্তু আর জমল না৷ বিলিতি ভূতটা সবুজ আলোর বলটার তাড়া খেয়ে বেরিয়ে পড়েছে৷

এরপর ঘুম আসা আর সম্ভব নয়৷ রহস্যটা আমাকে পেয়ে বসল৷ রহস্য সত্যি প্রচুর৷ যত সাংঘাতিক, তত জটিল৷ চিত হয়ে শুয়ে জট ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকলুম৷

হুঁ, তপোব্রত সেই ইউরেনিয়াম-চোর ধাতুবিজ্ঞানী ত্রিভুবন দাশেরই চেলা৷ ত্রিভুবন দাশ তাকে শেঠবাড়িতে পাঠিয়েছিল বাচ্চু ফকিরের হারানো পান্নার খোঁজে৷ এখানেই সন্দেহ জাগছে, শেঠমশাই কর্নেলকে সম্ভবত পুরো সত্যি কথাটা বলেননি৷ পরে কোনো উপায়ে পান্নাটা উদ্ধার করেছিলেন৷ সেটা বাচ্চু ফকিরকে হয়তো ফেরত দেবার ইচ্ছেও ছিল৷ কিন্তু আর তার খোঁজ পাননি৷ তার খোঁজ না পাওয়ার কথা আমার সামনেই শেঠমশাই বলেছিলেন কর্নেলকে৷ চন্দ্রকান্তের বাড়িতে কর্নেল বললেন, পান্নাটা দরিয়াগঞ্জেই কোথাও লুকোনো আছে এবং কোরকের খাতায় লেখা ছড়াটা থেকে তার সূত্র পেয়েছেন৷

তার মানে দাঁড়াচ্ছে, দাদু নাতিদের ওই ছড়াটা শিখিয়েছিলেন, যাতে ওরা বড়ো হয়ে ছড়াটার সাংকেতিক সূত্র ধরে পান্নাটা উদ্ধার করতে পারে৷ কোরক ভুলে যাওয়ার ভয়ে বুদ্ধি করে ওটা খাতায় লিখে রেখেছিল৷

বাঃ! আমার থিয়োরির সঙ্গে বাস্তব ঘটনাগুলো চমৎকার মিলে যাচ্ছে৷

ত্রিভুবন দাশ অমরবাবুর কাছেই হারানো পান্নার ব্যাপারটা শুনে থাকবেন৷ ওইরকম একটা প্রকাণ্ড পান্না তাঁর দরকার ছিল৷ অমরবাবু নিশ্চয় টের পেয়েছিলেন, তাঁর বাবা পরে পান্নাটা উদ্ধার করে কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন৷ দৈবাৎ মুখ ফসকে বলে থাকবেন ধাতুবিজ্ঞানীকে৷

দারুণ মিলে যাচ্ছে আমার থিয়োরি৷ কর্নেলকে বলতে হবে৷

এখন কথাটা হল, ত্রিভুবন দাশ তপোব্রতের সাহায্যে কোমল-কোরককে কিডন্যাপ করলেন কেন? না সেই পান্নার দাবিতে৷ তার মানে, তপোব্রত কোরকের খাতায় ছড়াটা দেখে থাকবে৷ কিন্তু ওটার মর্ম বোঝেনি৷ হুঁ, ব্যাপারটার ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করার জন্যই সে কোমল-কোরককে দিয়ে কর্নেলের ছাদের বাগানে গুলতিতে বাঁধা চিরকুট ছুড়ে মারার ব্যবস্থা করেছিল৷ যাতে কিনা, সত্যি সত্যি কিডন্যাপ করা হলেও ব্যাপারটা কর্নেল নিছক তামাশা ভেবে নাক গলাতে যাবেন না এবং কিডন্যাপার কোমল-কোরককে লুকিয়ে রাখার জন্য প্রচুর সময় পাবে৷

কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের কীর্তিকলাপ ত্রিভুবন দাশ আর তপোব্রতের জানা৷ তাই এই ফন্দিফিকির৷ শেঠবাড়িতে কর্নেল যাতায়াত করেন মাঝে মাঝে৷ কাজেই ওঁরা সাবধানে এগোচ্ছিলেন লক্ষ্যের দিকে৷

এখন বাকি রইল দুটো রহস্য৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের বাগানে রাতবিরেতে সবুজ বলের আবির্ভাব এবং হরবাবুর স্টুডিয়োতে হানা৷...

অনেক ভেবেও এ-দুটোর জট ছাড়াতে পারলুম না৷ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলুম, রাত দুটো বাজে৷ টেবিলবাতির সুইচ অফ করে চোখ বুজলুম৷ কিন্তু সবুজ আলোর বলটা এসে আটকে গেছে চোখের ভেতর৷ খুব লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে৷ কী ঝামেলায় পড়া গেল!

তারপর সত্যিই ঘুমিয়ে গেছি কি না, বলতে পারব না৷ ফোনের বিরক্তিকর শব্দে তড়াক করে উঠে বসলুম এবং ফোন তুলেই অভ্যাসমতো বললুম, 'রং নাম্বার!'

'রাইট নাম্বার, ডার্লিং!'

'সরি, কর্নেল! আবার কী হল?'

'ছ-টা বাজে৷ উঠে পড়ো৷ না, না৷ আর শোওয়া নয়৷ রেডি হও৷ ট্যাক্সি করে যাওয়ার পথে তোমাকে বরং তুলে নিয়ে যাব৷'

আধ ঘণ্টা পরে কর্নেলের সঙ্গে ট্যাক্সিতে এসপ্ল্যানেডের দিকে যেতে যেতে বললুম, 'হালদারমশাই ট্রাঙ্ক কলে কী কথা জানিয়েছেন যে, শোনামাত্র এভাবে ছুটে চলেছেন?'

'ট্রাঙ্ক কল না করলেও যেতুম, ডার্লিং!'

'নাহয় যেতেনই৷ কিন্তু হালদারমশাইয়ের কথাটা কী?'

'বাঘ৷'

অবাক হয়ে বললুম, 'বাঘ মানে? হালদারমশাই দরিয়াগঞ্জে বাঘ দেখেছেন নাকি?'

'তা-ই তো বললেন৷'

'ধরে নিচ্ছি, দরিয়াগঞ্জে জঙ্গল আছে, বাঘও থাকতে পারে৷ হালদারমশাই সেই বাঘ দেখে থাকতেও পারেন৷ কিন্তু বাঘের সঙ্গে এই কেসের সম্পর্ক কী?'

'খুব গভীর সম্পর্ক আছে, জয়ন্ত!'

'খুলে বলুন!'

মুখ দেখে বুঝলুম, গোয়েন্দাপ্রবর আপাতত আর কথা বাড়াতে রাজি নন৷ চুরুটের ধোঁয়ার ভেতর সান্তাক্লজ-সদৃশ মুখটি ঢাকা পড়েছে৷ চোখ দুটো বন্ধ৷

আট ঘণ্টার বাসজার্নি শুনে ভড়কে গেলুম৷ টিকিট কেটে এনে বললুম, 'নিজেদের গাড়িতে গেলে জার্নিটা আরামদায়ক হত৷ এইসব দূরপাল্লার বাসের অবস্থা আপনার জানা নেই৷ আমি জানি৷ কারণ, প্রথম সাংবাদিক জীবনে এইসব বাসে চেপেই দূরের খবর সরেজমিন তদন্ত করে আনতে হয়েছে আমাকে৷ তার ওপর ইদানীং তো দুর্ঘটনা লেগেই আছে৷ আমার বড্ড অস্বস্তি হয় বাসে চাপলে৷'

কর্নেল কোনো মন্তব্য করলেন না৷ বুকের ঝুলন্ত বাইনোকুলারটি চোখে রেখে মনুমেন্টের মাথায় কী যেন দেখতে ব্যস্ত হলেন৷ তারপর তেতো মুখে বললেন, 'আজকাল কাকেদের বড্ড বাড় হয়েছে৷ মনুমেন্টের মাথায় কাকের ঝাঁক৷ কী অবিশ্বাস্য স্পর্ধা, ডার্লিং! এরপর দেখবে, রাইটার্স বিল্ডিংসেও ঝাঁকে ঝাঁকে গিয়ে হানা দিয়েছে৷ আমার মতো টেকো লোকদের পক্ষে সে এক বিপজ্জনক ঘটনাই বলা চলে৷ বাই দা বাই, জয়ন্ত, তুমি তো রাইটার্সে যাও-টাও খবর আনতে৷ কোন কোন মন্ত্রীর টাক আছে, একটা তালিকা দিয়ো তো আমাকে৷ ওঁদের সাবধান করে দেব, যাতে ওঁরা টুপি পরে দফতরে যান৷'

দরিয়াগঞ্জগামী বাসটিতে একজন-দু-জন করে যাত্রী উঠতে শুরু করেছে৷ সব সিটই রিজার্ভ করার ব্যবস্থা আছে৷ আমাদের সিট নম্বর পাঁচ আর ছয়৷ সামনে তিন আর চার৷ তিন নম্বরের লোকটি টিকিট কাটার সময় কিউতে আমার সামনেই ছিল৷ কেমন যেন চেহারা, গোঁফ, গালপাট্টা, জুলজুলে চাউনি, গাট্টাগোট্টা গড়ন৷ বাস ছাড়ার সময় এখনও হয়নি৷ সে জানলার ধারে বসে সেই জুলজুলে চাউনিতে আমাদের দেখছিল৷ আমরা তখনও বাসে উঠিনি৷ পাশেই দাঁড়িয়ে আছি৷ লক্ষ করলুম, যতবার চোখে চোখ পড়ছে, চাউনি সরিয়ে নিচ্ছে৷ ভাবলুম, কর্নেলকে কথাটা বলি৷ কিন্তু উনি কাক-কাক করে মেতে উঠেছেন৷ আসলে ওঁর বাড়ির পাশের নিম গাছে রাজ্যের কাকের আড্ডা৷ কাকেদের পার্লামেন্ট বলা যায়৷ ষষ্ঠীর কাছে শুনেছি, ভুল করে খালি মাথায় কর্নেল তাঁর শূন্যোদ্যানে গিয়ে ঠোকর খান৷ কাজেই কাক তাঁর চক্ষুশূল হতেই পারে৷ কিন্তু লোকটা অমন করে তাকাচ্ছে কেন? খুব সন্দেহজনক এবং অস্বস্তিকর ব্যাপার৷

বাস-বেচারার দোষ নেই, রাস্তার যা অবস্থা! ঝাঁকুনির চোটে হাড়ের গিঁট ঢিলে হয়ে যাচ্ছিল৷ তারই মধ্যে কখন দিব্যি একখানা ঘুমও দিয়ে নিয়েছিলুম৷ কর্নেলের ডাকে সোজা হয়ে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম৷ কর্নেল বললেন, 'এসে গেছি৷ তবে এক ঘণ্টা লেট৷'

সামনের তিন নম্বর সিটের সন্দেহভাজন লোকটিকে দেখতে পেলুম না৷ বাস থেকে নেমে কর্নেলকে তার কথা জিজ্ঞেস করলে মুচকি হেসে বললেন, 'ছ-কিলোমিটার দূরে আগের স্টপে নেমে গেছে৷ কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হল, হালদারমশাইয়ের এখানে অপেক্ষা করার কথা৷ কোথায় তিনি?':

মফস্সল শহরে বাসস্ট্যান্ড যেমন হয়৷ চারদিকে ঠাসাঠাসি দোকানপাট, যানবাহনের গুঁতোগুঁতি, এলোপাতাড়ি ভিড় আর চ্যাঁচামেচিতে তুলকালাম৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এবং এদিকে-ওদিকে আঁতিপাঁতি খোঁজাখুঁজি করেও গোয়েন্দাভদ্রলোকের গোঁফের ডগাটুকুও আবিষ্কার করা গেল না৷ কর্নেলের মুখে উদবেগ লক্ষ করে বললুম, 'নিশ্চয় কোনো বিপদে পড়েছেন৷ হালদারমশাইয়ের যা নাক গলানো স্বভাব!'

কর্নেল বললেন, 'হুঁ, বাঘের পেটে যাওয়াও অসম্ভব নয়৷'

'বাঘ!' চমকে উঠলুম৷ তারপর মনে পড়ল, গত রাতে কর্নেল টেলিফোনে হালদারমশাইয়ের বাঘ দেখার কথা বলছিলেন বটে৷ বললুম, 'দরিয়াগঞ্জে বাঘ আছে নাকি?'

'আছে৷'

'কিন্তু বাঘ তো জঙ্গলে থাকে!'

'দরিয়াগঞ্জেও জঙ্গলের অভাব নেই,' বলে কর্নেল একটা সাইকেল-রিকশো ডাকলেন৷ বললেন, 'প্যালেস হোটেলে যাব৷'

রিকশোয় যেতে যেতে বললুম, 'প্যালেস হোটেল শুনে মনে হচ্ছে এই এঁদো শহরেও ফাইভ স্টার হোটেল আছে!'

কর্নেল হাসলেন, 'দরিয়াগঞ্জ খুব বনেদি জায়গা, জয়ন্ত৷ নবাবি আমলে সুবা বাংলা-বিহার-ওড়িশার বড়ো বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল৷ পদ্মা সেই পুরোনো ঐতিহাসিক শহরের প্রায় অর্ধেকটা গিলে খেয়েছে৷ তবে আড়াইশো বছরের পুরোনো একটা পাথরের প্রাসাদ এখনও টিকে আছে৷ তার ভোল ফিরিয়ে এক জৈন ব্যবসায়ী হোটেল করেছেন৷ দরিয়াগঞ্জ টুরিস্ট স্পট হিসেবেও বিখ্যাত৷'

'এই অখাদ্য জায়গায় টুরিস্টরা কী দেখতে আসে?'

'পদ্মার সৌন্দর্য৷ তা ছাড়া ঐতিহাসিক নিদর্শনও প্রচুর৷' কর্নেল রিকশোওয়ালার কান বাঁচিয়ে চাপা স্বরে এবং মিটিমিটি হেসে বললেন, 'তবে তোমাকে জানানো উচিত, বেশিরভাগ টুরিস্টই ছদ্মবেশী স্মাগলার৷ এটা সীমান্ত এলাকা৷ পদ্মা পেরোলেই বাংলাদেশ৷ তবে আসল কথাটা হল, আজকাল যেখানে সীমান্ত, সেখানেই স্মাগলারদের দাপট৷'

বাজার এলাকা ছাড়িয়ে গিয়ে বাঁ-দিকে তাকাতেই পদ্মার দেখা পেলুম৷ সত্যিই মুগ্ধ হবার মতো বিশাল সুন্দর এক নদী৷ বুকে কোথাও সবুজ দ্বীপের মতো চর, কোথায় সোনালি কাছিমের খোলের মতো ধু-ধু বালিয়াড়ি৷ কর্নেলকে চোখে বাইনোকুলার তুলে নিতে দেখলুম৷ কী দেখছেন, বোঝা গেল৷ কাছে ও দূরে বুনো হাঁসের ঝাঁক ওড়াউড়ি করছে৷ কালো, দীর্ঘ আর বাঁকা একটা রেখা মাঝে মাঝে আকাশ থেকে চাবুকের মতো এসে শপাং করে নীলচে জলে আছড়ে পড়ছে৷ শরতে সবে মরশুমি হাঁসের ঝাঁক আসতে শুরু করেছে৷ ওপারটা আবছা৷ জল আকাশ ছুঁয়েছে বলে মনে হয়৷ সব মিলিয়ে এ-যেন সমুদ্র আর মরুভূমির আজব সহাবস্থান৷

ডাইনে বসতি এলাকা৷ পুরোনো জীর্ণ বাড়ির ভেতর নতুন ঝকমকে সব বাড়ি৷ একাল-সেকাল পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে৷ একটু পরে বসতি এলাকা শেষ হল৷ বাইনোকুলার নামিয়ে কর্নেল বললেন, 'এবার আমরা ইতিহাসের ভেতর ঢুকছি, জয়ন্ত! ওই দেখো৷'

একটা জঙ্গুলে জায়গার ভেতর টুটা-ফাটা পোড়ো মসজিদের গম্বুজ, মন্দিরের চূড়া, ধ্বংসস্তূপ৷ কোথাও শুধু একটা দেওয়াল খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে সবুজ চাপ চাপ শ্যাওলা, মাথায় ঝোপঝাড়৷ ডাইনে ঘুরে প্রকাণ্ড ফটক৷ ভেতরে একটা লালরঙের দোতলা বাড়ি চোখে পড়ল৷ ফটকের মাথায় ইংরেজিতে লেখা আছে 'প্যালেস হোটেল'৷

ফটকের সামনে রিকশো থেকে আমরা নামলুম৷ রিকশোওয়ালা ভাড়া নিয়ে চলে গেলে কর্নেল বললেন, 'হালদারমশাইকে একটা ডাবল বেড ঘর বুক করতে বলেছিলুম৷ করেছেন কি না কে জানে! এসো, দেখা যাক৷'

নুড়ি-বিছানো রাস্তার দু-ধারে পাম গাছের সারি৷ দু-ধারে টুকরো টুকরো ফুলবাগিচা৷ দেশি-বিদেশি গাছ৷ খুদে নকল পাহাড়ের গা বেয়ে নকল ঝরনা ঝরছে৷ দেখে মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, 'বাঃ!'

কর্নেল বললেন, 'কিন্তু...৷' বলেই থেমে গেলেন৷

বললুম, 'কিন্তু কী?'

'তোমার সন্দেহভাজন লোকটি দেখছি অন্যপথে আগেই এখানে পৌঁছে গেছে৷'

বুকটা ধড়াস করে উঠল৷ বললুম, 'কই? কোথায়?'

কর্নেল ইশারায় ডান দিকের সবুজ লনের শেষে অশোক গাছের তলায় একটা বেঞ্চ দেখালেন৷ বেঞ্চে হেলান দিয়ে বসে সেই গুফো-গালপাট্টাওয়ালা লোকটাই বটে, সিগারেট টানছে৷ তার মুখের এ-পাশটা দেখা যাচ্ছে শুধু৷ কিন্তু এ যে সে-ই, তাতে ভুল নেই৷

লোকটার সঙ্গে বোঝাপড়ার ঝোঁকেই থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলুম৷ কিন্তু কর্নেল আমাকে হাত ধরে টানলেন৷ 'ছেড়ে দাও! আগে রাতের ডেরা খোঁজাটাই এখন জরুরি৷'

দু-ধারে দুটো কামান বসানো, মধ্যিখানে চওড়া পাথুরে সিঁড়ি৷ সিঁড়ি বেয়ে বারান্দায় উঠে সেই লোকটিকে আবার দেখার জন্য ঘুরে দাঁড়ালুম৷ সে এবার বেঞ্চ থেকে উঠে ফটকের দিকে চলেছে৷ ওকে ফলো করা উচিত ছিল৷ কিন্তু এ-মুহূর্তে কিছু করা যাচ্ছে না৷

রিসেপশনে রাশভারী চেহারার এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক বসেছিলেন৷ কর্নেলকে দেখামাত্র উঠে দাঁড়িয়ে প্রায় চিক্কুর ছাড়লেন, 'হ্যাল্লো! হ্যাল্লো! হ্যাল্লো!' তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন৷ বললেন, 'সকালে এক ভদ্রলোক আপনার নামে ঘর বুক করতে এসেছিলেন৷ শুনে তো খুব খুশি হলুম৷ উত্তর-পুবের সেই ঘরটাই আপনার জন্য রেখেছি৷ ওই ঘরটা আপনার পছন্দ, জানি৷'

কর্নেল পরিচয় করিয়ে দিলেন৷ হোটেলের এই ম্যানেজার ভদ্রলোকের নাম রামসুন্দর দুবে৷ চমৎকার বাংলা বলেন৷ খুব খাতির করে নিজেই দোতলার সেই ঘরটিতে নিয়ে গেলেন৷ তারপর মুচকি হেসে কর্নেলকে বললেন, 'এবার কী কেস? গত বারের মতো বুদ্ধমূর্তি পাচার, নাকি অন্য কিছু?'

কর্নেল বললেন, 'না দুবেজি! স্রেফ সাইট-সিইং!'

দুবেজি মেনে নিলেন না৷ হাসতে হাসতে বললেন, 'গত বছরও তাই বলেছিলেন৷'

'আমার বরাত, দুবেজি৷ বেড়াতে গিয়েও রেহাই পাই না৷ কোত্থেকে উটকো ঝামেলা জুটে যায়৷ যাই হোক, আপনি বলেছিলেন, এই গোলমেলে জায়গায় আর থাকবেন না৷ এখনও থেকে গেছেন দেখছি৷'

'আগরওয়ালজি ছাড়লে তো?' বলে দুবেজি আমার দিকে ঘুরলেন, 'আপনি কাগজের লোক শুনে ভালো লাগল৷ আপনাকে প্রচুর তথ্য দেব৷ একটু কড়া করে লিখবেন তো কাগজে৷ স্মাগলারদের এই বড়ো ঘাঁটিটা স্থানীয় লোকের পক্ষে ভীষণ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে ক্রমশ৷ সবসময় খুনোখুনি লেগেই আছে৷ এক দলের সঙ্গে আর এক দলের বখরা নিয়ে ঝগড়া লাগলেই ব্যাস! বোমাবাজি, এলোপাতাড়ি গুলি৷ বাড়ি থেকে লোকেরা সন্ধ্যার পর বেরোতে সাহস পায় না৷ পুলিশ কাঠপুতুল হয়ে মজা দেখে৷ বলে কী জানেন? যদুবংশ এভাবেই ধ্বংস হবে, আমরা কেন নিমিত্তের ভাগী হই? বুঝুন অবস্থা!'

দুবেজি খুব খোলা মনের মানুষ৷ ব্যালকনিতে বসে পদ্মায় রাতের চোরাচালানের হালচাল নিয়ে রোমাঞ্চকর গল্প করতে থাকলেন৷ বেলা পড়ে এসেছে৷ দুবেজির নির্দেশে নীচের ক্যান্টিন থেকে কফি আর স্ন্যাক্স এসে গেল৷ খাওয়ার পর কর্নেল বললেন, 'একটু বেরোব, দুবেজি!'

দুবেজি বললেন, 'সন্ধ্যের পর বেশিক্ষণ বাইরে থাকবেন না, কর্নেল! এখন অবস্থা আরও সাংঘাতিক হয়েছে৷ স্মাগলাররা সন্ধ্যের পর রাস্তাঘাটে লোক চলাচল পছন্দ করে না৷'

ওঁকে সেই সন্দেহভাজন লোকটির নামধাম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলুম, কর্নেল যেন টের পেয়েই বললেন, 'এসো জয়ন্ত! দিনের আলো থাকতে থাকতে ঘুরে আসি৷ দুবেজি ঠিকই বলেছেন৷ আমাদের সাবধান হওয়া দরকার৷'

ফটকের দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললুম, 'দরিয়াগঞ্জ তাহলে আপনার চেনা জায়গা?'

'সেটা আগেই তোমার বোঝা উচিত ছিল, ডার্লিং,' কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, 'তবে তত বেশি চেনা নয়৷ যেমন ধরো, এখানে শেঠমশাইদের বাড়িটা কোথায়, জানি না৷ গোবিন্দর মুখে যেটুকু শুনেছি, সেটুকুই ভরসা!'

প্যালেস হোটেলের চৌহদ্দি পাঁচিল-ঘেরা৷ পশ্চিম দিকে পাঁচিলের সমান্তরাল একটা সংকীর্ণ এবড়োখেবড়ো রাস্তা৷ ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কিছুটা এগিয়ে একটা খোলামেলা মাঠ দেখতে পেলুম৷ ধান খেত, সবজি খেত, আর কোথাও নিঝুম হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একলা কোনো গাছ৷ পাট খেতে পাখপাখালি তুমুল হল্লা করছে৷ কর্নেল ঘাসে ঢাকা আলপথে পা বাড়িয়ে বললেন, 'মনে হচ্ছে, ওই বাড়িটাই৷'

গাছপালার ভেতর একটা জরাজীর্ণ একতলা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল৷ চারদিকের পাঁচিল ভাঙাচোরা৷ কাছাকাছি যেতেই একটা নেড়ি কুকুর চ্যাঁচাতে শুরু করল৷ বললুম, 'আপনার ফর্মুলা-২০ সঙ্গে আনা উচিত ছিল৷'

কর্নেল কী বলতে যাচ্ছিলেন, একটা লোক বেরিয়ে এল৷ গোবিন্দর মতোই তাগড়াই পালোয়ান চেহারা৷ হাতে লাঠি৷ খালি গা, পরনে খাটো লুঙ্গি৷ কাঁচা-পাকা চুল আর দাড়ি৷ কর্নেল বললেন, 'তোমার নাম বুঝি হোসেন?'

কর্নেলের অমায়িক এই প্রশ্নের উত্তরে লোকটা রুক্ষস্বরে বলল, 'নামে কী দরকার বাবুসায়েব? ছোটোবাবু বলে দিয়েছেন, বাড়ির ত্রিসীমানায় যেন কেউ না আসে৷ আপনারা চলে যান!'

কর্নেল মিঠে গলায় বললেন, 'তোমার ছোটোবাবুকে গিয়ে বলো, কলকাতা থেকে কর্নেল এসেছেন৷ জরুরি খবর আছে৷'

লোকটা গোঁ ধরে বলল, 'হুকুম নেই৷' নেড়ি কুকুরটাও সমানে ধমক দিতে থাকল৷

কর্নেল এবার গলা চড়িয়ে ডাকলেন, 'হরবাবু! হরবাবু! ভীষণ বিপদ৷ শিগগির আসুন!'

ভাঙা পাঁচিলের ওধারে হরবাবুকে আসতে দেখলুম৷ তেমনি রাগী তিরিক্ষে চেহারা৷ ভুরু কুঁচকে বললেন, 'পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েও আপনার তর সয়নি দেখছি৷ নিজেই এসে উদয় হয়েছেন!'

'হয়েছি৷ কারণ কোমল-কোরককে কেউ বা কারা চুরি করে নিয়ে গেছে৷'

হরবাবু খাপ্পা হয়ে বললেন, 'চালাকি করবেন না কর্নেল! আপনি ভালোই জানেন, ওরা আপনার সঙ্গে জোক করে৷'

'জোক নয়, হরবাবু! এবার সত্যি সত্যি ওদের কিডন্যাপ করা হয়েছে৷ কিডন্যাপাররা কোরকের হাত দিয়ে লিখিয়েছে, আগামী রবিবারে মধ্যে এখানকার কোনো শিবমন্দিরে জিনিসটা না পৌঁছে দিলে কোমল-কোরককে বলি দেওয়া হবে৷'

হরবাবু বললেন, 'কোন জিনিসটা?'

'একটা পান্না৷ যেটা পঞ্চাশ বছর আগে বাচ্চু ফকির আপনার বাবাকে...'

হরবাবু কর্নেলকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'ভেতরে আসুন! হোসেন, ওঁদের আসতে দাও৷'

দু-পাশে ভেঙে পড়া গেটের স্তূপে ঘন ঝোপঝাড়৷ ভেতরে একটা ধানের মরাই৷ গোয়ালঘরের সামনে দুটো বলদ ঘাস খাচ্ছে৷ ঘাসের স্তূপ থেকে ধোঁয়া উঠছে৷ ধোঁয়াটে ঘাস ওদের পছন্দ বলেই মনে হল৷ একটি মেয়ে ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছে৷ নেড়ি কুকুরটার রাগ পড়ল না৷ মুরগির ঝাঁক দানা খাচ্ছিল৷ সে তাদের ওপর হামলা করল৷ মুরগিগুলো কোঁকোঁ করে ডানা ঝাপটে সবজির মাচানে উঠে প্রাণ বাঁচাল৷ মেয়েটি একটা পাটকেল তুলে কুকুরটাকে বাড়িছাড়া করে তবে ছাড়ল৷

বারান্দায় হোসেন কয়েকটা নড়বড়ে চেয়ার পেতে দিলে আমরা বসলুম৷ তারপর হরবাবু তেতো মুখে বললেন, 'কাল এমনি সময় সেই গোয়েন্দা ভদ্রলোক এসেছিলেন৷ আসা মানে কী? পাঁচিল ডিঙিয়ে ঢুকে ঝোপে ওত পেতে বসেছিলেন৷ হোসেন তখন মাঠে না থাকলে লাঠিপেটা করত৷ হোসেনের বউও কম নয়৷ কুকুরের চ্যাঁচামেচি শুনে ওই ঝোপের পেছনে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল৷ জামার কলার ধরে টানতে টানতে আমার কাছে নিয়ে এল৷'

হালদারমশাইয়ের দুর্দশার কথা শুনে হাসি পাচ্ছিল৷ কিন্তু এখন হাসতে মানা৷ কর্নেল বললেন, 'তাহলে হালদারমশাইয়ের মুখে আপনার স্টুডিয়োতে হামলা আর ডনের মৃত্যুর কথা শুনেছেন?'

হরবাবু ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, 'আপনার গোয়েন্দা না ফোয়েন্দা লোকটা সেই খবর দিয়েই বেঁচে গেল৷ নইলে ওকে কী করতুম জানেন? সারা গায়ে আলকুশি ঘষে ছেড়ে দিতুম৷ ছটফট করতে করতে পদ্মায় ঝাঁপ দিয়ে অতলে তলিয়ে যেত৷ গোয়েন্দাগিরির সাধ যেত ঘুচে৷'

'হরবাবু,' কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন, 'আপনার স্টুডিয়োতে চোর কী চুরি করতে ঢুকেছিল?'

'বলব না৷'

'হরবাবু! আপনি একটি ফাঁদে পা দিয়েছেন৷'

হরবাবু এবার চমকে উঠলেন, 'তার মানে?'

'আপনার স্টুডিয়োতে হামলার খবর শুনেই সেটা আপনার আঁচ করা উচিত ছিল৷' কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটি জ্বেলে ফের বললেন, 'তবে আমি আঁচ করতে পারছি, খবরটা শুনেও আপনি যখন কলকাতা ফিরে যাননি, তখন চোর যেটা আপনার স্টুডিয়োতে চুরি করতে ঢুকেছিল, সেটা আপনি সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন৷'

'হ্যাঁ, এনেছি৷'

'সেটা কি একটা ছবি?'

'বলব না৷'

'আচ্ছা হরবাবু, আপনি সবুজ বল কেন আঁকেন?'

'বলব না৷'

'হরবাবু কোমল-কোরককে কিডন্যাপারদের হাত থেকে বাঁচাতে হলে আপনাকে এসব প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে৷'

কর্নেলের কন্ঠস্বরের দৃঢ়তা ছিল৷ হরবাবু মুখ নামিয়ে আস্তে বললেন, 'কোমল-কোরককে কেউ কিডন্যাপ করেনি৷ ওটা জোক! ওরা নিজেরা নিজেদের কিডন্যাপ করে৷'

'এবার ওরা সত্যিই বিপদে পড়েছে, হরবাবু! এবারেরটা জোক নয়,' বলে একটু ঝুঁকে পড়লেন হরবাবুর দিকে৷ চাপা স্বরে ফের বললেন, 'আপনি সাংঘাতিক একটা লোকের ফাঁদে পা দিয়েছেন৷'

অমনি হরবাবু প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'বারবার ফাঁদ ফাঁদ করছেন৷ কীসের ফাঁদ?'

'আপনার দাদার বন্ধু ত্রিভুবন দাশের, যে ত্রিভুবন দাশ আপনার দাদা-বউদির মৃত্যুর জন্য দায়ী৷'

কথাটা বলেই কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ আমিও দেখাদেখি উঠে পড়লুম৷ হরবাবুর মুখে একটা রাক্ষুসে ভাব৷ যেন এখনই ঝাঁপিয়ে পড়বেন কর্নেলের ওপর৷ আমরা বারান্দা থেকে নেমেছি, তখন হরবাবু বললেন, 'আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি, কর্নেল! আমার ব্যাপারে নাক গলাতে এলে বিপদে পড়বেন৷'

কর্নেল কোনো কথা না বলে হাঁটতে থাকলেন৷ আড়চোখে দেখলুম, হোসেন যেন অবাক হয়ে গেছে৷ একবার হরবাবুকে, একবার কর্নেলকে দেখছে৷ কুকুরটা তার বউয়ের তাড়া খেয়ে বাইরে পালিয়েছিল৷ এতক্ষণে আমাদের পেছনে লাগল৷ তার চ্যাঁচানিতে বিরক্ত হয়ে একটা পাটকেল কুড়োতে যাচ্ছি, সেইসময় দেখলুম, কর্নেল পকেট থেকে একটা লম্বাটে কৌটোর মতো জিনিস বের করলেন৷ তারপর কৌটোর মুখটা খুলে কুকুরটার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলেন৷ অমনি কুকুরটা লেজ গুটিয়ে কুঁইকুঁই করতে করতে বাড়ির দিকে দৌড়োল৷ হাসতে হাসতে বললুম, 'ফর্মুলা-২০ নাকি?'

কর্নেল কৌটো বন্ধ করে পকেটে ঢুকিয়ে বললেন, 'ভাগ্যিস বুদ্ধি করে জিনিসটা সঙ্গে এনেছিলুম৷ আসলে কোন জিনিস কখন কী কাজে লাগে, বলা যায় না৷'

'ত্রিভুবন দাশের ফাঁদ পা দেওয়ার কথা বললেন কেন?'

কর্নেল আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বিড়বিড় করে আওড়ালেন, 'দুই ডাক বাট, উত্তরে হাঁট...'

অবাক হয়ে বললুম, 'সেই ছড়াটা!'

কর্নেল ছড়াটা আউড়ে হনহন করে হাঁটতে শুরু করেছেন৷ একটা এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তা শেঠমশাইদের বাড়ির ভেঙে পড়া গেট থেকে সোজা পদ্মার দিকে এগিয়ে গেছে৷ ডাইনে মাঠ এবং জঙ্গলের ওধারে প্যালেস হোটেল দেখা যাচ্ছে৷ দিনের আলোর রং এখন ধূসর৷ রাস্তাটার দু-ধারে ঝোপঝাড় এবং ধ্বংসস্তূপ৷ প্রায় আধ মাইলটাক হাঁটার পর কর্নেল দাঁড়ালেন৷ আগের মতো বিড়বিড় করে বললেন, 'এক ডাক৷' তারপর আবার হনহন করে হাঁটতে লাগলেন৷ মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলুম না৷

এবার টর্চ জ্বালতে হল৷ একটু এগিয়ে সেই বড়ো রাস্তাটা পড়ল৷ ওই রাস্তা দিয়ে আমরা সাইকেল-রিকশো চেপে পুব দিকে প্যালেস হোটেলে গেছি৷ রাস্তার ওধারে বাঁধ৷ বাঁধে উঠে কর্নেল আবার দাঁড়ালেন৷ এবার দাঁড়ানোর কারণ নীচে পদ্মা৷ এত জোরে হাঁটা অভ্যেস নেই৷ হাঁপিয়ে গেছি৷ বললুম, 'হচ্ছেটা কী?'

কর্নেল বাঁধের ঢালে টর্চের আলো ফেললেন৷ পাথরের চাবড়া সেঁটে দেওয়া হয়েছে ধস আটকাতে৷ বাঁধের ওপর গাছের সার৷ নীচের জলটা দেখে নিয়ে কর্নেল আলো নিভিয়ে বললেন, 'দুই ডাকের মাঝখানে কবে পদ্মা এসে ঢুকে গেছে দেখছি!'

'চিরদিন শুধু হেঁয়ালি!' বিরক্ত হয়ে বললুম, 'খুলে বললে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়, বুঝি না৷'

কর্নেল হাসলেন, 'বাঘ ডার্লিং, বাঘ!'

'আবার হেঁয়ালি?'

'ঘিলু চাঙ্গা করো, জয়ন্ত! তোমার ঘিলু মাঝে মাঝে বড্ড ঝিমিয়ে পড়ে৷'

'পড়াটা স্বাভাবিক৷ এমন উদ্ভুট্টে...'

'চুপ!' বলে আমাকে থামিয়ে দিলেন কর্নেল৷

নীচের বড়ো রাস্তায় একটা বচসা হচ্ছে৷ নিরিবিলি আঁধার রাস্তায় বচসা, বিশেষ করে এই দরিয়াগঞ্জে, ভয় পাইয়ে দেয়৷ প্যালেস হোটেলের ম্যানেজার দুবেজির কাছে যা শুনেছি, মনে পড়ায় ভয়টা আরও বেড়ে গেল৷ নিশ্চয় স্মাগলারদের মধ্যে বখরা নিয়ে ঝগড়া হচ্ছে৷

কিন্তু একটু পরে বুঝতে পারলুম, বচসাটা সাংঘাতিক কিছু নয়৷ গলার স্বরও চেনা মনে হল৷

'মাফ করবেন মশাই! ও-রাস্তায় রিকশো টানতে পারব না৷'

'এতকাল সবাই পেরেছে! তুমি পারবে না?'

'আজ্ঞে না৷ ভাড়া মিটিয়ে দিন৷ চলে যাই৷ দিনকাল খারাপ৷ আমি বলেই এলুম এ তল্লাটে৷'

'দেখো বাপু, আমাকে দরিয়াগঞ্জের সবাই চেনে৷ তুমিই চেন না দেখছি৷'

ভরাট গলায় অন্য একজন বলল, 'তোমাকে রিকশোসুদ্ধু পদ্মায় ছুড়ে ফেলে দিতে পারি, জান?'

'ছেড়ে দে বাবা! আয়, একটু কষ্ট করে পায়ে হেঁটেই যাই৷'

এতক্ষণে চিনতে পারলুম৷ চাপা স্বরে কর্নেলকে বললুম, 'শেঠমশাইয়ের গলা মনে হচ্ছে?'

কর্নেলও চাপা গলায় বললেন, 'হ্যাঁ৷ শেঠমশাই আর গোবিন্দ৷'

রিকশোটা ক্রিং ক্রিং করে ঘণ্টা বাজিয়ে ঘুরছিল৷ তার জুগজুগে আলোয় শেঠমশাই আর গোবিন্দকে এক বারের জন্য দেখা গেল৷ রিকশোটা পশ্চিমে শহরমুখো হয়েই যেন তাড়া-খাওয়া প্রাণীর মতো পালিয়ে গেল৷ পালোয়ান গোবিন্দের হুমকিই হয়তো এর কারণ৷ শেঠমশাইয়ের হাতে সেই বেঁটে নকশাদার লাঠি বা ছড়িটাও দেখতে পেলুম৷

কিছুক্ষণ পরে বললুম, 'শেঠমশাই কি নাতিদের উদ্ধার করতে এলেন?'

'তাই তো মনে হচ্ছে৷'

'কিন্তু বাচ্চু ফকিরের পান্না তো পঞ্চাশ বছর আগে ওঁর ব্যাঙ্ক থেকে হারিয়ে গেছে! ওটা না পেলে উনি নাতিদের উদ্ধার করবেন কী করে?'

কর্নেল কোনো জবাব দিলেন না৷ ফের পদ্মার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে সেই আজব ছড়াটা আউড়ে তারপর আপনমনে আগের মতোই বললেন, 'সমস্যা! দুই ডাকের মধ্যিখানে পদ্মা একখানা হাত ঢুকিয়ে দিয়েছে৷'

'ঃআ৷ ব্যাপারটা কী?'

'বাঘ৷'

রাগ করে বললুম, 'হোটেলে ফিরে যাচ্ছি৷ আপনি এখানে দাঁড়িয়ে থাকুন৷ তারপর সত্যি বাঘ এসে হালদারমশাইয়ের মতো আপনাকে পেটে চালান দিক৷'

পা বাড়িয়েছি, কর্নেল বললেন, 'জয়ন্ত! বাঘের চেয়ে সাংঘাতিক হল ভূত৷'

'আমি ভূত বিশ্বাস করি না৷'

'তুমি বিশ্বাস না করলে কী হবে, ওই দেখো, ভূত ঘুরে বেড়াচ্ছে পদ্মার চরে৷'

চমকে উঠে পদ্মার দিকে তাকিয়ে দেখি, শূন্যে ভেসে আছে একটা সবুজ আলো৷ ঠিক যেমনটি বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের বাগানে দেখেছিলুম, ক্রিকেট বলের সাইজ সবুজ সেই ভূতুড়ে আলো৷ আলোটা কলকাতা থেকে এত দূরে চলে এসেছে৷ অজানা ভয়ে বুক কেঁপে উঠল৷ দম-আটকানো গলায় বলে উঠলুম, 'কর্নেল! সেই সবুজ আলো! ওখানে কী করছে ওটা?'

কর্নেল আস্তে বললেন, 'ত্রিভুবন দাশের কাজকারবার বোঝা কঠিন৷ যাই হোক, তার সঙ্গে বোঝাপড়া পরে হবে৷ এসো, শেঠমশাই কী করছেন দেখি৷'

রাস্তায় নেমে বললুম, 'আবার ওঁদের বাড়িতে যাওয়া ঠিক হচ্ছে কি? খেঁকি কুকুরটা নাহয় আপনার ফর্মুলা-২০ শুঁকে লেজ গুটিয়ে পালাবে৷ কিন্তু এবার শুধু হোসেন পালোয়ান নয়, গোবিন্দ পালোয়ানও তার পাশে৷ তা ছাড়া হোসেনের বউও যা দজ্জাল! শুনলুম, হালদারমশাইয়ের মতো প্রাক্তন দুঁদে দারোগাকে কাহিল করে ছেড়েছিল৷'

কর্নেল বললেন, 'জয়ন্ত, স্পিকটি নট৷'

সেই এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তায় অন্ধকারে ঠোক্কর খেতে খেতে কর্নেলকে অনুসরণ করছিলুম এবং ভাবছিলুম, আর অন্তত সন্ধ্যের মুখে তাঁর সঙ্গে কোথাও বেরোচ্ছি না৷ প্যালেস হোটেলের ব্যালকনিতে বসে নিরাপদে রবীন্দ্রসংগীত ভাঁজতে ভাঁজতে পদ্মার শোভা দেখব, কিংবা দুবেজির কাছে স্মাগলিং কারবারের রোমাঞ্চকর গল্প শুনব৷ হুঁ, সীমান্তে স্মাগলিং নিয়ে ফলাও করে একখানা রিপোর্তাজ লিখে দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় প্রকাশ করলে হিড়িক পরে যাবে সন্দেহ নেই৷ রবীন্দ্রসংগীত গাওয়া বা পদ্মার শোভা দেখার চাইতে বরং তাতেই আমার বেশি লাভ৷

খেঁকি কুকুরটা কয়েকবার ডেকে চুপ করে গেল৷ বাড়িটাতে বিদ্যুৎ নেই৷ লন্ঠনের আলো দেখিয়ে হোসেন শেঠমশাই ও গোবিন্দকে ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে৷

কর্নেল ভাঙা পাঁচিলের পাশে আমাকে টেনে বসিয়ে দিলেন৷ কুকুরটার আর সাড়াশব্দ নেই৷ বুঝলুম, স্বয়ং ফর্মুলা-২০ কাছাকাছি কোথাও ঘাপটি মেরেছে, সেটা টের পেয়েছে বেচারা৷ ভেতরে শেঠমশাইয়ের গলা শোনা গেল, 'হর! অ্যাই হর! বেরোচ্ছিসনে কেন? দরজা খোল হতভাগা! নইলে গোবিন্দ দরজা ভেঙে ফেলবে বলে দিচ্ছি৷'

একটু পরে হরবাবু সাড়া দিলেন, 'কী হয়েছে? অমন চ্যাঁচাচ্ছেন কেন?'

'চ্যাঁচাব না? আমার সাড়া পেয়েই দরজা বন্ধ করে দিলি৷ দেখিনি বুঝি?'

'ছবি আঁকছিলুম৷ জানেন না, দরজা বন্ধ করে ছবি আঁকি?'

'এ কি ছবি আঁকার সময়? ওদিকে সাংঘাতিক বিপদ৷ একটার পর একটা বিপদ ঘটছে৷'

'শুনেছি৷ কিছুক্ষণ আগে কর্নেলসায়েব এসে সব বলে গেছেন৷'

'শুনেও চুপ করে আছিস? দিব্যি ছবি আঁকছিস! এমনকী, আমি এমন করে কেন এসে হাজির হয়েছি, তাতেও তোর মাথাব্যথা নেই? কই দেখি, কী ছবি আঁকছিস?'

'আপনি অদ্ভুত মানুষ! অতদূর থেকে এসেছেন৷ বিশ্রাম করবেন, তা নয়...'

'বিশ্রাম! বলছিস কী তুই! কোমল-কোরককে তপো হতচ্ছাড়া কিডন্যাপ করেছে৷ বাচ্চু ফকিরের পান্না দাবি করেছে৷ না দিলে তাদের বলি দেবে বলে হুমকি দিয়েছে৷ জানিস এসব কথা?'

'জোক৷ আপনি জানেন না, কোমল-কোরক এমন জোক কতবার করেছে?'

'এবারেরটা মোটেই জোক নয়৷ পুলিশ তপোর বাসায় গিয়েছিল৷ দরজায় তালা আঁটা৷ ঃও৷ দুধ দিয়ে কালসাপ পুষেছিলুম!'

হরবাবু জোর-গলায় বললেন, 'জোক! আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন৷ কোমল-কোরকের কোনো ক্ষতি হবে না৷'

'তোর কথাবার্তা খুব সন্দেহজনক, হর! মনে হচ্ছে, এর পেছনে তোরই কারসাজি আছে৷'

'কী বলছেন যা-তা?'

'হ্যাঁ৷ তপোর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে তুই-ই কোমল-কোরককে লুকিয়ে রেখেছিস!'

'বাবা! বড্ড বাড়াবাড়ি করছেন আপনি!'

শেঠমশাই গলা চড়িয়ে বললেন, 'তোকেই পুলিশে ধরিয়ে দেব৷ বাচ্চু ফকিরের পান্নাটা আমার কাছ থেকে আদায় করে কাউকে বেচবার তাল করেছিস তুই! কিন্তু জেনে রাখ, তুই মাথা ভাঙলেও ও-জিনিস তোকে দেব না৷'

'আপনার মাথার ঠিক নেই দেখছি৷ কী আবোল-তাবোল বলছেন?'

'ঠিকই বলছি৷ এবার বুঝতে পেরেছি, তুই কেন সবুজ বল আঁকিস! পরোক্ষে তুই আমাকে ব্ল্যাকমেল করতে চাস৷ তুই ভালোই জানিস, আমি সবুজ বল দেখলে কষ্ট পাব৷ এ একটা মেন্টাল টরচারের কারচুপি৷ নিজের বাবাকে তুই কষ্ট দিয়ে বাচ্চু ফকিরের পান্নাটা আদায় করতে চাস, এই তো!' বলে বৃদ্ধ শেঠমশাই হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন৷ গোবিন্দ তাঁকে ধরে বারান্দার একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল৷ হরবাবুকে দেখলুম, শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ লন্ঠনটা টেবিলের ওপর৷

এই নাটকীয় ঘটনার বাকি অংশ দেখার সুযোগ পেলুম না৷ হঠাৎ কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, 'চলে এসো৷' তারপর গুড়ি মেরে পাঁচিলের ধারে ধারে ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলেন৷ অন্ধকারে এভাবে চলাফেরা ওঁর পক্ষে সহজ৷ কিন্তু আমার অবস্থা শোচনীয়৷ শিশিরে ভিজে জবুথবু তো হচ্ছি, তার সঙ্গে সাপের ভয়৷ প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা হচ্ছে, এই বুঝি ফোঁস করে ছোবল মারবে৷ এমন জায়গায় সাপখোপ থাকা খুবই স্বাভাবিক৷ শুধু একটাই ভরসা, কর্নেল আগে এবং আমি ওঁর পেছনে, সাপের ছোবল প্রথমে ওঁরই খাওয়ার কথা৷

এবং বাঘ! কথায় বলে, আগে গেলে বাঘে খায়৷ হালদারমশাইকে যদি সত্যি বাঘে খেয়ে থাকে, এমনি অবস্থাতেই খাওয়া সম্ভব৷ এবার কর্নেলকেও খাবে৷ খাওয়ার আগে হালুম তো করবেই৷ শোনামাত্র আমি পিঠটান দেব৷

একটু পরে ঘুরঘুট্টে অন্ধকারে খস খস খড় খড় শব্দ হল৷ পরমুহূর্তে কী একটা ঘটল৷ কে কার ওপর ঝাঁপ দিল যেন৷ তার মানে, নির্ঘাত বাঘ! গোয়েন্দাখেকো সেই বাঘটাই হবে৷ জাপটাজাপটি, ধস্তাধস্তির শব্দও শুনতে পেলুম৷ হাতে টর্চ আছে৷ কিন্তু ভড়কে যাওয়ার দরুন জ্বালতে একটু দেরি হল৷

সেই আলোয় প্রত্যাশা অনুযায়ী কর্নেলকে ধরাশায়ী দেখলুম, সেটা ঠিক৷ কিন্তু এইমাত্র যে প্রাণীটি গুলতির বেগে ঝোপঝাড়, ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে উধাও হয়ে গেল, তার গায়ে ডোরাকাটা দাগ নেই এবং চারখানা ঠ্যাংও নেই তার৷ সে নিছক দু-ঠেঙে প্রাণী, কর্নেল বা আমার মতোই৷

কর্নেল ব্যস্তভাবে বললেন, 'টর্চ নেভাও! হোসেন দেখতে পাবে৷'

টর্চ নিভিয়ে বললুম, 'কী আশ্চর্য!'

'আশ্চর্য তো বটেই!' কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'বাঘের বদলে মানুষ! তবে তার চেয়েও যেটা আশ্চর্য, সেটা হল, তুমি ওকে চিনতে পারলে না৷'

চমকে উঠে বললুম, 'হুঁ, চেনা চেনা মনে হচ্ছিল যেন৷ কিন্তু...'

'চুপ! হোসেন শুনতে পাবে৷ চলো, হোটেলে ফেরা যাক৷'

কিছুক্ষণ পরে হোটেলে ফিরে কফি খেতে খেতে বললুম, 'এই কেসের ব্যাপারে একটা থিয়োরি খাড়া করেছিলুম৷ নেতিয়ে গেছে৷ রবিঠাকুরের বাচস্পতি মশাইয়ের ভাষায় বলতে গেলে আমার 'আন্তারা ফাঁচকলিয়ে' গেছে এবং 'মাথাটা তাজঝিম-তাজঝিম' করছে৷'

কর্নেল জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে বললেন, 'এই জিনিসটা দেখলে তোমার আন্তারা আরও ফাঁচকলিয়ে যাবে এবং মাথাটা আরও তাজঝিম-তাজঝিম করবে৷'

টেবিলের ওপর জিনিসটা রাখলেন কর্নেল৷ অবাক হয়ে বললুম, 'এ আবার কী বস্তু?'

'গোঁফ-গালপাট্টার অংশ,' কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন৷ 'পরচুলাটাও সম্ভবত খসে গেছে৷ ভোরবেলা খুঁজে বের করা যাবে৷'

'সেই লোকটা!' লাফিয়ে উঠলুম উত্তেজনায়, 'সেই গোঁফ-গালপাট্টাওয়ালা লোকটা!'

'হ্যাঁ, তোমার সন্দেহভাজন লোকটাই বটে৷' কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বললেন, 'তবে ছদ্মবেশ ধরার ব্যাপারে একেবারে আনাড়ি৷'

'আনাড়ি কী বলছেন? অমন করে আপনার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল!'

'না ডার্লিং! আমিই ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলুম৷'

'ওকে অন্ধকারে দেখতে পেলেন কী করে?'

'তুমি তো জান, আমি রাতচরা প্রাণীদের মতো অন্ধকারেও দিব্যি দেখতে পাই৷ না, দেখতে পাওয়া বললে ভুল হবে৷ টের পাই৷ সামরিক জীবনে জঙ্গলে গেরিলা-যুদ্ধের তালিম নিয়েছিলুম৷ কান, জয়ন্ত! নিছক দুটো কানই রাতবিরেতের জঙ্গলে কিছু টের পাওয়ার জন্য যথেষ্ট৷ শব্দটা কোনখান থেকে আসছে, স্বাভাবিক শব্দ না সন্দেহজনক শব্দ, সেটা কানে শুনে আঁচ করতে হয়৷ তবে তোমার এই সন্দেহভাজন লোকটিকে পাকড়াও করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না৷ আমার লক্ষ্য ছিল ওর পরচুলা৷ কিন্তু দুঃখের বিষয়, ওর গোঁফ আর একদিকের গালপাট্টাই হস্তগত করতে পারলুম শুধু৷ পরচুলাটা...' কর্নেল একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, 'পরচুলাটা খসে পড়া উচিত৷ অবশ্যই উচিত৷ ভোরবেলা খুঁজতে বেরোব৷'

'লোকটা তো এই হোটেলেই উঠেছে৷ দুবেজিকে ওর রুম নম্বর জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে৷ তারপর সরাসরি ওকে চার্জ করলেন...'

কর্নেল আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, 'আগে বাঘ, জয়ন্ত!'

'আবার বাঘ!'

'হুঁ, বাঘ৷ তারপর হালদারমশাই৷'

বিরক্ত হয়ে উত্তরের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালুম৷ এদিকে পদ্মা৷ অন্ধকার ও কুয়াশায় পদ্মাকে এখন আলাদা করে চেনা যায় না৷ দূরে ও কাছে আলো জুগজুগ করছে৷ জেলে নৌকোর আলো৷ একটু পরে সেইসব হলুদ আলোর ওপর হঠাৎই সেই সবুজ আলোটা ফুটে উঠল৷ কিছুক্ষণ স্থির থাকার পর সেটা নিভে গেল৷ একটু পরে আবার জ্বলল৷ তারপর নাচ জুড়ে দিল যেন৷ এদিক থেকে সেদিক, নীচে থেকে ওপরে৷ ডাকলুম, 'কর্নেল! কর্নেল! দেখে যান৷'

কর্নেল এলেন না৷ চুরুটের ধোঁয়ার ভেতর বললেন, 'তুমিই দেখো, ডার্লিং!'

'ত্রিভুবন দাশ সবুজ আলোর বল নিয়ে ক্রিকেট খেলছে৷'

'সবুজ সংকেত, জয়ন্ত!'

'কীসের সংকেত?'

'ত্রিভুবন দাশ বলছে, চলে এসো৷'

'কাকে বলছে?'

'হরবাবুকে৷'

যত কথা বলব, তত হেঁয়ালি শুনব৷ কাজেই চুপ করে গেলুম৷ পদ্মার দিকে ঘুরে সবুজ আলোর বলটার খেলা দেখতে থাকলুম৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত থাকলে খেলাটা জমত ভালো৷ কাল পোস্টাপিসে গিয়ে টেলিফোনে ওঁকে ট্রাঙ্ক কল করতে হবে৷

কর্নেলের ডাকে চোখ খুলে দেখি, পুবের জানলা দিয়ে একরাশ রোদ ঢুকেছে ঘরে৷ বললেন, 'উঠে পড়ো, ডার্লিং! আটটা বাজে৷'

প্রকৃতিবিদের টুপিতে মাকড়সার ছেঁড়া জাল, শুকনো পাতা৷ সাদা দাড়িতে জ্বলজ্বল করছে একটা নীল পোকা৷ হান্টিং বুটে জলকাদার ছোপ৷ ঘাসের কুটো সেঁটে আছে৷ হাতে প্রজাপতি-ধরা জালের স্টিক৷ বাইনোকুলারও ঝুলছে বুকের ওপর৷ অভ্যাসমতো প্রাঃতভ্রমণে বেরিয়েছিলেন এবং প্রজাপতি ধরাও উদ্দেশ্য ছিল৷ তারপর মনে পড়ে গেল পরচুলাটার কথা৷ বললুম, 'পরচুলাটা খুঁজতে যাননি?'

কর্নেল মাথা নাড়লেন৷ মাথা নাড়ার সঙ্গে দাড়িও নড়ল৷ নীল রঙের পোকাটা সঙ্গেসঙ্গে যেন কোনো বিপদের আশঙ্কা করে উড়ে পালাল৷ নিরাশ মুখে বললেন, 'যা শিশিরের অত্যাচার! প্রজাপতিগুলোও বেরোতে বড্ড বেশি দেরি করে আজকাল৷ শিশির না শুকোলে বেরোবেই না৷ তবে প্রচুর হাঁস দেখে খুশি হয়েছি৷ একটা জেলে-নৌকোর সঙ্গে কথা হয়েছে৷ মন্দিরের চরে পৌঁছে দেবে৷ ওদিকটায় নাকি আরও বেশি হাঁস দেখা যায়৷ তা ছাড়া মন্দিরের চরে প্রজাপতিও নাকি প্রচুর৷ জয়ন্ত, তুমি কি জগন্নাথ-প্রজাপতির নাম শুনেছ?'

'না,' বলে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলুম৷ কী প্রশ্নের কী জবাব!

'ঝটপট রেডি হও৷ ব্রেকফাস্ট সেরে আমরা বেরোব,' কর্নেল পেছন থেকে ঘোষণা করলেন৷

বাথরুম থেকে বেরিয়ে দেখি, ব্রেকফাস্ট এসে গেছে৷ একটু পরে দুবেজি এলেন হন্তদন্ত হয়ে৷ বললেন, 'গত রাতে একটা ভূতুড়ে কাণ্ড, কর্নেল! দরিয়াগঞ্জ তোলপাড় হচ্ছে সেই নিয়ে৷'

কর্নেল ওমলেটের টুকরো মুখে গুঁজে বললেন, 'সবুজ আলো?'

'আপনি দেখেছেন?' দুবেজি উত্তেজিতভাবে বললেন৷ 'তাহলে তো ব্যাপারটা সত্যি৷ গত রাতে মন্দিরের চরের ওপর ওই ভূতুড়ে আলো দেখে তল্লাটের সব মাছধরা নৌকো পালিয়ে এসেছে৷'

'শুনে এলুম৷'

'বর্ডার সিকিউরিটির ক্যাম্পে খবর দেওয়া হয়েছিল৷ ওরা বলছে, স্মাগলারদের সিগন্যাল৷ কিন্তু কথাটা হল, এর আগেও মন্দিরের চরে অনেক ভূতুড়ে ব্যাপার লোকে দেখেছে৷ তাই রাতবিরেতে ওই চরে পারতপক্ষে কোনো জেলে নৌকো ভেড়ায় না৷'

জিজ্ঞেস করলুম, 'মন্দিরের চর কেন বলা হয়, দুবেজি?'

দুবেজি মুখে রহস্যের ভাব ফুটিয়ে বললেন, 'ওটা আসলে চর বলতে যা বোঝায়, ঠিক তা নয়৷ বছর তিরিশেক আগেও ওই মাটিটা দরিয়াগঞ্জের অংশ ছিল৷ পদ্মার ব্যাপার-স্যাপার তো জানেন! মাঝখানে ঢুঁ মেরে ঢুকে ওই মাটিটাকে আলাদা করে দিয়েছে৷ আসল পদ্মা মন্দিরের চরের ওপারে৷ বাঁধের নীচে যেটা দেখেছেন, ওটা একটা শাখা৷ শাখাটা পেরোলেই মন্দিরের চর৷'

'ওখানে মন্দির আছে বুঝি?'

'কয়েকটা মন্দিরই ছিল৷ এখন ভেঙেচুরে গেছে৷ শুধু শিবমন্দিরটাই আস্ত আছে৷ তবে দরিয়াগঞ্জের লাগোয়া ছিল যখন, তখন পুজোআচ্চা হত৷ আলাদা হয়ে যাওয়ার পর আর মেরামত হয়নি৷ তা ছাড়া বর্ডার এলাকা৷ যখন-তখন দু-দেশের সেপাইদের মধ্যে গুলি ছোড়াছুড়ি হত৷ বাংলাদেশ হওয়ার পর সেটা থেমেছে৷ কিন্তু এখন স্মাগলারদের যা দৌরাত্ম্য!'

দুবেজি স্মাগলারদের গল্প শুরু করলেন৷ ব্রেকফাস্ট শেষ করে কফি খেয়ে কর্নেল বললেন, 'আমরা বেরোচ্ছি, দুবেজি! হুঁ, আপনার আট নম্বর রুমের ভদ্রলোক ফিরেছেন কি?'

দুবেজির মুখে উদবেগ ফুটে উঠল৷ 'না৷ খুব ভাবনায় পড়ে গেছি৷ আমার ধারণা, লোকটা স্মাগলার৷ সেজন্যই ভাবনা হচ্ছে, ওর একটা কিছু ঘটে থাকলে গভর্নমেন্ট আমাদেরও টানাটানি করবেন৷ এ-হোটেলের ওপর এমনিতেই পুলিশের নজর আছে৷ তারপর ধরুন, কাস্টমসের লোকেদেরও নজর আছে৷ শুধু মালিকের নামডাকের জোরে রক্ষে৷'

এই সুযোগে বললুম, 'গোঁফ-গালপাট্টাওয়ালা লোকটার কথা বলছেন কি দুবেজি?'

'হ্যাঁ৷ কাল বিকেলে এসে ঘর বুক করলেন ভদ্রলোক৷ কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে গেলেন৷ এখনও পর্যন্ত নিপাত্তা৷ কী করা যায়, ভেবে পাচ্ছি না!'

'নাম কী ভদ্রলোকের?'

দুবেজি একটু হাসলেন, 'স্মাগলার হলে আসল নামধাম তো হোটেলের খাতায় লিখবে না৷ লিখেছে, স্বপন মজুমদার৷'

'পুলিশে খবর দেওয়া উচিত, দুবেজি! আর দেরি করবেন না৷'

কর্নেল বললেন, 'ফিরবেন যথাসময়ে৷ ও নিয়ে দুবেজির ভাবনার কারণ নেই৷ দুবেজি, আপনি পুলিশ-টুলিশ করতে যাবেন না৷ আমার এই তরুণ বন্ধুটির পরামর্শ কানে নেবেন না৷ বুঝতে পারছেন না, ও একজন রিপোর্টার? অতএব ও এই সুযোগে একখানা খবরের দাঁও মারতে চায়৷'

কর্নেল অট্টহাসি হাসলেন৷ দুবেজিও হাসলেন৷ বললেন, 'তা যা বলেছেন৷ কাগজের লোকেরা খবরের গন্ধ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে৷ তবে মনে হচ্ছে আট নম্বর ঘরের লোকটা শেষ পর্যন্ত খবরই হবে৷'

'হবে,' কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, 'কিন্তু এখনও দেরি আছে৷ আপনি মুখটি বুজে থাকুন, দুবেজি!'

হোটেল থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর্নেলকে বললুম, 'ওই স্বপন মজুমদার ত্রিভুবন দাশের এক স্যাঙাত৷'

কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না৷ ফটক পেরিয়ে বাঁধের দিকে হাঁটতে থাকলেন৷ বাঁধে উঠে নীচের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'নৌকোটা এসে গেছে৷ এসো জয়ন্ত, মন্দিরের চরে তোমাকে জগন্নাথ-প্রজাপতি দেখাব৷'

বাঁধের ঢালে পাথরের চাবড়ার খাঁজে পা রেখে সাবধানে দু-জনে নেমে গেলুম৷ জেলেডিঙির হালে এক বুড়ো, দাঁড়ে এক জোয়ান৷ ছইয়ের সামনে জালের স্তূপ৷ নৌকোর মুখ মন্দিরের চরের দিকে ঘুরল৷ কর্নেল বুড়ো লোকটির সঙ্গে গল্প করতে থাকলেন৷ গত রাতের সেই সবুজ আলোর গল্পও চলতে থাকল৷ বুড়ো লোকটির মতে, মন্দিরের চরে মন্দিরের পুরোনো দেবতা ফিরে এসেছেন৷ ভক্তদের ইশারা দিচ্ছেন, পুজোআচ্চা বন্ধ রেখেছিস কেন? পুজো দে৷ নইলে সর্বনাশ হবে৷ কিন্তু তার জোয়ান ছেলের মতে, 'মাগলার'! সে বারবার 'মাগলার' বলায় তার বাবা খুব চটে গেল৷ বলল, 'কী খালি 'মাগলার মাগলার' করছিস! তুই জানিস কিছু? তখন তোর জম্মোই হয়নি৷ ওই মাটি আর গঞ্জের মাটি এক ছিল৷ দেশ ভাগ না হবে, না দেবতার কোপ পড়বে৷ দেবতা মানুষের ওপর রাগ করে নিজের মন্দির সরিয়ে নিয়ে গেলেন৷ মাঝখানটা ধুয়ে-মুছে ভাসিয়ে দিলেন জলে৷'

চরে ঘন জঙ্গল৷ প্রচুর ইট-পাটকেল এবং পাথরের স্ল্যাব পড়ে আছে৷ বোঝা যায়, সত্যিই একসময় এটা দরিয়াগঞ্জের সঙ্গে যুক্ত ছিল৷ নৌকোর বুড়ো লোকটি ভাড়া আর বকশিশ নিয়ে সেলাম ঠুকে কর্নেলকে বলল, 'কখন ফিরবেন স্যার? বললে পরে নৌকো নিয়ে আসব টাইমমতো৷'

কর্নেল তাকে প্রচণ্ড অবাক করে বললেন, 'আমরা আর ফিরব না৷'

বুড়োর ছেলে মুচকি হেসে বলল, 'ওপারে যাবেন তো? দিনের বেলা পারবেন না কিন্তু৷ ধরা পড়লেই বিপদ৷ তবে যদি বলেন, মাঝরাত্তিরে নৌকো এনে রাখব৷ ওপারে পৌঁছে দেব৷ একশো টাকা লাগবে৷'

কর্নেল তাকেও অবাক করে বললেন, 'আমরা উড়তে জানি, বুঝলে তো? পদ্মা পেরিয়ে চলে যাব পাখির মতো৷'

বাবা-ছেলে দু-জনেই গুম হয়ে নৌকো নিয়ে চলে গেল৷ পাড়ের দিকে নয়, মূল পদ্মার দিকে নৌকোর গতি৷ মাছ ধরতেই চলেছে বোঝা যায়৷

চর না বলে টিলা বলাই উচিত৷ উঠতে উঠতে কর্নেল একজায়গায় থমকে দাঁড়ালেন৷ বললেন, 'দুই ডাক৷ হুঁ, আরও একটু হাঁটতে হবে৷'

বললুম, 'কাল সন্ধ্যেয় এক ডাক ছিল৷ এখন হল দুই ডাক৷ কীসের ডাক?'

'মানুষের৷'

'তার মানে?'

'দুই ডাকে বাট৷'

'সেই উদ্ভুট্টে ছড়াটা,' হাসতে হাসতে বললুম, 'এ বয়সেও ছড়া নিয়ে আপনি মাথা ঘামান!'

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, 'জয়ন্ত, এ হল আগের আমলে দূরত্ব বোঝানোর হিসেব৷ এক ডাক মানে একখানে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করে কাউকে ডাকলে যতদূর ডাক পৌঁছোয়, সেটাই হল এক ডাকের পথ৷ আনুমানিক হিসেবে আধ মাইল দূরত্ব৷ দুই ডাকে বাট! বাট মানে পথ৷ দুই ডাক প্রায় এক মাইল দূরত্ব৷ ছড়ায় আছে: 'দুই ডাকে বাট/উত্তরে হাঁট৷' আমরা উত্তরেই এসেছি৷ এরপর ছড়া বলছে: 'ঘাটে মহাবল/তার নীচে জল৷' একটু সমস্যা আছে এবার৷ এই মাটিটা যখন গঞ্জের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তখন শেঠমশাইদের বাড়ির গেট থেকে সেই ঘাটের দূরত্ব ছিল প্রায় এক মাইল৷ পদ্মা সেই ঘাটের কী দশা করেছে কে জানে৷ এসো তো৷ দেখা যাক৷'

Cov49

জঙ্গলে চরের মাথায় গিয়ে ওধারে বালিয়াড়ি দেখতে পেলুম৷ কর্নেল এদিক-ওদিক তাকিয়ে কিছু খুঁজছিলেন৷ গাছপালা-ঝোপঝাড়ের ভেতর ইট আর পাথরের স্ল্যাব ছড়িয়ে রয়েছে৷ কর্নেল বিড়বিড় করে আওড়ালেন, 'ঘাটে মহাবল/তার নীচে জল৷' তারপর হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে গেলেন সামনের দিকে, 'চলে এসো জয়ন্ত! পাওয়া গেছে৷'

কাছে গিয়ে বললুম, 'কী পাওয়া গেছে?'

'মহাবল!'

'মহাবল! সে আবার কী?'

'বাঘ৷'

চমকে উঠে বললুম, 'কই বাঘ? কোথায় বাঘ?'

'এই তো!' বলে কর্নেল তাঁর সামনে একটা ঝোপের ভেতর কিছু দেখালেন৷

উঁকি মেরে দেখি, একটা পাথরে তৈরি চতুষ্পদ প্রাণী কাত হয়ে পড়ে আছে৷ লেজটা ভাঙা৷ ওটা যে বাঘের মূর্তি, বুঝতে একটু দেরি হল৷ কালো পাথরের প্রাণীটির গায়ে টানা টানা দাগ খোদাই করা৷ হাসতে হাসতে বললুম, 'হালদারমশাই কি এই পাথুরে বাঘের কথাই বলেছিলেন আপনাকে?'

কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, 'মহাবল, ডার্লিং! মহাবল৷'

'কী আশ্চর্য!'

'আশ্চর্য নয় জয়ন্ত! বাঘকে কোনো কোনো অঞ্চলে মহাবল বলা হয়৷ পুজোও করা হয় মহাবলদেব নামে৷ একসময় এ-অঞ্চলে ভীষণ জঙ্গল ছিল৷ অথচ মাটি খুব উর্বর৷ তাই বাঘের উৎপাত থেকে বাঁচতে লোকেরা মহাবলদেবের পুজো করত৷'

'সুন্দরবনে দক্ষিণরায়ের পুজো হয়৷ এখানে তাহলে উত্তররায়ের পুজো হত বলুন?'

'না, জয়ন্ত! দক্ষিণরায় ব্যাঘ্রবাহন দেবতা৷ কিন্তু মহাবল নিজেই দেবতা৷' কর্নেল নীচে বালিয়াড়ির দিকে কয়েক-পা এগিয়ে গেলেন, 'এখানেই ঘাট ছিল৷ এখন বালির চড়া জমে গেছে৷ হুঁ, ছড়ায় বলছে: 'ওইখানে থাম/সিদ্ধ মনস্কাম৷' খুব ভালো কথা,' কর্নেল আপনমনে বলতে থাকলেন৷ 'ওইখানে থাম৷ হুঁ, থামলুম৷ আর এগোচ্ছিনে৷ কিন্তু মনস্কাম সিদ্ধ হওয়ার মতো তো কিছু দেখছিনে৷'

ঝোপের শেষে বালিতে ডুবে থাকা একটা পাথরের স্ল্যাবে বসে পড়লেন কর্নেল৷ বিড়বিড় করে ফের ছড়াটা আওড়ালেন৷ মুখে হতাশ ভাব৷ দাড়িতে আঁচড় কাটতে থাকলেন, 'ওইখানে থাম/সিদ্ধ মনস্কাম৷ থেমেছি৷ কিন্তু মনস্কাম সিদ্ধ হচ্ছে না৷ ভারি সমস্যায় পড়া গেল দেখছি৷ ও জয়ন্ত, তুমি একটু ভাবো তো! দু-জনে ভেবে যদি মনস্কাম সিদ্ধ হয়৷'

'কী মনস্কাম সিদ্ধ হবে, না জানলে মাথা ঘামানোর মানে হয় না৷'

কর্নেল কী জবাব দিতে যাচ্ছিলেন, সেই সময় বালিয়াড়ির শেষে পদ্মার ওপর কী একটা জিনিস আকাশে ভেসে আসছে দেখে বললুম, 'কর্নেল! ওটা কী দেখুন তো?'

কর্নেল চোখে বাইনোকুলার রেখে উড়ুক্কু জিনিসটা দেখলেন৷ তারপর তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন৷ মুখে হাসি ঝলমল করছে৷ বললেন, 'প্লেন, জয়ন্ত! চন্দ্রকান্তবাবু ছোটো প্লেনে চেপে উড়ে আসছেন৷ সত্যি উনি! এসো, এসো! আমরা ওঁকে ওয়েলকাম করি৷ এ সময়ে ওঁকে আমাদের খুবই দরকার ছিল৷ মেঘ না চাইতেই জল, জয়ন্ত!'

কর্নেল দু-হাত তুলে বালির চরে নেমে গেলেন৷ হাত দুটো জোরে নাড়তেও থাকলেন৷

কর্নেল বালির চরে দু-হাত তুলে নাচানাচি করতে থাকায় তাঁর টুপিটা পড়ে গেল৷ শরতের উজ্জ্বল রোদে ঝলমলিয়ে উঠল তাঁর প্রসিদ্ধ টাক৷ কাছে গিয়ে টুপিটা কুড়িয়ে তাঁর হাতে গুঁজে দিলুম৷ তখন টুপিটা নাড়তে থাকলেন৷

বালির চড়ায় যন্ত্রচালিত হ্যাং-গ্লাইডার নেমে পড়ল৷ চন্দ্রকান্ত বেরিয়ে এলেন৷ মুখে হাসি৷ আমরা দৌড়ে কাছে গেলে কর্নেলের মতো দু-হাত তুলে বললেন, 'এসে গেলুম৷ না এসে পারা গেল না৷'

কর্নেল খুশি হয়ে বললেন, 'ওয়েলকাম চন্দ্রকান্তবাবু! সুস্বাগতম!'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'এক মিনিট৷ একটু হাঁফ ছাড়ি৷ তারপর কথা হবে৷'

হাঁফ ছেড়ে চন্দ্রকান্ত বললেন, 'আসতেই হল, তার কারণ এই চিঠি৷ পড়ে দেখুন৷'

পকেট থেকে একটা ভাঁজকরা কাগজ বের করলেন বিজ্ঞানী৷ কর্নেল সেটা নিয়ে চোখ বুলিয়ে দেখার পর আমাকে দিলেন৷ পড়ে দেখি, ওতে লেখা আছে:

'ভাই চাঁদু,

একটা জরুরি ব্যাপারে তোমার সাহায্য নিতে চাই৷ কিন্তু তুমি তো আমাকে দেখলেই চটে যাও৷ এদিকে তোমার বাড়ি গিয়ে দেখা করব, তার উপায় নেই৷ ধুন্ধুমারকে লেলিয়ে দেবে৷ অগত্যা রাতবিরেতে গিয়ে তোমাকে গ্রিন সিগন্যাল দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করছিলুম, একটা অসাধারণ জিনিস আমার হস্তগত হয়েছে৷ ভেবেছিলুম, তুমি নিজেই আগ্রহী হয়ে যোগাযোগ করবে৷ কিন্তু উলটো বুঝলে ভায়া! আমার গ্রিন সিগন্যালকে তুমি পাকড়াও করার চেষ্টা করলে৷ অগত্যা এই চিঠি লিখতে হল৷ পদ্মা সীমান্তে দরিয়াগঞ্জের সামনে যে জঙ্গুলে চরটা আছে, সেখানে অবিলম্বে আমার সঙ্গে দেখা করো৷ দু-জনে কাজে নামলে একটা সাংঘাতিক কীর্তি করে ফেলব৷ দু-জনেই কোটিপতি হয়ে যাব৷ বাকি সব কথা মুখোমুখি হবে৷ তবে সাবধান, গোপনে একা যাবে৷ আমার পেছনে গোয়েন্দা লেগেছে৷ ইতি,

তোমার গুণমুগ্ধ পাঁচু৷'

বললুম, 'পাঁচু কে?'

খিখি করে হাসলেন চন্দ্রকান্ত, 'বুঝলেন না? সেই চোর ধাতুবিজ্ঞানী ত্রিভুবন দাশ৷ ওর ডাকনাম পাঁচু৷ বলতে ভুলে গিয়েছিলুম৷'

কর্নেল বললেন, 'হালদারমশাইয়ের ফ্ল্যাটে পাওয়া চিঠিটার হাতের লেখার সঙ্গে ওই লেখার মিল আছে, কীভাবে পেলেন এটা?'

'গেটের লেটার বক্সে,' চন্দ্রকান্ত চাপা গলায় বললেন, 'চিঠিটা গতকাল সকালে আবিষ্কার করেছি৷ কিন্তু আমার ব্যাপার তো জানেন! কম্পিউটারে হিসেব-নিকেশ না করে কোনো সিদ্ধান্ত নিই না৷ কাল সারাদিন এই নিয়ে খুব পরিশ্রম করলুম৷ প্রতিবার কম্পিউটার থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি হচ্ছিল৷ অর্থাৎ পাঁচুর সংসর্গে গেলেই বিপদে পড়ব৷ গত রাতে হঠাৎ মনে পড়ে গেল, জয়ন্তবাবু কোন এক ফকিরের হারানো পান্নার কথা বলছিলেন৷ তারপর আপনিও জিজ্ঞেস করেছিলেন, মহাজাগতিক তেজস্ক্রিয় রশ্মিতে কোনো অ-তেজস্ক্রিয় খনিজ ধাতুরশ্মির সাহায্যে ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব কি না! ব্যাস! পাঁচুর চিঠির ডাটা আর আপনাদের দু-জনকার বক্তব্যের ডাটা একসঙ্গে কম্পিউটারে ফিড করলুম৷ রেজাল্ট বেরিয়ে এল: 'গো! চলে যাও৷ সুতরাং চলে এলুম৷'

বললুম, 'আপনি বলেছিলেন হারানো পান্নাটা আড়াইশো কিলোমিটার দূরে আছে৷ আগে সেটা খুঁজে দেখা উচিত৷'

চন্দ্রকান্ত মিটিমিটি হেসে বললেন, 'খুঁজতেই হবে৷ পাঁচুর উদ্দেশ্য তো বুঝে গেছি৷ 'সাংঘাতিক কীর্তি' মানে মারণাস্ত্র৷ কোনো ধনী দেশের কাছে সেটা বেচলেই কোটিপতি হয়ে যাবে পাঁচু৷ এখন ওর দরকার একটা বড়ো সাইজের রত্ন৷'

কর্নেল বললেন, 'বাচ্চু ফকিরের হারানো পান্নাটা পেলে পাঁচুবাবুর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়৷'

চন্দ্রকান্ত জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা সিগারেট-লাইটারের মতো যন্ত্র বের করলেন, 'এটা একটা ডিটেক্টর৷ সাধারণ মেটাল-ডিটেক্টর বলতে যা বোঝায়, তা নয়৷ এটা হল নন-রেডিয়ো অ্যাক্টিভ মেটাল-রে-ডিটেক্টর৷' উঠে দাঁড়ালেন বিজ্ঞানী৷ খুট করে যন্ত্রটার বোতাম টিপে চালু করলেন৷ ক্ষীণ পিঁপিঁ শব্দ শোনা গেল৷ অমনি চন্দ্রকান্ত প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'খোঁজ পাওয়া গেছে!'

চন্দ্রকান্ত এদিকে-ওদিকে যন্ত্রটা বাগিয়ে ধরে এগোচ্ছেন, পিছোচ্ছেন৷ ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে হাঁটাচলা করছেন৷ কখনো পিঁপিঁ আওয়াজটা বেড়ে যাচ্ছে, কখনো কমে যাচ্ছে৷ পাথুরে বাঘটার কাছে গিয়ে বললেন, 'শুনছেন তো? সিগন্যালের ফ্রিকোয়েন্সি এখানেই বেশি৷ তার মানে এখানেই আছে৷ কিন্তু এ-জিনিসটা তো নিরেট পাথর৷ আরে! এ তো দেখছি একটা পাথরের বাঘ!'

কর্নেল বললেন, 'হ্যাঁ৷ মহাবলদেব৷'

'আসুন তো এটাকে সরিয়ে দেখি৷'

তিন জনে চেষ্টা করেও পাথুরে বাঘটাকে নড়ানো গেল না৷ দরদর করে ঘাম ঝরছিল৷ বাতাস বন্ধ৷ হাত ব্যথা করছিল৷ কর্নেল বললেন, 'একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার চেষ্টা করা যাবে৷'

যন্ত্রটার সুইচ অফ করে চন্দ্রকান্ত বললেন, 'এই বাঘের তলায় পান্নাটা লুকোনো আছে৷ ধুন্ধুকে সঙ্গে আনতে পারলে ভালো হত৷ এটাকে তুলে দূরে ছুড়ে ফেলত৷'

'তার আগে আপনাদের ছুড়ে ফেলা হবে, একেবারে পদ্মায়৷'

আচমকা এই হুমকি শুনে তিন জনেই ঘুরে দাঁড়ালুম৷ পেছনে ভাঙাচোরা কয়েকটা পাথুরে থাম ঘিরে যথেষ্ট ঝোপ গজিয়েছে৷ আর সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং শেঠমশাই৷ তাঁর পাশে গোবিন্দ পালোয়ান৷

কর্নেল বললেন, 'আসুন শেঠমশাই! আপনি এখানেই আসবেন, জানতুম৷ তবে এমন অসময়ে দিনদুপুরে এসে পড়বেন ভাবিনি৷'

শেঠমশাই এগিয়ে এসে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তের দিকে চোখ কটমট করে তাকিয়ে বললেন, 'কে ইনি?'

'প্রখ্যাত বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত চৌধুরী৷'

'বিজ্ঞানী হোন আর যাই হোন, ওঁর কথাবার্তা ভালো নয়,' শেঠমশাই বললেন, 'মহাবলদেবকে উনি ছুড়ে ফেলার কথা বলছিলেন! মহাবলদেব এখন ঘুমোচ্ছেন বলেই পার পেয়ে গেলেন৷'

চন্দ্রকান্ত অবাক হয়ে বললেন, 'ঘুমোচ্ছেন? একেবারে সাউন্ড স্লিপ দেখছি! অবশ্য জ্যান্ত বাঘ এমন কাত হয়ে শুয়েই ঘুমোয়৷ কিন্তু এটা তো মরা বাঘ!'

শেঠমশাই খাপ্পা হয়ে বললেন, 'মরা বাঘ মানে?'

চন্দ্রকান্ত খিখি করে হাসলেন, 'মরা বই কী৷ পাথুরে বাঘ মরা ছাড়া আর কী?'

'গোবিন্দ!' শেঠমশাই হাঁকলেন৷ 'এই বিজ্ঞানী না টিজ্ঞানিকে পদ্মায় চান করিয়ে নিয়ে আয়৷'

গোবিন্দ চন্দ্রকান্তের দিকে এগিয়ে এলে কর্নেল মাঝখানে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আহা, এই বিপদের সময় গণ্ডগোল করা ঠিক নয়, শেঠমশাই! চন্দ্রকান্তবাবু বোধকরি ফসিলাইজড বাঘের কথাই বলতে চাইছেন৷ চন্দ্রকান্তবাবু, ইনিই সেই শেঠমশাই, যাঁর নাতিদের কিডন্যাপ করা হয়েছে৷'

চন্দ্রকান্ত নমস্কার করে বললেন, 'তাই বলুন৷ আমার আজকাল কী হয়েছে, নিজের স্মৃতি কাজ করে না৷ হাতের কাছে কম্পিউটার থাকলে ঠিকই জানিয়ে দিত, আপনিই তিনি৷'

কর্নেল বললেন, 'শেঠমশাই কি তাহলে বাচ্চু ফকিরের পান্নাটা দিয়ে নাতিদের উদ্ধার করতে এলেন?'

শেঠমশাই গম্ভীর মুখে বললেন, 'উপায় কী? আপনি তো কিছুই করতে পারলেন না৷ এখন আপনাদের অনুরোধ করছি, এখান থেকে চলে যান৷ পান্নাটা বের করে আমি শিবমন্দিরে গিয়ে বসে থাকব৷ ওরা কোমল-কোরককে সঙ্গে নিয়ে এলে তবেই পান্না দেব৷ নইলে গোবিন্দ যা করার করবে৷'

কর্নেল একটু হেসে সেই ছড়াটা আওড়ালেন:

'দুই ডাক বাট

উত্তরে হাঁট

ঘাটে মহাবল

তার নীচে জল

ওইখানে থাম

সিদ্ধ মনস্কাম!'

শেঠমশাই অবাক হয়ে বললেন, 'আপনি এ ছড়া জানেন দেখছি! কোথায় শুনলেন এ ছড়া?'

'শ্রীমান কোরকের খাতার পাতায় লেখা ছিল,' কর্নেল বললেন, 'তাহলে দেখছেন, ছড়াটার সূত্র আমি ঠিকই ধরতে পেরেছি এবং সঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি৷'

'পৌঁছেছেন৷ কিন্তু এখনও হাতড়ে বেড়াচ্ছেন অন্ধের মতো৷' শেঠমশাইয়ের মুখে বিদ্রূপ ফুটে উঠল, 'খুঁজে বের করতে পারেননি৷ পারবেনও না৷'

চন্দ্রকান্ত তাঁর খুদে যন্ত্রটা বাগিয়ে ধরে বললেন, 'আমি পারব৷' বলে গোবিন্দকে ডাকলেন, 'এই ভাই পালোয়ান! একটু হেল্প করো তো! এই বাঘটা, সরি, মহাবলদেবকে একটু উলটে দাও তো!'

যন্ত্রটা আবার পিঁপিঁ করে চ্যাঁচাতে থাকল৷ কর্নেল বললেন, 'থাক, চন্দ্রকান্তবাবু! শেঠমশাইয়ের মন ভালো নেই৷ গোবিন্দকেও ঘাঁটাবেন না৷ কারণ, আপনার ধুন্ধু এখন কাছে নেই৷'

চন্দ্রকান্ত গোবিন্দের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে যন্ত্রটা বন্ধ করলেন৷ কর্নেল এদিকে-সেদিকে একটুখানি পায়চারির ভঙ্গিতে হাঁটাচলা করার পর হঠাৎ চমকে দেওয়া কন্ঠস্বরে বলে উঠলেন, 'পেয়ে গেছি! পেয়ে গেছি!'

শেঠমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, 'তাই বুঝি? কই? বের করুন দেখি৷'

কর্নেল মহাবলদেবের মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ সেখানে একটা ভেঙে-পড়া নিটোল পাথরের থাম বিঘত খানেক উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ ওপরের দিকটা ভেঙে পড়ে ঝোপের ভেতর কয়েক টুকরো হয়ে ছড়িয়ে রয়েছে৷ এতক্ষণে লক্ষ করলুম, এই মহাবলদেবের রীতিমতো একটা থামওয়ালা মন্দির ছিল৷ ছাদের টুকরোগুলো কবে সরিয়ে সম্ভবত মহাবলদেবকে পুঃনপ্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু কাজটা এগোয়নি৷ হয়তো এই সীমান্ত এলাকায় দু-দেশের ফৌজি সংঘর্ষই তার কারণ৷ কর্নেল হাঁটু মুড়ে সেই থামটার গোড়ার দিকে ঝুঁকে পড়তেই শেঠমশাই বললেন, 'কর্নেল! আপনার জিত৷'

কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'আপনার রচিত ছড়ায় আছে: 'ওইখানে থাম৷ সিদ্ধ মনস্কাম৷' আমি ভেবেছিলুম, থামতে বলা হচ্ছে৷ কিন্তু আসলে আপনি একটা থাম বা স্তম্ভের কথাই বলেছেন৷ 'ঘাটে মহাবল/তার নীচে জল৷' এখানে ঘাটের ধাপ দেখতে পাচ্ছি৷ বালিতে ঘাটটা অবশ্য তলিয়ে গেছে৷ কিন্তু একসময় এখানে জল ছিল৷ 'তার নীচে জল/ওইখানে থাম/সিদ্ধ মনস্কাম৷' এই থামটাই ঘাটের ধারে টিঁকে থাকা শেষ থাম৷ কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, থামটার নীচে একটা ছিদ্র৷ কুশঘাসের আড়ালে ছিদ্রটা ঢাকা পড়েছে৷ ওই ছিদ্রটা একটা তালা বলেই মনে হচ্ছে৷'

শেঠমশাই বললেন, 'হ্যাঁ, তালা৷'

'এই তালার চাবি আপনার কাছে আছে?'

'আছে৷'

'আপনার হাতের ওই মোটা ছড়ির বাঁটের ভেতর লুকনো আছে৷'

শেঠমশাই হঠাৎ একটু চটে গেলেন, 'এত আপনার বুদ্ধিসুদ্ধি, অথচ আমার নাতিদের উদ্ধার করতে পারলেন না? আমাকে কিডন্যাপারদের দাবি মেনে নিতে কষ্ট করে ছুটে আসতে হল!'

কর্নেল হাসলেন, 'কোমল-কোরকের জন্য ভাববেন না, শেঠমশাই!'

'ভাবব না? কী বলছেন আপনি?'

'শেঠমশাই, আগে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন৷ তারপর আপনার নাতিদের উদ্ধারের চেষ্টা করব৷'

'কী আপনার প্রশ্ন?'

'আপনার ব্যাঙ্কের আলমারি থেকে সত্যিই কি বাচ্চু ফকিরের পান্না চুরি গিয়েছিল?'

শেঠমশাই ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বললেন, 'পুরোনো কথা চাপা আছে, চাপা থাক৷'

'শেঠমশাই! পান্না চুরি যায়নি৷ যায়নি, তার একমাত্র কারণ, ওটা এই থামের ভেতর লুকোনো আছে৷'

শেঠমশাই একবার কর্নেলের দিকে তাকিয়ে মুখ নামালেন৷ কিছু বললেন না৷

কর্নেল বললেন, 'আপনার ব্যাঙ্কের লগ্নিকরা টাকা অনাদায় হওয়াতে বিপদে পড়েছিলেন৷ আমানতকারীরা টাকার দাবিতে মামলা করেছিল৷ তাই পান্নাটা গোপনে বেচে তাদের টাকা শোধ করার মতলবে বাচ্চু ফকিরকে বলেছিলেন, ওটা হারিয়ে গেছে৷ বাচ্চু ফকির অভিশাপ দিয়ে চলে যান৷ তারপরই আপনার স্ত্রী দরিয়াগঞ্জের শিবমন্দিরে পুজো দিতে এসে স্নান করার সময় পদ্মায় তলিয়ে যান৷ অমনি আপনি ভয় পেয়ে যান৷'

'কে বলল এসব কথা?'

কর্নেল হাসলেন, 'আপনার ব্যাঙ্ক সম্পর্কে খোঁজখবর, কলকাতায় পুরোনো রেকর্ড ঘেঁটে জেনে এসেছি৷ আর আপনার স্ত্রীর দুর্ঘটনায় মৃত্যু সম্পর্কে দরিয়াগঞ্জে বিশদ তদন্ত করেছি৷ তা ছাড়া আপনি নিজেও এসব ঘটনা সংক্ষেপে বলেছেন আমাকে৷ শুধু বলেননি যে, পান্নাটা সত্যিই চুরি যায়নি৷ আমাকে আপনি বলেছেন, বাচ্চু ফকিরের কাছে ক্ষমা চাইতে বহুবার দরিয়াগঞ্জ ছুটে এসেছেন৷ কিন্তু তাঁর খোঁজ পাননি৷ ক্ষমা চাইতে নয়, বাচ্চু ফকিরকে তাঁর পান্না ফেরত দিতেই আসতেন আপনি৷ অভিশাপের ভয়ে হোক, আর অনুশোচনাবোধ হোক, পান্না ফেরত দিতে চাওয়ার মধ্যে আপনার বিবেকই কাজ করেছে৷ আপনার প্রশংসা করছি, শেঠমশাই৷'

শেঠমশাই দুঃখিত মুখে বললেন, 'বাচ্চু ফকিরের খোঁজ না পেয়ে ঠিক করেছিলুম, পান্নাটা কোথাও লুকিয়ে রাখা দরকার৷ এখানে এই বেদিটা দেখছেন, এর ওপর মহাবলদেবের ওই মূর্তিটা ছিল৷ এখানে একটা গাছ ছিল মাত্র৷ কোনো মন্দির ছিল না৷ কিছু জমি বেচে আর লোকের কাছে চাঁদা তুলে সাতটা থামের মাথায় ছাদ বসিয়ে মন্দির তৈরি করে দিয়েছিলুম৷ এই জায়গাটা তখন দরিয়াগঞ্জেরই অংশ ছিল৷ ধ্বংসস্তূপে প্রচুর পাথরের থাম পড়ে ছিল-এখনও আছে৷ সেইসব থাম জোড়া দিয়ে কম খরচায় কোনো রকমে একটা মন্দির গড়া৷ আমার আসল উদ্দেশ্য ছিল, রত্নটা লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে৷ মন্দির গড়া হয়ে গেলে কলকাতা থেকে একজন বিশ্বস্ত রাজমিস্ত্রি এনে ওই থামটার গোড়া খোদাই করে লকার বানিয়ে নিয়েছিলুম৷ রাত্রিবেলা গোপনে লকার তৈরি করে দিয়েছিল সে৷'

জিজ্ঞেস করলুম, 'থামে কেন? বেদিতেই তো ভালো লকার তৈরি করা যেত!'

শেঠমশাই চটে গেলেন, 'কেন বেদিতে লকার বানিয়ে নিইনি, তা বোঝবার মতো বুদ্ধি আপনার নেই! বেদিতে করলে লোকের চোখে পড়ত না? পুজো দিতে এসে বেদিপ্রদক্ষিণ করার সময় তালার ছেঁদা চোখে পড়ত, আর তাই নিয়ে মাথা ঘামাত সবাই৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ঠিক, ঠিক৷ কিন্তু ওই বিশেষ থামটাই বেছে নিয়েছিলেন কেন?'

শেঠমশাই চার্জ করলেন, 'আপনি তো সায়েন্টিস্ট৷ পাথর চেনেন? কতরকম পাথর আছে জানেন? সব পাথরে সব কাজ হয় না, বোঝেন?'

চন্দ্রকান্ত থামটার কাছে গিয়ে পরীক্ষা করে হাসিমুখে ঘুরলেন, 'ইউ আর রাইট শেঠমশাই! তবে আপনি একটু ভুলও করেছেন৷ মাত্র ইঞ্চি ছয়েক ভুল৷'

'ইঞ্চি ছয়েক ভুল মানে?'

'থামের তলার দিকটা ছ-ইঞ্চি গ্র্যাফাইট৷ কালো সিসে দিয়ে তৈরি৷ ওপরটা গ্র্যানিট পাথর৷'

শেঠমশাই পা বাড়িয়ে বললেন, 'অত আমি বুঝি না৷ মিস্ত্রি সব থাম পরীক্ষা করে দেখে বলেছিল, এইটাতে কাজ হবে৷' বলে ছড়ির বাটটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খুললেন৷ একটা চাবি বের করে থামটার কাছে বসলেন৷ তারপর সেই অদ্ভুত লকার খুলে একটা কালো রঙের ছোট্ট চারকোনা কৌটো বের করলেন৷ কৌটোটা পকেটে ঢুকিয়ে লকারটা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালেন শেঠমশাই৷

কর্নেল চুপচাপ দাঁড়িয়ে চারদিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিলেন৷ বললেন, 'আপনি কি এবার শিবমন্দিরে যাবেন শেঠমশাই?'

'হ্যাঁ৷ আপনারা কেটে পড়ুন এখান থেকে,' শেঠমশাই গম্ভীর মুখে বললেন, 'আপনাদের দেখলে কিডন্যাপাররা ভড়কে যাবে৷ দুর্বৃত্তদের বিশ্বাস করা যায় না৷ কোমল-কোরকের একটা ক্ষতি করে বসলে আমি আর বাঁচব না৷ আয় গোবিন্দ!'

'আর একটা প্রশ্ন ছিল, শেঠমশাই!'

'বলুন৷'

'মহাবলমন্দিরের কোনো ফটো তুলিয়েছিলেন কি?'

'হ্যাঁ,' শেঠমশাই পা বাড়িয়ে বললেন, 'ফটোটা বাঁধিয়ে রেখেছিলুম৷ আমার ঘরের দেওয়ালে টাঙানো ছিল৷ কিন্তু...'

'সেটা চুরি গেছে!'

শেঠমশাই একথায় একটুও অবাক না হয়ে বললেন, 'গেছে৷ কোমল-কোরকই হয়তো দুষ্টুমি করে লুকিয়ে রেখেছে কোথাও৷'

আমরা তিন জনে তাকিয়ে রইলুম৷ শেঠমশাই আর গোবিন্দ গাছপালার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটু পরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷ তারপর চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ইস! কী কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! পাঁচু পান্নাটা হাতাবে এবং ভয়ংকর মারণাস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে৷ আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে, কর্নেল! কেন যে ধুন্ধুকে সঙ্গে আনলুম না!'

আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলুম, তার একটু তফাতে একটা ঝাঁকড়া গাছ৷ হঠাৎ কর্নেল সেই গাছটার কাছে গিয়ে পকেট থেকে রিভলবার বের করে কাউকে বললেন, 'দশ গোনা পর্যন্ত নেমে না এলে গুলি ছুড়ব বলে দিচ্ছি৷ ওয়ান... টু... থ্রি... ফোর...'

ঝাঁকড়া গাছ থেকে হনুমানের মতো ঝুপ করে কেউ লাফিয়ে পড়ল৷ আমার বয়সি এক যুবক৷ মুখে করুণ হাসি৷ প্যান্ট-শার্টে প্রচুর কাদার ছোপ৷ কর্নেল হো-হো করে হেসে বললেন, 'জয়ন্ত! এই তোমার সেই সন্দেহভাজন লোকটি৷ অবশ্য বেচারার গোঁফ-গালপাট্টা-পরচুলা আমার হস্তগত হয়েছে! একটু ভুল বোঝাবুঝিতে এই সেমসাইড ঘটে গেছে আর কি!' কর্নেল রিভলবার পকেটস্থ করে বললেন, 'না, তপোব্রতবাবু! আপনার ভয় পাওয়ার কারণ নেই৷ কোমল-কোরকের হাত দিয়ে চক্রান্তের ব্যাপারটা জানিয়ে আপনি ঠিক কাজই করেছিলেন৷ হরবাবুর ভয়ে আপনি মুখ খুলতে সাহস পাননি৷ আমি জানি চিড়িয়াখানা থেকে কোমল-কোরক কিডন্যাপড হওয়ার পর আপনি তাদের উদ্ধারের জন্য প্রচুর চেষ্টা করেছেন৷ এখানে পর্যন্ত ছুটে এসেছেন৷ তবে ওই যে বললুম, গতরাতের ঘটনাটা নেহাত ভুল বোঝাবুঝি৷'

আমি বোকা বনে দাঁড়িয়ে আছি৷ জীবনে এমন বোকা কখনো বনিনি৷ ব্যাপারটা আঁচ করে বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত বেজায় হেসে বললেন, 'কী অদ্ভুত! কী অদ্ভুত!'

কর্নেল বললেন, 'তার চেয়ে অদ্ভুত হালদারমশাইয়ের অন্তর্ধান৷'

বললুম, 'কিন্তু শিবমন্দিরে কী ঘটেছে, চুপিচুপি গিয়ে আমাদের দেখা উচিত৷ যদি সত্যি ত্রিভুবন দাশ ওরফে পাঁচুবাবুকে শেঠমশাই পান্নাটা দিয়ে ফেলেন, সর্বনাশ হবে৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'পৃথিবীর মৃত্যু ঠেকানো যাবে না৷ মারণাস্ত্র তৈরি করে পাঁচু কোনো দেশকে বেচবে৷ কোটিপতি হবে৷ তারপর যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধে, সেই দেশ ভয়ংকর অস্ত্রটা ব্যবহার করলেই, ব্যাস! আর দেখতে হবে না৷ এই সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা বসুন্ধরা মড়ার খুলি হয়ে মহাকাশে ভেসে বেড়াবে৷':

বিজ্ঞানী দু-হাতে চুল আঁকড়ে ধরে ধুপ করে বসে পড়লেন৷ কর্নেল হাসলেন, 'তার অনেক দেরি, চন্দ্রকান্তবাবু! তার আগে যদি পদ্মার তাজা ইলিশের ঝোল খেতে চান, প্যালেস হোটেলে চলুন৷ ভেবে দেখুন, আপনার তৈরি সিন্থেটিক ইলিশ নয়, সুস্বাদু সত্যিকার ইলিশ৷'

চন্দ্রকান্ত লাফিয়ে উঠলেন৷ স্লোগান হাঁকার মতো বললেন, 'জিভে জল আসছে! জিভে জল আসছে! পদ্মার ইলিশ!'

তপোব্রতবাবু বললেন, 'কিন্তু শিবমন্দিরে এতক্ষণে কী হচ্ছে...'

তাঁকে থামিয়ে কর্নেল বললেন, 'শিবমন্দিরে গিয়ে শেঠমশাই আর গোবিন্দ এতক্ষণে ভড়কে গেছেন৷ ঝগড়াঝাঁটি হওয়াও অসম্ভব নয়৷ গোবিন্দ পালোয়ান যা গোঁয়ার!'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'গোঁয়ারগোবিন্দ কথাটা শুনেছি বটে৷ কিন্তু সেখানে ঝগড়া হচ্ছে কেন?'

'একদঙ্গল পুলিশ লাঠি-বন্দুক বাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ গত রাতে শেঠমশাইয়ের আসা দেখেই বুঝেছিলুম, বাচ্চু ফকিরের পান্না বের করে নিয়ে শিবমন্দিরে হাজির হবেন৷ তাই সকালে থানায় গিয়ে ওই ব্যবস্থা করে রেখেছি৷'

'সর্বনাশ!' তপোব্রত শিউরে উঠলেন, তাহলে যে কোমল-কোরককে ওরা মেরে ফেলবে৷'

কর্নেল সেকথায় কান দিলেন না৷ বললেন, 'চন্দ্রকান্তবাবু, আপনি অবশ্য ইচ্ছে করলে গ্লাইডারে উড়ে প্যালেস হোটেলের ছাদে অবতরণ করতে পারেন৷ ভেবে দেখুন, উড়ে যাবেন না, না আমাদের সঙ্গী হবেন?'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'বড্ড টায়ার্ড৷ একটানা উড়ে গা ব্যথা করছে৷'

'তাহলে আপনার গ্লাইডারের বোঁচকাটা কোথাও লুকিয়ে রাখা যাক৷'

ঝোপের ভেতর ওটা লুকিয়ে রাখার পর আমরা দক্ষিণে পদ্মার সেই খাতের দিকে এগিয়ে গেলুম৷ যেতে যেতে বললুম, 'কিন্তু নৌকো না পেলেই সমস্যা৷ তখন ওই নৌকোটাকে অমন করে বিদায় না দেওয়াই উচিত ছিল৷'

কর্নেল বললেন, 'ভেবো না৷ আমরা শেঠমশাইয়ের নৌকোয় যাব৷ ওঁরা নিশ্চয় চন্দ্রকান্তবাবুর মতো উড়ে আসেননি!'

খাতের ধারে পৌঁছে দেখি, সত্যিই একটা ছোট্ট পানসি-নৌকো বাঁধা৷ নৌকোর মাঝি অবাক চোখে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে৷ আমরা একে একে তার পানসিতে উঠতে শুরু করলে তার সংবিৎ ফিরল৷ আপত্তি করে বলল, 'একী বাবুমশাইরা! এটা খেয়ানৌকা নয়৷ শেঠমশাই ভাড়া করে এনেছেন৷'

কর্নেল তার হাতে একটা দশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, 'শেঠমশাই ফেরার আগে তুমি আমাদের পৌঁছে দিয়ে এসো৷ ওঁর ফিরতে দেরি হবে৷ উনি এখন ঝগড়া করছেন মন্দিরে৷'

টাকাটা মাঝির উপরি রোজগার৷ সে দেরি করল না৷ আমাদের পারে পৌঁছে দিয়ে তারপর প্রাণপণে নৌকো বেয়ে সবুজ চরটার দিকে আবার পাড়ি জমাল৷

প্যালেস হোটেলের ফটকে পৌঁছে কর্নেল বললেন, 'চন্দ্রকান্তবাবু, সেই লেসার-ল্যাসো সঙ্গে এনেছেন তো? ওটা দরকার হতে পারে৷'

চন্দ্রকান্তের পিঠে একটা ব্যাগ আটকানো৷ বললেন, 'এর মধ্যে আছে৷ কিচ্ছু ভাববেন না৷ পাঁচুর চুরি-করা ফর্মুলায় তৈরি সবুজ আলোর বলটাকে বন্দি না করে আমার সোয়াস্তি নেই৷ আসলে যন্ত্রটার সামান্য ত্রুটি ছিল৷ শুধরে নিয়েছি৷ এবার দেখবেন, বল-বাছাধন সুড়ুৎ করে এসে পায়রার মতো খোপে ঢুকবে৷'

হোটেলের লবিতে ঢুকে থমকে দাঁড়ালুম৷ সোফার এককোনে পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসে বা শুয়ে আছেন স্বয়ং গোয়েন্দা কে.কে. হালদার! চোখ বন্ধ৷ হাঁ-করা মুখ৷ নাকও ডাকছে এবং মাথায় ব্যান্ডেজ!

কর্নেলের ডাকে তড়াক করে উঠে ঘুসি পাকিয়ে বললেন, 'তবে রে!'

বলেই জিভ কাটলেন৷ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন৷ কর্নেল বললেন, 'স্বপ্ন দেখছিলেন হালদারমশাই?'

হালদারমশাই কাঁচুমাচু মুখে বললেন, 'সরি, ভেরি সরি, কর্নেল স্যার!'

'মাথায় ব্যান্ডেজ কেন?'

'সব বলছি, চলুন৷ প্রচুর রহস্য! প্রচুর!'

কর্নেল আমাদের দোতলার ঘরে যেতে বলে ক্যান্টিনের দিকে গেলেন৷ গেস্ট আছে, জানাতেই গেলেন হয়তো৷ একটু পরে ওপরের ঘরে ফিরে হালদারমশাইকে বললেন, 'কাল বিকেলে আপনার বাসস্ট্যান্ডে থাকার কথা৷ আমি খুব ভাবনায় পড়েছিলুম, আপনার কোনো বিপদ হল নাকি৷ ব্যান্ডেজ দেখে বুঝতে পারছি, সত্যিই বিপদ হয়েছিল৷'

হালদারমশাই বললেন, 'প্রচণ্ড বিপদ, প্রচণ্ড! আগের দিন বিকেলে হরবাবুর গতিবিধির ওপর নজর রাখতে গিয়ে প্রথম বিপদ৷'

'হোসেনের বউয়ের পাল্লায় পড়েছিলেন!'

'জানেন দেখছি,' হালদারমশাই অবাক হলেন, 'উঃ! মেয়েটার গায়ে কী জোর, ভাবা যায় না৷ এই দেখুন, জামার কলারের কী অবস্থা করেছে! নতুন জামা!'

'কিন্তু মাথায় ব্যান্ডেজ কেন?' কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, 'হোসেনের লাঠির ঘা খাননি তো?'

হালদারমশাই স্বীকার করলেন, 'ঠিক ধরেছেন৷ আপনাকে থানা থেকে ট্রাঙ্ক কল করে ফের হরবাবুর ওপর নজর রাখতে গিয়েছিলুম৷ এবার আর পাঁচিল ডিঙোতে সাহস পাইনি৷ অন্ধকারে একটা ঝোপের ভেতর ঘাপটি মেরে বসেছিলুম৷ কুকুরটা মহা বিচ্ছু৷ পেছনে লাগল আবার৷ যেই উঠতে গেছি, হঠাৎ পেছন থেকে টর্চের আলো৷ তারপর মাথায় লাঠির ঘা৷ অন্য কেউ হলে ভিরমি খেয়ে পড়ে থাকত৷ পুলিশ-লাইফে এমন অনেক বিপদ গেছে৷ কাজেই বিপদেও মাথা ঠিক থাকে৷ রক্তারক্তি হলেও৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'তারপর? তারপর?'

'তারপর আর কী?' হালদারমশাই ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে বললেন, 'মাথা ফেটে রক্তারক্তি হলে দৌড়ে পালাতেই হয়৷ তারপর সোজা হাসপাতালে যেতে হয়৷ কিন্তু আমার বেলায় সমস্যা হল৷ ডাক্তারবাবু কিছুতেই ছাড়বেন না৷ বলেন, এ অবস্থায় হাঁটাচলা করলে মারা পড়বেন৷ খামোকা বেডে শুইয়ে রাখলেন৷ কী বিপদ দেখুন৷'

কর্নেল বললেন, 'হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসেননি তো হালদারমশাই?'

'আসতেই হল৷ উপায় কী? এ সময়ে হাসপাতালে শুয়ে থাকা চলে?'

'দরিয়াগঞ্জে আপনি উঠেছেন কোথায়?'

'অন্নপূর্ণা হোটেলে৷ বাসস্ট্যান্ডের কাছে৷ এ আমার চেনা জায়গা, কর্নেল স্যার! বহুবছর আগে এই থানার চার্জে ছিলুম৷'

'হরবাবুর বাড়িতে সন্দেহজনক কিছু কি দেখেছেন?'

'দেখেছি৷ একজন বেঁটে হোঁতকা মোটা লোক হরবাবুর সঙ্গে কথা বলছিল৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'পাঁচু! পাঁচু!'

হালদারমশাই বিরক্ত হয়ে বললেন, 'পাঁচু-ফাঁচু কি না জানি না৷ বারান্দায় বসে দু-জনে কথা বলছিল৷ বার কতক 'বাঘ' কথাটা কানে এল৷ শুনতে পাব কী, খেঁকি কুকুরটার যা চ্যাঁচানি! তারপর লোকটা চলে গেল৷ ঠিক সেই সময় দজ্জাল মেয়েটা এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল৷ টানতে টানতে হরবাবুর কাছে নিয়ে গেল৷ হরবাবু হাঁক দিলেন, আলকুশি নিয়ে আয়! বেগতিক দেখে এক নিশ্বাসে ওঁর স্টুডিয়োতে হামলা আর ডনের মৃত্যুসংবাদ দিলুম৷ তখন কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে থাকার পর হরবাবু আমাকে শাসিয়ে গালমন্দ করে ছেড়ে দিলেন৷ আমি থানায় গিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে ট্রাঙ্ক কলের চেষ্টা করলুম৷ লাইন পেলুম রাত দশটায়৷ তখন আপনাকে বাঘের কথাটা জানালুম, কর্নেল স্যার! ঠিক কি না?'

'ঠিক, তারপর আবার ওত পাততে গিয়ে হোসেনের লাঠি খেলেন,' কর্নেল হাসলেন, 'তখন আর কিছু দেখেছেন কি হালদারমশাই?'

হালদারমশাই চাপা স্বরে বললেন, 'এক পলকের দেখা৷ ভুল হতেও পারে৷ একটা ঘরের জানালা খোলা ছিল৷ ভেতরে হ্যারিকেনের আলো জ্বলছিল৷ সেই আলোয় মুখোশপরা খুদে দুটো মূর্তি, কোমল আর কোরককেই যেন খেলতে দেখেছি৷ ভালো করে দেখার আগেই মাথায় লাঠি৷'

শুনে আমি চমকে উঠলুম৷ তপোব্রতবাবুও নড়ে বসলেন৷ বললেন, 'আমার অনুমানই ঠিক৷ হরবাবু শনিবার এখানে আসছেন বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান৷ কিন্তু রাত্তিরে কলকাতাতেই কোথাও ছিলেন৷ এই হল এক নম্বর পয়েন্ট৷ দু-নম্বর পয়েন্ট, রবিবার চিড়িয়াখানা দেখতে যাওয়ার জন্য কোমল-কোরককে উনিই প্ররোচিত করেছিলেন৷'

কর্নেল বললেন, 'এবং আপনার সঙ্গেই যাওয়ার জন্য, যাতে কিনা দোষটা আপনার ঘাড়ে পড়ে৷'

'ঠিক বলেছেন,' তপোব্রত বললেন৷ 'তিন নম্বর পয়েন্ট হল, হরবাবু নিশ্চয় চিড়িয়াখানার ভেতর ওত পেতে অপেক্ষা করছিলেন৷ আমি ক্লান্ত হয়ে একটা গাছের ছায়ায় বসেছিলুম৷ আর কোমল-কোরক 'স্টার-ওঅর' খেলছিল৷ একটু পরে মুখ তুলে দেখি, ওরা নেই৷ এবার বুঝতে পারছি, কাকু দূর থেকে ইশারায় ওদের ডাকছেন দেখেই ওরা তাঁর কাছে ছুটে গিয়েছিল৷ তারপর উনি ওদের নিয়ে উধাও হন৷ এদিকে আমি খুঁজে সারা৷ কোনমুখে শেঠমশাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াব, এই ভেবে অস্থির৷'

হালদারমশাই সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কথা শুনছিলেন৷ বললেন, 'এঁকে তো চিনতে পারলুম না৷ কে ইনি?'

কর্নেল বললেন, 'ইনিই কোমল-কোরকের প্রাইভেট টিউটর তপোব্রতবাবু৷'

হালদারমশাই নস্যি নিয়ে বললেন, 'বড্ড গোলমেলে ব্যাপার৷'

আমি বললুম, 'কর্নেল! হরবাবু তাঁর বাবাকে বলছিলেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন৷ কোমল-কোরকের কোনো ক্ষতি হবে না৷ তার মানে, ওরা ত্রিভুবন দাশ ওরফে পাঁচুবাবুর...'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ফের বাবু? পাঁচুচোর বলুন!'

'বেশ৷ পাঁচুই বলছি,' হাসতে হাসতে বললুম৷ 'কোমল-কোরক পাঁচুর পাল্লায় পড়েনি৷ হরবাবু তাঁর বাবাকে এভাবে চাপ দিয়ে পান্নাটা আদায় করতে চেয়েছেন৷ পান্নাটা পেলে তখন পাঁচুকে বেচবেন৷'

তপোব্রত বললেন, 'ঠিক তাই৷ কিন্তু গত রাতে শেঠমশাই এসেছেন৷ কোমল-কোরককে তাহলে কোথায় লুকিয়ে রাখলেন হরবাবু? আমি গত রাতে মন্দিরের চরে সবুজ আলো দেখার পর সাঁতার কেটে ওখানে গেছি৷ কোনো হদিশ করতে পারিনি৷ বালিয়াড়িতে শুয়ে রাত কাটিয়েছি৷ তারপর সকালেও খুঁজে বেড়িয়েছি৷ শেষে পাথরের বাঘটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছি, এমন সময় কর্নেল আর জয়ন্তবাবুকে আসতে দেখলুম৷ সঙ্গেসঙ্গে গাছে চড়ে গা-ঢাকা দিলুম৷'

কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, 'একটা বাজে৷ ক্যান্টিনে যাওয়া যাক৷ খিদে পেয়েছে৷'

হালদারমশাই বললেন, 'আমি অন্নপূর্ণা হোটেলেই যাই৷ হোটেলের মালিক আমার চেনা লোক৷ বলা আছে, ফিরতে দেরি দেখলে চিন্তাভাবনা কোরো না৷ তবে বলা যায় না কিছু৷'

কর্নেল বললেন, 'ঠিক আছে৷ খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিয়ে নিন গিয়ে৷ সময়মতো আপনাকে খবর দেব৷'

একটু পরে নীচের ক্যান্টিনে চন্দ্রকান্তবাবু হাপুস-হুপুস করে ইলিশের ঝোল খেতে খেতে বললেন, 'বহুকাল বাদে পদ্মার টাটকা ইলিশ খাওয়ার সুযোগ দেখছি পাঁচুই দিল আমাকে৷ দেখা হলে প্রথমে সেজন্য ওকে ধন্যবাদ দেব৷ তারপর লেসার-ল্যাসো বের করব৷ কী বলেন কর্নেল?'

কর্নেল বললেন, 'ত্রিভুবন দাশ খুব ধূর্ত লোক, চন্দ্রকান্তবাবু!'

'জানি,' চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ওর কাছাকাছি যাব না৷ দূর থেকে ধন্যবাদ দেব৷'

দুবেজি এলেন হঠাৎ৷ 'কর্নেল, আপনার ফোন৷'

কর্নেল এঁটো হাতে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ দুবেজি আমাদের খাওয়ার তদারকে ব্যস্ত হলেন৷ সেই সময় মুচকি হেসে বললুম, 'দুবেজি, আপনার আট নম্বর রুমের ভদ্রলোকের কী খবর?'

দুবেজি বাঁকা মুখে বললেন, 'স্মাগলার! স্মাগলার! বি.এস.এফ. গুলি করে পদ্মায় ভাসিয়ে দিয়েছে৷ শকুনের ঝাঁক কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে৷'

অমনি তপোব্রত চটেমটে বলে উঠলেন, 'কী বাজে কথা বলছেন মশাই? আমি স্মাগলার হতে যাব কোন দুঃখে?'

দুবেজি অবাক হয়ে বললেন, 'কী মুশকিল! আপনাকে কে স্মাগলার বলেছে? আমি আট নম্বর রুমের লোকটার কথা বলছি!'

'আমিই তো আট নম্বর রুম বুক করেছি৷'

'তার মানে?' দুবেজি হকচকিয়ে গেলেন৷ 'আপনি বুক করলেন কখন?'

তপোব্রত পকেট থেকে একটা চাবি বের করে দেখালেন, 'এটা চিনতে পারছেন? প্যালেস হোটেল লেখা চাবি৷ রুম নম্বরও লেখা আছে৷'

দুবেজি হতভম্ব৷ বললেন, 'কিন্তু সে তো অন্য লোক৷ ইয়া গোঁফ, গালপাট্টা! মাথায় পাখির বাসার মতো চুল! বয়স্ক লোক৷ আর আপনি তো একেবারে নিরীহ চেহারার ইয়াংম্যান৷'

আমি এবং চন্দ্রকান্ত হাসছিলুম৷ বললুম, 'পরে সব কর্নেলের কাছে শুনবেন, দুবেজি! ইনিই তিনি৷ ছদ্মবেশে এসেছিলেন স্বপন মজুমদার নামে৷'

দুবেজি মিনিট খানেক ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন তপোব্রতের দিকে৷ তারপর ফোঁস করে চাপা শ্বাস ফেলে চলে গেলেন৷ একটু পরে কর্নেল ফিরে এলেন৷ জিজ্ঞেস করলুম, 'কার ফোন?'

'থানা থেকে অফিসার-ইন-চার্জ মুকুন্দবাবু জানালেন, কথামতো কাজ হয়েছে৷ তবে একটু ঝামেলাও হয়েছে৷ তিন জন কনস্টেবল আহত৷'

চন্দ্রকান্ত ইলিশের কাঁটা চুষতে চুষতে বললেন, 'পাঁচুর গায়ে জোর আছে৷ ওকে আমরা বলতুম এলিফ্যান্ট-ম্যান৷'

'পাঁচু নয়, চন্দ্রকান্তবাবু! গোবিন্দ!'

এবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললুম, 'গোবিন্দের সঙ্গে পুলিশের ঝামেলা হয়েছে? আপনি শিবমন্দিরে ঝগড়া হতে পারে বলেছিলেন৷'

কর্নেল বললেন, 'ঠিক ধরেছ, জয়ন্ত! মুকুন্দবাবুকে বলেছিলুম, শেঠমশাই শিবমন্দিরে গেলে যেন তাঁকে সসম্মানে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়৷ তাই করতে গিয়ে গোবিন্দর সঙ্গে কনস্টেবলদের মল্লযুদ্ধ হয়ে গেছে৷ শেষে গোবিন্দর বুকে রাইফেলের নল ঠেকিয়ে তাকে কাবু করা হয়েছে৷'

চন্দ্রকান্ত বললেন, 'কাজটা ভালো ঠেকছে না৷ শেঠমশাইকে খামোকা গ্রেফতার করা মোটেই উচিত হয়নি৷'

'খামোকা নয়, চন্দ্রকান্তবাবু!' কর্নেল তাঁর ঝোল-ভাতে হাত লাগালেন, 'ওঁর কাছে মূল্যবান একটা রত্ন আছে৷ তাই ওঁর নিরাপত্তার জন্যই এ ব্যবস্থা করতে হয়েছে৷ শেঠমশাই এখন রত্নটা সমেত নিরাপদে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন৷'

তপোব্রত বললেন, 'কোমল-কোরকের বিপদ হবে না তো এবার?'

কর্নেল বললেন, 'আর একটু অপেক্ষা করুন, তপোব্রতবাবু! আশা করি, আজই এই রহস্য-অ্যাডভেঞ্চারের পালা শেষ হয়ে যাবে৷'

চন্দ্রকান্ত হতাশমুখে বললেন, 'ধূর্ত পাঁচু এইসব গণ্ডগোল দেখে নির্ঘাত কেটে পড়েছে৷ সবুজ আলোর বলটা আমার হাতছাড়া হয়ে গেল!'

কর্নেল মিটিমিটি হেসে বললেন, 'আপনার সঙ্গে তার মন্দিরের চরে অ্যাপয়েন্টমেন্ট৷ ভুলে যাবেন না৷ চিঠি লিখে আপনাকে ডেকেছে ত্রিভুবন দাশ৷'

চন্দ্রকান্ত এ-কথায় একটু উৎসাহ পেলেন যেন৷ খাওয়ায় মন দিলেন৷

খাওয়ার পর দোতলায় গিয়ে আট নম্বর ঘরে তপোব্রত ঢুকলেন৷ আমরা ঢুকলুম দশ নম্বরে, আমাদের ঘরে৷ চন্দ্রকান্ত তাঁর ব্যাগ খুলে কয়েকটা বিদঘুটে গড়নের যন্ত্র বের করে খুটখাট শব্দে চাবি টিপতে থাকলেন৷ কর্নেল ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে চুরুট টানছেন৷ আমি অভ্যাসমতো ভাতঘুম ঘুমোনোর তালে আছি৷ সেই সময় বিরক্তিকর ডোর বেলের শব্দ৷ কর্নেল উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই হালদারমশাই ঢুকে দম-আটকানো গলায় বলে উঠলেন, 'প্রচণ্ড ঝগড়া, প্রচণ্ড৷ প্রায় হাতাহাতির উপক্রম৷ পিস্তল বের করেছিল৷ অমনি হোসেনের লাঠির বাড়ি৷ কবজি ভেঙে গেছে ব্যাটাচ্ছেলের৷ দৌড়ে পিঠটান দিল৷ ফাঁকতালে একটা পিস্তল লাভ হয়ে গেল হরবাবুর৷' খিখি খ্যাখ্যা করে হাসতে থাকলেন হালদারমশাই৷

কর্নেলও হাসলেন, 'তাহলে আর হোসেনের ওপর আপনার রাগ থাকা উচিত নয়৷'

হালদারমশাই চেয়ারে ধপাস করে বসে নস্যি নিয়ে বললেন, 'না৷ ওকে ক্ষমা করে দিয়েছি৷'

চন্দ্রকান্ত শুনছিলেন৷ বললেন, 'সেকেন্ড রাউন্ড ফাইট কার সঙ্গে কার?'

আমি বললুম, 'সম্ভবত পাঁচুর সঙ্গে হরবাবুর৷'

'সম্ভবত নয়, তাই,' হালদারমশাই বললেন৷ 'হোটেলে যাওয়ার পথে সেই হোঁতকা-মোটা লোকটা পাঁচু না ফাঁচুকে দেখলুম৷ শেঠমশাইদের বাড়ির দিকে হনহন করে হেঁটে চলেছে৷ আর যাওয়া হল না হোটেলে৷ ফলো করলুম চুপিচুপি৷ বেশ খানিকটা দূরে একটা ইটের ঢিবির ওপর থেকে নজর রাখলুম৷ একটু পরে হরবাবু বেরোলেন৷ তারপর দু-জনে ঝগড়া বেঁধে গেল৷ খেঁকি কুকুরটাও কম যায় না৷ সেও পাঁচু না ফাঁচুকে মুখ ভেংচে যাচ্ছেতাই গাল দিতে শুরু করল৷'

কর্নেল বললেন, 'হালদারমশাই, খবরটার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ৷ তবে এবার আপনার পেটে কিছু পড়া দরকার৷ নীচের ক্যান্টিনে গিয়ে দেখুন, যদি কিছু মেলে৷'

'নাঃ৷ আমি অন্নপূর্ণা হোটেলেই যাই৷ মোটে তো সওয়া দুটো বাজে৷ ওখানে তিনটে পর্যন্ত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে৷' হালদারমশাই তেতো মুখে বললেন৷ 'তবে আসল কথাটা হল, এই হোটেলের চার্জটা বড্ড বেশি৷'

হালদারমশাই চলে গেলে আবার চোখ বুজে প্রিয় ভাতঘুম ঘুমোনোর চেষ্টা করলাম৷ তারপর যে ঠিকই ঘুমিয়ে পড়েছিলুম, তাতে সন্দেহ নেই৷ ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকে৷ কর্নেল বললেন, 'চারটে বাজে, জয়ন্ত! উঠে পড়ো৷ বেরোতে হবে৷'

ঘরে চন্দ্রকান্ত নেই দেখে বললুম, 'বিজ্ঞানী ভদ্রলোক কোথায় গেলেন?'

'মন্দিরের চরে রওনা দিয়েছেন৷'

'সর্বনাশ! ওঁকে একা বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত হয়নি৷'

'ভয় নেই, ডার্লিং! ওঁর কাছে শুধু লেসার-ল্যাসো নেই, দস্তুরমতো সাংঘাতিক লেসার-পিস্তলও আছে৷ ছুড়লে ত্রিভুবন দাশ সঙ্গেসঙ্গে ভস্মীভূত হবে, তবে তার চেয়ে ওঁর দুর্ভাবনা গ্লাইডারটা নিয়ে৷ ত্রিভুবন দাশের চোখে পড়লে ওটা সামলে দিতেও পারে৷'

বেরিয়ে আট নম্বর ঘরের দরজায় তপোব্রতকে ডাকতে গেলুম৷ দেখি, দরজায় তালা আঁটা৷ বললুম, 'তপোব্রতবাবুও একা বেরিয়েছেন দেখছি৷'

কর্নেল মুচকি হেসে বললেন, 'হয়তো কোমল-কোরককে উদ্ধারে বেরিয়েছেন ফের৷ এসো, আমরা আগে থানায় যাই৷ শেঠমশাই চটে আগুন হয়ে আছেন৷ ওঁকে সব বুঝিয়ে বলা দরকার৷ তারপর মন্দিরের চরে রওনা হব৷ ত্রিভুবন দাশ অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছে চন্দ্রকান্তের সঙ্গে৷ ঘটনাটা কী দাঁড়ায়, দেখা দরকার৷ লোকটা অসম্ভব ধূর্ত৷'

প্যালেস হোটেলের ফটকের কাছে পৌঁছে থমকে দাঁড়ালুম৷ বুক ধড়াস করে উঠল৷ রাস্তার ওধারের জঙ্গল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসছেন হরবাবু৷ চাপা গলায় বলে উঠলুম, 'কর্নেল! কর্নেল! হরবাবু!'

কর্নেল কিন্তু একটুও ভড়কালেন না৷ সহাস্যে এগিয়ে গেলেন হরবাবুর দিকে৷ যেন হ্যান্ডশেক করবেন, এমন একটা হাবভাব৷ হরবাবু এবার পাঁচুবাবুর পিস্তলটা বের করে কর্নেলের বুকে কয়েকটা গুলি ছুড়বেন ধরেই নিয়েছি, এবং কর্নেলের বোকামি দেখে যত তাজ্জব, তত কাঠ হয়ে গেছি আতঙ্কে৷

কিন্তু হরবাবু সেসব কিছুই করলেন না৷ মুখে সেই রাগী ভাবটাও দেখলুম না৷ কাঁদো-কাঁদো মুখ করে ভাঙা গলায় বললেন, 'সর্বনাশ হয়ে গেছে কর্নেল৷ আপনি ঠিকই বলেছিলেন, আমি ত্রিভুবন দাশের ফাঁদে পা দিয়েছি৷ ওকে আমি চিনতে পারিনি বলেই এই ভুলটা করে ফেলেছি৷ আমায় ক্ষমা করুন৷'

কর্নেল বললেন, 'কী সর্বনাশ হয়েছে, হরবাবু?'

'কোমল-কোরককে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না৷'

'কোথায় রেখেছিলেন ওদের?'

'বাজার এলাকায় আমার এক বন্ধু ব্রতীনের বাড়িতে৷ গত রাতে বাবা এসে পড়লেন হঠাৎ৷ বেগতিক দেখে হোসেনের বউকে সেখানে ওদের রাখতে পাঠিয়েছিলুম৷ আজ সকালে গিয়েও দেখেছি, ওরা ব্রতীনের ছেলের সঙ্গে ভাব করে ফেলেছে৷ খেলায় মেতে আছে৷'

'ব্রতীনবাবুকে কিছু খুলে বলেননি?'

'না৷ ওকে বলেছিলুম, জঙ্গলের ভেতর ভাঙাচোরা বাড়িতে ওদের মন টিঁকছে না৷ কলকাতার ছেলে তো!'

'বেশ৷ তারপর কী হল বলুন?'

'এইমাত্র ব্রতীনের বাড়ি থেকে আসছি৷ ব্রতীন কোর্টে৷ ওর বউ বলল, বুলুর সঙ্গে একটু আগে বাগানে ওদের খেলতে দেখেছে৷ বুলু ব্রতীনের ছেলে৷ সে বলল, খেলতে খেলতে হঠাৎ দৌড়ে দু-জনে চলে গেল৷ তারপর আর পাত্তা নেই৷' হরবাবু দম নিয়ে বললেন ফের, 'আমার সন্দেহ, ত্রিভুবন দাশ ওদের চুরি করেছে৷'

'বুলু বলল, খেলতে খেলতে হঠাৎ দৌড়ে চলে গেল?'

'তাই তো বলল৷ কেন অমন করে চলে গেল, বোঝা যাচ্ছে না৷'

'হয়তো বোঝা যাচ্ছে হরবাবু!'

হরবাবু ব্যগ্রভাবে বললেন, 'কী বোঝা যাচ্ছে, কর্নেল?'

'বাগানের কাছে কেউ এসে ওদের ইশারায় ডেকেছিল৷'

'ঠিক ঠিক৷ কোমল-কোরক খুব মিশুকে স্বভাবের ছেলে তো৷ ত্রিভুবন ব্যাটাচ্ছেলে ঝোপের আড়াল থেকে ইশারায় ডেকেছে, অমনি ওরা দৌড়ে গেছে৷ আর ওর পাল্লায় পড়েছে৷'

কর্নেল বললেন, 'ভাববেন না হরবাবু! ওদের উদ্ধার করে দেব৷ এখন আমার কিছু প্রশ্নের জবাব দিন৷'

হরবাবুর চেহারায় আগের মতো রাগী ভাবটা ফুটে উঠল৷ বললেন, 'এ কি প্রশ্ন করার সময়?'

কর্নেল নির্বিকার মুখে বললেন, 'আপনার কলকাতার বাড়ির গেটে লেটার বক্সে কোরকের হাতে লেখা একটা চিঠি পাওয়া গেছে৷ সেটা আপনিই কোরককে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিলেন একসময়৷ তাই না?'

হরবাবু মুখ নামিয়ে বললেন, 'হুঁ:! কিন্তু এখন এসব কথার মানে হয় না৷'

'রবিবার তপোব্রতের সঙ্গে চিড়িয়াখানায় বেড়াতে যাওয়ার জন্য আপনিই কোমল-কোরককে...'

কর্নেলকে থামিয়ে দিয়ে হরবাবু বললেন, 'বেশ করেছি৷ ওয়ার্থলেস! এলুম সাহায্যের আশায়, এসে দেখছি, ভুল করেছি৷ খালি আজেবাজে প্রশ্ন৷'

হরবাবু পা বাড়ালেন৷ ত্রিভুবন দাশের সঙ্গে বোঝাপড়া করতেই যাচ্ছেন, এমন ভঙ্গি৷ কর্নেল বললেন, 'প্যারিসে ছবির প্রদর্শনী করার জন্য ত্রিভুবন দাশের ফাঁদে পা না দিলেই পারতেন, হরবাবু!'

হরবাবু ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, 'কে বলল এমন কথা?'

'তপোব্রত আড়ি পেতে শুনেছিলেন,' কর্নেল তেমনি নির্বিকার মুখে বললেন৷ 'হ্যাঁ, একথা ঠিক, কোমল-কোরক আপনার দাদার ছেলে৷ তাদের ক্ষতি করার ইচ্ছে আপনার ছিল না৷ শুধু এটা ট্রাম্প কার্ড হিসেবে-অর্থাৎ, তুরুপের তাস হিসেবেই ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন৷ মহাবল মন্দিরের ফটো থেকে রত্নটা কোথায় আছে, তার ক্লু খুঁজে পেলে সেটা উদ্ধার করে ত্রিভুবন দাশকে দিতেন৷ প্যারিসে প্রদর্শনী করতে যাওয়ার জন্য টাকাকড়ির লোভ দেখিয়েছে সে৷ আর ফটো থেকে সূত্র খুঁজে না পেলে আপনার বাবা যে নাতিদের উদ্ধার করতে দরিয়াগঞ্জে ছুটে আসবেন এবং মুক্তিপণ হিসেবে পান্নাটা শিবমন্দিরে নিয়ে যাবেন, সে তো নিশ্চিত৷ সেজন্যই দীর্ঘ এক সপ্তাহ-আগামী রবিবার পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন৷ কিন্তু হালদারমশাইয়ের মুখে কলকাতায় আপনার স্টুডিয়োতে হামলা আর ডনের মৃত্যুর খবর পেয়ে আপনি বুঝতে পারলেন, ত্রিভুবন দাশ বিনি পয়সায় রত্নটা হাতাতে চায়৷ এদিকে হঠাৎ গত রাতে আপনার বাবা এসে হাজির৷ আপনার তখন সাপের ছুঁচো গেলার অবস্থা৷'

হরবাবু গলার ভেতর বললেন, 'শয়তানের বাচ্চাকে ফটোটার কথা বলা ভুল হয়েছিল৷'

'হরবাবু, আপনি কি জানেন, এই ত্রিভুবন দাশই আপনার দাদা-বউদির মৃত্যুর কারণ?'

হরবাবু চমকে উঠলেন৷ ঠোঁট কামড়ে ধরে রাঙা চোখে তাকিয়ে রইলেন৷

'আপনাকে একটু হিন্ট দিয়েছিলুম হরবাবু, গ্রাহ্য করেননি৷' কর্নেল শান্তভাবে চুরুট বের করে ধরালেন৷ একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে ফের বললেন, 'তবে কথাটা হল, লুকিয়ে রাখা রত্নটার সহজ সূত্র অন্যত্র ছিল, হরবাবু!'

হরবাবু আস্তে বললেন, 'কোথায় ছিল?'

'আপনার বাবা ছেলেবেলায় আপনাকে এই ছড়াটা শিখিয়ে থাকবেন আশা করি: দুই ডাকে বাট/উত্তরে হাঁট/ঘাটে মহাবল...'

এ পর্যন্ত শুনেই হরবাবু বলে উঠলেন, 'ধুর মশাই! এলুম আপনার সাহায্য চাইতে৷ আর আপনি ছড়া আওড়াচ্ছেন! শয়তানের বাচ্চার সঙ্গে আমাকে একা লড়তে হবে৷ ভুলের প্রায়শ্চিত্ত!' বলে সটান ঘুরে জঙ্গল আর ধ্বংসস্তূপের ভেতর গজরাতে গজরাতে অদৃশ্য হলেন৷

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, 'শিল্পীরা একটু ছিটগ্রস্ত হন, সেটা ঠিক৷ কিন্তু এমন নির্বোধ শিল্পী কখনো দেখিনি, ডার্লিং! প্যারিসে ছবির প্রদর্শনী করার লোভে এমন কাণ্ড কেউ করে?'

খাপ্পা হয়ে বললুম, 'হরবাবু করেছেন৷ করে শেষ পর্যন্ত বিপদে ফেলেছেন দুটো বাপ-মা-মরা ছেলেকে৷ নিজের দাদার ছেলে!'

'বোকা! বোকা!' বলে কর্নেল পা বাড়ালেন৷

বললুম, 'পাঁচু কোমল-কোরককে চুরি করে ধরে নিয়ে গেছে৷ আমার খুব ভয় হচ্ছে, কর্নেল!'

কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না৷ বললেন, 'এসো৷ থানায় গিয়ে শেঠমশাই আর গোবিন্দ পালোয়ানের কী অবস্থা হল, দেখা যাক৷'

রাস্তায় একটা সাইকেল-রিকশো পাওয়া গেল৷ আমরা থানার দিকে চললুম৷ বাজার এলাকা ছাড়িয়ে গিয়ে থানা৷ অফিসার-ইন-চার্জ মুকুন্দবাবুর ঘরে ঢুকেই যা দেখলুম, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারলুম না৷

শেঠমশাই হাসিমুখে বসে আছেন এবং তাঁর দুই ঊরুর ওপর দুটো মুখোশপরা খুদে মানুষ৷ তাদের হাতে খেলনা-পিস্তল৷ কর্নেলকে দেখে তারা সেই পিস্তল তুলে চিক্কুর ছাড়ল, 'হ্যান্ডস আপ!'

কর্নেল দু-হাত তুলে বললেন, 'হ্যান্ডস আপ তো করলুম কো-কো৷ কিন্তু আমাকে চুরি করে লুকিয়ে রাখার জায়গা কোথায় পাবে? এই পেল্লায় শরীর লুকিয়ে রাখা সোজা নয়৷'

কো-কো-ই বটে! স্বপ্ন নয়, সত্যি তাদের দেখছি৷ শেঠমশাই ওদের মুখোশ খুলে দিয়ে বললেন, 'খুব হয়েছে! সব সময় খালি এইসব কুৎসিত মুখোশ পরে থাকবে আর গণ্ডগোল বাধাবে! চলো, ফিরে গিয়ে মজা দেখাচ্ছি!'

কর্নেল বললেন, 'তাহলে শেঠমশাই নাতিদের ফিরে পেলেন তো?'

অমনি শেঠমশাই গম্ভীর হয়ে গেলেন৷ বললেন, 'আপনিও মশাই কম গণ্ডগোলের লোক নন৷ আপনার পেটে পেটে বড্ড বেশি প্যাঁচ-পয়জার৷ তবে কোমল-কোরককে উদ্ধারের দাবি আপনি করবেন না৷ তপু এদের এইমাত্র উদ্ধার করে এনেছে৷ ওকে আমি মিথ্যে সন্দেহ করেছিলুম৷'

তপোব্রতকে এতক্ষণে দেখতে পেলুম৷ আসলে কো-কো-র দিকেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলুম বলে তাকে লক্ষ করিনি৷ তিনি বললেন, 'না শেঠমশাই! কর্নেলের পরামর্শেই কো-কো-কে খুঁজে পেয়েছি৷'

শেঠমশাই ভুরু কুঁচকে বললেন, 'তার মানে?'

তপোব্রত বললেন, 'দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম করছি, তখন কর্নেল আমার রুমে গেলেন৷ জিজ্ঞেস করলেন, এখানে ছোটোবাবুর কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু আছেন কি না৷ অমনি ব্রতীনবাবুর কথা মনে পড়ল৷ ব্রতীনবাবু কলকাতায় আপনাদের বাড়ি গিয়ে ওঠেন দেখেছি৷'

'হুঁ, ব্রতীন উকিল৷'

'তো, কর্নেল বললেন, ব্রতীনবাবুর বাড়ি খুঁজে আনাচেকানাচে গিয়ে লক্ষ রাখুন৷ সঙ্গেসঙ্গে বেরিয়ে পড়লুম৷ একে-তাকে জিজ্ঞেস করে বাড়িটা খুঁজে বের করলুম৷ বাড়ির পেছনে বাগান৷ দেখি কী, সেখানে কো-কো একটা ছেলের সঙ্গে স্টার-ওঅর খেলছে৷ খেলতে খেলতে আমাকে ওরা দেখতে পেল৷ দৌড়ে এল৷'

শেঠমশাই কর্নেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'তাহলে আপনারই ক্রেডিট পাওনা৷ তবে শিবমন্দিরে খামোকা হাঙ্গামার পেছনে আপনারই চক্রান্ত ছিল৷ জানেনই তো, গোবিন্দটা যা গোঁয়ার!'

'সবই আপনার নিরাপত্তার জন্য শেঠমশাই,' অফিসার-ইন-চার্জ মুকুন্দবাবু বললেন, 'যাই হোক, জিপ রেডি৷ সঙ্গে আর্মড গার্ড থাকবে৷ কলকাতায় নিরাপদে আপনাদের পৌঁছে দিয়ে আসবে, ভাববেন না৷ এতক্ষণ শুধু কর্নেল সায়েবের জন্য অপেক্ষা করছিলুম৷'

শেঠমশাই ব্যস্তভাবে উঠে পড়লেন৷ নাতিদের বগলদাবা করে বেরোলেন৷ গোবিন্দর হাতে তাঁর সেই নকশা কাটা লাঠি৷ কর্নেল আর আমার দিকে সে এমন চোখে তাকাচ্ছিল, বুঝতে পারলুম, এরপর কলকাতার দরিয়াগঞ্জ ভবনে আমাদের ঢোকা হয়তো নিরাপদ হবে না৷ শিবমন্দিরে পুলিশের সঙ্গে তার মল্লযুদ্ধের পেছনে কর্নেলের চক্রান্তের ব্যাপারটা সে আঁচ করে থাকবে৷

বাইরে গিয়ে তপোব্রতকে জিজ্ঞেস করলুম, 'কে কোমল আর কে কোরক, তপোব্রতবাবু?'

তপোব্রত বললেন, 'এই হল কোমল, আর এই হচ্ছে কোরক৷'

কোমল বলল, 'ভ্যাট! আমি হাহা!'

কোরক বলল, 'আমি হুহু৷'

শেঠমশাই ধমক দিলেন, 'শাট আপ! ফের হাহা-হুহু করলে এবার আহা-উঁহু করিয়ে ছাড়ব৷ তপু, সাবধান! তুমি একজনকে ধরো! গোবিন্দ, আমার ছড়ি দে৷ দিয়ে তুই একজনকে ধর৷ নইলে আবার ভো-কাট্টা হয়ে যাবে৷'

তপোব্রত বললেন, 'ছোটোবাবুকে ডেকে নিয়ে এলে হত, শেঠমশাই!'

শেঠমশাই তাঁর সেই গাবদা ছড়িটা বাগিয়ে ধরে বললেন, 'ওকে লাঠিপেটা করব৷ উদ্ভুট্টে সব ছবি এঁকে এঁকে ও নিজেই একটা উদ্ভুট্টে ছবি হয়ে গেছে৷ গিয়ে চিঠি লিখে পাঠাচ্ছি৷ এখানে বসে যত ইচ্ছে ছবি আঁক৷ ভিটে আগলে বসে থাক আর জমিজমার দেখাশোনা কর৷ গবেট! বুদ্ধু হাঁদারাম!' তারপর কর্নেলের দিকে ঘুরে বললেন, 'বাচ্চু ফকিরের পান্নাটা বেচে আমি একটা অনাথ আশ্রম খুলব৷ ভাববেন না এটা আমি মেরে দেবার তালে আছি৷ প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না?'

জিপটা চলে গেল৷ কর্নেল মুকুন্দবাবুকে একটু তফাতে ডেকে নিয়ে গিয়ে চুপি চুপি কীসব শলাপরামর্শ করলেন৷ তারপর এগিয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন৷ বললেন, 'চলো, ডার্লিং! বিজ্ঞানী ভদ্রলোক মন্দিরের চরে কী করছেন দেখা যাক৷'

বাঁধে হাঁটতে হাঁটতে মন্দিরের চরের সামনাসামনি যখন পৌঁছোলুম, তখন সূর্য ডুবুডুবু৷ নরম গোলাপি আলো ঝলমল করছে নীচের চওড়া খাতে৷ কর্নেল বাইনোকুলারে পদ্মার বুকে বুনো হাঁস দেখলেন কিছুক্ষণ৷ ক্রমশ দিনের আলো ধূসর হয়ে এল৷ এতক্ষণ নীচের খাতে দুপুরের সেই ছোট্ট পানসিটাকে আসতে দেখলুম৷ কর্নেল বললেন, 'এসো জয়ন্ত! মন্দিরের চরে পাড়ি দিই৷'

বাঁধের ঢালে পাথরের চাবড়ার খাঁজে সাবধানে পা রেখে পর্বত-অভিযাত্রীদের মতো নেমে গেলুম দু-জনে৷ কর্নেল পানসির মাঝিকে ডেকে বললেন, 'যে ভদ্রলোককে মন্দিরের চরে পৌঁছে দিয়েছ, তিনি ফিরে আসেননি তো ওখান থেকে?'

মাঝি বলল, 'না তো! উনি বললেন রাত্তিরে শিবমন্দিরে পুজো দেবেন৷'

বুঝলুম, বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্তর কথা হচ্ছে৷ মিনিট কুড়ি পরে পানসি মন্দিরের চরে গিয়ে ভিড়ল৷ কর্নেল মাঝিকে বললেন, 'তুমি বরং ওপারে গিয়ে অপেক্ষা করো৷ টর্চের আলো দেখিয়ে ইশারা করব, তখন নৌকো নিয়ে আসবে৷'

মাঝি একটু কুন্ঠিতভাবে বলল, 'স্যার, গত রাত্তিরে মন্দিরের চরে ভূতুড়ে আলো দেখেছি৷'

কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, 'স্মাগলারদের কারবার! আলোর ইশারা দিচ্ছে স্যাঙাতদের৷'

মাঝি বলল, 'কেউ কেউ তা বলছেও বটে৷ তবে বলা যায় না কিছু৷ এই চরে ভূত আছে, তাও সত্যি স্যার! বাবার কাছে শুনেছি...'

কর্নেল তার হাতে একটা দশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিলেন৷ বললেন, 'মোটা বকশিশ পাবে৷ নাও, শিগগির ওপারে চলে যাও৷ পুলিশের চোখে পড়লে তোমাকে সন্দেহ করবে, বুঝতে পারছ না?'

মাঝি দ্রুত নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে ওপারে পাড়ি জমাল৷ বললুম, 'লোকটা আমাদেরই হয়তো স্মাগলার ভাবল৷'

কর্নেল বললেন, 'চুপ, আর স্পিকটি নট৷'

মন্দিরের চরে গাছপালার ভেতর এখনই জমাট আঁধার ঘনিয়েছে৷ তবে পাখিদের তুলকালাম চ্যাঁচামেচি থামেনি৷ কর্নেল অন্ধকারে দেখতে পান, সেটা সত্যি৷ তবে আমাকে বার কতক আছাড় খেতে হল৷ কিছুক্ষণ পরে একটা খোলা জায়গায় পৌঁছোলুম৷ কর্নেল একটা ঝোপের পাশে আমাকে টেনে বসিয়ে দিলেন এবং নিজেও বসলেন৷ চোখে অন্ধকার মেখে যাচ্ছে ক্রমশ৷ কিছু দেখতে পাচ্ছি না৷

একটু পরে হেঁড়ে গলায় কেউ গেয়ে উঠল, 'আজ জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে-এ-এ...!' কী অদ্ভুত! এ যে চন্দ্রকান্তের গলা৷ বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন! এর চেয়ে আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল, এখন জ্যোৎস্না কোথায়? কৃষ্ণপক্ষের ঘুরঘুট্টে অন্ধকারে এমন গান গাওয়ার কোনো মানে হয়?

রবিঠাকুর বেঁচে থাকলে বিজ্ঞানীকে লাঠিপেটা করতেন সন্দেহ নেই৷ চন্দ্রকান্তকে পাঁচু কিছু খাইয়ে পাগল করে দেয়নি তো?

কর্নেলকে চিমটি কাটলুম৷ কর্নেল পালটা চিমটি কেটে আমাকে যেন ধমকে দিলেন৷ আবছা দেখা যাচ্ছে, বিজ্ঞানী পায়চারি করছেন আর সমানে গাইছেন, 'জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে-এ-এ-এ!'

একটু পরে কেউ বলে উঠল, 'হ্যাল্লো চাঁদু! এসে গেছ তাহলে!'

গান থামিয়ে চন্দ্রকান্ত বললেন, 'ওয়েলকাম, পাঁচু! কনগ্রাচুলেশন! তুমি যে কসমিক রেডিয়ো-অ্যাকটিভ রে কেন্দ্রীভূত করে সবুজ আলোর বল তৈরি করেছ, তা আগাম আমায় জানাবে তো? খামোকা আমার বাগানে গিয়ে তাই নিয়ে লুকোচুরি খেলতে শুরু করলে৷ আমি কি জানি যে, তুমিই এই কীর্তি করে সিগন্যাল দিচ্ছ?'

'তুমি আমাকে দেখলেই ধুন্ধুকে লেলিয়ে দিতে৷ সেই ভয়ে তোমার মুখোমুখি হতে পারছিলুম না৷'

'যাকগে৷ কই, দেখি তোমার কীর্তিকলাপ৷ ডেমনস্ট্রেশান দাও৷ তারপর কথা হবে৷'

'দেখাচ্ছি৷ তবে সাবধান, গ্রিন কসমিক বলটা কেড়ে নেবার চেষ্টা কোরো না যেন৷ মারা পড়বে৷ আমি এখন মরিয়া হয়ে উঠেছি, চাঁদু!'

'তোমার কথা শুনেই বুঝতে পারছি সেটা! নাও, দেরি কোরো না!'

এবার সেই সবুজ আলোর ক্রিকেট বলটা ভেসে উঠল অন্ধকারে৷ এদিকে-ওদিকে নাচানাচি জুড়ে দিল৷ তারপরই ঠিক চন্দ্রকান্তের বাগানে সে-রাতে যা ঘটেছিল, তাই ঘটল৷ সবুজ বলটা সুড়ুৎ করে পিছলে এল এবং অদৃশ্য হয়ে গেল৷ চন্দ্রকান্তের খিখি হাসি শুনতে পেলুম৷ পরক্ষণে ত্রিভুবন দাশ ওরফে পাঁচুর গর্জন শুনলুম, 'তবে রে বিশ্বাসঘাতক!'

তারপর কেউ টর্চ জ্বালল৷ দেখলুম, চন্দ্রকান্ত এবং একটা বেঁটে হোঁতকা মোটা লোক মল্লযুদ্ধ করছেন৷ সঙ্গেসঙ্গে হরবাবুর চিৎকার শুনলুম, 'হ্যান্ডস আপ!'

পাঁচু হকচকিয়ে গিয়ে চন্দ্রকান্তকে ছেড়ে উঠে দাঁড়াল৷ দু-হাত তুলে বলল, 'হর নাকি? তুমি আবার এর মধ্যে নাক গলাতে কেন এলে?'

'কোমল-কোরক কোথায়, আগে বলো! নইলে তোমার পিস্তলের গুলিতে তোমারই খুলি ফুটো করে দেব!'

'কী মুশকিল! আমি কেমন করে জানব? ওদের তো তুমিই চুরি করে এনেছ!'

ততক্ষণে চন্দ্রকান্ত উঠে দাঁড়িয়ে ধুলোবালি ঝাড়ছিলেন পোশাক থেকে৷ এবার খপ করে পাঁচুকে পেছন থেকে ধরতে গেলেন৷ অমনি পাঁচু একটা পা ছুড়ল৷ ব্যাস! চন্দ্রকান্ত আবার কুপোকাত৷ সেই ফাঁকে পাঁচু ঝাঁপ দিল হরবাবুর ওপর৷ গুলির শব্দ শুনতে পেলুম৷ তারপর হরবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, 'ধর! ধর!' তাঁর হাতের টর্চটা পড়ে নিভে গিয়েছিল৷ এতক্ষণে কর্নেল টর্চ জ্বেলে রণক্ষেত্রে ঢুকলেন৷ সেই আলোয় পাঁচুকে দেখলুম, বালিয়াড়ির দিকে ফুটবলের মতো ছুটে চলেছে৷

কর্নেল দৌড়ে গেলেন৷ চন্দ্রকান্ত, হরবাবু এবং আমিও 'ধর! ধর!' বলে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে কর্নেলকে অনুসরণ করলুম৷ হরবাবু পিস্তলের সব ক-টা গুলি শেষ করে ফেললেন৷ একটাও পাঁচুর গায়ে লাগল না৷

বালিয়াড়ির ঢালে পৌঁছে পাঁচু থমকে দাঁড়াল৷ কারণ সামনের দিক থেকে হঠাৎ একসঙ্গে কয়েকটা টর্চের আলো এসে পড়েছে৷ তখন সে ডান দিকে মোড় নিয়ে সমতল বালির চরে দৌড়োতে শুরু করল৷ ওই আলোগুলো যে পুলিশের, তখনই বুঝতে পারলুম৷ কেউ চেঁচিয়ে উঠল, 'হল্ট! হল্ট! গোলি মার দেগা!'

একটু পরে চমকে উঠে দেখলুম, পাঁচু বালির ভেতর তলিয়ে যাচ্ছে৷ সে দু-হাত তুলে করুণ আর্তনাদ করে উঠল, 'বাঁচাও! বাঁচাও!'

কর্নেল থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন৷ বললেন, 'সর্বনাশ! চোরাবালিতে গিয়ে পড়েছে!'

একদল পুলিশ টর্চের আলো ফেলতে ফেলতে দৌড়ে আসছিল৷ তারা আমাদের পাশে এসে থমকে দাঁড়াল৷ মুকুন্দবাবু বললেন, 'যাঃ! আসামি হাতছাড়া হয়ে গেল যে!'

চন্দ্রকান্ত বিব্রতভাবে বললেন, 'কিচ্ছু করা যাবে না৷ লেসার-ল্যাসো দিয়ে জ্যান্ত মানুষ আটকানো যায় না৷'

এতগুলো টর্চের আলোয় চোরাবালিতে একটা মানুষ ক্রমশ তলিয়ে গেল দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল৷ এমন ভয়ংকর দৃশ্য কখনো দেখিনি৷ বালিগুলো নড়তে নড়তে একসময় স্থির হয়ে গেল৷

কর্নেল চাপা শ্বাস ফেলে দুঃখিতভাবে বললেন, 'আর কী! ধাতুবিজ্ঞানী ত্রিভুবন দাশ তাঁর পাপের শাস্তি পেলেন৷ মুকুন্দবাবু, আগামীকাল ওই বিপজ্জনক এরিয়াটা ঘিরে ফেলার ব্যবস্থা করুন৷'

আমরা বিষণ্ণ, ক্লান্ত একদল মানুষ ফিরে চললুম দরিয়াগঞ্জ শহরের দিকে৷ পদ্মাকে যে কেন রাক্ষুসি নদী বলা হয়, এতদিনে সেটা বুঝতে পারছিলুম৷

Cov50
অধ্যায় ২২ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%