সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

আমার কুকুর জিমকে নিয়ে জ্বালায় পড়েছি দেখছি৷ এমন নয় যে তাকে কখনো বনজঙ্গল, পাহাড়পর্বতে আনিনি৷ এই তো মাস তিনেক আগে তাকে নিয়ে কাশ্মীরের বরফ-ঢাকা পাহাড়ি মুল্লুকে ঘুরেছি৷ কিন্তু জিমের এমন পালাই পালাই ভাবভঙ্গি তো কখনো দেখিনি৷
প্রথমে ভেবেছিলুম, একেবারে বিদেশবিভুঁই জায়গায় এসে ওর বুঝি অসুখবিসুখ করেছে৷ আমাদের সঙ্গে আছেন ভাগ্যক্রমে প্রাণীবিজ্ঞানী ডক্টর মুরলীধর প্রসাদ৷ নৈনিতালের লোক৷ তিনি জিমকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে বলেছেন, 'জিম ইজ অলরাইট৷ ওর কিস্যু হয়নি৷ তবে কী জানেন জয়ন্তবাবু? মানুষের যেমন, তেমনি সব প্রাণীরই ওই একটা ব্যাপার আছে৷ সব জায়গায় মন টেকে না৷'
ভেবে পাইনি, এমন সুন্দর জায়গায় মন না টেকার কারণ কী থাকতে পারে৷ চারিদিকে নীল সাগরে ঘেরা এই দ্বীপের প্রাকৃতিক দৃশ্য মনোরম৷ ক্যাম্পের সামনে সবুজ ঘাসে-ঢাকা একটা সমতল মাঠ৷ সেখানে নির্ভয়ে হরিণের পাল চরে বেড়ায়৷ কখনো লুকোচুরি খেলতে আসে সাদা রঙের দু-একটা খরগোশ৷ পাখিও কম নেই. ঝাঁক বেঁধে মাঠে নেমে তারা পোকামাকড় খুঁজে যায়৷ কিন্তু আশ্চর্য, জিমকে ছেড়ে দিয়ে দেখেছি, সে অভ্যাসমতো পশুপাখিদের মিছিমিছি ভয় দেখিয়ে বা তাড়া করে মজা লুটতে ছোটে না৷
এমনকী, তার প্রায় নাকের ডগায় কোনো পাখি বা খরগোশ বেয়াদপি করে গেলেও জিম মুখেও ধমকায় না৷ খালি মুখ তুলে বোবার মতো তাকিয়ে থাকে৷ তার শরীর কেমন যেন থরথর করে কাঁপে৷
সবচেয়ে অদ্ভুত লাগে তার আচরণ, সন্ধ্যার দিকে৷ ক্যাম্পের সামনে খোলামেলায় আগুন জ্বেলে আমরা যখন বসে গল্পসল্প করি, জিম আমার কোলে বসে মুখের ভেতরে কী একটা অস্পষ্ট শব্দ করে৷ মাঝে মাঝে যেন সে ভীষণ চমকে ওঠে৷
সারারাত যতবার ঘুম ভাঙে, শুনতে পাই জিমের ওই বোবার মতো চাপা অদ্ভুত আওয়াজ৷ রাতের দিকে বেশ ঠান্ডা বলে তার গায়ে এক টুকরো কম্বল জড়ানো থাকে৷ দেখেছি, জিম কম্বলের ভেতর মুখটাও ঢুকিয়ে তালগোল পাকানো শরীরে পুঁটুলির মতো গুটিয়ে রয়েছে৷ ভয়েই কি? কীসের ভয়? এখানে ভয় পাবার মতো কিছু দেখছি না তো৷
আজ তিন দিন হল আমরা এই দ্বীপে এসেছি৷ আমরা মানে, ওই ড. মুরলীধর প্রসাদ, আমি এবং আমাদের প্রখ্যাত 'বুড়ো ঘুঘু' কর্নেল নীলাদ্রি সরকার মহোদয়৷ আর এক জন সঙ্গীও অবশ্য আছে৷ সে কর্নেলের 'পুরাতন ভৃত্য' শ্রীযুক্ত ষষ্ঠীচরণ৷ তাকে না আনলে এ অখদ্যে দ্বীপে না খেয়ে মরতে হত৷ খুব চালাকচতুর এবং এই প্রৌঢ় বয়সেও তার গায়ের জোরের পরিচয় অনেকবার পেয়েছি৷
আজও কর্নেল ভোর বেলা ড. প্রসাদকে নিয়ে বেরিয়ে গেছেন৷ সামনের মাঠের পারে উঁচু পাঁচিলের মতো বিশাল পাহাড় দ্বীপের একদিক থেকে অন্যদিক পর্যন্ত চলে গেছে৷ দ্বীপটাকে নাকি দু-ভাগে ভাগ করেছে পাহাড়টা৷ কর্নেলরা যান ওই পাহাড়ে৷
এ দ্বীপের নাম ভেগা আইল্যান্ড৷ আর ওই পাহাড়টার নাম ওয়াকিমো মাউন্টেন৷ ওয়াকিমো কথাটার মানে নাকি বদরাগী৷ পাহাড়টার এমন বিশ্রী নাম কেন? শুনেছি এ সমুদ্রে যারা মাছ ধরতে আসে, তাদের বিশ্বাস, ওখানে একটা বেজায় বদরাগী দানো বাস করে৷ তাই মাছধরা জাহাজ এ দ্বীপের ছায়া মাড়ায় না৷
কর্নেল কি দানোটাকে জব্দ করতে এসেছেন তাহলে? মোটেও না৷ কর্নেল যা বলছেন, শুনে তাক লেগে যায়৷ ওয়াকিমো পাহাড়ে একধরনের বিচিত্র প্রাণীর বাস৷ প্রাণীটা নেকড়ে এবং কুকুরের মাঝামাঝি৷ পনেরো হাজার বছর আগে গুহাবাসী আদিম মানুষেরা জন্তু শিকার করে এনে গুহার ভেতর বসে মহানন্দে খেত৷ আর হাড়গোড় ফেলে দিত বাইরে৷ নেকড়েরা এইসব হাড়গোড়ের লোভে গুহার কাছে জড়ো হত৷ কালক্রমে এই উচ্ছিষ্ট খাদ্য খেতে খেতে তারা শিকার করাই ভুলে গেল৷ মানুষ-ঘেঁষা হয়ে পড়ল৷ তারপর মানুষ তাদের বশ করে ফেলল৷ তারাই গৃহপালিত কুকুরের পূর্বপুরুষ৷
কিন্তু মানুষের ভেতর যেমন, তেমনি জন্তুদের ভেতরেও কিছু বেয়াড়া জীব থাকে৷ তেমন কিছু বেয়াড়া নেকড়ে মানুষের পোষ মানল না, অথচ শিকারের ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে৷ তারা কী করল তখন? অগত্যা পেটের জ্বালায় বাঁদর-হনুমানদের মতো উদ্ভিদভোজী-যাকে ইংরেজিতে বলে ভেজিটেরিয়ান হয়ে গেল৷ গাছের পাতা, ফল-মূল-এসব খেয়েই বেঁচে রইল৷
প্রাণীবিজ্ঞানীদের ধারণা, এইসব জাত-খোয়ানো নেকড়ের বংশধর এখনও কোথাও টিকে থাকতে পারে৷ কর্নেল কোনো সূত্রে খবর পেয়েছেন, ভেগা দ্বীপের পাহাড়ে নাকি সেই আজব নেকড়ে-কুকুর এখনও আছে৷ তাই প্রাণীবিজ্ঞানী ড. প্রসাদকে নিয়ে এখানে হাজির হয়েছেন৷
আর আমি তো কর্নেল বুড়োর ছায়াসঙ্গী৷ যাকে বলে ন্যাওটা৷ তাই আমাকেও আসতে হয়েছে৷ পোর্টব্লেয়ার থেকে হেলিকপ্টারে আসতে ঘণ্টা পাঁচেক লেগেছে৷ কিন্তু একটুও ক্লান্তি বা বিরক্তি জাগেনি৷ জিমকে সঙ্গে আনার কারণ, সেই আজব নেকড়ে-কুকুর বা কর্নেলের ভাষায় 'নেকুর' যদি একটা পাকড়াও করতে পারেন, পোষা কুকুরের সামনে তার আচরণ কেমনধারা হবে, পরীক্ষা করে দেখবেন৷ তা ছাড়া জিমের জন্য একটা জরুরি কাজও আছে৷ জিমকে দেখিয়ে নেকুরদের ফাঁদে ফেলার মতলব ছিল কর্নেলের৷ পোষা ঘুঘু পাখির সাহায্যে ব্যাধ যেভাবে বুনো ঘুঘু পাখি ডেকে এনে ফাঁদে ফেলে, ঠিক সেইভাবে৷
কিন্তু দ্বীপে এসে জিমের হাবভাব দেখে কর্নেল আপাতত সে মতলব কাজে লাগাচ্ছেন না৷ লাগাতে চাইলে আমিও আপত্তি করতুম৷
আজ তিন দিনের দিন একটা সন্দেহ জেগেছে৷ জিম কি তাহলে নেকুরের ভয়ে এমন অস্থির?
কর্নেলের কাছে কথাটা তুলতে হবে৷ তবে জিম শক্তিমান অ্যালসেশিয়ান৷ তার গায়ের রং কুচকুচে কালো৷ দশাসই গতর৷ একবার একজন খুনে গুন্ডাকে প্রায় মেরে ফেলার উপক্রম করেছিল৷ জিমের মতো সাহসী দুর্দান্ত কুকুর শাকপাতাখেকো নেকুরকে ভয় পাবে বলে মনে হয় না৷
কিন্তু কিছু বলাও যায় না৷ গরিলাও তো মাংসাশী প্রাণী নয়৷ অথচ গরিলাকে সিংহও ভয় পায়৷
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে সকালে ক্যাম্পের সামনে চেয়ার পেতে বসে কফি খাচ্ছি৷ ষষ্ঠীচরণ তার কিচেন-তাঁবুর সামনে খোলামেলায় পিকনিকের উনুনের মতো উনুন বানাতে ব্যস্ত হয়েছে, কারণ কেরোসিন তত বেশি সঙ্গে আনা হয়নি এবং কতদিন থাকতে হবে, তার ঠিক নেই৷ জিম আমার চেয়ারের পায়া ঘেঁষে বসে আছে-মুখটা বেজায় বিষণ্ণ৷ হঠাৎ ষষ্ঠীচরণ কাজ ফেলে আমার কাছে এসে কাঁচুমাচু মুখে একটু হেসে বলল, 'ছোটো সায়েব যদি কিছু মনে না করেন, একটা কথা বলি৷'
বললুম, 'অত বিনয়ের অবতার তো তোমায় কোনোদিন দেখিনি ষষ্ঠী৷ ব্যাপারটা কী?'
ষষ্ঠীচরণের হাসিটুকু মিলিয়ে গেল৷ সে গম্ভীর হয়ে চাপা গলায় বলল, 'আজ্ঞে, আমার বড্ড গা বাজছে৷'
অবাক হয়ে বললুম, 'সে কী হে ষষ্ঠী! তুমি অমন ডানপিটে সাহসী মানুষ৷ তোমার গা বাজছে মানে?'
ষষ্ঠীচরণ আরও গলা চেপে বলল, 'এ দ্বীপটায় অমানুষ থাকে আজ্ঞে৷'
'অমানুষ মানে?' হাসতে হাসতে বললুম, 'ও ষষ্ঠী! তুমি কি ভূতের ভয় পেয়েছ?'
ষষ্ঠীচরণ এবার বসল৷ চারিদিকটা দেখে নিয়ে ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, 'এই মাত্তর আমার ওপর টুপ টুপ করে ঢিল পড়ছিল৷ আপনার দিব্যি ছোটো সায়েব৷ মিথ্যে কথা আমায় কখনো বলতে শুনেছেন?'
মার্চ মাসের উজ্জ্বল সকাল বেলা৷ আকাশে মেঘের কুটোটি নেই৷ তাঁবুর পেছনে অবশ্য একটু তফাতে ঝোপঝাড় আর গাছপালা আছে৷ কিন্তু সামনেটা ফাঁকা৷ সবুজ ঘাসের মাঠ ওয়াকিমো পাহাড় পর্যন্ত ছড়ানো, এই ফাঁকা জায়গায় দিনদুপুরে ষষ্ঠীকে ভূতেরা ঢিল ছুড়ে নাকাল করেছে, ভাবতেই হাসি পায়৷ আমি হো-হো করে হেসে বললুম, 'কই, চলো তো দেখি-ভূতের কেমন সাহস৷'
ষষ্ঠীচরণ বলল, 'বন্দুকটাও সঙ্গে নিন স্যার৷'
পা বাড়িয়ে বললুম, 'ভূতের গায়ে বন্দুকের গুলি বেঁধে না৷ কই, চলো দেখি৷ আয় জিমি!'
জিম যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমার সঙ্গে এগোল৷ মাত্র তিরিশ হাত তফাতে ষষ্ঠীচরণের কিচেন-তাঁবু৷ ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছেছি, হঠাৎ আমার গায়ে টুপ টুপ করে কী পড়ল কয়েক বার৷ ঠাহর করে দেখি, সেগুলো খুদে মার্বেলের মতো গড়নের গোল ঢিল৷ চারিদিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে কাউকেও দেখতে পেলুম না৷ দৌড়ে ওই তাঁবুর পিছনে ঢুকলুম৷ কেউ কোথাও নেই৷ ওদিকটা প্রায় পঁচিশ গজ অবধি ফাঁকা৷ তারপর জঙ্গল৷ জঙ্গল থেকে ঢিল ছুড়ছে কি? তারা কারা?
জিম আমার পেছন পেছন এসে মুখ তুলে দাঁড়িয়ে আছে৷ জঙ্গলের দিকে আঙুল তুলে তাকে ইশারা করলুম৷ কিন্তু জিম কথা মানল না৷ শুধু লেজটা গুটিয়ে কেমন চাপা শব্দ করতে লাগল৷
ষষ্ঠীচরণ এগিয়ে এসে বলল, 'ঢিলটা পরখ করে দেখুন তো স্যার! এ তো ঢিল বলে মনে হচ্ছে না৷'
হাতের তালুতে রেখে দেখলুম, খুব হালকা ধূসর রঙের গুটি৷ গুটিটা শুকনো ঘাস দিয়ে তৈরি৷ সাধুবাবারা গাঁজা খাওয়ার জন্য নারকেল ছোবড়ার যেমন খুদে গুলতি বানায়, ঠিক তেমনি৷ কিন্তু ওগুলো আরও ছোটো৷ ওজনে হালকা হলেও দৈবাৎ চোখে লাগলে বিপদ হতে পারে৷
ততক্ষণে ষষ্ঠীচরণ আরও কয়েকটা ভূতের ঢিল খুঁজে পেয়েছে৷ সেগুলো সে একটা কাগজের মোড়কে রেখে বলল, 'বড়ো সায়েবকে দেখাতে হবে৷ কী বলেন স্যার?'
ভূতপ্রেতে আমার বিশ্বাস নেই৷ নিশ্চয় এভাবে ভূতুড়ে ঢিল ছুড়ে কারা আমাদের ভয় দেখাচ্ছে কোনো উদ্দেশ্যে৷ ব্যাপারটা দেখতে হয়৷
দৌড়ে আমার তাঁবু থেকে রাইফেল নিয়ে বেরোলুম৷ জিম অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাকে অনুসরণ করল৷ ষষ্ঠীচরণ ব্যাপার দেখে আরও ভয় পেয়ে বলল, 'ওরে বাবা! আমার কী হবে?'
'কিচ্ছু হবে না৷ ভূতেরা ঢিল ছুড়লে তুমিও ঢিল ছুড়বে৷' বলে যেদিক থেকে ঢিলগুলো এসেছিল সেইদিকে এগিয়ে গেলুম৷
কিন্তু আর ঢিল ছুড়ল না কেউ৷ ঝোপজঙ্গল দুর্ভেদ্য বললেই হয়৷ ভেতরে ঢোকার কোনো উপায় নেই৷ চোখে পড়ল, বড়ো বড়ো পাথরও রয়েছে জঙ্গল জুড়ে৷ একখানে প্রকাণ্ড একটা পাথর জঙ্গলের বাইরে অবধি ছড়িয়ে রয়েছে দেখে সেখানে গেলুম৷ প্রথমে জিমকে তুলে দিলুম পাথরটার ওপর৷ তারপর আমি উঠলুম৷
জঙ্গলের মাটিটা ক্রমশ ওদিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে বোঝা যাচ্ছিল৷ হঠাৎ মনে একটা অদ্ভুত অস্বস্তির সৃষ্টি হল৷ ওই ঘন সবুজ জঙ্গলের ভেতর থেকে কে বা কারা যেন আমাকে দেখছে৷ তাদের দেখতে পাচ্ছি না, অথচ তারা আমাকে দেখছে-অস্বস্তিটার কারণ এই৷
কিন্তু ভালো করে খুঁটিয়ে দেখেও সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ছিল না৷
তবু হলফ করে বলতে পারি৷ একদল অদৃশ্য আজব প্রাণী যেন আড়াল থেকে আমার ওপর লক্ষ রেখেছে৷ কিছুতেই এ অনুভূতি মন থেকে তাড়াতে পারলুম না৷
তারপর জিম একটা অদ্ভুত কাণ্ড করল৷ আমাকে ফেলে রেখে লাফ দিয়ে পাথর থেকে নামল৷ তারপর লেজ গুটিয়ে গলার ভেতর অদ্ভুত আওয়াজ করতে করতে খোলা ঘাসজমির ওপর দিয়ে তাঁবুর দিকে দৌড়োল৷ আমি রেগে-মেগে চিৎকার করে ডাকলুম, 'জিম! জিম! কী হচ্ছে! এই জিম!'
জিম কথা কানে করল না৷ কিচেন-তাঁবুর পাশে ষষ্ঠীচরণ দাঁড়িয়ে আছে দেখলুম৷ তার হাতে একটা বল্লম কিংবা লাঠি৷ এতদূর থেকে বোঝা যাচ্ছে না৷ জিম সটান গিয়ে আমার তাঁবুতে ঢুকে পড়ল৷
পেছনে ঘুরছিলুম জিমের জন্যে৷ এবার জঙ্গলের দিকে ঘুরে চমকে উঠলুম৷
আন্দাজ গজ বিশেক দূরে নীচে এমনি একটা পাথরের পাশে তিনটে বিদঘুটে প্রাণী দাঁড়িয়ে আছে৷ তাদের ওপর রোদ্দুর পড়েছে বলে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি৷
তারা মানুষের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে৷ গায়ের রং কালো কুচকুচে৷ গলা কাঠির মতো৷ মাথা তেকোনা এবং প্রকাণ্ড৷ নীচের ধড়টা ঝোপের ভেতর বলে বোঝা যাচ্ছে না কেমন৷ সবচেয়ে অদ্ভুত ওদের চোখ৷ তেকোনা মাথায় দুটো গোল রঙিন কাচের মতো মস্ত চোখের রং লাল, কখনো নীল, কখনো হলুদ হয়ে উঠছে৷
আমার মাথায় পলকে ভেসে এল, ওরা যেন অতিকায় পিঁপড়ে৷ কিন্তু পিঁপড়েরা কি অমন খাড়া দাঁড়াতে পারে মানুষের মতো?
ভয় হল, ওরা আমাকে আক্রমণ করবে না তো? তাই রাইফেল তাক করলুম৷
অমনি প্রাণীগুলো গা ঢাকা দিল পাথরের আড়ালে৷ বুঝলুম, জিম কেন ভয় পেয়েছে৷ এও বুঝলুম ঘাসের গুলতিগুলো কারা ছুড়েছিল৷
বেলা দুটোয় কর্নেল এবং ড. প্রসাদ ঘেমে-তেতে ফিরলেন৷ নেকুরের লেজের ডগাটুকুও দেখতে পাননি৷ তবে ওয়াকিমো পাহাড়ের অনেকটা চিনে ফেলেছেন৷ পাহাড়টা যত দুর্গম দেখায়, তত কিছু নয়! সহজে ওঠা যায় এবং যতদূর খুশি ঘোরাঘুরি করা যায়৷
ঘাসের গুলতি আর পিঁপড়ে মানুষের কথা শুনে প্রাণীবিজ্ঞানী ড. প্রসাদ তো ভীষণ উত্তেজিত৷ কর্নেল বললেন, 'বোঝা গেল, কেন ভেগা দ্বীপ ভূতুড়ে দ্বীপ বলে বিখ্যাত অথবা কুখ্যাত হয়েছে৷ ক-বছর আগে এক জাহাজের কাপ্তেন আমাকে এখানকার পিঁপড়ে-মানুষের কথা বলেছিলেন৷ বিশ্বাস করিনি৷ এখন দেখা যাচ্ছে কথাটা সত্যি৷'
ড. প্রসাদ বললেন, 'কর্নেল! নেকুর থাক৷ বরং আমরা পিঁপড়ে-মানুষের দিকে মন দিই৷'
আমি বললুম, 'একটা কথা বুঝতে পারছি না৷ এই ঘাসের গুলতির রহস্যটা কী?'
কর্নেল বললেন, 'এগুলো পিঁপড়ে-মানুষদের অস্ত্র৷ পোকামাকড় ওদের খাদ্য৷ এই গুলতি ছুড়ে ওরা পোকামাকড়কে কাবু করে৷ বুঝলে?'
হাসতে হাসতে বললুম, 'ব্যাটারা আমাদেরও গুলতি ছুড়ে কাবু করবে ভেবেছে৷ একটা মানুষের মাংসে ওদের বছর চলে যাবে কিনা৷'
ষষ্ঠীচরণ একটু তফাতে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে কথা শুনছিল৷ আতঙ্কে সে বলে উঠল, 'ওরে বাবা!'
কর্নেল সকৌতুকে বললেন, 'ষষ্ঠী! তোমার গা-গতর দেখে ওদের বেজায় লোভ হয়েছে মনে হচ্ছে৷ নইলে প্রথম তোমার ওপর গুলতি ছুড়ল কেন ওরা৷'
ষষ্ঠীচরণ আরও ভয় পেয়ে করুণ স্বরে বলল, 'ওরে বাবা৷'
কিছুক্ষণ পরে কর্নেল আর ড. প্রসাদ একটা ফাঁদ নিয়ে বেরোলেন৷ যেখানে আমি পিঁপড়ে-মানুষদের দেখেছি, সেখানে কোথাও ফাঁদটা পেতে রাখবেন৷ সঙ্গে ষষ্ঠীচরণকেও নিয়ে গেলেন৷ সে দা দিয়ে কুপিয়ে জঙ্গল সাফ করে চলার রাস্তা বানাবে৷ যা দুর্গম জঙ্গল!
আমি রইলুম তাঁবুর পাহারায়৷ জিম সেই যে তাঁবুর খাটের তলায় ঢুকেছে, আর বেরোবার নাম করে না৷ তার ওপর রাগ হচ্ছিল৷ খুব বকাবকি করলুম তাকে ভীতু বলে৷ শাসালুম, কলকাতায় ফিরে বেচে দেব ব্যাটাচ্ছেলেকে৷ জিম গ্রাহ্য করল না৷ শুধু গলার ভেতর সেই চাপা কান্নার মতো আওয়াজ করল৷
বিকেল নেমেছে৷ গুলিভরা রাইফেল কাঁধে রেখে সতর্ক দৃষ্টিতে চারপাশে লক্ষ রেখে সান্ত্রির মতো পায়চারি করছিলুম৷
দূরে একপাল হরিণ চরছিল৷ মাথার ওপর ঝাঁকে ঝাঁকে সামুদ্রিক পাখি উড়ে যাচ্ছিল৷ একসময় উত্তর দিকে জঙ্গলের মাথার ওপর একটা প্রকাণ্ড বেলুন দেখতে পেলুম৷ হলুদ রঙের বেলুনটা নিঃশব্দে ওদিকে কোথাও আস্তে আস্তে নামছে৷
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম৷ বেলুনটা গাছপালার আড়ালে অদৃশ্য হলে ব্যস্ত হয়ে উঠলুম৷ এই নির্জন আজব দ্বীপে বেলুন নামাটা বড়ো রহস্যময়৷
তাঁবুর দরজায় পর্দা শক্ত করে বেঁধে তক্ষুনি বেরিয়ে পড়লুম ব্যাপারটা দেখতে৷ যেদিকে পিঁপড়ে-মানুষ দেখেছিলুম, এটা তার উলটো দিকে৷ ওদিক দিয়েই আমরা এ দ্বীপে ঢুকেছি৷ আমাদের হেলিকপ্টার ওদিকে সমুদ্রতীরে বালির বিচে নেমেছিল৷ যখন আমাদের দ্বীপ ছেড়ে যাওয়ার সময় হবে, তাঁবুর ভেতর রাখা বেতার যন্ত্রে খবর পাঠাবেন কর্নেল৷ তাহলে ওঁর বন্ধু এক সামরিক অফিসার হেলিকপ্টারটা নিয়ে আসবেন দ্বীপে৷
জিমকে নাড়ানো যাবে না৷ তা না হলে ওকে সঙ্গে নিয়ে যেতুম৷
জঙ্গলের ভেতর দৌড়ে চললুম৷ একটু পরেই জঙ্গলের ওধারে ঢালু পাহাড়ি জমি নীচে সমুদ্রের বিচে গিয়ে মিশেছে৷ সেখানে দাঁড়িয়ে দেখি, বেলুনটা চুপসে বালির ওপর পড়ে রয়েছে৷ বেলুনের তলায় দড়িদড়া থেকে ঝুলন্ত প্রকাণ্ড বাস্কেটের মতো আসন৷ একটা বেঁটে গাবদা মোটা লোক সবে বেরোচ্ছে৷ তার চেহারা চীনাদের মতো৷ কোমরে বাঁধা একটা লম্বাটে রিভলবার৷ লোকটাকে দেখে পছন্দ হল না৷ কেমন খুনে মার্কা চেহারা৷
বেলুন সেইভাবেই পড়ে রইল৷ লোকটা এদিকে ঘুরে ঢালু জমিটা বেয়ে উঠতে থাকল৷ তখন আমি ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লুম৷
সে জঙ্গলে ঢুকে পশ্চিমে এগোল৷ তাকে অনুসরণ করতে থাকলুম৷ ফাঁকা মাঠের দিকে না গিয়ে সে সমুদ্রের সমান্তরালে জঙ্গলের ভেতরে চলেছে৷ কিছুক্ষণ পরে সে দাঁড়াল৷ এদিক-ওদিক তাকিয়ে একটা পাথরের ওপর উঠল৷ তারপর তিন বার হাততালি দিল৷
জঙ্গলের ভেতর ছায়া ততক্ষণে আরও ঘন হয়েছে৷ তবু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ওর ক্রিয়াকলাপ৷ মিনিট খানেক পরে যা দেখলুম, আমার তো চক্ষু চড়কগাছ৷ এ কি স্বপ্ন, না সত্যি সত্যি ঘটছে!
পাথরের ওপাশ থেকে এক দঙ্গল পিঁপড়ে-মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে৷
লোকটা প্যান্টের পকেট থেকে মুঠো মুঠো কী সব জিনিস ছড়িয়ে দিল৷ আর পিঁপড়ে-মানুষগুলো কাড়াকাড়ি করে তা কুড়িয়ে খেতে থাকল৷ একটু পরে লোকটাকে দেখলুম ওদের সঙ্গে চলেছে৷ আমি আড়ালে আড়ালে কিছুটা এগিয়ে গেলুম৷ কিন্তু পাথরের কাছে এসে ওদের হারিয়ে ফেললুম৷ ওরা যেন বেমালুম উবে গেছে৷
এদিক-ওদিক সাবধানে খোঁজাখুঁজি করেও ওদের পাত্তা পেলুম না৷ ততক্ষণে পশ্চিমে ওয়াকিমো পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে সূর্য৷ জঙ্গল থেকে দক্ষিণে এগিয়ে ফাঁকা মাঠটায় পৌঁছোলুম৷ তাঁবুর দিকে প্রায় দৌড়ে চললুম৷
জিমের জন্যে ভাবনা হচ্ছিল৷
আমার তাঁবুর সামনে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হল৷ দরজার পর্দা ছেঁড়া৷ শুধু ছেঁড়া নয়, কুটিকুটি করে কেটে কেউ বা কারা ছড়িয়ে রেখেছে৷
ভেতরে ঢুকে চেঁচিয়ে ডাকলুম, 'জিম! জিম!'
জিমের সাড়া নেই৷ ক্যাম্পখাটের তলা ফাঁকা৷ টর্চ জ্বেলে তাঁবুর ভেতরটা ভালো করে দেখে নিলুম৷ জিম নেই৷
রাগে দুঃখে বাইরে বেরিয়েছি৷ কর্নেলদের সাড়া পাওয়া গেল৷ সন্ধ্যার আবছা আলোয় ওঁদের দেখা যাচ্ছিল৷ কথা বলতে বলতে হেঁটে আসছেন তাঁবুর দিকে৷
কর্নেল তাঁর ধুরন্ধর গোয়েন্দাবুদ্ধি প্রয়োগ করে সিদ্ধান্তে এসেছেন, পিঁপড়ে-মানুষরাই জিমকে চুরি করে নিয়ে গেছে৷ তাকে উদ্ধার করতে হলে পিঁপড়ে-মানুষদের ডেরা খুঁজে বের করতে হবে৷ কর্নেলের ধারণা, জিমকে মেরে ফেলা ওদের উদ্দেশ্য নয়৷ অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে৷ আপাতত সেটা বোঝা যাচ্ছে না৷
এ-রাতেও জ্যোৎস্না ছিল৷ আমরা চুপিচুপি একটা কাজ সেরে ফেললুম৷ সমুদ্রতীরের সেই বেলুনটা গুটিয়ে নিয়ে এলুম তাঁবুতে৷ তারপর পালাক্রমে রাইফেল হাতে পাহারা দিলুম৷ কিন্তু রাতে কোনো ঘটনা ঘটল না৷
ভোর বেলা কর্নেল একা বেরিয়েছিলেন৷ ফিরে এসে জানালেন, ব্যাটাচ্ছেলেরা ফাঁদটাকে কুটিকুটি করে কেটেছে৷ তবে লুকিয়ে রাখা ক্যামেরায় ছবিগুলো উঠেছে৷ কর্নেলের ক্যামেরার কীর্তিকলাপ আমার জানা৷ অন্ধকারে ছবি তুলতে ওস্তাদ৷
ছবিগুলো প্রিন্ট করে দেখালেন৷ পিঁপড়ে-মানুষরা ফাঁদ কীভাবে দাঁত দিয়ে কাটছে, তার পরিষ্কার ছবি উঠেছে!
ব্রেকফাস্ট সেরে আমি, কর্নেল ও ড. প্রসাদ বেরিয়ে পড়লুম উত্তর দিকের জঙ্গলে-যেখানে কাল সন্ধ্যায় বেলুনের লোকটাকে অদৃশ্য হতে দেখেছি৷
সেই পাথরের কাছে গিয়ে দিনের আলোয় একটা ব্যাপার দেখতে পেলুম৷ পাথরের গায়ে সাদা আঁকিবুঁকি রয়েছে৷ পিঁপড়ে-মানুষদের ছবি আঁকার শখ? নাকি ওতে কিছু লেখা রয়েছে? তাহলে স্বীকার করতে হয়, ওরা মানুষদের মতো লেখাপড়াও করে৷
প্রাণীবিজ্ঞানী ড. প্রসাদ হেসে উড়িয়ে দিলেন৷ কর্নেল হাঁটু গেড়ে প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে মাটিতে ও ঘাসে কিছু খুঁজছিলেন৷ ওই অবস্থায় বাঁ-দিকে এগিয়ে আরও একটা বড়ো পাথরের কাছে গিয়ে চাপা গলায় বলে উঠলেন, 'পেয়েছি! পেয়েছি!'
ড. প্রসাদ বললেন, 'কী পেয়েছেন কর্নেল?'
কর্নেল কোনো জবাব না দিয়ে পাথরটার ওপর উঠতে শুরু করলেন৷ তারপর দেখি, উনি হঠাৎ উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন৷ কিছুক্ষণ কী দেখার পর ইশারায় আমাদের ডাকলেন৷ ড. প্রসাদ আর আমি পাথরে উঠে ওঁর মতো উপুড় হতেই এক বিচিত্র দৃশ্য দেখতে পেলুম৷
পাথরের ওদিকে ঢালু হয়ে মাটিটা নেমে গেছে এবং একটা বিশাল গর্তের মতো সমতল জায়গায় অসংখ্য উইঢিবির মতো ঢিবি রয়েছে৷ ঢিবির দরজা আছে এবং জানলার মতো ফোকরও আছে কয়েকটা৷ ঢিবিঘরের ভেতর থেকে পিঁপড়ে-মানুষরা বেরোচ্ছে, আবার ঢুকছে৷ একখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে একদল পিঁপড়ে-মানুষ৷ মধ্যিখানে একটা বেদিমতো উঁচু জায়গা৷ সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা লাল পিঁপড়ে-মানুষ৷ ওর মাথায় ঘাসের মুকুট৷ মুকুটে রঙিন পালক গোঁজা এবং উজ্জ্বল মণির মতো কী জিনিস-তা থেকে সূর্যের আলো ঠিকরে পড়ে চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে৷
তার চেয়েও আশ্চর্য ব্যাপার, বেদির নীচে ঘাসের মোটা দড়িতে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে বেলুনের লোকটা৷
আমরা দম আটকানো ভঙ্গিতে উপুড় হয়ে শুয়ে ওই আজব দৃশ্য দেখতে থাকলুম৷ তারপর কানে এল, পিঁপড়ে-মানুষেরা পোকামাকড়ের ডাকের মতো চাপা ক্ষীণ শব্দে কথাবার্তা বলছে৷ সে শব্দ এত চাপা যে মনে হচ্ছে, অনেক দূরে কোথাও হাজার হাজার পোকামাকড় ডাকছে৷
তারপর যা দেখলুম, আমি লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিলুম আর কি-কর্নেল টেনে ধরে ফের শুইয়ে দিলেন৷
সামনেকার একটা ঢিবিঘর বেশ বড়ো-প্রায় ফুট ছয়েক উঁচু এবং ফুট তিনেক চওড়া৷ সেটার রং পাটকিলে৷ সেটা নিশ্চয় রাজার বাড়ি৷ সেখান থেকে চ্যাংদোলা করে পিঁপড়ে-রক্ষীরা আমার জিমকে বের করে আনছিল৷
পেছনে আরেকটা লাল পিঁপড়ে-মানুষ৷ নিশ্চয় রানি৷ কিন্তু জিম যেন মড়া৷ টুকটুক করে তাকাচ্ছে৷ নির্জীব অবস্থা৷
রানি বেদিতে উঠে রাজার পাশে দাঁড়াল৷ জিমকে পিঁপড়ে-রক্ষীরা তাদের পায়ের কাছে বেদির ওপর শুইয়ে দিল৷ কিন্তু আশ্চর্য, জিম ছাড়া পেয়েও তেমনি নির্জীব হয়ে পড়ে রইল৷
এবার রানিকে দেখলুম দু-হাত তুলে জোরে নাড়ছে৷ তারপর ঢিবি রাজবাড়ির দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল একটা অদ্ভুত প্রাণী৷ ধূসর রঙের হায়নার মতো দেখতে৷ কিন্তু অত কুৎসিত নয়৷ বরং নেকড়ে বলে মনে হল৷ পিঁপড়ে-রানির মাথাতেও মুকুট আছে৷ মুকুটে ফুল গোঁজা৷ রানি একটা ফুল মুকুট থেকে নিয়ে একটু ঝুঁকে দাঁড়াল৷ প্রাণীটা বেদিতে উঠে খপ করে ফুলটা মুখে পুরল৷ চিবুতে থাকল৷ তারপর জিমের গা শুঁকতে শুরু করল৷
ড. প্রসাদ উত্তেজিতভাবে ফিসফিস করে বললেন, 'নেকুর! নেকুর!'
নেকুর তাহলে পিঁপড়ে-মানুষদের কাছে পোষ মেনেছে! অবাক হয়ে নেকুর দেখতে থাকলুম৷ জন্তুটা জিমকে যেন আদর করছে৷ জিম তেমনি নিঃসাড়৷
জিমের চারপাশে ঘুরে নেকুরটা খেলা করতে থাকল৷ সবাই এবার ভিড় করে খেলা দেখছিল৷ ঢিবিঘরগুলো থেকে ছোটো-বড়ো সব পিঁপড়ে-মানুষ ভিড় জমিয়েছে ততক্ষণে৷ এই সময় কর্নেল ফিসফিস করে বললেন, 'সাবধানে নেমে এসো তোমরা৷ ঢিবিঘরগুলোর পেছনে গিয়ে লুকিয়ে থাকো৷ তারপর কী করতে হবে, বলে দেবখন৷'
সাবধানে তিন জনে পাথরের টুকরো আর খাঁজের আড়ালে নীচে নেমে গেলুম৷ বুঝলুম, এই সমতল বিশাল গর্তমতো জায়গাটা কোনো যুগের আগ্নেয়গিরির ক্রেটার৷ ঢিবিঘরের পেছনে ঝোপের আড়ালে তিন জনে বসে পড়লুম৷
তারপর দেখি, কখন ওদের অজান্তে বেলুনের লোকটা দড়ির বাঁধন খুলে ফেলেছে৷ সে উঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাক করে বেমক্কা রিভলবার থেকে গুলি ছুড়ল দু-বার৷
পলকের মধ্যে হুলুস্থুল পড়ে গেল৷ পিঁপড়ে-মানুষরা পিলপিল করে এদিকে-ওদিকে ক্রেটারের কিনারায় ঢালু পাড় বেয়ে উঠল এবং পালিয়ে গেল৷ রাজা ও রানি যেন হতভম্ব৷ স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ লোকটা বেদির ওপর লাফ দিয়ে উঠল এবং রাজার মুকুট ধরে টানাটানি শুরু করল৷

নেকুরটা জিমকে নিয়েই ব্যস্ত ছিল৷ এবার আচমকা গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ওপর৷ রিভলবার ছিটকে পড়ল নীচে৷ নেকুরটা ওর গলা কামড়ে ধরেছে৷ লোকটা বিকট আর্তনাদ করে হাত-পা ছুড়ছে৷
কর্নেল বলে উঠলেন, 'চলে এসো সবাই!'
আমরা যেই দৌড়ে গেছি, রাজা-রানি তিরের মতো ছুটল উলটো দিকে৷ বেদির কাছাকাছি পৌঁছোনোর সঙ্গেসঙ্গে নেকুরটাও দৌড়ে পালিয়ে গেল৷ কর্নেল বেলুনের লোকটার কাছে হাঁটু দুমড়ে বসলেন৷ ওর গলাটা ফাঁক হয়ে গেছে, গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে৷ ওকে বাঁচানোর উপায় ছিল না৷ এক মিনিটের মধ্যে হাত-পা খিঁচিয়ে ওর দেহটা শক্ত হয়ে গেল৷ সেই বীভৎস দৃশ্য থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলুম৷
জিম আমাকে দেখে এতক্ষণে ওঠার চেষ্টা করল৷ পারল না৷ ওকে দু-হাতে বুকের কাছে তুলে নিলুম৷ ওর শরীর থরথর করে কাঁপছিল৷
কর্নেল লোকটার পকেট হাতড়ে একটা নোটবই পেলেন৷ চীনা ভাষায় কী সব লেখা আছে৷ নোটবইটা নিজের পকেটে ঢুকিয়ে কর্নেল বললেন, 'আসুন ড. প্রসাদ, আমরা এখান থেকে কেটে পড়ি৷ বেচারি পিঁপড়ে-মানুষদের বিব্রত করে লাভ কী? ওদের কচি বাচ্চারা নিশ্চয় ঘরে আছে৷ ওরা না ফিরলে সেগুলো না খেয়ে মারা পড়বে৷'
ঠিক তাই৷ ঢিবিঘরের দরজায় খুদে পিঁপড়ে-মানুষরা উঁকি দিচ্ছিল দেখে মায়া হয়৷ আমরা চলে গেলে মা-বাবা ফিরে এসে খেতে দেবে৷ এ বেলা হয়তো বেলুনের লোকটার মাংস দিয়েই পিঁপড়ে-পুরীতে বড়ো রকমের একটা ভোজ হবে৷
তাঁবুতে ফিরে দেখি আরেক কাণ্ড৷ ষষ্ঠীচরণ বন্দি৷ কিচেন-তাঁবুর ভেতর তার ক্যাম্পখাটে ওকে কারা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে৷ যা দিয়ে বেঁধেছে, তা শক্ত ঘাসের দড়ি৷ ও ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে৷ মুখে কথা নেই৷
কর্নেল একটা ছুরি দিয়ে বাঁধন কেটে ওকে মুক্ত করলেন৷ তখন ষষ্ঠীচরণ উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙল এবং জব্বর একটা হাই তুলল৷
বললুম, 'ব্যাপার কী ষষ্ঠী?'
ষষ্ঠীচরণ বলল, 'খুব ঘুম পেয়েছিল স্যার!'
তার জবাব শুনে অবাক হয়ে বললুম, 'কিন্তু তোমায় অমন করে বেঁধেছিল কারা?'
এতক্ষণে ষষ্ঠীচরণের যেন খেয়াল হল৷ কাটা দড়িগুলো দেখে নিয়ে বলল, 'তাহলে আমাকে সত্যি সত্যি বেঁধেছিল ব্যাটাচ্ছেলেরা? আমি ভাবছি, স্বপ্ন দেখছিলুম৷ ওরে বাবা! এ কী বিদঘুটে জায়গায় এসে পড়েছি৷'
কর্নেল হাসতে হাসতে বললেন, 'তুমি নিশ্চয় আরাম করে খাটে শুয়েছিলে?'
ষষ্ঠীচরণ জিভ কেটে বলল, 'অন্যায় হয়ে গেছে স্যার৷ মাফ করে দিন৷ আপনারা যাওয়ার পর কেমন ঢুলুনি পেয়েছিল৷ ভাবলুম একটু শুয়ে নিই৷ রাত্তিরে তরাসে ঘুম হয় না কিনা!'
কর্নেল বললেন, 'ভাগ্যিস, তোমাকে পিঁপড়ে-মানুষরা ধরাধরি করে জিমের মতো বয়ে নিয়ে যায়নি! তাহলে আজ দুপুরের খাওয়াদাওয়া কারও জুটত না আমাদের৷'
ষষ্ঠীচরণ ভয় পেয়ে বলল, 'ওরে বাবা!' তারপর সে ব্যস্তভাবে উনুন ধরাতে গেল৷
আমরা কর্নেলের তাঁবুতে গেলুম৷ ড. প্রসাদ বললেন, 'লোকটার নোটবইয়ে নিশ্চয় সব কথা লেখা আছে৷ চীনা ভাষা জানলে ভালো হত৷ কিন্তু...'
কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, 'আমি অল্পস্বল্প জানি চীনাভাষা৷ দেখি, কী লেখা আছে?'
কর্নেল মিনিট দশেক ধরে নোটবইটা নিয়ে মেতে রইলেন৷ আমরা দু-জনে চুপচাপ কৌতূহল নিয়ে বসে রইলুম৷ তারপর কর্নেল বললেন, 'লোকটার নাম সান-ওয়ান-সু৷ হংকং-এ বাড়ি৷ কীভাবে ভেগা দ্বীপের পিঁপড়ে-মানুষদের কথা জেনেছিল, লেখা নেই৷ তবে এটুকু লেখা আছে, মোট তিন বার এসেছে এর আগে৷ পিঁপড়ে-মানুষদের রাজার মুকুটে যে বহুমূল্য মণি দেখেছি আমরা, সান-ওয়ান-সু ওটা হাতাতে চেয়েছিল৷'
ড. প্রসাদ বললেন, 'ওদের সঙ্গে ভাব করল কীভাবে, লেখা নেই?'
কর্নেল বললেন, 'আছে৷ প্রথম বার এসে ওদের গতিবিধি জেনে গিয়েছিল আড়াল থেকে৷ দ্বিতীয় বার সঙ্গে এনেছিল একটা প্রকাণ্ড কেক৷'
বললুম, 'কেক দিয়ে পিঁপড়ে-মানুষদের সঙ্গে ভাব করেছিল? ভারি বুদ্ধিমান তো৷'
কর্নেল বললেন, 'হ্যাঁ৷ তৃতীয় বার এনেছিল এক বস্তা চিনি৷'
বললুম, 'কিন্তু এ-বার তার সঙ্গে কিছু ছিল না৷ আমি দেখেছি৷'
কর্নেল হাসলেন৷ বললেন, 'এই চতুর্থ বার সে যা এনেছিল, তা বেলুনের বাস্কেটে এখনও আছে৷ ওই যে দেখছ প্যাকেট বাঁধা জিনিসটা, ওটা লজেঞ্চুস৷'
আমরা সবাই একসঙ্গে হেসে উঠলুম৷ কর্নেল ফের বললেন, 'প্যাকেটটা সঙ্গে নিয়ে কেন যায়নি, একটু ভাবলেই বোঝা যায়৷ আমার মনে হচ্ছে, পিঁপড়ে-মানুষদের রাজাকে সে সমুদ্রের ধারে তার বেলুনের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছিল৷ হয়তো বলেছিল, ওখানে গেলেই রাজাকে উপহারটা দেবে৷ তার মতলব ছিল, ওইভাবে ডেকে নিয়ে মণিটা কেড়ে নিয়ে বেলুনে চড়ে পালাবে৷ কিন্তু পিঁপড়ে-মানুষরা বুদ্ধিমান৷ ওর মতলব টের পেয়েছিল৷'
আমার বুদ্ধি খেলল এবার৷ বললুম, 'উঁহু৷ তা নয়, বেলুনটা আমরা নিয়ে এসেছিলুম বলে সমুদ্রের ধারে গিয়ে যখন পিঁপড়ে-মানুষরা কিছু পায়নি, তখন রেগে গিয়ে ওকে বন্দি করেছিল৷'
কর্নেল সায় দিয়ে বললেন, 'মন্দ বলনি জয়ন্ত৷ সম্ভবত...'
কর্নেলের কথা হঠাৎ বন্ধ হল৷ উনি কোনের দিকে গুটিয়ে রাখা বেলুনটার দিকে হঠাৎ এগিয়ে গেলেন৷ তারপর বলে উঠলেন, 'সর্বনাশ! বেলুনের অবস্থাটা কী করেছে! কুটিকুটি করে রেখে গেছে যে!'
আমি ও ড. প্রসাদ হুমড়ি খেয়ে দেখতে লাগলুম৷ বেলুনের ভাঁজকরা রবারটা আর আস্ত নেই৷ ঝাঁঝরা হয়ে রয়েছে৷ তার মানে বেলুনটা আর ওড়ানো যাবে না৷ শুধু দোলনার মতো বাস্কেটটা টিকে আছে৷ তার মধ্যে বসার আসন, লজেন্সের প্যাকেট, অল্পস্বল্প কলকবজা রয়েছে৷ পিঁপড়ে-মানুষরা সেসব ছোঁয়নি৷ লজেন্সের প্যাকেটটা অন্তত নিয়ে পালানো উচিত ছিল৷ কেন নেয়নি?
ড. প্রসাদ একটু হেসে বললেন, 'আমরা লজেন্সগুলো দিয়ে ওদের সঙ্গে ভাব করব৷ কী বলেন কর্নেল?'
কর্নেল গম্ভীর মুখে বললেন, 'ওই লজেন্সে তীব্র বিষ মেশানো আছে, ড. প্রসাদ৷'
আমরা দু-জনে আঁতকে উঠলুম৷ বললুম, 'সে কী! কী ভাবে বুঝলেন?'
কর্নেল বললেন, 'ওই দেখো, কত খুদে পিঁপড়ে আর পোকামাকড় ঘরে পড়ে রয়েছে৷ তাই দেখে পিঁপড়ে-মানুষরা প্যাকেটটা ছোঁয়নি৷ এবার আশা করি বুঝতে পারছ, লোকটাকে কেন ওরা অমন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে শাস্তি দিচ্ছিল৷'
ড. প্রসাদ বললেন, 'সর্বনাশ! পিঁপড়ে-মানুষরা দেখছি ভারি ধূর্ত৷ আমরা বেরিয়ে গেছি, আর ওরা সেই ফাঁকে এতসব কাণ্ড করেছে! তার মানে, ওরা সারাক্ষণ আমাদের চোখে চোখে রেখেছে৷ কিন্তু ওদের আস্তানা থেকে আমরা এতদূরে রয়েছি৷ আমরা ওদের আস্তানায় পৌঁছোবার আগেই অত তাড়াতাড়ি কীভাবে ওরা এখানে এল এবং ফিরে গেল?'
কর্নেল বললেন, 'সেটা একটা রহস্য বটে৷ আমার মনে হচ্ছে, এখানে কোথাও একটা সিধে পথ আছে, মাটির তলায় তলায়৷ অর্থাৎ সুড়ঙ্গপথ৷ খুঁজে দেখা যাক৷'
তাঁবুর বাইরে গিয়ে দাঁড়ালুম তিন জনে৷ জিম আমার সঙ্গে এসেছে৷ নিভে যাওয়া আগ্নেয়গিরির ক্রেটার অর্থাৎ পিঁপড়ে-মানুষদের বসতি এখান থেকে উত্তর-পশ্চিম কোনে মাইলটাক দূরে৷ ওদিকটা জঙ্গল আর পাহাড়ে বড়ো দুর্গম দেখাচ্ছে৷
এইসময় হঠাৎ জিম একটা চাপা গরগর আওয়াজ করল৷ আগের আতঙ্ক মেশানো আওয়াজ৷ তারপর এক বিচিত্র দৃশ্য দেখলুম৷
আমাদের সামনে খোলামেলা ঘাসের মাঠে আচম্বিতে পিলপিল করে কালো রঙের পিঁপড়ে-মানুষরা যেন মাটি ফুঁড়ে বেরোল৷ অসংখ্য জায়গা থেকে অসংখ্য পিঁপড়ে-মানুষ আর তাদের সঙ্গে সেই নেকুরের পাল৷
বুঝলুম অজস্র গর্ত ছিল ঘাসের আড়ালে৷ ওগুলো সুড়ঙ্গপথ৷ সেখান দিয়ে বেরিয়ে গোটা মাঠ জুড়ে একটা মোটা কালো রেখার মতো দাঁড়িয়ে আছে ওরা৷ সামনে একটা করে নেকুর নিয়ে একজন করে পিঁপড়ে-মানুষ৷ নিশ্চয় ওরা সেনাবাহিনী৷
তারপর দীর্ঘ সেই কালো রেখা অর্ধবৃত্তাকার হয়ে এগিয়ে আসতে থাকল আমাদের দিকে৷ কতক্ষণ হতবাক হয়েছিলুম কে জানে! হঠাৎ কর্নেল চেঁচিয়ে উঠলেন, 'সমুদ্রের কাছে চলো সবাই৷ সমুদ্রের কাছে৷' তারপর দৌড়ে তাঁবুতে গিয়ে ঢুকলেন৷
কখন ষষ্ঠীচরণ রান্না ফেলে আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে৷ সে বলে উঠল, 'ওরে বাবা!'
আমি রুদ্ধশ্বাসে বললুম, 'রাইফেল এনে গুলি ছুড়ি কর্নেল!'
কর্নেল তাঁবুর ভেতর থেকে শুনতে পেয়ে বললেন, 'না জয়ন্ত৷ গুলি করে ওদের শেষ করা যাবে না৷ সারা দ্বীপের মাটির তলায় তলায় দুর্গের মতো কোটি কোটি পিঁপড়ে-মানুষ রয়েছে মনে হচ্ছে৷ এসো, সবাই সমুদ্রের দিকে পালাই৷'
আচমকা চার জনে সবকিছু ফেলে পুবে সমুদ্রের দিকে দৌড়ে চললুম৷ কর্নেল শুধু বেতারযন্ত্রটা সঙ্গে নিয়েছেন দেখা গেল৷
যখন বিচে পৌঁছোলুম, তখন আমাদের দম আটকানোর অবস্থা৷ বুঝতে পারছিলুম না, এখানে কীভাবে ওদের হাত থেকে বাঁচব৷ এদিকে সমুদ্র অনেকটা শান্ত৷ কর্নেল সোজা জলে নেমে গিয়ে ডাকলেন, 'এসো জয়ন্ত! আসুন ড. প্রসাদ৷ আমরা এখন নিরাপদ৷'
ষষ্ঠীচরণ কর্নেলের সঙ্গেই জলে নেমেছে৷ ঢেউয়ের ঝাপটায় কোমর অবধি ভিজে যাচ্ছে ওদের৷ আমি ও ড. প্রসাদও ওদের কাছে গেলুম৷ বললুম, 'কর্নেল! আমরা এখানে কীভাবে নিরাপদ? ওই তো ওরা এগিয়ে আসছে!'
কর্নেল বেতারযন্ত্রের চাবি ঘুরিয়ে কোনো বেতারকেন্দ্র ধরার চেষ্টা করছেন! বললেন, 'ওরা জলকে বড়ো ভয় পায়৷'
জিমকে আমি দু-হাতে বুকের কাছে ধরে রেখেছি৷ সে থরথর করে কাঁপছে৷ বিচের ওধারে উঁচু ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে নেমে আসছে পালে পালে নেকুর৷ বীভৎস তাদের মুখভঙ্গি৷ জিভ লকলক করছে৷ পিঁপড়ে-মানুষরা তিড়িং-বিড়িং করে নাচতে নাচতে আসছে ওদের পেছন৷
বিচের বালিতে এসে ওরা থমকে দাঁড়াল৷
কর্নেল বেতারযন্ত্রে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন৷ শুনলুম উনি বললেন, 'হ্যাঁ-হ্যাঁ, ভেগা আইল্যান্ড৷ শিগগির হেলিকপ্টার নিয়ে আসুন৷ আমরা বিপন্ন৷'
ষষ্ঠীচরণ চোখ বুজে ঠক ঠক করে কাঁপছে এক হাঁটু জলে৷ জিম আমার বুকে মুখ লুকিয়েছে৷ ড. প্রসাদ বিড়বিড় করে বলছেন, 'আহা! ক্যামেরাটা আনলে কত ভালো হত! কেউ কি বিশ্বাস করবে আমাদের কথা?'
কথাটা কানে যেতেই কর্নেল প্রায় আর্তনাদ করে বললেন, 'এই যাঃ! আমার ক্যামেরাটা আর কি ফিরে পাব? কী ভুলো মন আমার!'
উজ্জ্বল রোদে সোনালি বিচের ওপর পালে পালে জিভ বের করা নেকুর আর অসংখ্য পিঁপড়ে-মানুষ একইভাবে দাঁড়িয়ে৷
ঘরের ছেলে বেঁচেবর্তে ভেগা আইল্যান্ড থেকে ঘরে ফিরতে পেরেছিলুম, এই যথেষ্ট৷ দিন সাতেক পরে পোর্টব্লেয়ার থেকে কর্নেল তাঁর বন্ধু বিমানবাহিনীর সেই জাঁদরেল অফিসারের সাহায্যে হেলিকপ্টারে চেপে ভেগা দ্বীপে তাঁর অত্যদ্ভুত ক্যামেরা আর আমার রাইফেলের খোঁজে পাড়ি জমিয়ে ছিলেন৷ কিন্তু কোথায় ভেগা দ্বীপ? দ্বীপ যেন বেমালুম তলিয়ে গেছে ভারত মহাসাগরে৷ অনেক ওড়াউড়ি করে তাঁরা ফিরে আসেন৷
এখন কর্নেল বলেন, 'তাহলে কি আমরা চার জনেই একইরকম বিদঘুটে স্বপ্ন দেখেছিলুম৷'
ষষ্ঠীচরণ বলে, 'তা আর বলতে৷'
আমিও সায় দিয়ে বলি, 'ঠিক ঠিক৷ স্বপ্নই বটে৷ তবে স্বপ্নে যদি ক্যামেরা বা রাইফেল হারায়, তাহলে তো বড়ো রহস্যের! ও কর্নেল, জীবনে কত রহস্যের সমাধান করেছেন, এটা করবেন না?'
কর্নেল উদাসভাবে শুধু বললেন, 'তাই তো!'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন