সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

স্টেশন তখনও অন্তত আধা কিলোমিটার দূরে, ট্যাক্সিটা বিগড়ে গেল৷ ট্রেনের সময় হয়ে এসেছে৷ ট্যাক্সির সামনে ও পিছনে গাদাগাদি করে প্রায় এক ডজন যাত্রী ঠাসা ছিল৷ এ-মুল্লুকে নাকি এটাই রেওয়াজ৷ তবে শীতের দাপটে অবস্থাটা খুব একটা অসহনীয় মনে হচ্ছিল না৷ তা ট্যাক্সিওয়ালা দশ কিলোমিটার পথ আসতে ইতিমধ্যে তিন বার ভাড়া বাড়িয়েছে৷ এবার কলকবজা বিগড়ে যাওয়া ব্যাপারটাকে চতুর্থ দফা বাড়াবার ফন্দি ভেবেই আমরা যাত্রীরা ঝটপট নেমে এলুম৷ এবং যাঁদের ঠ্যাংগুলো লম্বা, তাঁরা সবার আগে দেখতে দেখতে উধাও হয়ে গেলেন৷
একটু পরে দেখি, আমি আর ট্যাক্সিওয়ালা ছাড়া আর জনপ্রাণীটি নেই৷ ট্যাক্সিওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়ে কোনো ফন্দিফিকির বা ধূর্তামির চিহ্ন খুঁজে পাচ্ছিলুম না৷ লোকটা করুণমুখে ইঞ্জিনের কলকবজার দিকে তাকিয়ে আছে৷ বললুম, 'কী দাদা, কী বুঝছেন?'
লোকটা হতাশভাবে মাথা নেড়ে বলল, 'নেহি সাব৷ আপ পাঁয়দল চলা যাইয়ে৷'
হুঁ, ভেবেছে আমি ওর হাড়জিরজিরে গাড়িটা মূর্ছাভাঙার অপেক্ষায় আছি৷ আসলে এতক্ষণ ঠাসাঠাসিতে আমার শরীরে আগাগোড়া ঝিম ধরে গেছে৷ পা দুটোতে কোনো সাড়া নেই৷ তাই সেই ঝিমুনি কাটিয়ে নিচ্ছি৷ এবং সেটা ওকে বুঝিয়ে দেবার জন্যই রাস্তার ওপরে পা দুটো ঘোড়ার মতো ঠুকতে ঠুকতে কয়েক পা এগিয়ে গেলুম৷ কাছেই একটা ব্রিজ রয়েছে৷ নদীটা বেশ চওড়া৷ তবে আদ্ধেকের বেশি বালিতে ভরা, বাকিটায় কালো জল৷ স্রোত বইছে বলে মনে হচ্ছিল না৷
বিকেল হয়ে গেছে৷ শীতের দিন ঝটপট ফুরিয়ে যায়৷ হিসেব করে দেখলুম, ট্রেনের এখনও মিনিট কুড়ি দেরি৷ স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে গেলেও ট্রেন ধরা যাবে৷ সঙ্গে একটা কিটব্যাগ ছাড়া কোনো বোঝা নেই৷ তা ছাড়া জায়গাটা কেন যেন খুব ভালো লাগছিল৷ একধারে ছোটো-বড়ো পাহাড়৷ তার উপত্যকা শীতের শস্যে সবুজ হয়ে আছে৷ অন্যধারেও পাহাড় আছে৷ আর আছে ঝোপঝাড় আর মাঝে মাঝে ঘন জঙ্গল৷ সামনে ওই স্টেশনের কাছে যা একটা বসতি-তা ছাড়া কাছাকাছি কোনো বসতির চিহ্ন চোখে পড়ছিল না৷
মনে হল, জায়গাটা ভ্রমণবিলাসীদের পক্ষে মোটামুটি পছন্দসই!
হঠাৎ আমার চোখ গেল ডাইনে নদীর পাড়ে জঙ্গলের দিকটায়৷ ঝোপের মধ্যে কী একটা বসে আছে যেন৷ বাঘ-ভাল্লুক নাকি? বলা যায় না, এই জঙ্গলে জনহীন জায়গায় বিশেষ করে শীতকালে জন্তুজানোয়ার বেরিয়ে পড়তেও পারে৷
ধূসর রঙের প্রাণীটি আমার দিকে পিঠ রেখে ওত পেতে আছে৷ একবার ভাবছি ট্যাক্সিওয়ালাকে ডেকে সাবধান করে দিই৷ আবার ভাবছি, আমার ডাকাডাকি শুনে যদি দাঁত-নখ বাগিয়ে তেড়ে আসে? অবশ্য রাস্তাটা যথেষ্ট উঁচু এবং আন্দাজ দেড়শো মিটার দূরত্বে রয়েছে ওটা৷
কিন্তু আমাকে হকচকিয়ে দিয়ে ওটা উঠে দাঁড়াল এবং তক্ষুনি বুঝলুম চোখের ভুল হয়েছে৷ ওটা ধূসর রঙের কোট-প্যান্টপরা একজন মানুষই বটে৷ হাতে কী একটা রয়েছে৷ গা ছমছম করে উঠল এবার৷ অন্যরকম ভয়ে৷ হাতে কী ওটা? পিস্তল? কাউকে খুন করার জন্যে ওত পেতে আছে লোকটা৷ কিন্তু কোট-প্যান্ট এবং দস্তুর মতো সায়েবি টুপিপরা কোনো লোক কাউকে খুন করার জন্যে ওভাবে ওত পেতেছে, এটা কিছুতেই যুক্তিসংগত মনে হল না৷
অথচ ওর গতিবিধি সন্দেহজনক৷ সন্দেহ আরও বাড়ল যখন দেখলুম, লোকটা হাতের কালোরঙের জিনিসটা তুলে গুলি ছোড়ার ভঙ্গিতে একটু কুঁজো হল এবং ওইভাবে পা টিপে ঝোপঝাড় ভেঙে এগোতে থাকল৷
তারপর দেখি, সে দৌড়োতে শুরু করেছে৷ গুরুতর দুর্ঘটনার আশঙ্কায় আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে এবার৷ প্রতি মুহূর্তে আশঙ্কা করছি, গুলির শব্দ আর মানুষের আর্তনাদ শুনব৷ ওর হাতের জিনিসটা যদি বন্দুক হত, তাহলে শিকারিই ভাবতুম৷ পিস্তল দিয়ে কি কেউ পাখি বা জন্তুজানোয়ার শিকার করে?
দৌড়ে সে যেখানে ঢুকল সেখানে কিছু উঁচু উঁচু গাছ রয়েছে৷ ছায়ায় অস্পষ্টভাবে তাকে দেখতে পাচ্ছি৷ তারপর সে অন্তত এক মিনিটের জন্যে অদৃশ্য হয়ে গেল৷ ট্যাক্সিওয়ালা ব্যাপারটা দেখেছে নাকি জানার জন্যে ওদিকে ঘুরলুম৷ না, ও এখনও ইঞ্জিনের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছে৷
আবার যখন সেই লোকটাকে দেখতে পেলুম, তখন সে নদীর পাড়ে হাঁটু দুমড়ে বসেছে এবং পিস্তল তাক করে রেখেছে৷ আর চুপ করে থাকতে পারলুম না৷ দৌড়ে গিয়ে ট্যাক্সিওয়ালাকে ব্যাপারটা দ্রুত জানিয়ে দিলুম৷ দু-জন মানুষ এখানে থাকতে একটা খুনখারাপি হবে! যে ট্যাক্সিওয়ালা তিন-তিন বার যাত্রীদের চাপ দিয়ে ভাড়া বাড়িয়েছে, তার বিবেকও এবার নড়ে উঠল৷ 'এইসা?'
বলে সে তার ট্যাক্সি থেকে একটা লোহার রড বের করল৷ তারপর চোখ কটমট করে আমাকে ডাক দিল৷ আমারও একটা কিছু হাতে নেওয়া দরকার৷ অগত্যা ওর ইঞ্জিনের মধ্যে রাখা একটা রেঞ্চ তুলে নিয়েই রওনা দিলুম৷ উত্তেজনায় মাথার ঠিক নেই৷
ট্যাক্সিওয়ালা উঁচু রাস্তা থেকে নামতে গিয়ে গড়িয়ে পড়ল৷ তারপর দুর্বোধ্য ভাষায় চাপাস্বরে কী বলতে বলতে ঝোপঝাড় ভেঙে এগোতে থাকল৷ আমি ওর পিছু পিছু চলেছি৷ দু-জনেই সতর্ক, আচমকা ধরে ফেলব ওকে৷
আমাদের দিকে পিঠ রেখে লোকটা এখনও তেমনি বসে আছে৷ টুপিপরা মাথাটা সামনে ঝুঁকছে, হাতের পিস্তল একেবারে নাকের ওপর তুলে তাক করে রেখেছে৷ সম্ভবত হতভাগ্য মানুষটি অর্থাৎ যাকে ও খুন করবে, সে নীচে নদীতে নিশ্চিন্তে কিছু করছে-টরছে৷ কিছু টের পাচ্ছে না৷ খুনে লোকটির হাতের পিস্তল আছে বলেই আমরা এত সাবধান হয়েছি৷ পা টিপে টিপে এগিয়ে কয়েক মিটার দূরে থেকে ট্যাক্সিওয়ালা রড তুলল এবং আমিও রেঞ্চটা বাগিয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম, 'খুন করলে! খুন করলে! পাকড়ো পাকড়ো!' ভুলেই গেলুম যে, ওর হাতে পিস্তল আছে৷
কিন্তু সঙ্গেসঙ্গে গুপ্তঘাতক ঘুরে ব্যাপারটা দেখেই হুড়মুড় করে নদীতে ঝাঁপ দিল৷ ট্যাক্সিওয়ালা রড নাচিয়ে পাড় থেকে শাসাতে শুরু করল৷ 'পিস্তল ফেঁক দো! নেহি তো ডান্ডা মারেগা হাম!'
আমি তখন হতভম্ব হয়ে গেছি৷ কী বলব, ভেবে পাচ্ছি না৷ নাকি এখনও লিটনগঞ্জের সেই সরকারি অতিথিশালায় শুয়ে একটা বিদঘুটে স্বপ্ন দেখছি?
কালো এবং প্রচণ্ড ঠান্ডা জলে বুক অবধি ডুবিয়ে হতভাগ্য গুপ্তঘাতক এখন ফ্যালফ্যাল করে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে৷ তার টুপিটা খুলে পড়ে কাগজের নৌকোর মতো ভেসে যাচ্ছে অল্প অল্প স্রোতে, এবং তার ফলে মাথাজোড়া যে টাকটি এই গোলাপি রোদ্দুরে চিকমিক করছে, সেটি অতি প্রসিদ্ধ এবং আমার সুপরিচিত৷ তার সান্টা ক্লজ সদৃশ্য সাদা অনবদ্য গোঁফ-দাঁড়িতে এখন বিস্তর জল-কাদা লেগেছে৷

এবং তার হাতের সেই পিস্তলটা পরিণত হয়েছে বাইনোকুলারে৷ এবং তা হয়েছে বলেই আমাদের বোকামির শাস্তি পাইনি৷ কিন্তু ততক্ষণে আমার পেটে হাসি ঘুলিয়ে উঠেছে৷ হায় বুড়ো ঘুঘু৷ এ কী দশা তোমার! ট্যাক্সিওয়ালা লোহার রডটা ফের তুলতেই করুণ আওয়াজ এল, 'জয়ন্ত! ওকে একটু বুঝিয়ে বলো যে, এটা পিস্তল-টিস্তল নয়, সামান্য একটা দূরবিন৷'
এতক্ষণে আমি হাসতে পারলুম৷ হো-হো করে হেসে উঠলুম৷ ট্যাক্সিওয়ালা অবাক হয়ে বলল, 'ক্যা জি? কোই জান পহচান আদমি? কৌন হ্যায় উও?'
বললুম, 'থোড়া গলতি হুয়া দাদা! মাফ কিজিয়ে৷ উও দেখিয়ে আপকা ট্যাক্সিমে বাচ্চালোক ক্যা গড়বড় কর রাহা৷'
সত্যি সত্যি কাচ্চাবাচ্চারা ওই জনহীন রাস্তায় ওর ট্যাক্সিতে হামলা করেনি, কিন্তু উপায় নেই৷ ওই নিমজ্জিত বৃদ্ধ ভদ্রলোককে উদ্ধার করতে হবে৷ শীতের বিকেলে নদীর জল ওঁর পক্ষে নিশ্চয় আরামদায়ক হচ্ছে না৷ যাই হোক, আমার মিথ্যে কথায় কাজ হল, ট্যাক্সিওয়ালা ঘুরে দাঁড়াল৷ তারপর ওর হাতে সেই ছোট্ট রেঞ্চটা গুঁজে দিতেই সে জঙ্গল ভেঙে রাস্তায় তার ট্যাক্সির দিকে দৌড় দিল৷
নিমজ্জিত বৃদ্ধের দিকে ঘুরে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বললুম, 'জলটা কি খুব ঠান্ডা?'
উনি করুণ হেসে ক্ষীণকন্ঠে বললেন, 'ধন্যবাদ! আমি এবার উঠতে পারব৷ তবে দয়া করে তুমি আমার টুপিটা উদ্ধার করো৷'
হাসতে হাসতে একটা গাছের ডাল ভেঙে ধীরে ধীরে ভাসমান টুপিটা উদ্ধার করে দেখি, উনি পাড়ে উঠেছেন এবং কী আশ্চর্য, আবার চোখে বাইনোকুলার রেখে পা টিপে টিপে এগোচ্ছেন! ভিজে পোশাক থেকে জল ঝরছে সমানে৷ কিন্তু এতক্ষণে সব রহস্য আমার কাছে পরিষ্কার হয় গেছে৷ বিরক্ত হয়ে ওঁর প্রচলিত নাম বা বদনাম ধরে ডেকে ফেললুম, 'হাই ওলড ঘুঘু! নিমুনিয়া হবে যে!'
উনি কানই দিলেন না৷ দৌড়ে গিয়ে ওঁর কাঁধ খামচে ধরলুম৷ তখন হতাশ ভঙ্গিতে ঘুরে দাঁড়ালেন৷ 'মাই ডিয়ার ইয়ংম্যান! তুমি জান না, কী সাংঘাতিক ক্ষতি করেছ আমার! অনেক কষ্টের পর বিরল প্রজাতির একটা উড-ডাকের দেখা পেয়েছিলুম৷ আর কি তাকে খুঁজে পাব?'
ওঁর কথায় এবার অনুতাপ জাগল৷ বললুম, 'এই দুর্ঘটনার জন্য আমি যথেষ্ট লজ্জিত এবং দুঃখিত৷ ক্ষমা করুন এবং চলুন, যেখানে উঠেছেন, সেখানে গিয়ে পোশাক বদলাবেন৷'
'এক মিনিট, জয়ন্ত! আমি প্রজাপতি ধরা জালটা নিয়ে আসি৷'
বলে উনি সামনের দিকে পা বাড়ালেন৷ সেদিকে তাকিয়ে দেখি গাছপালার ফাঁকে একটা কাঠের বেড়া দেখা যাচ্ছে৷ বুড়ো দেখতে দেখতে কী কৌশলে সেই বেড়ার ফাঁক গলিয়ে অদৃশ্য হলেন৷ তখন ব্যাপারটা ভালো করে দেখার জন্য বেড়ার দিকে এগিয়ে গেলুম৷
একটা কৃষিফার্ম বলে মনে হল৷ নদীর ধারে চারপাশে পাহাড় আর জঙ্গলের মধ্যে কেউ চাষবাস করেছে৷ অঢেল শীতের ফসল ফলে রয়েছে৷ তরকারিও লাগানো আছে৷ বুড়ো এখন হামাগুড়ি দিয়ে কুমড়ো খেতের দিকে এগোচ্ছেন৷ দুর্লভ প্রজাতির কতগুলো প্রজাপতি ওঁর জালে ধরা পড়েছে জানি না, তবে আমার চোখ পড়ল কুমড়োগুলোর দিকে৷ কিন্তু ওগুলো কি সত্যি কুমড়ো, না পাথর? চতুর্দিকে অজস্র ছোটো-বড়ো পাথর পড়ে আছে৷ অনেকরকম গড়ন, নানান রঙের৷ কিন্তু কুমড়ো খেতের ওগুলোর মসৃণ নিটোল গড়ন আর সোনালি রং দেখেই বুঝতে পারলুম, পাথর নয়৷ অতএব কুমড়ো ছাড়া আর কী!
আমার বৃদ্ধ বন্ধু ওখানে হাঁটু মুড়ে সাবধানে জাল গুটোচ্ছিলেন৷ হঠাৎ কোত্থেকে বাজখাঁই গলায় কে চেঁচিয়ে উঠল, 'অ্যাই! অ্যাই! অ্যাই!' তারপর দেখি, গামবুটপরা, নাদুসনুদুস চেহারার এক ভদ্রলোক হাতে খুরপি নিয়ে দৌড়ে আসছেন৷ এই রে! এবার আর বুড়োকে বাঁচানো যাবে না৷ আমি বেড়ার ফাঁক গলিয়ে ঢোকার জন্যে সাধ্যসাধনা করছি তার মধ্যে শুনি, উভয় পক্ষই হা-হা-হা-হা করে হেসে উঠলেন৷
'জয়ন্ত! এসো৷ আলাপ করিয়ে দিই৷'
ডাক শুনে বেড়া গলিয়ে ঢুকে পড়লুম৷ খামারের মালিক অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন৷ বেড়ার ফাঁকটা বেড়ে গেছে সম্ভবত, সেদিকেই ওঁর নজর৷...
খামারের মালিকের পরিচয় পেয়ে আমি অবাক৷ ভদ্রলোক আসলে একজন কৃষিবিজ্ঞানী৷ নাম ড. রঘুনাথ গিনতিওয়ালা৷ সংক্ষেপে ড. গিনতি৷ অনেককাল পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন৷ ভালো বাংলা বলেন৷ এই খামার তাঁর ল্যাবরেটরি৷ গাছগাছড়া নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করেন৷ তা ছাড়া এক ঋতুর ফসল কীভাবে অন্য ঋতুতে ফলানো যায়, তা নিয়েও মাথা ঘামান৷ আমার কৌতূহল ওঁর ফলানো কুমড়ো সম্পর্কে৷ প্রশ্ন শুনে হাসতে হাসতে বললেন, 'আপনারা বাঙালিরা কুমড়োর ছক্কা খেতে খুব ভালোবাসেন৷ ওদিকে লিটনগঞ্জের কলকারখানা এলাকায় অজস্র বাঙালি আছেন৷ বলতে পারেন, তাঁদের মুখ চেয়েই আমি এই উৎকৃষ্ট জাতের কুমড়ো ফলিয়েছি৷ ওখানকার অফিস ক্যান্টিনগুলোতে তরিতরকারি জোগায় একটা এজেন্সি৷ তারা আমার খেতের কুমড়ো ট্রাকবোঝাই করে কিনে নিয়ে যায়৷ আপনার বন্ধু কর্নেলসাহেবকেই জিজ্ঞাসা করুন, সত্যি না মিথ্যে৷'
কর্নেলসাহেব অর্থাৎ 'বড়ো ঘুঘু' বলে পরিচিত কর্নেল নীলাদ্রি সরকার এই খামারবাড়ির পাশের ঘর থেকে ভিজে পোশাক ছেড়ে ড. গিনতির বেঁটে পাজামা-পাঞ্জাবি এবং আস্ত কম্বল জড়িয়ে এতক্ষণে এলেন৷ ফায়ারপ্লেসের সামনে আরাম করে বসে বললেন, 'জয়ন্ত ড. গিনতির কুমড়োগুলো কিন্তু অকালকুষ্মাণ্ড!'
ড. গিনতি হো-হো করে হেসে উঠলেন, 'কী বললেন? অকালকুষ্মাণ্ড!'
কর্নেল বললেন, 'তা ছাড়া আর কী বলব? সচরাচর কুমড়ো পরিণত আকার পেতে এবং পাকাপোক্ত হতে অনেক দিন লেগে যায়৷ আপনার এই কুমড়ো মাত্র তিন মাসেই প্রকাণ্ড হয়ে ওঠে৷ ভেতরটা লাল টুকটুকে৷'
ড. গিনতি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন যেন৷ বললেন, 'না না৷ লাল বলা ঠিক নয়, হলদে৷ আপনি তো ভেতরটা দেখার সুযোগ পাননি এখনও৷ বরং কাল সকালে আপনার ফরেস্ট বাংলোয় খানিকটা পাঠিয়ে দেব৷ তখন-'
বাধা দিয়ে কর্নেল বললেন, 'সরি! ভেতরটা তো এখনও দেখিইনি৷ তবে যেন মনে হচ্ছে, ভেতরটা লাল হওয়াই উচিত৷'
'কেন বলুন তো?'
'বুঝলেন ড. গিনতি, আমার ইদানীং উদ্ভিদবিজ্ঞানের দিকেও ঝোঁক চেপেছে৷ সেদিন একটি পত্রিকায় দেখছিলুম, অবিকল এই জাতের কুমড়ো পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে ফলে৷ প্রশান্ত মহাসাগরের ওই সব দ্বীপে দু-শো বছর আগে কুমড়ো কী তা কেউ জানতই না৷ ১৭৬৯ সালে বিখ্যাত অভিযাত্রী টমাস কুক প্রথম তাহিতি দ্বীপে বিলিতি কুমড়োর কিছু বীজ পুঁতে এসেছিলেন৷ তার প্রায় একশো বছর পরে বিবর্তনবাদের প্রবক্তা চার্লস ডারউইন গিয়ে দেখেন, মাটির গুণে বিশাল আকারের কুমড়ো ফলেছে৷ তা এখনও দ্বীপের লোকেরা ভয়ে কুমড়ো ছোঁয় না৷ ওখানকার একটা দ্বীপের নাম ইস্টার দ্বীপ৷ তাদের ধারণা সেখানকার লোকেরা যে পক্ষীদেবতার পুজো করে, এ বুঝি তারই ডিম! বুঝুন অবস্থা!'
আমি ও ড. গিনতি হেসে উঠলুম৷ এই সময় কফি এল৷ আরাম করে কফিতে চুমুক দিলুম৷ কর্নেলবুড়ো কোনো ব্যাপারে একবার মুখ খুলল তো থামতে চান না৷ আবার পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জে ফিরেছেন৷ গতিক দেখে ড. গিনতি আমার দিকে চেয়ে ইশারা করে বললেন, 'ইয়ে, এবার জয়ন্তবাবু ব্যাপারটা শোনা যাক৷ বলুন জয়ন্তবাবু, কী দেখে এলেন লিটনগঞ্জে?'
কর্নেল চিমটেয় অগ্নিকুণ্ড থেকে এক টুকরো অঙ্গার তুলে চুরুট ধরাতে ব্যস্ত হলেন৷ আমি বললুম, 'ব্যাপার সত্যি সাংঘাতিক৷ হেভি ওয়াটার প্ল্যান্টের প্রায় অর্ধেকটা বিস্ফোরণে গুঁড়ো হয়ে গেছে৷ সরকারি গোয়েন্দারা এখনও তদন্ত করছেন৷ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে৷ কিন্তু আঁচ করা যাচ্ছে না যে, অত কড়াকড়ি নিরাপত্তা ব্যবস্থা সত্ত্বেও কীভাবে অন্তর্ঘাত ঘটল৷'
ড. গিনতি শিউরে উঠলেন৷ 'বলেন কী! অন্তর্ঘাত? তাহলে ফিরে গিয়ে আপনাদের পত্রিকায় কড়া করে লিখবেন জয়ন্তবাবু৷'
কর্নেল তাঁর দিকে ঘুরে দুষ্টু হেসে বললেন, 'রিপোর্টার জয়ন্তর খুব সুনাম আছে, ড. গিনতি৷ ওর কলমের জোরে সরকারি অফিসের চেয়ারগুলো কেঁপে ওঠে শুনেছি৷'
পালটা খোঁচা মেরে বললুম, 'আর আপনার? আপনারও তো বুড়ো ঘুঘু বলে যথেষ্ট নাম আছে৷'
কর্নেল আচমকা কাশতে শুরু করলেন৷ সর্বনাশ! জলে নাকানিচুবানি খাওয়ার ফলাফল৷ ড. গিনতি আমাকে কী প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, উদবিগ্ন হয়ে গেলেন৷ কিন্তু না, কর্নেল সামলে নিয়েছেন৷ বুড়ো হাড়ে ভেলকি দেখাবার ক্ষমতা আছে ওঁর৷ রুমালে নাক মুছে বললেন, 'এবার ওঠা যাক৷ বাংলোয় ফিরতে রাত হয়ে যাবে৷'
ড. গিনতি বললেন, 'সঙ্গে লোক দেব৷ আলো দেব৷ কিছু ভাববেন না৷ তা জয়ন্তবাবু, ওই হেভিওয়াটার প্ল্যান্ট ব্যাপারটা কী বলুন তো? বুঝতেই পারছেন, আমি নিছক কৃষিবিদ্যার চর্চা করি৷'
কর্নেল হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন৷ 'এবার উঠি ড. গিনতি! আপনার আতিথ্য এবং সাহায্যের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ৷ কাল সকালে আপনার এই কাপড়চোপড় আর কম্বল ফেরত পাঠাব৷ এসো জয়ন্ত!'
বলে উনি সটান বেরিয়ে গেলেন৷ বাইরে এতক্ষণে চাঁদ উঠেছে৷ কিন্তু কুয়াশাও ঘন হয়ে জমেছে৷ আর কনকনে ঠান্ডার কথা না তোলাই ভালো৷ মনে হচ্ছিল, কর্নেল বুড়োর পাল্লায় পড়াটা ঠিক হয়নি৷ সোজা ভারুন্ডি স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরলে ভালো করতুম৷
এই জঙ্গলের পথে হাড়-কাঁপানো শীতে ফরেস্ট বাংলোর দিকে হাঁটতে হাঁটতে এবার বাঘ-ভাল্লুকের ভয় হচ্ছিল৷ শুনলুম ভারুন্ডি জঙ্গলে বুনো হাতিরও উৎপাত আছে৷ তবে ড. গিনতির লোকটির হাতে আলো আছে৷
ফরেস্ট বাংলোয় আরাম করে বসে কর্নেল বললেন, 'জয়ন্ত, সবার সামনে আমাকে বুড়ো ঘুঘু বলাটা তোমার বদ অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে৷ না-আমি রাগ করিনি৷ কিন্তু কথাটা তোমার তলিয়ে দেখা উচিত৷ তুমি কি এলিয়ট রোডে আমার ফ্ল্যাটের নতুন নেমপ্লেটটা লক্ষ করনি?'
একটু হেসে বললুম, 'করেছি৷ লেখা আছে: কর্নেল নীলাদ্রি সরকার, প্রকৃতিবিদ৷ বুড়ো ঘুঘুর বাসা বলে পরিচিত ফ্ল্যাটের মধ্যে এখন কাচের জার ভরতি! তাতে প্রজাপতি-পোকামাকড়েরা ডিম পাড়ছে৷ হরেক পাখপাখালির মমি সাজানো রয়েছে! দুর্লভ এবং বিরল প্রজাপতির নমুনা৷ কিন্তু হে বৃদ্ধ, ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে৷ তা ছাড়া অভ্যাস যায় না মলে৷ দশ কিলোমিটার দূরে লিটনগঞ্জে হেভিওয়াটার প্ল্যান্টের রহস্যময় দুর্ঘটনা আর ভারুন্ডি ফরেস্ট বাংলোয় এক প্রাক্তন গোয়েন্দার অবস্থিতি কি নেহাত কাকতালীয় ব্যাপার? দুয়ের মধ্যে কোনো যোগাযোগ নেই? আমি মোটেও বিশ্বাস করি না৷'
কর্নেল জোরে মাথা দুলিয়ে বললেন, 'একেবারে কাকতালীয়৷ আমাকে সরকার ওসব ব্যাপারে কোনো অনুরোধ করেননি৷ আমি এসেছি উড-ডাকের খবর পেয়ে৷ খবরের কাগজের লোক হলেও ওসব খবরে তোমার মাথাব্যথা থাকে না৷ নইলে সম্প্রতি ভারুন্ডির জঙ্গলে উড-ডাকের আবির্ভাবের খবর তোমার চোখে পড়ত৷ যাক গে, এবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার৷ তোমার নিশ্চয় খুব খিদে পেয়েছে৷ আমি চৌকিদারকে দেখি৷ ততক্ষণ তুমি ফায়ারপ্লেসের অগ্নিকুণ্ডটার দায়িত্ব নাও৷ কাঠ গুঁজে দিতে ভুলো না যেন৷'
উনি বেরিয়ে গেলেন৷ তারপর আমি বসে আছি তো আছিই৷ আর ওঁর পাত্তা নেই৷ বাংলো গোরস্থানের মতো স্তব্ধ৷ একা বসে থাকতে গা ছমছম করছে৷ প্রায় দু-ঘণ্টা পরে কর্নেল ফিরলেন৷ বললুম, 'এত দেরি যে?'
কর্নেল বললেন, 'রাতের কাজটুকুও সেরে এলুম৷ আশা করি, আমার সেই অত্যদ্ভুত ক্যামেরার কথা তুমি ভোলনি৷'
হ্যাঁ, অত্যদ্ভুত ক্যামেরাই বটে৷ প্রতাপগড় জঙ্গলে ওটা পেতে রাখতে দেখেছিলুম সেবার৷ জন্তুদের জল খেতে যাওয়ার পথে গাছের ডালে বেঁধে রেখেছিলেন৷ একটা তার নীচে মাটিতে পোঁতা ছিল! ক্যামেরার লেন্সের সামনে দিয়ে পঞ্চাশ গজ অবধি মাটিতে কেউ হেঁটে গেলেই অতিসূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক সিস্টেমে সেই স্পন্দন ধরা পড়বে এবং আপনা আপনি শাটারটা ক্লিক করবে৷ ফ্ল্যাশ বালব জ্বলবে এবং ছবি উঠে যাবে৷ কর্নেলের মতে, জন্তুদের স্বাভাবিক চেহারার ছবি এভাবেই তো তোলা সহজ৷'
বললুম, 'কোথায় ক্যামেরা পেতে এলেন?'
চাপা হেসে কর্নেল বললেন, 'ড. গিনতির কুমড়ো খেতে৷ কারণ, তখন ওখানে কয়েকটা অদ্ভুত পায়ের ছাপ দেখেছিলুম৷ ওটা কী প্রাণী দেখা দরকার৷'
বুড়োর বাতিকের কোনো তুলনা নেই৷ ও নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই৷ এখন একমাত্র ভাবনা, সকাল হলেই আমাকে কেটে পড়তে হবে৷ লিটনগঞ্জে হেভিওয়াটার প্ল্যান্টের রিপোর্ট কীভাবে লিখব, তাই ভাবতে থাকলুম৷ কর্নেলও অবশ্য আর মুখ খুললেন না৷ কেমন গম্ভীর হয়ে চুরুট টানতে থাকলেন৷
খেয়ে-দেয়ে শুতে রাত প্রায় দশটা বেজে গেল৷ ক্লান্তির ফলে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি৷ সেই ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকে৷ দেখি, সকাল হয়ে গেছে৷ কর্নেল অভ্যাসমতো কখন এই প্রচণ্ড শীতের ভোরেও বাইরে ঘুরে এসেছেন৷ গায়ে ওভারকোট, মাথায় হনুমান টুপি, হাতে ছড়ি৷ বললেন, 'গুড মর্নিং! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে৷ এখন উঠে পড়ো এবং দ্রুত চোখ-মুখ ধুয়ে এসো!'
বললুম, 'দ্রুত কেন? কোথাও বেরোবেন বুঝি?'
'বেরোব৷ অবশ্য তাতে তোমার লাভই হবে৷ কথা দিচ্ছি৷'
'লাভের দরকার নেই৷ আমি সোজা গিয়ে ট্রেন ধরব৷' বলে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলুম৷
কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে এসে দেখি কর্নেল বিছানায় ফটোর গুচ্ছের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছেন৷ আমাকে দেখে বললেন, 'জয়ন্ত, আমার রাতের ফসল৷ দেখে যাও, তোমার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে যাবে৷'
একটা ফটো তুলে নিয়ে সত্যি সত্যি চক্ষু চড়কগাছ আমার৷ এ কী দৃশ্য! কুমড়ো খেতে একটা বিশাল কুমড়োর ওপর ঝুঁকে ড. গিনতি কী যেন করছেন, এক হাতে খুদে টর্চ রয়েছে৷ বললুম, 'কী ব্যাপার?'
কর্নেল হাসলেন৷ 'ড. গিনতি নিশ্চয় রাতদুপুরে নিজের কুমড়ো নিজে চুরি করছেন না?'
'তাহলে কী করছেন? নিশ্চয় কোনো বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-টরিক্ষা করছেন৷'
'ঠিক তাই৷ অসাধারণ ওঁর গবেষণা৷' কর্নেল তারিফ করে বললেন৷ 'খুব অধ্যবসায়ী লোকও বলব, জয়ন্ত৷ যাকগে৷ সেই অদ্ভুত পায়ের ছাপের রহস্যটা রহস্যই থেকে গেল৷ সম্ভবত জন্তুটা ওঁকে দেখে আর ওখানে পা বাড়ায়নি৷'
চৌকিদার কফি দিয়ে গেল৷ কফি খাওয়ার পর কর্নেল ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ 'জয়ন্ত, দেরি হয়ে যাচ্ছে৷' বলে আমাকে আপত্তির সুযোগ না দিয়ে হাত ধরে টানতে টানতে বেরোলেন৷ কুয়াশার ফাঁকে হালকা রোদ ফুটেছে৷ কিন্তু ঠান্ডার কথা না তোলাই ভালো৷ বাংলো থেকে উতরাই রাস্তায় নেমে গেলুম কিছুদূর৷ তারপর সমতলে আরও কিছুটা এগিয়ে চমকে উঠলুম৷ গাছপালার আড়ালে একটা জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে৷ জিপে কারা বসে আছে৷ কর্নেল তাদের ইশারা করে আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে ঝোপে ঢুকলেন৷ তারপর ফিসফিস করে বললেন, 'এবার হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হবে জয়ন্ত৷ একটু কষ্ট করো৷'
'কিন্তু ব্যাপারটা কী?'
'স্বচক্ষে দেখবে চলো৷'
পাগলের পাল্লায় পড়া গেছে, উপায় কী! ঝোপঝাড় ও পাথরের আড়ালে এগোচ্ছি৷ ঠান্ডায় হাত-পা জমে যাচ্ছে৷ গাড়ির ইঞ্জিনের শব্দ শুনছি৷ কতক্ষণ পরে কর্নেল একটু উঁচু হয়ে চোখে বাইনোকুলার রেখে বললেন, 'এসে গেছে! দেখবে নাকি জয়ন্ত? দেখোই না!'
বাইনোকুলারে চোখ রাখতেই ড. গিনতির খামারবাড়ির গেট নজরে পড়ল৷ একটা ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে৷ ট্রাকের গায়ে যা লেখা আছে, স্পষ্ট পড়তে পারছি উম্মর সিং ক্যাটারিং কোম্পানি৷ ট্রাকে তরিতরকারি বোঝাই হচ্ছে৷ ড. গিনতি এবং তাঁর লোকেরা তদারক করছেন৷ আমি মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারলুম না৷ এই স্বাভাবিক ব্যাপারে এত লুকোচুরি বা ওত পেতে বেড়ানোর কারণ কী?
হঠাৎ কর্নেল বলে উঠলেন, 'চলে এসো জয়ন্ত৷ পাখি ফাঁদে পড়েছে৷'
তারপর আমার প্রায় বাঘের লেজে-বাঁধা শেয়ালের অবস্থা হল৷ খামারবাড়ির গেটে পৌঁছে ফের চমকে উঠলুম৷ ট্রাক ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে বন্দুকধারী এক দঙ্গল পুলিশ৷ ড. গিনতি দু-হাত তুলে ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছেন! কর্নেলকে দেখে কাঁদো-কাঁদো গলায় বললেন, 'দেখেছেন, দেখেছেন কর্নেল, কী জঘন্য অত্যাচার!'
কর্নেল গম্ভীরমুখে কোনো কথা না বলে ট্রাকের কাছে গেলেন এবং কাঠবেড়ালির মতো উঠে পড়লেন৷ তারপর হেঁট হয়ে একটা বিশাল কুমড়ো তুলে বললেন, 'আসুন মি. শর্মা৷ খুব সাবধানে ধরবেন কিন্তু৷ এর মধ্যে সাংঘাতিক এক্সপ্লোসিভ আছে৷ বিস্ফোরণ ঘটতে পারে৷'
একজন পুলিশ অফিসার হাত বাড়িয়ে কুমড়োটা নিয়ে সাবধানে ধরে রইলেন৷ কর্নেল নেমে এসে তাঁর হাত থেকে কুমড়োটা নিলেন৷ তারপর মাটিতে রেখে বোঁটার কাছে চাপ দিলেন৷ একটা লম্বা-চওড়া ফালি উঠে এল৷ উঁকি মেরে দেখি, ভেতরে একটা ধূসর রঙের মস্ত গোল জিনিস ভরা রয়েছে৷ সঙ্গে সঙ্গে আমার বুদ্ধিসুদ্ধি খুলে গেল৷ থরথর করে কাঁপতে থাকলুম৷
কর্নেল বললেন, 'তাহলে বুঝতে পারছ জয়ন্ত, তোমার কাজের জন্যে কেমন একখানা স্টোরি পেয়ে গেলে৷ আশা করি, এবার এও বুঝেছ যে, লিটনগঞ্জের হেভিওয়াটার প্ল্যান্টের দ্বিতীয় টাওয়ারকেও ধ্বংস করার ব্যবস্থা হচ্ছিল৷ ক্যান্টিনে এই বিশেষ চিহ্নিত কুমড়োটি যেত এবং সেখান থেকে পাচার হত টাওয়ারের মধ্যে৷ যাকগে, আমার কাজ শেষ৷ বাকি যা কিছু, মি. শর্মার হাতে ছেড়ে দেওয়াই ভালো৷ এসো জয়ন্ত, আমরা বাংলোয় ফিরি৷ তোমার ট্রেন সেই এগারোটায়৷ ততক্ষণে তুমি এই অকালকুষ্মাণ্ডের রহস্যময় কাহিনির একটা খসড়া করে নিতে পারবে৷ তবে মনে রেখো, কুমড়োরহস্য আমি দৈবাৎ টের পেয়েছিলুম৷ প্রজাপতি-ধরা জাল পাততে গিয়েই!'
আসতে আসতে শুনলুম, পেছনে ড. গিনতি গর্জে বলছেন, 'নেমকহারাম৷ আমার পাজামা-পাঞ্জাবি-কম্বলটা পর্যন্ত এখনও ফেরত দিল না৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন