খাই খাই বুড়ো

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov4

সেই আজব রাজ্যের সুখের কথা কী বলব, এমন সুখশান্তি পৃথিবী খুঁজলে কোথাও তুমি দেখতে পাবে না৷ সেখানে মাঠভরা সোনার ফসল, গাছভরা মিঠে ফল, আর শহরে-বাজারে, দোকানপাটে থরে থরে সাজানো কতরকম সুন্দর জিনিস৷ কারও কোনো অভাব নেই৷ সবাই সুখী৷ তাই চোর-ডাকাত নেই৷ খুনোখুনি নেই৷ তা ছাড়া পশুপাখিরা সেখানে মানুষকে ভয় করে না৷ ফুলে ফুলে আলো সে রাজ্যের বাগিচাগুলো৷ প্রজাপতি ওড়ে৷ পাখি ডাকে৷ লোকেরা মনের আনন্দে গান গায়, আর যে-যার কাজ করে৷ তারপর রাত হলে নাক ডাকিয়ে ঘুমোয়৷

হঠাৎ একদিন সেই সুখের রাজ্যে এক অবাক কাণ্ড দেখা গেল৷

রান্না করে বউ-ঝিরা নাইতে গেছে ঘাটে৷ ফিরে এসে দেখে, সব খাবার কে চেটেপুটে খেয়ে ফেলেছে৷

ফলের বাগানে গাছভরা ফল ছিল৷ হঠাৎ কখন সব ফল উধাও৷

চাষিরা মাঠে ফসল লাগিয়েছিল৷ সেই ফসল আর দেখা যাচ্ছে না৷

আর সে-রাজ্যের রাজার ছিল ঘোড়াশালে ঘোড়া, হাতিশালে হাতি৷ সকালে আস্তাবলে এসে ঘোড়ার সহিস আর হাতির মাহুতের চোখ কপালে উঠেছে৷ কী সর্বনাশ! গেল কোথায় সব?

তারপর দিনে দিনে আরও আজগুবি ঘটনা ঘটতে লাগল...

কোথাও একটুখানি খাবার মতো জিনিস নেই৷ ঘরে ঘরে উপোস চলল৷ রাজার কাছে নালিশ গেল৷ রাজা কোতোয়ালকে ধমকে বললেন, 'যেমন করে হোক, এই আজব কাণ্ডের বিহিত করো৷ নইলে গর্দান যাবে৷'

কোতোয়াল পাহারা দেয়৷ কিন্তু কোনো ফল হয় না৷ এমনকী, শেষে দেখা গেল সবুজ পাতাগুলি নেই, ঘাস নেই-সব রুক্ষু ছন্নছাড়া হয়ে পড়েছে৷ আর প্রজাপতি দেখা যায় না৷ পাখি নেই৷ জন্তুজানোয়ার বলতে কিছু নেই৷ তারপর একটা-দুটো করে জ্যান্ত মানুষও উধাও হয়ে যাচ্ছে৷ দেশটা একেবারে শ্মশানের মতন দেখাচ্ছে৷

তখন কোতোয়াল রাজার সামনে এসে বলল, 'মহারাজ, নির্ঘাত কোনো মায়াবী রাক্ষসের কাণ্ড৷ মায়াবলে অদৃশ্য হয়ে সব কিছু খেয়ে ফেলছে৷ হয়তো এরপর সব জীবিত প্রাণী ও উদ্ভিদ খাওয়া শেষ হলে আস্ত ঘরবাড়িগুলো খেয়ে ফেলবে৷ তার চেয়ে বরং আমরাই এখুনি কেটে পড়ি চলুন৷'

রাজা মন্ত্রীকে বললেন, 'সর্বনাশ! একটা উপায় বের করো তো মন্ত্রী৷'

মন্ত্রী মাথা চুলকে বলল, 'উপায় আর কী মহারাজ৷ কোতোয়াল যা বলছে, তাই করা যাক৷ চলুন, সরে পড়ি৷ প্রাণে বাঁচলে ফের একটা রাজ্য মিলতে পারে৷ সেনাপতি আছে, তার কোমরে তলোয়ার আছে-তখন সে ভাবনা নেই৷ কী বল সেনাপতি?'

সেনাপতি সায় দিয়ে তলোয়ার ঘুরিয়ে বলল, 'আমিও তাই বলছি মহারাজ৷'

ব্যাস রাতারাতি রাজা মন্ত্রী সেনাপতি কোতোয়াল আর যারা যারা বেঁচে ছিল, দল বেঁধে পালাল রাজ্য ছেড়ে৷ রাজ্যে তখন সত্যি সত্যি শ্মশানদশা৷ খাঁ-খাঁ নিঝুম পুরী৷ একটুও সবুজ রং নেই কোথাও৷ শুধু ঘরবাড়িগুলিই যা রইল...

কিন্তু না, সবাই পালাল বলছি বটে, একজন থেকে গেল চুপিচুপি৷ এক সুন্দর ছেলে৷ এই রাজ্যের প্রতিটি জিনিসের উপর ছিল তার ভালোবাসা৷ এর মাঠ, নদী, বন, গাছপালা, ফুল, পাখি, প্রজাপতিদের সে ভালোবাসত৷ সে তাই এই শ্মশান-রাজ্য ছেড়ে কোথায়ও যেতে চাইল না৷ সে অবাক হয়ে খুঁজতে বের হল, কে সেই অদৃশ্য রাক্ষস? কেন সে সব কিছু খেয়ে ফেলল এমনি করে?

মাটিতে ঘাস গজায় না৷ গাছে গজায় না পাতা৷ নদীর জল গেছে শুকিয়ে৷ আর সে সেই শূন্য রুক্ষ মরুভূমির মতো মাটিতে ক্লান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়৷ আজব রাক্ষস কিন্তু তাকে খায় না৷ হয়তো মজা দেখে৷ অতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে৷ রাক্ষুসে মুখে বড়ো জোর একটা খুদে রসগোল্লা বই তো আর নয়!

কিন্তু রাক্ষুসে লোভ যাবে কোথায়? একদিন সে আর থাকতে পারল না৷ সামনে এসে দাঁড়াল৷ গর্জে উঠল, 'হাঁউ মাঁউ খাঁউ!'

ছেলেটি কিন্তু ভয় পাবে কী, ওকে দেখে হেসেই খুন৷

রাক্ষস চোখ কটমট করে বলল, 'হাসছ যে? ভয় হচ্ছে না আমায় দেখে?'

ছেলেটি জবাব দিল, 'হাসব না কেন? আরে, তুমি যে দেখছি মানুষের মতো৷'

'মানুষের মতো?' রাক্ষস একেবারে অবাক৷

'হ্যাঁ, তোমায় কেমন দেখাচ্ছে জান? অবিকল একটা বুড়ো মানুষ৷ রোসো, তোমার নাম দিলুম, খাই খাই বুড়ো৷ খুশি তো?'

রেগে-মেগে রাক্ষস ওকে হালুম করে গিলে ফেলল৷ কিন্তু কী মুশকিল! ছেলেটি পেটের ভিতর এমন লাফালাফি শুরু করে যে, সে ওয়াক করে উগরে দিতে বাধ্য হয়৷ ফের অবশ্য গিলে নেয়৷ ছেলেটি নাকের ভিতর অ্যায়সা সুড়সুড়ি দেয় যে, সে হেঁচে ফেলে, 'হ্যাঁচ্ছো'৷ ছেলেটি ডিগবাজি খেয়ে বেরিয়ে পড়ে, হাততালি দিয়ে হাসে৷

অগত্যা বেচারা হার মেনে বলল, 'ওফ! কী সর্বনেশে ছেলে রে বাবা! ঠিক আছে৷ তোমায় ছেড়ে দিলুম৷'

ছেলেটি বলল, 'না খাই খাই বুড়ো, সেটি হচ্ছে না৷ আমি কিন্তু তোমায় ছাড়ছি না৷'

রাক্ষস চোখ পাকিয়ে বলল, 'ছাড়ছি না মানে? যাও বকবক কোরো না আর৷ আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে৷ দেখি, অন্য কোথাও যাই৷ এখানে তো আর খাবার মতো কিছু নেই৷'

ছেলেটি বলল, 'তোমার খুব খিদে পেয়েছে বুঝি?'

'ঃও! ভীষণ খিদে৷ দিন-রাত্তির পেটটা শুধু খাই খাই করে৷ ওই তো হল জ্বালা...' রাক্ষস দীর্ঘশ্বাস ফেলে৷

চিন্তিত মুখে ছেলেটি বলল, 'তাই তো! খাই খাই বুড়ো, তোমার সত্যি কোনো দোষ নেই বাপু৷ এত খিদে থাকলে তুমি আর কী করবে বলো৷ তবে যদি একটা কাজ কর, এত খিদে তোমার থাকবে না-আর রাজ্য শ্মশান হবে না৷ করবে?'

খাই খাই বুড়ো আর ছেলেটি তখন হনহন করে হাঁটতে থাকল৷ মাঠ নদী বন জঙ্গল পেরিয়ে সে আর এক রাজ্য৷ সেখানে একটা পাহাড়ের চুড়োয় ঘর৷ ছেলেটি বলল, 'খাই খাই বুড়ো, এই ঘরে যে থাকে সে তোমার মিতে-নাম তার উপোসি বুড়ো৷ বেচারা কিস্যু খেতে পারে না! শুকিয়ে আমশি হয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন৷ কত কবরেজ-বদ্যি করল, কোনো ফল হয়নি৷ ওর খিদেই পায় না৷'

খাই খাই বুড়ো মহানন্দে চেঁচিয়ে ডাকতে লাগল, 'মিতে, ওহে উপোসি মিতে!'

উপোসি বুড়ো রোগাপটকা গতর নিয়ে বেরিয়ে অতি কষ্টে বলল, 'কে রে?'

'আহা, কাছে এসেই দেখো, কে এসেছে৷' বলে ছেলেটি উপোসি বুড়োকে টানতে টানতে খাই খাই বুড়োর সামনে নিয়ে গেল৷

কী তাজ্জব কাণ্ড! দুই বুড়ো যেই-না কাছাকাছি হয়েছে, ছেলেটি দু-জনের পিছনে দুটো ধাক্কা লাগাতেই ব্যাস৷ দুই বুড়ো একাকার-একসঙ্গে মিলেমিশে একজন৷

তার ফলাফল কী হল বলব?

বলে আর লাভ নেই৷ নিজেই বুঝে নাও না৷

আর যদি অগত্যা বুঝতে না পার, অঙ্ক কষে দেখো প্ল্যাসকে মাইনাস দিয়ে গুণ করলে কী হয়? স্রেফ মাইনাস৷

তাহলে বুঝতে পারছ, ফের গাছভরা ফুলফল, পশুপাখি, প্রজাপতি আর খেতভরা ফসল, থরে থরে সাজানো দোকানপাট, মানুষ নির্ভয়ে সুখশান্তিতে বাঁচছে৷

ছেলেটি কে চিনতে পারছ না?

আরে, সে তো তুমিই৷

Cov5
অধ্যায় ১ / ২২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%