অলৌকিক আধুলিরহস্য

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov27

ইদানীং রোজ ভোর বেলা জগিং শুরু করেছি৷ আমাদের এই ছোটো শহরে অত সকালে রাস্তাঘাট একেবারে নিরিবিলি হয়ে থাকে৷ তাতে শীতকাল৷ খেলার মাঠ পেরিয়ে নদীর ধার অবধি গিয়ে বাড়ি ফিরতে এক কিলোমিটার দৌড় হয়ে যায়৷ গা ঘেমে উঠে৷

আমার ভাগনে শ্রীমান ডন টের পেয়ে একদিন বলল, 'চোরটাকে ধরতে পেরেছিলে মামা?'

'চোর? কোথায় চোর?' আকাশ থেকে পড়লুম৷ 'আমি তো জগিং করছিলুম, হতভাগা! চোর কোথায় দেখলি?'

ডন আকাশ থেকে পড়ল৷ 'জগিং! ও মামা, জগিং মানে কী? তুমি তো দৌড়োচ্ছিলে৷'

গম্ভীর হয়ে বললুম, 'জগিং মানে দৌড়-ব্যায়াম৷ এতে স্বাস্থ্য ভালো থাকে৷ খিদে বাড়ে৷ জম্পেশ রকমের ঘুম হয়৷'

ডন খুশি হয়ে বলল, 'আমিও জগিং করব, মামা৷'

'বেশ তো৷ ভোর ছ-টায় ঘুম থেকে উঠে করিস৷ তোর তো সাতটার আগে ঘুমই ভাঙে না৷'

পরদিন অবশ্য ওকে বিছানা থেকে টেনেই ওঠাতে হল৷ কিন্তু অতটুকু ছেলে৷ খেলার মাঠ অবধি গিয়ে 'ধুস' বলে নেতিয়ে বসল! আমি হাসতে হাসতে ধুকুর-ধুকুর দৌড়ে নদীর ধারে রোজকার টার্গেট পোড়োমন্দির চক্কর দিলুম৷ তারপর খেলার মাঠে এসে দেখি, ডন৷ ফের পুরোদমে শুরু করেছে৷ মনে মনে বললুম, 'ভালো! বাহাদুর ছেলে!'

তারপর টের পেলুম ব্যাপারটা৷ ডন আসলে পাড়ার সেই বদরাগী নেড়ি কুকুরটাকে উচিত শিক্ষা দিতে চলেছে৷ তার হাতে আধলা ইট৷ কুকুরটা লেজ গুটিয়ে ঝিলের ধারে রামু ধোপার গাধার পেটের তলা দিয়ে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেল৷

এতে বুঝি গাধাটা অপমানিত বোধ করে চার ঠ্যাং তুলে লাফ দিল৷ তখন শ্রীমান বেগতিক দেখে থমকে দাঁড়াল৷ কাছে গিয়ে বললুম, 'খুব হয়েছে৷ তোমার দ্বারা জগিং হবে না৷ বাড়ি এসো৷'

ডন ফিক করে হেসে বলল, 'তখন অমন বসে পড়লুম কেন বলো তো মামা?'

'দৌড়োতে পারছিলে না বলে৷'

ডন বলল, 'যাঃ! সেজন্যে নাকি! একটা আধুলি পড়ে ছিল যে ওখানে৷'

সে আধুলিটা দেখাল৷ চকচকে নতুন আধুলি৷ বললুম, 'কার পড়ে-টড়ে গেছে আর কি? ওটা দিয়ে যদি ফের ঘুড়ি কেনার মতলব করিস, গাঁট্টা লাগাব বলে দিচ্ছি৷ গাছে ঘুড়ি আটকাবে আর আমাকে গাছে চড়তে হবে-কক্ষনো না৷'

ডন মনমরা হয়ে বলল, 'তাহলে কী করব বলো না মামা?'

'বরং কোনো ভিখিরিকে দান করে দিস৷ পুণ্যি হবে৷'

বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখলুম শীতের রোদে রাস্তার মোড়ে সেই অন্ধ ভিখিরিটা বসে আছে-রোজই থাকে৷ ডনকে ইশারা করলে সে গম্ভীর মুখে আধুলিটা ভিখিরির মগে ঠকাস করে ফেলে দিয়ে এল৷ বোঝা যাচ্ছিল, আধুলিটা নিয়ে তার কোনো মতলব ছিল৷

সন্ধ্যায় এক কাপ চা নিয়ে আরাম করে বসে একটা গোয়েন্দা গল্পের পাতায় চোখ রেখেছি, ডন এসে বলল, 'মামা, ও মামা! দেখো দেখো-সেই আধুলিটা না?'

ডনের হাতে একটা আধুলি ছিল৷ সেটা কুড়িয়ে-পাওয়া আধুলিটার মতোই নতুন এবং চকচকে বটে৷ বললুম, 'সেই আধুলিটা, কী বলছিস? এটা তুই তো ঠকাস করে ভিখিরির মগে ফেললি সকালে?

ডন চোখ বড়ো করে বলল, 'অবাক, মামা, অবাক! পিসিমা একটা টাকা দিয়েছিল আমাকে, জান তো? টাকাটা নিয়ে গেলুম হাবুবাবুর দোকানে খাতা কিনতে৷ এই দেখো খাতাটা৷'

সে খাতাটা দেখাল৷ বিশ্বাস করে বললুম, 'আধুলিটা বুঝি হাবুবাবু দিলেন?'

ডন চাপা গলায় বলল, 'দিলেন তো! ও মামা, এটা সেই আধুলিটা-সত্যি বলছি, দেখো না ভালো করে৷ ঠিক সেইটে৷ কুড়িয়ে পেতে কতক্ষণ ধরে দেখছিলুম না? সেই লাল ফুটকিটা পর্যন্ত৷ দেখতে পাচ্ছ?'

তর্ক করে লাভ নেই ওর সঙ্গে৷ ঝামেলা বাড়বে৷ হাত বাড়িয়ে বললুম, 'ওটা আমায় দে৷ তার বদলে তোকে আট আনা দিচ্ছি৷'

ডন এক-পা পিছিয়ে বলল, 'উঁহু! এটা দিয়ে আমি ম্যাজিক করব না বুঝি?'

'বেশ, তাই করিস৷ যা এখন!'

ডন বলল, 'তুমি বিশ্বাস করলে না তো? ঠিক আছে৷ কাল ভোর বেলা জগিং করবার সময় ফের এটা ভিখিরিকে দেব৷ দেখবে, ফের ঘুরে আসবে আমার হাতে৷'

পরদিন ওকে ঘুম থেকে ওঠাতে হল না৷ আমাকেই বরং ওই ওঠাল৷ মামা-ভাগনে মিলে ঠান্ডা হিমে ভোর বেলায় ধুকুর-ধুকুর দৌড় শুরু করলুম৷ আজ ওর খাতিরে একটু আস্তে৷ নদীর ধারে পোড়োমন্দির ঘুরে খেলার মাঠ পেরিয়ে রাস্তায় পৌঁছে লক্ষ করলুম ডনটা একটুও কাবু হয়নি৷ রহস্যটা কী?

মোড়ের অন্ধ ভিখিরিকে দেখে আধুলিটার কথা মনে পড়ল৷ বললুম, 'হ্যাঁরে আধুলিটা ওকে দিবি বলেছিলি যে?'

'দিচ্ছি৷' বলে ডন ভিখিরির কাছে গেল৷

ঠকাস শব্দ এবং ভিখিরির আশীর্বাদ শুনে বুঝলুম, মুদ্রাটি যথাস্থানে গেছে৷

এদিন ছিল রবিবার৷ ডন একদফা পাড়া ঘুরতে বেরিয়েছিল৷ এগারোটা নাগাদ তার পায়ের ধপ ধপ আওয়াজ শুনলুম৷ তারপর এক চিক্কুর-'মামা! মামা! ম্যাজিক, মামা, ম্যাজিক৷' তারপর হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকে সে বলল, 'বলেছিলুম না! এই এই দেখো৷'

ওর হাতে সেই আধুলিটার মতোই চকচকে নতুন আধুলি দেখে হাসতে হাসতে বললুম, 'চালাকি? কোত্থেকে নতুন একটা আধুলি এনে বলছ সেইটে?'

ডন কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, 'তোমার দিব্যি, মামা! মা পান কিনতে পাঠিয়েছিল৷ পানওয়ালা এটা দিল৷ সে আমার হাতে ওটা গুঁজে দিল৷ তুমি দেখে রাখো না! এই লাল ফুটকিটা দেখছ-ওইটা দেখেই চিনতে পারছি৷'

'ঠিক আছে৷ আমার কাছে থাক এটা৷ আমি নিজে পরীক্ষা করে দেখবখন৷'

ডন ছোঁ মেরে আধুলিটা তুলে নিয়ে ছিটকে সরে গেল৷ রাগী মুখ করে বলল, 'দিচ্ছি তোমায়! অত করে মা-র কাছে বকুনি খেয়ে এটা ফিরে পেলুম৷ এ দিয়ে ম্যাজিক করব৷'

পরদিন ভোরে জগিং করতে গিয়ে নদীর ধারে পোড়োমন্দির চক্কর দিচ্ছি, হঠাৎ খেয়াল হল শ্রীমান সঙ্গে নেই৷ ঘুরে দেখি অনেকটা দূরে খেলার মাঠে ছোট্টটি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ যেতেই ভ্যাঁ করে বলল, 'আধুলিটা হারিয়ে গেছে মামা!'

রাগ করে বললুম, 'বেশ হয়েছে হতভাগা ছেলে! আধুলি হাতে নিয়ে কেউ দৌড়োয়?'

ডন আমাকে খামচে ধরে থামাল৷ তারপর চোখ মুছতে মুছতে বলল, 'খুঁজে দাও না মামা৷ আমার ম্যাজিক করা হবে না যে৷'

ঘাসে শিশির চকচক করছে৷ সূর্যটা সবে বিছানা থেকে উঠে বসে হাই তুলছে৷ পিটপিটে চাউনি৷ তার ওপর উত্তুরে হাওয়ার ঠান্ডাহিম দুষ্টুমি৷ এমন সময় একটা আধুলি খুঁজে বের করা বড়ো কষ্টসাধ্য কাজ৷ ডনের খাতিরে তবু অনেক কষ্ট করতে হল৷ কিন্তু তার পাত্তা পাওয়া গেল না৷ ডনকে বললুম, 'ঠিক এখানেই পড়েছে তার মানে কী? অন্য কোথাও ফেলেছিস তাহলে৷'

ডন জোরের সঙ্গে বলল, 'এখানেই৷'

কিন্তু প্রচণ্ড খুঁজেও আধুলিটা পাওয়া গেল না৷ কাজেই আমাদের পায়ের শব্দে রাস্তার মোড়ের অন্ধ ভিখিরি নড়েচড়ে বসলেও তার মগে ঠকাস করে সেই মিঠে শব্দটা বাজল না৷ বেচারা নিশ্চয় খুব মনমরা হয়ে গেল৷

মনমরা হয়ে রইল শ্রীমানও৷ শরীর খারাপ বলে স্কুলে গেল না৷ বিকেল নাগাদ ভাবলুম ছেলেটাকে চাঙ্গা করা উচিত৷ আমার ডাক শুনে ডন চোখ পিটপিট করতে করতে ঘরে ঢুকল৷ তারপর নিজের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকিয়ে বলল, 'কী?'

ওকে টেনে আদর করে বললুম, 'যা হবার হয়ে গেছে! ও নিয়ে মনখারাপ করে লাভ নেই৷ চল, বাইরে কিছুক্ষণ ঘুরে আসি৷ মন ভালো হয়ে যাবে৷'

ডন ঘাড় গোঁজ করে বলল, 'যাব-একটা আধুলি দাও, নতুন আধুলি না হলে নেব না কিন্তু৷'

'আধুলি?' চিন্তিত হয়ে বললুম৷ 'আধুলি যদি না থাকে, সিকি হলে চলবে না?'

ডন ঠোঁটের কোনায় কেমন একটু হাসল৷ 'তোমার টেবিলের ড্রয়ার খুঁজে দেখো না৷'

টেবিলের ড্রয়ারে খুচরো পয়সা রাখি, একথা সত্য৷ ডনের এ-খবর না জানার কথা নয়-এ-বাড়ির কারুরই নয়৷ খুঁজতে গিয়ে পেয়েও গেলুম একটা আধুলি৷ এবং চকচকে আনকোরা আধুলিটা৷ ডনের তর সইল না, খপ করে কেড়ে নিল৷ তারপর উলটে-পালটে দেখতে দেখতে আচমকা এক চিল-চিক্কুর ছাড়ল, 'মামা, ও মামা! ম্যাজিক, মামা, ম্যাজিক!'

অবাক হয়ে বললুম, 'কী রে?'

'সেই লাল ফুটকিটা৷' ডন নাচতে নাচতে বলল৷ 'আমার আধুলি৷ আমার আধুলি৷ দেখো দেখো!'

হাঁ করে তাকিয়ে ছিলুম৷ ওর হাত থেকে আধুলিটা নিয়ে আরও অবাক হলুম৷ একী! সত্যি সেই লাল ফুটকিওয়ালা আধুলিটা যে! কোথায় পেলুম এটা-কার, কিছুতেই মনে পড়ল না৷ কিন্তু জিনিসটা যে অলৌকিক এতে আর সন্দেহ থাকা উচিত নয়৷

আর এ তো ঠিক এই পড়ে-পাওয়া অলৌকিক আধুলি যখন ডনকে ভালোবেসে ফেলেছে, তবে ডন এটা মোড়ের অন্ধ ভিখিরিকে দিক কিংবা হারিয়ে ফেলুক, আবার তার কাছে এ-হাত সে-হাত ঘুরে ফিরে আসবেই৷ নিজেকে চেনাবার জন্যে কপালে একটা লাল ফুটকি তো থাকবেই৷ সুতরাং ডন দৌড়ে বেরিয়ে গেলে ওর দিকে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলুম৷ এমন ভাগনের মামা হওয়াটাও তো কম গর্বের কথা নয়৷

Cov28
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%