সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

আগে জানলে এ বুড়োর পাল্লায় কিছুতেই পড়তুম না৷ ঢের ঢের বুড়ো মানুষ দেখেছি, গ্রীষ্মকালে তাঁরা নাতির হাত ধরে পার্কে গিয়ে বসে থাকেন এবং শীতের সময় ঘরের কোনে আলোয়ান মুড়ি দিয়ে কাগজ পড়েন৷ দু-চার জন বুড়োমানুষ অবশ্যি নেতা হয়ে দেশ শাসনও করেন৷ খবরের কাগজের খবর জোগাড় করতে গিয়ে তাঁদের সঙ্গে চেনাজানাও হয়েছে অল্পস্বল্প৷ কিন্তু তাঁরা কেউ এঁর মতো পাহাড়-জঙ্গল বুড়ো ঘোড়ার দাপটে ছোটাছুটি করে বেড়ান না-স্রেফ দু-খানা ঠ্যাঙের জোরেই! কিংবা প্রজাপতি বা পাখির পেছনে বাচ্চা ছেলের মতো হন্যে হয়ে ঘোরেন না তাঁরা৷
এ বুড়োর কাণ্ডকারখানাই অদ্ভুত৷ নইলে এই জানুয়ারির হাড়কাঁপানো শীতে কেউ প্রতাপগড়ের জঙ্গলে ক্যামেরা নিয়ে রাতবিরেতে টোটো করে ঘুরবে কোন সাহসে? বিশেষ করে যে-জঙ্গলে সম্প্রতি একটা মানুষখেকো বাঘের দৌরাত্ম্য চলছে!
জঙ্গলে রাতবিরেতে ক্যামেরার কথা শুনে কেউ যদি ভাবে, নিশ্চয় ফ্লাশ বালবের সাহায্যে জন্তুজানোয়ারের ছবি তোলা হচ্ছে-তাহলে সে মস্ত ভুল করবে৷ ক্যামেরাটাও বিষম বিদঘুটে৷ ভূতুড়ে বলতেও আমার আপত্তি নেই৷ কারণ, ওতে ফ্লাশ বালবের দরকার হয় না৷ অথচ অন্ধকারে লেন্সের সামনে কম পক্ষে বিশ-পঁচিশ মিটার দূরত্বে ১৮০ ডিগ্রির মধ্যে যা কিছু থাকে, সবেরই ছবি উঠে যায়৷ শাটার টেপার জন্যে কারও বসে থাকার দরকার নেই৷ ওটার ইলেকট্রনিক ব্যবস্থা এত সূক্ষ্ম আর স্পর্শকাতর যে, শুধু দরকার লেন্সের সামনে ওই দূরত্বের মধ্যে মাটিতে একটুখানি কাঁপন৷ কোনো জন্তু মাটিতে হাঁটলেই কিছু-না-কিছু কাঁপন জাগে৷ সেই যথেষ্ট৷ শাটার ক্লিক করবে৷
প্রতাপগড় জঙ্গলের বাংলোয় রাত দশটায় উনি যখন ফিরে এলেন ক্যামেরার ফাঁদ পেতে, আমি তখন ফায়ারপ্লেসের সামনে ইজিচেয়ারে বসে কড়া কফি খাচ্ছি আর পরদিন সকালে কেটে পড়ার মতলব ভাঁজছি৷ কী শীত, কী শীত! বিহারের শীতের নামডাক আছে জানতাম৷ কিন্তু প্রতাপগড় এলাকা যে উত্তর মেরুরই ছোটো ভাই, সেটা জানতে বাকি ছিল৷
'হ্যালো ডার্লিং!' যথারীতি সম্ভাষণ করে উনি টুপি ও ওভারকোট খুললেন এবং আমার পাশে বসে মৃদু হেসে বললেন, 'জয়ন্ত কি আমার ওপর রাগ করেছ?'
ফ্লাস্ক থেকে এক মগ কফি ঢেলে ওঁর হাতে দিয়ে গম্ভীর মুখে বললুম, 'আর ক-দিন থাকবেন ভাবছেন?'
আমার কাঁধে একটা হাত রেখে অন্য হাতে কফির মগ ধরে উনি হঠাৎ চাপা স্বরে বললেন, 'ডার্লিং! আশা করছি, কাল সকালের মধ্যে তোমার চোখ ছানাবড়া হয়ে ওঠার মতো এক অত্যদ্ভুত ছবি তোমায় দেখাতে পারব৷ অতএব ধৈর্যসহকারে অন্তত আর একটা দিন অপেক্ষা করো৷ এবং জয়ন্ত, এমনও হতে পারে, তুমি এবার প্রতাপগড় থেকে তোমার দৈনিক সত্যসেবকের জন্য একটি রোমাঞ্চকর সংবাদও সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে!'
ওঁর লোভ দেখানো কথায় একটুও না গলে বললাম, 'কীসের ছবি দেখাবেন আর? গত রাতে তো ঝরনার জল খেতে আসা এক পাল হরিণের ছবি উঠেছিল আপনার ক্যামেরায়৷ কাল বড়োজোর দেখব হয়তো একটা রোগা বাঘ!'
'ঠিক বলেছ ডার্লিং?' বুড়ো সাদা দাড়ি খামচে ধরে হাসলেন৷ তারপর অভ্যাসমতো টাকে সেই হাতটা বুলিয়ে কী একটা ফেলে দিলেন৷ দেখলুম লাল রঙের একটা পোকা৷ অনেক সময় টাকে মাকড়সার জাল বা পাখির বিষ্ঠাও দেখেছি৷ বুড়ো পোকাটার গতিবিধিতে নজর রেখে বললেন, 'বাঘের ছবিই দেখাব৷ তবে এটা যে-সে বাঘ নয়, সেই কুখ্যাত মানুষখেকো বাঘ৷ সরকার যাকে মারার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছেন৷'
বিরক্ত হয়ে বললুম, 'ধরুন, তাই না হয় হল! মানুষখেকো বাঘটার ছবি আপনার ক্যামেরায় উঠল৷ কিন্তু সেটা অত্যদ্ভুতই-বা হবে কেন এবং দৈনিক সত্যসেবকই-বা ও খবর ছাপবে কেন? তা ছাড়া ওটাই মানুষখেকো তার প্রমাণ কী?'
রহস্যময় হেসে বুড়ো বললেন, 'ধৈর্য ধরো বৎস! এ বৃদ্ধের প্রতি কিঞ্চিৎ বিশ্বাস রাখো৷ কেমন?'
এবার একটু চমক জাগল৷ বললুম, 'যদি জেনেই বসে আছেন যে, সেই মানুষখেকো বাঘটাই আপনার ক্যামেরার সামনে এসে হাজির হবে, তাহলে ওই শিকারি ভদ্রলোকদের বললেন না কেন? ওঁরা তো বাঘটাকে মারার জন্যে হন্যে হচ্ছেন৷ আজ বিকেলে আপনার সামনেই ওঁরা দু-জনে বেরিয়ে গেলেন৷ কোথায় মোষের বাচ্চা বেঁধে রেখে গাছের ওপর মাচান করে বসে থাকবেন সারারাত৷ খামোকা ওঁরা কষ্ট পাবেন ঠান্ডায়৷'
আমার কথার জবাব দেবার জন্যে ঠোঁট ফাঁক করেছেন, এমন সময় চৌকিদার দরজায় উঁকি মেরে একটু কেশে বলল, 'হুজুর কর্নেলসাব৷ খানা তৈয়ার হ্যায়৷ হুকুম হোগা তো আভি লায়ে গা৷'
'জরুর' বলে হুজুর কর্নেলসাব অর্থাৎ আমার বৃদ্ধ বন্ধু কর্নেল নীলাদ্রি সরকার ওরফে 'বুড়ো ঘুঘু' অভ্যাসমতো বুকে ক্রশ এঁকে যথার্থ রসিকের মতো খাদ্য গ্রহণে প্রস্তুত হলেন৷
বাংলোটা একেবারে জঙ্গলের মধ্যে৷ তাই সতর্কতার জন্য বারান্দা জুড়ে গ্রিল এবং এই শীতে গোটাটা তেরপলে ঢাকা রয়েছে৷ বারান্দার একদিকে কিচেন৷ চৌকিদার কিচেনের সামনে খাটিয়া পেতে ঘুমোয়৷ সম্প্রতি মানুষখেকো বাঘের উপদ্রব হওয়াতে সে আরও সতর্কতার দরুন পাশে একটা টর্চ আর বল্লমও রাখে৷ কর্নেলবুড়ো মানুষখেকোর ভয় তুচ্ছ করে এত রাত অবধি জঙ্গলে ঘোরেন এবং নিরাপদে ফিরে আসেন৷ বারান্দার গ্রিলের একটা অংশ খুলে সে হুজুর কর্নেলসাবকে ভেতরে আসতে দেয় এবং সঙ্গেসঙ্গে ফের সেই ফাঁকটা অর্থাৎ দরজা বন্ধ করে তালা এঁটে সন্দিগ্ধদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে৷ আমার ধারণা, সে ভূত দেখছে, না মানুষ, তার দৃষ্টিতে এরকম একটা চাঞ্চল্য থাকে৷ কর্নেলের ওপর তার ভক্তি ক্রমশ বেড়ে গেছে৷
জেলি-মাখানো মোটা মোটা চাপাটির সঙ্গে বুনো মুরগির মাংস বেশ জমিয়ে খাওয়া গেল৷ খেতে খেতে কর্নেল আমার সেই কথাটার জবাব দিলেন৷ 'ঠিকই জয়ন্ত! মি. সেন এবং মি. দত্তকে আমার বলা উচিত ছিল, আপনারা ঝরনার ভাটিতে টোপ না বেঁধে আরও একটু উজানে এসে বাঁধুন৷ কারণ আমার ধারণা, বাঘটা ওখানেই টিলার ওপর একটা গুহায় থাকে৷ তার পায়ের দাগও খুঁটিয়ে দেখেছি৷ জঙ্গলবিদ্যায় আমারও কিঞ্চিৎ জ্ঞানগম্যি আছে৷'
'তাহলে বললেন না কেন?'
কর্নেল হাসলেন৷ 'যেচে পড়ে বলাটা সংগত মনে করিনি৷ তা ছাড়া লক্ষ করেছ নিশ্চয়, বিশেষ করে মি. দত্ত কেমন যেন অভদ্র প্রকৃতির লোক৷ এসেই আমাদের এখানে দেখে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন না? মি. সেনও কেমন আমাদের শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন, দু-দুটো মানুষ-টোপ থাকতে আর মোষের বাচ্চা কিনতে খামোকা পয়সা খরচ কেন? ব্যাপারটা আমার গায়ে লেগেছে জয়ন্ত!'
ওঁর দুঃখ দেখে ঠাট্টা করে বললুম, 'আহা! ওঁরা তো কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নামক প্রখ্যাত বুড়ো ঘুঘুকে চেনেন না! চিনলে নিশ্চয় সমীহ করে কথা বলতেন৷ তা ছাড়া যে জঙ্গলে মানুষখেকো বাঘ রয়েছে, সেখানে যারা বেড়াতে এসেছে শখের বশে, তারা নিছক টোপ হতেই এসেছে বই কী!'
কর্নেল কিন্তু হাসলেন না৷ গোমড়ামুখে গেলাসের কনকনে ঠান্ডা জলটা পুরো গিলে ফেললেন৷
শেষ রাতে কী একটা গণ্ডগোলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল৷ জেগে কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম৷ লন্ঠনের দম বাড়িয়ে কর্নেল ব্যস্তভাবে ডাকছেন, 'জয়ন্ত! জয়ন্ত!' বাইরে চৌকিদার দুর্বোধ্য ভাষায় চ্যাঁচামেচি করছে৷ আর কেউ হাউমাউ করে কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে৷
কম্বল ছেড়ে বেরোনো সহজ কথা নয়৷ কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সহজাত বোধ কাজ করে৷ হুড়মুড় করে উঠে পড়লুম৷ তারপর দেখি, কর্নেল লন্ঠন হাতে এগিয়ে দরজা খুললেন৷ তাঁর পিছন পিছন দৌড়ে গেলুম৷ বারান্দায় বেরিয়ে এক ভয়ংকর দৃশ্য চোখে পড়ল৷ মেঝেয় পা ছড়িয়ে বসে আছেন সেই শিকারি মি. দত্ত এবং দু-হাতে মুখ ঢেকে ছেলেমানুষের মতো কাঁদছেন৷ তাঁর পোশাকে চাপ চাপ টাটকা রক্ত লেগে রয়েছে৷ পাশে দুটো রাইফেল পড়ে রয়েছে৷ আর তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে চৌকিদার বেচারা জড়ানো গলায় ক্রমাগত কী বলছে, বোঝা যাচ্ছে না৷
কর্নেল মি. দত্তের কাঁধে হাত রেখে ঝাঁকুনি দিয়ে বললেন, 'মি. দত্ত, কী হয়েছে?'
বার কতক ঝাঁকুনি দেওয়ার পর মি. দত্ত শান্ত হলেন৷ তারপর ফ্যাঁচ করে নাক ঝেড়ে বললেন, 'ও হো হো হো! আমি কী করব? কী করব আমি? আমার সারা জীবনের সঙ্গী আমার প্রাণের বন্ধু অমল... ঃও!'
কর্নেল বললেন, 'প্লিজ মি. দত্ত! শান্ত হোন, শান্ত হোন৷ কী হয়েছে বলুন তো?'
মেজাজি মি. দত্ত বিকৃত মুখে বললেন, 'বুঝতে পারছেন না মশাই কী হয়েছে? অমলকে বাঘে মেরে ফেলেছে৷ ও হো হো! কেমন করে ওর স্ত্রী-ছেলে-মেয়েদের সামনে এ মুখ দেখাব?'
এটাই অনুমান করেছি ততক্ষণে৷ কর্নেল ওঁর কাঁধ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, 'সর্বনাশ! মি. সেনকে মানুষখেকো বাঘটা মেরে ফেলেছে! কিন্তু কীভাবে ব্যাপারটা ঘটল বলুন তো মি. দত্ত? আপনারা কি একই মাচানে ছিলেন না?'
দত্তসাহেব রুমালে চোখ-নাক মুছে বললেন, 'একই মাচানে তো ছিলুম৷ কখন বাঘটা চুপিচুপি গাছে উঠেছিল টের পাইনি৷ আমার একটু তন্দ্রামতো এসেছিল৷ হঠাৎ অমলের আর্তনাদে জেগে গেলুম৷ টর্চ জ্বালতেই দেখি, ঃও! সে এক বীভৎস দৃশ্য৷ বাঘটা অমলের গলা কামড়ে ধরে ঝাঁপ দিল৷'
কর্নেল বললেন, 'আপনি নিশ্চয় গুলি করেননি? ওঁর রাইফেলটাও তো নিয়ে এসেছেন দেখছি৷'
দত্তসায়েব শ্বাস টেনে বললেন, 'আমার গায়ে ধাক্কা লেগেছিল৷ টর্চ আর রাইফেল নীচে পড়ে গিয়েছিল তক্ষুনি৷ ঃও! ও হো হো হো৷ অমল!'
'তারপর? তারপর?' আমি দম-আটকানো গলায় প্রশ্ন করলুম৷
মি. দত্ত বললেন, 'তারপর কীভাবে যে পালিয়ে এসেছি আমিই জানি৷ এই দেখুন, কত জায়গায় ছড়ে গেছে৷ আর এই দেখুন কত রক্ত৷ অমলের রক্ত! ও হো হো হো৷'
কর্নেল একটু ভেবে নিয়ে বললেন, 'বড্ড দেরি হয়ে গেছে৷ এতক্ষণে নিশ্চয় বাঘটা শিকার নিয়ে সরে পড়েছে৷ সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো উপায় নেই৷...'
বাকি রাত আর ঘুমোনো গেল না৷ পাশের ঘরে দত্তসায়েব সমানে বিড়বিড় করে শোকপ্রকাশ করছেন শোনা যাচ্ছিল৷ কর্নেল ও আমি ফায়ারপ্লেসের কাছে বসে রইলুম৷ কর্নেলবুড়ো একেবারে চুপচাপ৷ কোনো প্রশ্ন করেও জবাব পেলুম না৷ অভ্যাসমতো দাড়ি বা টাকে হাত বুলোচ্ছেন, কখনো চোখ বুজে বুকে ক্রস আঁকছেন৷
জঙ্গল ও পাহাড় জুড়ে ঘন কুয়াশা৷ রোদ বাড়লে সেটা কাটল৷ তখন কর্নেল আমাকে নিয়ে বেরোলেন৷ দত্তসায়েবকে দেখলুম লনে রোদে বসে আছেন৷ হাতে রাইফেল৷ হিংস্র চেহারা৷ লাল চোখ৷ কর্নেল ডাকলেন, 'আসুন মি. দত্ত৷ দেখি, আপনার বন্ধুর ডেডবডি খুঁজে পাই নাকি৷'
দত্তসাহেব উঠলেন৷ 'ওই শয়তানটাকে খতম না করে আর আমি কলকাতা ফিরছি না; এই আমার প্রতিজ্ঞা৷'
যেতে যেতে কর্নেল বললেন, 'প্রথমে আমাদের মাচানের ওখানে যাওয়াই উচিত৷'
মি. দত্ত শুধু বললেন, 'হুঁ৷'
বাংলো থেকে ঝোপজঙ্গলে ভরা ঢাল বেয়ে নেমে আমরা ছোট্ট একটা সোঁতার ধারে পৌঁছোলুম, যেটা একটু দূরে ঝরনা থেকে বয়ে এসেছে৷ পাথরের ওপর দিয়ে ঝিরঝিরে স্বচ্ছ জল বইছে৷ ধারে ধারে কিছুটা যাওয়ার পর মি. দত্ত বললেন, 'ওই যে ওখানে৷'
চারপাশে ঘন গাছপালা, মধ্যিখানে এক টুকরো ফাঁকা ঘাসজমি৷ একটা বাচ্চা মোষ মনের সুখে এখন ঘাস খাচ্ছে৷ বুঝলুম, ওটাই টোপ৷ জমিটায় পৌঁছেই আমরা থমকে দাঁড়ালুম৷ মাচানের ঠিক নীচেই একটা ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পড়ে রয়েছে৷ তারপর বিকট চিৎকার করে মি. দত্ত ছুটে গিয়ে মৃতদেহটার কাছে হাঁটু মুড়ে বসলেন এবং রাতের মতোই বুকফাটা কান্না জুড়ে দিলেন৷
কর্নেল ও আমি এগিয়ে গেলুম৷ শিকারি মি. সেনের গলায় গভীর ক্ষতচিহ্ন এবং বুকের ওপরটা তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে ফালা ফালা৷ পুরু পুলওভার ফেঁড়েফুঁড়ে গেছে৷ জমাট কালচে রক্তের ছোপ সবখানে৷ কর্নেল মুখ তুলে মাচানের দিকে তাকালেন৷ তারপর বেমক্কা গাছে চড়তে শুরু করলেন৷ গাছটার গুড়ি ও ডালে রক্তের ছোপ দেখতে পাচ্ছিলুম৷
একটু পরেই কর্নেল মাচান থেকে নেমে এসে বললেন, 'আপনি ঠিকই বলেছেন মি. দত্ত৷ বাঘটা ওঁকে আচমকা মাচানের ওপরেই আক্রমণ করেছিল৷ উনি আত্মরক্ষার ফুরসত পাননি৷ তো ইয়ে ডেডবডিটা...'
দত্তসায়েব শান্তভাবে বললেন, 'চৌকিদারকে বলেছি ক-জন লোক ডেকে আনতে৷ জিপে করে কলকাতা নিয়ে যাব৷ কিন্তু জানি না, অমলের স্ত্রীর সামনে দাঁড়াব কোন মুখে৷ ঃও৷'
কর্নেল অন্যমনস্কভাবে মাচানের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর হঠাৎ ঘুরে বললেন, 'দেখুন মি. দত্ত, আমার মনে হচ্ছে, আপনার বন্ধু মি. সেনকে যে বাঘটা মেরে ফেলেছে, সেটা মানুষখেকো নয়৷'
মি. দত্ত ভুরু কুঁচকে বললেন, 'আপনি কি শিকারি? কীভাবে বুঝলেন যে মানুষখেকো নয়? মানুষখেকো না হলে ওভাবে কোনো বাঘ চুপিচুপি গাছে উঠে শিকারির ওপর হামলা করে না৷'
কর্নেল বললেন, 'তা ঠিক৷ তবে এ জঙ্গলে আরও বাঘ থাকাও তো সম্ভব৷'
ধমকের সুরে দত্তসায়েব বললেন, 'যা জানেন না, তা নিয়ে বাজে বকবেন না৷'
কর্নেল ধমক খেয়ে কাঁচুমাচু মুখে সরে এলেন৷ 'চলো জয়ন্ত, ডেডবডি তো পাওয়া গেছে৷ আমরা নিজের কাজে যাই৷'
ঝরনার ধারে এসে বললুম, 'লোকটা অভদ্র৷ গোঁয়ার৷ একটা হামবাগ!'
কর্নেল হেসে বললেন, 'শিকারিদের একটু রাগ হওয়া স্বাভাবিক৷ যাক গে, জয়ন্ত৷ তুমি বাংলোয় গিয়ে বিশ্রাম করো গে৷ এ বুড়োর পিছনে ছোটাছুটি করা তোমার পোষায় না জানি৷'
'সে আর বলতে? কিন্তু আপনি যাবেনটা কোথায়?'
'আপাতত ক্যামেরাটা নিয়ে আসি৷' বলে কর্নেল হনহন করে এগিয়ে গেলেন৷ আমি বাংলোয় ফিরলুম৷...
কর্নেল ফিরলেন একেবারে দুপুর গড়িয়ে৷ তারপর খেয়েদেয়ে ফিলম ডেভেলাপ করতে বাথরুমে ঢুকলেন৷ ওটাই ওঁর ডার্করুম৷ রাতে ঘুম হয়নি৷ তাই আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লুম৷ সেই ঘুম ভাঙল কর্নেলের ডাকাডাকিতে৷ 'জয়ন্ত, জয়ন্ত! শিগগির সব গুছিয়ে নাও৷ আমরা এক্ষুনি রওনা দেব৷ জিপ এসে গেছে৷'
বললুম, 'সে কী৷ অরণ্যপিপাসা এরই মধ্যে মিটে গেল? না কি মানুষখেকো বাঘের আতঙ্ক? আর জিপ কোথায় পেলেন? আমরা এই অবেলায় যাবই-বা কোন চুলোয়?'
বুড়ো ঘুঘু রহস্যময় হেসে বললেন, 'ওয়েট ওয়েট ডার্লিং৷ সব প্রশ্নের জবাবে আপাতত আমার রাতের ফসল তোমাকে উপহার দিতে চাই, নাও৷'
হাত বাড়িয়ে যা পেলুম, তা একটা ছোট্ট ফটোগ্রাফ৷ কিন্তু দেখামাত্র চমকে উঠলুম৷ একী! এ যে দেখছি, মি. দত্ত হাঁটু দুমড়ে পাথরের খাঁজে হাত পুরে কী একটা করছেন৷ অবাক হয়ে বললুম, 'এর মানে? কাল রাতে তো ওঁরা দু-জনে মাচানে ছিলেন৷-মানে মি. দত্ত এবং মি. সেন-অথচ মি. দত্ত দেখছি একা এখানে কী যেন করছেন৷'
কর্নেল বিদঘুটে ভঙ্গিতে ফের হাসলেন৷ 'রেডি হয়ে নাও ঝটপট৷ তোমায় যা দেখাব বলেছিলুম, তা দেখালুম৷ বাকিটা প্রতাপগড় টাউনশিপে গিয়ে দেখাব৷'
'কিন্তু আপনি মানুষখেকো বাঘটা দেখাবেন বলেছিলেন৷'
'তাই তো দেখালুম৷' বলে বৃদ্ধ গোয়েন্দাপ্রবর নিজেই আমার কম্বল বেডিংপত্তর গোছাতে শুরু করলেন৷ আমি তো হতভম্ব হয়ে গেছি৷ কিছুক্ষণ পরে জিপে ওঠার সময় কর্নেল বললেন, 'আসলে যে বুড়ো এবং রোগা বাঘটা তল্লাটে পাঁচটা মানুষ মেরে খেয়েছে, সে তার পাহাড়ি গুহায় স্বাভাবিকভাবে মরে পড়ে আছে৷ তাকে গতকাল আবিষ্কার করে এসেছিলুম৷ কবে কোনো শিকারির গুলি খেয়ে বাঘটার অবস্থা এমনিতে শোচনীয় হয়ে উঠেছিল৷ যাক গে, উঠে পড়ো বৎস, যথাস্থানে পৌঁছে সব টের পাবে৷'
প্রতাপগড় টাউনশিপে পৌঁছোতে প্রায় সন্ধ্যা হল৷ অবাক হয়ে দেখি, জিপ থানায় ঢুকছে৷ বুক কাঁপল৷ তাহলে কি মি. সেন বাঘের হাতে মারা পড়েননি? নিছক খুনখারাপির ঘটনা?
হুঁ, ঠিক তাই৷ লাল চোখে হিংস্র মুখভঙ্গিতে বসে আছেন মি. দত্ত৷ তাঁর হাতে হাতকড়া৷ টেবিলের চারপাশ ঘিরে কয়েক জন পুলিশ অফিসার রয়েছেন৷ আমাদের দেখে একজন পুলিশ অফিসার চেঁচিয়ে উঠলেন, 'হ্যাল্লো কর্নেল৷'
কর্নেল কোটের পকেট থেকে এক গাদা ছবি এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'আমার অত্যদ্ভুত ক্যামেরার রাতের ফসল মি. শর্মা৷ একটা ছবিতে দেখবেন দত্তসায়েব দুটো বাঘনখ লুকিয়ে রাখছেন৷ সময়ও ফিলমে সাংঘাতিকভাবে লেখা হয়ে যায়৷ রাত দুটো তিরিশ মিনিট৷ এই দেখুন!'
মি. শর্মা একগাল হেসে বললেন, 'আপনার নির্দেশমতো জায়গায় মার্ডার উইপন দুটো উদ্ধার করা হয়েছে৷ ডেডবডি মর্গে পাঠানো হয়েছে৷ রিপোর্ট আসতে দেরি নেই৷' বলে উনি ড্রয়ার থেকে কাগজে মোড়া দুটো বাঘের থাবার মতো নখওয়ালা সাংঘাতিক অস্ত্র বের করলেন৷ রক্তের ছোপ কালো হয়ে আছে৷
মি. দত্ত মুখ নীচু করে বসে আছেন পাথরের মতো৷
অনেক রাতে সার্কিট হাউসের একটা ঘরে কর্নেলের মুখোমুখি হলুম৷ 'দত্তসায়েব বন্ধুকে খুন করলেন কেন?'
কর্নেল জবাব দিলেন, 'কলকাতার প্রখ্যাত হোসিয়ারি দত্ত অ্যান্ড সেনের নাম শোননি জয়ন্ত? সেই যে বাঘমার্কা গেঞ্জি ইত্যাদি যাদের৷ যেটুকু অনুমান করছি, তাতে মনে হয় দত্তসায়েব ভেতর ভেতর পার্টনার বন্ধু সেনসায়েবকে ঠকিয়ে একা মালিক হবার চক্রান্ত করেছিলেন৷ কারণ ওঁদের চাপা গলায় আগের রাতে কী সব তর্ক করতে শুনেছিলুম৷ যাই হোক সেই চক্রান্তের চরম অবস্থা এই হত্যাকাণ্ড৷ বুঝে দেখো জয়ন্ত, কী চমৎকার ফন্দি এঁটেছিলেন মি. দত্ত৷ মানুষখেকো বাঘ শিকার করতে এসে তার পাল্লায় একজনের মারা পড়াটা কত স্বাভাবিক দেখাত৷ শুধু বাদ সাধল এই বৃদ্ধ প্রকৃতিবিদ এবং তার অত্যদ্ভুত ক্যামেরা৷ তবে ডার্লিং জয়ন্ত, আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি-যদি তুমি এই বৃদ্ধকে নির্দয়ভাবে পরিত্যাগ না করে যাও, তাহলে কয়েক দিনের মধ্যে তোমায় সত্যিকার বাঘ দেখাবই দেখাব৷'
দাড়ি ও টাকওয়ালা 'বুড়ো ঘুঘু' কর্নেল নীলাদ্রি সরকার নিজের বিশাল বুকে খাঁটি পাদরির মতো একবার ক্রস আঁকলেন৷ তারপর অস্ফুট স্বরে আওড়ালেন, 'আমেন! আমেন!'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন