সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ছোটোমামার সঙ্গে পাশের গ্রামে যাত্রা শুনতে গিয়েছিলুম৷ যাত্রার আসর ভাঙল, তখন অনেক রাত৷ ফুটফুটে জ্যোৎস্না ছিল৷ ছোটোমামা বললেন, 'এত রাতে আর বাস পাওয়া যাবে না৷ আয়, বরং হাঁটাপথে শর্টকাট করি৷'
পিচের রাস্তা থেকে ছোটোমামার পিছন পিছন মাঠে নেমে বললুম, 'পথ কোথায় ছোটোমামা? তুমি যে হাঁটাপথ বলছ?'
ছোটোমামা সবে গুনগুন করে কী গান ধরেছিলেন৷ বিরক্ত হয়ে বললেন, 'দিলি তো মুডটা নষ্ট করে! হাঁটাপথ বুঝিসনে? যেখান দিয়ে তুই হাঁটবি, সেটাই হাঁটাপথ৷ চুপচাপ চলে আয়৷'
নির্জন মাঠে হু-হু করে বাতাস বইছে৷ এদিকে-ওদিকে দু-একটা গাছ কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ শনশন শব্দে ডালপালা দুলছে৷ ছোটোমামার গানের মুডটা ফিরে এসেছে৷ এবার গলা ছেড়ে গান ধরেছেন৷ কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না৷ কিন্তু সুরটা চেনা ঠেকছিল৷ ছোটোমামা তাহলে যাত্রার আসরে শোনা বিবেকের গানই গাইছেন৷ একটু পরে আমরা একটা দিঘির পাড়ে পৌঁছোলুম! অনেকগুলো তাল গাছ সেখানে লম্বা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ পাতাগুলো অদ্ভুত শব্দে নড়ছে৷ হঠাৎ কে ধমক দিয়ে বলে উঠল, 'কী হে ছোকরা, আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিলে?'
কেমন খ্যানখেনে গলার স্বর৷ ছোটোমামা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, 'অদ্ভুত তো! ঘর ছেড়ে দিঘির পাড়ে ঘুমোতে এসেছ৷ কে হে তুমি?'
'আবার তুমি বলা হচ্ছে? ভারি বেয়াদপ ছোকরা দেখছি৷'
ছোটোমামা একটু ভড়কে গিয়ে বললেন, 'আপনি কোথায় ঘুমোচ্ছেন?'
'তাল গাছের ডগায়৷'
এতক্ষণে টের পেলুম, সামনে একটা তাল গাছের মাথা থেকে কেউ কথা বলছে৷ ছোটোমামা হাসতে হাসতে বললেন, 'তাল গাছের ডগা কি ঘুমোনোর জায়গা? ঘুম পেলে বাড়ি গিয়ে ঘুমোন৷'
'এটাই তো আমার বাড়ি৷'
'তার মানে?'
'মানে আবার কী? যাও, বিরক্ত কোরো না৷ আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে৷'
বিকট হাই তোলার শব্দ শোনা গেল৷ আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ ছোটোমামা গোঁ ধরে বললেন, 'এর একটা এসপার-ওসপার না করে যাব না৷ তাল গাছের ডগায় কেউ ঘুমোতে আসে বলে তো শুনিনি৷ গাছের তলায় অবশ্যি অনেক মানুষকে ঘুমোতে দেখেছি৷ ও মশাই, শুনছেন?'
'জ্বালাতন! শোনো হে ছোকরা, এখনই কেটে না পড়লে বিপদ হবে বলে দিচ্ছি৷'
ছোটোমামার হাত ধরে টেনে বললুম, 'আমার বড্ড ভয় করছে৷ চলো ছোটোমামা৷'
ছোটোমামা রেগে গিয়ে বললেন, 'তুই বড্ড ভীতু ছেলে দেখছি৷ ব্যাপারটা তোর গোলমেলে মনে হচ্ছে না? তাল গাছের ডগায় কেউ ঘুমোতে আসে? লোকটা নিশ্চয় চোর৷ পুলিশের ভয়ে ওখানে লুকিয়ে আছে!'
এবার ওপর থেকে হুংকার শোনা গেল৷ 'কী বললে! কী বললে? আমি চোর? আমি পুলিশের দারোগা বঙ্কুবিহারী ধাড়া৷ আমাকে চোর বলা হচ্ছে? রোসো, দেখাচ্ছি মজা৷'
তাল গাছের ডগায় পাতাগুলো প্রচণ্ড নড়তে থাকল৷ এবার ছোটোমামা হন্তদন্ত হাঁটতে থাকলেন৷ চাপা স্বরে বললেন, 'দরকার হলে দৌড়োতে হবে৷ রেডি হয়ে থাক৷'
দৌড়োনোর দরকার হল না৷ বঙ্কুবিহারী ধাড়ার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না আর৷ কিছুটা চলার পর ছোটোমামা বললেন, 'ব্যাপারটা বড্ড রহস্যজনক৷ বুঝলি পুঁটু? আমার ধারণা, দারোগাবাবু কোনো চোরকে ধরার জন্যে ওখানে লুকিয়ে আছেন৷'
ছোটোমামার কথা শেষ হওয়ামাত্র কে চাপা স্বরে বলে উঠল, 'কোথায় লুকিয়ে আছেন দারোগাবাবু?'
চমকে উঠে দেখি, সামনে একটু তফাতে কেউ সদ্য উঠে দাঁড়াল৷ জ্যোৎস্নায় চেহারাটা আবছা কালো৷ ছোটোমামা থমকে দাঁড়িয়ে বললেন, 'কে, কে?'
'আজ্ঞে আমি৷'
'আমি মানে কী? তোমার নাম?'
'নাম শুনে কী হবে? দারোগাবাবু কোথায় লুকিয়ে আছেন বলুন৷'
ছোটোমামা কিছু বলার আগে আমি বলে দিলুম, 'দিঘির পাড়ে একটা তাল গাছের ডগায়৷'
অমনি ছায়া-কালো লোকটা বলে উঠল, 'ওরে বাবা! আমি তো ওখানেই ঘুমোতে যাচ্ছিলুম৷ সর্বনাশ!'
বলেই সে উধাও হয়ে গেল৷ ছোটোমামা হেসে ফেললেন৷ 'এই লোকটাই চোর৷ বুঝলি তো পুঁটু? একে ধরার জন্যই দারোগাবাবু ওখানে ওত পেতেছেন৷'
বললুম, 'কিন্তু উনি তো ঘুমোচ্ছেন বললেন! নিজের বাড়িও বললেন!'
'ধুর বোকা! পুলিশের কথা ওইরকমই৷ আসল কথাটা বললে চলে? চোর সাবধান হয়ে যাবে না?'
'কিন্তু শেষ পর্যন্ত চোর সাবধান হয়ে গেল তো?'
ছোটোমামা গুম হয়ে বললেন, 'আমার কী দোষ? চোর যে এখানে লুকিয়ে আছে, জানতুম নাকি?'
আবার দু-জনে হাঁটতে থাকলুম৷ ছোটোমামার গানের মুডটা চলে গেছে মনে হচ্ছিল৷ চুপচাপ হাঁটছেন আর এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন৷ বরাবর দেখেছি, ছোটোমামার সঙ্গে রাতবিরেতে বেরোলে বড্ড গোলমেলে কাণ্ড হয়৷ আমার গা ছমছম করছিল৷ ছোটোমামাকে এদিক-ওদিক তাকাতে এবং কখনো হঠাৎ দাঁড়িয়ে গিয়ে কান করে কিছু শুনতে দেখছিলুম৷ জিজ্ঞেস করলে জবাব দিচ্ছিলেন না৷ কিছুক্ষণ পরে ফের উনি থমকে দাঁড়ালেন৷ তারপর বললেন, 'শোন পুঁটু! কথাটা মনে আছে তো? দরকার হলে দৌড়োনোর জন্যে রেডি থাকতে হবে?'
ভয়ে ভয়ে বললুম, 'আবার দৌড়োতে হবে কেন ছোটোমামা?'
'কিছু বলা যায় না! সামনে কালোমতো যে গাছটা দেখছিস, ওটা জটাবাবার থান৷ একবার এমনি রাত্তিরে ওখানে জটাবাবার পাল্লায় পড়েছিলুম৷ ওঃ৷ সে এক সাংঘাতিক কাণ্ড৷'
আরও ভয় পেয়ে বললুম, 'তাহলে ওখান দিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না ছোটোমামা৷'
ছোটোমামা পা বাড়িয়ে বললেন, 'আয় না দেখি কী হয়৷ সেবার আমি একা ছিলুম৷ এবার দু-জনে আছি৷ জটাবাবা আমাদের ঘাঁটাতে সাহস পাবে না৷'
'জটাবাবা কে, ছোটোমামা?'
'একটা বুড়োমতন লোক৷ মাথায় প্রচুর জটা৷'
'সে ওখানে কী করে?'
'বললুম না ওখানে ওর থান আছে? দিনের বেলা লোকেরা এসে ওখানে মানত করে৷ ঢাকঢোল বাজিয়ে জটাবাবার পুজোও দেয়৷ তবে দিনের বেলা জটাবাবা কাকেও দেখা দেয় না৷'
'দিনের বেলা জটাবাবা কোথায় থাকে?'
ছোটোমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, 'চুপচাপ আয় তো৷ জটাবাবা শুনতে পেলে কেলেঙ্কারি৷'
গাছটা প্রকাণ্ড৷ তলায় ঘন ছায়া৷ বাতাসে ডালপালা কেমন অদ্ভুত শব্দ করছিল৷ ছোটোমামা আবার একটুখানি দাঁড়িয়ে গাছটাকে দেখে নিলেন৷ তারপর ফিসফিস করে বললেন, 'রেডি, স্টেডি, গো!'
ছোটোমামার পিছন পিছন গাছটার তলায় যেই গেছি, আমার মাথায় কী একটা ঠেকল৷ চমকে উঠে হাত তুলে দেখি, একটা পা৷ বারণ ভুলে চেঁচিয়ে উঠলুম৷ 'ছোটোমামা! ছোটোমামা!'
'ধ্যাত্তেরি! চ্যাঁচাচ্ছিস কেন? বললুম চুপচাপ চলে আয়৷'
'একটা পা! বড্ড ঠান্ডা, ছোটোমামা৷'
'চলে আয় না হতভাগা!'
'আমাকে যেতে দিচ্ছে না যে!' কাঁদো-কাঁদো হয়ে বললুম৷ বরফের মতো ঠান্ডা একটা পা আমার গলা আঁকড়ে ধরে আছে৷ দু-হাতে ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলুম৷ দম আটকে যাচ্ছিল৷
ছোটোমামা কাছে এসে বললেন, 'কই, কোথায় পা?'
'আমার গলায়৷'
ছোটোমামা সেই ঠান্ডা ঝুলন্ত পা ধরে টানাটানি শুরু করলেন৷ হঠাৎ আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল৷ খুব জোরে পায়ে চিমটি কেটে দিলুম৷ অমনি পা-টা গলা থেকে সরে গেল আর কে ওপর থেকে আর্তনাদ করে উঠল, 'উহুহুহু! গেছি, গেছি! কী বিচ্ছু ছেলে রে বাবা!'
আমিও সাহস পেয়ে চেঁচিয়ে উঠলুম, 'ছোটোমামা! টানো! দু-জনে টেনে নামাই জটাবাবাকে৷'
ছোটোমামাও ততক্ষণে সাহসী হয়ে উঠেছেন৷ দু-জনে ঠান্ডা পা ধরে টানতে থাকলুম৷ জটাবাবা ঠ্যাং ঝুলিয়ে ডালে বসে থাকার বিপদ টের পেল এতক্ষণে৷ কাকুতিমিনতি করে বলতে থাকল, 'ঘাট হয়েছে বাবারা! ছেড়ে দে৷ উহুহুহু, বড্ড ব্যথা করছে রে!'

ছোটোমামা পা ছেড়ে দিলেন৷ আমিও ছেড়ে দিলুম৷ তারপর ছোটোমামা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বললেন, 'কী জটাবাবা? সেবার তো আমাকে একা পেয়ে খুব ভয় দেখিয়েছিলে৷ এবার আর ভয় পাচ্ছি না৷ কই, নেমে এসো৷ দেখি তোমার কত বুজরুকি৷'
গাছের ফাঁক দিয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে৷ ওপরের ডালে জটাবাবাকে আবছা দেখা যাচ্ছিল৷ পায়ে হাত বুলিয়ে 'আহা-উহু' করছে৷ মাথার প্রকাণ্ড জটা, পুঁটুলির মতো দেখাচ্ছে৷ ছোটোমামার চ্যালেঞ্জ শুনে কোনো জবাব দিল না! চিমটিটা খুব জোর হয়ে গেছে-তাহলে৷
বললুম, 'আমার খুব ঘুম পাচ্ছে৷ চলুন ছোটোমামা!'
ছোটোমামা বীরদর্পে হাঁটতে থাকলেন৷ বললেন, 'তোর বুদ্ধি আছে পুঁটু৷ খুব জব্দ হয়ে গেছে জটাবাবা!'
'জটাবাবার পা অত ঠান্ডা কেন ছোটোমামা?'
'ঠান্ডা হবে না? জটাবাবাকে তুই জ্যান্ত মানুষ ভেবেছিস নাকি?'
চমকে উঠে বললুম, 'জ্যান্ত মানুষ নয়? তাহলে কী?'
ছোটোমামা চাপাস্বরে বললেন, 'বাড়ি ফিরে বলবখন৷ রাতবিরেতে নিরিবিলি জায়গায় ওসব কথা বলতে নেই৷'
এবার ছোটোমামার মনে সাহস জেগেছে৷ তাই যাত্রাদলের বিবেকের সেই গানটা গাইতে শুরু করলেন৷ কিছুটা চলার পর হঠাৎ গান থামিয়ে বললেন, 'ভুল হয়ে গেছে৷ বুঝলি পুঁটু?'
'কী ভুল ছোটোমামা?'
ডান দিকে আঙুল তুলে ছোটোমামা বললেন, 'ভুল করে কঙ্কালীতলার ঝিলের ধারে এসে পড়েছি৷ এখানে কোথায় একটা শ্মশান আছে যেন৷ বড্ড বিপদে পড়া গেল দেখছি৷'
একটু ভেবে নিয়ে ঝিলের ধারে ধারে হাঁটতে শুরু করলেন৷ ঝিলের জল জ্যোৎস্নায় ঝিকমিক করছে৷ ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে কিছুটা চলার পর কারা কথা বলছে শোনা গেল৷ ছোটোমামা বললেন, 'মনে হচ্ছে, জেলেরা ঝিলে মাছ ধরতে এসেছে৷ আয় তো! ওদের কাছে রাস্তাটা জেনে নিই৷'
ঝোপঝাড়ের পর একটা ফাঁকা জায়গা৷ সেখানে একটা ঝুপসিকালো গাছ৷ তার তলায় কারা বসে চাপাস্বরে কথাবার্তা বলছে৷ কিন্তু যেই আমরা সেখানে গেছি, লোকগুলো 'ওরে বাবা! এরা আবার কারা' বলে চ্যাঁচামেচি করে দৌড়ে উধাও হয়ে গেল৷
ছোটোমামা বললেন, 'যা বাব্বা৷ আমাদের দেখে ওরা ভয় পেল কেন? আমরা মানুষ না ভূত?'
গাছটার তলায় গিয়ে দেখি, কে খাটিয়ায় শুয়ে আছে৷ ছোটোমামা চাপাস্বরে বললেন, 'সর্বনাশ! এখানেই তো তাহলে কঙ্কালীতলার শ্মশান৷ ওরা একটা মড়া পোড়াতে এসেছিল৷'
মড়াটা দেখে গা ছমছম করছিল৷ গলা পর্যন্ত চাদরে ঢাকা৷ মুখটা একপাশে কাত হয়ে আছে৷ জ্যোৎস্নায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ ছোটোমামা এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে পা বাড়িয়েছেন, সেই সময় খাটিয়া থেকে মড়াটা বলে উঠল, 'চিতা সাজানো হয়েছে?'
ছোটোমামা বললেন, 'ওরে বাবা! এ যে দেখছি জ্যান্ত মড়া৷ পালিয়ে আয় পুঁটু!'
মড়াটা তড়াক করে উঠে বসে বলল, 'পালিয়ে যাবেন না, পালিয়ে যাবেন না! একা থাকতে আমার বড্ড ভয় করবে!'
'পুঁটু! রেডি স্টেডি গো!' বলে ছোটোমামা দৌড়োতে শুরু করলেন৷
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছোটোমামার পিছনে ছুটতে শুরু করলুম৷ কিন্তু বড্ড বিচ্ছিরি ঝোপঝাড়৷ কোথাও চষা খেতের মাটি গাদা হয়ে আছে৷ তার ওপর দৌড়োনো কঠিন৷ বার তিনেক আছাড় খেলুম৷ ছোটোমামা একবার থেমে পিছনে তাকিয়ে বললেন, 'সর্বনাশ! মড়াটা ছুটে আসছে যে!'
মড়াটার আর্তনাদ শুনতে পেলুম, 'দাদা! আমাকে ফেলে যাবেন না!'
আবার আমাদের দৌড়োনো শুরু হল৷ এবার এসে পৌঁছোলুম গাছপালা ঘেরা একটা বাড়ির কাছে৷ ছোটোমামা বললেন, 'আবার ভুল হয়ে গেছে রে পুঁটু! অন্য একটা গ্রামে চলে এসেছি মনে হচ্ছে! আয় তো এদের ডাকি!'
কিছুক্ষণ ডাকাডাকির পর দরজা খুলে কে একজন বলল, 'কাকে চাই?'
ছোটোমামা বললেন, 'দেখুন, আমরা বড্ড বিপদে পড়েছি৷ তাই...'
'বিপদটা কী আগে শুনি?'
'কঙ্কালীতলার শ্মশানের ওখানে একটা মড়া ছিল৷ হঠাৎ সে...'
লোকটা ঝটপট বলল, 'থাকারই কথা৷ আমাদের ছোটোকর্তার মড়া৷ তা এখনও চিতেয় ওঠেননি বুঝি?'
ছোটোমামা চাপাস্বরে বললেন, 'আমাদের ফলো করে আসছিলেন ভদ্রলোক৷ বলছিলেন, শ্মশানে ওঁর একা থাকতে বড্ড ভয় করবে৷'
'মলোচ্ছাই! আমাদের লোকগুলো কোথায় গেল? তারা ছিল না?'
'ছিল তো! আমাদের হঠাৎ ওখানে দেখে ওরা কেন যে ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল!'
লোকটা খি খি করে হেসে বলল, 'তা ভয় পাবারই কথা৷ রাতবিরেতে কাউকে চেনা কঠিন৷ এই তো আপনাদের দেখেও আমি দিব্যি ভয় পাচ্ছি৷'
ছোটোমামা জোরে হাত নেড়ে বললেন, 'আমরা মানুষ! আমরা মানুষ! আমাদের ভয় পাবেন কেন?'
'কিছু বলা যায় না মশাই! দিনকাল যা পড়েছে৷ কে জানে কে কোন রূপ ধরে ঘোরে৷'
ছোটোমামা তার দিকে এক-পা এগিয়ে বললেন, 'আপনি আমার গায়ে হাত দিয়ে দেখুন৷ আমরা মানুষ৷ এই ছেলেটা আমার ভাগনে৷ আমি ওর মামা৷ আমরা যাত্রা দেখে বাড়ি ফিরছিলুম৷ রাস্তা ভুল করে এই অবস্থা৷ এই নিন, আমার হাতটা ঠান্ডা না গরম দেখুন৷ আমরা ভূত হলে হাতটা বরফের মতো ঠান্ডা হবে৷'
ছোটোমামা হাত বাড়িয়ে আর এক-পা এগোতেই লোকটা চেঁচিয়ে উঠল, 'হাত সরান! হাত সরান! ওরে বাবা! হাত বাড়িয়ে ঘাড়টি ধরে মটকাবার মতলব? বড়োকর্তা! বড়োকর্তা! একবার আসুন তো!'
হেঁড়ে গলায় বাড়ির ভিতর থেকে কেউ বলল, 'কী হল রে ভূতু?'
লোকটা বলল, 'কারা এসে গণ্ডগোল বাধাচ্ছে৷'
'দরজা বন্ধ করে দে৷'
আমাদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ হয়ে গেল৷ ছোটোমামা বললেন, 'কোনো মানে হয়?'
বললুম, 'চলুন ছোটোমামা! অন্য কোনো বাড়ির লোক ডেকে জিজ্ঞেস করে নিই৷'
দু-জনে হাঁটতে থাকলুম৷ আশেপাশে আর কোনো বাড়ি নেই৷ ঝোপজঙ্গল আর উঁচু-নীচু সব গাছ বাতাসে দুলছে৷ একটু পরে আর একটা বাড়ি দেখতে পেলুম৷ ছোটোমামার ডাকাডাকিতে বাড়ির ভেতর থেকে কে ঘুম-জড়ানো গলায় সাড়া দিল, 'কী হয়েছে?'
ছোটোমামা বললেন, 'দয়া করে একটু বাইরে আসবেন?'
'না বাইরে যাবার সময় নেই৷ আমি ঘুমোচ্ছি৷'
ছোটোমামা বিরক্ত হয়ে বললেন, 'কোথায় ঘুমোচ্ছেন? এই তো দিব্যি কথা বলছেন৷'
'ঘুমোতে ঘুমোতে কথা বলা আমার অভ্যেস৷'
'কী অদ্ভুত! আচ্ছা, ঠিক আছে৷ ঘুমোতে ঘুমোতে বলুন, আমরা কনকপুর যাব কোন রাস্তায়?'
'কনকপুর? সে আবার কোথায়?'
'কনকপুর চেনেন না? বাসরাস্তার ধারে অত বড়ো গ্রাম৷'
'বাসরাস্তার ধারে তো কত বড়ো বড়ো গ্রাম আছে৷'
ছোটোমামা হতাশ ভঙ্গিতে বললেন, 'ভারি বিপদে পড়া গেল দেখছি৷ আচ্ছা এ-গ্রামের নাম কী?'
জবাব এল তেমনি ঘুমজড়ানো গলায়, 'নাম একটা ছিল যেন৷ মনে পড়ছে না৷'
ছোটোমামা খাপ্পা হয়ে বললেন, 'আপনি দেখছি ভারি অদ্ভুত লোক৷ নাম ছিল মানে কী?'
এবার জোরালো নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল৷ ছোটোমামা এবার খুব রেগে গেছেন৷ দরজায় দমাদ্দম লাথি মারতে শুরু করলেন৷ কপাট ভেঙে পড়ল মড়মড় করে৷ আমার ভয় করছিল, ছোটোমামার কাণ্ড দেখে৷ পাশের বাড়ির লোকেরা জেগে গিয়ে হইচই বাধায় যদি? রাতদুপুরে কারও বাড়ির দরজা ভেঙে ঢোকা কি ঠিক হচ্ছে?
কিন্তু ছোটোমামা একেবারে মরিয়া৷ ভেতরে পা বাড়িয়ে বললেন, 'আয় পুঁটু! লোকটাকে ঘুম থেকে জাগানো দরকার৷ ঘুমের ঘোরে মাথামুণ্ডু কীসব বলছে৷'
ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখলুম, একটা লোক উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে এবং তার নাক ডাকছে৷ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোতে পারে মানুষ? উঠোনে সাদা হয়ে জ্যোৎস্না পড়েছে৷ লোকটার নাক থেকে ঘড়র ঘড়র শব্দ হচ্ছে৷ ছোটোমামা তার গায়ে ধাক্কা দিয়েই পিছিয়ে এলেন৷ বললুম, 'কী হল ছোটোমামা?'
ছোটোমামা চাপাস্বরে বললেন, 'ব্যাপারটা ভালো ঠেকছে না পুঁটু! লোকটার গা বরফের মতো ঠান্ডা৷'
আঁতকে উঠে বললুম, 'চলে আসুন ছোটোমামা!'
ছোটোমামা ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন, 'পায়ে ব্যথা হয়ে গেছে রে৷ বরং এক কাজ করি আয়৷ ওই বারান্দায় দু-জনে শুয়ে পড়ি৷ ভোর বেলা নিশ্চয় মানুষজনের দেখা পাব৷ তখন জিজ্ঞেস করে নেব৷'
উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে একজন ঘুমন্ত লোক, যার গা নাকি বরফের মতো ঠান্ডা এবং এই বাড়িটাও তার৷ এখানে ঘুমোনো কি ঠিক হবে? কিন্তু ছোটোমামা আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন বারান্দায়৷ তারপর চিত হয়ে শুয়ে পড়লেন৷ আমারও খুব ঘুম পাচ্ছিল৷ শুয়ে পড়লুম শান-বাঁধানো বারান্দায়৷ দু-জনেই ক্লান্ত৷
তারপর কখন ঘুমিয়ে গেছি৷
ঘুম ভাঙল ছোটোমামার ডাকাডাকিতে৷ চোখ খুলে উঠে বসলুম৷ তারপর খুব অবাক হয়ে গেলুম৷ এ কোথায় শুয়েছিলুম আমরা? ভোরের আলোয় সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ একটা বট গাছের তলায় শুকনো ন্যাড়া মাটিতে মামা-ভাগনে খুব ঘুমিয়েছি৷ কোথাও ঘরবাড়ির চিহ্ন নেই৷ শুধু জঙ্গল৷
ছোটোমামা বললেন, 'হাঁ করে কী দেখছিস? রাতবিরেতে বেরোলে একটু গণ্ডগোল হয়েই থাকে৷ চল, বাড়ি ফিরি৷'
হাঁটতে হাঁটতে বললুম, 'রাস্তা চিনতে পারবেন তো ছোটোমামা?'
ছোটোমামা করুণ হেসে বললেন, 'দিনের বেলা আর ভুল হবে না৷ আমরা কোথায় চলে এসেছিলুম জানিস? কঙ্কালীতলার জঙ্গলে৷ প্রবলেম হল, রাতবিরেতে কিছু চেনা যায় না৷ চেনা জায়গাও অচেনা হয়ে যায়৷'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন