টুকুন ও চুমকি

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov7

টুকুনের মন খারাপ৷ তার বড়ো শালিখ পাখিটা খাঁচা থেকে পালিয়ে গেছে৷ এক বছর ধরে তাকে কত আদরে পুষছিল টুকুন৷ নাম রেখেছিল চুমকি৷ রোজ স্কুল থেকে ফিরে টুকুন তার সঙ্গে গল্প করত৷ স্কুলে সেদিন যা যা হয়েছিল, সেই সব মজার মজার গল্প৷ চুমকি মন দিয়ে শুনত আর কিচির কিচির করে হেসে খুন হত৷ চুমকির ভাষা টুকুন দিব্যি বুঝতে পারত৷ তেমনি টুকুন যা বলত, তাও কি বুঝত না চুমকি? নইলে অত হাসি কীসের?

তবু চুমকি পালিয়ে গেল৷ পালিয়ে গেল ছোটোমামার দোষে৷ খাঁচার দরজা খুলে আদর করতে গেছেন, আর চুমকি ফুড়ুৎ করে উড়ে গেছে৷ টুকুন রাগে-দুঃখে ছোটোমামাকে আঁচড়ে কোণঠাসা করে ফেলেছিল৷ ছোটোমামার ওই এক কথা, 'ভারি তো একটা শালিখ৷ ময়না হলে কথা ছিল৷'

রাতে টুকুন শুধু চুমকির স্বপ্ন দেখল৷ সকালে উঠে তাঁকে খুঁজতে বেরোল৷ যেখানে শালিখ পাখি দেখতে পায়, খুশিতে লাফিয়ে ওঠে৷ চিক্কুর ছেড়ে ডাকে, 'চুমকি-ই-ই!' চুমকি হলে তো সাড়া দিয়ে কাছে আসবে! ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে ডানা মেলে পালিয়ে যায়৷ টুকুনের আরও মন খারাপ হয়ে যায়৷

টুকুনদের গাঁয়ে কত শালিখ! শুধু চুমকিই নেই৷ তাহলে কি কানুদের সেই রাক্ষুসের পাল্লায় পড়েছিল? বেড়ালটা টুকুনকে দেখতে পেয়েই কেটে পড়ছে কেন? টুকুন কানুদের বাড়ির পেছনে ওত পেতে বসে রইল৷ হাতে একটা ইটের টুকরো৷ বেড়ালটাকে উচিত সাজা দেবে৷

কানুর বোন বিনু এসে বলল, 'ও কী রে টুকুন? কাকে মারবি তুই?'

টুকুন থতোমতো খেয়ে ঢিলটা ফেলে দিল৷ কাঁদো-কাঁদো মুখ করে বলল, 'বিনুদি, আমার চুমকিকে দেখেছ? চুমকি পালিয়ে গেছে কাল৷'

বিনু বলল, 'চুমকি কে রে?'

ন্যাকামি দেখে গা জ্বলে যায় টুকুনের৷ সে রাগ চেপে বলল, 'আমার শালিখ পাখি বিনুদি৷ দেখনি তাকে?'

বিনু মুখটিপে হেসে বলল, 'তাই বল৷ একটু আগে নদীর ঘাটে ভারু পাটনির ছেলে নোটনের কাছে একটা শালিখ পাখি দেখলুম৷ গিয়ে খোঁজ নে তো!'

টুকুন দৌড়োল৷ নদীর ঘাটে নৌকোয় বসে ভারু মাঝি হুঁকো খাচ্ছে আর খক খক করে কাশছে৷ বলল, 'কী খোকাবাবু? ওপারে যাবে নাকি? এসো, পার করে দিই৷'

টুকুন বলল, 'নোটন কোথায় মাঝি? তাকে খুঁজছি৷'

ভারু বলল, 'নোটন? সে তো ওপারের বনে গোরু চরাতে গেল৷'

টুকুন ব্যস্ত হয়ে বলল৷ 'মাঝি, আমাকে শিগগির পার করে দাও৷' আসল কথাটা ফাঁস করল না৷ ভারু যদি পার না করে? ভারু তাকে পার করে দিল৷ ওপারে মেঠো পথের দু-ধারে সবুজ ধান খেত৷ এদিক-ওদিক বন-বাদাড়৷ টুকুন দেখল বনের ধারে একপাল গোরু চরছে৷ তাহলে ওখানেই নোটন আছে৷ টুকুন আবার দৌড়োল৷

কিন্তু কোথায় নোটন? একটা গাছের তলায় একদল রাখাল ছেলে খেলা করছে৷ তারা বলল, নোটনকে তারা দলে নেয় না৷ নোটন খুব একানড়ে ছেলে৷ সে তাই একলা গোরু চরায়৷ ওই তো তার বাঁশির সুর শোনা যাচ্ছে৷

বাঁশির সুর যেদিক থেকে আসছে, সেদিকে গভীর বন৷ টুকুনের এবার একটু ভয় করছিল৷ তবু সে মরিয়া হয়ে ছুটে চলল৷ শরৎকালের আকাশ জুড়ে টুকরো টুকরো মেঘ ভাসছে৷ কাশ বনে সাদা ফুলের মেলা বসেছে৷ এই রোদ, এই ছায়া৷ ফুরফুরে বাতাস বইছে৷ সবুজ ঘাসের পাতায় রং-বেরঙের ঘাসফড়িং কিরকির করে গান গাইছে৷ নালার ধারে এক পায়ে বসে থাকা বকটা টুকুনের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকাল৷ যেন বলল, 'কে হে তুমি, এখন ঝামেলা করতে এলে?'

নালা পেরোবে কেমন করে? টুকুন নালার ধার দিয়ে দৌড়ে ঝিলের সামনে পড়ল৷ থমকে দাঁড়াল৷ এই কি সেই ডাইনির ঝিল-যেখানে পদ্মপাতায় বসে রোদ্দুরে চুল শুকোয় এক আদ্যিকালের বুড়ি ডাইনি? তার নীল চোখ নাকি জ্বলজ্বল করে৷ ছেলেপুলে দেখলেই সে চোখ দিয়ে রক্ত চুষে খায়৷ টুকুনের বুক ঢিপ ঢিপ করল৷ সে ভয়ের চোখে তাকিয়ে রইল ঝিলের দিকে৷

কিন্তু ডাইনিটা নেই৷ ঝিলের জলে কত পাখি৷ মনের সুখে সাঁতার কাটছে৷ মাঝে মাঝে ডানা শনশন করে ঝাঁক বেঁধে ওড়াওড়ি করছে৷ টুকুন ভাবল, এই কি তাহলে পাখিদের দেশ?

হঠাৎ কে ভারী গলায় বলে উঠল, 'কে ওখানে?'

চমক খেয়ে টুকুন ঘুরে দেখল, ঝাঁকড়া আর বেঁটে একটা গাছের তলায় এক বুড়োমানুষ বসে আছে৷ টুকুনও ভয়ে ভয়ে বলল, 'আমি টুকুন৷ নোটনকে খুঁজে বেড়াচ্ছি৷ সে আমার চুমকিকে ধরেছে৷ নোটন কোথায় বলতে পার?'

বুড়ো হাসতে লাগল৷ তারপর বলল, 'নোটন? ওই শোনো সে বাঁশি বাজাচ্ছে৷ কিন্তু চুমকি কী খোকাবাবু?'

'চুমকি আমার শালিখ পাখির নাম৷' বলে টুকুন আবার পা বাড়াল৷

বুড়ো বলল, 'হুঁ, নোটনের কাছে একটা শালিখ পাখি দেখেছি বটে!'

বাঁশির সুর গভীর বনের ভেতরে৷ টুকুন যত যায়, তত মনে হয় বাঁশির সুর দূরে সরে যাচ্ছে৷ বনের ভেতর ঘন ছায়া৷ পাখপাখালি ডাকছে৷ ঝিঁঝি পোকা ডাকছে৷ নোটনের বাঁশির সুর সমানে শোনা যাচ্ছে৷ কিন্তু কোথায় নোটন? হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে গেল টুকুন৷ তেষ্টায় গলা শুকিয়ে গেল৷ সে ধুপ করে বসে পড়ল৷

কতক্ষণ পরে তার কানে এল কেউ তার নাম ধরে ডাকাডাকি করছে৷ টুকুন উঠে দাঁড়াল৷ তারপর দেখল, ছোটোমামা আর সেই বুড়ো মানুষটা হন্তদন্ত হয়ে এদিকেই আসছেন৷ টুকুন গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল৷

ছোটোমামা বললেন, 'তোকে খুঁজে খুঁজে সারা৷ বাড়ি আয় হতভাগা ছেলে!'

টুকুন গোঁ ধরে বলল, 'নোটনের কাছে আমার চুমকি আছে যে!'

ছোটোমামা হাসলেন৷ 'না, না৷ তোর চুমকি ফিরে এসেছে দেখবি আয়!'

টুকুন লাফিয়ে উঠল৷ বুড়ো বলল, 'হুঁ, পোষা পাখি৷ যাবে কোথায়? বনের পাখি তো আর তাকে দলে নেবে না৷ তবে নোটনের একটা শালিখ পাখি আছে৷ ওই শোনো, নোটন কেমন বাঁশি বাজাচ্ছে৷'

যেতে যেতে ছোটোমামা গান শুনে বললেন, 'বেশ বাজায় তো ছেলেটা৷ কোথায় বসে বাজাচ্ছে?'

বুড়ো বলল, 'সেটাই বলা কঠিন৷ নোটন তো এক জায়গায় থাকে না৷'

বাড়ি ফিরে টুকুন দেখল চুমকি খাঁচার ভেতর মনমরা হয়ে বসে আছে৷ তাকে দেখে কিচিরমিচির করে বলল, 'তোমার মন খারাপ হবে বলে ফিরে এলুম, টুকুন! নইলে আকাশে উড়ে বেড়ানোর যা মজা!'

টুকুন বলল, 'না চুমকি৷ তোকে আর সব সময় খাঁচায় ভরে রাখব না৷ নোটনের মতো তোকে সঙ্গে করে রোজ নদীর ওপারে নিয়ে যাব৷ সেখানে কত পাখি জানিস তো?'

তারপর সে মায়ের কাছে গিয়ে বলল, 'ও মা! আমি একটা বাঁশের বাঁশি কিনব যে! পয়সা দাও!'

নদীর ওপারে ঝিলের ধারে গভীর বন৷ টুকুনের ইচ্ছে করছে, সেই বনে গিয়ে রাখাল ছেলের মতো বাঁশি বাজাবে৷ আর তার কাঁধে বসে থাকবে চুমকি! কী মজাই না হবে! ছোটোমামা খুঁজতে গেলে তাকে খুঁজেই পাবেন না, অথচ তার বাঁশির সুর শুনতে পাবেন৷ সে এক দারুণ লুকোচুরি খেলা!

Cov8
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%