জুতোরহস্য

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov25

ভদ্রলোক দরজার পর্দার ফাঁকে উঁকি মেরে কাঁচুমাচু মুখে বললেন, 'জুতোপায়ে ঢুকতে পারি স্যার?'

'নিশ্চয় পারেন৷ তবে খুলে রেখে এলেও আপনার নতুন জুতো চুরি যাবে না, সে গ্যারান্টি আমি দিতে পারি৷'

'অ্যাই! তাহলে যথাস্থানেই এসেছি৷' বলে ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলেন৷ তারপর সোফায় বসে পাঞ্জাবির পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখ মুছলেন৷ 'আমার ভাগনে গোকুল, স্যার, আপনি চেনেন ওকে-বাবুগঞ্জ ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার৷ আপনার ঠিকানা দিয়ে বলল, এর কিনারা করতে আপনিই পারবেন৷'

'জুতো চুরির?'

'আজ্ঞে৷'

'ক-জোড়া চুরি গেছে এ পর্যন্ত?'

'তিন জোড়া৷' ভদ্রলোক করুণমুখে বললেন, 'এ বাজারে এক জোড়া চামড়ার জুতোর দাম চিন্তা করুন স্যার৷ এক সপ্তায় তিন-তিন জোড়া জুতো লোপাট৷ গত রোববার থেকে শুরু৷ রোববার সন্ধ্যে বেলায়৷ তারপর বিস্যুতবার ঠিক সেই সন্ধ্যে বেলায় আবার লোপাট৷ শুক্কুরবার ফের কিনলুম৷ ফের সেদিনই সন্ধ্যে বেলা লোপাট হয়ে গেল৷ এ কেমন চোর স্যার? সবার জুতো ঠিকঠাক পড়ে থাকে, আর আমার জুতোই ব্যাটাচ্ছেলে নিয়ে পালায়? নতুন জুতো তো আরও কত লোকে পরে যায়৷ তাদের জুতো ভুলেও ছোঁয় না৷ খালি আমার জুতো!'

'ঠাকুরবাড়ির দরজা থেকে?'

'ঠিক ধরেছেন স্যার৷ রাজাদের ঠাকুরবাড়ি৷ কবে ওঁরা কলকাতায় চলে এসেছেন৷ দালান-কোঠা সবই ধসে পড়েছে৷ শুধু ঠাকুরবাড়িটাই কোনোরকমে টিকে ছিল৷ পোড়ো খাঁ-খাঁ অবস্থা৷ দেবতার নামে জমি আছে৷ কিন্তু পুজোআচ্চা বন্ধ ছিল৷ সেবায়েত থাকলে কী হবে? পায়ে বাত৷ চলাফেরা করতে পারে না৷ নিজের ঘরে শুয়েই নমো নমো৷ বুঝলেন তো স্যার?'

'বুঝলুম৷ তারপর কোনো সাধুসন্ন্যাসীর আবির্ভাব হল ঠাকুরবাড়িতে?'

'অ্যাই!' ভদ্রলোক নড়ে বসলেন৷ 'গোকুল যা বলছিল ঠিকঠাক মিলে যাচ্ছে৷'

'তিনি আসার পর রোজ সন্ধ্যে থেকে শাস্ত্রপাঠ-কথকতা-কীর্তনের আসর বসছিল?'

'আজ্ঞে৷' ভদ্রলোক আবার নড়ে বসলেন৷ 'গোকুল যা বলছিল...'

'আপনার নাম কী?'

'পাঁচুগোপাল সিংহ৷'

'আপনার বাবার নাম?'

'আজ্ঞে যদুগোপাল সিংহ৷ তিনি আমার ছোটোবেলায়...'

'আপনার ঠাকুরদার নাম?'

'জয়গোপাল সিংহ৷'

'তিনি কী করতেন?'

'তিনি রাজবাড়ির খাজাঞ্চি ছিলেন৷'

'খাজাঞ্চি?'

'আজ্ঞে হ্যাঁ৷ খাজাঞ্চি মানে ক্যাশিয়ার স্যার! আজকাল খাজাঞ্চি বললে...'

'আপনার বাবা কী করতেন?'

'রাজবাড়ির সেরেস্তাদার-মানে অ্যাকাউন্টেন্ট ছিলেন৷'

'আপনি কী করেন?'

'রেলে টিকিট চেকার ছিলুম৷ গত মাসে রিটায়ার করে পৈতৃক বাড়িতে এসে উঠেছি৷ বিয়ে-টিয়ে করিনি৷ আমার বিধবা দিদি-গোকুলের মা স্যার! দিদিই আমাদের বাড়িতে থাকত৷ আমি আসার পর সে গোকুলের সরকারি কোয়ার্টারে চলে গেছে৷ অত করে বললুম৷ থাকল না৷ বলে কী, আর এ বাড়িতে ভূতের অত্যাচার সইতে পারব না৷'

'ভূতের অত্যাচার?'

'আজ্ঞে!' ভদ্রলোক চাপা গলায় বললেন, 'রাতবিরেতে কীসব অদ্ভুত শব্দ৷ কুকুর চ্যাঁচালেই থেমে যেত৷ তবে প্রথম প্রথম গা করিনি৷ শেষে শান্তি-স্বস্ত্যয়ন করালুম৷ তাতেও কাজ হল না৷ এমন সময়-'

'সাধুবাবার আবির্ভাব৷ কাজেই তাঁর শরণাপন্ন হলেন?'

'হলুম৷ কিন্তু সাধুবাবার কৃপায় ভূতের অত্যাচার যদি-বা বন্ধ হল, হঠাৎ এই আরেক উপদ্রব শুরু হয়ে গেল৷ জুতো চুরি! তিন-তিন জোড়া জুতো স্যার৷'

'সাধুবাবা কোনো আশকারা করতে পারলেন না?'

ভদ্রলোকের মুখে এতক্ষণে আতঙ্কের ছাপ ফুটে উঠল৷ 'আশকারা করতে গিয়েই সাংঘাতিক সব কাণ্ড স্যার৷ কাল শনিবার সকালে ঠাকুরবাড়ির যে ঘরটায় সাধুবাবা থাকতেন, সেই ঘরের বারান্দায় চাপ চাপ রক্ত দেখা গেল৷ সারা বাবুগঞ্জ হুলুস্থুলু৷ পুলিশ এল৷ রক্তের ছাপ পেছনকার দরজার ঘাটেও পাওয়া গেল৷ নীচে গঙ্গা৷ পুলিশ বলল, বডি গঙ্গায় ফেলে দিয়েছে৷ আমি এর মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারছিলুম না৷ শেষে গোপনে গোকুলকে সব বললুম৷ তখন গোকুল-'

'আপনার বাড়িতে আর কে থাকে?'

'কেউ না স্যার! আমি একা থাকি৷ স্বপাক খাই৷ বরাবর নিজের কাজ নিজে করার অভ্যাস আছে৷'

'আপনি যে রোজ সন্ধ্যেয় বাড়ি থেকে সাধুবাবার আসরে যেতেন-'

'কাছেই স্যার৷ খুব কাছে৷'

'হ্যাঁ৷ কিন্তু আপনার কি মনে হত না বাড়িতে চোর ঢুকতে পারে?'

ভদ্রলোক হাসার চেষ্টা করে বললেন, 'ভুলো, স্যার! ভুলোর চ্যাঁচানি যে একবার শুনেছে, সে-ই কানে আঙুল গুঁজে পালাবে৷'

'ভুলো কোনো কুকুরের নাম?'

'আজ্ঞে৷ ঠিক ধরেছেন৷ গোকুল যা-যা বলছিল-'

'ভুলোকে আপনি কোথায় পেলেন?'

'দিদির পোষা দিশি কুকুর৷ দিদি চলে গেলেও ভুলো চলে যায়নি৷'

'তাহলে ভুলো এখন আপনার বাড়ি পাহারা দিচ্ছে?'

'অ্যাঁ?' ভদ্রলোক চমকে উঠলেন৷ 'তাই তো! ওর কথা কাল থেকে আমার খেয়ালই নেই৷ ভুলোকে আমি কাল থেকে দেখেছি, না দেখিনি? হুঁ, দেখিনি৷ কী আশ্চর্য! ভুলো কি তাহলে দিদির কাছে চলে গেছে? অকৃতজ্ঞের কাণ্ড দেখেছেন?'

'আপনি ফিরে গিয়ে ওর খোঁজ নিন৷ দেরি করবেন না৷'

পাঁচুগোপালবাবু তড়াক করে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর আর একটি কথাও না বলে হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন৷...

এতক্ষণ চুপচাপ বসে এইসব কথা শুনছিলুম৷ এবার দেখলুম আমার বৃদ্ধ বন্ধু প্রকৃতিবিদ এবং রহস্যভেদী কর্নেল নীলাদ্রি সরকার চোখ বুজে সাদা দাড়িতে হাত বুলোচ্ছেন৷ চওড়া টাক বড্ড বেশি চকচক করছে৷ একটু হেসে বললুম, 'আশ্চর্য কর্নেল! আপনি অন্ধকারে ঢিল ছোড়েন এবং দিব্যি সেই ঢিল লক্ষ্যভেদও করে৷'

কর্নেল চোখ খুলে জোরে মাথা দোলালেন৷ 'অন্ধকারে? নাহ জয়ন্ত৷ আমি আলোতেই ঢিল ছুড়েছি৷'

'জুতো চুরির কথা আপনি জানতেন তাহলে?'

'নাহ৷ ভদ্রলোককে আমি কস্মিনকালেও চিনি না৷ তবে গঙ্গার ধারে ডাকবাংলোর কেয়ারটেকার গোকুলবাবুকে চিনি৷ গত এপ্রিলে বাবুগঞ্জে উনি আমাকে কয়েকটা অর্কিডের খোঁজ দিয়েছিলেন৷' কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুটটা যত্ন করে ধরিয়ে বললেন, 'জুতোর ব্যাপারটা তুমিও আঁচ করতে পারতে, যদি ওঁর কথাগুলো লক্ষ করতে৷ তাক বুঝে প্রশ্ন করলে সঠিক উত্তর বেরিয়ে আসে৷'

'কিন্তু সাধুবাবার ব্যাপারটা?'

'ডার্লিং! বরাবর দেখে আসছি, কাগজের লোক হয়েও তুমি কাগজ খুঁটিয়ে পড় না৷ তোমাদের 'দৈনিক সত্যসেবক' পত্রিকাতেই বাবুগঞ্জের সাধুবাবা নিখোঁজ এবং রক্তের খবরটা বেরিয়েছে৷'

'বেশ৷ কিন্তু কুকুরের ব্যাপারটা?'

'পাঁচুগোপালবাবুর মুখেই শুনেছ, কুকুর চ্যাঁচালে ভূতুড়ে শব্দ থেমে যেত৷ কাজেই একটা কুকুর থাকার চান্স ছিল৷'

'তাহলে ভূত আসলে জুতো চুরি করতেই আসত৷'

'বাহ৷' কর্নেল হাসলেন৷ 'ক্রমশ তোমার বুদ্ধি খুলে যাচ্ছে৷'

'রীতিমতো রহস্যজনক ঘটনা৷ কুকুরটাও নিপাত্তা হয়ে গেল সাধুবাবার মতো?'

'এবং তিন জোড়া জুতোও নিপাত্তা হয়ে গেছে৷'

'কিন্তু কুকুরের জন্য ভদ্রলোক প্রায় গুলতির বেগে বেরিয়ে গেলেন কেন বলুন তো?'

কর্নেল আমার কথায় কান দিলেন না৷ আবার চোখ বুজে ইজিচেয়ারে হেলান দিলেন এবং চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে ওঁকে আপনমনে বিড়বিড় করতে শুনলুম, 'খাজাঞ্চি! আগের দিনের রাজা খেতাবধারী বড়ো জমিদারদের খাজাঞ্চিখানা থাকত৷ ট্রেজারি! খাজাঞ্চি ঠিক ক্যাশিয়ার নয়, ট্রেজারার৷ সে আসলে খুব সম্মানজনক পদ৷ তবে খুব আস্থাভাজন লোক হওয়া চাই৷ আস্থা! খুব গুরুত্বপূর্ণ এই শব্দটা-আস্থা৷'

ষষ্ঠীচরণ আর এক প্রস্থ কফি রেখে গেল৷ বললুম, 'কর্নেল! কফি!'

'হ্যাঁ৷ কফি খেয়েই আমরা বেরোব৷' কর্নেল চোখ খুলে কফির পেয়ালা তুলে নিলেন৷ তারপর মিটিমিটি হেসে বললেন, 'আমরাও গুলতির বেগে বেরিয়ে যাব৷ বাসে মাত্র ঘণ্টা তিনেকের জার্নি৷ পৌঁছেই লাঞ্চ খাওয়া যাবে৷'

বাবুগঞ্জ গঙ্গার ধারে বেশ জমকালো শহর৷ টেলিফোন এক্সচেঞ্জও আছে৷ সরকারি ডাকবাংলো শহরের শেষ প্রান্তে৷ গাছপালা-ঘেরা নিঝুম নিরিবিলি পরিবেশ৷ কেয়ারটেকার গোকুলবাবু যেন জানতেন কর্নেল তাঁর মামাবাবুর কাছে খবর পেয়েই ছুটে আসবেন৷ তাই সুস্বাদু ইলিশ সহযোগে চমৎকার একখানা মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা করে রেখেছিলেন৷ খাওয়ার পর উনি ইনিয়েবিনিয়ে রাজমন্দিরে এক সাধুবাবার আকস্মিক আবির্ভাব এবং রহস্যময় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্ণনা করলেন৷ শেষে বললেন, 'মামাবাবুর মাথায় ছিট আছে৷ মা এতকাল দাদামশাইয়ের ভিটে আগলে রেখেছিলেন৷ এত বলেও আমার কোয়ার্টারে আনতে পারিনি৷ তারপর মামাবাবু রিটায়ার করে বাড়ি ফিরলেন৷ অমনই নাকি ভূতের উপদ্রব শুরু হল৷ আসলে ভূত-টুত, জুতো চুরি বোগাস৷ মামাবাবুর পাগলামিতে অতিষ্ঠ হয়েই মা অগত্যা আমার কাছে চলে এসেছিলেন৷ কিছুক্ষণ আগে মামাবাবু আপনার কাছ থেকে ফিরে আবার এক পাগলামি করতে এসেছিলেন৷ খামোকা ঝগড়াঝাঁটি!'

কর্নেল বললেন, 'ভুলোর জন্যে?'

'আপনি শুনেছেন?' গোকুলবাবু হাসলেন৷ 'ভুলো মায়ের পোষা দিশি কুকুর৷ কিন্তু আমি থাকি সরকারি কোয়ার্টারের দোতলায়৷ ভুলো বিলিতি হলে কথা ছিল৷ তা ছাড়া যা বিচ্ছিরি চ্যাঁচায়৷ মামাবাবুর ধারণা, ভুলো মায়ের কাছে পালিয়ে এসেছে৷ এলেও এই এরিয়ায় ঢুকবে কেমন করে? এক এরিয়ার কুকুর অন্য এরিয়ায় গেলে কুকুরগুলো তাকে ঢুকতে দেবে?'

চলে যাওয়ার আগে গোকুলবাবু জানিয়ে গেলেন, তাঁর মামাবাবুর জুতো চুরির ব্যাপারটা নয়, সাধুবাবার হত্যা রহস্যের ব্যাপারে তাঁর খটকা লেগেছিল৷ সেইজন্যই ওঁকে কর্নেলের কাছে পাঠিয়েছিলেন৷

বাসজার্নির ধকল এবং লাঞ্চের পর ভাতঘুমের অভ্যাস আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল৷ কর্নেলের ডাকে উঠে বসলুম৷ গঙ্গার ওপারে সূর্য সবে অদৃশ্য হয়েছে৷ দিনের আলো কমে গেছে৷ চারদিকে পাখিরা তুমুল চ্যাঁচামেচি করছে৷ কর্নেল পিঠ থেকে কিটব্যাগ খুলে টেবিলে রেখেছিলেন৷ জিজ্ঞেস করলুম, 'প্রজাপতি ধরতে বেরিয়েছিলেন, না কি অকির্ডের খোঁজে?'

'নাহ৷ জুতোর খোঁজে৷'

হেসে ফেললুম৷ 'আপনি কি ভেবেছিলেন চোর আপনাকে পাঁচুগোপালবাবুর জুতো ফেরত দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে?'

'কতকটা তা-ই৷' কর্নেল তুম্বো মুখে বললেন৷ 'তবে এভাবে ফেরত দেবে ভাবিনি৷'

অবাক হয়ে বললুম, 'কীভাবে?'

'জুতো মেরে৷' কর্নেল চুরুট ধরিয়ে বিষণ্ণভাবে বললেন, 'হ্যাঁ৷ জুতো মারা আর কাকে বলে? ছ-পাটি ছেঁড়া পামশু আমাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারা৷ একপাটি আমার টাকে পড়তে যাচ্ছিল৷ মাথা না সরালে পেরেকে রক্তারক্তি হয়ে যেত৷ সোল ওপড়ালে সব জুতোরই পেরেক বেরিয়ে থাকে৷ যেই একটা নীলকন্ঠ পাখি দেখতে মুখ তুলেছি, অমনই টুপিটা পড়ে গেছে৷ সঙ্গে সঙ্গে জুতো ছুড়েছে!'

'বলেন কী! কোথায়?'

'রাজবাড়ির ধ্বংসস্তূপের ভেতর৷ চিন্তা করো জয়ন্ত, সোল-ওপড়ানো পেরেক-বেরোনো জুতো৷'

'সোল-ওপড়ানো জুতো?' আরও অবাক হয়ে বললুম, 'তাহলে কি পাঁচুগোপালবাবুর জুতোর ভেতর কিছু লুকোনো ছিল?'

'পর পর তিন জোড়া জুতো চুরি যাওয়ার কথা শুনেই সেটা তোমার মাথায় আসা উচিত ছিল৷ বিশেষ করে সেকালের এক জমিদারবাড়ির ট্রেজারারের পৌত্রের জুতো৷'

এই সময় উর্দিপরা একটা লোক ট্রেতে কফি নিয়ে এল৷ সে সেলাম দিয়ে চলে যাচ্ছিল৷ কর্নেল ডাকলেন, 'রামহরি!' সে কাছে এলে কর্নেল বললেন, 'তুমি তো এখানকার লোক৷ রাজমন্দিরের সেবায়েত ঘনশ্যামবাবুর বাড়িতে কে কে আছে এখন?'

রামহরি বলল, 'ঠাকুরমশাইয়ের তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে৷ ছেলে নেই! এখন শুধু গিন্নিঠাকরুন আছেন৷ ঠাকুরমশাই তো বাতের অসুখে বিছানায় পড়ে আছেন৷'

'ঠাকুরমশাইয়ের কোনো ভাই বা জ্ঞাতি নেই?'

'এক ভাই ছিল৷ বনিবনা হত না৷ ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে চলে গিয়েছিল৷ সে প্রায় তিন-চার বছর আগের কথা স্যার৷ শুনেছি সে জেলখানায় আছে৷ চুরি-ডাকাতি করে বেড়াত৷ সেই নিয়েই তো দাদার সঙ্গে ঝগড়া৷'

'ঠিক আছে৷ তুমি এসো রামহরি৷'

রামহরি চলে গেলে কর্নেল চুপচাপ কফি খেতে লাগলেন৷ তারপর বললেন, 'চলো৷ ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি যাই৷'

বিদ্যুতের আলোয় বাবুগঞ্জ ঝলমল করছিল৷ বড়ো রাস্তায় পৌঁছে কর্নেল একটা সাইকেলরিকশো নিলেন৷ সন্ধ্যেরাতেও প্রচণ্ড ভিড়৷ রিকশোওয়ালা অনেক ঘিঞ্জি গলি পেরিয়ে একখানে থেমে বলল, 'আর যাওয়া যাবে না স্যার৷ পায়ে হেঁটে চলে যান৷ আমি বলেই এলুম৷ অন্য কেউ কিছুতেই আসবে না৷'

কর্নেল বললেন, 'কেন হে? ভূতের ভয়ে নাকি?'

রিকশোওয়ালা কপালে-বুকে হাত ঠেকিয়ে বলল, 'ঠাট্টাতামাশার কথা নয় স্যার! এই তল্লাটে দিনদুপুরে কেউ পা বাড়ায় না আজকাল৷ যাচ্ছেন যান৷ তবে সাবধানে যাবেন৷'

সে রিকশো ঘুরিয়ে উধাও হয়ে গেল৷ এদিকটায় বিদ্যুৎ নেই৷ কর্নেল টর্চ জ্বেলে এগিয়ে গেলেন৷ ওঁকে অনুসরণ করলুম৷ ধ্বংসস্তূপ আর জঙ্গল৷ একফালি আঁকাবাঁকা পথ৷ সামনে মিটমিটে আলো জ্বলছিল৷ কর্নেলের টর্চের আলোয় একটা জরাজীর্ণ এক-তলা বাড়ি দেখা গেল৷ কাছে গিয়ে উনি ডাকলেন, 'ঠাকুরমশাই আছেন নাকি?'

দরজা খুলে এক প্রৌঢ়া ভদ্রমহিলা লন্ঠন হাতে বেরিয়ে কর্নেলকে দেখে যেন চমকে উঠলেন৷ কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, 'কোত্থেকে আসছেন আপনারা?'

কর্নেল বললেন, 'কলকাতা থেকে আসছি৷ একটা কথা বলেই চলে যাব৷'

'উনি তো অসুস্থ৷'

'নাহ৷ কথাটা আপনার সঙ্গে৷'

'আমার সঙ্গে? কী কথা?'

'আপনি কি ঠাকুরবাড়িতে সাধুবাবার আসরে যেতেন?'

ভদ্রমহিলা আবার চমকে উঠেই সামলে নিলেন৷ 'কেন সে-কথা জিজ্ঞেস করছেন বাবা? আপনারা কি পুলিশের লোক? আমরা কোনো সাতে-পাঁচে থাকি না৷'

'আমার কথার জবাব দিলে খুশি হব৷ ঠিক জবাব না পেলে কিন্তু ঝামেলায় পড়বেন৷'

কর্নেলের কথার ভঙ্গিতে ভয় পেয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা৷ বললেন, 'আমরা তো কারও কোনো ক্ষতি করিনি বাবা!'

'আপনি কি সাধুবাবার আসরে যেতেন?'

ঠাকুরমশাইয়ের স্ত্রী আস্তে বললেন, 'একদিন গিয়েছিলুম৷'

'শুক্রবার সন্ধ্যেয়?'

'হ্যাঁ বাবা৷'

'কতক্ষণ ছিলেন আসরে?'

'যতক্ষণ ভাগবত পাঠ হল, ততক্ষণ ছিলুম৷'

'সবাই চলে গেলে আপনি কি চুপিচুপি সাধুবাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন?'

ভদ্রমহিলা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বললেন, 'হ্যাঁ৷ তা-'

'আপনি তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন কেন?'

ঠাকুরমশাইয়ের স্ত্রী চুপ করে থাকলেন৷

'বলুন৷ তা না হলে ঝামেলায় পড়বেন কিন্তু৷'

এই সময় ঘরের ভেতর থেকে খ্যানখেনে গলায় কে বলে উঠল, 'বলে দাও না, এত ভয় কীসের? ভূতো নিজের পাপের শাস্তি পেয়েছে৷ একদিন-না-একদিন সে খুন হতই৷ যা হয়েছে পুলিশকে বলে দাও সব কথা৷'

কর্নেল একটু হেসে বললেন, 'সাধুবাবাকে আপনি চিনতে পেরেছিলেন৷ তাই না? সেইজন্যই চুপিচুপি তার সঙ্গে দেখা করেছিলেন৷ কী বলেছিলেন আপনি তখন আপনার ভূতোঠাকুরপোকে?'

ভদ্রমহিলা কেঁদে ফেললেন৷ 'ওকে বললুম, আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি আর কিছুদিন থাকলে আরও অনেকে চিনে ফেলবে৷ তুমি শিগগির পালিয়ে যাও ঠাকুরপো! হঠাৎ সেই রাত্তিরে ঠাকুরপো খুন হয়ে গেল৷ চাপ চাপ রক্ত!'

কর্নেল বললেন, 'আপনার ঠাকুরপো ভূতনাথের নামে পুলিশের হুলিয়া জারি করা আছে৷ এলাকায় কয়েকটা ডাকাতির মামলা ঝুলছে তার নামে৷'

'জানি৷ সেইজন্যই তো-'

'হ্যাঁ৷ তাই তাকে চিরদিনের জন্য বেঁচে যাওয়ার একটা ফন্দি দিয়েছিলেন৷ আপনার বুদ্ধির প্রশংসা করছি৷'

কথাটা বলেই কর্নেল হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে থাকলেন৷ আমি হতবাক হয়ে ওঁকে অনুসরণ করলুম৷...

বাংলোয় ফিরে দেখি, পাঁচুগোপালবাবু অপেক্ষা করছেন৷ কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ৷ কর্নেলকে দেখে উত্তেজিতভাবে বললেন, 'অনেক খুঁজে পেয়ে গেছি স্যার! আপনি যা বলেছিলেন, ঠিক তা-ই৷'

কর্নেল বললেন, 'জুতো?'

'আজ্ঞে৷' বলে পাঁচুগোপালবাবু ব্যাগে হাত ঢোকালেন৷

'এখানে নয়৷ আমার ঘরে চলুন৷'

ঘরে ঢুকে পাঁচুগোপালবাবু ব্যাগ থেকে দু-পাটি পামশু বের করলেন৷ জীর্ণ বেরঙা ছেঁড়া বেঢপ জুতো৷ বললেন, 'ঠাকুরদার সিন্দুকের তলায় লুকোনো ছিল স্যার৷ ঠাকুরদার জুতোই মনে হচ্ছে৷ ইস! কী বিচ্ছিরি গন্ধ৷'

কর্নেল জুতোজোড়া নিয়ে খুঁটিয়ে দেখে টেবিলে রাখলেন৷ বললেন, 'এবার আপনাকে একটা কাজ করতে হবে৷ রাজবাড়ির ওদিকটায় এতক্ষণে ঘন অন্ধকার৷ আপনি সেখানে গিয়ে এই গানটা গাইবেন-'

'গা-গান? আমি স্যার গান গাইতে পারি না যে!'

'চেষ্টা করবেন৷ নিন, মুখস্থ করুন:

চলে আয় ওরে ভূতো

পায়ে দিবি রাঙা জুতো৷'

পাঁচুগোপালবাবু অনিচ্ছা অনিচ্ছা করে আওড়ালেন৷ তারপর করুণমুখ করে বললেন, 'কে-কেন গান গাইতে হবে স্যার? আমার তো মাথায় কিছু ঢুকছে না!'

'আপনার জুতোচোর ভূতটাকে ধরতে হবে না? তিন-তিন জোড়া জুতো চুরি করেছে সে৷ তাকে ধরা উচিত নয় কি?'

এই সময় একজন পুলিশ অফিসার ঘরে ঢুকে হাসিমুখে বললেন, 'বডি পাওয়া গেছে কর্নেলসায়েব! শকুনে প্রায় সাবাড় করেছে৷ তবে স্কেলিটনটা আছে৷ বেশি দূরে ভেসে যায়নি৷ মাত্র দু-কিলোমিটার দূরে একটা খাড়িতে ভাসছিল৷ মুণ্ডু-কাটা বডি৷'

পাঁচুগোপালবাবু লাফিয়ে উঠলেন, 'সাধুবাবার বডি?'

কর্নেল বললেন, 'নাহ৷ আপনার ভুলোর৷'

পাঁচুগোপালবাবু আর্তনাদ করলেন, 'হায়, হায়৷ ভুলোকে কে মারল?'

'ভূতো৷' বলে কর্নেল উঠলেন৷ 'আপনার ঠাকুরদার জুতোজোড়া নিন৷ চলুন, ভূতোকে ফাঁদে ফেলা যাক৷'

পুলিশ-জিপ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল৷ অফিসার কর্নেলের সঙ্গে চুপিচুপি পরামর্শ করে চলে গেলেন৷ কর্নেল পাঁচুগোপালবাবুকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চললেন৷

ঘুরঘুট্টে অন্ধকার এলাকা৷ এবার কর্নেল টর্চ জ্বালছিলেন না৷ কিছুক্ষণ পরে একটা কালো ঢিবির পাশে গুঁড়ি মেরে বসলেন৷ তারপর পাঁচুগোপালবাবুকে চাপাস্বরে বললেন, 'সামনে দাঁড়িয়ে জোরে গানটা শুরু করুন৷'

ভদ্রলোক কেশে গলা সাফ করে হেঁড়ে গলায় সুর ধরে আওড়ালেন:

'চলে আয় ওরে ভূতো

পায়ে দিবি রাঙা জুতো৷'

বারকতক গাওয়ার পরে কালো ছায়ামূর্তি ভেসে উঠল ওঁর সামনে৷ খোনা গলায় বলে উঠল, 'এঁনেছিস? দেঁ! দেঁ!'

পাঁচুগোপালবাবু চেঁচিয়ে উঠেছিলেন আতঙ্কে৷ 'ওরে বাবা! এ যে দেখছি সত্যিই ভূ-ভূ-ভূত!'

অমনিই এদিক-ওদিক থেকে টর্চের আলো জ্বলে উঠল৷ একটা সাধুবাবার চেহারার লোক পালানোর জন্য লাফ দিতেই কর্নেল গিয়ে তাকে ধরে ফেললেন৷ দু-জন কনস্টেবলকে দেখলুম লোকটার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল৷ কর্নেল তাঁর দাড়ি-জটা উপড়ে নিয়ে বললেন, 'ছদ্মবেশী সাধুবাবাকে চিনতে পারছেন না পাঁচুগোপালবাবু? রাজমন্দিরের সেবায়েত ঘনশ্যামবাবুর ছোটো ভাই ভূতনাথ৷ আপনার ভুলোর মুণ্ডু কেটে রক্ত ছড়িয়ে আত্মগোপন করেছিল৷ আপনার ঠাকুরদার দু-পাটি জুতোর সোলের ভেতর লুকিয়ে রাখা দশটা সোনার মোহরের খবর বহুদিন আগে ভূতনাথ পেয়েছিল আপনার দিদির কাছে৷ আপনার দিদি কথায় কথায় মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন ওকে৷ পরে বুদ্ধি করে বলেছিলেন, সেই মোহর আপনার জুতোর সোলে লুকোনো আছে৷ তখন আপনি রেলের চাকরি করেন৷ ট্রেনে ট্রেনে ঘোরেন৷ ভূতনাথ তাই সুযোগ পায়নি৷ আপনি রিটায়ার করে বাড়ি ফেরার পর তাই সে আপনার জুতো চুরির ধান্দা করেছিল৷ যাই হোক, চলুন৷ বাংলোয় ফেরা যাক৷'

Cov26
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%