সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

হরিপদ খুব বিপদে পড়েছে৷ সবসময় মুখ ভার৷ খেতে-শুতে-চলাফেরা করতে সুখ নেই৷ ঘুমিয়ে স্বস্তি নেই৷ তার নাকি লেজ গজাচ্ছে৷
হ্যাঁ, লেজ৷ পিঠের দিকে শিরদাঁড়ার নীচে যে তেকোনা হাড়টা আছে, সেখানেই ব্যাপারটা ঘটছে৷
সবচেয়ে মুশকিলটা হল, কথাটা কাকেও বলা যাচ্ছে না৷ এইতে হরিপদ আরও মনমরা হয়ে পড়েছে৷ বিপদ-আপদ ঘটলে অন্যকে জানালেও খানিকটা সুখ পাওয়া যায়, সে সাহায্য করুক বা না করুক৷ কিন্তু এমন গুরুতর কথা বলতেই যে লজ্জা করে৷ তা ছাড়া বললেও কি কেউ তার লেজ গজানোটা ঠেকাতে পারবে?
প্রথমে ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল এভাবে৷
এক সকালে হঠাৎ হরিপদ টের পেয়েছিল, শিরদাঁড়ার নীচের তেকোনা হাড়টায় কেমন একটা অস্বস্তি, আর চুলকোনি৷
সেই যে শুরু হল, চুলকোনি চলতেই থাকল৷ হরিপদ সারাক্ষণ সেখানে হাত দেয়৷ শেষে তিতিবিরক্ত হয়ে পাড়ার ডাক্তারবাবুর কাছে গেল৷
ডাক্তারবাবু একটা ওষুধ লাগাতে দিলেন বটে, কিন্তু কাজ হল না৷ তখন হরিপদ গেল তারককবরেজের কাছে৷ হরিপদ বরাবর ডাক্তারের চেয়ে কবরেজদেরই বিশ্বাস করে৷
কবরেজমশাই আতশকাচ দিয়ে জায়গাটা দেখে গম্ভীর মুখে বললেন, 'হুঁ!'
হরিপদ বলল, 'কী হয়েছে কবরেজমশাই?'
কবরেজমশাই বললেন, 'আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে ওই হাড়টাকে বলে পিকচঞ্চু অস্থি৷ কেন বলে জান? ওটা পিক অর্থাৎ কোকিলের চঞ্চুর মতো৷ চঞ্চু মানে কী জান?'
হরিপদ মাথা নাড়ল৷
'চঞ্চু মানে ঠোঁট৷ কোকিলের ঠোঁট দেখেছ? দেখনি? তুমি মহামূর্খ৷'
হরিপদ মনে মনে রাগ করলেও চুপ করে থাকল৷ সে তত মূর্খ নয়৷ গরিব লোকের ছেলে বলে পয়সার অভাবে বেশিদূর পড়াশোনা হয়নি৷ তবে যেটুকু হয়েছে, তাই-বা মন্দ কী? সে এখন ফার্গুসন কোম্পানির আপিসে ছোটোসায়েবের খাস বেয়ারা৷ ছোটোসায়েব তাকে খুব স্নেহ করেন৷ কত বকশিশ দেন৷
তারককবরেজ বলেছিলেন, 'দেখো বাপু, তোমার পিকচঞ্চু অস্থিতে যা দেখছি, লক্ষণ বড়ো ভালো নয়৷ তুমি কি কখনো হনুমান মেরেছিলে?'
হরিপদ অবাক হয়ে বলেছিল, 'হনুমান? না তো!'
'তাহলে নিশ্চয় পাটকেল ছুড়েছিলে৷'
হরিপদ ছেলেবেলায় গ্রামে থাকত৷ তাদের গ্রামে হনুমান ছিল অনেক৷ সে আর সব ছেলেদের সঙ্গে জুটে হনুমান তাড়াত, ঢিল ছুড়ত বটে৷
হরিপদ মাথা চুলকে বলেছিল, 'হনুমানের কথা কেন কবরেজমশাই?'
তারককবরেজ গলার স্বর চাপা করে বলেছিলেন, 'বলছি কি সাধে? তোমার মতো ঠিক একই রোগ হয়েছিল নরহরিউকিলের৷ সেও হনুমানকে ঢিল ছুড়ে এই বিপদ বাধিয়েছিল৷ শেষে আদালতে যাওয়া বন্ধ করতে হয়েছিল বেচারিকে৷'
হরিপদ ভয়ে ভয়ে বলেছিলেন, 'কেন, কেন?'
তারকবাবু বলেছিলেন, 'তুমি মূর্খ৷ লেজ নিয়ে কেউ আদালতে যেতে পারে?'
'লেজ?' হরিপদ ভ্যাবাচ্যাকা একেবারে৷
'হ্যাঁ, লেজ! হনুমানের লেজ!' তারককবরেজ বলেছিলেন৷ 'সাড়ে তিন ফুট লেজ কম কথা নয়৷ তাকে গুটিয়ে যত ছোটোই করো, পেছনটা ফুলে থাকবে৷'
তা তো থাকবেই৷ কিন্তু নরহরিউকিলের লেজ গজিয়েছিল বলে হরিপদরও গজাবে নাকি? হরিপদ কাঁপতে কাঁপতে বলেছিল, 'আমারও কি লেজ গজাবে নাকি কবরেজমশাই?'
'হুঁ, গজাবে৷'
'ওরে বাবা! লেজ নিয়ে ছোটোসায়েবের কাছে যাব কেমন করে?' হরিপদ প্রায় কেঁদে ফেলছিল৷ 'আর রাস্তায় নামলেই ছেলেপুলেরা পেছনে লাগবে৷'
তারককবরেজ ফ্যাঁচ করে হেসে বলেছিলেন, 'তা তো লাগবেই৷ নরহরিউকিল কি সাধে আদালতে যাওয়া ছেড়েছিল? যাক গে, যা বলছি শোনো৷ এই লেজ গজানো রোগের একটাই ওষুধ আছে৷ কিন্তু সে-ওষুধ জোগাড় করা বড়ো ঝকমারি৷ তেত্রিশ টাকা তেত্রিশ পয়সা খরচ হবে৷'
হরিপদ তাতে পিছপা নয়৷ তিনশো তেত্রিশ বললেও রাজি হত৷ ওরে বাবা! মানুষের লেজ গজানোর মতো বিপদ আর কী থাকতে পারে?
তেত্রিশ টাকা তেত্রিশ পয়সা দিয়ে এসেছিল হরিপদ৷ তারপর কথামতো দিন তিনেক পরে গেল কবরেজের কাছে৷
তারককবরেজ বললেন, 'বাপস! তোমার লেজ গজানো ঠেকাবার ওষুধ আনতে আমার যা কষ্ট গেল, বলার নয়৷ হুতুমপুরের নাম শুনেছ? সেখানে বনজঙ্গল ঢুঁড়ে নিয়ে এলুম, তারপর বটিকা তৈরি করলুম৷ মলম বানালুম৷ রোজ রাত্তিরে শোবার সময় একটা করে বড়ি খাবে৷ আর এই মলমটা মাখাবে পিকচঞ্চু হাড়ে৷ এক মাস পরে ফের ওষুধ দেব৷...'
তারপর দিন সাতেক ওষুধ খেয়েছে এবং মলম লাগিয়েছে হরিপদ৷ তবু সেইরকম চুলকাচ্ছে৷ তার ওপর কী একটা ঠেলে বেরোচ্ছেও যেন৷ তাহলে কি ওষুধে কাজ হচ্ছে না?
আপিসে তাকে দেখে ছোটোসায়েব বলেন, 'কী হরিপদ? অসুখবিসুখ করেছে নাকি?'
হরিপদ আসল কথাটা তো বলতে পারে না৷ শুধু বলে, 'একটু জ্বর মতো হয়েছে স্যার!'
'তাহলে আপিসে এসেছ কেন? ছুটি নাও৷'
শেষ পর্যন্ত ছুটিই নিতে হল হরিপদকে৷ ততদিনে তার সেই মারাত্মক জিনিসটা ইঞ্চিটাক উঁচু হয়ে ঠেলে বেরিয়েছে৷ কবরেজের কাছে যাওয়া দরকার৷ কিন্তু সেই সময় হঠাৎ মনে পড়ে গেল, তাদের গ্রামে একজন কবরেজ আছেন বটে! গ্রামের কবরেজ বলে তারকবাবুর মতো নামডাক নেই৷ কিন্তু হাজার হলেও হরিপদর গ্রামের মানুষ৷ যত্ন করে দেখবেন বই কী৷ হরিপদ সেদিনই গ্রামে চলে গেল৷...
হরিপদর এক পিসি ছাড়া গ্রামের বাড়িতে আর কেউ নেই৷ পিসিকে সে মাসে মাসে টাকা পাঠায়৷ পিসি তো হরিপদকে দেখে ভারি খুশি৷ কিন্তু ওর হাবভাব দেখে ভড়কে গেল৷ বলল, 'ও হরে, তোর কী হয়েছে? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন?'
হরিপদ হাসবার চেষ্টা করে বলল, 'ট্রেনে-বাসে এসেছি তো, তাই বড্ড ক্লান্ত৷ আচ্ছা পিসিমা, গাঁয়ে আজকাল আর হনুমান আসে?'
পিসি বলল, 'হনুমান? কোথায় হনুমান? আর কি সে রামরাজত্ব আছে রে? সব হনুমান কোথায় পালিয়েছে! আর শুধু হনুমান কেন, আজকাল শেয়াল-টেয়ালও আর নেই৷ এমনকী আগের মতো পাখিও দেখতে পাইনে!'
'কেন, কেন?'
'পাপে৷ মানুষের পাপে৷ বুঝলি হরে? মানুষের এত পাপ যে পাখপাখালি জন্তুজানোয়ার সবাই মানুষকে ঘেন্না করে পালিয়ে গেছে!'
হরিপদ গম্ভীর হয়ে বলল, 'তা যাই বলো পিসিমা, হনুমান পালিয়েছে বলেই না তোমার মাচানে অত লাউ শশা কুমড়ো ফলে রয়েছে৷ হনুমান থাকলে সব খেয়ে ফেলত না কি?'
অমনি পিসি মুড়ো ঝাঁটা তুলে বলল, 'হুঁ, খেয়ে ফেললেই হল৷ ঝাঁটা ছুড়ে মারব না মুখে?'
হরিপদ বলল, 'আচ্ছা, ধরো কথার কথা বলছি, যদি আমি-মানে এই হরে হঠাৎ হনুমান হয়ে যাই...৷'
এটুকু শুনেই পিসি খিলখিল করে হেসে বলল, 'ওরে, থাম থাম৷ তুই হনুমান হবি কী রে হরে? বালাই ষাট! তুই কেন মুখপোড়া হনুমান হবি, শুনি?'
হরিপদ বলল, 'ধরো, যদি হই?'
পিসি একটু ভেবে বলল, 'তুই হনুমান হলে একটার বেশি শশা খাসনে কিন্তু! তার বেশি খেলে আমার রাগ হবে৷'
'তাই হবে৷ তা পিসি, আমি যদি মুখ ভেংচাই তোমাকে?'
পিসি ফের খিলখিল করে হাসল, তারপর বলল, 'আমিও ভেংচাব৷ শুধু কি ভেংচাব? সেই ছড়াটাও গাইব,
এই হনুমান কলা খাবি?
জয়-জগন্নাথ দেখতে যাবি?'
হরিপদ বলল, 'আমি যদি রাতারাতি হনুমান হয়ে যাই, তাহলে কিন্তু ভড়কে যেয়ো না পিসি৷ গাঁয়ে তো আর হনুমান নেই৷ কাজেই যদি কোনো হনুমান হঠাৎ দেখতে পাও, জেনো সে তোমার ভাইপো এই হরে৷ বুঝলে তো?'
পিসি এতক্ষণে একটু অবাক হয়ে বলল, 'তা ও হরে, এসব কথা কেন বলছিস বাবা? বালাই ষাট! তুই হনুমান হতে যাবি কোন দুঃখে?'
হরিপদ আমতা হেসে বলল, 'কিছু বলা যায় না পিসিমা৷'
'থাম হতচ্ছাড়া ছেলে! আয় খাবি আয়!'
হরিপদ চুপচাপ বাড়ির উঠোনে বিশাল নিম গাছটার দিকে তাকিয়ে রইল৷ যদি লেজটা গজিয়ে যায়, সে তো হনুমান হয়ে যাবে৷ তখন ওই গাছে গিয়ে উঠবে৷ কিন্তু গাছটায় নাকি ভূত আছে৷ ছেলেবেলায় সে সেই ভূতটার ভয়ে সন্ধ্যে বেলায় গাছটার দিকে তাকাতেই পারত না৷ কপালের ফেরে যদি হনুমান হয়ে ওঠে, ভূতটার সঙ্গে ভাব করে নিতেই হবে৷
পিসি রান্নাঘরে রান্না করছে৷ ঠিক দুপুর বেলা৷ হরিপদ পাশের পুকুরে গেছে স্নান করতে৷ পুকুরঘাটে ভিড় জমে আছে৷ হঠাৎ ভিড় থেকে একটা ছোট্ট ছেলে চেঁচিয়ে উঠল, 'ওরে! ওই দেখ, একটা হনুমান!'
আর সব ছেলে-মেয়েরা চেঁচিয়ে উঠল, 'এই হনুমান কলা খাবি? জয়-জগন্নাথ দেখতে যাবি?'
হইচই পড়ে গেল৷ গাঁয়ে কতকাল কেউ হনুমান দেখেনি৷ হঠাৎ পুকুরপাড়ে একটা হনুমান দেখে সবাই চেঁচিয়ে উঠল, 'হনুমান এসেছে! হনুমান এসেছে!'
হরিপদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে গেছে৷ তারপর টের পেল, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না, পিঠ টনটন করছে৷ সে সামনে দু-হাত নামিয়ে ঝুঁকল৷ তারপর দেখল, সর্বনাশ! তার মানুষের শরীরটা তো আর নেই! সারা গা ধূসর লোমে ঢাকা৷ আর পিঠের দিকে সেই 'পিকচঞ্চু'তে বিঘত খানেক লেজ গজিয়ে গেছে৷
মরিয়া হয়ে হরিপদ চেঁচিয়ে উঠল, 'উপ৷'
আরও সর্বনাশ! মানুষের ভাষাটাই যে আর বেরোচ্ছে না৷ হরিপদ যত কথা বলার চেষ্টা করছে, উপ আঁপ খ্যাঁকোর খ্যাঁক ছাড়া আওয়াজ বেরোচ্ছে না৷
এবার ছেলের পাল ঢিল ছুড়তে শুরু করল৷ হরিপদ রাগে-দুঃখে মুখ ভেংচাতে ভেংচাতে অশ্বত্থ গাছটায় গিয়ে উঠল৷
তাতেও কি রেহাই আছে? কে চেঁচিয়ে বলল, 'ওরে! ভুঁইয়ের কুমড়োগুলো সব শেষ করে ফেলবে যে! বন্দুকটা নিয়ে আয় তো!'
হরিপদ বিপদ টের পেল৷ আগের যুগ আর নেই৷ আজকাল মানুষ এত ধর্ম মানে না৷ হনুমান ফসল নষ্ট করে৷ কাজেই দরকার হলে বন্দুক ছুড়ে বসবে হয়তো!
ভয় পেয়ে হরিপদ তাদের বাড়ির দিকে দৌড়োল৷
কিন্তু যেই পাঁচিলে উঠে হনুমানের ভাষায় বলেছে, 'ও পিসিমা!' অমনি পিসি ভেংচি কেটে এবং মুড়ো ঝাঁটা দিয়ে সে ছড়া গাইতে শুরু করেছে৷
রাগে-দুঃখে হরিপদ ভাবল, নিকুচি করেছে গাঁয়ের লোকের! তার চেয়ে বরং কোনো রকমে যদি কলকাতা চলে যায় ফের, তাহলে অন্তত আলিপুর চিড়িয়াখানায় গিয়ে ঢুকতে পারলে আর ভয় নেই৷ অন্তত পেটের খাওয়াটা জুটবে৷
হরিপদ তো মানুষ হয়ে নেই যে বাসে চাপবার চেষ্ট করবে৷ সাত মাইল নাক বরাবর মাঠ বন-বাদাড় পেরিয়ে সে রেলস্টেশনে পৌঁছোল৷ প্লাটফর্মে একটা ঝাঁকড়া গাছে পাতার আড়ালে বসে ট্রেনের অপেক্ষা করতে থাকল৷
ট্রেনটা এলে সে উপ করে ছাদে চড়ে বসল৷ তারপর আর কী? আর হাওড়া স্টেশনে পৌঁছোনো ঠেকায় কে?
কিন্তু বিপদ হল ট্রেন থেকে নামার পর৷
হাজার হাজার লোক সবসময় স্টেশনে থইথই করছে৷ তাদের মধ্যে একটা হনুমান গিয়ে ঢুকলে কী হুলস্থুল না হবে! তাড়া খেয়ে হরিপদ সোজা উঠে পড়ল হাওড়া ব্রিজের মাথায়৷
কলকাতা শহরে এ-একটা ঘটনার মতো ঘটনা৷ এতকাল হাওড়া ব্রিজের মাথায় পাগলরা চড়ে ভেংচি কাটে৷ আজ কিনা একটা হনুমান চড়ে ভেংচি কাটছে৷ তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে লক্ষ লক্ষ লোক দাঁত বের করে ভেংচি কাটছে আর কাটছে৷
খবর পেয়ে খবরের কাগজের লোকেরা এল৷ ক্যামেরা এল, টিভি-র লোকেরাও এল৷ হরিপদর ছবি উঠতে থাকল ক্যামেরায়৷
কাল প্রথম পাতায় ছাপা হবে কাগজে৷ টিভিতে দেখানো হবে৷ এখন খালি হরিপদর সান্ত্বনা, মানুষ হয়ে তো এমন নাম ছড়াত না, ছবিও ছাপা হত না৷ ভাগ্যিস, লেজ গজিয়ে হনুমান হতে পেরেছে!
কিন্তু তারপর বিপদ এল৷
দমকল আর চিড়িয়াখানার লোকেরা এসে গেছে খবর পেয়ে৷ হরিপদ একেবারে ডগায় গিয়ে কুঁকড়ে বসে আছে৷
দমকলের লোকদের কত ফিকির আছে৷ খপ করে তাকে একটা খাঁচাকলে ঢুকিয়ে ফেলল এবং লম্বা মইয়ের সাহায্যে নামিয়ে আনল৷ তারপর গাড়ি চালিয়ে সোজা চিড়িয়াখানায় তুলল৷
যাক, বাঁচা গেল৷ নিরাপদে থাকা যাবে৷ খাওয়া-দাওয়াও মিলবে৷ লোকেরা খাঁচার কাছে এলে মনের সুখে ভেংচি কাটা যাবে৷ হরিপদ খুশি৷
কিন্তু সুখ তার বরাতে নেই৷ যেই না তাকে হনুমানের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে, অমনি হনুমানগুলো যেন চমকে উঠেছে৷
হরিপদ কোনায় বসে পিটপিট করে চমকে রইল৷ ওদের চোখে কেমন একটা সন্দেহ ফুটে বেরোচ্ছে যেন৷ সবচেয়ে ধেড়েটা অর্থাৎ পালের গোদা গম্ভীর মুখে হঠাৎ খ্যাঁক করে একটা ধমক দিল৷
হরিপদর এখন হনুমানের ভাষা বুঝতে অসুবিধে নেই!
গোদাটা তাকে বলছে, 'এই! তুই কোন ব্যাটারে?'
হরিপদ হনুমানের ভাষায় বলল, 'চিনতে পারছ না দাদা? আমি তোমাদেরই একজন৷'
'চালাকি হচ্ছে?' পালের গোদা তেড়ে এল৷ 'তোর গায়ে যে মানুষ মানুষ গন্ধ! তুই নিশ্চয়ই মানুষের ঘরে বড়ো হয়েছিস! ওরে জাতনাশা! তোকে গোবর খেতে-'
অন্য একটা হনুমান বলল, 'ওর লেজটাও কেমন বিচ্ছিরি! ছ্যা ছ্যা! এ কী লেজ?'
পালের গোদা হুকুম দিল, 'আয় তো সবাই মিলে টেনে ছিঁড়ি৷ ওর একটা ভালো লেজ দরকার৷'
হুকুম পেয়েই সব হনুমান হরিপদর লেজটা ধরে জয় রাম বলে যেমনি হাঁক মেরে দিয়েছে হ্যাঁচকা টান, অমনি লেজটাও গেছে খুলে৷ আর হরিপদও সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হয়ে উঠেছে৷
একদঙ্গল হনুমানের ভেতর একটা মানুষ ঢুকে পড়লে অবস্থা ভারি শোচনীয় হয়৷ হরিপদকে সবাই মিলে খামচাতে শুরু করল৷ দু-চারটে খুদে বাচ্চা হনুমান সুড়সুড়িও দিতে থাকল৷ হনুমানের ভাষায় চ্যাঁচাতে লাগল তারা, 'রাম! রাম! এটা যে মানুষ!'
হরিপদ লাফালাফি জুড়ে দিল এবং চ্যাঁচাতে থাকল, 'ওরে বাবা! ওরে বাবা! বাঁচাও! বাঁচাও!...'
হরিপদ তাকাল৷ পিসি দাঁড়িয়ে আছে বিছানার পাশে৷ বলল, 'ও হরে, স্বপ্ন দেখছিলি? ওঠ, ওঠ৷ কত বেলা হয়েছে৷'
হরিপদ এক লাফে উঠে বসল৷ স্বপ্ন দেখছিল? তাই বটে৷ কিন্তু পিঠের দিকে শিরদাঁড়ার নীচে ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়৷ ওই স্বপ্নটাই-বা সত্যি হতে বাকি থাকে কেন?
ওই তো তার ভবিষ্যৎ৷ সব স্পষ্ট দেখতে পেল৷ হরিপদ কাঁদো-কাঁদো মুখে বলল, 'ও পিসি, হারুকবরেজকে একবার খবর দাও না গো! আমার... আমার নাকি লে-লে-লে...'
হরিপদ মাঝে মাঝে তোতলামি করে৷ পিসি বলল, 'কেন রে? হারুদাকে কেন?' উঠোন থেকে সেই সময় কে ডাকল, 'ও হরে! কলকাতা থেকে এসেছিস শুনলুম, দেখা করতে যাসনি যে বড়ো?'
মেঘ না চাইতেই জল৷ হারুকবরেজ এসে গেছেন৷ ঘরে ঢুকতেই হরিপদ লুটিয়ে প্রণাম করল৷ তারপর বলল, 'ও পিসি, তুমি হারুজ্যাঠার জন্যে চা আনো৷ ততক্ষণে আমি অসুখটা দেখিয়ে নিই৷'
পিসি বেরোলে হরিপদ দরজা বন্ধ করে চাপা গলায় বলল, 'জ্যাঠামশাই, দেখুন তো এটা কী গজাচ্ছে শিরদাঁড়ার নীচে৷'
হারুকবরেজ দেখেই ফিক করে হেসে বললেন, 'ব্যাঘ্রস্ফোট!'
ওরে বাবা! হরিপদ আঁতকে উঠল৷ তারককবরেজ বলেছে যা, তাতে হনুমান হওয়ার সম্ভাবনা ছিল৷ হারুকবরেজ যা বলছেন, তাতে যে বাঘ হাওয়ার সম্ভাবনা আছে! হরিপদ ভয় পেয়ে বলল, 'বাঘের লেজ? ওরে বাবা! তাহলে তো সোঁদরবনেই গিয়ে ঢুকতে হবে?'
হারুকবরেজ বললেন, 'তোমার মাথা! ব্যাঘ্রস্ফোট মানে পাড়াগাঁয়ে যাকে বলে বাঘা ফোড়া৷ বুঝলে? তোমার ওটা ফোড়া হয়েছে৷ ভোগাবে৷ ঠিক আছে৷ ওষুধ দিচ্ছি৷ কালই ফেটে যাবে! ভেবো না৷ আসলে এ-বছর যা গরম পড়েছিল৷ ঘরে ঘরে সব্বাইর শুধু ফোড়া হচ্ছে৷'
হরিপদ এবার বাঘের মতো লাফ দিয়ে ফের কবরেজের পায়ের ধুলো নিল৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন