টাক এবং ছড়ি রহস্য

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Cov42

কাকতালীয় যোগ

সেদিন সকালে আমার প্রাজ্ঞ বন্ধু স্বনামধন্য কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের ডেরায় ঢুকে আমি অবাক৷ একটি ছোট্ট ডিমালো আয়না মুখের ওপর তুলে উনি নিজের বিশাল টাকটি খুঁটিয়ে দেখছেন৷ বললেন, 'এসো ডার্লিং৷ তোমার কথাই ভাবছিলুম৷'

বললাম, 'টাকের সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক?'

'আছে৷' কর্নেল আয়নাটি টেবিলে রেখে একটু হাসলেন৷ 'কারণ একটি বিজ্ঞাপন৷ যেটি তোমাদেরই দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় সম্প্রতি বেরিয়েছে৷ পড়ে দেখতে পার৷'

উনি একটা বিজ্ঞাপনের কাটিং এগিয়ে দিলেন৷ পড়ে দেখি বেশ মজার একটা পদ্য৷

টাক! টাক!! টাক!!!

ট্রাই ইয়োর লাক

যদি থাকে দাড়ি

সুফল তাড়াতাড়ি

ইন্দ্রোদ্ধার, দৈব চিকিৎসালয়

১১১/১পি খাঁদু মিস্তিরি লেন

কলকাতা-১৩

বি.দ্র.-আগে টাক পরীক্ষা করিয়ে তবে ভরতি৷ ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে৷ দরাদরি নিষিদ্ধ৷

বললুম, 'ইন্দ্রোদ্ধারটা বোঝা যাচ্ছে না তো?'

কর্নেল বললেন, 'ইন্দ্র মানে কালো চুল৷ তাই আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে টাক পড়াকে ইন্দ্রলুপ্ত বলা হয়৷'

'কিন্তু হঠাৎ টাক নিয়ে আপনি চিন্তিত কেন? এতদিন তো টাককে জ্ঞানী ও দার্শনিকের লক্ষণ বলে খুব গালভরা বুলি আওড়েছেন৷ আজ আবার-'

'কাক!' কর্নেল বিমর্ষমুখে বললেন৷ 'কাকের অত্যাচারে, জয়ন্ত! টাকের সঙ্গে কাকেরও গূঢ় সম্পর্ক আছে৷'

ষষ্ঠীচরণ ট্রেতে কফি আনছিল৷ কথাটা শুনে গম্ভীর মুখে বলল, 'এতবার করে মনে পড়িয়ে দিই, ছাদে যাবার সময় কেপ পরে যান৷ বাবুমশাই তবু কথাটা কানে করবেন না৷ কাকের দোষটা কী?'

কর্নেল চোখ কটমটিয়ে তাকালে ষষ্ঠী ট্রে রেখে কেটে পড়ল৷ ব্যাপারটা বুঝতে পারলুম৷ ছাদের বাগানে গিয়ে আবার কাকের ঠোকর খেয়েছেন৷ তবে বাগান না বলে জঙ্গল বলাই ভালো৷ যত রাজ্যের বিদঘুটে গড়নের ক্যাকটাস, উদ্ভুট্টে সব অর্কিড আর দুর্লভ প্রজাপতির ঝোপঝাড়৷ পাশের বাড়ির গা-ঘেঁষে ওঠা বুড়ো নিম গাছটা সম্ভবত কলকাতার কাকদের রাজধানী৷ তাড়ানোর জন্যে একবার পটকা ছুড়ে নাকি মামলা বাধার উপক্রম হয়েছিল৷ কফিতে চুমুক দিয়ে বললুম, 'ষষ্ঠী ঠিক বলেছে৷ আপনার টাককে কাকেরা পাকা বেল-টেল ভাবে৷ অবশ্য বেল পাকলে কাকের কী বলে একটা কথা চালু আছে৷'

কর্নেল কফির সঙ্গে চুরুটও টানেন৷ জ্বেলে নিয়ে ধোঁয়ার ভেতর বললেন, 'বেল কেন? তালের সঙ্গেও কাকের সম্পর্ক জুড়ে দিয়ে একটা কথা চালু আছে৷'

ঝটপট বললুম, 'জানি৷ কাকতালীয় যোগ৷ কাক এসে তাল গাছে বসল, সেই মুহূর্তে একটা পাকা তাল খসে পড়ল৷ নিছক আকস্মিক যোগাযোগ৷ লোকে যদি ভাবে কাকের সঙ্গে তাল পড়ার সম্পর্ক আছে, তাহলে এটা বোকামি৷'

'ডার্লিং, প্রাচীন ন্যায়শাস্ত্রে কাকতালীয় ন্যায় নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা আছে৷' কর্নেল সায় দেবার ভঙ্গিতে বললেন৷ 'যাই হোক, বিজ্ঞাপনটা দেখা অবধি মন ঠিক করতে পারছি না৷ কী করি তুমিই বলো!'

'যদি থাকে দাড়ি/সুফল তাড়াতাড়ি৷ আপনার দাড়ি আছে৷ অতএব ট্রাই ইয়োর লাক৷'

'তাহলে চলো! কফিটা শেষ করে এখনই বেরিয়ে পড়া যাক৷'

বেরিয়ে পড়া গেল না৷ কারণ কলিং বেল বাজল এবং আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই এক ভদ্রলোক আমাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে ঢুকে ধপাস করে সোফায় বসে পড়লেন৷ তারপর দু-হাতে মাথার চুল-কালো কোঁকড়া একরাশ চুল আঁকড়ে ধরে আর্তনাদের সুরে বলে উঠলেন, 'ওঃ টাক৷ হায় রে টাক৷'

কর্নেল হাঁ৷ আমিও হাঁ৷ তবে এটুকু বুঝলুম৷ এই হল কাকতালীয় যোগ৷ একেবারে হাতেনাতে আর কি৷...

টাক নিয়ে দুর্বিপাক

গরম কফি খাইয়ে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ভদ্রলোককে শান্ত-সুস্থ করা হল৷ তাঁর নাম মুরারিমোহন ধাড়া৷ ষাটের ওধারে বয়স৷ ঢ্যাঙা, রোগা গড়ন৷ বেজায় লম্বা নাক৷ মুখে গোঁফ-দাড়ি নেই৷ তবে মাথার চুল দেখার মতো-উজ্জ্বল কালো, মাঝখানে সিঁথি৷ পরনে ধুতি ও তাঁতের ছাইরঙা পাঞ্জাবি৷ পায়ে যেমন-তেমন একটি চটি৷ আর হাতে একটা ছড়ি৷ ছড়িটি কিন্তু সুন্দর৷

মুরারিবাবু যা বললেন, তা সংক্ষেপে এই:

দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকায় এই বিজ্ঞাপন দেখে গতকাল 'ইন্দ্রোদ্ধার দৈব চিকিৎসালয়ে' যান৷ একটা ঘিঞ্জি গলির ভিতর জরাজীর্ণ বাড়ি৷ কোনো ব্যবসায়ীর গুদাম বলে মনে হয়েছে৷ দোতলায় অ্যাজবেস্টসের ছাউনি দেওয়া ঘরের মাথায় নতুন সাইনবোর্ড ছিল৷ বেঁটে, হোঁতকা-মোটা, গোলগাল চেহারার ডাক্তারবাবুটি অবশ্য খুবই অমায়িক৷ উঁচু বেডে শুইয়ে মুরারিবাবুর টাক পরীক্ষা করে বলেন, 'ঠিক আছে৷ চলবে৷ তবে দাড়ি কামাতে হবে৷' মুরারীবাবুর তাতে আপত্তি ছিল না৷ ডাক্তারবাবু নিজেই যত্ন করে দাড়ি-গোঁফ কামিয়ে দেন৷ তারপর বলেন, 'চোখ বুজুন৷' মুরারিবাবু চোখ বোজেন৷ এরপর কী হয়েছে তাঁর জানা নেই৷ একসময় চোখ খুলে দেখেন, ঘরে আলো জ্বলছে৷ কেউ কোথাও নেই৷ উঠে বসেই সব মনে পড়ে৷ মাথায় হাত দিয়ে টের পান, টাক নেই, সারা মাথা চুলে ভরতি৷ খুশি হয়ে ডাক্তারবাবুকে ডাকাডাকি করেন৷ সাড়া না পেয়ে অবাক হন৷ ঘোরালো কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন অগত্যা৷ এই হল রহস্যের প্রথম পর্ব৷

দ্বিতীয় পর্ব কিন্তু মারাত্মক৷ মুরারিবাবু কলকাতায় সবে এসেছেন৷ রেলে চাকরি করতেন৷ পাটনায় থাকার সময় রিটায়ার করেছেন৷ কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে কলকাতার লেক প্লেসে বহু টাকা সেলামি দিয়ে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেছিলেন৷ দিন পাঁচেক আগে জিনিসপত্র নিয়ে উঠেছেন৷ একা মানুষ৷ স্বাবলম্বী৷ স্বপাক খান৷ গতকাল সন্ধ্যায় মাথার চুল গজানোর পর নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে গিয়ে দেখেন, অন্য কে একজন ঢুকে বসে আছে৷ কতকটা তাঁর মতোই চেহারা ও গড়ন৷ মাথায় টাক, মুখে দাড়িও আছে৷ মুরারিবাবুকে দেখে সে বলে, 'কাকে চাই?' মুরারিবাবু ভড়কে যান৷ তারপর হইচই বাধান৷ অন্যান্য ফ্ল্যাটের লোকেরা এসে পড়ে৷ তারা একবাক্যে রায় দেয়, এই কালো চুলের মুরারিবাবুকে তারা চেনে না৷ এমনকী ওপরতলা থেকে বাড়ির মালিক এসে পর্যন্ত শাসিয়ে বলেন, পুলিশ ডাকা হবে৷ বেগতিক দেখে মুরারিবাবু চলে আসেন৷ রাত্তিরটা হোটেলে কাটিয়ে এখন কর্নেলের শরণাপন্ন হয়েছেন৷ থানায় যাননি, তার কারণ তিনি এখন কীভাবে প্রমাণ করবেন যে তিনিই আসল মুরারিমোহন ধাড়া? কলকাতায় তাঁর আত্মীয়স্বজন দূরের কথা, চেনা লোকও নেই৷ থাকলেও কালো কোঁকড়া চুল গজিয়ে তাঁর চেহারাকে একেবারে বদলে দিয়েছে যে!

আর একটু রহস্য আছে৷ কর্নেলের কাছে আসার পথে 'ইন্দ্রোদ্ধার দৈব চিকিৎসালয়ে' গিয়েছিলেন, টাক পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় তো বটেই, কিন্তু গিয়ে দেখেন, ঘরে তালা৷ সাইনবোর্ড নেই৷ খোঁজ করলে কেউ কিছু বলতে পারল না৷ কর্নেলের কীর্তিকাহিনি মুরারিবাবু খবরের কাগজে পড়েছেন৷ দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকা থেকেই তাঁর ঠিকানা জোগাড় করেছেন৷ এই দুর্বিপাক থেকে তিনি ছাড়া আর কেউ তাঁকে উদ্ধার করতে পারবেন না বলে তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস৷

ছড়ি বদল পর্ব

ঘটনাটি শোনার পর গোয়েন্দাপ্রবর মন্তব্য করলেন, 'হুঁ, টাকের আমি, টাকের তুমি, টাক দিয়ে যায় চেনা৷'

বললুম, 'উহুঁ, গোঁফ৷ সুকুমার রায়ের 'গোঁফচুরি' পদ্যে আছে৷'

কর্নেল হাসলেন৷ 'যাই হোক, এক্ষেত্রে টাকচুরি নিয়েই সমস্যা বেধেছে৷' বলে মুরারিবাবুর দিকে তাকালেন৷ 'মুরারিবাবু, সেলফ-আইডেন্টিটি ব্যাপারটা সত্যিই গুরুতর৷ আমিই যে আমি, আপনি মুরারিবাবুই যে মুরারিবাবু, কোনো কোনো সময়ে প্রমাণ করা কঠিন হয়৷ তবে এ জন্য আদালত আছে৷'

মুরারিবাবু করুণ স্বরে বললেন, 'আছে৷ আদালতে তো যেতেই হবে৷ রেলের কর্তারা এবং আমার কলিগরা আছেন৷ নানা জায়গায় আমার আত্মীয়স্বজন আছেন৷ টেলিগ্রাম-ট্রাংকল করে সবাইকে ডাকব৷ ব্যারিস্টারের কাছে যাব৷ সবই করব৷ কিন্তু সে তো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার৷ কিন্তু ইতিমধ্যেই যে সর্বনাশ হবার তা হতে চলেছে৷ কারণ স্পষ্ট বুঝতে পারছি, বিজ্ঞাপন দিয়ে চক্রান্ত করে কেউ বা কারা আমার ফ্ল্যাটে ঢুকতে চেয়েছিল, এবং ঢুকে পড়েছে৷ কেন এ চক্রান্ত, কেন আমার ফ্ল্যাটে ঢুকেছে, সেটা নিয়েই আপাতত দুর্ভাবনা!'

'কেন?' কর্নেল সোজা হয়ে বসলেন৷ রহস্যের গন্ধটা এবার ঝাঁঝালো তো বটেই৷

মুরারিবাবু চাপাস্বরে বললেন, 'হিরে৷ একটা-দুটো নয়, তিন-তিনটে হিরে৷ দাম এ-বাজারে কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা৷'

কর্নেল নড়ে বসলেন৷ 'কোথায় রেখেছেন হিরেগুলো?'

মুরারিবাবু তাঁর কালো রঙের ছড়িটা দেখিয়ে বললেন, 'অবিকল এইরকম একটা ছড়ির ভেতরে৷ মাথাটায় প্যাঁচ আছে৷ সেজন্য ছড়িটা সব সময় হাতে রাখতুম৷ কাল বিজ্ঞাপনটা দেখেই তাড়াহুড়ো করে বেরোতে গিয়ে ছড়িটা নিতে ভুলে গিয়েছিলুম৷ বুঝলেন না? টাক পড়া অব্দি কলিগরা তো বটেই, যে দেখত ঠাট্টাতামাশা করত৷ বেজায় বিদঘুটে টাক কিনা৷ আপনার টাক অবশ্য মানানসই৷ তো-'

কর্নেল ওঁর কথার ওপর বললেন, 'এই ছড়িটা নতুন কিনেছেন, আসার পথে?'

'ঠিক ধরেছেন৷ নিউ মার্কেটের ওখান থেকে কিনে আনলুম৷' মুরারিবাবু ছড়িটা এগিয়ে দিলেন৷ ফিসফিস করে বললেন, 'ওরা হিরেগুলো খুঁজে হন্যে হচ্ছে৷ পাবে না৷ তবে বলা যায় না কিছু৷ যদি দৈবাৎ ছড়িটার বাঁট খুলে ফেলে-তার আগেই দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন৷ আপনার হাতে ধরে বলছি কর্নেল স্যার! আপনি সব পারেন৷ কোনো ছুতো করে এই ছড়ি হাতে আমার ফ্ল্যাটে গিয়ে আপনি আগে ঢুকুন৷ আলাপ জুড়ে দিন৷ তারপর আপনার এই অ্যাসিস্ট্যান্ট ভদ্রলোক গিয়ে কলিং বেল টিপবেন৷'

কর্নেল একটু হেসে বললেন, 'জয়ন্ত আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট নয়৷ খবরের কাগজের রিপোর্টার৷'

মুরারিবাবু সঙ্গেসঙ্গে আমাকে নমস্কার করে বলল, 'তাই বলুন! কাগজে কর্নেলের কীর্তিকলাপ তো আপনিই লেখেন৷ দারুণ আপনার লেখার হাত, মশাই!' বলে ফের ফিসফিসিয়ে উঠলেন৷ 'তাহলে তো আরও চান্স! রিপোর্টার যেতেই পারে ওখানে৷ কারণ একটা বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে৷ কে প্রকৃত মুরারিমোহন ধাড়া এই নিয়ে অন্তর্তদন্ত করা খুবই স্বাভাবিক৷ কর্নেল স্যার যাওয়ার মিনিট কতক পরে জয়ন্তবাবু যাবেন৷ জাল মুরারি তক্ক করবে দরজায় দাঁড়িয়ে৷ সেই ফাঁকে কর্নেল স্যার দেওয়ালের ব্র্যাকেটে-ঝোলানো ছড়িটা হাতিয়ে এই ছড়িটা রাখবেন৷ ব্যাটা টেরই পাবে না৷ বাকিটা সহজ৷'

ছড়িটা কর্নেল নিলেন৷ তারপর কুন্ঠিতভাবে বললেন, 'যদি কিছু মনে না করেন, আপনার চুল গজানোটা একটু দেখতে চাই৷'

মুরারিবাবু মাথা বাড়িয়ে বললেন, 'আলবাত দেখবেন৷ দেখুন! মিরাকল বলা যায়৷'

কর্নেল একটুখানি হেসেই বললেন, 'সত্যিই মিরাকল৷ ভেবেছিলুম, আঠা দিয়ে পরচুলা পরিয়েছে নাকি৷ তা নয়৷ প্রকৃত চুল৷ ঠিক আছে আপনি সন্ধ্যা ছ-টা নাগাদ আসুন৷'

মুরারিবাবু আশ্বস্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন৷ একটু পরে কর্নেল বললেন, 'তুমি সম্ভবত কী জিজ্ঞেস করার জন্য উশখুশ করছিলে, ডার্লিং!'

উত্তেজনা নিশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে গেল৷ বললুম, 'ছড়ি বদলানোটা রিস্কি হবে না? যদি দৈবাৎ-'

কথা কেড়ে কর্নেল বললেন, 'রিস্ক না নিলে রহস্য ভেদ করা তো সম্ভব হয় না ডার্লিং৷'

'কখন বেরোবেন ভাবছেন?'

কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে এবং অভ্যাসে সাদা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, 'যাবার সময় তোমার আপিস হয়ে তোমাকে ডেকে নেবখন৷'

হুঁকো বিষয়ক প্রবাদ

দৈনিক সত্যসেবক পত্রিকার আপিসে অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছি, কর্নেলের পাত্তা নেই৷ দুটোয় ফোন করলুম, ষষ্ঠী বলল, 'বাবামশাই তো লাঞ্চো খেয়েই বেইরেছেন৷' তিনটে বাজল৷ চারটে বাজল৷ পাঁচটায় উদবিগ্ন হয়ে বেরিয়ে পড়ার আগে আবার ফোন করলুম, ষষ্ঠী ফোন ধরে বলল, 'বাবামশাই এই মাত্তর ফিরেছেন৷ ছাদে গেছেন! কেপ পরেই গেছেন৷ বুঝলেন না কাগুজে দাদাবাবু? কাক-কাক৷' রাগে-অভিমানে ফোন রেখে ভাবলুম, 'এর অর্থ কী?' আমাকে নিয়ে বেরোনোর কথা৷ অথচ একা বেরিয়েছিলেন৷ হলটা কী?

যখন কর্নেলের তিন-তলার অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছোলুম, তখন প্রায় পাঁচটা বাজে৷ রাস্তায় যা জ্যাম৷ সটান ছাদে ওঁর 'প্ল্যান্ট ওয়ার্ল্ডে' চলে গেলুম৷ দেখলুম, একটা বিদঘুটে ক্যাকটাসের দিকে ঝুঁকে আছেন প্রকৃতিবিদ৷ মাথায় সত্যিই 'কেপ'৷ কাছে গিয়ে বললুম, 'আশ্চর্য মানুষ আপনি!'

কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন৷ মুচকি হেসে বললেন, 'আমার চেয়েও আশ্চর্য মানুষ বিস্তর আছে, ডার্লিং! চলো নীচে যাই৷ মুরারিবাবুর আসার সময় হয়েছে৷'

'আপনি গিয়েছিলেন ওঁর ফ্ল্যাটে? কী দেখলেন? ছড়িটা বদলাতে পারলেন?'

'হুঁউ৷ আসলে জয়ন্ত, টাক ও দাড়ির সঙ্গে টাক ও দাড়ির বন্ধুত্ব খুব ঝটপট গড়ে ওঠে৷ এটা বরাবর দেখে আসছি৷'

নীচের ড্রয়িং রুমে ঢুকে কর্নেল বাথরুমে গেলেন গার্ডেনিং-এর জোব্বা বদলে হাত ধুতে! শুনলুম গলা চড়িয়ে ষষ্ঠীকে কড়া কফির হুকুম জারি করেছেন৷ এই সময় কলিং বেল বাজল৷ দরজা খুলে দিলুম৷ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়লেন মুরারিমোহন ধাড়া৷ দম-আটকানো গলায় বললেন, 'গিয়েছিলেন? কাজ হয়েছে তো?'

কর্নেল পর্দা তুলে বললেন, 'বসুন, আসছি৷' তারপর অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷

মুরারিবাবু সোফায় বসে উদবিগ্ন মুখে বললেন, 'আমার ঠাকুরদার কেনা হিরে, জয়ন্তবাবু! এক সায়েব দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল মাইনিং বিজনেসে৷ ঠাকুরদাকে মাত্র দেড় হাজারে বেচেছিল৷ তা সেসব কথা পরে বলবখন৷ বলুন, খবর কী? আমার হার্ট ধুকপুক করছে খালি৷' বুকে হাত দিলেন মুরারিবাবু৷

কর্নেল সেইরকম একটি ছড়ি হাতে ফিরে এলেন৷ মুরারিবাবু খপ করে সেটি প্রায় কেড়ে নিয়ে বাঁটের প্যাঁচ ঘোরাতে শুরু করলেন৷ খিখি হেসে বললেন, 'জ্যাম হয়ে গেছে প্যাঁচ৷ বহুকাল খোলা হয়নি কিনা৷'

কর্নেল চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন, 'আগে একটু কফি খান পাঁচুবাবু! তারপর কথা হবে৷'

মুরারিবাবু চমকে উঠলেন৷ 'পাঁচুবাবু! ও কী বলছেন কর্নেল স্যার? আমার না-'

কর্নেল চোখ বুজেই বললেন, 'প্যাঁচ খুলবে না পাঁচুবাবু৷ কারণ ওটা আপনার কেনা সেই ছড়িটাই৷'

মুরারিবাবু কিংবা পাঁচুবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'কী অদ্ভুত রসিকতা!'

'রসিকতা আপনারও কম নয়, পাঁচুবাবু?' কর্নেল চোখ খুলে ফিক করে হাসলেন৷ 'আপনি আমার হাত দিয়ে আপনার মনিব মুরারিবাবুর হিরে চুরি করতে চেয়েছিলেন৷ একেই গ্রাম্য প্রবাদে বলে, অন্যের হাতে হুঁকো খাওয়া৷'

'মুরারিবাবু' কিংবা 'পাঁচুবাবু' দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই পাশের ঘরের অন্য দরজার পর্দা তুলে এক পাঞ্জাবিপরা ভদ্রলোক বেরোলেন৷ ঢ্যাঙা, মাথায় টাক, মুখে দাড়ি৷ তিনি 'তবে রে ব্যাটা পেঁচো৷' বলে গর্জন করে ঝাঁপ দিলেন এবং 'পাঁচুবাবু'র পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরলেন৷ তারপর একই দরজা দিয়ে বেরিয়ে এলেন এক পুলিশ অফিসার এবং দু-জন সেপাই৷ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেল৷ আমি হাঁ৷ তক্ষুনি দলটা বেরিয়ে গেলে ঘুরে কর্নেলের দিকে তাকালুম৷ স্বপ্ন না, সত্যি?

কর্নেল চোখ বুজে দুলতে শুরু করেছেন ফের৷ বললেন, 'হুঁ, একেই বলে পরের হাতে হুঁকো খাওয়া৷ মাঝখান থেকে পাঁচুবাবুর বিজ্ঞাপন-খরচটা গচ্চা গেল৷ লম্বা-চওড়া একটা গুলগল্পও কাজে এল না৷ ডার্লিং তোমার অবশ্য একটা বড়ো লাভ হল৷ বড়োবাজারের শিশি-বোতলের কারবারি মুরারিমোহন ধাড়ার কর্মচারী পাঁচু বা পঞ্চানন্দকে নিয়ে কাগজে দারুণ খবর হবে৷'...

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%