সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

সেই যারা বাংলা মুল্লুকের পাড়াগাঁয়ে রাতবিরেতের অন্ধকারে নিরিবিলি জায়গায় আলো জ্বেলে কীসব খুঁজে বেড়ায়, এই মার্কিনমুল্লুকে এসেও তাদের দেখা পেয়ে যাব ভাবতেও পারিনি৷
তফাতটা শুধু দেখলুম ভাষার৷ সেই একই রকম তিনটে আলো নিয়ে তিনটে ছায়ামূর্তি জলার ধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ নাকিস্বরে এক জন বলল, 'এখানে তো থাকার কথা৷ গেল কোথায়?'
অন্য জন বলল, 'ভালো করে খুঁজে দেখ না৷'
তৃতীয় জন বলল, 'কেউ মেরে দেয়নি তো?'
ভাষাটা ইংরেজি৷ এমনিতে বেশিরভাগ মার্কিন একটু নাকিস্বরে কথা বলে৷ এরা তো ভূত৷ গলার স্বর বেজায় রকমের খোনা৷
আমার সঙ্গী বব তেজি ছোকরা৷ ভূত বিশ্বাস করে না৷ সকাল-বিকেলে রোজ দেড় মাইল করে জগিং অর্থাৎ দৌড়ব্যায়াম করে৷ গাড়ি চালায় দুর্ধর্ষ বেগে৷ সে বলল, 'একটু অপেক্ষা করো৷ ওদের ডেকে আনি৷ মনে হচ্ছে, গাড়িটা ঠেলতে হবে৷ উনষাট বছর বয়সের এই বুড়োগাড়ির পক্ষে এমনটা হবেই৷'
উঁচু হাইওয়ের ডান ঘেঁষে আমাদের গাড়িটা দাঁড় করানো৷ ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত৷ কনকনে হাওয়া বইছে৷ ঠান্ডায় হিম হয়ে গেছি গাড়ি থেকে নেমেই৷ দূরে-বহু আলোর ফুটকি দেখা যাচ্ছে৷ হাইওয়েতে কয়েক ফার্লং অন্তর ল্যাম্পপোস্ট যদিও রয়েছে, আমরা থেমেছি দুই ল্যাম্পপোস্টের মাঝামাঝি জায়গায়৷
ইচ্ছে করে কি কেউ থামে? একেই বলে, যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যে হয়৷ বব হাইওয়ের ধারে ঢালু জমির দিকে পা বাড়াচ্ছে দেখে পিছু ডেকে বললুম, 'বব! বব! কথা শোনো!'
বব থেমে বলল, 'কী হল?'
'যাচ্ছ কোথায় তুমি? একটা কথা বলছি, শোনো৷'
নীচের দিকে আবছাভাবে একটা জল দেখা যাচ্ছে৷ নক্ষত্রের প্রতিবিম্ব পড়েছে৷ ঝিকমিক করে কাঁপছে৷ সেখানে তিনটে আলো ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছে৷ সেদিকে দেখিয়ে বব বলল, 'ওদের ডেকে আনি৷ তুমি কি একা ঠেলতে পারবে ভাবছ? তুমি তো বাতাসেই উড়ে যাচ্ছ দেখছি৷'
বব হাসছিল৷ বললুম, 'বব! ওরা কারা ভাবছ তুমি?'
বব সেদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, 'এখানে একটা গোরুর খোঁয়াড় আছে দেখেছি৷ ওরা খোঁয়াড়েরই লোক হবে৷ না হলে খামারবাড়ির চাষাভুসো৷'
দু-পা এগিয়ে চাপা গলায় বললুম, 'ওরা কী বলাবলি করছিল আমার কানে এসেছে বব৷'
এবার বব একটু চমকাল বুঝি৷ সেও গলা চেপে বলল, 'আমাদের ওপর ওরা হামলা করবে বলছিল নাকি? দেখো, হাইওয়েতে এমন হামলা প্রায়ই হয়৷ তবে আমাদের কাছে দামি কিছু তো নেই৷ তা ছাড়া আমার কাছে একটা অটোমেটিক রিভলবার আছে৷ ভেবো না৷'
বললুম, 'না না৷ আমার ধারণা, ওরা হয়তো মানুষ নয় বব!'
বব অবাক হয়ে বলল, 'মানুষ নয় মানে? তবে ওরা কী?'
'দেখো বব, তাহলে তোমায় অনেক গল্প বলতে হয়৷' ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে এবং ভূতঘটিত অস্বস্তিতে ব্যস্তভাবে বললুম, 'বরং হাইওয়েতে দাঁড়িয়ে থেকেই আমরা কোনো গাড়ি থামিয়ে সাহায্য চাইব৷'
বব, রাস্তার দু-দিক ঘুরে দেখে নিয়ে বলল, 'আশ্চর্য তো! এখন কোনো দিক থেকেই গাড়ি আসছে না৷ এ তো ভারি অস্বাভাবিক ব্যাপার৷ এটা এক আঃন্তরাজ্য হাইওয়ে৷ চব্বিশ ঘণ্টা গাড়ির বিরাম থাকে না৷ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন?'
'সেজন্যেই তো বলছি, গতিক ভালো নয়৷ এসো, আপাতত গাড়ির ভেতর ঢুকে সিগারেট টানি৷ ঠান্ডায় দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না৷'
বলে আমি গাড়িতে ঢুকে বসলুম৷ বব কিন্তু এল না৷ বলল, 'এদিকে লোকগুলোও চলে যাচ্ছে যে! হ্যাত্তেরি, তোমার কথার নিকুচি করেছে৷ বসো, এক্ষুনি আসছি৷'
সে দৌড়ে ঢাল বেয়ে নেমে গেল৷ নীচে জলার ধারের আলো তিনটে ওদিকে উঁচুতে উঠে এগিয়ে যাচ্ছে৷ কালো টিলামতো উঁচু জায়গার দিকে৷ একটু পরে কিন্তু তিনটে আলোই মিলিয়ে গেল৷ তখন বব ফিরে এসে বলল, 'ব্যাটাচ্ছেলেদের অত করে ডাকলুম৷ শুনতেই পেল না৷ দেখো দিকি, কী মুশকিলে পড়া গেল! ওহে, এক বার বেরিয়ে একটু ঠেলে দাও না, দেখি কী হয়৷ এসো এসো৷'
অগত্যা বেরোতে হল৷ বব এক পাশে দাঁড়িয়ে ঠেলতে ঠেলতে স্টার্ট দেবার চেষ্টা করল, অন্যদিকে আমি কাঁধ লাগালুম৷ কিন্তু গাড়ি কান্নার মতো শব্দ করতে থাকল শুধু৷ স্টার্ট নিল না৷ এই সেকেলে ১৯২১ সালের মডেল ভিনটেজ গাড়িটা তবু মায়াবশে বব ছাড়তে নারাজ৷
হতাশ হয়ে বব অন্ধকারে সেই কালো টিলাটার দিকে তাকিয়ে রইল৷ সেই সময় দেখলুম, এবার তিনটে নয়, মোটে একটা আলো নেমে আসছে জলার দিকে৷ আলোটা জলা অবধি এসে একবার থামল৷ তারপর আমাদের দিকে উঠতে থাকল৷ অস্বস্তি হচ্ছিল আমার৷ কিন্তু বব নেচে উঠল প্রায়৷ সে জোর গলায় ডেকে বলল, 'ওহে লোকটা, আরও একটু পা চালিয়ে এসো দিকি! বড্ড বিপদে পড়েছি আমরা৷'
আলোটা ঢালু জায়গায় থেমে গেল৷ তারপর খনখনে গলায় জিজ্ঞেস করল, 'কে তোমরা? হয়েছেটা কী?'
বব বলল, 'গাড়িটা স্টার্ট নিচ্ছে না৷ একটু ঠেলে দিলে বোধ হয় নেবে৷'
'আমার অত সময় নেই৷ কর্তার কুকুরের লেজ হারিয়ে গেছে৷ খুঁজে বেড়াচ্ছি৷'
'কী হারিয়েছে বললে?'
'লেজ৷' বলে আলোওয়ালা ছায়ামূর্তিটা গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পেরোতে থাকল৷
বব হাসতে হাসতে বলল, 'তুমি তো ভারি রসিক লোক দেখছি!'
আলোওয়ালা বলল, 'রসিকতা কী বলছ? প্রাণ নিয়ে টানাটানি৷ কর্তার যা মেজাজ৷ জিমের লেজ খুঁজে না আনলে চাকরি চলে যাবে৷'
আলোওয়ালা রাস্তার ওধারে গিয়ে মাঠে নামল৷ বব বলল, 'উঁহু উঁহু! এভাবে রাত কাটানোর মানে হয় না৷ তুমি অপেক্ষা করো, আমি ওর কর্তার কাছে গিয়ে সাহায্য চাই৷'
আমি তো ভুক্তভোগী যাকে বলে৷ বাংলার পাড়াগাঁয়ে একবার ঠিক এমন আলোওয়ালাদের পাল্লায় পড়ে যা ভুগেছিলুম কহতব্য নয়৷ এটা তো বিদেশবিভুঁই৷ একা এখানে থাকি, আর যে আলোওয়ালাটা সদ্য ওধারে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমাকে বাগে পেয়ে ঘাড় মটকাক আর কি! তাই বললুম, 'চলো বব৷ তোমার সঙ্গে আমিও যাই৷'
বব খুশি হয়ে বলল, 'এসো৷'
মনে একটা ভরসা হচ্ছে, দু-জন একসঙ্গে থাকলে ওরা সুবিধে করতে পারবে না৷ তা ছাড়া ববের গায়ে অসুরের জোর আছে৷ পকেটে রিভলবারও আছে, রিভলবারের গুলিতে ওদের ক্ষতি কিছু না হোক, আমরা অন্তত মনে সাহস পাব৷ রাতবিরেতে ভয় পেলে আওয়াজ একটা মোক্ষম দাওয়াই কিনা৷ সেজন্যেই নিয়ম আছে ভয় পেলে জোরে গান গাইতে হয় কিংবা আপন মনে কথা বলতে হয়৷ সাহস ছাড়া ভূতপ্রেতকে হারানোর আর কোনো উপায় নেই৷ ভয় পেয়েছি টের পেলেই ওরা ঘাড়টি মটকে দেবে৷ কাজেই ভূতের পাল্লায় পড়লেই হাবেভাবে দেখাতে হবে তুমি ভীষণ সাহসী৷ তাহলে উলটে ভূতই ভয় পেয়ে পালাবে৷
জলার ধার দিয়ে নরম ঘাসে-ঢাকা টিলায় উঠতে উঠতে বললুম, 'রিভলবারটা তৈরি রেখো কিন্তু৷ কিছু বলা যায় না৷'
বব বলল, 'না না৷ এরা চাষাভুসো লোক৷ বড্ড গোবেচারা৷'
'বব, কুকুরের লেজ খোঁজাখুঁজির ব্যাপারটা নিয়ে তোমার মনে সন্দেহ জাগছে না?'
'ওটা তো রসিকতা৷ তুমি মার্কিন চাষাভুসোদের হালচাল জান না৷ এরা ভারি রসিক৷'
'যে কর্তার কথা বলল, সে রসিক না হতেও পারে৷'
'চলো তো, দেখি লোকটা কেমন৷' বলে বব জগিংয়ের ভঙ্গিতে টিলাটা বেয়ে উঠতে থাকল৷
আমার হাঁপ ধরে যাবার দাখিল৷ তবে শিগগির থামতে হল আমাদের৷ সামনে ঘন গাছপালা৷ ততক্ষণে অন্ধকারে দৃষ্টি পরিষ্কার হয়েছে৷ একফালি পথ খুঁজে পেলুম৷ পথ ধরে একটু এগোলে কুকুরের ডাক শোনা গেল৷
কুকুরের ডাকটা সত্যি বলেই মনে হচ্ছিল আমার৷ ভূতদের কুকুর থাকতেও পারে৷ কিন্তু তারা কখনো ডাকে বলে শুনিনি৷ যত এগোচ্ছি, কুকুরটার হাঁকডাক তত বেড়ে যাচ্ছে৷ সামনে আবছা একটা বাড়ি দেখা যাচ্ছিল৷ কিন্তু কোনো আলো নেই৷ এমন তো হবার কথা নয়৷ এদেশে বিদ্যুৎ ছাড়া চলে না৷ শুধু আলো নয়, হাজার রকমের দরকারি কাজে বিদ্যুৎ লাগে৷
বব বলল, 'ভারি অদ্ভুত তো! মনে হচ্ছে, বাড়ির ভেতর কুকুরটাকে বেঁধে রেখে বাড়ির লোকেরা কোথায় বেরিয়েছে৷ কিন্তু আলো নেই কেন?'
এবার ফিসফিস করে বললুম, 'বব৷ সেজন্যেই তো তখন বলছিলুম, এরা মানুষ নয়৷'
বব আমার কথা শুনে হেসে উঠল৷ 'তখন থেকে তুমি মানুষ নয়, মানুষ নয় করছ কেন বলো তো?'
আসল কথাটা বলতে যাচ্ছিলুম, হঠাৎ বাড়ির সবগুলো আলো একসঙ্গে জ্বলে উঠল৷ কুকুরের ডাকটাও থেমে গেল৷ সামনে সুন্দর একটা কাঠের বাড়ি দেখতে পেলুম৷ ছোট্ট লনে একটা ফুলবাগিচাও দেখলুম৷ বব দৌড়ে গিয়ে বারান্দায় উঠল এবং দরজায় নক করল৷ আমি লনে দাঁড়িয়ে আলো-অন্ধকারে চোখ বুলিয়ে বিপজ্জনক কিছু আছে কি না খুঁজতে থাকলুম৷
দরজা ফাঁক করে এক বুড়ো ভদ্রলোক উঁকি মেরে বললেন, 'কী চাই?'
বব সবিনয়ে বলল, 'দেখুন, আমরা আসছিলুম সিডার র্যাপিড এয়ারপোর্ট থেকে৷ এক বন্ধুকে প্লেনে তুলতে গিয়েছিলুম৷ ফেরার পথে গাড়িটা বিগড়ে গেছে৷'
বুড়ো নির্বিকার মুখে বললেন, 'তা আমি কী করতে পারি?'
'দয়া করে যদি আপনার লোকেদের একটু বলেন...'
কথা কেড়ে ভদ্রলোক বললেন, 'আমার লোকেরা সবাই এখন কাজে বেরিয়েছে৷'
রাগী বব খাপ্পা হয়ে বলল, 'কুকুরের লেজ খুঁজতে বুঝি?'
আশ্চর্য ভদ্রলোক খিক খিক করে হাসলেন৷ 'তাহলে তো জানই দেখছি৷ আমার জিমের ওই এক দোষ, বুঝলে? বেড়াতে গিয়ে একটা-না-একটা কিছু কোথাও ফেলে আসবেই প্রত্যেক দিন৷ আজ তো লেজ ফেলে এসেছে৷ কাল এসেছিল সামনের বাঁ-ঠ্যাংটা ফেলে৷ হতভাগা খোঁড়াতে খোঁড়াতে বাড়ি ফিরছিল৷ শেষে অনেক খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া গেল একটা ওক গাছের মাথায়৷'
বব রাগ চেপে বলল, 'উড়ে গিয়ে আটকে ছিল বুঝি?'
'না, না৷' বুড়ো খুব হাসলেন৷ 'দুষ্টু বাজপাখির কাজ৷ ভাগ্যিস, পরদিন খাবে বলে বাসায় রেখে দিয়েছিল৷ নইলে জিম খোঁড়া হয়ে থাকত৷'
বলেই বুড়োর চোখ পড়ল আমার দিকে৷ বললেন, 'ওটা কে?'
চটপট বললুম, 'আমি ভারতের লোক৷ এদেশে বেড়াতে এসেছি৷'
দরজাটা পুরো খুলে ভদ্রভাবে বেরোলেন৷ মস্ত আলখাল্লার মতো কালো ওভারকোট গায়ে চাপানো৷ লম্বাটে চেহারা৷ নাকটা অসম্ভব খাড়া আর লম্বা৷ কোটরগত ছোট্ট দুটো চোখ৷ ভুরু, চুল, দাড়ি সব সাদা৷ হাত বাড়িয়ে বললেন, 'স্বাগত, সুস্বাগত! তুমি ভারতের লোক৷ এসো এসো৷ ভেতরে এসো৷ কী সৌভাগ্য আমার, এতকাল পরে একজন ভারতের লোক পাওয়া গেল৷ এসো, তোমায় আমার বড্ড দরকার৷'
বব তো হতভম্ব৷ কিন্তু বাইরে কনকনে ঠান্ডায় ততক্ষণে রক্ত যেন জমে গেছে৷ ভূত হোক, আর প্রেতই হোক, ঘরের ভেতর ঢোকাটাই এখন জরুরি৷
ভেতরটা সেকেলে আসবাবে ঠাসা৷ একপাশে ফায়ারপ্লেসও রয়েছে সাবেকি রীতিতে৷ কানট্রি এলাকায় মার্কিনদের ঘর গরম রাখার ব্যবস্থা সত্ত্বেও শখ করে ওরা সেকালের মতো ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালে এবং সেখানে বসে গল্পসল্প করে৷
বব গুম হয়ে বসে রইল৷ ভদ্রলোক বললেন, 'আমার নাম স্যাম বানভিল৷ এই এলাকায় লোকে আমাকে আংকল স্যাম-শ্যাম খুড়ো বলে ডাকে৷ হুম! আগে কফি খাও৷ পরে কথাবার্তা হবে৷'
দুধ চিনি ছাড়া কালো কফি খেতে আমি ততদিনে অভ্যস্ত৷ কিন্তু মুখে দিয়েই বুঝেছি, গণ্ডগোল আছে৷ রুমাল বের করে মুখ মোছার ছলে তরল পদার্থটুকু পাচার করে দিলুম৷ তারপর আড়চোখে দেখি, বব কাপ থেকে বাঁ-হাতের দুই আঙুলে সরু কী একটা টেনে তুলল৷ তুলে বলল, 'এটা কী শ্যামখুড়ো? বাজ পাখিটার আঙুল নাকি?'
শ্যামখুড়ো চোখ বুজে দুলতে দুলতে বললেন, 'না, না৷ ঘাসফড়িং৷'
বব বলল, 'চীনে পাখির বাসার ঝোল রান্না করে খায় শুনেছি৷ ঘাসফড়িং সেদ্ধ করে কফি খাওয়ার কথা জানা ছিল না৷ আশা করি ডিনারে আপনি ছুঁচোর রোস্ট এবং প্যাঁচার পালকের স্যালাড খেয়েছেন?'
শ্যামখুড়ো খিক খিক করে হেসে বললেন, 'তোমাদের আমি ডিনার খাওয়াতে পারতুম৷ তুমি ঠিকই ধরেছ৷'
বাঁচা গেল৷ মার্কিনরা রাতের খাওয়াটা সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে নেয়৷ কাজেই আমি আর বব শ্যামখুড়োর কাছে যদি ওই সময় আসতুম, কী খেতে হত ভেবে শিউরে উঠলুম৷ বব কফির কাপটা রেখে দিয়েছে ততক্ষণে৷ খুড়ো আপন খেয়ালে বসে বসে দুলছেন৷ নইলে নিশ্চয় আপত্তি করতেন এবং গিলতে বাধ্য করতেন৷ দেখাদেখি আমিও কাপটা রেখে দিলুম৷
এইসময় একটা প্রকাণ্ড কালো কুকুর নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে খুড়োর পায়ের কাছে বসল৷ অবাক হয়ে দেখলুম, তার লেজটা পুরোপুরি বাদ৷ লেজের জায়গায় একটা গর্ত মতো রয়েছে৷ কুকুরটার নীল জ্বলজ্বলে চোখ৷ সেই চোখে আমায় দেখছে দেখে ভীষণ ভড়কে গেলুম৷ কিন্তু ভড়কালে চলবে না৷ সাহস চাই, প্রচুর সাহস৷
বব কুকুরটাকে দেখে বলল, 'খুড়ো আশা করি জিমকে কুকুরের স্বাভাবিক খাদ্য খাওয়ান?'
শ্যামখুড়ো জবাব দেবার আগেই জিম করল কী, যেন ববকে দেখাবার জন্য মুখ বাড়িয়ে ফায়ারপ্লেস থেকে একটা জ্বলন্ত কাঠের ঠুকরো কামড়ে নিল৷ তারপর মুখ কাত করে হাড় চিবোনোর ভঙ্গিতে চিবোতে শুরু করল৷ অঙ্গারের কুচি চিড়বিড় করে ছিটকে পড়তে থাকল৷
এতক্ষণে বব ভীষণ চমকে উঠল এবং তার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল৷ সে হাঁ করে তাকিয়ে রইল৷ শ্যামখুড়োর চোখে পড়লে ব্যস্তভাবে বলে উঠলেন, 'ঃআ জিম! খায় না, ছিঃ খায় না! বদহজম হবে৷ তখন সেদিনকার মতো ঘোড়ার নাদির গুলি গিলতে হবে৷'
জিম বারণ মানল৷ হয়তো ঘোড়ার নাদির গুলি গিলতে হবে বলেই৷ এবার শ্যামখুড়ো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'হুম৷ তোমার সঙ্গে কথাবার্তা শুরু করা যাক৷ হ্যাঁ হে, তোমরা ভারতীয়রা নাকি অনেকরকম গুপ্তবিদ্যা জান-মানে, অকালটের কথাই বলছি৷ একটু নমুনা দেখাও না আমায়?'
'খুড়োমশাই, আমি তো কিছু জানি না৷' করুণ মুখভঙ্গি করে বললুম৷ আড়চোখে লক্ষ করলুম, ববের ঠোঁটের কোনায় মুচকি হাসি ফুটেছে৷ আমার অবস্থা দেখেই হয়তো-বা৷
শ্যামখুড়ো বললেন, 'জানিনে বললে ছাড়ছিনে বাপু৷ বলি, আপত্তিটা কীসের? বিদ্যা তো অপরের কাছে জাহির করার জন্যই৷ বিদ্যা জেনে কি কেউ ঘরে চুপচাপ মুখ বুজে বসে থাকে৷ কই, ঝাড়ো একখানা নমুনা৷ ধরো, শূন্যে মাটিছাড়া হয়ে বসা-কিংবা জ্বলন্ত আগুনে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকা৷ যেকোনোটা৷'
বেগতিক দেখে বব বলল, 'বরং তোমার তাসের ম্যাজিকটা দেখাতে পার খুড়োকে৷'
খুড়ো ভুরু কুঁচকে বললেন, 'ম্যাজিক? ম্যাজিক কে দেখতে চেয়েছে হে ছোকরা?'
তেজি বব বলল, 'সবই তো ম্যাজিক৷ ওই যে অকালট না ফকালট না গুপ্তবিদ্যার কথা বললেন, তা স্রেফ ম্যাজিক ছাড়া কী! একটু আগে আপনার জিমের আগুন খাওয়াটাও তাই৷ আপনি আসলে একজন ম্যাজিশিয়ান৷ তা কি বুঝিনি?'
'কী বললে? কী বললে? কী বললে?' শ্যামখুড়ো রাগের চোটে সটান উঠে দাঁড়ালেন৷
'আপনি ম্যাজিশিয়ান৷' বব অকুতোভয়ে বলল৷
আমি ববের দিকে বারবার চোখ টিপছি৷ এ বিপদের সময় তর্ক করতে নেই৷ গোঁয়ার বব আমার দিকে তাকাচ্ছেই না৷ এদিকে শ্যামখুড়ো দাঁত কিড়মিড় করে তার দিকে তাকিয়ে আছেন৷ গুলি গুলি চোখ দুটো থেকে দেখতে পাচ্ছি, স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে পড়ছে৷ তবু হাঁদারাম বব কিছু আঁচ করছে না৷
হঠাৎ লিকলিকে আঙুল তুলে খুড়ো চেরা গলায় চেঁচিয়ে উঠলেন, 'বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও!'
'যাচ্ছি!' বলে বব উঠে গটগট করে বেরিয়ে গেল৷
আমি উঠতে যাচ্ছি, খুড়ো আমার কাঁধ চেপে বসিয়ে দিলেন৷ সারা গা হিম হয়ে গেল৷ কিন্তু খুড়োর মুখে মিঠে হাসি ফুটেছে তক্ষুনি৷ বুড়ো আঙুল তুলে ববের উদ্দেশে বললেন, 'কিস্সু জানে না ও ছোকরা৷ কখনো ওর সঙ্গে আর মিশো না৷ তার চেয়ে তুমি আমার কাছে থেকে যাও৷'
মৃদু আপত্তি করে বললুম, 'পরে সময় করে আসব খুড়ো৷ এখন বরং আমায় যেতে দিন৷'
'এই ঠান্ডার রাতে কোথায় যাবে বাবু?' শ্যামখুড়ো সস্নেহে বললেন, 'পাশের ঘরে আরাম করে ঘুমোতে পারবে৷ যাকগে, যা নিয়ে কথা হচ্ছিল৷ কই, শূন্যে বসে থাকাটাই একটু দেখাও৷'
অগত্যা বললুম, 'যখন-তখন এ বিদ্যা প্রকাশ করতে নেই খুড়ো৷ শাস্ত্রে নিষেধ আছে৷ তিথি-নক্ষত্র এসব দেখে তবে না৷ পাঁজি দেখে দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে৷'
খুড়ো বললেন, 'তাই বুঝি? ঠিক আছে৷ তাহলে ওই তো আগুন রয়েছে৷ অন্তত আগুনে পিঠ রেখে শোওয়াটা একবার দেখাও৷ ওঠো, দেরি কোরো না৷ টম ডিক হ্যারি এক্ষুনি এসে পড়বে৷ ওরা এলে আমার অন্য সব কাজকর্ম আছে৷ তখন আর ফুরসত পাব না৷ ওঠো, ওঠো৷'
আগুনটাও এসময় ফায়ারপ্লেসে কেন কে জানে, দাউদাউ করে জ্বলে উঠল৷ আঁতকে উঠলুম৷ শ্যামখুড়ো লিকলিকে আঙুলে আমাকে খোঁচাতে শুরু করেছেন৷ পাঁজি-তিথি-নক্ষত্রের কথা তুলব কী, ক্রমাগত পাঁজরে ও পেটে খোঁচা খেয়ে কাতুকুতু লাগছে৷ হি-হি করে হাসি পেয়ে গেল শেষ অবধি৷ তখন শ্যামখুড়োও হি-হি করে হাসতে হাসতে কাতুকুতুটা বাড়িয়ে দিলেন৷
কাতুকুতুর চোটে ফায়ারপ্লেসে গিয়ে ছিটকে পড়ি আর কি, হঠাৎই হইহই করে দরজা খুলে তিনটে লোক ঢুকল৷ তিন জনের হাতেই তিনটে অদ্ভুত লন্ঠন৷ হ্যাঁ, এরাই জলার ধারের সেই তারা৷ শ্যামখুড়ো আমায় ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ বললেন, 'পাওয়া গেল?'
টম, হ্যারি, ডিক তুমুল কোলাহল করে জবাব দিল, 'পাওয়া গেছে৷ পাওয়া গেছে৷'
শ্যামখুড়ো বেজায় খুশিতে নাচতে নাচতে বললেন, 'কোথায় পেলি?'
ওরা কোরাস গাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, 'ভোঁদড়ের গর্তে৷'
'কাল ব্যাটাকে দেখব৷ এখন আয় তোরা, জিমকে ধর৷ লেজটা পরিয়ে দিই৷'
চার জনে জিমকে নিয়ে ব্যস্ত হল৷ আর সেই সুযোগে আমি ফুড়ুৎ করে কেটে পড়লুম দরজা গলিয়ে৷ তারপর দৌড়, দৌড়, দৌড়৷ অন্ধকারে কত বার ঠোক্কর খেলুম৷ রাস্তায় গড়িয়ে পড়লুম৷ শিশিরে কাদায় পোশাকের অবস্থা যা হল, বলার নয়৷
হাইওয়েতে পৌঁছে ভাগ্যিস গাড়িটা পাওয়া গেল৷ ভেতরে বব নির্বিকার ঘুমোচ্ছিল৷ ঘুম-জড়ানো গলায় বলল, 'শুয়ে পড়ো৷ সকাল অবধি উপায় নেই৷'
হাইওয়েতে পুলিশের টহলদারি আছে৷ শেষরাতে তাদের ডাকে ঘুম ভেঙেছিল৷ গাড়ির অবস্থা দেখে তাদের অফিসার ববকে বলেছিল, 'এই ভিনটেজ মালটা ভাগাড়ে ফেলে দিয়ে নতুন একটা কেনো৷' বব তাতে রাজি৷ তাদের গাড়িতেই আমাদের লিফট দিয়েছিল৷
পথে বব হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, 'গাড়ি খারাপ হওয়া জায়গাটার ওখানে টিলার ওপর কে থাকেন বলুন তো? ভারি অদ্ভুত লোক৷'
অফিসার চোখ পাকিয়ে বলেছিলেন, 'গাঁজা খাও নাকি?'
বব খাপ্পা৷ 'সিগারেট খাওয়া নিশ্চয় গাঁজা খাওয়া নয়৷'
অফিসার একটু হেসে বলেছিলেন, 'ও জায়গাটার নাম আংকল স্যামস কেবিন৷ শ্যামখুড়োর কুটির৷ বিখ্যাত বই আংকল টমস কেবিনের অনুকরণ৷ ওখানে স্যাম নামে একটা লোক থাকত৷ ভাঙা বাড়িটার সামনে তাঁর কবর দেখেছি৷ ফলকে মৃত্যু সাল লেখা আছে ১৮৭৫৷'
বব আমার দিকে চোখ টিপে, কেন কে জানে, শুধু মুচকি হেসেছিল৷ আমি হাসিনি৷ ফোঁস করে বড়ো রকমের একটা নিশ্বাস ফেলেছিলুম৷ কারণ এই নিয়ে দু- বার ফাঁড়া গেছে৷ এক বার বাংলামুল্লুকে, আর একবার মার্কিনমুল্লুকে৷ তফাতটা শুধু ভাষায়৷...

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন