সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

সেহরাগড় ফরেস্ট বাংলোয় ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল৷ নাম ড. আর.পি. গুন্টা৷ তিনি এক বিস্ময়কর মানুষ৷
প্রথমে চোখে পড়েছিল ওঁর অস্বাভাবিক দৈর্ঘ্য৷ অত লম্বা মানুষ গিনেস রেকর্ড বইতে এখনও উল্লিখিত হননি বলে আমার বৃদ্ধ বন্ধু আক্ষেপ করেছিলেন৷ তাই শুনে ড. গুন্টা হাসতে হাসতে বললেন, 'কী দরকার? আসলে কী জানেন, নিজের এই লম্বা হওয়া নিয়ে আমার নিজেরই ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে৷ রাস্তাঘাটে বেরোলে সাড়া পড়ে যায়৷ যেখানে যাই, পিছনে ভিড়৷ তার ওপর সমস্যা হল, দরজার মাপ৷ কোনো বাড়িতে ঢুকতে হলে প্রতিমুহূর্তে আমাকে নিজের উচ্চতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হচ্ছে৷ আবার অনেক সময় মনেও থাকে না কথাটা এবং মাথায় ঠোক্কর খাই৷ এই দেখুন না, কী অবস্থা হয়েছে?'
কপালে অনেক কালো ছোপ দেখে সমস্যাটা হাড়ে হাড়ে টের পেলুম৷ বললুম, 'আপনার এই দৈর্ঘ্যের সঙ্গে প্রস্থটাও যদি বাড়ত, তাহলে লোকেরা আপনাকে ভয়ও পেত৷'
ড. গুন্টা বললেন, 'রক্ষে করুন মশাই৷ তাহলে লোকেরা আমাকে ঘটোৎকচ বলতে শুরু করত৷ কী বলেন, কর্নেল?'
কর্নেল চোখ বুজে সাদা দাড়ি টানাটানি করছিলেন৷ বললেন, 'আচ্ছা ড. গুন্টা, কবে থেকে আপনি লম্বা হতে শুরু করেছেন?'
ড. গুন্টা কর্নেলের কথায় অবাক হলেন যেন৷
'তা তো লক্ষ করিনি৷ তবে যতদূর মনে পড়ছে, মাস তিনেক আগে একদিন ভোর বেলা বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে চৌকাঠে ঠোক্কর লাগল মাথায়৷ তখন... মাই গুডনেস!'
উনি আরামকেদারা থেকে সোজা হলেন হঠাৎ৷ কর্নেল বললেন, 'কী ব্যাপার?'
'আমার মতো বোকা দেখছি পৃথিবীতেই নেই৷' ড. গুন্টা মুখে হতাশার ভাব ফুটিয়ে বললেন, 'কী আশ্চর্য! সত্যি তো, ব্যাপারটা ভেবে দেখা উচিত ছিল আমার৷ ওই প্রথম মাথায় ঠোক্কর খাওয়ার আগের দিন সম্ভবত আমার উচ্চতা প্রায় স্বাভাবিক ছিল৷... হ্যাঁ, স্বাভাবিক ছিল৷ কারণ, তার আগে তো বাথরুম কেন, কোনো ঘরের দরজার সামনে আমাকে মাথা হেঁট করতে হয়নি৷ কর্নেল, এই ব্যাপারটা আমার লক্ষ করতে ভুল হয়ে গেছে দেখছি৷'
কর্নেল ওঁকে যেন আশ্বস্ত করতে চেয়েই বললেন, 'পৃথিবীর অধিকাংশ বিজ্ঞ মানুষই নিজের সম্পর্কে অসচেতন৷ ও নিয়ে দুঃখ করার কিছু নেই৷ পিটুইটারি গ্ল্যান্ডের একটু হেরফের ঘটলে মানুষ বামন কিংবা দৈত্য হয়ে ওঠে৷ শুধু তাই নয়, তাদের গায়ে প্রচণ্ড শক্তিও এসে যায়৷'
ড. গুন্টা আস্তে বললেন, 'তা ঠিক৷ কিন্তু আমার বয়স প্রায় পঞ্চান্ন হয়ে এল৷ এই বয়সে হঠাৎ আমার পিটুইটারি গ্ল্যান্ড কেন এ-খেল দেখাল বোঝা যাচ্ছে না৷ অবশ্য আমি অনেকের তুলনায় একটু লম্বা ছিলুম ছেলেবেলা থেকেই৷ হঠাৎ একটা যেন দুর্ঘটনা ঘটল৷ আমি রাতারাতি সাত ফুট উঁচু হলুম৷ অথচ খেয়াল পর্যন্ত করলুম না৷ কর্নেল, ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে মনে হচ্ছে৷ আমি যাই৷'
উনি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর দরজা দিয়ে মাথা যতদূর সম্ভব নীচু করে বেরিয়ে গেলেন৷ কর্নেল তাকিয়ে রইলেন অবাক হয়ে৷ আমিও৷
ড. গুন্টা উঠেছিলেন পাশের ঘরে৷ কিছুক্ষণ পরে বেরিয়ে সে-ঘরের দরজায় তালাবন্ধ দেখলুম৷ বললুম, 'কর্নেল, ড. গুন্টা কি বাংলো ছেড়ে চলে গেলেন নাকি!'
কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না৷ বললেন, 'চলো জয়ন্ত, সেহরাগড় ফোর্টের ধ্বংসাবশেষ দেখে আসি৷'
এই বাংলোটা একেবারে সংরক্ষিত জঙ্গলের ভেতর একটা টিলার গায়ে! নীচে ছোট্ট এক নদী৷ কাঠের সাঁকো পেরিয়ে বনজঙ্গল শুরু৷ দুর্গে পৌঁছোতে ঘণ্টা খানেক লাগল৷
কিন্তু যা ভেবেছিলুম, তাই ঘটল৷ প্রকৃতিবিদ দুর্গের ওপর থেকে বাইনোকুলারে কী পাখি দেখতে পেয়ে আমার অস্তিত্ব ভুলে গেলেন এবং ধ্বংসাবশেষের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন৷ দেওয়ালের ওপর বসে আমি নীচের জঙ্গলের শোভা দেখতে থাকলুম৷
কতক্ষণ পরে পিছনে কী একটা শব্দে চমকে উঠে দেখি, ড. গুন্টা একটা প্রকাণ্ড পাথর ধরে টানাটানি করছেন৷ আমি ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলুম৷
ড. গুন্টা চাপা হুংকার দিয়ে এক ঝটকায় বিশাল পাথরটা দু-হাতে শূন্যে তুললেন৷ তারপর সেটা নীচে ছুড়ে ফেললেন৷ নীচে বিকট শব্দ করে পাথরটা পড়ল এবং গড়াতে গড়াতে চলল৷ ড. গুন্টা হাত ঝাড়তে ঝাড়তে হাসিমুখে তাকালেন আমার দিকে৷ মুখের চেহারায় কেমন অস্বাভাবিকতা লক্ষ করে আমার অস্বস্তি হল৷ বললুম, 'ড. গুন্টা, আপনি দেখছি সুপারম্যানও বটে৷'
ড. গুন্টা আমার কাছে এগিয়ে এসে সহাস্যে বললেন, 'মি. চৌধুরি, আমার ইচ্ছে করছে আপনাকে তুলে দূরে ছুড়ে ফেলি!'
আঁতকে উঠে বললুম, 'সে কী! না-না৷ দয়া করে ইচ্ছেটা একটু সামলে রাখুন, মশাই!'
'আমাকে ঘটোৎকচ মনে হচ্ছে না আপনার?'
'হচ্ছে৷ খুব হচ্ছে৷ আপনি ঘটোৎকচই বটে৷'
ড. গুন্টা ফিকফিক করে হাসতে হাসতে বললেন, 'খুব ভয় পেয়েছেন মনে হচ্ছে?'
'পেয়েছি বই কী৷ আপনি অমন প্রকাণ্ড পাথরটা যেভাবে ছুড়ে ফেললেন!'
'আরও শক্তি দেখবেন নাকি?' বলে ড. গুন্টা দুর্গের উঁচু পাঁচিলটার দিকে এগিয়ে গেলেন৷ তারপর দু-হাতে ঠেলতে শুরু করলেন৷ প্রকাণ্ড পাঁচিলটা সশব্দে ভেঙে পড়ল৷
আমি এত ভয় পেয়ে গেছি যে, পালিয়ে যাওয়ার জন্য এদিক-ওদিক তাকিয়ে নিরাপদ পথ খুঁজছি৷ ড. গুন্টা ফটকের পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন৷ আগের মতো দু-হাতের ধুলো-ময়লা ঝাড়তে ব্যস্ত৷ মুখে তৃপ্তির হাসি-কিন্তু কেমন অস্বাভাবিকতাও ফুটে আছে৷
হঠাৎ উনি ফের চাপা হুংকার দিয়ে লাফ মারলেন এবং ওই লাফে অন্তত ফুট বিশেক উঁচু ফটকের মাথায় পৌঁছে গেলেন৷
অমনি আমি নীচু পাঁচিলের ভাঙা অংশটা পেরিয়ে নামতে শুরু করলুম৷ এদিকটা ঢালু হয়ে নেমে গেছে৷ অজস্র পাথর আর ঝোপজঙ্গলে ভরতি৷ ভাগ্যিস নীচের গভীর গড়খাইটা শুকনো ছিল৷ হাঁচড়পাঁচড় করে ওপারে উঠতেই প্রকৃতিবিদের দেখা পেলুম৷ রুদ্ধশ্বাসে বললুম, 'ড. গুন্টা সুপারম্যান হয়ে গেছেন৷ কীসব সাংঘাতিক কাণ্ড শুরু করেছেন, দেখলে বুদ্ধিসুদ্ধি গুলিয়ে যাবে!'
কর্নেল কিন্তু হাসছিলেন৷ বললেন, 'এখান থেকে বাইনোকুলারে আগাগোড়া সবটাই আমি দেখেছি, ডার্লিং৷ তবে ড. গুন্টাকে তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷'
'নেই মানে? আমাকে ছুড়ে ফেলার ইচ্ছে করছে বলেছিলেন!'
কর্নেল পা বাড়িয়ে বললেন, 'সেই গল্পটা জান তো? এক পাগল যাচ্ছেতাই পাগলামি শুরু করেছে৷ একটা লোক যেই বলেছে, ওরে! দেখিস, যেন ঢিল ছুড়িস না-অমনি পাগল বলে উঠল, বাঃ! মনে পড়িয়ে দিয়েছে রে! বলে সে তখন ঢিল ছুড়তে লাগল৷ ড. গুন্টাকে আমরা হয়তো ওইরকম মনে পড়িয়ে দিয়েছি৷ যাই হোক, এসো-বাংলোয় ফেরা যাক৷'
বিকেলে লনে বসে আছি কর্নেলের সঙ্গে, সেই সময় ড. গুন্টাকে ফিরতে দেখলুম৷ হাসিমুখে সম্ভাষণ করে বললেন, 'সেহরাগড় ফরেস্টকে জব্দ করে এলুম, কর্নেল! শ-খানেক শাল গাছ উপড়েছি৷ একটা বাঘকে ছাতু করে দিয়েছি৷ একটা দাঁতাল হাতিকে আধমরা করে দিয়েছি৷ ঠ্যাং ভেঙে পড়ে আছে৷ আর, ফোর্টের অবস্থাটাও দেখে আসুন গিয়ে৷ একখানা দেওয়ালও আস্ত নেই৷'
কর্নেল বললেন, 'কিন্তু আপনার খাওয়াদাওয়া? চৌকিদারকে আপনার খাবার টেবিলে রাখতে বলেছিলুম৷ দেখুন তো!'
ড. গুন্টা বললেন, 'আরে তাই তো! আমার খিদে পেয়েছে যে! আমি খাব- প্রচুর৷'
তারপর ধুপধাপ শব্দে মাটি কাঁপিয়ে দৌড়োলেন৷ কর্নেল চেঁচিয়ে বললেন, 'মাথায় ঠোক্কর লাগবে, ড. গুন্টা৷'
ড. গুন্টা তক্ষুনি নীচু হয়ে বারান্দায় উঠলেন এবং দরজার তালা খুলে ভেতরে ঢুকলেন৷ তারপর মিনিট দুই হয়েছে, পর্দা তুলে চৌকিদারকে ডাকতে থাকলেন৷ চৌকিদার এসে বলল, 'হুজুর!'
'এটুকু খানা তুমি আমার জন্যে রেখেছ? আমি কি মাছি না পিঁপড়ে?'
চৌকিদার বেজার মুখে বলল, 'আর তো কিছু নেই, হুজুর৷'
'চলো দেখি, তোমার কিচেনে কী আছে৷'
ড. গুন্টা কিচেনের দিকে গেলেন৷ চৌকিদারও গুটিসুটি পিছনে পিছনে গেল৷ কিন্তু একটু পরে সে দৌড়ে এল আমাদের কাছে৷ 'হুজুর! হুজুর! উনি আদমি না রাক্ষস? বাপরে বাপ! চাল, ময়দা, সবজি, যা ছিল-সব আস্ত গিলে খাচ্ছেন যে! একটা ব্যবস্থা আপনারা করুন, হুজুর!'
ড. গুন্টার হাঁক শোনা গেল, 'চৌকিদার! চৌকিদার!'

চৌকিদার চাপা গলায় বলল, 'দোষ-গলতি মাফ করবেন হুজুর৷ আমি এখন ওপরওয়ালার কাছে রিপোর্ট করতে চললুম৷'
বেচারা চৌকিদার প্রায় লেজ তুলে দৌড়োনোর মতো গেট দিয়ে উধাও হয়ে গেল৷
তারপর কিচেনের দিক থেকে ড. গুন্টা বেরিয়ে এলেন৷ মুখে একরাশ ময়দা লেগে আছে৷ বললেন, 'এ কী বিচ্ছিরি খিদে বলুন তো, কর্নেল! ইচ্ছে করছে, আপনাদেরও খেয়ে ফেলি৷'
কর্নেল সহাস্যে বললেন, 'জঙ্গলে গিয়ে হরিণ-টরিন ধরে খান না, ড. গুন্টা৷ কী আর করবেন!'
ড. গুন্টা সঙ্গে সঙ্গে পা বাড়ালেন৷ বললেন, 'আরে, তাই তো বটে!' বলে মাটি কাঁপিয়ে বাংলোর প্রাঙ্গণের ধারে উঁচু বেড়া মড়মড় করে ভেঙে বেরিয়ে গেলেন৷
উদবিগ্ন হয়ে বললুম, 'কর্নেল! ব্যাপারটা বড্ড ঘোরালো হয়ে যাচ্ছে! চলুন, এখান থেকে চলে যাই আমরা৷ এ যে সত্যি ঘটোৎকচের কাণ্ড বেধে গেল৷'
কর্নেল শুধু হাসলেন৷ আমার কথার কোনো জবাব দিলেন না৷
ঘণ্টা দুই পরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে৷ বাংলোয় বিদ্যুতের আলোর ব্যবস্থা আছে৷ কিন্তু মশার বড্ড জ্বালাতন৷ তাই আমরা ঘরে বসে আছি৷ ড. গুন্টার আর পাত্তা নেই৷ বলছিলুম, 'এতক্ষণে হয়তো জঙ্গলের সব হরিণ ওঁর পেটে চলে গেল৷'
এমন সময় জিপের শব্দ হল বাইরে৷
দু-জন ফরেস্ট অফিসার আর একদল গার্ড হন্তদন্ত হয়ে এসে গেলেন৷ রেঞ্জারসাহেব আমার চেনা৷ হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, 'কর্নেল! এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে৷ আপনার পাশের ঘরের সেই লম্বা ভদ্রলোক...'
কর্নেল কথা কেড়ে বললেন, 'বুঝেছি৷ জঙ্গলে হরিণের পাল সাবাড় করে বেড়াচ্ছেন৷'
রেঞ্জার বললেন, 'দুঃখের কথা, আমরা ওঁকে গুলি করে মারতে বাধ্য হয়েছি৷'
'সে কী!'
'গুলি না করে উপায় ছিল না৷ উনি একজন ফরেস্ট গার্ডকে আছাড় মেরে খুন করেছেন৷ সে এক বীভৎস দৃশ্য কর্নেল! লোকটা একেবারে নরদানব কিং কং বললেই চলে৷'
কর্নেল আস্তে বললেন, 'ঠিকই করেছেন৷ তা না হলে এবার ভদ্রলোককে আটকানো কঠিন হত৷ ক্রমশ ওঁর ভেতরে একটা ভয়ংকর শক্তি জেগে উঠছিল৷ এরপর জঙ্গল ছেড়ে হয়তো উনি বসতি এলাকায় গিয়ে ঢুকতেন৷ তারপর আরও বীভৎস ঘটনা ঘটত৷'
কথা থামিয়ে কর্নেল উঠে দাঁড়ালেন, 'চলুন তো, ওঁর ডেডবডিটা দেখে আসি৷'
জিপে চেপে আমরা জঙ্গলের রাস্তা ধরলুম৷ মাইল দুই এগিয়ে বাঁ-দিকে এক জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখা গেল৷ রেঞ্জার বললেন, 'ওই যে, ওখানে৷ ডেডবডির পাহারায় দু-জনকে বসিয়ে রেখে এসেছি৷'
কাঠকুটো জ্বেলে লোক দুটো আসলে ভয় তাড়ানোর চেষ্টা করছিল৷ আমাদের দেখে সাহস ফিরে পেল৷ তারা বন দফতরের কর্মী৷ এক জনের হাতে একটা বন্দুক, অন্য জনের হাতে নিছক বল্লম৷ মুখে প্রচণ্ড আতঙ্কের ছাপ লেগে আছে৷ একটু তফাতে দলা পাকানো রক্তাক্ত একটা লাশ পড়ে ছিল৷ রেঞ্জার টর্চের আলোয় সেটা দেখিয়ে বললেন, 'এটা ফরেস্ট গার্ড মণি সিং-এর ডেডবডি৷ কী অবস্থা হয়েছে দেখুন৷'
কর্নেল বললেন, 'ড. গুন্টার ডেডবডি কোথায়?'
রেঞ্জার পা বাড়িয়ে বললেন, 'আসুন, দেখাচ্ছি৷'
জায়গাটা খোলামেলা৷ একটু এগিয়ে টর্চের আলোয় একটা ছোটো নদী দেখা গেল৷ বালি আর পাথরে ভরতি৷ রেঞ্জার অবাক হয়ে বললেন, 'সর্বনাশ! ডেডবডিটা কোথায় গেল৷ জানোয়ারে টেনে নিয়ে গেল না তো?'
বালির ওপর একটু রক্তের ছাপ চোখে পড়ল৷ কর্নেল টর্চের আলোয় খুঁটিয়ে জায়গাটা দেখে বললেন, 'না৷ টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই৷ কিন্তু... আশ্চর্য তো!'
'কী কর্নেল?'
'মনে হচ্ছে, ড. গুন্টা মারা যাননি৷ দিব্যি পায়ে হেঁটে চলে গেছেন৷'
'অসম্ভব! গুলি করার পর আমরা ওঁকে পরীক্ষা করে দেখেছিলুম৷ দেহে প্রাণ ছিল না৷ দুটো গুলিই হার্টে লেগেছিল৷'
যে দুটো লোক পাহারায় ছিল, তাদের এক জন বলল, 'কী একটা শব্দ শুনেছিলুম, কিছুক্ষণ আগে৷ টর্চ জ্বেলে কিন্তু কিছু দেখতে পাইনি৷'
অন্য লোকটি বলল, 'আমি ভেবেছিলুম কোনো জানোয়ার৷'
রেঞ্জার তাদের খুব বকাবকি করলেন৷ তারা আমতা-আমতা করছিল৷ বুঝতে পারছিলুম, ওদের বকাবকি করা বৃথা৷ বেচারারা ভয়ে আধমরা হয়ে বসেছিল৷ যদি দেখত, ড. গুন্টার মড়া হেঁটে যাচ্ছে, তাদের ভিরমি খেয়ে পড়ে থাকতে হত৷
কর্নেল পায়ের ছাপ অনুসরণ করে নদীর ওপার পর্যন্ত গেলেন৷ আমরাও ওঁর সঙ্গে গেলুম৷ কিন্তু তারপর কঠিন পাথুরে মাটিতে আর কোনো ছাপ দেখা গেল না৷ কর্নেল উদবিগ্ন মুখে বললেন, 'সেহরাগড় টাউনশিপের লোকেদের ভাগ্যে কী আছে কে জানে! আমার মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা অনেকদূর গড়াবে৷'
ফরেস্ট বাংলোয় ফিরে এ রাতে আর অন্ধকার বনভূমির সৌন্দর্য দেখার মন ছিল না৷ তা ছাড়া মশার খুব উৎপাত, সেকথা আগেই বলেছি৷
অনেক রাত পর্যন্ত জেগে কাটাচ্ছিলুম৷ কর্নেলের নাক ডাকছিল যথারীতি৷
একসময় হঠাৎ বাইরে কী একটা ধাক্কা দেওয়ার শব্দ হল৷ অমনি কর্নেলের নাক ডাকাও থেমে গেল৷ ওঁর ঘুম বরাবর পাতলা৷ ওদিকে পাশের ঘরে কেউ যেন চুপি চুপি তালা খুলছে৷ তারপর সাবধানে দরজা খুলল৷ কর্নেলের নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেলুম৷ তারপর টেবিলবাতিটা জ্বলে উঠল৷ ফিসফিস করে বললুম, 'কর্নেল! পাশের ঘরে কে যেন ঢুকল৷'
কর্নেলও ফিসফিস করে বললেন, 'চুপ!'
উনি বারান্দার দিকের জানলার পর্দা তুলে উঁকি দিলেন৷ আমিও ওঁর কাছে গিয়ে উঁকি দিলুম৷ বারান্দায় আলো আছে৷ একটু পরে শিউরে উঠে দেখি, পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন স্বয়ং ড. আর.পি. গুন্টা৷ হাতে একটা প্রকাণ্ড সুটকেস৷ পোশাকে ধুলো-ময়লা আর চাপ চাপ রক্ত লেগে আছে৷ বারান্দা থেকে নেমে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে চলে গেলেন৷
কর্নেল বললেন, 'যাকগে৷ এবার নিশ্চিন্তে ঘুমুনো যাবে৷'
বললুম, 'রহস্যটা কিন্তু শেষপর্যন্ত রহস্যই থেকে গেল, কর্নেল৷'
কর্নেল একটু হাসলেন, 'তা ঠিক৷ তবে যা আশঙ্কা করেছিলুম, সম্ভবত তত কিছু ঘটবে না৷ কারণ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সেই দানব শেষপর্যন্ত দানবই থেকে গিয়েছিল৷ কিন্তু ড. গুন্টাকে দেখলুম, দিব্যি ভদ্রলোকের মতো নিজের জিনিসপত্র নিতে এসেছিলেন৷ তার মানে, সুবুদ্ধির উদয় হয়েছে ওঁর এবং ঘরের ছেলে ঘরে ফেরাই সাব্যস্ত করেছেন৷'
পরদিন আমরা জঙ্গল থেকে সেহরাগড় টাউনশিপ ফিরে গেলুম৷ তারপর সেখান থেকে বাসে চেপে ফৈজাবাদ৷ কলকাতা ফেরার ট্রেন রাত বারোটা নাগাদ৷ একটা হোটেলে খাওয়া-দাওয়া সেরে কর্নেল হঠাৎ বললেন, 'চলো জয়ন্ত, ড. গুন্টার খোঁজখবর নিয়ে আসি৷'
অবাক হয়ে বললুম, 'সর্বনাশ! উনি কি ফৈজাবাদের লোক নাকি?'
'বাংলোর খাতায় সেই ঠিকানাই তো জেনেছি৷'
'কিন্তু...'
কর্নেল আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'আমার ধারণা, ড. গুন্টা এখন আর নরদানব বা ঘটোৎকচ হয়ে নেই৷ কাজেই ওঁকে ভয় পাওয়ারও কিছু নেই৷ হয়তো ভুলটা আমারই৷ আমি ওঁকে সচেতন করে দেওয়াতে ওইসব বীভৎস ঘটনা ঘটেছে৷ তোমাকে সেই পাগলের গল্পটা বলেছিলুম, আশা করি মনে আছে৷ কোনো কারণে মানুষের মধ্যে অস্বাভাবিকতা এলে তাকে উত্ত্যক্ত করা উচিত নয়৷'
রাত এখন প্রায় ন-টা৷ কিন্তু ফৈজাবাদ ছোট্ট শহর৷ ড. গুন্টাকে সবাই চেনে-সেটা উনি লম্বা মানুষ বলেই৷ শেষদিকে একটা টিলার গায়ে একটা পুরোনো গড়নের বাড়ি৷ টাঙ্গাওয়ালা তার গেটের কাছে নামিয়ে দিল আমাদের৷ লন পেরিয়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, বাড়িতে যেন জনমানুষ নেই৷ অস্বাভাবিক স্তব্ধ পরিবেশ৷ তবে আলো দেখা যাচ্ছিল একটা ঘরে৷
দরজার বোতাম টেপার বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলল৷ সেই অস্বাভাবিক ঢ্যাঙা মানুষ, চেনা মুখ৷ অমায়িক হেসে বললেন, 'কোত্থেকে আসছেন আপনারা?'
আমি তো অবাক! কর্নেল নমস্কার করে বললেন, 'আপাতত আসছি সেহরাগড় থেকে৷ আপনার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে, ড. গুন্টা৷'
ড. গুন্টা ভুরু কুঁচকে কী স্মরণ করার চেষ্টা করে বললেন, 'সেহরাগড়! সেখানে তো একটা জঙ্গল আছে শুনেছি৷ যাকগে, ভেতরে আসুন৷'
ভেতরে ঢুকে আমরা বসলুম৷ ড. গুন্টাও বসলেন৷ ওঁর মুখে বিস্ময় লক্ষ করছিলুম৷ কর্নেল বললেন, 'ড. গুন্টা, আপনার প্রজেক্ট যে সাকসেসফুল সেই কথাটা বলতে এসেছি-যদিও দেশের আইনে আপনি অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন৷'
ড. গুন্টা চমকে উঠলেন, 'কী বলছেন, ঠিক বুঝতে পারছি না৷'
'আপনার ফ্যান্টম প্রতিমূর্তি সেহরাগড় জঙ্গলে বীভৎস কাণ্ডকারখানা করেছে, জানেন কি?'
ড. গুন্টা নড়ে বসলেন, 'মাই গুডনেস!'
'হ্যাঁ৷ এক ডজন হরিণ, একটা বাঘ আর একজন ফরেস্ট গার্ডকে আপনার ফ্যান্টম প্রতিমূর্তি খুন করে ফেলেছে৷ অসংখ্য গাছ উপড়ে ফেলেছে৷ সেহরাগড় কেল্লাটা ভাঙচুর করেছে৷ এমনকী একটা দাঁতাল হাতিকেও মারাত্মক জখম করেছে৷'
ড. গুন্টা দু-হাতে মুখ ঢেকে বসে রইলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর ভাঙা গলায় বললেন, 'কিন্তু আমার তো কিছু মনে পড়ছে না৷'
'কিন্তু আপনি একজন বায়োফিজিসিস্ট৷ আপনি জানতেন, আপনার ফ্যান্টম প্রজেক্টের পরিণতি সাংঘাতিক হতে পারে৷'
ড. গুন্টা উঠে দাঁড়িয়ে আস্তে বললেন, 'বিশ্বাস করুন, মাস তিনেক আগে হঠাৎ আমার উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার পর কী কী ঘটেছে, এখন একটুও মনে নেই৷'
'আইন কিন্তু আপনাকে ছেড়ে দেবে না, ড. গুন্টা৷'
ড. গুন্টা হঠাৎ সবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন৷ তারপর ঝনঝন দুমদাম প্রচণ্ড শব্দ শোনা গেল৷ উদবিগ্ন হয়ে বললুম, 'কী ব্যাপার, কর্নেল?'
কর্নেল হাসলেন, 'ল্যাবরেটরি ভাঙছেন৷ প্রমাণ লোপের চেষ্টা৷ যাই হোক, আর এখানে থাকা নিরাপদ নয়, জয়ন্ত৷ চলো, আমরা কেটে পড়ি৷'
স্টেশনে পৌঁছে বললুম, 'ফ্যান্টম প্রতিমূর্তি ব্যাপারটা কী, খুলে বলুন তো?'
কর্নেল বললেন, 'প্রতিবস্তুর কথা নিশ্চয়ই শুনেছ৷ মানুষের ব্যক্তিসত্তার তেমনই কোনো প্রতিরূপ আছে কি না, এ-নিয়ে বায়োফিজিসিস্টরা গবেষণা করেছেন৷ কতকটা ড. জেকিল এবং মি. হাইডের ব্যাপারটা যেমন৷ তবে ওই প্রতিরূপ ফ্যান্টম অস্তিত্ব কোনো মানুষের স্বাভাবিক চরিত্রের একেবারে উলটো না হতেও পারে৷ আমাদের মধ্যে একটা করে প্রতি-মানুষ আছে৷ সে অসম্ভব শক্তিমান৷ তাকে দিয়ে যেমন ভালো কাজ করানো যায়, তেমনই খারাপ কাজও করানো যায়৷ কাজেই ওই ফ্যান্টম-প্রতিমূর্তিকে তুমি ঘটোৎকচ বলতেও পার৷ ভুলে যেয়ো না, মহাভারতের ঘটোৎকচ একজন মানুষ ছাড়া কিছু নয়৷ তবে অতিমানুষ৷ তাকে জাগালে ভালো বা মন্দ দুই-ই ঘটতে পারে৷'
ব্যাপারটা আমার মাথায় ঢুকছিল না৷ তাই বললুম, 'নিকুচি করেছে ফ্যান্টম ব্যাটার৷ তাকে জাগিয়ে আর কাজ নেই৷'

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন