সুব্রত গুহ
এটা সত্যি কথা যে জল, ব্যাঙ আর পূর্ণিমা এই তিন একসঙ্গে মিলে একটা বিশেষ ঐন্দ্রজালিক মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। আমার ছোটবেলায় আমি এইভাবেই পড়েছি। ওই সব বই ভর্তি থাকত নিম্ফ মেয়েদের গল্পে। যারা সাদা গাউন আর সোনালী চুলের মালিক– যা অনেক বাচ্চা মেয়েদের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলত। আবার আজকের দিনে চুলের রংয়ের নির্মাতাদের উপকার করে।
সেইসব রাজপুরুষরা আজেবাজে ঘোড়ায় চাপত না। তাদের ছিল রাজকীয় তেজী ঘোড়া। আর তারা এমন সব পোষাক পড়ত যে ভেতরে ভেতরে পুরো শরীর ঘেমে যেত, ঠিক ওই পশুটার মতো যাতে চড়ে তারা ঘুরতো।
রাক্ষসদের পোষ মানানোটা খুবই আকর্ষনীয়, যদি না তারা অত নোংরা আর দুর্গন্ধময় হত। তাছাড়া ছিল একজোড়া জুতো যা পায়ে দিয়ে সব জায়গায় ঘুরে বেড়ানো যেত। সমতলেও হাঁটা যেত, সমুদ্রেও যাওয়া যেত, আবার সেইসব শহরেও ঘোরা যেত, যা পুরোপুরি ধ্বংসাবশেষ আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে।
আর সেইসব চিরন্তন শিশু আছে, যারা সবুজ জামা পরে থাকে, যারা আমাদের স্বর্গের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যারা সন্দেহজনক নামগুলির সাথে সামঞ্জস্য করার প্রতিশ্রুতি দেয় না। ছিল সেইসব স্বপ্ন যেখানে কামনা বাসনা, সব প্রতিভাধরদের জন্য আদেশ, যাদের গোঁফ ছিল এবং সেন্ট মার্তিন দে পোরেসের থেকে অলৌকিক ছিল।
এটাই হচ্ছে ঐন্দ্রজালিক রাতের আবহাওয়া।
যে ক্লাবে আমি সাঁতার কাটি, অসাধারণ দর্শনীয় তার পুলটা। এটা তৈরি করা হয়েছিল জঙ্গল থেকে চুরি করা একটুকরো জমির মধ্যে,যা এখনও কিছু প্রাণী দাবী করে।
দিনের তাপমাত্রা যে কত, তা শুধু অনুভব করা যায়, ওই গরম আর মিষ্টি জলে নামলেই। যেখানে আমি নেমে একই ভাবে সাঁতার কেটে চলি। কখনও চিত সাঁতার দিতে দিতে তারাদের দেখি।
সাগরের পারে গর্তগুলো জলে ভর্তি। আর সেগুলোতে আকৃষ্ট হয় ব্যাঙেরা কারণ গর্তগুলো বেশ ছোট ছোট। ওরা থাকে ক্লাবের সুন্দর ভাবে ছাঁটা ঘাসগুলোর মধ্যে। হলদেটে চাঁদ যেন তাদের গান গাইতে বলে। আর ওরা ওদের ছোট্ট ফুসফুস আর সমস্ত শক্তি দিয়ে গান গাইতে থাকে। ফুসফুস গুলোকে অনেক সময় গিলও বলে।
আমার অবশ্য একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে। মিস এলিভিরার প্রকৃতি বিজ্ঞানের পাঠ ভুলে যাওয়ার।
জলের শব্দ, আমার অপ্রত্যাশিত সঙ্গীর গ্যাঙর গ্যাঙ আর চিরজীবী অসংলগ্নতা আমাকে সময়ই দেয়নি যে বুঝব, যে একটা বুড়ো ব্যাঙ, যে অন্যদের থেকে অনেক বড়, সাঁতার কাটছে ব্রেষ্ট স্ট্রোকে য সে কোন সাঁতারের ওপেন চ্যাম্পিয়নশিপের অনুপ্রেরণা হতে পারে।
বেশ কিছুক্ষণ ধরেই ব্যাপারটা অবজ্ঞা করলাম। কিন্তু একবার আমার সাঁতারের স্ট্রোকগুলোর মধ্যে একটা তার শরীর ছুঁয়ে গেল। তারপরই আমার শরীরের মধ্যে একটা অসন্তোষের শিহরণ বয়ে গেল, যা কোনমতেই এড়ানো গেল না।
মনে হল না যে, সে ব্যাপারটা যে লক্ষ্য করেছে। সে যেমন সাঁতার কাটছিল তেমনই সাঁতার কাটতে লাগল।আমি পুলের অন্য প্রান্তে চলে গেলাম যাতে ওইরকম দূর্ঘটনা আর না ঘটে। আর আমিও যারপরনাই অবাক যখন দেখলাম ব্যাঙটা একটা অদ্ভুত ধোঁকা দিয়ে আমার দিকেই আসছে।
আমার কেমন যেন মনে হয়েছে যে ব্যাঙটা বোধহয় আমায় একটা চুমু খেতে চায়। তা হলেই সে আবার রাজপুত্র হয়ে যেতে পারবে। অবশ্যম্ভাবী ভাবে নীল।
প্রায় কুড়ি পাক দেবার পর জল খাওয়ার জন্য একটু থামলাম। তখনই শুনলাম, আমার মতো করেই ব্যাঙটা আমাকে কিছু বলছে।আমি কোন কথাই বলিনি। খুব একটা গাম্ভীর্য্য বজায় রেখেছিলাম। যদিও ভেতরে ভেতরে খুবই ভয় পেয়েছিলাম। অন্যান্য ব্যাঙেদের মাঝে আমি তীরে বসেছিলাম। যদিও, তারাও বেশ দূরত্ব রেখেই চুপচাপ ছিল। মোটা মত চাঁদ তাদের দেখে বেশ মজা পাচ্ছিল।
আস্তে আস্তে শরীরের বাইরে জলগুলো শুকিয়ে গেল। আমি চিন্তা করছিলাম, যে আমার মন আমার সঙ্গে রসিকতা করছে। এও সেই রসিকতা যার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য, আমাকে মনোবিদের কাছে দৌড়তে হয়েছে, আর খরচাও করতে হয়েছে প্রচুর।
বীচ চেয়ারে বসে সবে তোয়ালে দিয়ে চুলটা জড়িয়েছি, আবার সেই স্বর। এইবার গলার স্বরটা বেশ জোরালোই ছিল। ও যে আমার কাছেপিঠেই আছে সেটা জানার জন্য ওকে দেখার দরকার ছিল না। নিরুপায়, কী আর করি নিজের ভাগ্যকে স্বীকার করে নেওয়াই ভাল। যতটা পারি একটা দুটো শব্দেই প্রাথমিক কথাবার্তা শুরু করলাম। এইভাবে কোন কথাবার্তাই কোন দিকে এগোয় না। খুবই সাবধানতার সঙ্গে, চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখে নিলাম, এইরকম একটা অস্বাভাবিক মুহূর্তের জন্য মনে মনে ভাল প্রস্তুতি নিয়ে নিয়েছি যাতে অবাক হতে না হয়।
জাদু বেশীক্ষণ স্থায়ী হয়নি।
যখন সেই বুড়ো ব্যাঙটা, যে খুবই রুক্ষ,বিশাল,জোরালো আর কুৎসিত, সবশেষে বলল তোমাকে কফি খেতে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমি জানতাম, রাজপুত্রের মতো বাত্রাসিয়ানেরও কোন চুল নেই। আর তার যদি কোন রঙ থাকতে হয়, তো তা হতে হবে সবুজ।
আমার উত্তরটা খুব সুন্দর ছিল। সেটা একেবারে জাদুকাঠির মতো কাজ করেছে। যা তাৎক্ষণিকভাবে লেজ চুপসে দিল। বিশেষতঃ একটা কাল্পনিক লেজ দু’পায়ের ফাঁকে, যা বাতাসে মিলিয়ে গেল। ব্যাঙ গান গাওয়া বন্ধ করল। চাঁদ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।
আমিও তার সাথে হাসলাম। আমি তাকে আন্তরিকভাবে প্রতিশ্রুতি দিলাম যে যদি আমি অন্যকোন এইরকম জাদু পরিস্থিতিতে, নিজেকে খুঁজে পাই, তবে আমি যেকোনো উভচরকে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করব। যদি সে আমাকে যা কিছু এবং স্বাভাবিক ব্যতীত কিছু গ্রহণ করার অজানা প্রস্তাব দেয়।
কিন্তু মূলে ‘এক কাপ কফি’।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন