গন্ধ যেখানে লড়াই করে রাতে

সুব্রত গুহ

কর্নেলের সময় চলে যাচ্ছে। কয়েকদিন আগেই তাঁকে বলে দেওয়া হয়েছে; তাঁর সাবধান হওয়া দরকার। খবরের কাগজ, ম্যাগাজিন, সব লুকিয়ে রাখতে হবে অথবা পুড়িয়ে ফেলতে হবে। যা কিছু সন্দেহজনক মনে হবে। রেড বুক পর্যন্ত। লাল? কি বোকার মত। ডিস্ক, ছবি, সাজ, সবকিছু। পুরোপুরি সবকিছু এমন কি স্মৃতি পর্যন্ত। কর্নেলের সময় চলে যাচ্ছে।

এখন দু’বছর পরেও তাঁর দুঃসময় একইরকম আছে। কতদিন হয়ে গেল একইরকম ভাবে। তাঁর বাড়ীর লিভিংরুমে তিনি বসে আছেন।

সামান্য শব্দ বুঝতেও তাঁকে সংগ্রাম করতে হয়। সামান্য এবং তুচ্ছ শব্দও। তাঁর চোখ পৃথিবীকে বর্ণনা করার জন্য লুকোনো।তাঁর কাছে মনে হয় দূরের কোন জিনিষ, অস্তিত্বহীন। তাঁর কাছে পুরো বিস্মৃতি। সত্তর বছর এবং আমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা আমাকে উজ্জ্বল করে ভাগ্যের সাথে। চিরদিনের জন্য মৃত। যদি এটা আমরা করি অথবা যদি এটা আমরা না করি।

যদি হ্যাঁ যদি না। সবই শাশ্বত অপমান। কিন্তু সবার ওপরে আমরা নিজেরা। এখন আমি কোন কিছুরই তোয়াক্কা করিনা। মিথ্যে কথা: হ্যাঁ আমি তোয়াক্কা করি। এবং অনেকটাই। কিন্তু আগে যদি আমি কিছু না করে থাকি, তা হলে এখন কি করতে পারি। সেই একই অক্ষমতা। না, কাপুরুষ না।শুধুই অ-ক্ষ-ম-তা।

আমি এখনও পুরনো নই। একাকীত্বের এইসব মুহূর্তে, যখন তাঁর স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাঁর নিজের কাজ নিজে করার জন্য। তিনি, যতটা পারেন চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর জীবনের দূর্ভাগ্যের প্রথম দিনটা তিনি খুব ভালভাবেই অনুভব করতে পেরেছিলেন। এটাও এক ধরণের হেরে যাওয়া। শোকাবহ ঘটনার কাছে হেরে যাওয়া।

এখন শুনতে পাচ্ছি। আমার হাত দিয়ে অনুভব করতে পারছি। রঙের কথা শুনতে পাচ্ছি। আর সূর্যোদয়ের জন্য অপেক্ষা করছি। কি যে উদ্দেশ্য, প্রায়ই সেটা হারিয়ে ফেলি। হারিয়ে ফেলি বাস্তবের সুনির্দিষ্ট বোধ।

সাধারণত কল্পনা করি। জান? পরাবাস্তব জগত, মৌন ইউনিকর্ন আর বাতাসে বহুবর্ণ মাছ, সব বেড়ায় ঘুরে। এবং এই কর্নেল। চিরন্তনভাবে এক। আমি এখনও নিজেকে ব্যাখ্যা করতে পারছি না। যতই চেষ্টা করি নিষ্ঠুরতা – সাধারণত মুর্খতা সহকারে – যা নির্দিষ্ট পুরুষদের আক্রমণ করে। লাল বই শেষ।

না, সৈন্যরা কখনই ষাঁড় ছিল না। আচ্ছা এটা স্বাভাবিক। যেমনভাবে বলা হয়: অজ্ঞ লোকের সঙ্গে তুমি পারবে,কিন্তু বোকার সঙ্গে...বুঝতে পারছ। হাত দিয়ে চারপাশটা অনুভব করতে পেরেছিলেন। আসবাবপত্র সব ঠিকঠাক জায়গায় আছে। এবং সেটা জেনে নিশ্চিন্ত হলেন। নেরুদার বই তার পাশে। তিনি চোখ বন্ধ করে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলেন যতক্ষণ না সে আসছে।

তাঁর মনে পড়েছে তাঁর উৎসাহ। ডাক্তার আসবে। হ্যাঁ কোন সন্দেহ নেই মানুষ তাকে বিশ্বাস করবে। তাই হল। সব সময় একই, যারা অতীতকে চায়, তাঁদের অনুভূতি বিক্ষুব্ধ।

এডুকেশনে ডক্টরেট,আর এমনকি একজন দার্শনিক,অশিক্ষিত জনগণের জন্য। আত্মার কেন্দ্রে তাদের মশালের মতো পুড়িয়ে দেয়।তাছাড়াও উদাসীন প্রথানুবর্তী, এর একটা মূল্য ছিল, এটা সাফল্যের দশ বছর। এবং অনেক ভুল কিন্তু শালীন দশটি বছর। একমাত্র, যদি হত। থামো।এখন সবকিছু অন্য রকম। এখনকার দিনে শুধুই উদ্বেগ। জাতীয় অস্থিরতা, প্রত্যাশা এবং বিস্ময়।

আর সেই একমাত্র যা তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট শক্তিশালী করে রাখে।

আসছে না কেন? তার কি হতে পারে? সে অস্থির, প্রায় বিরক্তবোধ করতে শুরু করেছে। আজকেই আমার তাকে দরকার,অন্যান্য দিনের চাইতে। ওকে আসতে দাও। আমি ওর গলার আওয়াজ শুনতে চাই। পেতে চাই ওর শ্বাস। শ্বাসেই একমাত্র কাছে আসা শরীরের আকার বোঝা যায় এবং সেই সঙ্গে থেকে যায় অলভ্য। কিন্তু কি হচ্ছে?

সে যদি মেয়ে হয়,অথবা পনেরো বছরের নয়। কিন্তু খুব ভালো পড়তে পারে। সকালে তার গলার আওয়াজ, সব সাহস, মমতা আর কোমলতা খুঁজে পেয়েছে। পেয়েছে বিরক্তিকর অনুরণনের স্বর।

সে খুব তাড়াতাড়ি বলল, মাতিল্দে, মেয়েটিকে ডাক।

মাতিল্দে তার সঙ্গী, তার বন্ধু, তার প্রেমিকা, তার বিশ্বাসী। তোমাকে ভালবাসি, চিন্তা কোরনা। আসতে বেশী দেরি হবে না। উত্তরটা এল ফিসফিস করে যেন অনেক দূর থেকে।

দরজার ঘন্টি বাজল। মাতিল্দের পায়ের আওয়াজ শুনল। আওয়াজটা তার মাথায় যেন বাড়ী মারছে। এই রকমই ও।

একটা শিহরণ যা মুহূর্তের জন্য পঙ্গু করে দেয়। কি ঘটছে। কঠোর পরিশ্রম,স্বাভাবিক কথা,পড়ার আকাঙ্ক্ষা।নেরুদা।পাবলিতো,লাতিন আমেরিকার নতুন কবিতার উত্থান।

বিপ্লব, চিঠি এবং মানুষদের মধ্যে। মিনিটগুলো পিছলে যাচ্ছে, আর উদ্ধার করা যাবে না, একবার হারালে। আলবাট্রাসের ঝাঁক দিগন্তে। অন্ধকার। মতামত। পড়া, আবার ফিরে পড়া।

কফি খাওয়া শেষ। যা মাতিল্দে অনেক আগেই দিয়েছিল। জ্বর জ্বর লাগছে। শুধু জ্বর জ্বর না, কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি। ও গুডবাই জানাল। আবার কাল আসবে। দাঁড়ালো। করমর্দন করল। কাছে টেনে ঠোঁটে ঠোঁট রাখল, একটু ঘসল। রাগের চাইতে ভয় বেশি। তাড়াতাড়ি বিদায় নিল।

উনি ওখানে। একা। তার চারপাশে পৃথিবী ঘুরে যাচ্ছে। ধ্বংস করে দিচ্ছে। কিন্তু সেইসঙ্গে মহিমান্বিতও করছে। সে বেঁচে আছে। বেঁচে আছে। এই প্রথমবার তার দুর্ভাগ্যের পর থেকে। বেঁচে আছে। লাফাতে ইচ্ছা করছে। উড়তে ইচ্ছা করছে। চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু যেটা সে করল - চুপ করে রইল।

তার মনেও নেই,কতক্ষণ যে,সে এইভাবে রয়েছে।অথবা কখন মাতিল্দে খাওয়ার ঘরে নিয়ে গিয়েছিল। অথবা সে খবরটা শুনেছিল বা সন্তানদের সমস্যা। নাতি নাতনিদের অগ্রগতি। কিছুইতো মনে নেই। শুধু সে। সে।

তার গলার আওয়াজ শুনতে সপ্তাহ পার হয়ে গেল। সে বলল যে সেও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। পরীক্ষার পড়া তৈরি করছিল। মাকে সাহায্য করতে হয়েছে। এবং আরও হাজার গণ্ডা অজুহাত। কিন্তু আমি, তার এতগুলো অজুহাতের একটাও বিশ্বাস করিনি। যাইহোক মাতিল্দে জোর করতে লাগল। সে প্রায় প্রার্থনা করতে লাগল। অবশেষে রাজি। আর কখনও হবে না। তবে তাতে আমার কিছু এসে যায়না।

তার স্বর, তার উপস্থিতি, আমার কাছে যথেষ্ট।

যে খবরটা সে শুনেছে অথবা হতে পারে তার বন্ধুরা বলেছে, তাতে তার যথেষ্ট ভয়ের আশঙ্কা হচ্ছিল। সতর্ক হতে হবে। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে না। সতর্কতা। এমনকি কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থার কথাও তারা বলল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা? সে? কি? তার জন্য? না, না, এত অতিরঞ্জিত করা ঠিক না।

আমাদের সাথে তারা সাহস করবে না। তিনি বললেন। তারা সবার সঙ্গে আর সব কিছুর সঙ্গে সাহস দেখায়।

যাইহোক এখনও তার সন্দেহ ছিল। খটকা, দূর্ভাগ্যবশতঃ তাকে ভুলটা দেখিয়ে দিয়েছে।

দিনের পর দিন, অদ্ভুত নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে ভয়ঙ্কর সব খবর। গণহত্যা, অপহরণ, নির্যাতন ইত্যাদি কত মনকে নাড়িয়ে দেওয়ার মত খবর। রাজনৈতিক কারণের জন্য হারিয়ে গেছে বেশ কয়েক হাজার লোক। কিন্তু না। তার কোন ব্যাপারেই, কোন কিছু চিন্তা করার নেই।

চোখের আলো একটা অপ্রয়োজনীয় শহীদ। পিঠের ওপর পুড়ে যাওয়ার ক্ষত,অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষতঃ যখন তেষ্টা তাকে ভাসিয়ে দিতে শুরু করে।

একমাত্র জিনিষ, যা নিয়েছিল, তা তার রক্ত। যার কিছুটা তখনও ছিল, যখন তার আরেকটা দাঁত তোলা হল। ঠিক। আমি একজন বিপ্লবের মন্ত্রী ছিলাম। হ্যাঁ, আমি এই স্কুলের তৈরিতে অংশগ্রহণ করেছি।আমি কৃষি সংস্কার প্রকল্পের প্রেসিডেন্টকে সমর্থন করি। ডিক্রী, ড্রাফ্‌ট করতে সাহায্য করেছি। কিন্তু ওদের কিছুই বলব না। কিছুই না।

সেই বিকেলে কল্পনা করেছিলেন যে এইরকম কিছু একটা হবে। তার মুখ ছুঁয়ে দেখেনি, এমনকি হাতও না। কিন্তু সে নিশ্চিত ছিল। তার চোখে একটা অন্য জ্যোতি। প্রতিটি রোমকূপে আনন্দ। তারা আমাদের দেখছে। তারা ফ্রান্সিস্কোর বাড়ী লুট করল। কিছুই বাকি রাখেনি। এমনকি বইগুলো পর্যন্ত পুড়িয়ে দিয়েছিল। সৌভাগ্যবশত ও বাড়ীতে ছিল না, বেড়াতে গিয়েছিল।

ও তার বন্ধুদের সব বই নিয়ে যেতে বলেছিল। ওর একটা নিজস্ব নিরাপদ জায়গা ছিল। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে, একটার পর একটা এমনভাবে সাজিয়ে রেখে দিয়েছিল যেন সুন্দর একটা বইয়ের দোকান। সব বইয়ের লাল কভার, আবার সেটা যেন সামনে থাকে, এটাও আবার তার এক নতুন প্রচেষ্টা। এটা একটা চ্যালেঞ্জ।

আমি এভাবে যেতে পারিনা। মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি লেখায় মন দিলেন। তার সব বন্ধুদের ব্যবহার করে, আর যেহেতু দেশের সব পত্রিকা তার কদর করে। দেশের সব পত্রিকায় তিনি লিখতে শুরু করে দিলেন।

খুব তাড়াতাড়িই তিনি শাসকের বিরোধীদের একজন হয়ে ওঠেন। তিনি কোন রকম দ্বিধা না রেখে, অপব্যবহার, নির্যাতন, এবং অপরাধের বিরুদ্ধে লিখতে শুরু করেন। তাকে যারা চিনত আর ভালবাসত, তার প্রশংসা করত, কিন্তু তারা তার জীবনের জন্য ভয় পেত।উনি উদাসীনভাবে,যে কোন পরামর্শ বা সাবধানতার সুপারিশ, উপেক্ষা করতেন।

‘আমরা যেমন সতর্ক আছি, তেমন আমরা সব দিকে নজরও রাখছি’। যারা তাকে সাহস করে প্রশ্ন করতে পারত, এইভাবেই তিনি উত্তর দিতেন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। আমি প্রস্তুত আছি।

লেকটা একটা স্মৃতি তার কাছে। প্রায় ’৫৪ সাল থেকে সুরক্ষিত করে রেখেছে। তার কোমরের বেল্টে আটকে আছে কোনদিন আর খোলা হয়নি। বইগুলো পুড়িয়ে দেওয়া হল। বাড়ীটাও। তিনি যথেষ্টই প্রতিহত করবার চেষ্টা করেছিলেন। তাকে, তার জন্য ধন্যবাদ, যিনি জীবন ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, তাকে কেউ বিশ্বাস করেনি।

সে একা যাবে না। তার মনে পড়ছে, গত দশকের স্বপ্নদর্শীদের। আরও স্বপ্নদর্শী অথবা তিনি নিজে। যে স্বপ্নেই মশগুল থাকে। তার আগেই তার বিবেককে পরিষ্কার করা হয়েছিল। এটাই একমাত্র আশা ছিল। তারা আসবে তা নিশ্চিত ছিল।

তারা আসছে। তারা এল। আর দেখল। তাদের সেই নির্মম দৃষ্টি দিয়ে। দুটো ছায়া মিলে গেল ঘরে আধো অন্ধকারে। আতঙ্কিত এবং কান্নাকাটি। একটি মহিলার কান্নাকাটি রাতের বিষণ্ণতাকে ভেদ করছে।তার পাশে একজন বৃদ্ধ নিঃশব্দে মিটিমিটি হাসছেন। তিনি তার কোমরে হাত রাখলেন। একটা ফিউস গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%