সুব্রত গুহ
নারায়ণা, পীচ ফলের মতো মিষ্টি। তার হাসি নভেম্বরের গোধূলিকে মনে পড়ায়। তার কৌতুহল, তার লাজুক স্বভাবকে অতিক্রম করে। তার অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট প্রাপ্তবয়স্কদের সামনে সে লাজুক আর শান্ত থাকে।
তার এখন পাঁচ বছর বয়সও হয়নি। কিন্তু সে যখন গম্ভীর হয়ে থাকে, কেউ তাকে খুশী করতে পারেনা। এমনকি মনে হয় তাকে পৃথিবীর সব মিষ্টি দিয়েও ভোলানো যাবে না।
তার চুল তাঁদের স্বপ্ন, যারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজেদের কল্পনা করছে হাজার হাজার তারার মাঝে।মাঝরাতে যারা জ্বলছে নিভছে, জোনাকির মত।
নারায়ণা যদি কখনও চোখের জল ফেলে তো তখন তার বাবা মা, তার দাদু ঠাকুমা তাকে লেবুর আইসক্রিম অথবা চকোলেটের টুকরো দিয়ে তাকে খুশী করতে চেষ্টা করে।
যদি কখনও শিশু মেয়েদের শ্রেণী বিভাগ করা হয়, সে ক্ষেত্রে সবাই বলে যে নারায়ণা সেই দলের মধ্যেই পড়ে, যারা প্রথমবারেই বাবা মায়ের কথা মানে না। তার একমাত্র ভয় পাইনের একটা ফল, যা ঝুলছে রান্নাঘরে। তার জন্য সে মাঝেমাঝেই লুকিয়ে পড়ে যাতে তার মা তাকে খুঁজে না পায়।
আজ সে সকাল সকাল উঠে পড়েছে। তার হলুদ গাউন, খাড়া চুল খোঁচার মত, চতুর্দিকে ছড়ানো এলোমেলো, বিড়ালের মত। ভঙ্গুর। বাবা-মায়ের ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে গেল। আজ রবিবার। খবরের কাগজটা দিয়ে গিয়েছে। ওটা রয়েছে দরজার নীচে। হাত নিয়ে খেলায় মত্ত বাবা মা ঘরের মধ্যে।
-তোমার চোখ দুটো কী সুন্দর! – ইভান বলল, তার সঙ্গীকে।
-গতকাল রাতে পূর্ণিমা ছিল। আমার খুব চিজ খেতে ইচ্ছা করছিল। আমি শেষ গুঁড়ো অবধি খেয়ে যেতে পারি। সে তাকে একটা চুমু দিয়ে চোখ বন্ধ করে রইল।
নারায়ণা হাসল, তারপর বাথরুমে ঢুকে গেল ওখানের থেকে বেরিয়েই সে গেল ফ্রিজের দিকে। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে ফিডিং বোতলটা বার করল। ওটা তখনও আধ বোতল দুধ ভর্তি।তারপর সে গেল উঠোনে। ওখানে গিয়ে তাকাল আকাশের দিকে। শান্ত ভাবে শুভেচ্ছা জানিয়ে, বসল কাঠের চেয়ারটায় যেটা তার ঠাকুমার দেওয়া।
দুপুরের আগেই সে টেবিল সাজাতে শুরু করল।একটা নীল টেবিল ক্লথ পেতে তার ওপর নুন, মাখন, চিনির একটা কাপ সব সাজিয়ে রাখল। তারপর আশেপাশের একটা ফুলদানি থেকে একটা সাদা কাটা ফুল নিয়ে এসে সাজিয়ে রাখল।
বিকেলের দিকে মায়ের ব্যাগ ঘাটাঘাটি করে একটা গোল আয়না বার করে নিয়েছিল। ওই দিকে তাকিয়ে,সে দেখল, যে কিভাবে তার দাঁত একটার পর একটা পড়ে গেছে আর কিভাবে এর পরেও কিছু দাঁত পড়ে যাবে।
স্যামন রঙের প্লাস্টিকের গভীর প্লেটটাতে আয়নাটা রেখে দিল, যা শুরু করল সূর্যের শেষ আলো কে প্রতিফলিত করা। সে বারবার যাচ্ছে আর ফিরে ফিরে আসছে কখনো গ্লাস নিয়ে কখনো কাঁটাচামচ বা চামচ নিয়ে। সে সবশেষে একটা বড় প্লেট নিয়ে তার মধ্যে বেশ একটা স্বাদু গন্ধ রয়েছে। টেবিল সাজানো হয়ে গেছে।
ওয়ার্ড্রবের ভেতর থেকে সাদা পোশাকের মধ্যে থেকে সবচাইতে সুন্দর একটা পোশাক খুঁজতে লাগলো। সেটা হাতে নিয়ে হাত দিয়ে ঘষে ঘষে তার কোঁচকানো ভাবটা সমান করার চেষ্টা করলো। এইবার সে প্যান্টালুনটা পড়ে নিল, সেটা সে সারা দিন ব্যবহার করেছে।
উঠোনের দিকে একটা সংযোগ বিচ্ছিন্ন বাতি, একেবারে শেষ প্রান্তে একটা সুন্দর কাঠের টেবিলের দিকে চলে গেছে।ক্রমশ আলো কমে আসছে। রাত হচ্ছে, চাঁদও তার লজ্জা ঝেড়ে ফেলে উঠে পড়েছে। চাঁদটা ঠিক বাড়ীর মাথার ওপর। নারায়ণা এইমাত্র টিভিটা বন্ধ করে দিল। সে তার বাবা-মায়ের কাছ থেকে লুকিয়ে উঠোনের দিকে গেল একটা অসাধারণ ডিনারের জন্য যা কল্পনাতেও আসে না।
তার ছোট ভাই তার পিছন পিছন এসেছে কিন্তু বেচারা এতই ছোট যে দরজার খিল অবধি তার হাত পৌঁছয় না।সে সেটা খুলতে পারলে তবেই পিছন দিকে যেতে পারবে। দরজাটা বন্ধই থাকে।
নারায়ণা বসল। একটা রুমাল নিয়ে গলায় জড়ালো। তারপর আয়না নিয়ে তার দুই হাত দিয়ে একটা বৃত্ত তৈরীর চেষ্টা করতে লাগল।প্রথমে খুবই তাড়াতাড়ি, ক্রমশ আস্তে আস্তে। চাঁদের গতি আয়নার চাইতে বেশী। যতক্ষণ না সব ঠিক আছে, ঠিক হচ্ছে। মাঝখানে, আস্তই আছে, আর প্রায় ফাটব, ফাটব ভাব।
নারায়ণা ক্রশ আঁকল, তারপর চোখ বন্ধ করল। ছুরিটা নিয়ে আরেক হাতে প্লাস্টিক হোল্ডার ধরে কাটা শুরু করলো। একটা বেশ বড় কেকের টুকরো নিয়ে খেতে লাগলো।
বোতলের নিপলে সীপ দিয়ে একটু ঠাণ্ডা দুধ খেয়ে নিল। তার মুখের মধ্যে খেলা করছে হালকা একটা হাসি আর আক্রোশ।
চাঁদের প্রায় অর্ধেকটা খেয়ে নিয়েছে। তারপর প্লেটটা, আয়নাটা নিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ী চলে গেল।তার মা তাকে দেখে খুবই রাগ করে তাকে শুয়ে পড়তে বললো।
সে তার হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হাসতে লাগলো। ভাইকে একটা চুমু দিয়ে ঘুমোতে গেল পরের দিনের জন্য।
আজ তো নারায়ণা আগেই উঠে পড়েছে। অন্ততঃ অন্যান্য দিনের তুলনায়।সেই একইরকম হলদে গাউন, খাড়া এলোমেলো চুল,বেড়ালের মতো ভঙ্গুর অবস্থান। বাবা-মায়ের ঘরের সামনে দিয়ে গেল। আজ সোমবার। দরজার তলা দিয়ে কাগজটা উঁকি দিচ্ছে। বাবা মা হাত নিয়ে খেলা করছে।
-তোমার ঠোঁট দুটো কী সুন্দর! - ইভান বলল
-কী অদ্ভুত! গত রাতে পূর্ণিমা ছিল না। মনে হচ্ছে কেউ যেন এসেছিল আর এর অর্ধেকটা খেয়ে গেছে।
নারায়ণা হাসলো। তারপর বাথরুমে ঢুকে গেল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন