ট্রেনের ষ্টেশন

সুব্রত গুহ

এই বছরটা খুব তাড়াতাড়ি কেটে গেল।

সকাল থেকে একটা ব্যাপার আমি ভাল করে বুঝতে পারছিলাম, যে দিনগুলোতে মনটা ভারী হয়ে থাকে বিষাদে, সেইদিন বৃষ্টিও হয় ভারী। বেশ কয়েক ঘন্টা হাঁটার পর এসে পৌঁছলাম ট্রেন ষ্টেশনে। কোন পকেটেই কোন টিকিটি নেই। অসম্ভব খিদে পেয়েছে। আমার মরে যেতে ইচ্ছা করছে। সত্যি কথা বলছি। আমি স্বীকার করছি। কিন্তু এর চাইতেও খারাপ যদি আমায় জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়।

হতাশার এও একটা ভাল দিক। কোন কিছুই ঠিকঠাক না গেলেও জীবনকে অনুভব করা যায়।

আমাদের শক্তি খুব বেশি নেই, থিওদর বলল আমাকে। ওর চোখ দুটো কেমন যেন। দৃষ্টিটাই অন্যরকম। ওই আধো অন্ধকার ঘরে ভাল বোঝা না গেলেও বেশ নিষ্প্রভ।আমরা খুব ভয়ে ভয়ে কথা বলছিলাম।নিজেদের গল্পও বলছিলাম। গলা গুলো কাঁপছিল, যন্ত্রণাময় এবং ক্লান্ত। ওরা কিন্তু আমাদের জন্য আসবে, বললাম, বেঁচে থাকার আশা ছাড়াই।

সার্জেন্ট পাদিয়া, আমাকে সাবধান করেছিল। একটা সিগারেট ঠোঁটের মধ্যে নিয়ে সে বলেছিল, আমি তোমার মুক্তিপণের টাকাটা নিয়ে নেব আর মৃত লোক দিয়ে দেব। ওর কথাগুলো খুবই দৃঢ় ছিল। যেন মৃত্যু আমার জীবনের শেষপর্ব অগ্রিম দিয়ে দেবে। আমি তাকে কোন রকমে ধন্যবাদ জানালাম। কারণ যে মানুষ জানে, তার অন্তিম ভবিষ্যত কি তার পক্ষে এটুকুই যথেষ্ট। ওর কাছ থেকে তীব্র ভাবে পালাতে চেষ্টা করলাম।

অনেক পরে সার্জেন্ট পাদিয়া, তার সিগারেটটা আমার পায়ের গভীরতম ক্ষতের ওপর চেপে দিল। সে অন্য আরেকটা ধরাল আর শেষে ওই একই কাজ করল। ইতিমধ্যে আমার যন্ত্রণার শেষ নেই। তার ওপর ওরা আমাকে আমার কুঠুরীতে ছুঁড়ে দিল। ক্ষতটা সারছে একটু একটু করে।

ঠিক কতদিন আমি লক আপে আছি, সেটাই ভুলে গেছি। কিন্তু একটা ব্যাপার আমি খেয়াল রেখেছিলাম, কতদিন ভেবেছি যদি আগামীকাল অবধি বেঁচে থাকি। এটা স্পষ্ট ছিল, আগের চাইতে অনেকদিন বাঁচতে চেয়েছিলাম। স্মৃতিতেই অনেকদিন বাঁচা যায়। তাই করতে পারতাম।

স্মৃতিতে সবসময়ই কিছু অনিশ্চিত কাদা লেগে থাকে। কানের ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। হাওয়াটা পুড়িয়ে দিচ্ছে। থিওদরের সঙ্গে আমিও অনুভব করছিলাম একই ভাবে। গভীর ভাবে অসুখী। ও যখন আমাকে ওর জীবনের গল্পগুলো বলছিল, ওই অন্ধকার, শত্রু, শাস্তি আর স্থূল অস্তিত্বের মধ্যে বেঁচে থাকা।

আজ অন্য ব্যাপার। একঘেঁয়ে হেঁটে চলা। এত একা আর স্বার্থপরের মত। ক্লান্তিকে আলিঙ্গন করে চুম্বন করি। আমার লজ্জা, আমাকে এই ট্রেন ষ্টেশনে পীড়িত করে। মাটি ক্রমশঃ ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আমি জানি যে মাঝে মাঝে আমাদের মুখ দেখা দরকার।

আমার মুখের মধ্যে, নতুন একটা ক্ষতের দাগ পাওয়া গেছে। এটা প্রমাণ করে যে আমি এই শেষ দিনে বাস করেছি। এখন আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, ট্রেনগুলো তার পাশ দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে, যেন একটা বিশাল সাপ তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে। শক্তিশালী ষ্টীলের সাপ।

সবে শীত পড়তে শুরু করেছে। মোটামুটি ঠাণ্ডা, ক্ষুধা, বৃষ্টি। চারপাশে বৃষ্টি। থিওদরের একই ছবি। যখন সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তার চোখের পাতা সবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যা তার ঘুমকে বিঘ্নিত করছিল। হঠাৎই ঘুম ভেঙ্গে, তাকাল নতুন সূর্যের দিকে। একটা দুর্দান্ত খবরের ওপর মন্তব্য করল।

গতকালের চাইতে আজ আরও ঠাণ্ডা। অনেক বেশি বিষণ্ণ। ও বলল মাঝে মাঝে। এই সময় অনুভব করছি অনেক দূরে কিন্তু যেখানে বাতাসে নির্মল গন্ধ আর অজানা।

এইভাবে যদি আমরা আলাদাও হই। প্রতিদিনের দমিত জীবনে আমরা আরও এক হয়ে যাচ্ছি। এমনকি সার্জেন্ট পাদিয়া পর্যন্ত বিভ্রান্ত।

এখন আমি জানি না আমি কে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%