ডি এল (ওল্লি কে)

সুব্রত গুহ

পুলিশের লোকটা আমাকে ভালভাবেই পরীক্ষা করল এবং হঠাৎই।যাকে বলে তন্নতন্ন করে। শেষে আমাকে ছেড়ে দিল ছোট একটা ভঙ্গিমা আর একটাই শব্দ যাও। ধন্যবাদ বলেই, বুঝলাম কোন দরকারই ছিল না বলার। কারণ ওটা তো ওর কর্তব্য, আমাকে ছেড়ে দেওয়া। এই অকারণ বিনয়টাই আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট। এইভাবেই তৈরি হয়েছে আমার চরিত্র, সব সময়।

আমি রাস্তায় মারাত্মক এবং বিপদজনকভাবে মারামারি করেছি। মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছি প্রতিবাদ করে। খুবই বদরাগী এমনকি সাইকোটিক স্বামীদেরও মুখোমুখি হয়েছি। সবদিক থেকেই নিজেকে একজন ডাকাবুকোই মনে করতাম। কিছুতেই বুঝতে পারছি না যে হঠাৎ কেন আমি এত বিগলিত হয়ে গেলাম। বিশেষতঃ এই বয়সে এসে, অতিরিক্ত বিনয় তাও একটা সাধারণ পুলিশের কাছে।

অথবা যদি ঠিকঠাক জানা যায়, এটা পুরোপুরি আমার বাবার জন্য।

আমার বাবা কোনদিন মিলিটারি হতে পারেনি। কিন্তু হতে চেয়েছিল সারা জীবন ধরে। বাবার কিন্তু মিলিটারিদের ওপর, অসামান্য শ্রদ্ধা ছিল। শুধু মিলিটারি নয়, পুলিশকেও। তাই-ই বা বলি কেন। যে কোন কেউ, যে কোন পেশায়, ইউনিফর্ম পড়া থাকলেই তার প্রতি বাবার শ্রদ্ধা ঝরে পড়ত।

যেহেতু আমি সবসময় বাবাকে খুবই ভয় করতাম, এমনকি এখনও, মাঝে মাঝে যদিও তিনি মারা গেছেন। কিন্তু ভয়টা রয়েই গেছে। তবে সময় সময় মিলিটারি, পুলিশ, এমনকি দমকলের লোকেদেরও ভয় করি। যাইহোক তার কাজ। আমি পুলিশদের কাজের কথা বলছি। ওই বিশেষ সময়ে তার কাজ খুবই হাস্যকর ছিল।উৎসবের আগে অস্ত্রে সন্ধানে,লবিতে ঢোকার আগে প্রত্যেক অতিথিকে সার্চ করছিল। সত্যি কথা বলতে কি? ক’জন লোক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে, দালাই লামার সভায় যাবে?

ওই ঘটনার পর ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। কত লোক লবিতে।সবাই ওপরে ওঠার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। এত লোক সবাই কি বৌদ্ধধর্মা- বলম্বী। সন্দেহ আছে। প্রত্যেকে একে অন্যকে সম্ভাষণ জানাচ্ছে, অভিবাদন জানাচ্ছে। একে অন্যকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। অনেকেই অনেককে চেনে। আমার মনে হয়েছে এটা একটা গালা ডিনার, যেখানে সবাই হাঁটছে কিছু ব্যতিক্রমী সুখের সঙ্গে।

সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেলাম। সিঁড়িটা বেশ চওড়া চেষ্টা করছিলাম যদি ধাক্কাধাক্কি না করে ওঠা যায়। সেই ভাগ্য কি আর আছে। যদিও সিঁড়িটা যথেষ্ট চওড়া, কিন্তু এত লোক। সব লোক মিলে একটা শরীর তৈরি হয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল,বিশাল এক শুঁয়োপোকা।অসাড়,সুগন্ধযুক্ত ও ঘামে ভেজা। সেই নিয়ে চলেছে।

মনে মনে চাইছিলাম, যেন চেনা জানা কারও সঙ্গে, দেখা না হয়। এই ধরণের হঠাৎ মুখোমুখি দেখা, আমাকে খুব নার্ভাস করে দেয়। ভাগ্য সহায় ছিল,তাই চেনা জানা কারও সঙ্গে দেখা হয়নি।আমাকে কেউ নজরও করেনি। তবে মনে হয় এ ব্যাপারে সাহায্য করেছে আমার ম্লান অথচ সদা সতর্ক মুখাবয়ব।

ওপরে তিন তলায়, অতিথিদের ঠেসে দিয়েছিল, ভুল ভাবে। তার ওপর গুঞ্জন। কি গোলমাল। মাথার ওপরে একটা মাইক কি সব বলে যাচ্ছে। যাই হোক শেষ পর্যন্ত ওই ঘুরে ঢুকতে পেলাম।

প্রথম মহৎ সত্য: কষ্ট পাওয়া

প্রতিটি সিটের গায়ে নম্বর দেওয়া। ফলে নিজের সিট খুঁজে নেওয়াটা কোন ব্যাপার না। আমি নিজেই নিজের সিট খুঁজে নিলাম।

অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই, চারপাশ দেখতে শুরু করে দিলাম। চারপাশে মনে হচ্ছে কথাবার্তার পাহাড়। কথার কিছু টুকরো। ঠোঁটের নড়াচড়া। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু বলছেই, ওই নরকে। আপাতদৃষ্টিতে প্রত্যেকেই কিছু বলতে চাইছে। কেন যে আমার কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। বিশেষতঃ যখন আমি কারো সঙ্গে থাকি, কোন কথা আমার মাথাতেই আসে না।

সম্ভবত এটাও বাবারই দান। খাবার টেবিলে বসে যখনই, কোন কথা বলতাম তখনই আমাকে চুপ করিয়ে দেওয়া হত। হয়ত সেই জন্যেই, সহ্যই করতে পারিনা কথার উষ্ণতা। একটা দৈত্যের মত গুঞ্জন আমাকে ঘিরে ধরেছে। ভেতরে ভেতরে, মনে মনে এই অপ্রয়োজনীয় আওয়াজকে মশানে নিয়ে গিয়ে নীরবতার গিলোটিনে চড়িয়ে দিই।

দ্বিতীয় মহৎ সত্য: কষ্টের কারণ

হঠাৎ করে সবাই চুপ করে গেল। মনে হল আমার গিলোটিনে চড়ানোর স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল। কিন্তু আমার কল্পনা অথবা কামনা, কোনটাই এই নীরবতার সৃষ্টি করেনি। এই নীরবতার কারণ হল: হিস হোলিনেস, তেনজিন গিয়াৎসু, তিব্বতের চতুর্দশ দালাই লামা, ঘরে ঢুকেছেন।

সমস্ত কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেছে। জনগণ শ্রদ্ধা জানাতে উঠে দাঁড়ালো। আর মুখগুলো, মনে হল, বিস্ময়ের জন্য আগ্রহী। আমিও উঠে দাঁড়ালাম। ওই আর কি,জাড্যে।ভাল ভাবে বুঝতেই পারছিনা কি ঘটছে। পরে বসে পরলাম। শান্তও হয়ে যাচ্ছিলাম। আমার বুঝতে একটু সময় লাগল যে সত্যিই দালাই লামা কথা বলা শুরু করেছেন।

তাঁর ডানদিকে বসা অনুবাদক, ইতিমধ্যে ওনার কথা অনুবাদ করা শুরু করে গিয়েছে। জনতাও ওনাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি না কথার মানে ধরতে পারছি না বিষয় সম্বন্ধে কোন ধারণা করতে পারছি।

(সন্ন্যাসী তো তার কথাগুলো কোনরকম দ্বেষ বা ঘৃণা ছাড়াই উচ্চারণ করছিলেন। তার উষ্ণ শ্বাসের সাথে গাম্ভীর্যের দৃঢ়তাকে, কাঠিন্যকে বাতিল করে দিয়েছিল।এমনকি লাউঞ্জ গায়কের মত সামান্য রসিকতাও করছিলেন।)

আমার বেশ কিছু সময় লাগল। কিন্তু এখনও কিছুই বুঝতে পারছিনা। এই মুহূর্তে আমি বেশ স্বস্তিতে। সেই সঙ্গে দালাই লামার গলার স্বর,আওয়াজ বেশ ভাল লাগতে লাগল। (অথবা অনুবাদকের বিচক্ষণ স্বর) দালাই লামার কণ্ঠস্বর আর ওই ক্ষমার অযোগ্য গুঞ্জন কোন তুলনাই চলে না। দর্শক স্রোতা সব সম্মোহিত।

প্রেসের ক্যামেরাগুলো দালাই লামাকে নানা দিক থেকে ধরে রাখছিল। ধরে রাখছিল তাঁর দ্যুতি। তাঁর পোষাকের প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি অংশ, তাঁর ওই নিখুঁত লাল পোষাক। তাঁর মাথা মসৃণ এবং সরল কপাল। তাঁর হাত উষ্ণ ভাবে নেড়ে মনোযোগ সহকারে কোন যুক্তি, সরিয়ে দেন। সেইসময় তাঁর শান্ত উর্দ্ধাঙ্গও কাঁপতে থাকে।

হয়ত জনতার, সবাই নিশ্চয়ই নয়, কিছু অংশ অবশ্যই বৌদ্ধ। কিন্তু যাই হোক সবাই কিন্তু সম্মোহিত।আমার কোন ধারণাই নেই,এই যে লোকেরা এসেছে, এই দিন, তাদের মধ্যে কতজন প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসের টানে এসেছে। অথবা অসুস্থ, কিন্তু অনুসরণ করে সব কিছু।

যেমন তিব্বতীয় ব্যাখ্যায় দোষী, ব্যাভিচারী, যদি তার স্বামীর নির্দেশ অনুসারে কাজ করে, পাপ কাজের সময় ধরা পড়লে: অকপটভাবে, বৈষম্যমূলক ছাড়া, সানুনয় কৃতজ্ঞ হয়ে থাকবে। নারীদের চোখের উজ্জ্বলতা লক্ষ করার জন্য ওখানে থাকার দরকার। তেমনি পোষাক।

অবশ্যই নিচে দেহরক্ষীরা অপেক্ষা করছে, তাদের জন্য। কিন্তু মহিলারা ও ব্যাপারে চিন্তাই করেনি। তারা প্রকৃতপক্ষেই নিরবচ্ছিন্ন লেকচারের মধ্যে ডুবে ছিলেন। দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে একটা বড় অংশই মহিলা। কেউ কেউ যথেষ্ট সুন্দরী। অনেকেই বৌদ্ধধর্মীদের মত পোষাক পরেছেন। আবার কয়েক জন লেসবিয়ানদের মত। বাকীদের মধ্যে অনেকেই তাদের বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। তাদের বিরক্ত লাগছে। একঘেয়ে লাগছে। বারবার হাই তুলছে। তাদের আকর্ষণ বা আকাঙ্ক্ষা হোটেলের করিডোরে খেলা করবে। কিন্তু তারা জানে না আকাঙ্ক্ষাই কষ্টের কারণ।

তৃতীয় মহৎ সত্য: কষ্টের অবসান

দালাই লামা, তাঁর ব্যাখ্যা ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, আমিও ততই আমার চারপাশের ব্যাপারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলাম। সংবাদপত্রের ক্যামেরা ছাদ থেকে ঝোলানো বড় বড় আলো। এয়ার কন্ডিশনার। সন্ন্যাসীদের ন্যাড়া মাথা, লাল হলুদ পোষাক, কাশি, গলা খাঁকারি। প্রত্যাশা। আমার প্রতিবেশীর প্রাণবন্ত সুগন্ধি। এমনকি ওইভাবে মজা লাগছিল যখন হিজ হোলিনেস তাঁর বাহু চুলকোচ্ছিলেন।

এই মুহূর্তেই তাকে দেখলাম। প্রকৃতপক্ষে সে ছিল মিরনা ম্যাক।

চতুর্থ মহৎ সত্য: পথ

এক নম্বর পথ বলছে: এটা সম্ভব নয়। আমি অলীক স্বপ্ন দেখছি। সম্ভবতঃ এটি কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা, একটি প্রতারণাপূর্ণ ছবি। মনের ফাঁদ। আমার বসার আসন ধরে রেখেছি হয়ত আমি তাকে অন্য কারো সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছি। হতে পারে তার বোন। কিন্তু না। তার বোন নয়, এটা নিশ্চিত। তার বোনকে ভালই চিনি। একজন বিখ্যাত মহিলা, সবসময় কাগজে ছবি বেরোচ্ছে।

তার মুখতো আমার পরিচিত। এর পাশাপাশি মিরনার মুখটিও আমার কাছে যথেষ্ট পরিচিত। সবসময় বা সবাইকে বলিনা (যে স্মৃতি আমাকে কষ্ট দেয়)। কিন্তু এখন বলব। কি আর হবে? কি এসে যায়? মিরনা, আমি প্রেম করছিলাম। আমাদের প্রেম খুব বেশী দিনের নয়। মেরে কেটে মাস দুয়েক। কিন্তু আমাদের প্রেম খুবই ঘনিষ্ট আর গোপন ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই সম্পর্ক কেউ জানত না।

এই দুমাস আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মাস। ওই সময়ে ও কাজ করত যুদ্ধে গৃহহারাদের সঙ্গে আর আমি (ওটা কোন জরুরী ব্যাপার নয়) তার সঙ্গে সহযোগিতা করতাম। আমিও শরনার্থীদের সঙ্গে কাজ করেছি। আমার মনে হয়, ওটা আমার নিজেকে জাহির করার ব্যাপার ছিল। বাবার বিরুদ্ধে, যা উনি এতকাল করে এসেছেন।

বাবা চিৎকার করে আমাকে বললেন তুমি কম্যুনিস্টদের সঙ্গে কাজ করছ। আমার বন্ধুদের মাঝে ছেড়ে দিলে, তারা তোমায় পিটিয়ে সোজা করে দিত। তুমি এই পরিবারের জন্য লজ্জা। তুমি যে কী? বোধহয় এটাই! তার বন্ধুরা অবশ্যই সামরিক বাহিনীর লোক ছিল।

বাবা যত চিৎকার করে, তত আমি কাজে জড়িয়ে পড়ি। যেদিন মিরনাকে মেরে ফেলা হল, সেদিন থেকেই শরনার্থীদের সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করে দিলাম।

তখন আমি বুঝতে পারলাম, এসব কিছু না। সংগ্রাম, অবাধ্যতা, এগুলোর অন্য অর্থ আছে। আমার বোধ হল, উদ্বাস্তুদের সঙ্গে যে কাজ করি এটা কেউ পছন্দ করেনি। কারণ বাবা কোনদিন আমায় ভালবাসেননি। তাই আমারও নিজেকে উদ্বাস্তু মনে হত। ক্রমশ অন্যান্য ব্যাপারেও আগ্রহী হতে শুরু করলাম। বৌদ্ধ ধর্মেও আগ্রহ তৈরি হল। এমন নয় যে কোন বৌদ্ধ কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। বুদ্ধ সম্পর্কে অনেক কিছু পড়তে শুরু করেছি।

মিরনাকে যখন মেরে ফেলা হল বাবা তখন খুবই খুশী হয়েছিলেন। খুব

ভালো হয়েছে যে ওরা ওই গেরিলাকে শেষ পর্যন্ত মেরে ফেলেছে। ওই যত সমস্যা সৃষ্টিকারী। প্রথমে ভেবেছিলাম যে ভুল করেছেন, খুবই ভুল। মৃত্যুর যোগ্য। কিন্তু হায়, আমি কখনও খুন করতে যাচ্ছি না। যেকোনো ভাবে মারলেই কোন কিছুর বদল হবে না। শুধু আমার মাথার মধ্যে থেকে যাবে ভূতের মত।

আমি অস্বীকার করছি না, যে যখন এই মন্তব্যগুলো করেছিলাম, তখন আমার খুব রাগ হয়েছিল। যা ব্যাখ্যা করতে চাই তা হল, ওই রাগ আমার মধ্যে, বিরাট বড় চমৎকার কিছুর মত ছিল। কিন্তু নিরর্থক।ফলে প্রত্যেকবার এইভাবে প্রকাশ করেছিল, আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম।কোনরকম অসম্মান বা ওইরকম কোন কিছু করে সাড়া দিতাম না। কোনরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যেতাম না। চিৎকার করা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তার মতো হতে চাই না।

শেষ পর্যন্ত বাড়ী ছাড়লাম। নিজস্ব একটা থাকার জায়গার ব্যবস্থাও হল। যেখানে শান্ত, সতর্কতা সহ বিচক্ষণ অস্তিত্ব থাকবে।সকল সমস্যা থেকে দূরে।

অনুবাদকের কাজ পেলাম। খুব বেশি টাকা রোজগার হতো না, কিন্তু আমার একার পক্ষে যথেষ্ট।সবচাইতে বড় কথা ছিল এটা ছিল সৎ ভাবে উপায় করা অর্থ।

মাঝে মাঝে মিরনার কথা ভাবতাম।চেষ্টা করতাম যাতে ভাবতে না হয়। কখনো কখনো রাতে তার মুখটা আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠতো।চেষ্টা করতাম সরিয়ে দিতে, অন্য কোন কিছু নিয়ে চিন্তা করতে। আমার কাজ নিয়ে চিন্তা করতে, নিজেকে কাজে লাগাতে।

আর এখন মিরনা আমার থেকে কয়েক হাত দূরে বসে দালাই লামার কথা শুনছে। আমার খুব ঘাম হতে শুরু করেছে।নিজের হাত দুটো খুব জোরে চেপে ধরলাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই হাতদুটো ছেড়ে দিলাম।ও দুটো কেমন যেন চটচটে হয়ে গেছে, পিছলে যাচ্ছে। আমার মন আমাকে বলল ‘এটা অসম্ভব। এটা অবশ্যই মরীচিকা। তুমি পাগল হয়ে গেছ। শেষ পর্যন্ত তুমি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেলে।

কিন্তু মিরনা হাসছিল। দালাই লামার প্রতিটি কথায় যা তার মুখ থেকে বেরোচ্ছে তাতেই মিরনা মাথা নাড়ছে। এ কে? আমি বেশ জোরের সঙ্গেই কথাটা বললাম।আমার প্রতিবেশী যথেষ্ট উদ্বেগের সঙ্গে আমার দিকে তাকালো। জানিনা এটা ওকে বিরক্ত করেছে কিনা। আমি তাকে কোনভাবেই কিছু বলিনি। কারণ আমার ভয় করছিল, যে মিরনা কোনভাবে বেঁচে আছে। অস্বাভাবিক ভাবেই বেঁচে আছে।ভয়টা আকস্মিক একটা বিড়ালের মত ক্ষণিক ছিল। আমি ছুঁয়ে দেখিনি, শুধুই চেয়ে দেখেছি।

আমার ভাল লাগছে না।এটাই আমার সিদ্ধান্ত। জোরে শ্বাস নিতে হবে। বাস্তবে ফিরে আসতে হবে। আমি তো দালাই লামার সভায় রয়েছি। দালাই লামা, জীবনের চারটি মহৎ সত্যের কথা বলছেন।এটা শুনতেই এসেছি।বাবার সম্বন্ধে কিছু না। তার অত্যন্ত কষ্টদায়ক নিষ্ঠুর মৃত্যুর কথা নয়। খুবই কষ্টের ক্যান্সারে। মরার আগে স্নেহপরবশ হয়েছিলেন। আমার হাত ধরে, ম্লান হাসি দিয়েছিলেন।

জানতে চাইনা মিরনা ম্যাকের সম্পর্কে হয়ত একমাত্র মহিলা যাকে ভালবেসেছিলাম। চোদ্দো বছর আগে, শরীরে সাতাশটা ছোরার আঘাত নিয়ে মারা গিয়েছিল। আমার মিলিটারি, পুলিশ কোন ইউনিফর্মের কোন ভয় করার দরকার নেই। মিষ্টি স্বর শুনতে চাই। সম্মোহক হঠাৎ দুঃখ তার পবিত্র কথা শুনতে চাই। এই মিষ্টি কথা আমার ভেতর সুরের মত ঢুকছে। বরং নিয়ে আসছে ধৈর্য্য, শান্ত সুখ।

সব কিছু, এমনকি দালাই লামার কথাগুলি যেন নরম দুধের ওপর দিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি না কি বলা হচ্ছে। অথবা অনুবাদককে শুনছি। সুরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে আমার ওপর। আমাকে নগ্ন করে দিচ্ছে।করে দিচ্ছে শুষ্ক। ঠিক আছে, এই শুষ্কতা, শুকনো ক্ষতের মত শুষ্কতা একটা ফাটল যাতে শ্বাস নেয় জীবন, করে লক্ষ্য।

মিরনা ম্যাক এখনও ওখানে রয়েছে। দালাই লামাও তার দিকে চেয়ে হাসলেন। সেও ফিরে হাসল। ওনার হাসি অনেকটা আমার বাবার মত। যে হাসিটা তার মৃত্যুর আগে দিয়েছিলেন।

এইবার থেকে, ঠিক এইরকম হাসিই, হাসতে চাই। সুতরাং আমি শরনার্থীদের সঙ্গে এই রকমই হাসব, যারা উদ্বাস্তু।

লোকেরা উঠে দাঁড়াচ্ছে। হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছে। অমায়িক ভাবে ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেন দালাই লামা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%