সুব্রত গুহ
এটাই আমি। চোখের চারপাশে রক্তবর্ণ বৃত্ত। লিকলিকে দুটো ঠ্যাং। ফ্যাকাশে অভিব্যক্তি। ওই হচ্ছে আমার মা। খুব লম্বা, খুব পাতলা, খাড়া সোজা। এই আমরা দুজন। আমরা দুজন।
তিনটে পঞ্চাশ, বিকেল। আমার বাড়ীর দরজার গায়েই স্কুল বাসটা দাঁড়ায়। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চলে যায়। সহপাঠীদের ‘বাই’ পর্যন্ত বলার অপেক্ষায় থাকে না। মার্তিনা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। একটাও কথা না বলে ব্যাকপ্যাকটা নিয়ে নিল। ঢুকতে ঢুকতেই রান্নাঘর থেকে বেসিলের গন্ধ। আজ স্প্যাগেট্টি খাওয়ার দিন। সোমবার আমাদের এই মেনু।
আজ সোমবার। যতক্ষণ না রাত আসছে, ততক্ষণ সোমবার।মা এখনও কাজের থেকে ফেরেনি। সাড়ে ছ’টার আগে তো নয়ই। যদিও তার ভলভো গাড়ির আওয়াজ শুনিনি। বা গাড়ি পার্ক করার শব্দও শুনতে পাইনি। তেমনই শুনতে পাইনি, মেঝেতে তার বিশাল হিলের শব্দ। এসেই দাসীকে বলবে ‘মার্তিনা, ঘরে ঢোকার জায়গাটা পরিষ্কার করে দিও। দেখো তো কিরকম নোংরা হয়েছে’।
তারপর চোখ পড়বে আমার দিকে। আমি বসে আছি। সব সময়ই বসে থাকি। চারপাশে ছড়ানো পাতা আর নোটবুক। হাতে সাদা আঠা আর কাঁচি ও পৃথিবীর ম্যাপ। হোমওয়ার্ক করছি আর হোমওয়ার্ক করছি। হোমওয়ার্কেই পুরো বিকেলের প্রতিটা মিনিট ভর্তি।
এইবার চশমাটা খুলবে। যেটা একটা সোনার শেকলের থেকে ঝোলে। যেটা আবার পরে নিয়ে সব কিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবে। ওপর থেকে নিচে, এপাশ থেকে ওপাশ।এবার পরের খাতা। আর মাথা নেড়ে হ্যাঁ বা না।
একটা শীতল চাহনি দিয়ে আমার দিকে মুখ ফেরাল। আমি ভয় পাই। খুব ভয় লাগে। তখনই কথাগুলো বলা শুরু হয়।
-তোমাকে ওই চিঠিটা আরও ভাল করতে হবে। ওইসব হাবিজাবি যা করেছ ওগুলো আর দেখতে চাইনা। দেখো নোটবইটা কি নোংরা।কি ভয়ঙ্কর। এরপর কেউই তোমার সঙ্গে কথা বলবে না। তারা আমার সম্বন্ধে বলবে। তুমি কি চাও তারা আমার কথা বলুক ... উত্তর দাও।
-না
-কি বললে –শুনতে পাইনি।
আমি একটু জোরের সঙ্গেই না বলব। তারপর চুপ করে থাকব। শেষে কাঁদতে চাইব। কান্না পায়। একটা অপরাধের অনুভূতি আমার ভেতরে চারিয়ে যায়। মনে হয় ক্ষমা চাই। কিন্তু তার কাছে ওসবের কোন মূল্য নেই। ওসব কাজ করবে না।
স্কুলে একটা সম্মানজনক গ্রেড পেতে আমাকে হোমওয়ার্ক যথাসাধ্য ভাল করতে হবে। এরপরই শাস্তি। সেটা তার তাকানো। ওই তাকানোর সামনে দাঁড়ানো যায় না। পুরো শীতল আর সর্বত্রগামী। কোনভাবেই এর থেকে লুকিয়ে রাখতে পারিনা। এমন কোন জায়গা যেখানে পৌঁছে, লুকোতে পারি।
খাতাগুলো গুছিয়ে তুলে নিলাম। উনি সে সময় উঠে গাড়ি থেকে একটা কালো ব্রিফকেস নিয়ে এলেন। টেবিলে অন্যদিকে বসে বিভিন্ন ফাইল পরীক্ষা করতে লাগলেন। একটা পা, অন্যটার ওপরে চাপানো। জুতোর কিছুটা খুলে দোলাতে শুরু করলেন।
আমি উঠে পড়লাম। একটা পেন্সিল শার্পনার নিয়ে এলাম। চেষ্টা করতে থাকলাম যাতে কোনরকম আওয়াজ না হয়।উনি বাড়ীতে কোনরকম হট্টগোল পছন্দ করেন না। সেইজন্য কেউ টেলিভিশন চালায় না। সাতটার মধ্যেই আমার সব কাজ হয়ে যায়। এবার আমি উঠতে পারি। নিজের ঘরে ঢুকে বাথরোবটা পড়ে নিই। দিনে দুবার চান করা শরীরের পক্ষে ভাল। জোরে জোরে গা ঘষে নিয়ে, ঘরে এসে পাজামা পড়ে নিলাম।
মিষ্টি রুটির সঙ্গে ওটমিল নিলাম। আর কিছু না। ঘরের বাইরে মা তার কোর্টের রেকর্ডের পর্যালোচনা চালিয়ে যাবে। কাছে গিয়ে গালে একটা চুমু দিলাম। ওই একটাই দেওয়ার অনুমতি আছে। খুবই উদাসীনতার সঙ্গে তিনি কাজ করে চলেছেন।
আমার ঘরের মধ্যে অন্ধকার দেখছি। দরজার তলা দিয়ে ঘরের মধ্যে আলো ঢুকছে। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। সবকিছুই শান্ত নীরব। প্রথম আওয়াজ শোনা গেল এরপর। গলার স্বরটা ধাক্কা খাচ্ছে। প্রার্থনার মতো ফিসফিস। যা আমার চারপাশকে ঘিরে রেখেছে। এটা আমার স্বর যার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।
একটা প্রতিধ্বনি যা জড়ো হচ্ছে। আমার শরীরটা এতই হাল্কা হয়ে গেল, যে সেটা অদৃশ্য হয়ে গেল। যা মুছে যায় অন্ধকারের মধ্যে।
আগামীকাল মঙ্গলবার। বুধ, বৃহঃ, শুক্র, শনি, রবি। সোমবার পর্যন্ত। ভবিষ্যতের সোমবার। আরেকটা সোমবার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন