সুব্রত গুহ
বৃষ্টিটা হঠাৎই নামল, একেবারে শহরের কেন্দ্রস্থলে। জল আর জল। যেন হতচ্ছাড়া আকাশ, পুরো খালি করে দিচ্ছে। ঠিক সন্ধ্যে ছ’টা।যেন কোন এক ক্রান্তীয় ঝড়,সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকানো, বজ্রপাত, এমনকি কিছু গাছ উপড়ে পড়েছে।
ঘরের ছাদগুলোকে যেন তুলে ফেলবে। নদীর জল বেড়ে গেছে। বান ডাকার মত হয়ে উপচে পড়ে নতুন পথ খুলে দিয়েছে। আর অন্যদের একপাশে ঠেলে জল কাদায় ভরে দিয়েছে। পাথরের টুকরোগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে, কাদা, গাছের গুড়ি, ঘরদোরের অংশের মধ্যে। কখনও বা একটা আস্ত বেড়া, আর কিছু প্রাণীদের মাঝে: মুরগি, গরু, এমনকি গাড়ীর মাঝেও। সবকিছু ঘুরপাক খাচ্ছে। সবই ঘুরছে জলের মধ্যে,কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না।
যে যেখানে ছিল সব চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ নড়ছে না। এমনকি সবাই পলক ফেলতেও ভুলে গেছে। শহরের মাঝখান পুরো স্তব্ধ। যেন কিছুই হয়নি। মনে হচ্ছে জলের ধাক্কাটা অনুভব করতে পারছে না। পাথরগুলো ভেঙে পড়ছিল। আকাশ থেকে নেমে এসেছিল প্রবল ঝড়। পাঁকে ভরে যাচ্ছিল চারদিক। এলোমেলো বাতাস বইছিল। নদীগুলো যেন ফুঁসে উঠছে। আছড়ে পড়ছে মাটিতে... তার ওপর প্রচণ্ড স্রোত।
কোন বড় ফোঁটা নেই। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে, মনে হচ্ছে বেড়ালে পেচ্ছাপ করছে। কী হচ্ছে। গফাড়ের (উত্তর আমেরিকার এক ধরনের বড় ইঁদুর) ঝলক যা দ্রুত লুকিয়ে পড়ে। না, কী হচ্ছে, কী হচ্ছে - কী আসে বিপরীত ভাবে - যেমন যখন ওখানে বৃষ্টি পড়ে। এই বৃষ্টি পুরো ইচ্ছার ওপর আর জোয়ার যা রেখে যায়, বৃষ্টির গন্ধ, পাথরের খাঁজে, পৃথিবীতে, বাতাসে, পুরোনো বাড়ীর বর্ণহীন ছাদে।
সেই একই বৃষ্টি। যে জলটা এখন শহরের মাঝে কাঁদছে। যা ঝরছে হতচ্ছাড়ার ওপর। ছিঁচকে চোরের মতো প্রতিটি সুরের সঙ্কেতে (নোট) যা বাড়ছে, একটা সবিরাম ছন্দে: বৃষ্টি আর নোটে।
একটা নোট/ একটা হতচ্ছাড়া জল, সবকিছু মিলে মিশে ঝরে পড়ছে। ঝরে পড়ছে প্লাজায়, যা মানুষে ভর্তি।
একই জল, সেই গন্ধ, সেই স্বাদ, যা কোনভাবেই গুলিয়ে ফেলা যায় না। এমনকি যদি একশো বছর পার হয়ে যায়। একে চেনা যায়। কারণ বৃষ্টি ঝরে চূড়ান্ত যন্ত্রণার তেজ নিয়ে। রক্ত ও সাহসে। পড়ে খুশি মত, সবকিছু ভাঙ্গার জন্য। অনেক যন্ত্রণা নিয়ে সময়কে পরিস্কার করতে, জমিকে ভেজাতে, নতুন কিছু ফলাতে।
জল যা পড়ে আনন্দের সঙ্গে, ক্ষত ধুয়ে দিতে। ধুয়ে দেয় নোংরা। যে গাছ মরে গেছে আর যে বাড়ছে সবাইকে জল দেবে। ধুয়ে দেয় আকাশ আর পৃথিবীকে, নুড়ি যার মাঝে ঘুরে বেড়ায়।যা কখনো অবৈতনিক কখনো অর্ধেক দেওয়া। প্রতিস্থাপন ছাড়া দিনের সমস্যা ধুয়ে দেয়, নতুন ভাবে শুরু করার জন্য। ধুয়ে দেয় সব বোঝা, যা ঘিরে রাখে শক্ত তর্তিয়ার টুকরো।দেশি মুরগি যা বাজারে পাওয়া যায়।হলুদ খবরের কাগজ শীতের জন্য (মাছিগুলোর জন্য)
হয়তো একটুকরো প্লাস্টিক, হয়ত কোন ভুলে যাওয়া নাম এক দুই তিন চার... অগণ্য হতাশার শৃঙ্খল। কোন এক মহিলা যিনি হারিয়েছেন স্মৃতি, গাড়লের স্মৃতি, ব্যাকপ্যাকের অবশিষ্টাংশ... ধুয়ে ফেলা ঘাম ও ধুলো। ধুয়ে দেওয়া, ধুয়ে দেওয়া, ধোওয়া এবং ধোয়া যখন এইভাবে বৃষ্টি হয়, যখন প্লাজায় বৃষ্টি হয়। সেই ক্রোধের সাথে, সময়ের সাথে সাথে এগিয়ে যাওয়া কষ্টের সাথে, সেই আনন্দের সাথে, সেই উৎসাহ, সেই দুঃখ, সেই রাগ।
যে অস্থিরতা
যে রাগ
যে ভালোবাসা চুম্বনের জন্য/ পৃথিবীকে কামড়ান
অন্য উপায়ে জেতার জন্য
আগাছা/ দারিদ্রের জন্য
যে উদ্বেগ সবকিছু ধুয়ে ছেড়ে দিয়ে
যখন অন্যদের কাছে পৌঁছনোর জন্য
ভাল ধোয়া
ভাল পরিষ্কার
একটি সঙ্গীতের নোট ও প্লাজার ওপর বৃষ্টি উফ্ফ। কিন্তু যেন কিছুই ঘটছে না। কিছুই নেই। খুব তাড়াতাড়ি বাহবা।কুইনার পাখিদের হালকা উড়ে যাওয়ার আগে অদম্য। দড়ির কম্পন, আর্মাদিলোর অন্ত্রে বোমের গুড়গুড়। ড্রামের ঘূর্ণিঝড়। জাম্পোন এর ঝড়ের বাতাস এবং গিটার ওহ্ গিটার।
কিন্তু তোমাকে, তোমাকে তো বৃষ্টি ধরে ফেলল। রাস্তার মাঝখানে, শহরের হৃদয়ে। আরও একটা গরমের দিন। বিকেল ৬টা, সূর্য হাসছে, কিন্তু জ্বলন্ত।
প্রথমে প্রায় দশ এসেছিল, তারপর বোধহয় গোটা কুড়ি, পরে ত্রিশ এখন হয়ত পঞ্চাশ জন স্কোয়ারের মাঝে,দূর্গের সামনে,মধ্যযুগীয় দুর্গের পুরনো দেওয়াল। এবং ভেতরে বছরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্গীত উৎসব।
(-কি মনে হচ্ছে? কি সুন্দর সঙ্গীতটা, না?
-হ্যাঁ, আকর্ষণীয়, দারুণ
-দেখ, যন্ত্রগুলো অরিজিনাল, নয়কি?
-চমক্প্রদ
-সত্যি সত্যিই খুবই চমকপ্রদ, পুরোপুরি)
ঠিক গরমের কোন একদিনে যেন পঞ্চাশজন ওই প্লাজায়। মানুষেরা আসে, যায়। ছোট প্যান্ট, হাল্কা শার্ট, টি শার্ট, খেলার জুতো, ক্যামেরা।
মিষ্টিমেয়েরা, পাকা আমের মত রং, নরম কর্ন, কলা ভাজা
প্রায় মাঝামাঝি, অতিপ্রাকৃত আর নগ্নতার মাঝামাঝি
হাসি ও হাসি।
কিন্তু তুমি এই বৃষ্টিতে ধরা পড়ে গেছ।
আর কেন নয়?এটা অনেকটা সেই কেলাসের পাখীদের উড়ে বেড়ানোর মত। যেন তারা তোমার দু’হাতের মধ্যে বাসা বেঁধেছে। যেন চারাংগা তারের কম্পন তোমার পাঁজরের ফাঁকে। যেন তোমার পিঠে রয়েছে কোলাহল। অসংলগ্ন কথাবার্তার ঝড় তোমার শব্দে ঘুরে বেড়ায়। তোমার আবরণহীন শ্বাস। তারপর, তারপর, তোমার হাত পড়েছে বাধা। শেষ মুহূর্তে তুমি চাইছ নীরবতার চূড়ান্ত প্রান্তে নিজেকে আটকে নিতে, যাতে নিচে পড়তে না হয়। যাতে আসতে না হয় ওই ঘূর্ণির সিঁড়ি থেকে।
যদি স্মৃতির লোভী আগুন, যদি শ্বাদণ্ড ঠিক করে (ছোট ঘোড়ার) এটা কি খুবই ব্যথা দিত? সেখানে আটকে যায় সব কিছু।
ওটা তোমাকে একটু একটু করে পোড়ায়, কোনভাবেই ক্ষমা না করে। আস্তে আস্তে তৈরি করবে পোড়া কাঠ যাতে ‘তামালে’ তৈরি করা যায়। এবং ইতিমধ্যে, সেই আগুনে তুমি বসে পড়লে – গ্রাস করে নিল তোমাকে... রাস্তার গন্ধ, যেখান দিয়ে গিয়েছিলে হেঁটে ওই পুরনো আর অবারিত নির্মাণে, সেই চুরি করা ছোট জমি, প্রত্যেকের কাছ থেকে বুলেট ইত্যাদি নিয়ে তারপরে, তারপর কি? যদি সবকিছুই চলে আসে ইঁট, গান পাউডার, বাণ্ডিল রক্ত আর কাঠ দিয়ে।
ইতিহাস, ঘুঁসি, লাথি। একটা ছোট শয়তানের বাচ্চা, তোমার গলায় ঝুলছে তারপর তুমি ভেসে গেল। স্কোয়ারে বৃষ্টি, বাণ এনে দিল এই শহরের অন্যান্য কোন।অনেক দূরবর্তী এবং অদ্ভুত–থামছেই না–ঠিক বিকেল ছ’টায়।
সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তোমাকে দেখছে। তারা ভাবছে শুরু করেছে, যে এই বিকেলে বোধহয় তুমি অনেক গিলেছ। কে জানে। কিন্তু তারা অবশ্যই জানে না। কি করে জানবে কোন নোটের পিছনে কি লুকানো আছে? তোমার হাতের মধ্যে কি চুঁইয়ে পড়ে। (ওখানে কি হচ্ছে) তোমার নির্বাসনের পিছনে।
এই দুপুরবেলায় তোমার কি হয়েছে।প্রতিদিনে দরকারি দিন থেকে ফিরে আসা। সব কিছু শেষ হয়ে গেছে।কনসার্ট, মানুষের প্রশংসা, এই নতুন ভোরে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, সেই সব দুর্দান্ত, কনসার্টের নোটগুলি। লাল ঝড়ছে, গোঙানি বৃষ্টি। সব প্লাজার মাঝখান ভরে দিচ্ছে।
ইয়োরোপীয় গ্রীষ্মের মাঝে। জল আর জল। উফ্ফ বৃষ্টি বিকেল ছ’টায় আকাশ খালি করছিল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন