ক্রিসমাসের বোনাস

সুব্রত গুহ

মলটার মধ্যে চারঘন্টা ধরে ঘুরছিলাম। ক্রিসমাস আসছে। যদিও সবাই বলছে হাতে টাকা নেই তা সত্ত্বেও, সবাই আশা করছে একটা ভাল উপহার পাবে।

আমার পা ব্যথা করছে। যতক্ষণ না আমার স্যালাড শেষ হচ্ছে,ততক্ষণ যারা বসার জায়গা খুঁজছে, দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমার কোন তাড়া নেই। ওই যে মহিলা, দু টেবিল দূরত্বে বসে আছেন,তারও মনে হয় একই ব্যাপার। জন্তুর মত গপগপ করে গিললে, বেকনের চর্বির অংশটা খাওয়ার জন্য ডবল পয়সা দিতে হবে। স্যালাড কাউন্টারে সব অদ্ভুত লোকেদের পাওয়া যায়। তাদের পেটের মধ্যে বোম আছে। কিন্তু তাদের বিবেক পরিষ্কার, কারণ তারা স্বাস্থ্যকর খাবার খায়।

খুবই ধীরে ধীরে চিবোচ্ছি। আর শুনছি। বেশ কিছুদিন ধরেই আমার একটা অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এই যে এতরকমের শব্দ চারপাশে তৈরি হচ্ছে, এর কোনটাই আলাদা করে কানে ঢোকেনা। যেমন কি সুন্দর মিউজিক বাজছে। রেস্তোরাঁর সব মেশিনের আওয়াজ। চেয়ার টানার আওয়াজ। দল মিলে যারা খেতে এসেছে তাদের কতাবার্তার আওয়াজ। সবই হচ্ছে আমার সামনে কিন্তু কোনটাই আলাদাভাবে কানে ঢুকছে না।

শব্দগুলো মিলেমিশে একটা অদ্ভুত শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে, যা কখনও উঠছে কখনও নামছে ঢেউয়ের মত। যদি না মাঝে কোন বাচ্চার কান্নার অথবা খুব কাছাকাছি কোন টেবিল থেকে জোর হাসির আওয়াজ আসে।

ভাব, কি জিনিস দাঁড়ায় একই জায়গায় হাজার কথা বলে চলেছে। আমি বন্ধ করার সময়ের কথা চিন্তা করছিলাম।ধীরে ধীরে আলোগুলো একটা একটা করে অথবা একসঙ্গে তিন চারটে করে নিবে যাচ্ছে। জায়গাটা ফাঁকা হয়ে কেমন শূন্যতায় ভরে যাচ্ছে। চারপাশে রাতের নীরবতা। আমার কেমন ভয় করছে।

উঠে দাঁড়াই। এইবার আমায় সিদ্ধান্ত নিতে হবে। উপহারটা কিনতে হবে। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে কেটে পড়তে হবে। মানসিক ভাবে আবার বিকল্পগুলোতে ফিরে আসতে হবে। ফিরেও আসি। এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আবার আমাকে বাজিয়ে দেখতে হবে। এর মানে হল আবার আমাকে ওই জায়গায় যেতে হবে, এই নিয়ে তিনবার একই জায়গায় যেতে হবে, যদি শেষ পর্যন্ত উপহারটা কিনতে পারি। কিচ্ছু করার নেই। চলা শুরু করলাম।

বেশ গরম লাগছে। শপিং মল মোটেও আমার পছন্দের জায়গা নয়। কেনা কাটাও পছন্দ করিনা। সবচাইতে বিরক্ত লাগে, যখন ওরা জিজ্ঞাসা করে কি চাই? আমার কাছে এটা অস্তিত্বগত সমস্যা। এটা আমাকে খুব যন্ত্রণা দেয়। ‘আমি শুধু দেখতে এসেছি’ উত্তর দিয়ে, তাড়াহুড়ো করি।

ঠিক ওই সময়ের থেকে তাদের চোখদুটো আমাকে অনুসরণ করে চলে। এটা আমি খুব ভালোভাবেই অনুভব করতে পারি। শুধু তাই-ই নয়, আমার আশেপাশে ওদের পায়ের আওয়াজও পাই। একই সঙ্গে আমি সন্দেহ আর অপরাধবোধে ভুগতে থাকি। যদিও আমার ব্যাগও খুলিনি অথবা হাতে কিছু তুলেও নিইনি।

সব চাইতে বিশ্রী ব্যাপারটা হয়, এই সময়গুলো কাটতেই চায়না। কি লম্বা যে হয়। দোষ আমারও আছে। আমিও তো বেরিয়ে আসিনা। ভাবতেও চাই না যে ওরা আমাকে বুঝতে পারছে। একটা বইয়ের পড়ে ফেলার মত, যা আমার ব্যাকপ্যাকে এলার্মটা অ্যাক্টিভেট করে দেয়। বেশি খারাপ লাগে যদি কোন পোষাক আমার ব্যাগের ভেলক্রোতে আটকে যায়। অজান্তে। আর সেটা খেয়াল না করলে সবাই ভাববে যে আমি নির্লজ্জের মত ওটা নিয়ে যাবার ধান্দা করছি।

যখন আমি এটা নিয়ে চিন্তা করি, তখন এমনভাবে নড়াচড়া করি যে ওই তত্ত্বমূলক ব্লাউজটা যাতে মাটিতে পড়ে যায়, অথবা আমি ব্যাপারটা অনুভব করি কিনা। কারণ যদি সত্যি সত্যি ঘটনাটা ঘটাই তা হলে অবশ্যই আমার ওপর সন্দেহটা আরও জোরদার হবে। যাইহোক, তাতে ওরা আমার ওপর আরও বেশি নজর রাখবে।

আমি শুধুমাত্র আশা করতে পারি যে দরজাটা পুরোপুরি খালি থাকবে অর্থাৎ যাতায়াতের পথে কেউ থাকবে না অথবা যে মহিলা আমার সামনে আছেন, তিনি আগে বেরিয়ে যাবেন। আমিই হয়ত সেই ভাগ্যবান হব যে ওই মহিলার বেলায় অ্যালার্ম বাজবে অথচ ওরা আমাকেই ধরবে।

অন্যান্য পথগুলো ভাবতে ভাবতে হাঁটছিলাম। ওই সবের মধ্য দিয়ে আর যেতে ইচ্ছা করছিল না। অপেক্ষা করতে লাগলাম, যে কখন কর্মচারীদের আর সিকিওরিটি গার্ডদের বদলের সময় হবে। যখন তাদের সন্দেহ থাকবে না। বিশেষত গলার স্বরে।

‘এস্তেলা, তুমি নিজেই নিজের সঙ্গে কথা বলছ’। নিজেকেই বিদ্রূপ করলাম। একটা শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে খুব ভয় পেয়ে গেলাম। এইভাবে যদি চলতে থাকি, তাহলে তৃতীয় দোকানে গিয়ে, আমি আর একা থাকব না। যেখানে নিজেকে কন্ট্রোল করব। এবং শেষ পর্যন্ত ক্লোজ সার্কিটে আমাকে জুম করে দেখবে।

সত্যি কথা বলতে কি, আমি দেখছিলাম যে, কেমন করে লোকেরা আর মেয়েরা যাদের ওই জায়গার লোগো লাগানো আছে, তাদের ব্যাগে, কেমন করে ওয়াকিটকিতে কথা বলতে বলতে আমার পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। এরা আমার চারপাশেই ঘুরছে। সাধারণ লোকেদের থেকে, তাদের আলাদা করতে পারছিলাম। তাদের পাগলামি সত্ত্বেও, তারা সব কাছেই ছিল।

ভাল হয় যদি, এইসব উপহার-টুপহার ভুলে গিয়ে যত তাড়াতাড়ি ওখান থেকে বেরিয়ে পড়া যায়। কটা বাজে খেয়ালই নেই। সেলফোনটা বার করতে ইচ্ছা করল না অথবা কাউকে জিজ্ঞাসা।

এইরকম সময়ে যে কোনরকম উল্টোপাল্টা পদক্ষেপ বিপদজনক হতে পারে। যতক্ষণ না বাহির দরজায় পৌঁছতে পারছি। খুব শান্ত থাকতে হবে। একবার বাইরে একটা পা রাখতে পারলে হয়। দৌড় লাগাতেও পারি। বাইরের গরম হাওয়াটা দরকার। খোলা জায়গা।

নিশ্চিন্ত লাগছে। যদিও শহরের বাইরেও একই এবং স্থায়ী শব্দ তরঙ্গ আছে। যেহেতু এটা আমি আবিস্কার করেছি, ওই বোঁ বোঁ শব্দটা শোনা বন্ধ হচ্ছে না। মাথার ভেতরে হয়েই চলেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%